শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বাঙালির জীবনচর্চার এক অনিবার্য উপাদানের নাম – উত্তমকুমার

লন্ডনের কিংস কলেজের ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগের একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা অধ্যাপক রিচার্ড ডায়ারের উদ্ভাবিত ‘স্টার থিওরি’ নামের একটি তত্ত্ব, সারা বিশ্বের বিনোদন এবং সমাজতত্ত্বের জগতে অতি পরিচিত তত্ত্ব ।
বিনোদন জগতে তারকা কি ভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকে তা নিয়ে ডায়ার সাহেবের নির্দিষ্ট কিছু মতামত আছে । সংক্ষেপে বলতে গেলে তাঁর তারকা-তত্ত্বের সারাংশ হল –


—- তারকারা মূলত একধরনের পণ্য যা কিছু প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা নির্মাণ করে থাকে বাণিজ্যিক স্বার্থে ।


—- তারকা হল একধরনের সযত্নে নির্মাণ করা ভাবমূর্তি যা সেই প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা দ্বারা এক উদ্দিষ্ট শ্রেণির অডিয়ান্সের কাছে আকর্ষনীয় করে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।


—- তারকা প্রতিনিধিত্ব করে একধরনের আদর্শবাদ, বা চিন্তাধারার, বা সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার, মূল্যবোধের, সামাজিক প্রবণতার। প্রতিষ্ঠানগুলি এই নির্মিত ভাবমূর্তিটিকে তাদের ‘টারগেট অডিয়ান্স’- এর চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তন করে নেয় ।


—- তারকার বৈশিষ্ট্য হল তাদের সাধারণত্বের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কিছু অসাধারণত্ব। আপাতভাবে সাধারণ মানুষ তাদের তাদেরই মতো একজন মনে করতে পারলেও তাদের ব্যাক্তিত্বের (persona) মধ্যে এমন কিছু ঔজ্বল্য থাকে, বিভা থাকে, মাধুর্য্য থাকে, যা তাদের সাধারণ মানুষদের থেকে কিছুটা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রেখে দেয়।

বলা বাহুল্য, পশ্চিমী জগতের সব তত্ত্ব আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সব সময়ে খাপে খাপ বসে যায় না। তবুও কিছু তত্ত্ব যখন অনেক দেশের অনেক মানুষের কাছে গুরুত্ব পায় তখন তার প্রাসঙ্গিকতা আমাদের দেশেও নেহাত উড়িয়ে দেওয়া যায় না ।

যদি তাই হয়, তাহলে কি আমরা কি আমাদের উত্তমকুমার নামের নক্ষত্রের অভ্যুত্থান এবং তাঁর জনপ্রিয়তার এই অস্বাভাবিক দীর্ঘস্থায়িত্বকে রিচার্ড ডায়ারের স্টার-থিওরি দিয়ে মূল্যায়ন করতে পারি?

তাঁর এই তারকা হয়ে ওঠার পিছনে কি সত্যিই কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সচেতন বাণিজ্যিক প্রয়াস ছিল?

মনে রাখতে হবে উত্তমকুমারের সিনেমা জগতে প্রবেশ প্রায় ‘এক্সট্রা’-র ভূমিকায় । এবং তারপর পর পর ফ্লপ হয়েছে তার অভিনীত ছবিগুলি । তাই তাঁর মধ্যে ‘স্টার-মেটিরিয়াল’ আছে, এ কথা অন্তত তাঁর পরিচালকরা সেই সময়ে কেউ মনে করেন নি । বরং আমরা জানতে পারছি বিমল রায় যখন ‘উদয়ের পথে’ ছবির পরিকল্পনা করছেন, উত্তমকুমার বিমল রায়ের কাছে নায়কের রোল পাবার জন্যে দেখা করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু বিমল রায় তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে সে ছবিতে রাধামোহন ভট্টাচার্যকে নায়ক করেন ।
তবে উত্তমকুমারের প্রথম দিকের সিনেমার প্রযোজকরা অবশ্যই চেয়েছেন তাদের ছবির নায়ক দর্শকের কাছে আরো বেশি করে গ্রহণযোগ্য হোক, জনপ্রিয় হোক। এবং তাঁর ছবির পরিচালকেরা চেষ্টা করেছেন উত্তমকুমারকে দেওয়া চরিত্রটিকে যেন তিনি যথাযথ ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। ছবি যাতে বাঙালি দর্শকের মনোমতো হয় স্বাভাবিকভাবেই তারা সেই ভাবে ছবি নির্মাণ করার চেষ্টা করেছেন। তার বেশি কিছু নয়। ছবি যখন বাণিজ্যিক সফলতা পেয়েছে তার কিছুটা ফল উত্তমকুমার নিশ্চয় পেয়েছেন। কিন্তু খুব সচেতনভাবে তারা উত্তমকুমারকে স্টার করে তোলার কোনো চেষ্টা করেছেন বলে জানা যায় না।

