শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

-চল, আমার মামার বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।

-তোর মামার বাড়ি ?

-আঁতকে উঠছিস কেন, মামা নেই বলে ? আরে, শুধু মামা নেই নয়, মামা বাড়িও নেই, তবুও মামার বাড়ি।

-তাহলে কোথায় নিয়ে যাবি, মামার বাড়ির গ্রামে ?

-একদমই ঠিক ধরেছিস, আমার দিদিমা দাদুর ভিটে।

আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরত্বে এই গ্রাম। গ্রাম, তবে কতদিন আর সেখানে মনুষ্য থাকবে জানি না। এ অঞ্চলের বহু গ্রাম এখন জনশূন্য। কোনোটা বন্যায়, তো কোনোটা প্রথমে পরিযায়ী, তারপর পরিত্যক্ত। এ গাঁয়ের প্রাথমিক স্কুলে সাকুল্যে গোটা পনেরো ছেলেপিলে। পড়াশোনা করে পাঁচটি, বাকিরা খাতায় ও পাওনা গণ্ডায়।

-এমন অবস্থা !

-সাধ ও সাধ্য আছে, তাই দূরে একটা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। এখানে পরীক্ষা দেয়, ড্রেস পায়, চিকেন হলে মিড ডে মিল খায়।

দিদিমা গত হয়েছেন বেশ কয়েকবছর হল, দাদু বহুদিন। আমার মায়েরা চার বোন। মা সেজ। মায়ের দাদুর চেহারা মনে পড়ে না। মনে থাকার কথাও নয়। মা তখন তিন বছর, ছোট মাসি চার মাস – দাদু গত হলেন। দাদু পঙ্কজাক্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়। গাছগাছড়া নিয়ে গবেষণা করতেন। সেই সময়ে ম্যাট্রিকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাশ। কদর ছিল সমাজে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আয়ুর্বেদ পড়েছিলেন শুনেছি। জ্যোতিষ শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। ওই অঞ্চলে তাঁর ভেষজ ওষুধের যথেষ্ট চাহিদা ছিল। দিদিমার নাম সর্বমঙ্গলা দেবী। এত বড় নাম শুনে আমরা ছোট নামের অধিকারীরা খুব হাসতাম। নামকরণটি সার্থক। কারোর মঙ্গল ছাড়া অমঙ্গলের ভাবনা তাঁর কাজকর্মে কখনও দেখিনি। অত্যন্ত নীতিনিষ্ঠ এবং সংযমী মানুষ ছিলেন। ইঞ্চি পাড় সাদা ধুতি আটপৌরে করে পরতেন। রামপুরহাটের কাছে জেন্দুর গ্রামের মেয়ে। মায়ের মামারা ছিলেন সেই সময়ের নামজাদা শিক্ষিত চাকুরে। দিদিমা অবশ্য যেটুকু লিখতে পড়তে পারতেন, তা ঘরেই। ইস্কুলে গিয়ে বামুনের ঘরের মেয়েদের লেখাপড়া শেখার পাট সেই গ্রামে তখনও শুরু হয়নি। শিখেছেন দাদাদের পড়া শুনে। বুদ্ধিমত্তা যে তাঁর কম ছিল না, তাঁর গৃহ পরিচালনা থেকেই বোঝা যায়। অত্যন্ত দক্ষ পরিকল্পনা করে মেয়েদের উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করেছেন এবং মায়ের লেখাপড়া শেখার আগ্রহকে সঠিক ভাবে রূপায়ণ করেছেন।

-দেখেচিস, গল্প করতে করতে নদীর কাছে পৌঁছেও গেলাম। আরে ভাই, ওপারে না, এপার ঘেঁষে চলো।

আমাদের টোটো চালক দু’পাশের ধানক্ষেতের মাঝে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া রাস্তায় নামতে নামতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গেরাম কোথাকে গো, সবই তো বাঁশ ঝাড়!’

