
(প্রাককথনঃ মধ্য ইউরোপের আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত একটি ছোট বৈচিত্র্যময় দেশ স্লোভানিয়া। সেই দেশটির অকালপ্রয়াত তরুণ কবি স্রেচকো কোসোভেল, যিনি এক (১৯০৪-১৯২৬) গভীর অনুরাগে জড়িয়ে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতার সঙ্গে। তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন সেই স্থির আলোর শিখা যাকে আমরা প্রজ্ঞা বলি। দু’জনের পরিচয় হবার অবকাশ হয়নি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রতি নিবিড় অনুরাগ এই তরুণ কবির মননকে ভারতবর্ষের প্রতি অনুরাগে দীপ্ত করেছিল। এই পর্বে কবি কোসোভেলের তিরিশটি কবিতার বঙ্গানুবাদ শ্রী চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের কলমে। কবি স্রেচকো কোসোভেলের জীবন ও সাহিত্যে আলোকপাত প্রথম পর্বের রচনায়। সংযোগঃ এখানে ক্লিক করুন )
(১)
।। ভারতবর্ষের সবুজ শ্যামলিমায় ।।
ভারতবর্ষের শান্ত সবুজ বনানী
যেখানে বৃক্ষ আনত স্বচ্ছ নীল জলে –
সেখানেই বাস কবি রবীন্দ্রনাথের।
সময় সেখানে মন্ত্রমুগ্ধ, এক বলয়িত নীল,
ঘড়ি নির্দেশ করে না কোনো মাস কিংবা বছরের,
কিন্তু নৈঃশব্দের মধ্যে সে তরঙ্গময়
যেন উঠে আসে মন্দিরশীর্ষের ওপর অদৃশ্য
ঝর্ণাগুলি আর বৃক্ষচূড়াগুলি হতে।
সেখানে প্রয়াণ নেই, নেই চিরবিদায়ের বাণী –
শাশ্বতের মতো যেন জীবন, বিধৃত এক বৃক্ষে…
*

(২)
।। এক ধূসর সকালে ।।
এক ধূসর সকালে
আমি পথে পথে নগর ভ্রমণে,
কুয়াশা আমার জ্বলে যাওয়া চোখে কেটে বসে যাচ্ছে,
কেটে বসে যাচ্ছে আমার গলায়,
আর তুষার-শৈত্য আমার হৃদয়ের চারপাশে।
তখন, বেকারিগুলো হতে
গরম গরম রাই রুটির ঘ্রাণ,
কিন্তু, বেকারিগুলো তখনও আঁধারে,
রাস্তা শব্দহীন, আশেপাশে কেউ নেই
আর একটা চাপ আমার আত্মায় চেপে বসছে।
এটা উস্কে দিচ্ছে কার্স্টের স্মৃতি :
যে গ্ৰাম পাহাড়ে পাহাড়ে বিনুনির মতো জড়িয়ে,
এই কালো রুটি আমাকে মনে করিয়ে দেয় তাকে,
বেকারি থেকে উঠে আসা এই স্বাস্থ্যকর গন্ধ
যার ঘ্রাণ বড়ো বেশি আদরের মতো।
*
(৩)
।। সহজ ভাষা ।।
আমি ভালোবাসি আমাদের কার্স্টের মানুষের মুখের
সহজ সরল ভাষা, আমি যে ভালোবাসি ওদের,
আরো বেশি ভালোবাসি তোমাদের চেয়ে,
তোমরা যারা প্রমিত ভাষার বুর্জোয়া কবিকুল।
যেন আমি দেখতে পাচ্ছি এক জ্যোতির্ময় ভূখণ্ড
নিস্তব্ধ সবুজ উপত্যকার ওপরে,
যেন দেখতে পাচ্ছি সমস্ত পর্বতশ্রেণী
এবং পাইন গাছগুলি উপত্যকার ওপর থেকে তাকিয়ে দেখছে।
আমি ওদের ভালোবাসি, ওদের ঐ তীক্ষ্ণ নৈঃশব্দ,
যেন এক রুক্ষ হাত
আরো একবার ডাকছে
এই হারানো শিশুটিকে।
*
(৪)
।। জায়মান পাইন ।।
আমি সার সার পাইনকে বেড়ে উঠতে দেখেছিলাম
আকাশে। জ্বলন্ত সূর্যের ভিতর দিয়ে
শান্ত, সংযত।
আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আগুন,
যে গ্ৰাস করে নেবে তাদের।
একটা সাদা বালিশের ওপর বৃদ্ধ নর-পর্বত
মাথা রেখে শুয়ে আছে
এবং সমাহিত।
পাইনেরা মর্মরময়।
(কার সাথে তাদের কথা?)
