শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

তালগাছ : পুনরধ্যয়ন, পুনর্মূল্যায়ন

একই রবীন্দ্রসৃষ্টি জীবনের এক এক পর্বে কত ভিন্ন ভিন্ন আবেদন নিয়ে আসতে পারে তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আমাদের শৈশবসাথী “শিশু ভোলানাথ” ও “সহজ পাঠে”র অন্তর্গত “তালগাছ” কবিতাটি। সেইসময় এটি ছিল একটি সুখপাঠ্য কবিতা। বিশেষ করে কবিতাটির কয়েকটি পংক্তি — যেমন, সারাদিন ঝরঝর থত্থর / কাঁপে পাতা-পত্তর— বালকমনে কী এক অজানা আলোড়ন তুলত।
এরপর কালের নিয়মে শৈশবের পর কৈশোর এল, একই অমোঘ নিয়মে দৃষ্টিভঙ্গী, রুচিবোধের আমূল পরিবর্তন ঘটল। “বড়” হওয়ার অনুভূতির প্রথম প্রকাশ ছোটদের থেকে প্রতি পদে পদে নিজের স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের নিরন্তর (কখনও কখনও হাস্যকর) প্রয়াসে, শৈশবের সমস্ত ভালোলাগার প্রতি এক উন্নাসিক তাচ্ছিল্য প্রদর্শনে — ওসব তো বাচ্চাদের জন্য, ওসব তো বাচ্চারা করে…… ইত্যাদি, ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ বা সামগ্রিকভাবে সাহিত্যও তার ব্যতিক্রম নয়। “শিশু”, “শিশু ভোলানাথ” ও গল্পগুচ্ছের কিছুসংখ্যক গল্পের সীমিত পরিসর অতিক্রম করে এক নতুন রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পেতে শুরু করেছি । সেই গভীর বিস্ময়বিমুগ্ধতায়, অব্যবহিত পূর্বের প্রিয় সব কিছুকেই বর্জন করে চলেছি। যা কিছু সহজ, সরল, নিরলঙ্কার, যা কিছু প্রথম পাঠেই বোধগম্য হয় তা সদ্য বড় হওয়া পাঠকের উপযোগী নয়। তাই কোন সহপাঠী যখন পাঠ্যসূচীর কোন কবিতা বা গল্প সম্পর্কে বলত “বাবা, কী শক্ত” তখন ধমকের সুরে বলতাম “কোন ক্লাসে পড়ছিস খেয়াল আছে? এখন কী তবে পড়বি “তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/ সব গাছ ছাড়িয়ে…”? কেবলমাত্র শিশুদেরই উপযোগী, সদ্যসাবালকের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত রচনার উদাহরণ হিসাবে তখন সতঃস্ফূর্তভাবে “তালগাছ” কবিতার কথাটাই মনে আসত। শৈশবে অত্যন্ত প্রিয় ছিল বলেই হয়তো। সব গাছ ছাড়িয়ে যাওয়া তালগাছের মতই সব সমবয়সীকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটা তাগিদ প্রবলভাবে অনুভব করতাম। অন্যদের তুলনায় রবীন্দ্রনাথ থেকে, অন্তত তাঁর গান থেকে একটু বেশি উদ্ধৃতি দিতে পারি — সেই কারণে সমবয়সী বন্ধুদের সমীহ মনের গভীরে আত্মশ্লাঘার সঞ্চার করত — মুখে যতই বিনয় করি না কেন। কিন্তু তখন বুঝি নি একদিন দর্পচূর্ণ হবে, বলতে হবে “গরব মম হরেছ প্রভু দিয়েছ বহু লাজ”। সেই দর্পচূর্ণের কাহিনি শোনাব পরবর্তী অংশে।

