
২০১১ সাল – রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবর্ষ। দেশে-বিদেশে কবির সৃষ্টিকে নিয়ে সমসময়ের কষ্টিপাথরে বিচার করার একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হচ্ছিল একধরণের নতুন উন্মাদনা । এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজটি করছিলেন সদ্য প্রয়াত বিশ্বখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক শ্রদ্ধেয় উইলিয়াম রাদিচে। তাঁকে সার্থক ভাবে প্ররোচিত করতে পেরেছিলেন Penguin India, Delhi-র উদয়ন মিত্র। ২০১১,১২,১৩ পরপর তিনটি উল্লেখযোগ্য বছর সামনে। কবির সার্ধশত জন্মবার্ষিকী (২০১১), ‘Song Offerings’ (ইং গীতাঞ্জলি) প্রকাশনার শতবর্ষ (২০১২) এবং কবির নোবেল প্রাপ্তিরও শতবর্ষ (২০১৩)। ২০১১ সালের শেষে আমরা পেলাম ‘Gitanjali RABINDRANATH TAGORE/ Translated by WILLIAM RADICE । আশ্চর্য সে বই। বইটা খুলতেই উৎসর্গ পৃষ্ঠার পরে যাকে বলা হয় Epilogue সেই পাতাতে চোখ গেল আটকে। প্রতিটি শব্দ থেকে ছড়িয়ে পড়ছিল হীরককণার দ্যুতি :
“In green India among quiet
trees that bend over blue water
lives Tagore…”
‘In Green India ‘, in Look Back, Look Ahead : The Selected Poems of Srecko Kosovel, translated by Ana Jelnikar and Barbara Siegel Carlson
স্রেচকো কোসোভেল! স্বীকার করতে এতটুকু দ্বিধা নেই যে এই কবির নাম এর আগে আমি কোথাও শুনিনি, কবিতা পড়া তো দূর অস্ত। কোন্ দেশের কবি তাও জানি না, শুনে বড়ো জোর শ্লাভ দেশীয় বলে মনে হচ্ছে। যা হোক, হাতের কাছে তেমন কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য তখন পেলাম না, কিন্তু ওই তিনটি লাইন একেবারে সোজাসুজি হৃদয়ে অনির্বাণ দীপের মতো জেগে রইল। তখনকার মতো রাদিচেতেই মগ্ন হয়ে রইলাম। কী অসাধারণ অধ্যাবসায়, কী গভীরসঞ্চারী! গবেষণামূলক পর্যবেক্ষণ বাদ দিলেও রবীন্দ্রঅনুদিত গদ্য আঙ্গিকে প্রকাশিত ‘Song Offerings’ এর কবিতাগুলিকে তিনি চাইলেন অনুবাদেও যেন থাকে সেই আস্বাদ যা মূল কবিতার বৈশিষ্ট্য : গীতিময়তা, ব্যঞ্জনাধর্মী চিত্রকল্প, ছন্দের বৈচিত্র্যময়তা এবং গভীর মন্ময়তা। সে ছিল এক অক্লান্ত প্রয়াস – যা তপস্যাকঠিন রাদিচের পক্ষেই হয়তো সম্ভব ছিল। উদ্দেশ্য পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথের কবিতার মূল আঙ্গিক এবং বিষয়ের সম্মোহিত রূপের সঙ্গে পরিচয় করানো। এর আগে ১৯৯৮ সালে প্রখ্যাত কবি এবং অনুবাদক জো উইন্টার গীতাঞ্জলির অপূর্ব মূলানুগ অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অনুবাদ ছিল text নির্ভর সেখানে রাদিচে অনুবাদের সময় গ্ৰহণ করেন বিশেষ করে গানের ক্ষেত্রে পঙক্তির পুনরাবৃত্তি যা আসলে কবিতার সাংগীতিক আঙ্গিক যাতে গীতাঞ্জলির গীতল ছন্দ, গূঢ় অর্থ এবং ভাবাবেগ পাঠকের হৃদয়ে দ্রুত সঞ্চালিত হতে পারে।
যা হোক ফেরা যাক মূল বিষয়ে।

প্রখ্যাত স্লোভেনিয়ান গবেষক Ana Jelnikar সেই সময় অর্থাৎ ২০১১-১২ সালে The Indian Council for Cultural Relations Tagore Fellowship পান এবং রবীন্দ্রনাথ এবং কোসোভেলের ওপর তাঁর গবেষণাকে পূর্ণতার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হন এবং তার পূর্ণাঙ্গ ফসল আমরা পাই ২০১৬ তে OXFORD University Press থেকে প্রকাশিত বইতে ‘THE WORLDS OF RABINDRANATH TAGORE AND SRECKO KOSOVEL’ । সৌভাগ্যবশত তখন তিনি সদ্য প্রয়াত কবি, অনুবাদক ও গবেষক William Radice-র অধীনে School of Oriental and African Studies (SOAS) থেকে এই বিষয়ের ওপর PhD করছিলেন।