আমি দেখছিলাম জ্বলন্ত স্তম্ভগুলিকে
তীর্থযাত্রায় – আকাশমার্গে …
আমার দেহ চূর্ণ-বিচূর্ণ, ছাই হয়ে গেছে।
*

(৫)
।। পাইনের সারি ।।
সারি সারি পাইন, পাইন, নীরব আতঙ্কের ভিতরে,
সারি সারি পাইন, পাইন, বোবা আতঙ্কের ভিতরে,
সারি সারি পাইন, পাইন, পাইন, পাইন!
সারি সারি পাইন, পাইন, কৃষ্ণবর্ণ পাইন
পর্বতের সান্ত্রীর মতো
ভারাক্রান্ত, অবসন্ন ফিসফিসানি তাদের
পাহাড়ী বনের ভিতরে দুলে যাচ্ছে।
যখন একটা ঝকঝকে রাত শৈল শিখরে
একটা পীড়িত আত্মা নতশির,
আমি শুনি চাপা স্বর
আর আমি ঘুমোতে পারি না।
‘স্বপ্নের ভিতরে নিঃশেষিত পাইনগুলি,
আমার ভাইয়েরা কি মৃত্যুর পথে,
আমার মা কি মৃত্যুর পথে,
আমার বাবা কি আমাকে ডাকছেন?’
উত্তর নেই,
শুধু মৃত স্বপ্নের
ঝলকানি,
যেন আমার মা মৃত্যুর পথে,
যেন আমার বাবা আমাকে ডাকছেন,
যেন আমার ভাইয়েরা সব পীড়িত।
*
(৬)
।। রুটি ।।
ঘরের নম্বর ২৪। পাঁচটি খাট ঘরে, পাঁচটি সাদা বিছানা।
গবাক্ষগুলির ভিতরে – অন্ধকার। বাইরে একটাই বাতি
আলোকিত করছে নির্জন রাস্তা। কার জন্য? কেন?
হয়তো একজন পথিক ফিরে দেখবে এবং অবাক হবে :
কোথায়? কিভাবে?
কিন্তু এসব তোমায় বলছি কেন? একটা ঘরে পাঁচজন আমরা,
পাঁচজন ছাত্র।
একজন যুবক, শ্যামবর্ণ বসনিয়ান – তার দৃষ্টি দূরে –
‘হেথা নয় হেথা নয় , অন্য কোথা অন্য কোনোখানে’
পড়ছেন পোয়েট টেগোর। দুজন স্লোভেনিয়ান
ঝুঁকে আছে টেবিলে পেতে রাখা
মেকানিকাল ড্রয়িং এর ওপর, তাদের চুল
উদ্বিগ্ন মুখের ওপর এসে পড়ছে।
পাঁচটি জীবন, আর, সবাই ঝুঁকে আলো টেনে নিচ্ছে
টেবিলের ওপরে থাকা সবুজ শেডের বাতি থেকে।
শান্ত। শুধু কলমের ঘসঘস আর কাগজের খসখস।
এখন রাত ১১ টা। ১১ টা আমার কাছে হোল্ডারের ‘বসন্ত’ চিত্রটি উপভোগ করার।
১১ টা বসনিয়ান ছেলেটির কাছে রবি ঠাকুর পড়া, তারপরে
দূরের পানে মেলে আঁখি যেন সে মগ্ন
শুভ্র গঙ্গাতীরে বসে।
১১টা তার কাছে রবীন্দ্রনাথ পড়ার সময়, আর ১১টা ওই দুজনের জন্য
‘ড্রয়িং’।
একটা চিন্তা, একটাই অসঙ্গতি : রুটি।
‘আমি ক্ষুধার্ত ‘।
সমস্ত পৃথিবীটাই চূর্ণ, মুখগুলিও ভাঙাচোরা।
সরলরেখা লুপ্ত।
বেঁকে চুরে গেছে আর অঙ্কের সব প্রমাণ শুধুই ধাঁধা।
রবীন্দ্রনাথ নিরুত্তর,
বসন্ত প্রতিরুদ্ধ।
একটা নতুন রহস্য সামনে : রুটি,
“রুটি”।
আমি নির্জন পথের দিকে চাই, যেখানে বাতিটা জ্বলছে, যেন
একটা চিন্তা শীতের কনকনে ঠান্ডায় কাঁপছে।
তারপরে আমি দেখলাম একটা মানুষ হেঁটে যাচ্ছে
সেই নির্জন রাস্তায়।
সে আলোটা নিভিয়ে দিল, কারণ এখন ইতিমধ্যেই রাত ১১টা।
একজন বাতিওয়ালা যে বাতি জ্বালে এবং নেভায়।
তার মন তীর্থগামীর বিপ্রতীপে।
*

(৭)
।। রাস্তার বাতি।।
