
(প্রাককথনঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে লিখেছেন, ‘আরম্ভের পূর্বেও আরম্ভ আছে, সন্ধ্যেবেলায় দীপ জ্বালানোর আগে সকালবেলায় সলতে পাকানো’। ঠিক সেইভাবেই যে-কোনো লেখা শুরু করবার আগের একটা গল্প থাকে। সেটা পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ভাল লাগে আমার। এই লেখাটির ক্ষেত্রে এটা অতি সংক্ষিপ্ত একটি ঘটনা। তন্ময়দার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় গত বছর দুর্গাপূজার সমযূ। ওঁর অনুজ এবং পশ্চিমবাংলার অতি পরিচিত মুখ সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে সস্ত্রীক গিয়েছিলাম ওঁদের পারিবারিক এবং বেশ প্রাচীন একটি পুজোতে সামিল হতে। সেখানেই তন্ময়দার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এবং প্রথম আলাপেই ওঁর সৌম্য চেহারা, মার্জিত স্বভাব, সৃজনশীল সত্তা, জ্ঞানের পরিধি এবং প্রচারবিমুখ স্বভাবকে ভাল লেগে যায়। তার কয়েকমাস পরেই শুরু হয় কলকাতা বইমেলা। আমার লেখা একটি বইয়ের প্রকাশকের স্টলে ওঁর সঙ্গে ফের হয়ে যায় মোলাকাত। একেবারেই দৈবাৎ। এইভাবে আরও কিছু আলাপ আর আড্ডার ফসল থেকে আজকের এই লেখা। উনি অনুরোধ করেছিলেন, আমি আদেশ মনে করেছি। আশাকরি রবিচক্র পত্রিকার পাঠকদের কাছে এটি গ্রহণযোগ্য হবে। লেখাটির শিরোনাম সেই অর্ধ শতাব্দী আগের একটি গান থেকে ধার নিলাম। সত্যজিৎ রায়ের লেখা আর অনুপ ঘোষালের দরাজ গলায় গাওয়া সেই গানের প্রতিটি কথা আজও কতটা প্রাসঙ্গিক।)
আমাদের চেনা পৃথিবীটার বড় নিদারুণ হাল আজ। কিছু যুদ্ধপ্রিয় মানুষ সামগ্রিক বিশ্বের নিরাপত্তা আর শান্তির ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বারংবার। প্রায় চল্লিশ দিনের একটা অসম অথচ ভয়াবহ যুদ্ধের পটভূমিতে কাটালো গোটা দুনিয়া। সাময়িক একটা যুদ্ধ বিরাম হয়েছে বটে তবে সেটা কতটা টেকসই হবে তা সময় বলবে। তবে এই যুদ্ধের জেরে একটি দুটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষই ভুগছেন অর্থনৈতিক আর সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায়। এই মুহূর্তে জাপানের কৃষক, চীনের শ্রমিক, ভারতের ব্যবসায়ী বা আফ্রিকার গৃহবধূ ; সবার মনে একটাই প্রশ্ন। তেলের দাম, গ্যাসের দাম পড়বে কিনা ? আবার যুদ্ধ লাগবে কিনা? অ্যাটম বোমা পড়বে কিনা। সেই চিন্তায় মগ্ন হয়ে দিন গুজরান করছি আমরা সবাই, সেইসব দেশের মানুষ যাদের এই যুদ্ধের সঙ্গে লতায় পাতায়ও বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।
তার কারণ অনেকগুলি। সর্বপ্রথম হল জ্বালানির সরবরাহে অনিশ্চয়তা। মূলত পারস্য উপসাগরের দেশগুলি থেকে আসে জ্বালানি। তেল, গ্যাস, অন্যান্য হাইড্রোকার্বন ও পেট্রোলিয়াম পণ্য। সৌদি আরব, আমীর শাহী, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক, ইরান, ওমান, কাতার ইত্যাদি। আমেরিকার লাগানো অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকের জন্য ইরান থেকে জ্বালানি এখন শুধুমাত্র চীনই নেয়। বাকি দেশগুলির চাহিদা পূরণ করে পারস্য উপসাগরের অন্যান্য দেশগুলি। ইজরাইল আর আমেরিকার ইরানের ওপর অতর্কিত আক্রমণ আর ইরানের অপ্রত্যাশিত জোরালো প্রত্যাঘাতে ঘেঁটে গেছে এইসব আরব দেশগুলির আত্মবিশ্বাস। ঘেঁটে গেছে তাদের জ্বালানি উৎপাদন ব্যবস্থা আর সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের সুরক্ষাও। সরবরাহতে বিঘ্ন ঘটায় তেলের ভান্ডারে টান পড়েছে প্রায় সব দেশেই। ঘুচে গেছে অর্থনৈতিক বা সামাজিক তারতম্যও। সেই কোভিড প্যান্ডেমিকের মত, সঙ্কটের মুখে দুনিয়াটা যেন বৈষম্যহীন হয়ে গেছে। পেট্রল পাম্পগুলিতে লম্বা লাইন দেখা গেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, অ্যামস্টারডামে।

দ্বিতীয় দুশ্চিন্তা হল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার নিয়ে। কারণ এই যুদ্ধের কয়েকমাস আগেই ইরানের ওপর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবার আরোপ লাগিয়ে, আমেরিকাকে সামরিক আঘাত হানতে দেখেছি। তখন অতি শক্তিশালী মার্কিন বাঙ্কার বাস্টার বোমা দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ইরানের পরমাণুকেন্দ্রের সন্দেহজনক কংক্রিটের বাঙ্কার। ঘোষণা করাও হয়েছিল যে কেল্লা ফতে হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র বানাবার কর্মসূচিকে ধূলিস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে। তারপর কিসের জন্য তাহলে এই অতর্কিত আক্রমণ, যখন সবপক্ষের একটা আলোচনাও চলছিল?