আজ জীবনের অস্তাচলপ্রান্তে শৈশবে প্রিয়, পরবর্তী কালে উপেক্ষিত “তালগাছ’’ শুধুমাত্র মনকে স্মৃতিমেদুরতায় ভারাক্রান্ত করে তোলে না — সে তো প্রবীণ বয়সের চিরন্তন প্রবণতা — আজ ওই কবিতাটি ভিন্নতর এক আবেদন নিয়ে আসে। “আর পাঁচজনের চেয়ে রবীন্দ্রনাথকে একটু বেশি জানি” — এই আত্মশ্লাঘা যে শুধুই আত্মপ্রবঞ্চনা ছিল আজ তা সমস্ত হৃদয় দিয়ে অনুভব করি । “তোমারে আমি পেয়েছি বলি মনে মনে যে মনেরে ছলি” — সেই ছলনা নিজের কাছে ধরা পড়ে যায়। উপলব্ধি করি এই বাচ্চাদের রবীন্দ্রনাথ / বড়দের রবীন্দ্রনাথ শ্রেণিবিন্যাসটা কত অসার। অনেক তথাকথিত “বাচ্চাদের কবিতা” বা “বাচ্চাদের গানের” মর্মবাণী শৈশবে অনুধাবন করা যায় না — একমাত্র পরিণত মনেই তা উপলব্ধি করা যায় । সেই দর্পচূর্ণ ঘটেছে যেসমস্ত রবীন্দ্রসৃষ্টিকে ঘিরে তার মধ্যে অন্যতম হল সেই তালগাছ। আজ “বুঝেছি” — এমন দাবি করার ধৃষ্টতা আমার নেই, কিন্তু বুঝতে যে অনেক বাকি আছে বা হয়তো আদৌ কিছু বুঝিনি আজ অন্ততপক্ষে এইটুকু তো বুঝেছি।
“তালগাছ” সম্বন্ধে আজকের অনুভূতি সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেব। তার আগে পুরো কবিতাটি একবার দেখে নেওয়া যাক।

তালগাছ
তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে।
মনে সাধ, কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়
একেবারে উড়ে যায়;
কোথা পাবে পাখা সে?
তাই তো সে ঠিক তার মাথাতে
গোল গোল পাতাতে
ইচ্ছাটি মেলে’ তার,–
মনে মনে ভাবে, বুঝি ডানা এই,
উড়ে যেতে মানা নেই
বাসাখানি ফেলে তার।
সারাদিন ঝরঝর থত্থর
কাঁপে পাতা-পত্তর,
ওড়ে যেন ভাবে ও,
মনে মনে আকাশেতে বেড়িয়ে
তারাদের এড়িয়ে
যেন কোথা যাবে ও।
তার পরে হাওয়া যেই নেমে যায়,
পাতা-কাঁপা থেমে যায়,
ফেরে তার মনটি
যেই ভাবে, মা যে হয় মাটি তার
ভালো লাগে আরবার
পৃথিবীর কোণটি।

তালগাছের দিনের বেলার ভাবনা মানবচরিত্রের এক চিরন্তন প্রবণতার ব্যঞ্জনাবাহী। তালগাছের সমস্তদিন ব্যাপী প্রয়াস এক অবাস্তব মনোহর কল্পলোকে উত্তরণের — যে জগৎ অবস্থিত তার চিরপরিচিত পরিসরের বহু উর্ধে — তারাদের দেশেরও উর্ধে। একইভাবে মানুষও তার পরম প্রাপ্তির সন্ধান করে চলে তার চিরপরিচিত পরিমণ্ডল থেকে দূরে, বহুদূরে। প্রবল গতিময়তার উন্মাদনায় এক চিরদূরায়মান দিগন্তরেখার দিকে তার অন্তহীন ছুটে চলা। তালবৃক্ষের প্রবল কম্পন, তার শাখায় শাখায়,পত্রাবলীতে বাতাসের আন্দোলন যেন মানবমনের সেই তীব্র গতিময় স্বপ্নের চিত্রায়ণ।


