শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

অনুগল্প – তন্ত্রমন্ত্র ও শব্দ

১। তন্ত্রমন্ত্র

মাস্টারমশাই তাঁর সম্ভাব্য ছাত্রের নাম দেখে তার বাবার সাথে কথাবার্তা শুরু করতে একটু সময় নিলেন। দু চার কথা ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করলেন,
— ছেলের নাম রেখেছেন স্নায়ু? এই নাম হঠাৎ মাথায় এলো কেন? আপনার শুনতে অন্যরকম লাগলো, নাকি এর কোনো ইতিহাস আছে?
— একটা ব্যাপার আছে স্যার।
স্নায়ু তখনও জন্মায় নি। আমার মনটনের মতিগতি নিয়ে সমস্যা হচ্ছিলো খুব। ঘেঁটে থাকতাম, চটে থাকতাম। হাত পা কাঁপতো, এই একটা কথা বলছি, মন চলে গেলো আরেক জা’গায়। বন্ধুদের সাথে কথা বলে, ডাক্তার দেখিয়ে এসপার ওসপার করতে পারছিলাম না কিছুতেই। কেউ ঘুমকে দোষ দিচ্ছে, কেউ কাজের চাপকে দোষ দিচ্ছে, কেউ কাছে বসিয়ে আদর করে জিজ্ঞেস করছে ভালোবাসার তরফে কিছু হলো কিনা। যা হয়, সবারই তো সব বিষয়ে কিছু জ্ঞান থাকে। সেইসব চলছিলো।
এর মাঝে আমার এক মাস্টারমশাই, খারাপ ছাত্র হলেও কি কারণে জানি না খুব ভালোবাসেন আমায়, বললেন, তুই স্নায়ু বিশারদ দেখা।
চলে গেলাম, ওষুধ খেয়ে কথা বলে আস্তে আস্তে ঠিক হলো।
তারপর একদিন স্নায়ু এলো আমাদের জীবনে। নিজের অতীতকে মনে রাখতে ওর নাম দিলাম স্নায়ু। ওতো আমারই অংশ, ওর স্নায়ুর খেয়ালও তো রাখতে হবে আমাকেই। এই হলো স্যার নামের ইতিহাস।
— আপনি ঠিক করেছেন। আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তন্ত্র হলো স্নায়ুতন্ত্র। সেটা ঠিক রাখার মন্ত্র ও মন্ত্রী খুঁজতে সারা পৃথিবী এখন খুব তৎপর। তন্ত্র কি আপনি জানেন তো?
— খারাপ ছাত্র হলেও এটা জানি স্যার। আমার পাচনতন্ত্রের সমস্যা আছে।
— বাহ্! আমার খুব ভালো লেগেছে যে আপনি খুব গুরুত্ব দিয়ে আদর দিয়ে আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে আঁটোসাঁটো তত্ত্বাবধানে রেখেছেন।
— তাহলে স্যার। আপনি আমার স্নায়ুকে নেবেন তো?
— আপনার স্নায়ু লিখিত পরীক্ষায় ভালো করেছে। আপনি মৌখিক পরীক্ষায় ভালো করেছেন। আমি নিচ্ছি আপনার স্নায়ুকে। দেখি কতটা আদরযত্ন করা যায়। ভালো রাখা যায়।
— আমার স্যার মাস্টারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। নিশ্চিন্ত হলাম।
— এখন আসুন। অফিসে যান। যা কিছু আচরণবিধি আছে সেসব মিটিয়ে, টাকা জমা করে যাবেন। প্রয়োজনে দেখা করবেন।
বিনীত নমস্কার জানিয়ে উঠে এলেন মনুবাবু। স্নায়ু এসব কিছুই বোঝে না। নির্বিকার। বাবার হাত ধরে গুটগুট করে বেরোতে বেরোতে কি ভেবে পেছনে তাকিয়ে দেখে মাস্টারমশাই হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। সেও হাসলো। বাবা দেখেনি এইটুকু। সেও কিছু বলেনি বাবাকে।

২। শব্দ

সেই ভোর থেকে এসে গুটিসুটি মেরে ছোট্ট হয়ে ব’সে থাকে ভোদাই, আকাশের মায়া ছড়ানো, গাছের ছায়া ঘেরানো দীঘির পাশে।
মাধাই কাঠ কুড়োতে কুড়োতে দীঘির কাছাকাছি চলে আসে কোনোদিন। যেদিন-ই আসে, দেখে লোকটা বসে আছে।
একদিন কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— কি করতে আসো গো এখানে? যেদিনই আসি দেখতে পাই জলের দিকে তাকিয়ে বসে আছো।
ভোদাই বললো,
— জলে গাছের পাতা পড়ে, তার শব্দ শুনতে আসি।
মাধাই একটু চোখ কুঁচকে মুখের দিকে তাকিয়ে, তারপর হো হো ক’রে হেসে বললো,
— ধুৎ সে আবার শোনা যায় নাকি? ওসব আজগুবি ভাবো তুমি।

