শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

রবীন্দ্রনাথ-গীতাঞ্জলি–ইয়েট্‌স্ঃ কোলাহল তো বারণ হল (পর্ব – ১)

“… when I translate my work I find new images and presently new thoughts and finally it is something almost new. The fundamental idea is the same but the vision changes. A poem cannot be translated, it can only be relieved in a different atmosphere.” …Rabindranath

স্কুলের উঁচু ক্লাসে রবীন্দ্রনাথের ওপর ইংরেজিতে একটি রচনা লেখার প্রয়োজনে বাবার শরণাপন্ন হলাম। এখনও মনে আছে, একটি অংশে ইংরেজি গীতাঞ্জলি সম্পর্কে তিনি লিখে দিয়েছিলেন – “The credit should go to William Batler Yeats, a poet and dramatist, who introduced Rabindranath to the Western World.”। সেই প্রথম মনে একটা প্রশ্নের জন্ম নিল। ইংরেজি গীতাঞ্জলির সাফল্যের পিছনে আইরিশ কবি ইয়েট্‌সের ‘credit’টা কী বা কতটুকু?

পরে জানলাম, ইংরেজি গীতাঞ্জলি এবং ইয়েট্‌স্‌কে নিয়ে এমন ধারণার মধ্যে খুঁজলে কিছুটা সত্য যে মিলবে না তা নয়; কিন্তু কালক্রমে গল্পের গরু গাছে উঠে মিথটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বহু শিক্ষিত মানুষও বিশ্বাস করে বসলেন, আদতে ইংরেজি গীতাঞ্জলি ইয়েট্‌সেরই লেখা – সি এফ অ্যান্ড্রুজেরও হতে পারে। অবশ্য‍‍‌ সত্যের দ্বার উন্মোচনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের স্বরূপ উদ্ঘাটন ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। সময়টা এল ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে শুরু হল সৌরীন্দ্র মিত্রর ‘গীতাঞ্জলি’ ও ডব্লু বি ইয়েট্‌স্’ এবং অগাস্ট ১৯৭২ থেকে শুরু হল তারই সূত্র ধরে ‘খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে’ – যে নামে আনন্দ পাব্লিশার্স থেকে ১৯৭৭ সালে বই বের হল। সেই ধারাবাহিক পর্ব থেকেই আমি এই লেখাটি খুব মনোযোগ সহকারে পড়েছি এবং এর বিষয়বস্তুর সারবত্তা নিজের সাধ্যমত বিচার করার চেষ্টা করেছি। ইংরেজি গীতাঞ্জলির ভূমিকায় ইয়েট্‌স্ বলছেন যে, গীতাঞ্জলির পাণ্ডুলিপি সর্বদা তাঁর সঙ্গে থাকত এবং ট্রেনে-বাসে-রেস্তোরাঁয় বসে পড়তেন যা তাঁর অত্যন্ত মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিল। ‘খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে’ প্রকাশিত হওয়ার পরে এই বিষয়টি নিয়ে আরও অনেকেই আলোচনা করেছেন।

গীতাঞ্জলির পাণ্ডুলিপি

রবীন্দ্রনাথের তৃতীয়বারের ইংল্যান্ড সফরের সময় William Rothenstein-এর বাড়িতে একটি কবিতা পাঠের আসরে (৭ জুলাই ১৯১২) ইয়েট্‌স তাঁর আবেগমথিত গলায় পান্ডুলিপির টাইপ-কপি থেকে কয়েকটি কবিতা পাঠ করেন। তার পরেই ১০ জুলাই ট্রাকাডেরো রেস্তোরাঁয় আয়োজিত সভায় তিনি একটি প্রশস্তি ভাষণ দেন যার সম্প্রসারিত রূপটি হল তাঁরই কৃত ইংরেজি গীতাঞ্জলির ভূমিকা। সেদিনকার ভাষণে ইয়ে্ট্‌স্ বলেছেন – “ I KNOW OF NO MAN IN MY TIME WHO HAS DONE ANYTHING IN THE ENGLISH LANGUAGE TO EQUAL THESE LYRICS. Even as I read them in these literal prose translations, they are as exquisite in style as in thought.” (বড় হরফ আমার)। তখনও কিন্ত ইয়েট্‌সের কাছে রবীন্দ্রনাথের এমন ইংরেজি ‘foreigner’s English’ বলে আদৌ বিবেচিত হয়নি। পরে কেন হল, কেনই-বা একই লেখা সম্পর্কে সময়ের ব্যবধানে ইয়েট্‌সের এক বিপ্রতীপ অবস্থান সে আলোচনায় পরে আসছি। দুই দিক দিয়ে সেদিন গীতাঞ্জলি বা রবীন্দ্রনাথ সমালোচনার লক্ষ্য হলেন।