দিনান্তে আমরা দেখি ওই তালগাছেরই ভিন্নতর রূপ — স্থির, নিবাত, নিষ্কম্প রূপ। হাওয়া নেমে যাওয়া, পাতা কাঁপা থেমে যাওয়ার মধ্যে নিহিত আছে পর্বান্তরের সঙ্কেত। অবিরাম গতির উন্মত্ততার পর আসে গভীর ভাবনার পর্ব। ধ্যানতন্ময়তার সেই মুহূর্তে পূর্ণ সত্যের উন্মোচন ঘটে। এমনি ভাবেই মাটির বাসা ছেড়ে কল্পনার পাখা মেলে উড়ে চলা তালগাছ অবশেষে অনুভব করে “মা হয় মাটি তার”। তার কল্পযাত্রার শেষে তখনই আসে তার ভালোলাগার চরম ক্ষণটি। এমনি করেই দিগদিগন্তে ধাবমান মানুষ অবশেষে উপলব্ধি করে তার পরম অন্বিষ্ট — সে প্রাণের মানুষই হোক বা জীবনের পরম সত্য হোক — সে কোন অচিন সুদূরলোকের নয়, সে আছে তার একান্ত কাছে, তার পরিচিত পরিমণ্ডলেরই মধ্যে, প্রতিদিন শত তুচ্ছের আড়ালে। তার প্রাণপণ সাধনার অবসান এই পরিচিত প্রাত্যহিক বাস্তবকে নূতন করে খুঁজে পাওয়াতেই।
আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে কবিতাটির উপর ঈষৎ ভিন্ন তাৎপর্য আরোপ করা যেতে পারে। সব গাছ ছাড়িয়ে আকাশে উঁকি দেওয়া তালগাছকে আধুনিক মানুষের আকাশচুম্বী উচ্চাভিলাষের প্রতীক বলে ব্যাখ্যা করা যায়।শুধু পৃথিবীর সব গাছকেই নয়, আকাশের তারাদেরও সে ছাড়িয়ে যেতে চায়। এমনি করে আজকের দিনে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ বারংবার তীব্র, বহুসময় অসুস্থ, প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে পর্যুদস্ত করে সাফল্যের উচ্চতম শিখরে আরোহণই হয়ে ওঠে জীবনের সব ধ্যানজ্ঞান। পরিবার, আপনজনেদের ভালোবাসা — তার কাছে কোনকিছুরই আর কোন অর্থ থাকে না। প্রবল বাতাসে বৃক্ষশাখার আন্দোলনে যেন মর্মরিত হয়ে ওঠে জয়লাভের উদগ্র বাসনা, প্রবল বিজয়োল্লাস। কিন্তু যখন গভীর ভাবনার অবকাশ মেলে তখনই সে উপলব্ধি করে জীবনের চরম প্রাপ্তি পরিবার, বন্ধুত্ব সবকিছুকে বিসর্জন দিয়ে, সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাস্ত করে জয়লাভের আনন্দে নয়, জীবনের সর্বোত্তম আনন্দ সারাদিনের সব কর্মের অবসানে দিনান্তে জননী জায়া প্রিয়জনের উপস্থিতিতে উষ্ণ গৃহকোণটিতে প্রত্যাবর্তনের মধ্যে। আজকের এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার দিনে “তালগাছ” বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

আপাতদৃষ্টিতে শিশুপাঠ্য “তালগাছ “ কবিতার মর্মবাণীটি রবীন্দ্রনাথের একাধিক কবিতায়, গানে অভিব্যক্ত হয়েছে ভিন্নতর আঙ্গিকে। এই মর্মবস্তুর উপর নির্মিত কিছু গান, কবিতা থেকে প্রাসঙ্গিক অংশটুকু নিয়ে পরবর্তী অংশে একটি কোলাজ নির্মাণের চেষ্টা করেছি।

উদ্ধৃত এইসব রচনাংশে আমরা দেখি স্বপ্নবিলাসী কবি বারবার অচিন স্বপ্নলোকের উদ্দেশে পাড়ি জমালেও প্রতিবারই এই মাটির পৃথিবীতেই নেমে এসেছেন।
বিস্ময়বিহ্বল কবি আকাশ ভরা সূর্য তারার মাঝে তাঁর স্থান খুঁজে নেন, অসীম কালব্যাপী প্রবহমান প্রাণতরঙ্গ অনুভব করেন তাঁর ধমনীর প্রতি রক্তকণিকায় কিন্তু শেষে তিনি প্রাণ ঢালেন এই ধরারই বুকে। মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকালমাঝে অপার বিস্ময়ে পরিভ্রমণরত কবির মনে এই ধরণীতে কোন বনপথপ্রান্তে বিকশিত নাম না জানা এক তৃণকুসুমের সৌরভের আকর্ষণ এতটুকু ক্ষীণ হয় না। তুচ্ছ এক ফুলের গন্ধে লাগা চমক তো কবিপ্রাণে সঞ্চারিত সীমাহীন বিস্ময়েরই এক অতিক্ষুদ্র অভিব্যক্তি।