ঠিক ১০০ বছর আগে যখন স্রেচকো কোসোভেল মাত্র ২২ বছর বয়সে মেনিনজাইটিসে মারা যান, তখন তাঁর প্রকাশিত কবিতার সংখ্যা খুব বেশি হলে ৪০টি । মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয় তাঁর ১০০০ এর মতো অপ্রকাশিত কবিতা, প্রবন্ধ এবং literary notes । আজ কোসোভেল স্লোভেনিয়ার একজন অবশ্যমান্য কবি এবং একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ Avant Guarde আন্দোলনের অগ্ৰদূত।
এই প্রসঙ্গে আমাদের কিশোর কবি অকালপ্রয়াত সুকান্ত ভট্টাচার্যের নাম মনে না করে উপায় নেই। সুকান্তও মারা যান ২১ বছর বয়সে, আর অদ্ভুত সমাপতন কোসোভেল যে বছর মারা যান, সেই বছরই জন্মগ্ৰহণ করেন আমাদের কিশোর কবি ১৯২৬ সালে। সে অর্থে এ বছর একজনের মৃত্যু শতবার্ষিকী আর অন্যজনের জন্ম শতবার্ষিকী।
যদিও কোসোভেলের বিপুল সৃষ্টি এবং উত্তর প্রজন্মের কাছে তার প্রভাবের তুলনায় আমাদের কবিকে কিছুটা কৃশকায় বলে মনে হতে পারে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার সংখ্যা শ’ দেড়েকের কাছাকাছি এবং একটি আধুনিক বাংলা কবি এবং কবিতার ছন্দ নিয়ে প্রবন্ধ, গোটা কয়েক গল্প আর কয়েকটি চিঠি – এই আমাদের উত্তরাধিকার। তবে দুজনেই সমাজ প্রগতির ক্ষেত্রে, বিপ্লবী চিন্তা ভাবনায়, এবং সমস্ত রকম সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থানের জায়গায় একেবারে পরষ্পর পরষ্পরের পরিপূরক, যেন একজন যাবার আগে তাঁর হাতের ব্যাটনটি আরেক যোগ্য জনের হাতে তুলে দিয়ে গেলেন।
সে ক্ষেত্রে ২০২৬ সালটি কবিতায় দীক্ষিত পাঠকের কাছে একটি অত্যন্ত স্মরণীয় বছর, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

১৯০৪ সালে ট্রিস্ট শহর থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে ছোট্ট শহর সেজানায় কোসোভেলের জন্ম। পাঁচ ভাইবোনের সর্ব কনিষ্ঠ। পরিবারটি সুপ্রতিষ্ঠিত, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পুষ্ট। বাবা ইস্কুলের হেড মাস্টার। অঞ্চলটি তখন অস্ট্রো- হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। স্বাধীন স্লোভেনিয় সংস্কৃতির প্রবক্তা হিসেবে শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থানের জন্য তাঁদের সেজানা ছেড়ে প্রথমে প্লিসকোভিয়া পরে সেখান থেকে স্লোভেনিয়ার কার্স্ট অঞ্চলের তোমাজে চলে যেতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে ইটালির অধীনে বর্তমান স্লোভেনিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল চলে যায় এবং নব্য প্রতিষ্ঠিত সার্ব, ক্রোয়েট এবং স্লোভেনীয় রাজ্যে যোগদান করে। ১৯২০ সালে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট বাহিনী স্লাভ সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল নারোদনি ডোম (জাতীয় ভবন) পুড়িয়ে দেয়। ১৯২৪-২৭ পর্বে ৫০০ অধিক স্লোভেনিয় ও ক্রোয়েশিয় প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ইটালি ভাষায় রূপান্তরিত করা হয়। কৈশোরে প্রথম মহাযুদ্ধ এবং কৈশোরোত্তীর্ণকালে জন্মভূমি এবং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর বিদেশীয় আক্রমণ কোসোভেলকে অস্তিত্ব সম্বন্ধে সূক্ষ্ম সংবেদনশীল করে তোলে যা তাঁর লেখায় ক্রমশ বিভিন্ন আঙ্গিকে সংশ্লেষিত হয়ে ওঠে যা আজ স্লোভেনিয়ান ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। স্রেচকো কোসোভেল (Srečko Kosovel, 1904-1926) তার সংক্ষিপ্ত জীবনে (মাত্র ২২ বছর) কবিতা, প্রবন্ধ এবং সংলাপে এক বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার রেখে গেছেন। তাঁর কবিতা এবং কাব্যশৈলী একইসঙ্গে সমসাময়িক প্রায় সবকটি প্রধান ধারার সংশ্লেষণে তৈরি : Impressionism, post-impressionism, Expressionism, Symbolism , Dadaism, Surrealism, এবং রাশিয়ান Constructivism। বেশ কিছু কবিতা Kons নামে তিনি উল্লেখ করেছিলেন।