গ্রামের নাম আড়াল। কিছুদূর যেতেই কয়েকটা পাকা বাড়ি। এটা হল রায় পাড়া। আমি নেমে রায় পাড়া পেরিয়ে বিপাশাকে নিয়ে গেলাম আমাদের কালীতলায়। চারবছর অন্তর আমাদের পুজোর পালা । দাদু ও তাঁর বন্ধুরা মিলে মাঘী পূর্ণিমায় এই কালী পুজো করতেন।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ ধীরে ধীরে আবছা থেকে উজ্জ্বল বিভায় নিজেকে মেলে ধরছে। আমাদের ঠাকুর-বেদির পাশেই খড়ের পালুই। তারই পাশে ঠাকুরের শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা চলছে। চার ফুট উচ্চতার শ্যামা রঙের কালীর উপর পূর্ণিমা যেন কোনো অলৌকিক জগতে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। কনকনে ঠান্ডা হাওয়াতে আমরা দুজনেই বেশ রোমাঞ্চিত।

ওহ্, আমার সঙ্গীর নাম বিপাশা। আমাদের পাড়ার হরিকাকুর একমাত্র মেয়ে। প্রবাসী । গবেষণা সূত্রে দেশে ফিরেছে। আমি ঋতু। ওকে আমি বিপস বলে ডাকি। দেশে ফিরলে দুজনে এমনই কোথাও কোথাও ঘুরে আসি।

-ঋতু, এত সুন্দর কালী আমি কোনোদিন দেখিনি।

-দেখবি কি করে, এ যে পূর্ণিমার কালী। আমাদের কালীরা প্রত্যেকেই যে অমাবস্যার। ল্যাংটা কালো মেয়েমানুষ, যতই দেবী হোক, তাঁরও তো লজ্জা আছে। তাই তো অমাবস্যার আড়ালের প্রয়োজনীয়তা। দিনের আলো তো এমন মেয়ের লজ্জা।

-দাদু কি কবি ছিলেন ?

-ঠিক ধরেছিস, দেখার চোখ না থাকলে এমনভাবে দেখা যে সে মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

কারিগর কালীকে একটা করে অলঙ্কার পরিয়ে কয়েক মিনিট ধরে বিস্মিত চোখ বোলাচ্ছেন। হয়তো বুঝে নিচ্ছেন, তিনি যেমন করে গড়তে চাইছেন, ঠিক তেমন রূপ খুলছে কিনা।

-জানিস তো বিপ্স, আমার এখনও পর্যন্ত ঠাকুর দেবতার উপর ভক্তি কম, কিন্তু এই প্রত্যেকটা দেবদেবীর মূর্তির ভিতর দিয়ে তাঁদের স্রষ্টা শিল্পীদের দিব্যদৃষ্টিকে বোঝার চেষ্টা করি। দ্যাখ, কারিগর ও কালী কেমন প্রাণে মনে একাকার। এক দারু শিল্পীর অপরূপ সৃষ্টি এভাবেই জগন্নাথ রূপে পুজো পেল। শুধু তো মন্দির মসজিদ প্যাগোডা নয়, যা কিছু সুন্দর, মানুষ তা পুজোর আড়ালেই বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছে।

-দাদুর নামটা সত্যিই সার্থক। চোখ ছিল বটে ! দাদুর পুজো ছিল এ পর্যন্তই । বিমূর্ত থেকে মূর্তির মূর্ত হয়ে ওঠা পর্যন্ত। পরের কাজ তাঁর বন্ধুরা করতেন।

-সেই সময় এমন অকাল কালীপুজো করার জন্য দাদুকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি কেন, সেটাও বুঝতে পারছি না।

-হয়তো নিছকই ছেলেমানুষি বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।
তাছাড়া গ্রামের নাম যখন আড়াল, সেখানে বাঁশবাগানের আড়ালে আবডালে এমন কিছু ঘটনা ঘটলে অর্থাৎ দুর্ঘটনা না হলে, কারোর তেমন প্রয়োজন পড়ে না, চার ইয়ারির কালী নিয়ে সমাজের নিদান হাঁকতে।

বিপাশা খানিকটা উদাস হয়ে গেল।

পৃথিবীতে এমন বহু জনপদ আছে যেগুলো চিরকাল নিরাপদ দূরত্বে থেকে আজও তাদের অবগুণ্ঠনখানি রক্ষা করতে পেরেছে। বহু মানুষও আছেন, যাঁরা আড়ালপ্রিয়।
আড়ালের বাইরে এলেই এঁরা মৃত।

চল, নদীর পাড়ে যাই।

চাঁদের আলোয় ভাসছে দ্বারকা। দ্বারকা নদী। ছোটবেলায় যে নদী আমাদের দিবারাত্রির সঙ্গী। আমার মামা মামি নেই কিন্তু এই নদী আছে। আমি যতবার “আমাদের ছোট নদী চলে আঁকেবাঁকে পড়তাম, ততবার রবীন্দ্রনাথকে দেখতে পেতাম ঠিক এমনই একটি আড়াল গ্রামের নদীর পাড়ে।