নক্ষত্রখচিত নৈশ গগনের শোভার মাঝে কবি পাঠ করেন কালহারা কোন কাল থেকে আসা কোন অমর্ত্যলোকের আমন্ত্রণলিপি। কিন্তু সেই আমন্ত্রণ কবি প্রত্যাখ্যান করেন।
ওই আলোক-মাতাল স্বর্গসভার মহাঙ্গন
হোথায় ছিল কোন্‌ যুগে মোর নিমন্ত্রণ–
আমার লাগল না মন লাগল না,
তাই কালের সাগর পাড়ি দিয়ে এলেম চ’লে
এই ধরারই বুকে বনপথে আলোছায়ার লুকোচুরি, তৃণদলের মাঝে রঙিন ফুলের অনুপম শোভাবিস্তার স্বর্গলোকের মহিমাকেও ম্লান করে দেয়। তাই কবির ঘোষণা
হেথা ঘাসে ঘাসে রঙিন ফুলের আলিম্পন,
বনের পথে আঁধার-আলোয় আলিঙ্গন–
আমার লাগল রে মন লাগল রে,
তাই এইখানেতেই দিন কাটে এই খেলার ছলে
শ্যামল মাটির ধরাতলে॥
কোন অগম পারের অবিমিশ্র, অনন্ত সুখের পরম ধাম নয়, তাঁর স্বর্গ এই শ্যামল মাটির ধরাতল, এই কালো মাটির বাসা, কান্না-হাসি, সুখ-দুঃখের দ্বন্দ্বে নিয়ত উদ্বেল এই প্রতিদিনের মানবসংসার :
এই-যে কালো মাটির বাসা শ্যামল সুখের ধরা–
এইখানেতে আঁধার-আলোয় স্বপন-মাঝে চরা ॥
এরই গোপন হৃদয় ‘পরে ব্যথার স্বর্গ বিরাজ করে
দুঃখে আলো-করা।।
ধরণীর প্রতিটি ধূলিকণা যার কাছে মধুময়, এই তো তাঁর স্বর্গের ঠিকানা :
বিশ্বজনের পায়ের তলে ধূলিময় যে ভূমি
সেই তো স্বর্গভূমি।
জননী বসুন্ধরার স্নেহধন্যা, প্রাণের পুণ্যে পরিপূর্ণা মানবকন্যা তার উদ্দেশে বলে :
কোন্‌ স্বর্গের তরে ওরা তোমায় তুচ্ছ করে
রহি তোমার বক্ষোপরে।
এইখানে বিশেষ প্রাসঙ্গিক “স্বর্গ হইতে বিদায়” কবিতাটি।

তালগাছের আরবার ভালোলাগা পৃথিবীর কোণটি — এখানেই সকল অন্বেষণের অবসান। কিন্তু বিপুলা এই ধরণীর সুদূর কোন প্রান্তসীমায় নয়, পরম প্রাপণীয় আছে আপন গৃহদ্বারপ্রান্তে । সর্বযুগে সর্বদেশে সৌন্দর্যপিয়াসী মানুষ ধাবিত হয় দূর দূরান্তে। অচেনার আনন্দ আস্বাদনের কত না আয়োজন, কত না প্রয়াস — “দুর্লভ” কবিতার সূচনায় তারই অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ । কিন্তু একসময় সমগ্র বিশ্বশোভার সারাৎসার হয়ে দেখা দেয় উপেক্ষার অন্তরালে রয়ে যাওয়া অতি পরিচিত, অতি তুচ্ছ এক দৃশ্য। সেই উপলব্ধির প্রকাশ কবিতার শেষে সুদূরের পিয়াসী কবির আক্ষেপবাণীতে :
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

বাউলকবি প্রাণের মানুষের ব্যাকুল অন্বেষণে দেশ দেশান্তরে ঘুরে বেড়ান কিন্তু অবশেষে নিজের গানেই তার বাণী শুনতে পান। যেথায় সেথায় দ্বারে দ্বারে যাকে তিনি সন্ধান করেন, সেই প্রাণের মানুষ তো প্রাণেই আছে।