তবে কেন মানুষ, যদি মানুষ হওয়া
এতই কঠিন? হয়ে যাও রাস্তার বাতি, যে
শান্তভাবে বিকীরণ করে তার আলো
মানুষের ‘পরে।
ঠিক যেমন, তেমনই থাকুক কারণ এই স্থিতাবস্থাতেই
সে পেয়ে যাবে এক চিরস্থায়ী মানুষের মুখ।
তার প্রতি সদয় হও, এই মানুষটি,
আর আলোকবাতির মতো পক্ষপাতহীন
যে শান্তভাবে আলোকিত করে
সেইসব মাতাল, ভবঘুরে আর ছাত্রদের মুখগুলি
নির্জন পথ ধরে।
একটা বাতি হও
যদি মানুষ হতে না পারো,
কারণ মানুষের মতো মানুষ হওয়া দুরূহ।
একটা মানুষের মাত্র দুটোই হাত থাকে
কিন্তু তার উচিত হাজার মানুষকে সাহায্য করা।
সুতরাং, রাস্তার বাতি হয়ে আলোকিত করো
হাজার সুখী মুখকে, আলোকিত করো
নিঃসঙ্গ এবং লক্ষ্যহীন যারা,
একক আলোর প্রদীপ হও,
একটা জাদুক্ষেত্রের মধ্যে মানুষ
সংকেত দিয়ে যাচ্ছে একটা সবুজ বাহু দিয়ে।
একটা বাতি হও, একটা বাতি,
একটা বাতি।
*
(৮)
।। প্রায় রাত দুপুর ।।
প্রায় রাত দুপুর।
মাছিরা কাপের ভিতরে মারা যাচ্ছে।
আগুন নিভে গেছে।
সুন্দরী ভিদা, স্মৃতিতে তোমার
তিক্ততার বাসা।
স্ট্র্যাভিনস্কি একটা গাড়ীর ভিতরে।
সমুদ্রের গর্জন।
প্রায় ৫ মিনিটের একাকীত্ব।
ট্রিস্টের হৃদয়ে অসুখ।
ঠিক এ কারণেই ট্রিস্ট্ এত সুন্দর।
বেদনা ফুলের মতো বিকশিত হয় সৌন্দর্যে।
*
(৯)
।। একটা ছোটো জামা ।।
আমি শব্দ দিয়ে বোনা
একটা ছোটো জামা পরে
হাঁটতে পছন্দ করি।
কিন্তু তার নীচে থাকতে হবে
একটা উষ্ণ উজ্জ্বল জগত।
সম্পদ কী?
বিলাসিতা কী?
আমার কাছে এগুলি হল :
একটা ছোটো জামা যা আমার আছে
এবং এ রকম জামা
যা আর দ্বিতীয়টি নেই।
*
(১০)
।। কনস ৫ – পাণ্ডুলিপির পাতা থেকে : ।।
গোবর সোনা আর সোনাই গোবর।
উভয় = 0
0 = ∞
∞ = 0
এ বি <
১,২,৩
যার আত্মা নেই
তার প্রয়োজন নেই সোনার
যার আত্মা আছে
তার প্রয়োজন নেই গোবরের।
ইই – আউ**
*
**(গাধার ডাক)
(১১)
।। কনস : কনস : কনস ।।
জ্যোৎস্না আইসক্রিম শীতল।
শূন্যগর্ভ যেন ত্রুবাদুরদের গান।
রাত্রির ছায়ার পাশে বসা ভারি মনোরম।
শৌচাগার, প্রস্রাবাগার। এখানে।
দরোজায় পিছনে লোকটি, কী চায় সে?
ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে সে
জ্যোৎস্নার স্বচ্ছ
দরোজার পিছনে।
প্রান্তরের বুকে চাঁদের আলো
জমাট দুঃখের মতো…
তোমার শরীর ঝলমল করে
আকীর্ণ চন্দ্রালোকে।
*

(১২)
।। কনস : এক্স ওয়াই ।।
একটা বিশাল হাতি আমার হৃদয় চেপে ধরে।
ক্লুডস্কির সার্কাস; প্রবেশ মূল্য – ৫ দিনার।
ছাদের ওপর থেকে নিজের দুঃখের ঢাক পিটিও না।
মেয়েটি হাসছে : রিন রিন রিন।
মনুষ্যহৃদয় বড় ছোটো আর জেলখানা অনেক বড়,
আমি মানুষের হৃদয়ের মধ্য দিয়েই যেতে চাই।
তুমি কোন পক্ষে : এদের না ওদের?