“ধারে ধারে কাশবন, ফুলে ফুলে সাদা।”

আমরা বেলা দশটা থেকে নদীতে স্নান করতে নামতাম। গামছা দিয়ে ছোট মাছ ধরতাম। আমার মাসতুতো ভাইবোনেরা বাঁধ থেকে জলে ঝাঁপ দিয়ে কেরামতি দেখাত, বালি খুঁড়ে জল বের করতাম। আহা, সে এক অন্যরকম ছেলেবেলা। গরমের ছুটিতেই কেবল আসতাম। তবে চারবছর অন্তর কালীপুজো পড়লে তখনও আসা হত। সে এক অনাবিল আনন্দ। জানিস তো, মায়েরা নাকি নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতেই তারাপীঠে কৌশিকী অমাবস্যার মেলা দেখতে যেত।

একবার মাঘ মাসে ড্যাম থেকে নদীতে জল ছাড়ায় কালী পুজোর সময় এক কোমর কনকনে ঠাণ্ডা জল পেরিয়ে ভোগ বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিল দাদাদের।
ওপারের গ্রামের নাম নোকরা। আমার ছোট মাসীর শ্বশুর বাড়ি। দিদিমা বেশিরভাগ সময় ছোট মেয়ের সঙ্গেই থাকতেন। বন্যায় তাঁর ঘরবাড়ি ভেসে গেছিল। এখনও নদীর ঘাটে দাঁড়ালেই দিদিমাকে দেখি, সেই ইঞ্চি পেড়ে সাদা শাড়ি পরে পিতলের ঘট থেকে পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে জল নিবেদন করছেন। চল, ভিটে দেখব এবার ।
আমরা নদী থেকে বাঁধ বরাবর হেঁটে চলেছি মামা বাড়ির দিকে। ঢাকের আওয়াজ শুনে একটু দাঁড়িয়ে গেলাম। হ্যাজাক জ্বালিয়ে যে এগিয়ে আসছে ঘাটের দিকে, তার পিছনে মাথায় পিতলের কলস নিয়ে আমার আরেক মাসতুতো ভাই। ঘট ভরার দায়িত্ব তাঁর। পথের উপর ঝরা বাঁশপাতা। হাওয়ার দোলায় পাতার আওয়াজে মাঘী পূর্ণিমা তখন চরাচরে এক আশ্চর্য মায়াময় দ্যুতি ছড়িয়েছে। পাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে এক ছাতারে পাখি লাফাতে লাফাতে আমাদের স্বাগত জানাল।

বাবুমামা হ্যাজাক বাতি ঘাটের কাছে নামিয়ে বললে, ‘কাল সকালে ভিটে দেখবা, আমি লিয়ে যাব।’

বাবু মামা আমার মামার বাড়ির পাশেই থাকেন। সে ছাড়া আমাদের এ গাঁয়ে তেমন কেউ চেনে না। মাঝে মাঝে দু একজন লোক নতুন কাউকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘হা গো, আপনারা কথিকার ?’
আমি বলি, ‘ওগো, আমি পঙ্কজবাবুর নাতনি।’

পুরনো মানুষ হলে আলাপ বাড়ান, আত্মীয়তার ইতিহাস ভূগোল টেনে বিস্তার করেন নিজেদের জীবন, বাকিরা চেহারা বেশভূষা দেখে বুঝে নেন যে, আমরা তাদের কেউ নই, ক্ষণিকের অতিথি মাত্র।

বিপাশা কালীপুজো দেখতে থাকে। আমার দিদিমা যতদিন শক্ত সমর্থ ছিলেন ততদিন নিজ হাতে ভোগ রান্না করে গ্রামের সকলকে খাওয়াতেন। এটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। বিধবা হয়ে তিনি একা হাতেই চার মেয়েকে নিয়ে জমিজমা থেকেই সংসার চালিয়েছেন নিজ কুশলতায়। কোনোকিছুই বিক্রি করতে হয়নি। ছোট মাসি ও মেসো এখনও আগলে রেখেছেন আমাদের মামা বাড়ি। আশিস দাদা, তাঁদের ছেলে জমি জমা গোরু বাছুর গ্রাম বড়ো ভালোবাসেন। আমাদের মাঠঘাট সেই একা হাতে সামলায়।