“মায়ার খেলা” নৃত্যনাট্যে প্রথম দর্শনের মুহূর্তে শান্তার প্রশ্নের উত্তরে অমরের সহর্ষ ঘোষণা — আজ থেকে তার মনের মানুষের জন্য আদিগন্ত অন্বেষনের শুরু। জীবনে বসন্তসমাগমের এই মুহূর্তে অমর বসন্তপবনের মতই সুদূরে বিকশিত নাম না জানা কুসুমের সন্ধানে ছুটে যেতে চায়। কিন্তু মনের মানুষ তো উপস্থিত রয়েছে, শান্তা প্রথম দর্শনেই তাকে মনপ্রাণ সমর্পণ করেছে। শান্তার নীরব প্রেমের অতলস্পর্শী গভীরতা সে তখন উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। সুদূরে ধাবমান প্রেমপিয়াসী মায়াকুমারীরা তখন তার উদ্দেশে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিল
কাছে আছে দেখিতে না পাও,
তুমি কাহার সন্ধানে দূরে যাও।
মনের মতো কারে খুঁজে মরো,
সে কি আছে ভুবনে–
সে তো রয়েছে মনে।
ওগো, মনের মতো সেই তো হবে,
তুমি শুভক্ষণে যাহার পানে চাও।
সত্যদৃষ্টির উন্মীলনের সেই শুভক্ষণটি আসে বহুপরে। মনের মানুষ যে মনেই আছে—অবশেষে অমর তা উপলব্ধি করে। সমগ্র “মায়ার খেলা” নাটকটি তার দৃষ্টির পর্বান্তরের ধারাভাষ্য।
সুদূরের উদ্দেশে যাত্রা — বাস্তবে অথবা কল্পনায় — অবশেষে আবার আপন সীমায় প্রত্যাবর্তন — পূর্বোক্ত সমস্ত রচনাংশে বিধৃত সেই ভাবনা কী তালগাছকেই স্মরণ করিয়ে দেয় না ?

পূর্বোক্ত রচনাংশসমূহের তাৎপর্য কি তবে এই যে রবীন্দ্রনাথ কূপমণ্ডুকতাকে মহিমান্বিত করেছেন ? তিনি “কর্মহীন… দীপ্তিহীন সুখে” আপন কোণে নিমগ্ন থাকার শিক্ষা দিচ্ছেন? “হেমন্তের ভেক যথা জড়ত্বের কূপে”? না একেবারেই নয়। এর চেয়ে বড় অপব্যাখ্যা আর কিছু হতে পারে না। নিজের চেনা ভুবনেই রয়েছে জীবনের পরম প্রাপ্তি — কিন্তু সেই সত্যজ্ঞানের উন্মেষের জন্য পরিচিত পরিসর থেকে নিষ্ক্রমনের প্রয়োজন। পৃথিবীর এক কোনে তার ফেলে আসা বাসার চরম মাধুর্যটুকু তালগাছ অনুভব করেছিল আকাশে আকাশে তার কল্পভ্রমণের শেষে প্রত্যাবর্তনের মুহূর্তে। বাউল কবি তাঁর প্রাণের মানুষের বাণী আপন গানে শুনেছিলেন দেশে দেশান্তরে দ্বারে দ্বারে দীর্ঘ ভ্রমণের পরে নিজের দেশে ফিরে। প্রেমপিয়াসী অমরের দিগদিগন্তব্যাপী ব্যাকুল সন্ধানের সমাপ্তি যখন ঘটল নৈরাশ্যের বিপুল অন্ধকারে, তখনই সে সন্ধ্যাতারার আলো দেখেছিল পূর্বে উপেক্ষিতা প্রেমাস্পদার দুচোখে। বিচ্ছেদবেদনা ছাড়া মিলন সম্পূর্ণ হত না। কবির এই দৃষ্টিভঙ্গীর সার্থকতম রূপায়ণ সম্ভবত পরের গানটিতে। ভূগর্ভস্থ জল বাষ্পীভূত হয়ে উর্ধ আকাশে উত্থিত হয়ে মেঘে রূপান্তরিত হয়, তারপর বৃষ্টিধারায় নেমে এসে শুষ্ক ভূমিকে রসসিক্ত করে —- অতি সাধারণ এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে কবি রূপক নির্মাণের ভিত্তি করে নেন। একান্ত কাছের ধন যখন সুদূর পথপরিক্রমা শেষে কাছে আসে তখনই সেই পাওয়া নিবিড়তম হয়ে ওঠে। সেই ভাবের ব্যঞ্জনা নিহিত পরের গানটিতে :
মাটির বুকের মাঝে বন্দী যে জল মিলিয়ে থাকে
মাটি পায় না, পায় না, মাটি পায় না তাকে॥
কবে কাটিয়ে বাঁধন পালিয়ে যখন যায় সে দূরে
আকাশপুরে গো,
তখন কাজল মেঘের সজল ছায়া শূন্যে আঁকে,
সুদূর শূন্যে আঁকে–
মাটি পায় না, পায় না, মাটি পায় না তাকে॥
শেষে বজ্র তারে বাজায় ব্যথা বহ্নিজ্বালায়,
ঝঞ্ঝা তারে দিগ্‌বিদিকে কাঁদিয়ে চালায়।
তখন কাছের ধন যে দূরের থেকে কাছে আসে
বুকের পাশে গো,
তখন চোখের জলে নামে সে যে চোখের জলের ডাকে,
আকুল চোখের জলের ডাকে–
মাটি পায় রে, পায় রে, মাটি পায় রে তাকে॥