তাই উত্তমকুমার নামের তারকা শুধুই কিছু বাণিজ্যিক প্রচেষ্টার ফসল, এমন কথাটা কোনো বাঙালিই মেনে নেবে না। বরং তারা বলবে, উত্তম কোনো পণ্য নয়, তিনি যে প্রক্রিয়ায় বাঙালির চোখের মণি হয়ে ওঠেন সেটিকে তারা সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত-র চৈতন্য মহাপ্রভুকে নিয়ে যে বিখ্যাত পঙক্তি লিখেছিলেন সেটিকে একটু বদলে নিয়ে বলতে পারে –

—- বাঙালির হিয়া-অমিয় মথিয়া উত্তম ধরেছে কায়া ।

অথবা বাঙালি রিচার্ড ডায়ারের তত্ত্ব উড়িয়ে দিয়ে রবি ঠাকুরের তত্ত্বে ভরসা রাখবে – ‘যে পারে সে আপনি পারে পারে সে ফুল ফোটাতে।’

উত্তমকুমার পারতেন সেই আপনি ফুল ফোটাতে । কেউ বলতেই পারেন তাঁর সময়ে বাংলা সিনেমার জগতে আরো অনেকেই পারতেন ফুল ফোটাতে। কিন্তু বুঝতে হবে তারা পারতেন একটা সময়ের সীমাবদ্ধতায়। কিন্তু উত্তম তাঁর ফুল ফোটানোর সাবলীল দক্ষতা বজায় রেখে কালের গন্ডি পেরিয়ে গেলেন, এবং পেরোতেই থাকলেন। এবং প্রয়াণের বহুকাল পরেও রয়ে গেলেন বাঙালির অন্তর্গত রক্তের ভিতরে।
বাঙালি অনেক ‘পুরোনো অব্যেস’ ছাড়লো । একান্নবর্তী জীবনের মায়া কাটালো, ধুতি-শার্ট-চটির মোড়ক বদলালো, ‘ওগো শুনছো’ জাতীয় মিঠে বোল বর্জন করলো, তালপাখা-কাঁথা-বালাপোশ- তক্তপোষ-পানের বাটা-কাঁসার বাসন সবকে দুচ্ছাই বলে বিদায় করলে … কিন্তু রয়ে গেলেন উত্তমকুমার। রোজকার ডাল-ভাতের মতো ,বাংলা ছড়া-প্রবাদের মতো, আগমনী গানের মতো, বিয়ের মন্ত্রের মতো।

তারপর উত্তমকুমার কবে যেন বয়সে শতবর্ষে পৌঁছে গেলেন, স্মৃতির মহাফেজখানার কোনো প্রকোষ্ঠে প্রবেশ না করেই, ভিন্টেজ ধুলো একটুও গায়ে না মেখেই, এবং চেহারায় একটুও বুড়িয়ে না গিয়েই।

এটা কি ভাবে হল সেটা নিয়ে ভাববার এটাই বোধহয় উপযুক্ত সময়। একেবারে সেই শুরুর সময়টার থেকে শুরু করা যাক। ১৯৫২ সাল। পাঁচ বছর আগে দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং বাংলা ভাগ হয়েছে । লক্ষ লক্ষ মানুষ ওপার বাংলা ছেড়ে প্রায় নিরাশ্রয় হয়ে এ’পারে চলে এসেছে । সেই চাপে পশ্চিম বাংলা অর্থনৈতিক ভাবে বিধ্বস্ত। কলকাতা শহরে ফাঁকা জায়গাগুলো অনেকটাই হয়ে গেছে জবরদখল। জায়গায় জায়গায় রিফিউজি কলোনি গড়ে উঠেছে। খাদ্য সমস্যা দেখা দিতে শুরু করেছে। কিন্তু কবি ঈশ্বর গুপ্ত মশাই বলেছিলেন – এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরা । সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালি কিন্তু আরও সজাগ হয়ে উঠলো। বাংলা কবিতা, নাটক, গান নতুন বাঁক নিলো। সেই সঙ্গে কিছুদিন আগে বাঙালি পেয়েছে এক নতুন শিল্প মাধ্যম – সিনেমা। সাহিত্যের সঙ্গে সিনেমার এক নিবিড় সম্পর্ক ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে। অনেক গুণীজন এসে জমা হতে লাগলেন সিনেমা শিল্পকে ঘিরে ।

