শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

সার্ধশতবর্ষ অতিক্রান্ত শরৎচন্দ্র

একশ’ পঞ্চাশ বছরের সময়সীমা অতিক্রম করলেন কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৭৬-২০২৬)। প্রায় নীরবেই। বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী একটি নতুন সাহিত্যধারায় বাংলা সাহিত্যকে তিনি সামাজিক বঞ্চনা, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অস্ত্র করে তুলেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ঘটনাবহুল আখ্যানের অনুসারী হলেন না তিনি, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যরুচি, ভাষা, মনন ও নন্দনতত্ত্বেরও করলেন না অনুসরণ। বরং তিনি প্রবেশ করলেন মানুষের একান্ত অন্তঃপুরে— যেখানে প্রেম আছে, অভিমান আছে, দারিদ্র্য ও লজ্জা আছে, সামাজিক বিধিনিষেধ আছে, আছে পরাজয়। অথচ সবকিছুর গভীরে রয়েছে এক সুকোমল, অবিনশ্বর মানবহৃদয়। প্রশ্ন জাগে, তাঁর মরমী মনের কতটুকু মূল্য আমরা দিতে পেরেছি? তাঁর সাহিত্যের সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বই বা কতটা আলোচিত তাঁর সময়কাল ও তৎপরবর্তী যুগে? এ’সব প্রশ্ন গম্ভীর আলোচনার বিষয়বস্তু হলেও আক্ষেপের বিষয় হল কয়েক প্রজন্মের ব্যবধানে বদলে যাওয়া বর্তমান বাঙালি মনন ও সমাজজীবন থেকে আজ বহু দূরবর্তী তাঁর ভাবনা ও সাহিত্যের সমৃদ্ধ জগৎ। তাই এবারের আন্তর্জালিক ‘রবিচক্র’-এর প্রয়াস শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে আরও একবার ফিরে দেখার তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মের আলোয়…
সাহিত্যরসিক মাত্রেই জানেন যে দীর্ঘ এক কাল ধরে সাধারণ বাঙালি পাঠকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত ছিলেন ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র। মানুষের, বিশেষ করে নারীর বঞ্চনা, ব্যথা-বেদনা, স্নেহ-ভালবাসা, প্রেম-অপ্রেম, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, দুঃখ-যন্ত্রণা, মান-অভিমানের এক মরমী রূপকার ছিলেন তিনি। তদানীন্তন সমাজপতিদের সামাজিক অন্যায় ও স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে তাঁর সাহিত্য করেছিল তীব্র কশাঘাত। এক অসামান্য কুশলতায় তিনি উন্মোচিত করেছিলেন চরিত্রগুলির মনোজাগতিক অনুভব, অভিব্যক্তি, টানাপোড়েন, সারল্য ও কুটিলতা। অননুকরণীয় দক্ষতায় এক কুশলী কারিগরের মত সৃজন করেছিলেন তাঁর গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলিকে। মধ্যবিত্ত বাঙালির সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের তিনি এমন এক অবিস্মরণীয় কথক, যিনি চিরকালীন সাহিত্যের কষ্টিপাথরে শাশ্বতর স্বীকৃতি সেভাবে না পেলেও একটি নির্দিষ্ট সময়কালের বাঙালি জীবনের লিপিকার হিসেবে তাঁকে অস্বীকার করা আজও অসম্ভব। এখনও তাঁর গল্প উপন্যাসগুলি পড়লে মনে হয়, তিনি যেন লোকচক্ষুর আড়ালে একটি সোনার কলম নিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন তদানীন্তন বাঙালির অন্দরমহলে। তাঁর সহজ, সরল, স্রোতস্বিনীর মত বাংলা গদ্যে ছিল কাহিনির ঠাসবুনন, আবেগের ফল্গুধারা। সমকাল তাঁর সাহিত্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিপুলভাবে, পরবর্তী সময়ও তাঁকে মনে রেখেছে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কথাকার হিসেবে। জনপ্রিয়তার নিরিখে রবীন্দ্রনাথের সময়কালেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলা সাহিত্যের মানিক-বিভূতি-তারাশঙ্কর, এই তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের যুগের আগে স্তরের ভিন্নতা সত্ত্বেও এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়েছে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের নাম। ভারতবর্ষের অসংখ্য প্রদেশে তাঁর উপন্যাস অনূদিত হয়েছে, পেয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা। স্মরণীয়, ১৯৭৬ সালে মুম্বাইতে শরৎচন্দ্রের শতবার্ষিকী স্মরণানুষ্ঠানে প্রখ্যাত মানবতাবাদী ও মারাঠী সাহিত্যিক পি, এল, দেশপান্ডের সশ্রদ্ধ উচ্চারণঃ “বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র শুধু বাংলা সাহিত্যের নন, সমগ্র ভারতীয় সাহিত্যের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর।“ পরবর্তী সময়ে হায়দ্রাবাদের বঙ্গ সাহিত্যের আসরেও বিশিষ্ট তেলুগু সাহিত্যিকের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছেঃ “দাক্ষিণাত্যের বেশ কিছু প্রদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে শরৎচন্দ্র এতটাই জনপ্রিয় যে তাদের অনেকেই তাঁকে তাদের নিজের ভাষার সাহিত্যিক বলে জানে।” তবু এই বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তাঁর সময়কাল থেকে অদ্যাবধি বাঙালি তাঁর পরিচয় ‘কথাশিল্পী’ বিশেষণেই সীমাবদ্ধ করে রাখল বহুলাংশে। কিন্তু কেন? এই গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যেই আমরা একবার চোখ বুলিয়ে নেব তাঁর ব্যক্তিজীবনের উপর যা পরবর্তীকালে তাঁর রচনাধারাকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকেও করেছিল অনন্যরূপে সমৃদ্ধ।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে। পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায়, মাতা ভুবনমোহিনী দেবী। পাঁচ ভাই-বোন ও মা-বাবার বৃহৎ সংসারে পিতা অর্থনৈতিক ভাবে দুঃস্থ হওয়ায় ছোট থেকেই মাতুলালয়ে মানুষ। স্কুলে থাকাকালীনই মাত্র সতেরো বছর বয়সে পাঠশালার সহপাঠী কাশীনাথের কথা ভেবে ‘কাশীনাথ’ নামে একটি গল্প লেখেন। এছাড়াও ‘ব্রহ্মদৈত্য’ নামে একটি গল্প লিখেছিলেন আজ যে গল্পের আর খোঁজ পাওয়া যায় না। সংসারে প্রবল অভাবের কারণেই কোনক্রমে কলেজে ভর্তি হলেও এফ.এ. পরীক্ষার ফি-র মাত্র কুড়ি টাকা জোগাড় করে উঠতে না পারায় শেষ পর্যন্ত আর পরীক্ষা দিয়ে ওঠা হয়নি। কলেজে পড়াকালীন তাঁর পরিচয় হয় ভাগলপুরের পরোপকারী যুবক রাজেন মজুমদারের সঙ্গে যাঁকে তিনি পরবর্তীকালে তাঁর ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে ইন্দ্রনাথ রূপে চিহ্নিত করে গিয়েছেন। এই সময়েই মাতুল সুরেন্দ্রনাথ, গিরীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রনাথ, এঁদের বন্ধু যোগেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখকে নিয়ে একটি সাহিত্যসভা গঠন করেন এবং ‘বড়দিদি’, ‘দেবদাস’, ‘চন্দ্রনাথ’ প্রভৃতি উপন্যাস ও ‘অনুপমার প্রেম’, ‘আলো ও ছায়া’, ‘বোঝা’ প্রভৃতি গল্পগুলি রচনা করেন। সংসারের প্রবল অনটনই পায়ের তলার জমি শক্ত করার তাড়নায় তাঁকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল তৎকালীন বর্মার রাজধানী রেঙ্গুনে। সেখানে গিয়ে মিস্ত্রি পল্লীতে থাকতেন, বিনা মূল্যে তাঁদের চিকিৎসা করতেন। সমাজের পতিতা নারী থেকে শুরু করে রাস্তার পশু, সকলের ব্যথাই তিনি অনুভব করতেন পরম মমতায়।
তাঁর এই দরদী মনের প্রভাবই পরিলক্ষিত হয় তাঁর রচিত উপন্যাস ও সেগুলির চরিত্রগুলির মধ্যে দিয়ে। “সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছুই, যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল, উৎপীড়িত” তাঁর লেখার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তাঁরাই। তৎকালীন বঙ্গসমাজে নারীর, বিশেষত মধ্য ও নিম্নবিত্ত নারীর, মত অবহেলিত ছিলেন আর কে বা কারা? তাই হয়তো সমাজের সাধারণ স্তরের নারীর সাধারণ চাওয়া-পাওয়া, প্রেম, বাৎসল্য ও টানাপোড়েন তাঁর লেখার উপজীব্য হয়ে উঠেছে বারবার। সমাজের বিধিনিষেধ দূরে সরিয়ে নারীকে কেবল তার সতীত্বের নিরিখে বিচার করেননি, রক্তমাংসের অন্তরালে দেখতে পেয়েছিলেন তার সুকোমল হৃদয়কেও। সামাজিক বিধিনিষেধের অধিক, অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছেন মানবিক অনুভূতিকে যে ধারা পূর্ববর্তী বঙ্কিমচন্দ্রের যুগের তুলনায় ভিন্ন ও কথাসাহিত্যে সম্পূর্ণ নতুন। সত্য, শিব ও সুন্দরের উপাসক হয়ে সমাজ নির্দেশিত কঠোর পথে না চলে পাপ ও পাপীকে আলাদা করে দেখতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। নারীর প্রণয়াকাঙ্খা, বাৎসল্য, তৃপ্তি-অতৃপ্তি, মনস্তত্ত্ব, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অঙ্কনের মাধ্যমে তিনি যে বাস্তবধর্মী, পাঠকের পরিচিত চিত্র তুলে ধরেছিলেন, তৎকালীন ক্রমপরিবর্তনশীল সমাজে দাঁড়িয়ে সেই বিশেষ রচনারীতিই তাঁর লেখাকে বিশিষ্টতা দান করেছিল এবং তাঁকে এনে দিয়েছিল পাঠক হৃদয়ের অতি নিকটবর্তী ‘কথাশিল্পী’-র আখ্যা।
শরৎচন্দ্রের জীবনের শেষ ক’বছর শরীর আদৌ ভাল যাচ্ছিল না। একটা-না-একটা রোগে ভুগছিলেনই। শেষে আক্রান্ত হন ক্যান্সারে। কলকাতার তৎকালীন শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকগণ – ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, ডাঃ কুমুদশঙ্কর রায় প্রমুখ শরৎচন্দ্রকে দেখে স্থির করলেন যে, শরৎচন্দ্রের পেটে অস্ত্রোপচার ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তাঁর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংবাদ শুনে রবীন্দ্রনাথ এক পত্রে লিখেছিলেন-