— ভাবনা নয় গো, সত্যিই। ওই যে গাছের ওপরে ওপরে পাখিগুলোকে দেখছো, তোমার অত জোরে হাসি শুনে কেমন চমকে উঠেছে…ওরা তো শুনতে পায় পাতা পড়ার শব্দ, আমি পাবো না কেন? ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জলে পাতা পড়লেই দেখে নেয়। বেলা পড়ুক, দেখতে পাবে তখন, এ-গাছ ও-গাছ থেকে উড়ে এসে একটা একটা ক’রে পাতা তুলে নিয়ে কোথায় যে রেখে আসতে যায়! পরিষ্কার ক’রে দেয় জল। আমি দেখি, ভাবতে শুরু করি কি ক’রে এমনটা হচ্ছে প্রতিদিন, কি ক’রে এই দীঘির ডাক শুনতে পায় পাখিরা!
তারপর মন এক ক’রে শুনতে শুনতে একদিন আমিও শুনতে পেলাম জলে পাতা পড়া। শুধু একটা পড়া, আর সামান্য এ-দোল ও-দোলের ছোটো ক’টা শব্দ… নানান পাতা নানান শব্দ… সেই থেকে রোজ শুনছি।
যেদিন অন্য কথা মনে পড়ে যায় হঠাৎ, সেদিন পাতা প’ড়ে যায়, শব্দ পাই না। আমি তো পাখি নই, হ’লে, চলতে খেলতেও শুনতে পেতাম।
— এখানে সারাদিন একা একা ব’সে এসব কথা ভাবো, খিদে পায় না তোমার?
— পায় তো। ওই দূরে দ্যাখো, ওই যে দো-চালার ছোট্টো বাড়িটা, ওখানে আমার বন্ধু আছে। ওরই বাড়ি। ও জানে কখন আমার খাওয়ার ডাক আসে। খাবার নিয়ে আসে।
— বা রে, বেশ বন্ধু তো তোমার।
— হ্যাঁ গো, ও যখনই আমার সামনে আসে কত আদর করে আমায়, চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা হেলিয়ে কতটা সময় বসে থাকে। আস্তে আস্তে নরম হয়ে আসে ওর হাসি, পশমের মতো তুলতুলে হয়ে যায় ওর ত্বক… তারপর আমি আবার পাতার দিকে মাথা ফেরালে পাশে একটু ব’সে থেকে চলে যায়। ওর অনেক কাজ থাকে তো। আবার সন্ধ্যেবেলা এসে আমার সাথে হাঁটতে বেরোয়…আমরা ওই সামনের জঙ্গল ঘুরে সাঁঝের আলো মাথায় ক’রে ঘরে ফিরি। পাখিগুলো সে কি কিচিরমিচির করে সে’সময়টায়, অত শব্দ করে তো, ওই জন্যে মনে হয় একদিন ওদের কথাবার্তায় পাতা রাখার জায়গাটা জানতে পারবো আমি। দাঁড়াও, ওই শব্দগুলো শিখে নিই একবার। বন্ধুই তো বলেছে, আমি পারবো। ও নিজেই শুনতে পায় অনেক। রাতে ঘরের পাশে মাঝেমাঝে হরিণ আসে লবণ খেতে, চলার শব্দ শুনে ও ব’লে দেয় একটা নাকি পোয়াতি হয়েছে; কতো দূর থেকে বহতা শুনে বলে দেয় চুনো মাছের ঝাঁক এসেছে নদীতে… এমন অনেক আছে।
আবার কেমন মজা দেখো, আমি প্রতিদিন সারাদিন এই জায়গাটায় ঘাসগুলোর ওপর বসে থাকি, কিছুই কষ্ট হয় না ওদের, পরদিন যেমন কে তেমন, মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বলে, এসো। কি সুখ নিয়ে যে আমি ওদের পাশে গিয়ে বসি আবার।
শব্দ শোনার কোনো শেষ নেই জানো। যে, যখন, শরীর মন এক ক’রে যে শব্দটা শুনতে চায়, ঠিক শুনতে পায় একদিন।
মাধাই চুপ ক’রে ভোদাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো, এবার উঠে দাঁড়িয়ে কাঠের গাঁটরি গোছগাছ ক’রে মাথায় তুলতে গিয়ে একটু থমকে দাঁড়িয়ে বললো,
— আমি মাঝে মাঝে এসে বসবো তোমার পাশে?
— হ্যাঁ গো, এসো, এতো তোমারও জায়গা। তবে, অত শব্দ করে হেসো না কিন্তু।
মাধাই আস্তে পা ফেলে দীঘির দিকে, গাছেদের দিকে, পাখিদের দিকে ভালো ক’রে দেখতে দেখতে হাঁটা লাগালো।
ভোদাই ভাবে, বন্ধুকে বলতে হবে, আজ একটা মানুষ এসেছিলো, আবার আসবে বলেছে।

[লেখকের অন্য রচনা]


Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
6 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Dwaipayan Goswami
Dwaipayan Goswami
2 months ago

খুব ভালো লাগলো

Anindya Sanyal
Anindya Sanyal
Reply to  Dwaipayan Goswami
2 months ago

ধন্যবাদ🙏🏼🌿

Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
1 month ago

অসাধারণ ভাল হয়েছে গল্পদুটি।দুটিরই বিষয় ও সমাপ্তি দারুণ।আরো ভাল হবার প্রত্যাশা রইল।

Anindya Sanyal
Anindya Sanyal
Reply to  Chandan Sen Gupta
1 month ago

ধন্যবাদ।🙏🏼🌿

Sulata
Sulata
1 month ago

অন্য ধরণের গল্প। বেশ লাগলো।

Anindya Sanyal
Anindya Sanyal
Reply to  Sulata
1 month ago

ধন্যবাদ।🙏🏼🌿

6
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x