এখানে অনেকগুলি প্রশ্ন আসতেই পারে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অধিকার কোন্ কোন্ দেশের আছে আর কাদের নেই সেটা কে নির্ধারণ করবে? জাতিসংঘ নাকি ‘জোর যার মুলুক তার’ই হবে আন্তর্জাতিক নিয়মাবলীর নিউ নর্মাল? ইউনাইটেড নেশনের কি কিছু করণীয় আছে এ ব্যাপারে? নাকি তারা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক আর আমেরিকার হাতের পুতুল হয়ে গেছে? ইরান কি সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির শেষ পর্যায়ে এসে গেছিল নাকি আর একবার আমরা ইরাক যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখছি? আর একটা প্রশ্নও আসে। ইজরাইলের কাছে কি পারমাণবিক অস্ত্র আছে? যদি না থাকে, তারা কেন এনপিটি (নন প্রলিফারেশন ট্রিটি)-তে সই করেনি? বিশ্বের ১৯১ টি দেশ সই করেছে। করেনি শুধু ভারত, পাকিস্তান আর নর্থ কোরিয়া। এরা তো সবাই ‘পারমাণবিক অস্ত্র আছে ’ ঘোষিত দেশ। তাহলে ইজরাইল কেন সাক্ষর করেনি ? আমেরিকা কি প্রকারান্তরে ইজরায়েলের এজেন্ডাকেই বাস্তবায়ন করছে, যে ইসলামিক দেশগুলি দিয়ে ঘেরা ইহুদী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে থাকুক?

Photo collage of destruction in Tehran, Tel Aviv & US war ship
যারা এই যুদ্ধের প্রধান চরিত্র, ইরান, ইজরাইল আর আমেরিকা – হয়ত তাদের নিজের নিজের যুক্তি আছে এই লড়াই করবার। কিন্তু তাদের জন্য যে মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে অন্য সবাইকে, সেই নিয়ে কাউকে খুব একটা উচ্চবাচ্য করতে দেখিনি। না কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা, না কোন বড় দেশ, না কোন ব্যক্তি বিশেষ। যদিও একটু আধটু মৃদু প্রতিবাদ করেছে গুটি কয়েক দেশ। যেমন চীন, রাশিয়া , ফ্রান্স, স্পেন, ভারত, তুর্কী। তবে তার বেশি না। যেমনটি ঘটে আমাদের পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায়। চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখেও সিংহভাগ মানুষ চুপ করে থাকে। ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে না। এই সামগ্রিকভাবে চুপচাপ থাকার কারণ কী হতে পারে ? আমেরিকার রোষানলে পড়বার ভয়? না, দেশের স্বার্থই চূড়ান্ত ভেবে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকাটা বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত বলে? যেমনটি পূর্বে ঘটেছিল হিটলারের হলোকাস্টের সময়, পোলপটের সময় বা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। চুপ করে লক্ষ লক্ষ মানুষ মরতে দেখেছে সবাই।
আসুন, এক এক করে এই সব দেশের যুক্তি আর তাদের যুদ্ধকালীন অবস্থানটা দেখি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইজরাইলঃ
ইরান থেকে থেকে আমাদের মেরে ফেলার কথা বলত, ‘ডেথ টু আমেরিকা’ আর ‘ডেথ টু ইজরাইল’ ঘোষণা করত। তার ওপর ইরান পারমানবিক অস্ত্র বানাচ্ছিল আর কথাবার্তা চালানোর অজুহাতে সময় কিনছিল। এছাড়া ইরান হিজবুল্লা, হামাস আর হুথির মতন কিছু প্রক্সি জঙ্গি সংগঠনের ভরণ পোষণ করছে যারা এলাকায় অশান্তি আর অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। তাছাড়াও ইরানের স্বৈরাচারী শাসনের দ্বারা তাদের দেশের সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার, মানবধিকার লঙ্ঘন করার মতন অপরাধের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে। তাই মেরেছি। বেশ করেছি।