১) গীতাঞ্জলির আদি-অন্ত ইয়েট্‌স্‌ কর্তৃক সংশোধিত ও পরিমার্জিত, প্রায় পুনর্লিখিত।

২) গীতাঞ্জলির কাব্যগুণ এবং ভাষা কবির সুনাম রক্ষা করেনি।

তা হলে, প্রথম অভিযোগটি সত্য হলে দ্বিতীয় সমালোচনাটির দায়-দায়িত্ব তো ইয়েট্‌স্‌কেই নিতে হয়। অবশ্য আমার আজকের আলোচনা প্রধানত প্রথম বিষয়টি নিয়েই। প্রথমে গীতাঞ্জলির প্রারম্ভিক ইতিহাসটুকু অতি সংক্ষেপে বলে নেওয়া যাক। সাল ১৯১২, রবীন্দ্রনাথের তৃতীয়বার ইংল্যান্ড সফর। তার আগে অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে বসে একটি খাতায় গীতাঞ্জলির অনুবাদ শুরু করলেন। যাত্রাপথে স্টিমারে বসেও লেখা চলল। প্রথম খাতাটি শেষ হলে দ্বিতীয় একটি খাতায় লেখা শুরু হল। লন্ডনে পৌঁছে রবীন্দ্রনাথ ৮৬টি কবিতা সম্বলিত প্রথম খাতাটি বন্ধু রোটেনস্টাইনের হাতে সমর্পণ করলেন। সৌরীন্দ্র মিত্র অবশ্য বলেছেন, চারটি সংখ্যাচিহ্নবিহীন পরিত্যক্ত কবিতা সমেত মোট সংখ্যাটা ৮৭(৮৩+৪)। কিন্তু ২০০৯ সালে প্রকাশিত অভীককুমার দে’র ফটো-কপির সংকলনে দেখছি, যেটা রোটেনস্টাইনের কাছে সমর্পিত এবং পরবর্তীকালে Houghton Library, Harvard University কর্তৃক সংরক্ষিত, সেই সংখ্যাটা ৮৭ নয় – ৮৬। এই কবিতাগুলির মধ্যে তিনটি কবিতার কোনো সংখ্যাচিহ্ন নেই বটে, কিন্তু কোনো কবিতাই পরিত্যক্ত হয়নি। শুরুতে দেখছি, রোটেনস্টাইনের হস্তাক্ষরেই লেখা রয়েছে – “Original manuscript of Gitanjali‌ which the poet brought me from India on his initial visit to us at Oak Hill Park.” মূল পাণ্ডুলিপির ফটো-কপি সংবলিত বইটি প্রকাশের পর বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার আর অসুবিধা রইল না। এতে যে শুধু গবেষকদের পরিশ্রম লাঘব হল তাই নয়, অনেক কল্পিত কাহিনি ও মিথ্যাচারের ফানুসটিও চুপসে গেল।