পঙ্কজাক্ষবাবু হয়তো আড়াল প্রিয় মানুষ ছিলেন। সেই আড়াল তাঁর সন্তান-সন্ততির উপরও এসে খানিকটা পড়েছে বইকি ! আমরাও চাইনা, আমাদের কালীকে নিয়ে খুব একটা জাঁকজমক করতে। ছোট মেসো খুবই সংস্কৃতি প্রিয় মানুষ। বিপাশাকে পেয়ে তিনিও পুজো শেষে শামিয়ানার নীচে আসর বসিয়ে ফেললেন।

“দেখব ব’লে এই আয়োজন মিথ্যা রাখি,
আছে তো মোর তৃষা-কাতর আপন আঁখি।
কাজ কী আমার মন্দিরেতে আনাগোনায়–
পাতব আসন আপন মনের একটি কোণায়,
সরল প্রাণে নীরব হয়ে তোমায় ডাকি ॥ “

আমরাও বিপাশার সঙ্গে গলা মেলালাম। আমাদের এই প্রজন্ম ধরল:
কালো মায়ের আঁধার কোলে
শিশু রবি শশী দোলে
(মায়ের) একটুখানি রূপের ঝলক স্নিগ্ধ বিরাট নীল–গগন।।

টুম্পা ও প্রসেনের মেয়ে সমবেত নৃত্য পরিবেশন করল, “তোমার আনন্দ ওই এল দ্বারে।”

তৃণার বিয়ে প্রায় ঠিকঠাক। তার হবু শ্বশুর শাশুড়িকে নিয়ে ব্যস্ত বৌদিরা। সলজ্জ উপস্থিতি নতুন জামাইয়ের। তৃণা গাইল, ‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে।’ আমাদের প্রায় সকলের কিছু নির্দিষ্ট গান আছে। যেমন, আমার বোনকে প্রায় সব অনুষ্ঠানেই গাইতে হয় ‘গঙ্গা আমার মা।’ তেমনি টুম্পা মানেই, ‘এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ।’

মা একটু সুযোগ পেলেই ফেসবুকে চলে যান। তিনিই মনে করিয়ে দিলেন নাচগানগুলো রেকর্ড করতে, যাতে ফেসবুকে পোস্ট করা যায়। তাছাড়া কার কোথায় আরও শোধরানোর প্রয়োজন আছে, সেদিকেও তিনি সদা সচেষ্ট। আমার মেজো মাসীর ছেলে , আমাদের সুব্রত দাদা অবশ্য এ বিষয়ে খুবই সচেতন। ক্যামেরা তার সবসময় তাক করাই থাকে। এটি তার পেশাও বটে। সকলের শেষে পুজো সামলে আসরে হাজির হলেন সাধনদা। সাধনদা আমাদের প্রত্যেক সামাজিক ক্রিয়াকর্মের ভাঁড়ার ঘরটি সামলানোর দায়িত্বে থাকেন। গানবাজনাতে ভারী উৎসাহ, নিজে গান লেখেন, সুর দিয়ে গান। তবে দোষ একটাই তাঁর সঙ্গীত সাধনা একবার শুরু হলে শ্রোতাদের বিরক্তি না ধরানো পর্যন্ত শেষ হয় না।
মা বললেন, ‘সাধনের গানগুলো মোবাইলে রেকর্ড করে রাখ।’
আমরা একে অপরের মুখ চাওয়াচায়ি করে এড়িয়ে গেছি। তখন কি আর জানতাম পৃথিবীতে সাধনদা মাত্র কয়েকদিনের অতিথি।

প্রায় ভোর রাতে আমরা ঘুমোতে গেলাম। ঘুম কি আর আসে ! চার বছর বাদে বাদে দেখাসাক্ষাৎ হলে যা হয়, অতীত বর্তমানের দোলায় সকলেই নিজ নিজ ঝাঁপি খুলে দিয়েছে।

মাঝেমধ্যে ছোট মেসো পাশের ঘর থেকে হাঁক দিচ্ছেন,’ ওরে তোরা এবার থাম।’

জগৎ এমনি করেই চলে, থামতে জানে না। কখন কার ভিতর ঢুকে সে তার ছন্দ বজায় রাখে, সে কেবল স্রষ্টা এবং তাঁর সৃষ্টি জানে।