কবিতায় স্লোভেনীয় কার্স্ট (Karst) অঞ্চলের প্রকৃতি, মানুষের অস্তিত্বের সংকট, যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং ইউরোপের ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতির প্রতি ক্ষোভ ফুটে উঠেছে। শুরুতে রোমান্টিক এবং lyrical থাকলেও পরে তিনি Constructivism-এর দিকে ঝুঁকে পড়েন, যেখানে তিনি প্রথাগত syntax বা ব্যাকরণ ভেঙে, টাইপোগ্রাফি এবং mathematical symbol ব্যবহার করতেন। তাঁর মরণোত্তর কাব্যগ্রন্থ Integrals ’26 অত্যন্ত বিখ্যাত যেখানে মৃত্যু, বেদনা এবং একই সাথে নতুন আশার (new dawn) প্রতিফলন দেখা যায় এ ছাড়াও মানুষ, প্রকৃতি এবং যন্ত্রের এক অনন্য সংমিশ্রণ দেখা যায় বিশেষ করে কার্স্ট অঞ্চলের রুক্ষ প্রকৃতি তাঁর কাব্যের অন্যতম প্রধান মোটিফ। প্রাক-ইন্টিগ্রালস কবিতায় পাখির ব্যবহার খুব বেশি, যা প্রায়শই কবির নিজের আত্মা বা স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ফুটে ওঠে।
আধুনিক যুগের প্রতীক হিসেবে তিনি ট্রেন, গাড়ি, ট্রাম, এবং বিমানের মতো আধুনিক যান্ত্রিক উপাদানের ছবি ব্যবহার করেছেন। স্লোভেনীয় লোককথা থেকে অনুপ্রাণিত ‘Lepa Vida’ বা ‘সুন্দরী ভিদা’র প্রতীকটি তাঁর কবিতায় দীর্ঘ আকাঙ্খা ও নির্জনতার প্রতীক হিসেবে এসেছে।

১৯২০-এর দশকে ইউরোপে যখন রবীন্দ্রনাথের ব্যাপক জনপ্রিয়তা, তখন কোসোভেল তাঁর লেখার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। কোসোভেল তাঁর সংগৃহীত রচনায় (collected works) রবীন্দ্রনাথকে পঞ্চাশ বারেরও বেশি উল্লেখ করেছেন, যা লিও টলস্টয় (৩০) বা রোমাঁ রোলাঁর (১৫) চেয়েও বেশি। কোসোভেল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে “In Green India” নামক একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা লিখেছিলেন, যেখানে তিনি শান্ত গাছপালা এবং নীল জলের মধ্যে কবিকে কল্পনা করেছেন :
‘Time there is spellbound, a cerulean circle,
the clock tells neither month nor year
but ripples in silence
as if from invisible springs
over ridges of temples and hills of trees –
There nobody’s dying, nobody’s saying
goodbye – life is like eternity, caught in a tree…
[In Green India ‘ translated by Ana Jelnikar and Barbara Siegel Carlson]

যার অবিস্মরণীয় তিনটি পঙক্তি রাদিচে ব্যবহার করেছিলেন তাঁর গীতাঞ্জলি বইয়ের মুখবন্ধে। শুরুতেই তার উল্লেখ করেছি কোসোভেল রবীন্দ্রনাথ দ্বারা এতটাই প্রভাবিত ছিলেন যে 20 December 1924 ‘Karmela’কে চিঠিতে লিখছেন :
”Again, I want to understand Tagore who is full of simple greatness, who is a child and a human being” কিংবা সমসাময়িক নারী কবি ‘ Maksa Samsa’কে 19 August, 1925 :
“Read Tagore’s poems and study them! There you will learn about the mighty simplicity of the word such as you may find in the Gospels. There you will intuit the depth of the tiniest phenomenon in man and nature which are one.”