এই সময়টাতে ভবানীপুরের একটি একান্নবর্তী পরিবারে বড় হয়ে উঠছে অরুণকুমার চ্যাটার্জি । পড়াশোনায় মাঝারি মাপের । প্রথমে চক্রবেড়িয়া স্কুল, তারপর সাউথ সাবার্বন স্কুল। ম্যাট্রিক পাশ করে কমার্স কলেজে ভর্তি হওয়া। সেই সঙ্গে ভবানীপুর সুইমিং এসোশিয়েশনের সভ্য হয়ে পদ্মপুকুরে সাঁতার শেখা চলতো। সাঁতারু হিসেবে বেশ কয়েকটা পদক পেয়েছিল অরুণ। সেই সঙ্গে নসীবাবুর আখড়ায় কুস্তি শেখাও চলতো । আর ব্যাডমিন্টন এবং ফুটবল, দুটো খেলাও ভাল খেলতো সে। এবং বাড়িতে লুকিয়ে যাত্রাপালায় অভিনয়টাও চলত। কলেজে পড়তে পড়তেই পোর্ট কমিশনারস-এর কনিষ্ঠ কেরানির চাকরি পাওয়া হয়ে গেল। কিন্তু ততদিনে সব ছাপিয়ে অভিনয়ের নেশাটা মনে মনে চাগিয়ে উঠেছে। তবে যাত্রায় নয়, সিনেমার জগত তাকে টানছে । বাংলা সিনেমার জগত তখন আলো করে আছেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথেশ বড়ুয়া, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ি স্যান্যাল, কুন্দনলাল সায়গল, রবীন মজুমদার, অসিতবরণ। চাকরি করার সঙ্গে স্টুডিও পাড়ায় যাতায়াত করতে করতে ছোটো খাটো রোল পাওয়া শুরু হল অরুণ চ্যাটার্জির । কিন্তু তখন অবধি পরিচালকেরা কেউ তাকে নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে তেমন কিছু ভাবছে না। কিন্তু অরুণকুমার কোথাও একটা নিজেকে তৈরি করে তুলছে অভিনেতা হওয়ার জন্য। ব্যর্থতা থেকে সে শিখছে । হতাশ হচ্ছে না। সম্ভবত হলিউডের সিনেমা দেখে বুঝতে পারছে, বাংলা সিনেমার অভিনয় শৈলীর মধ্যে কোথাও একটা উচ্চকিত ব্যাপার আছে। ইতিমধ্যে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি অভিনয় জগতেই থাকবে বলে মনস্থ করে ফেলেছে অরুণকুমার।

১৯৫২ সালে মুক্তি প্রাপ্ত ‘বসু পরিবার’ ছবিতে উত্তমকুমার নামের অভিনেতাকে এই প্রথম অনেকেই নজর করলেন।
এর আগে যে সব সব ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন সেই সব ছবিতে প্রথমে অরূপকুমার এবং পরে উত্তমকুমার নামের অভিনেতাকে খবর কাগজের সমালোচকেরা হয়তো ভেবেছিলেন – এই রকম তো কতজনই আসে যায় ।

১৯৫২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সঞ্জীবনী’ নামের একটি ছবির সমালোচনা করতে গিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার সমালোচক লিখলেন – ‘উত্তমকুমার স্থানে স্থানে অভিনয় ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন।‘

সেই বছরেই কিছুদিন পরে ‘বসু পরিবার’ ছবির সমালোচনা করতে গিয়ে সেই আনন্দবাজার পত্রিকাতে লেখা হল – “সুখেনের ভূমিকায় উত্তমকুমার মনে ধরার মতো চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।”
দেশ পত্রিকাতে লেখা হল “সুখেনের ভূমিকায় আগের চেয়ে অনেক সহজ ও সজীব হয়েছেন। “