পরদিন সকালে মা, মেজো মাসী, ছোট মাসি, আমাদের সকল ভাইবোনেরা মিলে গেলাম মামার বাড়ি দেখতে। বাবুমামা সাক্ষী। মেজো মাসী দেখালো এই আগাছা পরিপূর্ণ জায়গার কোথায় সেই সুবৃহৎ মাটির বাড়িটি ছিল। মা বলল, ‘দ্যাখ, ওইখানে আমাদের গোয়াল ঘর ছিল। সবজি সব ঘরেই লাগাত মা। মাছ দুধ ডিমের কোনো অভাব ছিল না, তবে নগদ টাকা পয়সার অভাব ছিল। ধান বিক্রি হলে তবেই নগদ ঢুকত।’

তারপর মেজো মাসী সামনের ধানের জমিতে কয়েকটা ধান গাছ স্পর্শ করে বলল, এসব আমাদের জমি।
আমারও তাঁর দেখাদেখি হাত দিলাম। শিরায় শিরায় শিহরণ জাগলো। এই ‘আমাদের জমি’ কথাটার ভিতর দিয়ে ছুঁয়ে ফেললাম পূর্ব পুরুষদের। এই মাটির আশিস আমাদের রক্তে। আরও একটু এগিয়ে অনেকখানি এলাকা জুড়ে বাঁশ ঝাড়। আমার ছোট মেসো বললেন, ‘সব আমাদের।’

বিপাশা হেসে বললে , ‘বংশদণ্ডের অভাব তোদের নেই । ‘

মা বললেন, ‘এই ধান বাঁশ আগাছা পুকুর গাছপালা সব তোদের মামা।‘

-আর এই নদী ?

-আমাদের সকলের আড়ালে বয়ে চলা মা।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের এই ছোট নদীর জন্মান্তর ঘটল। গত রাতের জোৎস্না আজ সূর্যালোকে প্লাবিত
শৈশবের চিরন্তন কিছু সম্পদ ধীরে ধীরে নিয়ে গেল জলে, যেখানে দাঁড়িয়ে কোনো এক ধুতি পরা মহিলা সূর্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছেন জল। একবার সূর্যের দিকে তাকাতে চেষ্টা করলাম। মাঘের সূর্য তো। মৃদু অথচ নির্মল, কুয়াশা ঘেরা অথচ আদুরে কোমল। মনে হল, আমার দাদু পঙ্কজাক্ষ। দিদিমা বলতেন, খুবই সাধু পুরুষ ছিলেন। তাই তার গণনা ছিল নির্ভুল। ছোট মাসি জন্মাবার পর তাঁর কোষ্ঠিতে দেখেছিলেন নিজের মৃত্যুর পদধ্বনি। তাই মেয়ের নাম রেখেছিলেন নিয়তি। অবিশ্বাস্য হলেও ঘটেছিল সেটাই। তিনি নাকি এও বলেছিলেন, যে তাঁর যে মেয়ের ছেলে গলায় নাড়ি জড়ানো অবস্থায় জন্ম নেবে, সেই পুত্রই হবে তাঁর জন্মান্তর। দিদিমা তাই বড়মাসীর ছেলেকে একটু বেশিই স্নেহ করতেন। মায়ের নাম রেখেছিলেন ইলা, অর্থাৎ পৃথিবী।

বাবু মামা, যে আমাদের আমাদের মামার বাড়ির পাশেই থাকে, তাঁর বউ জন্ম থেকেই হাঁটতে পারেনা। ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে প্রায় সব কাজ করে । উঠোনে মাটির উনুনে চায়ের জল বসিয়েছে।

-কী রে বিপাশা, এসব তোর গবেষণার কাজে আসবে ? একটা জমাটি গল্পও পেলি না, তাই তো?

-পেয়েছি রে, পেয়েছি।

এই বলে বিপাশার সঙ্গে আমিও ফিরে গেলাম কালীতলায়।
গত রাত্রে পূর্ণিমায় কালী যতটা উজ্জ্বল ছিলেন, আজ যেন ঠিক উল্টো। বাসি ফুলের মতো নিস্তেজ। আবার সেই চারটি বছরের প্রতীক্ষা। মাঝখানে অজস্র দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। আমাদের এবার ফিরতে হবে। গত রাতের আনন্দের পরিশ্রম ভর করেছে চোখেমুখে। সমস্ত আবেগ বিসর্জনের অপেক্ষায়।

-কী পেলি, বললি না যে!