রোটেনস্টাইনের বাড়িতে কবি, রোটেনস্টাইনের হস্তাক্ষর

এখানে আর একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে এসে পড়ে। প্রকাশকালে কিছু পরিমার্জন হলেও রোটেনস্টাইনের কাছে রক্ষিত খাতাটিকে মূল পান্ডুলিপি বলেই আমাদের ধরে নিতে হবে। সৌরীন্দ্র মিত্রর হিসেব মতো রবীন্দ্রনাথের হেফাজতে থাকা এই দ্বিতীয় খাতাটিতে কুড়িটি কবিতা থাকার কথা (৮৩+২০=১০৩)। কিন্তু রোটেনস্টাইনের রক্ষিত পাণ্ডুলিপির প্রামাণ্য সংখ্যা ৮৬ ধরলে দ্বিতীয় খাতাটির কবিতা গিয়ে দাঁড়ায় তা হলে ১৭ (৮৬+১৭=১০৩)। এখন গীতাঞ্জলিতে প্রকাশিত ওই ১০৩টি কবিতার অঙ্কটা মেলাতে গেলে দ্বিতীয় খাতাটির হদিশ তো আমাদের পাওয়া দরকার, যেটা সৌরীন্দ্র মিত্রের মতে রবীন্দ্রনাথের হেফাজতেই ছিল। সেটা কোথায়? এই দ্বন্দ্ব কাটিয়ে সমীর সেনগুপ্ত তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের বিদেশী বন্ধুরা’ শীর্ষক প্রবন্ধে দুটো খাতার প্রসঙ্গই তুলেছেন। বলেছেন, “মোট ১০৩টি ছোট ছোট কবিতার অনুবাদ সংবলিত খাতাদুটি তিনি সসংকোচে রোটেনস্টাইনের হাতে অর্পণ করলেন”। লক্ষ করার বিষয়, রোটেনস্টাইনও ‘original manuscript’-এর প্রাপ্তি স্বীকার করেছেন বটে, কিন্তু তা একটা না দুটো খাতায় তার কোনো উল্লেখ পাচ্ছি না। তবে ফটোকপি পাচ্ছি ওই ৮৬টি কবিতারই।

যাই হোক, ওই ১০৩টি কবিতাই পড়ে উচ্ছ্বসিত রোটেনস্টাইন পাণ্ডুলিপির তিনটে টাইপ-কপি প্রস্তুত করিয়ে মতামতের প্রত্যাশায় ইংল্যান্ডের সাহিত্য-সমাজের তিনজন গুণী মানুষের কাছে পাঠালেন। প্রখ্যাত এই তিন ব্যক্তিত্ব হলেন – অক্সফোর্ডের সাহিত্যের অধ্যাপক Andrew Cecil Bradly, আধ্যাত্মবাদী লেখক Stopford Augustus Brook এবং নাট্যকার ও কবি William Butler Yeats.

A C Bradly
S A Brook
W B Yeats

পাণ্ডুলিপি পড়ে ইয়েট্‌সের একেবারে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় কথা আগেই বলা হয়েছে। মনে রাখা খুবই প্রয়োজন, ইয়েট্‌সের ওই বিচার রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষরে লিখিত অসংশোধিত ও অবিকৃত খসড়াটির প্রেক্ষিতেই। ব্র্যাড্‌লি রোটেনস্টাইনকে পত্রযোগে জানালেন, “It looks as though we have at last a great poet among us again.”। স্টপফোর্ড ব্রুক লিখলেন, “I have read them with more than admiration, with great gratitude, for their spiritual help and for the joy they bring and confirm, and for the love of beauty which they deepen far more than I can tell. I wish I were worthy of them.”। শুরু হয়ে গেল গীতাঞ্জলি সম্পর্কে উচ্ছ্বাসের বন্যা। Modern Review পত্রিকায় সি এফ অ্যান্ড্রুজ লিখলেন, ‘An evening with Rabindra’; ওই ৭ জুলাইয়ের পরদিন, ৮ জুলাই ইংরেজ লেখিকা মে সিনক্লেয়ার অ্যান্ড্রুজের মতোই মনের অবস্থা নিয়ে রথীন্দ্রনাথকে লিখলেন তাঁর ‘last night’-এর অভিজ্ঞতা। ‘পিতৃস্মৃতি’তে পুরো চিঠিটির অনুবাদ রয়েছে, যেখানে সিনক্লেয়ার শুরুতেই লিখছেন – “কাল রাতে আপনার কবিতার বিষয়ে কোনো কথা বলি মনের অবস্থা তেমন ছিল না। এ কবিতা এমন পর্যায়ের যে, এর মধ্যে প্রথাগতভাবে দু-চার কথা বলা অসম্ভব। আজ আমি কেবল এইটুকু বলতে পারি, আবার যদি এ কবিতা নাও শুনি তবু এর রেশ আজীবন আমার মনে বাজতে থাকবে। নিছক কবিতা হিসাবে বিশুদ্ধ এবং সর্বাঙ্গসুন্দর বলেই নয়, এই কবিতায় এমন এক ঐশী স্পর্শ আছে যা আমি কদাচিৎ হঠাৎ-আলোর ঝলকের মতো, নিতান্ত ক্ষণিকের জন্য, মনে মনে অনুভব করেছি।”