অর্থাৎ তিনি এই প্রথম স্বীকৃতি পাচ্ছেন একজন অভিনেতা হিসেবে। তারকা হয়ে ওঠা তখনো দূর অস্ত।
পরের বছর আর একটি ছবি মুক্তি পেলো যার নাম সাড়ে চুয়াত্তর। এ ছবির প্রধান ভূমিকা যদিও তুলসী চক্রবর্তী ও মলিনা দেবী, এবং মূলত তাঁদের দৌলতেই এই ছবি দশ সপ্তাহ চলেছিল । কিন্তু তার পাশাপাশি একেবারেই অনাড়ম্বর ভাবে আর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটলো । এই ছবিতে প্রথম রোমান্টিক চরিত্রে একসঙ্গে দেখা গেল উত্তমকুমার এবং সুচিত্রা সেনকে। সিনেমাতে তারা দুজনেই খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে এবং মেয়ে। তাদের প্রেম একেবারেই নিরুচ্চারিত, সলজ্জ, দ্বিধাজড়িত । তেমন কোনো প্রেমের সংলাপ বা গান নেই তাদের লিপে । কিন্তু তবুও এই প্রথম বাংলা সিনেমায় রোমান্টিক প্রেমকে পর্দায় কি ভাবে দেখানো হবে তার একটি অস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি হল । এই জুটি পরবর্তী কালে বাঙালিকে এতটাই বিমোহিত করে রাখবে যে প্রেমের যে অন্যতর কোনো মডেলও হতে পারে সেটা তারা মেনে নিতেই চাইবেন না। তখন অবশ্য কারো কল্পনাতে আসেনি যে কিছু দিনের মধ্যেই ছন্নছাড়া মধ্যবিত্ত বাঙালির সব অপ্রাপ্তি ভুলে যাওয়ার জন্য এই জুটি যেন এক আশ্চর্য স্বপ্নসম্ভব, এক অলীক নির্মাণ, এক স্বর্গীয় প্রেমের যুগল-বিগ্রহ হয়ে উঠবে। এই সব কিছুর সূচনা হল এই ছবি থেকেই। তবে সেই অস্পষ্ট রূপরেখাটি কিছুটা স্পষ্টতর হয়ে উঠলো পরের বছরে মুক্তি পাওয়া অগ্নিপরীক্ষা ছবিতে। আপামর বাঙালি এই জুটিতে মজে গেল ।
এই জুটির সাফল্য নিয়ে সিনেমা-করিয়েরা এতটাই নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে ১৯৫৫ সালে এই একই জুটির বারোটি ছবি মুক্তি পেলো, তার মধ্যে আটটিই প্রবল ব্যবসায়িক সাফল্য পেলো।

১৯৫৭ সালে মুক্তি পেলো আরো বারোটি ছবি, ১৯৫৮-তেও বারোটি। ১৯৫৯ ছ’টি । তার মধ্যে বেশির ভাগই ব্যবসায়িক সাফল্য পেলো।
এই সময়ে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলির মধ্যে ছিল রাইকমল, শাপমোচন, সবার উপরে, সাগরিকা, সাহেব বিবি গোলাম, চিরকুমার সভা, একটি রাত, শ্যামলী, ত্রিযামা, শিল্পী, নবজন্ম, পৃথিবী আমারে চায়, তাসের ঘর, হারানো সুর, অভয়ের বিয়ে, চন্দ্রনাথ, পথে হল দেরী, মরুতীর্থ হিংলাজ, বিচারক, অপরিচিত, কমললতা, চিরদিনের, মন নিয়ে, শুকসারী, সাবরমতী ইত্যাদি । বাঙালির কাছে ছবিগুলি আজও আকর্ষণ হারায়নি।