-আড়াল। এই আড়ালটুকুর টানেই বছরে একবার হলেও ফিরে আসি, দিন শেষে রাত্রি নামে, পূর্ণিমার বিপরীতে জেগে থাকে অমাবস্যা, জোয়ারের পরে ভাটা, জন্ম মৃত্যু। সেই আচ্ছাদনকে বাদ দিয়ে তো চলা যায় না। সব গল্পেই কি চমক থাকতে হবে, নাকি চমকে দিতে না পারলে গল্প জমবে না!

ফেরার পথে আমাদের চোখের সামনে থেকে ক্রমশ সরে যেতে থাকে ধানক্ষেত বাঁশ ঝাড়, দ্বারকা। বিসর্জনের ঢাকের আওয়াজ তবু পিছু ছাড়ে না। রাস্তার অচেনা কৃষকেরা একঝলক তাকিয়ে হেঁটে চলে যে যার কাজে।
আমাদের আর কোনো কিছু আড়ালে থাকে না। কয়েকটা টুকরো টুকরো এলোমেলো স্মৃতি জড়িয়ে যে চিত্র তৈরি হয় মনোজগতে তাকে ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না।

আমাদের সঙ্গে মা ও মেজো মাসী। মূল রাস্তায় যেতে যেতে একটা চপ মুড়ির দোকানে টোটো থামল। পথের ধারে বেঞ্চে বসে শালপাতার ঠোঙায় চপ মুড়ি খাওয়া হল। মেজো মাসীর ঘন ঘন চা ছাড়া চলে না। তাই হাল্কা করে আদা দিয়ে লিকার চা। মা মাসীর বাপের বাড়ি ছেড়ে আসার দুঃখ কিছুটা প্রশমিত হল।

বিপাশা ও আমি শুরু করলাম ফিরে আসার গল্প।

-এতদিন বাদে তাহলে ছাড়া পেলি, বল ?

বিপাশা পথের হাওয়ায় মুখের উপর উড়ে আসা চুলগুলো সরিয়ে কানের পাশে ক্লিপে আটকালো।

ছাড়া পাইনি রে, এই দ্যাখ না, ওদের জন্য মন কেমন করছে। কেবলই মনে হচ্ছে, ওরা দুজন এলে আমারই মতো উপভোগ করতে পারত এই আড়াল। অনেক সুখ সুবিধা আছে বুঝলি কিন্তু সবই একরকম। যত দূর যায় না কেন, ঘুরে ফিরে একই, এত বৈচিত্র্য কোথায় ?

বৈচিত্র্যই বটে! আমাদের টোটো চালকের মোবাইলটি ইতিমধ্যে ঘনঘন বেজে উঠছে। কিন্তু এতক্ষণ সে ধরছিল না। মেজো মাসী বললেন, ‘ওগো, ফোনটো ধরো ক্যানে !’

সে কান দিল না। উল্টে,চিৎকার করে বলতে লাগল, “খুব পয়সার লোভ, ডাল ভাতে চলবেনা গো মাসী, আরো চাই, আরো চাই। এখন ঠেলায় পড়ে পিরিত করতে আলছে। উওর বাপ মা আমাকে বুলে দিয়েছে, ঘরে যেন উ মেয়েকে আর না তুলি।”

তার রাগের চোটে টোটোর গতি বেশ বেড়ে গেল।
রাস্তার খানাখন্দ এতক্ষণ দিব্যি এড়িয়ে চলছিল, এখন সবকিছু অগ্রাহ্য করে বউয়ের ভয়ে ছুটছে।

মেজমাসী আর সহ্য করতে না পেরে ধমকে বলল, ” আস্তে আস্তে। “

এবার গতি কিছুটা মন্থর হল।

-মা, ওরে চেনা খুব কঠিন। যে মানুষ আড়াল করতে জানে না, সে আবার মানুষ নাকি ? কুনো লাজ নাই গো, আমার ছোট ছেলেটো মা মা করে দিনরাত হাহাকার করে, তাও ফেরেনি। কালী মায়েরও যেটুকুন লাজ আছে, উওর
নাই । “তা তুমি আবার বিয়ে করেছ নাকি ?” মেজো মাসী একটু বিরক্তির সুরেই জিজ্ঞাসা করল।

-না মা, একটো প্যাটের খরচ আমার বেঁচে যেইচে।

আমার মেজো মাসী এবার চালকের নাম ধাম জানতে চাইল। নাম তার শিবু, গ্রাম সোদর পাড়। এক কদম এগিয়ে জিজ্ঞেস করলে, “শ্বশুরবাড়ি কোথা ?”