আবার একই বন্ধুকে কয়েক সপ্তাহ পরে 7 September, 1925 লিখছেন :
“I am glad you are reading Tagore’s ‘Gardener’. In those seemingly so simple lines there is all of life’s greatness. That is what it means to be simply great. That is what it means to plunge into the depth of meaning, into truth. That is what it means to be simple, but not banal …”
কোসোভেলের কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সেই স্থির আলোর শিখা যাকে আমরা প্রজ্ঞা বলি, এবং যার জন্য সমসাময়িক ইউরোপের কাতরতা ধরা পড়ে T.S. Eliot এর বিখ্যাত CHORUSES FROM ‘THE ROCK’ কবিতায় : ” Where is the wisdom we have lost in knowledge?” যে আলোর সাহায্যে যুগের গভীরতম সাংস্কৃতিক এবং বৌদ্ধিক প্রশ্ন এবং উদ্বেগ যা জাতীয়তাবাদ, বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত বিপ্লব, প্রকৃতিবাদ থেকে নারীবাদ সমস্ত বিষয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যের অভিমুখে উত্তরণে পৌঁছানো যায়। কিভাবে কোসোভেল রবীন্দ্রনাথ থেকে নিজেকে ঋদ্ধ করে নিয়েছেন তার দু একটি নমুনা :
Song Offerings ( গীতাঞ্জলি )এ ১২ নম্বর রবীন্দ্রনাথের অনুদিত কবিতায়:
“The traveller has to knock on every alien door to come to his own, and one has to wander through all the outer worlds to teach the innermost shrine at the end.”
কোসোভেল তাঁর ‘If You Can’t Speak’ কবিতায় লিখছিলেন:
‘You have to wade through a sea
of words to come
to yourself. Then alone,
forgetting all speech,
go back to the world.”
একই কবিতায় তিনি আরো লিখেছেন:
“He finds a new word;
Today, it’s not clear
what your word is.”
রবীন্দ্রনাথও একই কবিতায় লিখেছিলেন:
“It is the most distant course that comes nearest to thyself and that training is the most intricate which leads to the utter simplicity of a tune.”
এছাড়াও ‘Bread’ কবিতাতেও রবীন্দ্রনাথের উল্লেখে ফুটিয়ে তুলেছেন। স্বপ্ন এবং বাস্তবের দ্বন্দ্বকে অসাধারণ মুন্সিয়ানায়। যদিও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আদ্যন্ত রোম্যান্টিক ঘরানার কবি এবং কোসোভেলের কবিতা বিষয় এবং আঙ্গিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিকতাকে পুরোপুরি আত্মসাৎ করে একেবারে কবিতার অন্য ভুবন গড়ে তুলেছেন যার অবস্থান রোম্যান্টিক কবিতা ভাবনার একেবারে বিপরীত মেরুতে, তা সত্ত্বেও তিনি রবীন্দ্রনাথ থেকে পেয়েছিলেন তাঁর কাঙ্খিত সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ বিরোধী এক সর্বজনীন বিশ্ববোধ।

তাঁর ‘The Spherical Mirror’ কবিতায় কোসোভেল একটি লাইনে লিখবেন :
“Nationalism is a lie.” যেন রবীন্দ্রনাথের ‘Nationalism’ এর প্রতিধ্বনি ‘Nationalism is a great menace’। উভয়ের লেখার মধ্যেই রয়েছে বিশ্বমানবতার সুর, রয়েছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার সোচ্চার প্রতিবাদ। মুসোলিনির অধীনে ফ্যাসিস্ট ইটালির আগ্ৰাসী আক্রমণ এবং স্লোভেনীয় ভূমি দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কোসোভেলকে প্রাণের ভয়ে বারবার স্থানান্তরিত হতে হয়েছিল। ১৯১৮ সালে ইটালির অধীনে বর্তমান