সত্তরের দশকেও এই প্রবণতা বজায় রইল। উত্তমকুমার বাঙালির কাছে একটি কাল্ট ফিগার হয়ে উঠলেন। তাঁর মতো চুলের ছাঁট, তাঁর মতো করে বাক্য উচ্চারণ করা, হাঁটা,তাকানো, ঘাড় ঘোরানো, এবং অবশ্যই ভুবন ভোলানো হাসি, এই সব মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে এতটাই সম্মোহক হয়ে উঠল, যে বাঙালি যেন কোনো গল্পের আকর্ষণে নয়, মিনার-বিজলি-ছবিঘর বা রাধা-পূর্ণ -প্রাচী সিনেমায় ভিড় করতে আরম্ভ করল উত্তমকুমারকে দেখার জন্যেই। এর সঙ্গে অবশ্যই ছিল অনবদ্য সব গান, যার বেশির ভাগই হেমন্ত বাবুর কন্ঠে। উত্তমকুমারের লিপ দেওয়া হেমন্তের গান, এই এক অলৌকিক যুগলবন্দী বাঙালিকে এমন ভাবে আবেগস্পন্দিত করতে থাকল, যে বাঙালি রুক্ষদিনের দুঃখকে মোকাবিলা করবার যেন এক হাতিয়ার পেয়ে গেল।

পঞ্চাশের দশকে যেটি বৃক্ষ ছিল ষাটের দশকে সেটি মহীরুহ হয়ে উঠল। তাঁর অভিনয় আরো ধারালো হয়ে উঠল। তাঁর ভক্তরা তাঁকে নিয়ে পাগলামি করতে লাগলো। কিন্তু উত্তমকুমার শুধু ম্যাটিনি আইডল হয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি প্রতিটি ছবিতেই দর্শককে নতুন কিছু দিতে চাইতেন । তিনি রোমান্টিক নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করলেও খুব সচেতন ভাবে সেই চরিত্রেও তিনি যেন মিশিয়ে দিতে লাগলেন ক্যারেকটর আক্টিং-এর উপাদান । ইনি সিনেমার পর্দায় একজন প্রেমিক হওয়ার সঙ্গে হয়ে উঠছেন, একজন পরিবারের কর্তব্যপরায়ণ বড় ভাই, মাতৃভক্ত সন্তান, পিতার সঙ্গে আদর্শগত ভাবে বিপরীতে চলে গিয়েও, একজন সুসন্তান। এই সময়ে গল্পের গতি প্রকৃতি ভুলে দর্শকজন অপেক্ষায় থাকতে লাগলেন কখন স্ক্রিনে উত্তমকুমারকে দেখা যাবে । তবে এই সময় তাঁর সহ-অভিনেতা , অভিনেতৃরাও অবশ্যই ছিলেন এক একজন দিকপাল ।

এই রকম একজন জনপ্রিয় নায়ক হওয়া সত্বেও বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা উত্তমকুমারকে কেমন যেন একটা সিরিয়াস আলোচনার বিষয় বলে মনে করেন নি। তাঁর অভিনয় ঠিক ‘সেরিব্রাল অ্যাকটিং’ পর্যায়ে পড়েনা এবং তাঁর ভাব-ভঙ্গির মধ্যে প্রচুর ম্যানারিজমের প্রভাব আছে, এই রকম কিছু উক্তি কফি হাউসের আনাচে কানাচে শোনা যেত ।

তাদের এই জাতীয় উন্নাসিকতাকে ধাক্কা দিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায় । ১৯৬৬-তে সত্যজিৎ রায় তাঁর কথা মাথায় রেখেই একটি চিত্রনাট্য লিখে ফেললেন । সেই ছবিটিতে সত্যজিৎ যে উত্তমকুমারকে পুনর্নিমাণ করলেন, সেই উত্তমকুমারকে বাংলা ছবির দর্শক আগে দেখে নি। অমন প্রলেপবিহীন মুখ , অমন গ্ল্যামরবিহীন স্বাভাবিকত্ব, অমন অভিনয়বিহীন অভিনয়। অতিকথার আবরণ থেকে আদত মানুষটিকে বের করে আমাদের সামনে রাখলেন সত্যজিৎ । এবং কি আশ্চর্য আমরা আবিষ্কার করলাম এই উত্তমকুমার কিছু কম মনোহরণ নন, বরং একটা চাপা দুঃখের আভা তাঁকে যেন আরো বেশি সুন্দর করে দিয়েছে । বুদ্ধিজীবীরা মানলেন মেথড অ্যাক্টিংটা তাঁর অনায়ত্ব বিষয় নয়। এবং এটাও মানলেন শুধু মনোমোহিনী হাসিটাই তাঁর তুরুপের তাস নয় । দরকার পড়লে খুব সামান্য কপালের কুঞ্চন , ভ্রুপল্লবের সামান্য উত্তোলন, ওষ্ঠের সামান্য ফাঁক দিয়ে সৃষ্টি করতে পারেন এক একটি বিষাদ-মূহুর্ত, এক একটি হতাশার কারণ। যখন কোনো দৃশ্যে তাঁর নিজস্ব কোনো সংলাপ নেই, তাঁর কোনো একজন সহ-অভিনেতার উপরেই দর্শকদের মনোযোগ থাকার কথা, ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে সেই সময়ে তিনি এমন একটা কিছু করছেন যাতে সেই দৃশ্যে কিছুটা বাড়তি মাত্রা সংযোজিত হয় । এগুলি তাঁর নিজস্ব ভাবনা থেকেই করতেন।

