শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

“…সে যে আমার জন্মভূমি”

আটাত্তর বৎসর পার হইল। মহাভারত বর্ণিত গান্ধার হইতে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ প্রাগজ্যোতিষপুর প্রভৃতি, অথবা রাজা ভরতের সাম্রাজ্য কিম্বা জম্বুদ্বীপ নামক উপমহাদেশীয় ভূখন্ডের, যে অংশ বিশেষটি, কাটিয়া কুটিয়া আমাদিগের ‘হাতে রহিল পেন্সিল’-এর ন্যায় আসিয়া পৌঁছাইল, তাহাই আমাদিগের মাতৃভূমি, বর্তমান ভারতবর্ষ। বহির্বিশ্বের হাতি, সাপ, মশলা, জাদু-র দৃষ্টিকোণ হইতে পৃথক স্বীয়কীর্তি প্রতিষ্ঠার আধুনিক যাত্রাপথ সৃষ্টি হইল এইদিনে। বহু আন্দোলন, রক্তক্ষয়, স্বার্থত্যাগ পার করিয়া প্রাপ্ত এই স্বাধীনতা। ‘খন্ডিত’ হইলেও ভারতীয় রূপে পনেরোই অগাস্ট নিঃসন্দেহে পুণ্যলগ্ন। 

অতঃপর নূতন দেশের অগ্রগতি শুরু হইল। প্রথমেই সৃষ্টি হইল জাতির নিজস্ব সার্বভৌম সংবিধান। ভারতবাসীর প্রথম উল্লেখযোগ্য সম্পদ। ইহার সহিত যুক্ত হইল পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। ইহা ভারতবর্ষের অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি রূপে পরের কয়েক দশক জুড়িয়া বিস্তৃত রহিল। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প খাতে অগ্রগতি ঘটিল। সৃষ্টি হইল নূতন নূতন বিশ্ববিদ্যালয়, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যাচর্চার বিশ্বমানের কেন্দ্র আই-আই-টি, ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়িয়া তুলিবার আতুরঘর। স্থাপিত হইল হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্ভরযোগ্য শৃঙ্খলা।

ইহার পরবর্তী কয়েক দশক জুড়িয়া কৃষিক্ষেত্রে ঘটিল তুমুল অগ্রগতি। ‘সবুজ বিপ্লব’ পাঞ্জাব প্রদেশ হইতে শুরু করিয়া সমগ্র দেশে ছড়াইয়া পড়িল। বহু মন্বন্তর পার করিয়া আশির দশকে আসিয়া ভারত খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন করিল। এই ধারাবাহিকতার সঙ্গে নিয়মিত নির্বাচন প্রক্রিয়া তৈরি করিল রাজনৈতিক ভারসাম্যর একটি নির্ভরযোগ্য পরিকাঠামো। 

এমন করিয়া নব্বই-এর দশক আসিয়া পড়িল। ভারতের ইতিহাসের মোড় ঘুরাইয়া দিবার অর্থনৈতিক উদারীকরণ হইল। সাতচল্লিশে যে দেশ হাঁটিতে শুরু করিল, ক্রমে বুনিয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করিয়া, সে বহির্বিশ্ব জয় করিতে আগুয়ান হইল।  

আশির দশক হইতে আসিতে শুরু করিল তথ্য প্রযুক্তির যাদুদন্ড। ভারতবাসী নিজ কর্মকুশলতা দেখাইবার নূতন অস্ত্র পাইল, যাহাতে বিশ্ববাসী তাহাকে সম্ভ্রমের চোখে দেখিতে আরম্ভ করিল। 

অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতি এবং তথ্য প্রযুক্তির শক্তি এই উভয় ডানায় ভর করিয়া ভারত অনন্য আকাশে উড্ডয়ন করিল। মহাকাশ গবেষণা হইতে রোগ প্রতিষেধক আবিষ্কার, কোন ক্ষেত্রেই তাহার অগ্রগতি থামিয়া থাকিল না। চন্দ্রাভিযান ও মঙ্গলযান ভারতবর্ষকে তথাকথিত উন্নতদেশগুলির সঙ্গে একাসনে নিয়া আসিল।