-ওগো, আড়াল।
পরের প্রশ্ন হত, “কার বিটি ?”

কিন্তু সে প্রশ্নের আগেই আবার শিবুর মোবাইলে বেজে উঠল হরে কৃষ্ণ রাম রাম। শিবু যথারীতি ফোনটি কেটে হনহন করে এগোতে শুরু করল কিন্তু কোথা থেকে উড়ে এসে একটি বাইক তার পথ আটকালো। তারপর শুরু হল যুদ্ধ।

-কুথা পালাবি তু? আজ তুর একদিন তো আমার একদিন। কী ভেবেছিলি, আমি গতর খাটিয়ে তুর মদ খাবার পয়সা আনব। মুরোদ লাই, মরদগিরি ?

-ছামু থেকে পালা বলছি, মোর চেপে গেলে খুন করে দুবো।

-মার দেখি, মার, কোতো বড়ো বাপের বেটা আছিস দেখে লুবো। আমিও আড়াল গাঁয়ের বিটি বটি, আয় দেখি, খ্যামতা থাকলে ছামুতে আয়।

আড়াল গাঁয়ের বিটির হিম্মত দেখে আমরা তো মা মাসীর দিকে আবার চেয়ে দেখলাম, দেখে ভাবলাম, বাপরে এ গাঁয়ের বউ বিটিদের দম তো কম নয়। দিদিমার কথা মনে পড়ল। শুনেছি মায়েরও সাংঘাতিক জেদ ছিল লেখাপড়া শেখার। একবার নদী পেরিয়ে ইস্কুল যেতে গিয়ে মাঝনদীতে হাবুডুবু খেতে খেতেও বইকে মাথায় তুলে ভিজে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল। আর মেজো মাসী তো তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই দিদিমার লড়াইয়ের সঙ্গি। এরই মধ্যে দেখি যে বাইক ম্যানের সঙ্গে এই শিবু পত্নী উড়ে এসে শিবুর বুকে পা রাখলেন।

চিন্ময়ী পূর্ণিমা-কালী এভাবে ধরাধামে অবতীর্ণ হবেন, বিপাশা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবেনি। টোটো থেকে পথে নামলেন এবার মা, মাসী।

-কার মেয়ে তুমি ?

-বললে চিনবা নাকি ?

-বলেই একবার দ্যাখো ক্যানে ?

-খুদুর

-খুদুকে চিনব না আবার! তোর চেয়ে তোর বাবাকে আমি ভালো চিনি। হাত থেকে লাঠি নামা। শিবু, ওকে টোটোতে তোল। আমাদের নামিয়ে ওকে নিয়ে বাড়ি যাবি। এরপর কোনোরকম বেয়াদপির খবর পেলে কীভাবে তোদের শায়েস্তা করতে হবে আমার জানা আছে। জানবি, আমিও পঙ্কজ বানিজ্জের বিটি বটি, এ অঞ্চলের একশো লোক আমি এক মিনিটে জড়ো করার ক্ষমতা রাখি।

আমি ও বিপাশা হতবাক।

মাঘ মাসের নরম রোদ কুয়াশা ঠেলে আমাদের কোলের উপর বসেছে। টোটো চালক শিবু গুনগুন করে কিছু একটা গাইছে । সে সুর অচেনা হলেও আড়ালে আবডালে এখনও গেঁথে আছে ভালোবাসা।

আমরা ফিরে চলেছি যে যার গন্তব্যে।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
2 months ago

গল্পটা খুব মাটির কাছাকাছি।দেখার চোখ থাকলে কি গ্রাম,কি শহরের পরতে পরতে যে গল্প লুকিয়ে থাকে,তাকে আবিস্কার করা যায়।গল্পের শেষ লাইনটা বড় ভাল লাগল।

Ruchi Ghosh
Ruchi Ghosh
1 month ago

স্মৃতিচারণের অন্তরালে কী সুন্দর একটা গল্প পড়লাম। গ্রামের নামটা ভারী সুন্দর। সত্যিই আমাদের জীবনের ‘ আড়াল ‘ টুকু হারিয়ে গেছে।

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x