‘নায়ক’ ছবিতে অভিনয় করে অথবা সত্যজিতের সংস্পর্শে এসে তিনি নিশ্চয় তাঁর পরবর্তী ছবিগুলিতে চরিত্রায়ন করার সময়ে খানিকটা অন্য রকম ভাবে ভাবনা চিন্তা করেছেন। নায়ক পরবর্তী ছবিগুলি লক্ষ করে দেখলে সেটা বোঝা যায় ।

এমন কি নায়ক মুক্তি পাবার পরেও উত্তমের সমালোচকেরা বলতে থাকেন নায়ক ছবিতে আসলে উত্তমকুমার সত্যজিতের হাতের পুতুল হয়ে কাজ করেছেন । যেমনটা দেখিয়ে দিয়েছেন তেমনটাই নাকি করেছেন। এমন কি এই ছবির নায়িকা শর্মিলা ঠাকুরও একটি সাক্ষাৎকারে এই রকম একটি উক্তি করেছেন। কিন্তু সত্যজিতের নিজের কথা শুনলে কিন্তু তেমনটা মনে হয় না । তিনি বলেছিলেন –

“বারো বছর পরে গত শনিবার টিভিতে আবার নায়ক দেখলাম । ছবিতে আমার ত্রুটি নিশ্চয় অনেক আছে। কিন্তু উত্তমের কাজে একটিও ত্রুটি কোনোখানে খুঁজে পাওয়া যায় নি। … তার সংলাপ বলার একটা ঢঙ ছিল : সেটা চমৎকার ঢঙ। বড় বাক্যকে সে বাক্যের মাঝে চমৎকার বিরতি দিতে পারতো। এ ছাড়া যখন অভিনেতার মুখে সংলাপ থাকে না তখন কিছু করাও অভিনয় । সেই নির্বাক মূহুর্তগুলিকেও উত্তমের দর্শককে টেনে রাখার ক্ষমতা ছিল । তার অভিনয়ে গাম্ভীর্য ছিল । স্থৈর্য ছিল । সে যখন সেটে আসতো তাকে কোনোদিন ছ্যাবলামি করতে দেখিনি । যতক্ষণ না ডাক পড়ছে সে চুপচাপ বসে থাকত। চুপ করে ভাবতো । … আজ অনেক নায়ক আছেন , তাঁদের মধ্যে অনেকেই ভাল অভিনয় করেন । কিন্তু উত্তমের মত কেউ নেই, কেউ হবে না ।”

মোটামুটি তিন দশক ধরে বাংলা সিনেমার দর্শকদের একজন নায়কের এই আবিষ্ট করে রাখার কোনো উদাহরণ অথবা একটা ইন্ডাস্ট্রি একজন নায়কের উপর নির্ভর করে টিঁকে থাকার উদাহরণ ভারতবর্ষে তো বটেই সারা পৃথিবীতে আছে কিনা সন্দেহ ।

নায়ক শব্দটির আগে ‘মহা’ শব্দটি ঠিক কবে থেকে কি ভাবে জুড়ে গিয়েছিল তার কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি । তবে এই রকম বিশেষণ আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁকে দেওয়া হয় নি । কোনো বিপণনের প্রয়াসও ছিল না। সম্ভবত সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আবেগ থেকেই এই নামের সৃষ্টি হয়েছিল। এবং নানা রকমের দিন বদলের ভিতর দিয়ে যাওয়ার পরেও যে বাঙালির হৃদয়ে সেই আবেগের মাত্রা কমেনি বলেই মহানায়ক বিশেষণ নিয়ে আজও কেউ প্রশ্ন তোলে না। ভবিষ্যতেও কেউ তুলবে না ।