স্লোভেনিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল চলে যাবার পর কোসোভেল তাঁর 1925-26 এর’ Social breakdown and the collapse of art’ এ লিখেছিলেন : ” Our destiny was decided by foreigners and not by ourselves” । তিনি জানতেন উপনিবেশিত মানুষের বেদনা এবং সে কারণেই রবীন্দ্রনাথের ‘জাতীয়তাবাদ’ (Nationalism) বিরোধী মতাদর্শের সাথে একাত্মতা বোধ করতেন। দুজনেই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাবাদ ও বিশ্বজনীন ভালোবাসার কথা বলেছিলেন। পড়ে ফেলেছিলেন রবীন্দ্রনাথের স্লাভ ভাষায় এবং জার্মান ভাষায় প্রকাশিত তৎকালীন সমস্ত অনুবাদ গ্ৰন্থ, এবং বিশেষ করে ‘Nationalism’ ‘Personality’, এবং ‘Sadhana’র প্রবন্ধাবলী। ভাগ্যের পরিহাস রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর ইউরোপ যাত্রাকালে ১৯২৬ এর ১৩ নভেম্বর ক্রোয়েশিয়ায় Zagreb শহরে দুটি বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রিত হয়ে পৌছোন, তার কয়েকমাস আগেই কোসোভেল মাত্র ২২ বছর বয়সে মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে ধরাধাম ত্যাগ করেন। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কোসোভেলের নাম ঘনিষ্ঠভাবে জানার কোনো সম্ভাবনা ছিল না কারণ কোসোভেল তখন নেহাতই এক অজ্ঞাতপরিচয় কবি। কোসোভেলের সাহিত্য কীর্তি প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর প্রায় চার দশক বাদে। এ ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে আমাদের Avant-Garde কবিতার যিনি অগ্ৰদূত সেই জীবনানন্দ দাশের বেশ মিল আছে। দু জনেই নিজ নিজ ভাষায় আধুনিকতার প্রকৃত মুখ হয়ে ওঠেন এবং যাবতীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন মরণোত্তর কালে। ১৯২৫ সালে, মৃত্যুর কিছু আগে, কোসোভেল তাঁর একটি কবিতার পাণ্ডুলিপির নাম দিয়েছিলেন ‘Zlati čoln’ (সোনার তরী), যা সরাসরি রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রতি একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি। কোসোভেল রবীন্দ্রনাথের লেখায় এমন এক ধরণের সহজতা এবং আধ্যাত্মিকতা খুঁজে পেয়েছিলেন, যা তাকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপে নতুন আশার আলো দেখিয়েছিল। “Tagore is someone who has shown an escape route from the cities of Europe across the grey rooftops, a path for the soul to eternity. [ Cosovel, ‘Journal VIII’,1925, CW 3, p. 657]
সোভিয়েত পরীক্ষার অন্ধভক্ত না হয়েও তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী রাজনীতি এবং নীতিশাস্ত্রের আরও জটিল, বিশ্বব্যাপী বিন্যাসের অংশ। তাঁর সময়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পর্কে বেদনাদায়কভাবে সচেতন। রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন :” আমাদের অন্তরতম সত্তায় কোনো শ্রেণী বা জাতি নেই “। তাই তিনি বলতে পারেন, ” আমাদের দেশকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের উচ্চতায়, মানবাধিকারের বিস্তৃতিতে, নৈতিক সমস্যার গভীরে উন্নীত করতে হবে। আমাদের জন্য এটাই স্লোভেনিয়ান সংস্কৃতির লক্ষ্য।” (কোসোভেল সিডব্লিউ ।।। ৬০)
(স্রেচকো কোসোভেলের একগুচ্ছ কবিতার অনুবাদ ১৫ মে ২০২৬-এর পরবর্তী সংখ্যায়)


I read kosolov.