ভারতবর্ষ বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ। পরীক্ষাগারে অথবা বাণিজ্যিক সংস্থার জন্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করা এক প্রকার, প্রায় দেড়শত কোটি জনসাধারণকে এই প্রযুক্তির আওতায় লইয়া কোন সমাধান সূত্র পরিবেশন করিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন সক্ষমতার প্রয়োজন। সমগ্র বিশ্ব অবাক হইয়া দেখিল, কী প্রক্রিয়ায় ভারতবর্ষ আধারকার্ড নিবন্ধন করিল, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া সমগ্র দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করিল, এবং সর্বোপরি ইউ-পি-আই মাধ্যমে ডিজিট্যাল মুদ্রা প্রচলন করিল। দৈনন্দিন ব্যবহারে আমরা এইরূপ পরিষেবার অন্তর্নিহিত জটিলতা বুঝিতে পারি না। অতি স্বাভাবিক এবং সহজলভ্য করিয়া তুলিতে পর্দার পিছনে যে কত বিস্তর অনুপুঙ্খ কার্য করিতে হয়, তাহার ইয়াত্তা নাই।

উনিশশো সাতচল্লিশ সালের একটি ভূখন্ড ভাঙিয়া দুইটি রাষ্ট্র, এবং পরবর্তী কালে বিভাজিত হইয়া তিনটি সৃষ্টি হইয়াছিল। ভারতবর্ষ ব্যতীত অপর দুইটির প্রতি দৃকপাত করিয়া, আমাদিগের প্রাপ্তি অনুভবে আত্মশ্লাঘা হইতেই পারে।

বিগত আটাত্তর বৎসরে কি সঙ্কট আসে নাই? স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে মহাত্মা গান্ধীর হত্যার মতো ঘৃণ্য ঘটনা দিয়া তাহার সূত্রপাত। অতঃপর ছোট বড় যুদ্ধ। ক্রমান্বয়ে বহির্শত্রু দ্বারা ভয়ঙ্কর সব নাশকতার ঘটনা। বিভিন্ন রাজ্যে ঘটিয়া যাওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। সংবিধানের সঙ্কট ঘোষিত হইল জরুরী অবস্থায়। আততায়ী দ্বারা নিহত হইলেন দেশের দুই প্রধানমন্ত্রী। এমনি করিয়া ঢেউএর মতো একের পর এক অশনি আঘাতে বিদ্ধ হইয়াছে দেশ। ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হইয়াছে অগ্রগতির রথ। 

ভারতবর্ষ বিদ্ধ হইলেও নির্বাপিত হয় নাই। নূতন উদ্যমে জাগিয়া উঠিয়াছে, নূতন উদ্দীপনায় স্পর্শ করিয়াছে উৎকর্ষের কোন নূতন শৃঙ্গ।   

তথাপি বর্তমান কালের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করিলে, মনে আশঙ্কার বুদবুদ জাগিয়া উঠে। সনাতন ভারতবর্ষের নিজস্ব তন্তুতে কি বদল লক্ষিত হইতেছে? বিশেষ করিয়া পশ্চিমবাংলা কি তার নিজ সমাজ বিন্যাস নষ্ট করিয়া ফেলিতেছে? আজ এই পুণ্যলগ্নে সকল ভারতবাসীর সঙ্গে, সমগ্র বাঙালী সমাজকে মনে রাখিতে হইবে, তাহার নিজস্ব সত্তার স্বরূপ কী? যে বুনিয়াদী পরিচয় ভারতবর্ষ কে সভ্যতার আদি যুগ হইতে আজ পর্যন্ত অচঞ্চল রাখিয়াছে, তাহাকে কোন অবস্থায় যেন হারাইয়া না ফেলি। তাহা হইলে অধঃপতনের সঙ্গী রূপে কোথায় নিক্ষিপ্ত হইতে পারি, দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে দেখিয়া সহজেই অনুমান করিতে পারি।

আজ এই পনেরোই অগাস্টের পুণ্যপ্রভাতে আমাদের সকলের শপথ, আমরা যেন কদাপি আমাদিগের সত্য হইতে বিচ্যুত না হই, মনে রাখিতে হইবে দেশমাতৃকা, তাহার সন্তানদিগের প্রতি চাহিয়া রহিয়াছেন। “সকল দেশের রাণী সে যে, আমার জন্মভূমি।”

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


4.5 2 votes
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Santwana Goswami
Santwana Goswami
11 months ago

স্বাধীনতাই একটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি।বহু আত্মত্যাগ এবং বহু আত্মবলিদানের কঠিন পথ অতিক্রম করে আমরা আজ একটি স্বাধীন দেশের অধিবাসী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি।এই প্রভূত মূল্যবান অর্জনকে আমরা আমাদের জীবনে এবং মননে সযত্নে লালন করার প্রতি সদা সচেতন থাকবো। সম্পাদকীয় লেখাটি খুবই প্রাসঙ্গিক এবং যথার্থ হয়েছে।

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Santwana Goswami
11 months ago

অনেক ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।