তবে গিরিশবাবু বলে গেছেন নটদের জন্য দেহপটের গুরুত্বের কথা । তারকাদেরও বয়স বাড়ে পৃথিবীর নিয়মেই। উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে তার অন্যথা হয়নি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে দেখা গেল প্রেমিকের ভূমিকা থেকে তিনি ক্রমশ সরে যাচ্ছেন ক্যারেকটার অ্যাক্টিং-এর দিকে। সিনেমার গল্পে বা চিত্রনাট্যে দেখা গেল উত্তমের এই পরিবর্তন মাথায় রেখে গল্প লেখা হচ্ছে বা চিত্রনাট্য তৈরি হচ্ছে। যেমন, এখানে পিঞ্জর, অগ্নীশ্বর, নগর দর্পনে, সিস্টার , সন্ন্যাসী রাজা, যদুবংশ, দুই পৃথিবী ইত্যাদি। এই পরিবর্তন তাঁর কাছে অভিপ্রেত ছিল কিনা তা আমরা জানতে পারবো না কোনোদিন। নিজের কথা উনি বিশেষ কিছুই বলেন নি, বা বলবার সুযোগ পান নি। দূরদর্শন শুরু হবার পরে পাঁচবছর তিনি বাংলা সিনেমার মহানায়ক হয়েই ছিলেন। তবুও তাঁরা কেন যে তাঁর কোনো সাক্ষাৎকার নিয়ে উঠতে পারেন নি, কে জানে ।

একজন ছায়া জগতের মানুষ হয়েও তিনি যে ধীরে ধীরে আপামর বাঙালির জীবনচর্চার অনিবার্য উপাদান হয়ে উঠেছেন, তা শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন বলেই নয়। এই তিন দশকে তিনি বাঙালির দিনযাপনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছলেন। এই সময়কালে তাঁর অভিনীত প্রায় আড়াই শ’ ছবিতে বাঙালির পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, ব্যাক্তির উপরে সমাজের ভালো মন্দ ভূমিকা, সংস্কার-কুসংস্কারের নানা রকমের বেড়া, এই সব অনেকটাই ধরা আছে । ধরা আছে বাঙালির মনস্তত্বের নানান বৈচিত্র্যের দিকও ।

অন্য দিকে বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে নিরুপমা দেবী, আশাপূর্ণা দেবী, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, সমরেশ বসু, বনফুল, বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী, প্রফুল্ল রায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, অবধূত, নীহাররঞ্জন, নারায়ণ স্যান্যাল, শঙ্কর, রূপদর্শী – এমন এক বিশাল বৈচিত্র্যময় সাহিত্যের জগতের কিছুটা হলেও ধরা পড়েছিল তাঁর অভিনীত ছবিতে। সব মিলে উত্তমকুমার নামের আধারের মধ্যে যেন বাঙালিত্বের একটা সুনিবিড় প্রতিবিম্বিত রূপ ধরা পড়েছিল।

আর যদি চরিত্রায়ণের বৈচিত্র‍্যের কথা ধরি, তাহলে তিনি ছিঁচকে চোর হয়েছেন, আবার দুঁদে পুলিশ অফিসার হয়েছেন। হিন্দু সন্ন্যাসী হয়েছেন, আবার খৃষ্টান পাদ্রি হয়েছেন। বিশ্বস্ত গৃহভৃত্য হয়েছেন, আবার দাপুটে জমিদার হয়েছেন। গ্রাম্য ডাক্তারের কম্পাউন্ডার হয়েছেন, আবার বিলেত-ফেরত ডাক্তার হয়েছেন। অসফল সাংবাদিক হয়েছেন, সফল ব্যবসায়ী হয়েছেন। যাত্রাপালার নট হয়েছেন, আবার সিনেমার তারকা হয়েছেন। তিনি মোগল সেনাপতি মীর জুমলা হয়েছেন, আবার বাংলার রাজা প্রতাপাদিত্যের পুত্র উদয়াদিত্যও হয়েছেন। প্রতিভাবান আরকিটেক্ট হয়েছেন আবার সৃজনশীল মৃৎশিল্পীও হয়েছেন। পকেটমার হয়েছেন, আবার স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী দলের নেতাও হয়েছেন। খুনের আসামী হয়েছেন, আবার বিচারকও হয়েছেন। বেকার রেসুড়ে হয়েছেন, আবার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হয়েছেন। জিপসি নর্তক হয়েছেন আবার গুজরাটি ব্যবসায়ীও হয়েছেন।রাজা হয়েছেন আবার রাজদ্রোহীও হয়েছেন।