স্লোভানিয়ার অকালপ্রয়াত কবি কোসভেল সম্বন্ধে বিস্তারিত জানলাম,অভিভূত হলাম তাঁর রবীন্দ্রানুরাগ সম্বন্ধে ।চন্দ্রনাথ বাবুর লেখায় সাহিত্যের এক নতুন আলোকোদ্ভাস উন্মোচিত হলো।
স্লোভেনিয়ার অকালপ্রয়াত কবি কোসো ভেল এবং তাঁর গভীর রবীন্দ্রাণুরাগ সম্বন্ধে জানতে পেরে চমৎকৃত হলাম।লেখক চন্দ্রনাথ বাবু সাহিত্যের এক নতুন অঙ্গন জনসমক্ষে এনেছেন এই রচনায়।
শ্রী চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য এক আপাত-অচেনা কবিকে আমাদের কাছে পরিচিত করিয়েছেন। তাঁর রবীন্দ্রনাথের প্রতি অনুরাগের কথা তিনি যেভাবে তুলে ধরেছেন, সত্যিই তিনি ধন্যবাদার্হ।
তাহলে পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে একজন কবি ছিলেন যিনি নীল জল ও সবুজ অরন্যের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সোনার তরী নামের তার একটি পদ্য পান্ডুলিপি রয়েছে। তিনি রবি রচনার স্লাভ ও জার্মান অনুবাদ পড়ে অনুভব করেছেন এত সহজে এত গভীর বানী বলা যায়। এবং – –
আমরা এনার নাম অধিকাংশ পাঠকই শুনিনি। চন্দ্রনাথবাবু বড়ই লজ্জা দিলেন। প্রভুত পরিশ্রমে তার সোনারতরী রাশি রাশি ভারা ভারা শষ্যে ভরে উঠেছে। আমরা ও পেলাম কয়েক আঁঠি। তাকে ধন্যবাদ। আরেক জন অল্প পঠিত ও শ্রুত কবির কথাও মনে এল। তরু দত্ত। তিনি ও কবি সুকান্ত পৃথিবী ছেড়েছেন একই বয়স ও একই মারণ রোগে।
এই বিদগ্ধ আলোচনায় স্নাত হলাম, ঋদ্ধ হলাম। প্রাবন্ধিক তাঁর রচনায় প্রতিটি দিক এত সাবলীল ভাবে ছুঁয়েছেন, ফলস্বরূপ রচনাটি একটি অনবদ্য মাইলফলক রূপে প্রতীত হয়। কবি স্রেচকো কোসোভেল এর রচনার সঙ্গে আমাদের আত্তীকরণ ঘটে।
অসাধারণ এই অনুভূতি ! সশ্রদ্ধ নমস্কার জানাই লেখক কে। 🙏
স্লোভানিয়ার কিশোর কবি কোসোবেল এর সঙ্গে পরিচিত হলাম এই লেখা টা পড়ে । আমাদের একান্ত আপন রবিকবি সম্পর্কে ঐ কবির মূল্যায়ণও লেখক সুন্দর ভাবে উপস্থাপিত করেছেন । অজানা এই তথ্যটি অত্যন্ত মনোগ্রাহী ভাবে সকলের মাঝে নিয়ে আসার জন্য লেখক চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য কে বিশেষ ধন্যবাদ 🙏
এমন এক কবির কথা জেনে সমৃদ্ধ হলাম। লেখককে অনেক ধন্যবাদ।
একটি ছোটো মন্তব্য না করে পারছিনা! ” কত অজানারে জানাইলে তুমি, কত ঘরে দিলে ঠাঁই। “স্রেচকো কোসোভেল এই নামটির সাথে পরিচিত হতে পারাও তো ভাগ্যের ব্যাপার। আগামী সংখ্যার জন্য অবশ্যই অপেক্ষা করে থাকবো।
খুবই সমৃদ্ধ ও মননশীল লেখা। রবীন্দ্র-প্রভাবের এমন আন্তর্জাতিক পরিসর সত্যিই বিস্ময়কর।
তথ্য, বিশ্লেষণ ও অনুভব—তিনের অপূর্ব সমন্বয়ে প্রবন্ধটি অনন্য হয়ে উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথ ও স্রেচকো কোসোভেলের এই সংযোগ একেবারেই নতুন আলোয় দেখাল।
সমৃদ্ধশালী লেখা। পাঠকের সঙ্গে সম্পূর্ন অপরিচিত বিদেশি এক রবীন্দ্রনুরাগীকে পরিচিত করালেন।
মনন শীল এই লেখা পড়ে নিজে ঋদ্ধ হলাম আর গর্বিত হলাম এই ভেবে যে আমাদেরই একজন কর্মসূত্রে পরিচিত দাদার পান্ডিত্যে।
রচনাটি লেখকের গভীর মনন, সৃজনশীলতার পরিচয়বাহী এক সুদীর্ঘ গবেষণার ফসল। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এবং বিশেষত রবীন্দ্র অনুধ্যায়ী অজানা, অচেনা এক কিশোর কবিকে যেভাবে পাঠক সমাজের কাছে তুলে ধরেছেন তা প্রণিধান যোগ্য।
অসাধারন তথ্যবহুল রচনা।
রবির কিরণ কোথায় কিভাবে পড়েছে তার অনুসন্ধানের শেষ নেই।তেমন এক অনুসন্ধানের ফসল এই মূল্যবান প্রতিবেদনটি আমাদের একজন অচেনা বিদেশী কবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।শ্রদ্ধেয় এই লেখকের আরো বেশ কটি প্রতিবেদন পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম।এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।প্রত্যাশা রইল,এরকম আরো মূল্যবান উপস্থাপনার।