কূপমণ্ডুকতা নয় — যেমন উপলব্ধি করেছিল “চণ্ডালিকা”র প্রকৃতি — ভালোবাসার মায়ামন্ত্রে কূপ হয়ে ওঠে অকূল সমুদ্র। সেই মন্ত্রই ছড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতায়, গানে।

ধরণীর সন্তান এই তালগাছ তার মাটির বাসা ছেড়ে উড়ে যেতে চায় আকাশপারের দেশে — যাত্রাপথে আকাশের তারাদের মধ্যে সে দেখে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের। একটি গানে আমরা দেখি দূর আকাশের তারার দৃষ্টি নিপতিত ধরণীরই এক কোণের উপর — যেখানে একটি মাটির ঘরে জ্বলে একটি মাটির প্রদীপ। এই প্রদীপশিখায় কখনও প্রেয়সীর ব্যাকুল দৃষ্টির উদ্ভাস, কখনও সে হয়ে ওঠে সতত উদ্বেগাকুল জননীহৃদয়ের উপমা। জননী জায়ার প্রাণের পরশে পৃথিবীর এক অতিক্ষুদ্র প্রান্তের সেই ক্ষীণ দীপালোকশিখা হয়ে ওঠে আগুনের পরশমণি। তাইতো সুদূর সন্ধ্যাতারা নির্নিমেষ নয়নে চেয়ে থাকে এই অতিক্ষুদ্র প্রদীপের আলোর দিকে । তারই জন্য সে অমর্ত্যের আশীর্বাণী বহন করে আনে। অবশেষে অমর্ত্যলোকের প্রতিভূ এই মহাজাগতিক জ্যোতিষ্ক নিজেই পার্থিবশিখায় জ্বলে উঠে ধন্য হতে চায়।
মাটির প্রদীপখানি আছে মাটির ঘরের কোলে,
সন্ধ্যাতারা তাকায় তারি আলো দেখবে ব’লে॥
সেই আলোটি নিমেষহত প্রিয়ার ব্যাকুল চাওয়ার মতো,
সেই আলোটি মায়ের প্রাণের ভয়ের মতো দোলে॥

নামল সন্ধ্যাতারার বাণী আকাশ হতে আশিস আনি,
অমরশিখা আকুল হল মর্তশিখায় উঠতে জ্ব’লে॥

শেষ করি রবীন্দ্রনাথের গানের কথাতেই — এ তো তালগাছের বাণীরই এক ভিন্নতর ভাষ্য :
কোথায় ফিরিস পরম শেষের অন্বেষণে।
অশেষ হয়ে সেই তো আছে এই ভুবনে॥
তারি বাণী দু হাত বাড়ায় শিশুর বেশে,
আধো ভাষায় ডাকে তোমার বুকে এসে,
তারি ছোঁওয়া লেগেছে ওই কুসুমবনে॥

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
12 days ago

আপনার অপূর্ব সুন্দর এই বিশ্লেষণটি পড়ে অপার আনন্দ পেলাম।সহজ পাঠের যে কবিতাটি নিয়ে আলোচনা শুরু করে নানা রচনা পরিক্রমা করে সমে এসে পৌঁছালেন,সেটা পড়ার মাঝখানে আমার সহজ পাঠেরই আর একটি কবিতার কথা মনে এলো।সেটা হল, ” দিনে হই একমত,রাতে হই আর।/ রাতে যে স্বপন দেখি, মানে কি যে তার “।এটার মধ্যেও তো অন্যভাবে সেই একই কথা।জানিনা প্রগলভতা হল কি না।জানাবেন।

1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x