May Sinclair
C. F. Andrews with Rabindranath

গীতাঞ্জলি সম্পর্কে বিদ্বৎসমাজের এমন মুগ্ধতা ও আগ্রহকে মান্যতা দিয়ে লন্ডনের ইন্ডিয়া সোসাইটি ১৯১২ সালের নভেম্বর মাসে বইটির (GITANJALI, Song Offerings) একটি সীমিত সংস্করণ প্রকাশ করে। বিলম্ব না করে বিখ্যাত প্রকাশন সংস্থা ম্যাক্‌‌মিলান কোম্পানি ১৯১৩ সালের মার্চ মাসে একটি সুলভ এবং সাধারণ সংস্করণ প্রকাশ করে। গীতাঞ্জলি প্রকাশের ব্যবসায়িক বিচক্ষণতার কথা জানিয়ে রোটেনস্টাইন পরে কবিকে লেখা একটি চিঠিতে মন্তব্য করেছিলেন, “Everything which bears your name is gold to Macmillan.”। যাই হোক, ঘটনার স্রোত পেরিয়ে ১৯১৩ সালের ১২ নভেম্বর গীতাঞ্জলির জন্য সুইডিশ্ অ্যাকাডেমি সে-বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করে দিল। বিশ্ববাসী পরের দিন জানল একটি অপরিচিত নাম; প্রায় অপরিচিত কলকাতার আরও অপরিচিত ৬নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের কে এক রবীন্দ্রনাথ! বারান্দার রেলিঙের পাশে উদাস নয়নে বাইরে তাকিয়ে থাকা আমাদের সেই ‘ছেলেবেলা’র ছোট্ট রবি – পাশ দিয়ে যেতে যেতে বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ যার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, “রবি আমাদের ফিলসফার হবে।”

রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি

দীর্ঘ আলোচনার পর এই পুরস্কারের সিদ্ধান্ত সুইডিশ কমিটির বিশেষজ্ঞরা নিয়েছিল Royal Society of Literature-এর সদস্য স্টার্জ মুরের ব্যক্তিগত একটি সুপারিশকে মান্যতা দিয়ে। দু’লাইনের সুপারিশের বয়ানটি ছিল –

“Sir, As a fellow of the Royal Society of Literature of the United Kingdom, I have the honour to propose the name of Rabindranath Tagore as a person well qualified in my opinion to be awarded the Nobel Prize in Literature.”

স্টার্জ মুর

সারা বিশ্বজুড়ে এল অভিনন্দনের প্লাবন। রোটেনস্টাইন লিখলেন, “I open the Times and a great shout comes from it – Rabindranath has won the Nobel prize! I cannot tell you of the delight this splendid homage gives me – the crown is now set upon your brow.” দুটি কণ্ঠ কিন্তু একেবারে নীরব। একজন এজ্‌রা পাউন্ড, অন্যজন ইয়েট্‌স্। পাউন্ডের প্রসঙ্গ এখন থাক, সে আর এক অধ্যায়। কিন্তু ইয়েট্‌স্? বড় বিস্ময়! লক্ষ্য করার বিষয়, Royal Society-র সরকারি তরফে কিন্তু সেই বছরের পুরস্কারের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল ঔপন্যাসিক Thomas Hardy-এ নাম। তা ছাড়া বিভিন্ন দেশের অনেক কবি-সাহিত্যিকদের নামও সুপারিশ করা হয়েছিল, যেমন ছিল ফরাসি দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক Antole Fance-এর নাম। অবশ্য সে বছর তাঁর নাম বিবেচিত না হলেও আনতোলে ফ্রঁস ১৯২১ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।

পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথের খ্যাতির কারণ ত্রিবিধ। প্রথম কারণ অবশ্যই কবিতা-প্রেমী বিদগ্ধ ইংরেজদের কাছে গীতাঞ্জলির সমাদর। অনস্বীকার্য যে নোবেল পুরস্কার সে’ খ্যাতিকে আরও গৌরবান্বিত ও ত্বরান্বিত করেছে। খ্যাতির দ্বিতীয় কারণটি হল, তাঁর ভাষণে থাকত ভাষার জাদু। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো লক্ষ্য করেছিলেন, ইংরেজি ভাষার প্রতি কতটা অধিকার নিয়ে ভাষণে এবং কথনে তৎক্ষণাৎ তাঁর কী যথাযথ শব্দ-চয়ন! তাঁর বাগ্মিতার অসাধারণত্বের পরিচয় পেলেন আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের বহু বিদগ্ধ মানুষ; ইলিয়ন ও হার্ভার্ড প্রভৃতি সম্ভ্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসতে লাগল আমন্ত্রণ; ফসল ফলল – The Religion of Man, Nationalism, Sadhana-র মতো বক্তৃতামালা।

তৃতীয় কারণটি তাঁর প্রশান্ত মূর্তির অসাধারণ সুষমায় মহিমান্বিত ব্যক্তিত্বের আভা। শুধু সেদিন কেন, গীতাঞ্জলি পর্বের বহুদিন পরে কবিকে দেখে ওকাম্পোর কী মনে হয়েছিল? রবীন্দ্রনাথের কবিতা তো তাঁর প্রথম প্রেম, অবশ্যই। কিন্তু তাঁর কবি-দর্শনের প্র্রথম অভিজ্ঞতাটা অনেকটা রোম্যাঁ রোলারই মুগ্ধতার ঢঙে! শঙ্খ ঘোষের অনুবাদে ওকাম্পোর বলা এক টুকরো অংশ, একটু দীর্ঘ হলেও না-বলে পারছি না। – “তেষট্টি বছর বয়স, প্রায় আমার বাবার বয়সী, অথচ কপালে একটিও রেখা নেই, যেন কোনো দায়িত্বভারই নষ্ট করতে পারে না তাঁর সোনালি শরীরের স্নিগ্ধতা। সুগোল সমর্থ গ্রীবা পর্যন্ত নেমে এসেছে উছলে-ওঠা ঢেউতোলা সাদাচুলের রাশি। শ্মশ্রুমণ্ডলে মুখের নীচের দিকটা আড়াল, আর তারই ফলে ওপরের অংশ হয়ে উঠেছে আরো দীপ্যমান। মসৃণ ত্বকের অন্তরালে তাঁর সমগ্র মুখাবয়বের গড়ন এক অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য রচনা করেছে, তেমনি সুন্দর তাঁর কালো চোখ, নিখুঁত টানা ভারী পল্লব। শুভ্র কেশদাম আর স্নিগ্ধ শ্মশ্রু, এর বৈপরীত্যে জ্বলে উঠেছে তাঁর চোখের সজীবতা। দীর্ঘ দেহ, শোভন চলন। তাঁর প্রকাশময় দুটি অতুলনীয় শুদ্ধ হাতের সুধীর সুষমা যেন অবাক করে দেয়, মনে হয় যেন এদের নিজেদেরই কোনো ভাষা আছে।”

Ernest Rhys

লন্ডনে Everyman’s Library-র সম্পাদক ও রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি জীবনীকার আর্নেস্ট রীজ প্রথম দর্শনেই অভিভূত। স্মৃতিকথায় তিনি লিখছেন, “For a moment I was abashed; it was as if the prophet Isaiah had come to one’s door.” শুধু চাক্ষুষ দেখেই বিশিষ্ট ইংরেজরা কবির প্রতি আকর্ষণ বোধ করেছেন। লন্ডনের রাস্তায় অকস্মাৎ কবি-সন্দর্শনে কোনো মহিলার মূর্ছা যাওয়ারও উপক্রম ঘটেছে – ‘Oh! It is Jesus!’ অধিকাংশ ইংরেজ রবীন্দ্রনাথের এমন ব্যক্তিত্ব ও ঈশ্বরসদৃশ শারীরিক সুষমার সঙ্গে প্রায় বাইবেলের পরিপূরক হিসাবে গীতাঞ্জলির মধ্যে আধ্যাত্মিকতার নিবিড় সংযোগ অনুভব করল। বলতেই হবে, এমন বিচার গীতাঞ্জলির প্রকৃত মূল্যায়নের পথে বড় অন্তরায় হয়েছে। চল্লিশের দশকের শুরু থেকেই গীতাঞ্জলির সেই তুমুল জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভাটার টান এর একটা কারণ।।