এক হাজার দিনার অথবা ৭ দিনের জেল।
আমার ভিতরের গোলাপ কখনোই কাঁদে না।
কেই বা যৌবনে মনমরা থাকতে চায়।
কী হবে যদি সশস্ত্র রক্ষী বেরিয়ে আসে ফটকের মধ্য দিয়ে?
সামরিক আদালত এবং তোমার বন্দীদশা।
ফুলগুলি নির্জন হও এই কঠিন সময়ে।
হে সশস্ত্র রক্ষী তোমার চোখ – যেন বর্শার ফলা,
নির্বোধ এবং নিষ্ঠুর ( পুষ্পগুচ্ছ, বন্ধ করে দাও আমাদের চোখগুলি!)
দীর্ঘ ছ’ বছরের জন্য গান্ধীজী কারারুদ্ধ ছিলেন।
*
(১৩)
।। কনস : জেড ।।
একটা বিষণ্ণ অ্যাকর্ডিয়ন।
সাঁতারের মরসুম।
নীলাভ বিদ্যুৎ।
জুতোর মাপ ৪০।
ইস্ত্রিয়া মরণোন্মুখ।
সমুদ্র।
ইওরোপ মুমূর্ষু।
খেলাধুলা, অর্থনীতি, রাজনীতি।
জাপান রাশিয়ার দ্বৈরথ।
নতুন সংস্কৃতি।
নতুন সংস্কৃতি : মানবতাবাদ।
নতুন রাজনীতি : মানবতাবাদ।
নতুন শিল্প : মানুষের জন্য।
ইওরোপের মৃত্যুলগ্ন আসন্ন।
সালফিউরিক অ্যাসিডে তাকে প্রলেপিত করো।
বিষাদের সময়।
একটা পর্দা খুলে দিচ্ছে একটা নতুন জগতের।
*
(১৪)
।। একটা আত্মঘাত দর্পণের সামনে ।।
একটা আত্মঘাত দর্পণের সামনে।
একটা ভীরু মন।
বাতাসের একটানা বিলাপ মসীকৃষ্ণ বনানী জুড়ে।
রাতের তীব্র ঝঞ্ঝা আমার বুক থেকে হৃদয়কে ছিন্ন করে।
আমার আত্মা, তুমি সেই ভৌতিক ভাসমান জাহাজ,
সর্বদাই ফিরে আসছে আদি অন্ধকারের বুকে,
উন্মত্ত ঝড়ে যে নেশাগ্ৰস্ত ঝিম মেরে থাকে!
একটা পুলিস বাজিয়ে চলেছে তার হুইশিল।
ঝড়ের সহোদর হওয়া অত্যন্ত ভীতিকর!
তেমনি ভীতিকর রূপো রূপো সূর্যের।
বিদীর্ণ পড়ে থাকো, নিহত হও , মন, মন রে আমার,
পরিত্রাণের জন্য পাহাড়ের মরা ঢালের দিকে তাকিও না।
আমি হেঁটে চলি বনের পথে। গাছের কাণ্ডগুলি কালো।
দুটো পরস্পর একে অপরের দিকে হেলে পড়েছে।
আমার মাথার ওপরে ব্রহ্মাণ্ডের করাল গহ্বর।
আমি তার ভিতরে ঝুঁকে পড়ছি
এবং শুনছি।
আমি হেঁটে চলি বনের পথে। গাছের কাণ্ডগুলি কালো।
দুটো পরস্পর একে অপরের দিকে হেলে পড়েছে।
আমার মাথার ওপরে ব্রহ্মাণ্ডের করাল গহ্বর।
আমি তার ভিতরে ঝুঁকে পড়ছি
এবং শুনছি।
*

(১৫)
।। আমাদের চোখ গুলি ।।
জ্বলন্ত লাভায় ভেসে যাচ্ছিল
আমাদের চোখগুলি।
আর সিমেন্ট টাওয়ারের
ধূসর ধূলিরাশি পুড়িয়ে দিচ্ছিল
আমাদের ঠোঁটগুলি।
পোড়া গাছগুলোর মতো
আমরা ঝুঁকে পড়েছিলাম
একটা নতুন দিনের দিকে।
*
(১৬)
।। একটি পিরামিডে ।।
শ্বেতপাথরের সমাধিস্থলে একটা শবের মতো।
মানুষের হৃদয়েই স্বর্ণমূদ্রা।
ছাই থেকে আমাদের চোখে জ্বালা ও যন্ত্রণা।
একটা বৈদ্যুতিক মোটর
আমার দাঁতের ওপর
ঘরঘর করে ঘুরে চলেছে।
পাহাড়ের গর্ভের আগুন জ্বলে যায়, জ্বলে যায়
জ্বলে যায়।
সুবর্ণ উৎপাদনের সামাজিকীকরণ।
বিবর্তনের শেষ।
সমাপ্তি, হে মানব!