এ দেশে এত রকমের চরিত্রে অভিনয় করা তারকা-নায়ক, সম্ভবত আর কেউ নেই। উত্তমের সমসাময়িক বোম্বাইয়ের হিরোদের অভিনয় ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার কোনো অবকাশ নেই । তাদের জনপ্রিয়তাও ছিল আঞ্চলিক নয়, আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে। কিন্তু তাঁর সময়ের নায়কেরা – রাজ কাপুর, দিলীপ কুমার,দেব আনন্দ, এঁদের অভিনয় শৈলীর এক এক ধরণের স্টিরিওটাইপ ছিল। দক্ষিণের শিবাজী গনেশন, এন টি আর, রাজকুমার ইত্যাদিদের ক্ষেত্রেও তাই ছিল। মোটামুটি এঁদের বিশেষত্বের বা আকর্ষণীয় দিকের কথা মাথায় রেখেই এঁদের সিনেমার চিত্রনাট্য, ডায়লগ লেখা হতো। সিনেমার সুপার স্টারদের নিয়ে খুব বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হতো না। কারণ দর্শক পছন্দ না করলে সেটা প্রযোজকদের জন্য অনেক টাকার ঝুঁকি হয়ে যেত।

কিন্তু উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্য রকম ছিল। বাংলা ছবি যেহেতু মূলত পৃর্ব প্রকাশিত গল্প উপন্যাস নির্ভর করে তৈরি হতো, তাই নায়কের চরিত্রে বৈচিত্র‍্যের মাত্রা অনেক বেশি থাকত। হয়তো অনেক সময় উত্তমবাবু সচেতন ভাবে এই বৈচিত্র্য বেছে নিতেন। যেমন শোনা যায় যখন রোমান্টিক নায়ক হিসেবে বাঙালি দর্শকদের কাছে তাঁর চাহিদা উন্মাদনার পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন প্রায় জোর করেই গ্ল্যামরের আলো থেকে সরে গিয়ে রাইচরণের (খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন) চরিত্রটি করেন।

ভাবমূর্তি সযত্নে রক্ষা করার কথা মাথায় না রেখে অভিনয় করেন নেগেটিভ চরিত্রে – শেষ অঙ্ক, বাঘ বন্দী খেলা, অপরিচিত-র মতো ছবি করেছেন । একজন পরাজিত মানুষের চরিত্র করেছেন যদুবংশ ছবিতে। কমেডি অভিনয় করেছেন ছদ্মবেশী, মৌচাক, ধন্যি মেয়ে ছবিতে ।

বলা যেতে পারে বঙ্গসমাজের অনেকগুলি আর্থ-সামাজিক স্তর, অনেকগুলি সামাজিক মর্যাদার ধাপ , এবং বাঙালির behavioral pattern এর নানান খুঁটিনাটি, তাঁর অভিনয়ের আওতায় এসেছিল। তার ফলশ্রুতিতে আমরা উত্তম কুমারের ছবিগুলি থেকে বাঙালির ফেলে সময়ের একটা সামাজিক ইতিহাসের ডকুমেন্টেশন হিসেবেও পেয়েছি।

এক কথায় বলা যেতে পারে ইদানীং ক্রমশ যে ভাবে বাঙালি তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলছে, তাতে ভবিষ্যতে যদি কোনো গবেষক বাঙালির সামাজিক জীবনধারার বিবর্তনের ডকুমেন্টশন করতে চান, তাহলে তার কাছে উত্তম কুমারের সিনেমাগুলি হয়ে উঠতে পারে নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং উৎস ।

আশা করি, এই কথা মাথায় রেখে তাঁর শতবর্ষে শুধু কিছু মোটাদাগের নাচ গানের অনুষ্ঠান না করে তাঁর ছবিগুলি যথাযোগ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Dwaipayan Goswami
Dwaipayan Goswami
4 hours ago

অসাধারণ একটা লেখা পড়লাম।

1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x