এই পরিস্থিতির উদ্ভবে রবীন্দ্রনাথকেও কিছুটা দায়িত্ব তো নিতেই হবে। অনেকেই খেয়াল করেন না, ইংরেজি গীতাঞ্জলির মধ্যে স্থান পেয়েছে তাঁর নানা বাংলা কাব্যগ্রন্থের এক বিচিত্র রামধনুর খেলা (গীতাঞ্জলি-৫৩ + গীতিমাল্য-১৬ + নৈবেদ্য-১৬ + খেয়া-১১ + শিশু-৩ + চৈতালি, কল্পনা, উৎসর্গ এবং স্মরণ থেকে একটি করে চারটি = মোট ১০৩টি ইংরেজি গীতাঞ্জলির কবিতা)। কান্নাহাসির দোলা আর শান্তি-অশান্তির আঘাতে যে বীণা তিনি বাজিয়েছেন গীতাঞ্জলিতে, তার সঙ্গে খ্রীস্টসদৃশ অবয়ব আর বাইবেলকে পাশে রেখে কাব্য বিচারকে আমি রবীন্দ্রনাথের কবিতার অবমূল্যায়নের অপচেষ্টা বলেই মনে করি। হ্যাঁ, ব্রহ্ম-সংগীতের মতো তাঁর বেশ কিছু গান-কবিতায় আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ আছে বটেই, কিন্তু সেই সামান্য একটা অংশ তাঁর সামগ্রিকতার মাহাত্ম্যকে চিহ্নিত করে না। যে দৃষ্টিভঙ্গিতে পাশ্চাত্যের সাধারণ পাঠকের কাছে রবীন্দ্রনাথের কবিতার মূল্যায়ন, তার প্রতিবাদ সেদিন রবীন্দ্রনাথেরই করার দরকার ছিল। কিন্তু খ্যাতির অমৃতসুধার সঙ্গে যে হলাহল উঠে আসছে তার সম্পর্কে অবহিত হলেও তাঁর অসহায়তা জানিয়ে অজিত চক্রবর্তীকে লিখছেন –“মাতালের পক্ষে অবস্থাবিশেষে মদ কষ্টকর হলেও সে সেটাকে ব্যবহার করতে ছাড়ে না – মানুষের মধ্যে একটা মাতাল আছে, লোকের খ্যাতি সম্ভোগ করা তার চিরকালের মৌতাত – আমার সেই মাতালটা সেই খ্যতির পেয়ালা ভরে ভরে পান করেছে- কিন্তু আমার অন্তরাত্মা ক্লেশবোধ করছে।” এখন খ্যাতির নেপথ্যে কিছু অখ্যাতি, ক্লেশ আর বিড়ম্বনার ইতিহাসটা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করা যাক।

(আগামী পর্বে সমাপ্য)

[লেখকের পূর্ব রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Ashish Sen
Ashish Sen
10 months ago

এই বিষয়টি নিয়ে কিছু পরস্পরবিরোধী লেখা চোখে পড়েছিল। তাই ভুলভ্রান্তি দূর করে প্রকৃত ইতিহাসটুকু তুলে ধরার জন্য আপনাকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। এমন একটি বিষয়কে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার জন্য কিছুটা গবেষণা করতেই হয়, সেই পরিশ্রমটুকু স্বীকার করে আপনি যে এটা নিয়ে লেখায় ব্রতী হয়েছেন, তার জন্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা নেই। আমি নিশ্চিত রবিচক্রের প্রতিটি সদস্য, যাঁরা আপনার লেখার প্রসাদ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন, তাঁদের প্রত্যেকে এই লেখাটি উপভোগ করবেন এবং ঋদ্ধ হবেন। পরের পর্বটি প্রকাশের জন্য সাগ্রহ অপেক্ষায় রইলাম।

Himadri Kumar Das Gupta
Himadri Kumar Das Gupta
Reply to  Ashish Sen
10 months ago

ধন্যবাদ