হে মানব!
স্বর্ণহৃদয় নিয়ে মানুষ
দাঁড়িয়ে আছে
একটা শ্বেত পিরামিডের ওপর।
*
(১৭)
।। প্রলাপ ।।
শহীদত্ব বরণ চিন্তনসমূহের।
নীল সমুদ্র।
ধূসর গারদ।
একটা সৈনিক জানালার সামনে
তার বেয়োনেটের মুখে
শূলে চড়াচ্ছে
নৈরাশ্যময় ভাবনাগুলোকে।
ক্ষমা করো ‘ও শূন্যতা’।
সিগারেট।
আমিই এডিসন।
আমি শুনছি নীল সমুদ্রের
একঘেয়ে প্রহারের স্বর
আমার করোটির ভিতরে।
*
(১৮)
।। জানালার পাশে একটি মুখ ।।
আমি ভালোবাসি তোমাকে, ওই ধূসর মুখশ্রী
কফি হাউসের ছায়া ছায়া বাতায়নে –
ওই প্রত্যাশাভরা মুখ –
ভাঙা বর্শাগুলি, পালতোলা জাহাজ, আর
মাস্তুলের যুগে – হৃদয় তিরবিদ্ধ –
মেঘরঙা উদাসীনতা চোখগুলিতে,
তুমি জানতে : আলোর ঝর্ণাধারার মতো
এসব আকাশ থেকে
আমাদের ওপর উছলে পড়বে।
আমরা দেখতে পাবো ঢেউয়ে ঢেউয়ে
সবুজ সমুদ্রের দোলানি,
দেখতে পাব ভয়ঙ্কর ঘূর্ণাবর্তগুলি
আর নির্ভীক নাবিকেরা
মাস্তুলের ওপর উদ্বেগহীন।
*
(১৯)
।। কালো দেওয়ালগুলি ।।
আমার আত্মার ওপরে
কালো দেওয়ালগুলি ভেঙে পড়ছে।
মানুষেরা মুখ থুবড়ে
রাস্তার বাতির মতো নিবে গেছে।
একটা একচোখো মাছ
আঁধার কেটে সাঁতরে যায়,
কৃষ্ণচক্ষু।
মানুষ অন্ধকারের বুক চিরে
বের হয়ে আসছে।
*
(২০)
।। ছড়া ।।
ছন্দমিল ছড়া তার হারিয়েছে মানে।
শিশুতোষ ছড়া তার বিশ্বাসের জোর।
শুনতে কি পাও তুমি চক্রের ঘর্ঘর?
কাব্য, জেগে ওঠো, ব্যথার ঘর্ষণটানে।
ফাঁপা শব্দ নিয়ে কি করবেন মশাই?
জাদুঘরেই রাখুন তাকে বন্ধ করে।
আপনার শব্দে চাই ঘর্ষণ-তীক্ষ্ণতা
মানুষের হৃদয় যে জাপটিয়ে ধরে।
সবকিছু আজ যথারীতি অর্থহীন।
মালঞ্চসমূহে চৈতী জ্যোছনাবিলাশ,
আর মাঠে মাঠে, শুভ্র শ্যামল প্রান্তরে।
পিছলে যায় একটি ভবিষ্য আভাস।
*

(২১)
।। লাল রকেট ।।
— একটা লাল রকেট – আমি, নিজেকে জ্বালাই,
পুড়ে যাই, আর মিলিয়ে যাই নিঃশেষে।
— হ্যাঁ, আমার পরিচ্ছদ রক্তলাল!
— আমার হৃদয় রক্তলাল!
— আমার শিরায় শিরায় রক্তও লাল!