কাল্পনিক ছবি

“কল্যাণীয়েষু শরৎ, রুগ্ন দেহ নিয়ে তোমাকে হাসপাতালে আশ্রয় নিতে হয়েছে শুনে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হলুম। তোমার আরোগ্য লাভের প্রত্যাশায় বাংলা দেশ উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকবে।
ইতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩১।১২।৩৭”
সেই সময়কার বিখ্যাত সার্জন ললিতমোহন বন্দোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের পেটে অপারেশন করেন তবে অপারেশন করেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হল না। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই জানুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের মৃত্যুসংবাদ শুনে লেখেন এই কবিতা-
“যাহার অমর স্থান প্রেমের আসনে।
ক্ষতি তার ক্ষতি নয় মৃত্যুর শাসনে।
দেশের মাটির থেকে নিল যারে হরি
দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে বরি।”
আর রবীন্দ্রনাথ যাঁর সম্পর্কে এমন মন্তব্য করে যান, আজ দেড়শো’ বছর পেরিয়েও তিনি যে বাঙালি মনের মণিকোঠায় রয়ে যাবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী?

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


2 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
7 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Mitas Das
Editor
1 month ago

Fantastic

Dwaipayan Goswami
Dwaipayan Goswami
1 month ago

যথাযথ মর্যাদায় শরৎচন্দ্রের সার্ধশতবর্ষে রবি চক্রের এই ডিজিটাল পত্রিকায় তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদিত হলো। সম্পাদকীয় লেখা পড়ে বেশ উপভোগ করলাম।

Ruchismita Ghosh
Ruchismita Ghosh
1 month ago

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় তাঁকে যোগ্য মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ভালো লাগল সম্পাদকীয়।

A B Chaudhuri
A B Chaudhuri
1 month ago

Gone through the full write up. I was not knowing his life story. But from my school life I was his Pujari. Hearty thanks to the author. Rabindranath used to love Sharatchandra and joked many times.
Thank you.

Sanjitkumar Bhattacharya
Sanjitkumar Bhattacharya
1 month ago

ভালো লাগলো।

Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
1 month ago

খুব ভাল শ্রদ্ধাস্মরণ। কথাশিল্পী উপাধিতে তাঁর কোন অবমূল্যায়ন হয়েছে বলে আমার মনে হয়না।সহজ করে গভীর কথা বলা তো উনিই শিখিয়েছেন।সব লেখাগুলিই আদ্যন্ত সিরিয়াস।যে যেমন মন নিয়ে পড়বে সে ওঁর লেখার গভীরে ততটুকুই ডুবতে পারবে

শৌভিক দে
শৌভিক দে
26 days ago

চমৎকার। সহজ বয়ানে সুলিখিত সম্পাদকীয় হৃদয় ছুঁয়ে যায়। অতিথি সম্পাদক সঙ্কলনের মান রেখেছেন। তার কলম জীবনের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি।

7
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x