— আমি ক্লান্তিহীনভাবে পলায়মান, যেন
আমাকে একেলাই পৌঁছুতে হবে পরিপূর্ণতায়।
— আর আমি যত পালাই ততই পুড়ি।
— আর যত বেশি দহন যন্ত্রণা ততোধিক।
— আর যত যন্ত্রণা পাই, তত দ্রুত মিলিয়ে যাই।
— হায়, আমি, যে চেয়েছিল অনশ্বরতা। আর
আমি চলি, মাঠের সবুজে এক লাল মানুষ,
উর্ধ্বে, নৈঃশব্দের নীল হ্রদের ওপরে
লোহার মতো মেঘের স্তর, হায়, কিন্তু আমি চলি,
আমি চলি, একটা লাল মানুষ!
— নৈঃশব্দ সর্বব্যাপী : মাঠে-ক্ষেতে, আকাশে,
মেঘে, একমাত্র আমিই, যে পলায়মান,
অন্তর্গত লেলিহান আগুনে ঝলসিত, আর
কিছুতেই পৌঁছতে পারি না নৈঃশব্দে।
*
(২২)
।। একটি শরৎকালীন দৃশ্য ।।
সূর্য : শান্ত প্রতিমূর্তি শরতের
যেন শোকার্ত বিষাদ;
শীর্ণ ঝাউ গাছের পিছনে
কবরের শাদা দেওয়ালের পিছনে।
ঘাসেরা রক্তিম সূর্যালোকে।
তুমি কি গোঁড়ামির চটি গলিয়েছ পায়ে?
একটা পরিত্যক্ত বাইসাইকেল শরতের পথে।
তুমি একটা মুমূর্ষু ভূ-দৃশ্যের মধ্য দিয়ে চলেছ।
একজন রাশভারী মানুষ মাঠে হাঁটছেন,
শরতের মতো শীতল সে,
শরতের মতোই বিষণ্ণ।
মানবতাবাদে বিশ্বাস।
আমার কাছে এটা একটা পবিত্র চিন্তা।
শব্দহীন নৈঃশব্দ হল দুঃখের মতো।
আমি আর বিষাদগ্ৰস্ত নই
কারণ আমি নিজের কথা ভাবি না।
*

(২৩)
।। পাগলাগারদের ওপরে ।।
একটা পাগলাগারদের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে
একটা চাঁদে-পাওয়া চাঁদ।
বিষণ্ণ চিন্তায় মগ্ন একটা ছায়া-মানব হেঁটে বেড়াচ্ছে
একটা সাদা বাগানের চারপাশে।
যেন একটা ক্যালিডোস্কোপের ভিতরে
টাকা-পয়সা, শেয়ারগুচ্ছ রামধনু আগুনে
তার সামনে নাচতে নাচতে পুড়ে শেষ হচ্ছিল।
একটা পাগলাগারদের সাদা সার সার দেওয়ালের পিছনে
এক উন্মাদ চাঁদের সঙ্গে
এখন মুক্তমনে হেঁটে যাচ্ছে একজন প্রাক্তন ব্যাঙ্ককর্মী, যে নথিপত্রে বন্দী ছিল।
এই হচ্ছে স্বাধীনতা,
ভয়ঙ্কর স্বাধীনতা
যেখানে তুমি পা ফেলছ একটা অদৃশ্য প্রসারিত
মানুষী চেতনার দেওয়ালের পিছনে,
যা উন্মোচিত হচ্ছে
এক বৈভীষিক বিস্তারে।
*
(২৪)
।। ধ্বংস ।।
ও মিথ্যে, রাশি রাশি মিথ্যে, ইউরোপীয় মিথ্যে!
কেবল ধ্বংসই পারে তোমাকে বিনাশ করতে!
কেবল ধ্বংস।
এবং গীর্জাগুলি আর সংসদগুলি :
মিথ্যে, রাশি রাশি মিথ্যে, ইউরোপীয় মিথ্যে।
ধ্বংস, ধ্বংস!
সমস্ত ফারাওদের জাদুঘর,
সমস্ত শিল্পের সিংহাসনগুলি।
মিথ্যে, রাশি রাশি মিথ্যে, মিথ্যে।
ও হাজিয়া সোফিয়া, ও ক্যাথেড্রাল,
ও সারি সারি শব, যারা ইউরোপকে রক্ষা করবে।
ও শ্বেত-শুভ্র শবগুলি
যারা ইউরোপের প্রহরীর মতো।
ও মিথ্যে, রাশি রাশি মিথ্যে, মিথ্যে।
ধ্বংস, ধ্বংস, ধ্বংস!
লক্ষ, লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে,
কিন্তু ইউরোপের অবিরল সত্যের অপলাপ।
ধ্বংস। ধ্বংস। ধ্বংস!
*

(২৫)
।। স্পষ্ট ।।
অনশ্বরতা আমার হৃদয়ের অন্বিষ্ট:
মহাবিশৃঙ্খলতা থেকে মহাজাগতিকে।
জ্বলন্ত শিখায় উজ্জ্বল
অন্ধকার শহরগুলি,
জনগণ ধাবমান
নীরব নিবিড় তিমিরে,
নীরব নিবিড় তিমিরে।
আমরা যাই!
আমরা যাই!
মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই,
মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই,
শব্দহীন ক্রোধ বর্ধমান
আর আমরা বিলুপ্তির পথে।
আমি, তুমি , আমরা সবাই।
*
(২৬)
।। এ হে হে ।।
এ হে হে : লূবীয়ানার বাড়িঘরের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি,
আর তারা সূর্যের বিরুদ্ধে নিজেদের ঢেকে ফেলেছে ধূসরে।
তারা আমাদের ট্রিস্টের প্রিয় এডিনোস্ট** পুড়িয়ে ফেলছে।
যীশু জাতিসংঘের অফিসে গিয়েছিলেন।
না, কোনো সুকুমার এবং সুপুরুষ মানুষের মুখ
ভালোবাসার জ্যোতিতে উদ্ভাসিত ছিল না।
একজন ছদ্ম যীশু ছিল জেনেভায়।
তুমি কি বলবে জেনেভাতেও তুমুল বৃষ্টি?
যীশু বাদামী বিদ্রোহীদের মধ্যে গিয়েছিলেন,
সেখানে তিনি ধূসর পথের ওপর দাঁড়িয়ে
সমস্ত শাস্ত্র এবং ফরীশী নিষিদ্ধ করছেন।
তিনি গুলি করছেন এবং হত্যা করছেন।
গুলি করছেন এবং হত্যা করছেন।
ওহে, তুমি ভেড়ুয়া, শ্বেতকায় জাতি!
এখন কি তুমি নিজেকে দেখবে আসলে তুমি কী?
*
** Edinost ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ট্রিস্টের একমাত্র সংবাদপত্র। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে ইটালির ফ্যাসিস্ট আগ্ৰাসনের বিরোধিতা করায় মুসোলিনির রোষে পড়ে এবং ১৯২৮ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্লোভেনিয়ার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত পত্রিকাটি পরে অবশ্য পরিবর্তিত বিন্যাসে আন্তঃধর্মীয় এবং গবেষণামূলক বিষয়ে স্লোভেনিয়ান এবং ইংরেজি ভাষায় চালু হয়।
(২৭)
।। লবণ ।।
একটা রাজনৈতিক প্ররোচনা অনুসারেই
তাদের জিজ্ঞাসাবাদ।
“আমরা আইসল্যান্ড থেকে” –
এই ছিল তাদের উত্তর।
একজন আধুনিক কবি সতর্ক করেছিলেন
পতন আসন্ন।
ওরা ছিল লবণাক্ত,
ছিল সারা সপ্তাহজুড়ে একটা পিপের মধ্যে
এবং তাদের পচন।
*
(২৮)
।। হেরিং মাছগুলি ।।
এক পিপে হেরিং মাছ
লূবীয়ানায় এসেছিল।
তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে
প্রশ্ন করা হয়েছিল:
তাদের ব্যাখ্যা :
তারা আইসল্যান্ডের।
একজন আধুনিক কবির
পতন সম্পর্কে সতর্কীকরণ।
একটা পিপেতে হেরিং গুলিকে
সপ্তাহভর রাখা হয়েছিল
আর তারা পচতে শুরু করল।
*
(২৯)
।। অবিচ্ছেদ্য ।।
ঘূর্ণায়মান সন্ধ্যা।
সবুজ জলাশয়কে ঘিরে গাছপালা।
আত্মার আবর্তন।
আমার আত্মার রঙ লাল।
আমি ভালোবাসি আমার দুঃখকে।
আমার সকল কাজ দুঃখ থেকে।
আরো বেশি, আরো, আরো বেশি
অন্তরতম অনুভূতি হতে।
অন্তরতম অনুভূতি হতে
এ সব ,সব বৃথা।
মুনাফাবাজেরা উত্তাল
কঁকঁ নৃত্যে।
*

(৩০)
।। একটিমাত্র শব্দ ।।
আমি যদি বলতে পারতাম একটিমাত্র শব্দ
ঠিক যেমন ফাগুন হাওয়া তোমার হৃদয়ে
ধীরে ধীরে প্রবেশ করে।
আমি যদি বলতে পারতাম একটিমাত্র শব্দ।
কিন্তু দ্যাখো, আমার আর কিছুই নেই,
আমার হৃদয় সেই বেদির মতো যে দ্বিখণ্ডিত।
আমার শব্দগুলি ক্ষতের মতো
যাদের প্রত্যেকটি থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ে।
স্বপ্নেরা অন্ধকারে ঝাঁপ দেয় না,
কেবল কালো দেওয়ালের খোঁচাওয়ালা ধারগুলি
পুরনো স্মৃতির মতো নিঝুম রাতের
আতঙ্কের ভিতরে জেগে ওঠে।
তবুও রয়েছে এখনও, তবুও এখনও
একটিমাত্র শব্দ – অন্তত একটিমাত্র শব্দ!
এসো, তুমি নিশীথাহত হতভাগা,
যাতে আমি তোমার হৃদয়কে চুম্বন করতে পারি।
*

তথ্যসূত্র :
১) THE WORLDS OF RABINDRANATH TAGORE AND SRECKO KOSOVEL’ by ANA JELNIKAR.
২) LOOK BACK. LOOK AHEAD – Selected Poems Of Srecko Kosovel – translated by Ana Jelnikar and Barbara Siegel Carlson.
৩) রবিজীবন (১) – বিজন ঘোষাল।
৪) অন্তর্জাল তথ্যভান্ডার।


Asadharon anubad, ak onyo rakom lekha ja bar bar porte ichhe kore. Kobi ke tar kobita o anubadok ke tar anubader jonyo onek onek kritowota.
শ্রীচন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের প্রজ্ঞা সত্যি বিস্ময়প্রকাশ করছি। 🙏
স্রেকো কোসোভেলের একগুচ্ছ কবিতা অনুবাদ করা কবিকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন জানাই। এক রকমের অসাধ্য সাধন করেছেন কবি। রবি চক্রের ডিজিটাল পোর্টালে এই কাজ আগামী দিনে অনেক পাঠকের কাছে নতুনভাবে প্রেরণা দেবে।
স্রেচকো কোসোভেল হবে
Imagery,nostalgia। এবং দুঃখবোধ kosovel এর কাব্যগুচ্ছে যে ভাবে বাঙ্ময় তাকে ভাষান্তর করা এক দুঃসাধ্য প্রচেষ্টা।চন্দ্রনাথ বাবু অকালপ্রয়াত যুব কবির অন্তর্লীন বেদনার্ত অনুভূতিকে সসম্মানে উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন।আমি সবিস্ময়ে কবির গভীর রবীন্দ্র প্রেম 1, ও 6,no কবিতা পড়ে বুঝলাম ভারতের সবুজ ,নিবিড় বনানী তথা গাঢ় নীল গাঙ্গেয় অববাহিকায় ,নৈশব্দের সময় নিরপেক্ষ অতলান্তিক গভীরতায় তিনি কবিকে অনুভব করছেন,আর এইভাবেই বসনিয়ান ছাত্রটি রাত 11টায় 5জন ছাত্রের ঠাসাঠাসি ভিড়ের মধ্যে একান্তে মানস চক্ষে গাঙ্গেয় পটভূমিতে রবি কবিকে অনুভব করছেন। আর একটি কবিতায় kosovel তাঁর ফেলে আসা গ্রাম karst কে ভুলতে পারেননা ।এই অতীত চারনা রোমান্টিক কবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।যাহোক ,অনেক কবিতা থেকে গেলো যার প্রকৃত মূল্যায়ন করা এই মুহূর্তে সম্ভব হলোনা ।দুঃখিত।
অসাধারণ লেখনী।
চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য মশাইয়ের কোসোভেলের কবিতার অনুবাদ আপনি যত্ন নিয়ে পড়েছেন ও মন্তব্য করেছেন। আপনার মতো তন্নিষ্ঠ পাঠকের কাছ থেকে পাওয়া এই মন্তব্য আমাদের প্রাণিত করছে।
কবি স্রেচকো কোসোবেল , যিনি তেমনভাবে প্রচারের আলো পাননি , তাঁর নিরন্তর অনুভবি মনের রসে জারিত কবিতা গুলি সুনিপুণ ও আন্তরিক ভাবে আমাদের সামনে এনে হাজির করেছেন শ্রী চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর অসামান্য অনুবাদের মধ্যে দিয়ে । বলতে গেলে , তাঁর চোখ দিয়েই এই প্রতিভাবান কবিকে জানা । তিনি সুন্দর , সঠিক ভাবে অনুবাদ করেছেন বলেই জানতে পেরেছি রবীন্দ্রনাথ এর কতোটা প্রভাব ছিল কবি র উপর । অনুবাদকের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা রইল ।