ইরানঃ
কথাবার্তা চলাকালীন এহেন আক্রমণ অন্যায্য এবং বেআইনি। উপকূলবর্তী দেশগুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের সহযোগী দেশগুলির ঘাঁটি থেকে আমাদের ওপর আঘাত হানা হয়েছে। তাই তাদেরও মারছি। বেশ করছি। সারা বিশ্বের তেলের দাম বাড়িয়ে দেব। প্রয়োজনে হাজার বছর লড়াই করব।
সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আমীর শাহী, বাহরাইন, ওমান, ইরাকঃ
এই দেশগুলি একপ্রকার ফেঁসে গেছে। আরব দেশ হয়েও আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্বর মারাত্বক ফল ভুগছে। তাদের ত্রাস এই যুদ্ধে তাদের তেলের ভান্ডার, পরিশোধনাগার আর অন্যান্য কাঠামোর ওপর আরও আঘাত আসবে। লবণাক্ত জলকে খাবার উপযোগী করে তোলার প্ল্যান্টগুলি এবং হোটেল আর এয়ারপোর্টগুলিকেও নিশানা করা হবে। এতে তাদের দেশগুলির পর্যটন শিল্পেও বিস্তর প্রভাব পড়বে।
ন্যাটো জোটের দেশগুলিঃ
বত্রিশটি দেশের জোট – মূলত আমেরিকা, ইউরোপের দেশগুলি , ক্যানাডা এবং তুর্কি। তারা চুক্তিবদ্ধ হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে চায় নি। কেউ কেউ নিমরাজি হয়েছে। বাকিরা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের অবস্থান নিয়েছে। এদের এই অবস্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশাহত ও তিতিবিরক্ত। বিশেষ করে ফ্রান্স আর ইউনাইটেড কিংডমের ওপর। এই দুই দেশের প্রধানদের নামে তিনি বারংবার কুরুচিকর মন্তব্যও করেছেন। ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোর উপরে একেবারে ব্যক্তিগত আঘাতও হেনেছেন। তাছাড়া আমেরিকা ন্যাটো জোট থেকে বেরিয়ে আসবে, সেইরকম হুমকিও দিয়েছেন।
আমেরিকার অন্যান্য মিত্র দেশগুলিঃ
‘ন্যাটো’র বাইরে মূলত জাপান, সাউথ কোরিয়া আর অস্ট্রেলিয়া। এই তিনটি দেশ আমেরিকার এই যুদ্ধ থেকে গা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন একাধিকবার। তার বক্তব্য জাপান আর সাউথ কোরিয়ার সুরক্ষার জন্য আমেরিকার বহু সৈন্য-সামন্ত ওই দেশগুলিতে মোতায়েন করা আছে অথচ আমেরিকার প্রয়োজনে তারা ছুটে আসে নি। তিনি কোন রকম রাখঢাক না করে বলেছেন যে নর্থ কোরিয়ার কিম জং এর সঙ্গে তার অত্যন্ত সুসম্পর্ক। অর্থাৎ ইঙ্গিত স্পষ্ট। তোমরা ভবিষ্যতে ওইদিক থেকে বিপদে পড়লে আমাদের আর পাশে পাবে না।
আফ্রিকা এবং এশিয়ার ছোট ছোট দেশগুলিঃ
তারা কোনো পক্ষের দিকে ঝুঁকছে না আর ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে এই চিন্তায় যে তাদের দূর্বল অর্থনীতির ওপর কি প্রভাব পড়বে এই যুদ্ধের।
আমেরিকার শত্রু বা প্রতিযোগী দেশগুলিঃ
চীন এই যুদ্ধে অনেক বিড়ম্বনার শিকার হয়েছে। তাদের তেল সরবরাহের প্রধান উৎস বিপন্ন হয়েছে। তাদের রপ্তানীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মিত্রদেশ ইরানের ওপর এই হামলার পর হাত গুটিয়ে বসে থাকতেও পারে না তারা,
অথচ আমেরিকার সঙ্গে সম্মুখসমরেও যেতে চায় না। আপাতত জাতিসংঘে চীন এই হামলার কড়া নিন্দা জানিয়েছে, সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রস্তাবে ভিটো প্রয়োগ করেছে এবং ইরানকে ত্রাণ সামগ্রী ইত্যাদি পাঠাচ্ছে। ওদিকে আমেরিকা দক্ষিন চীন সমুদ্র থেকে বেশ কিছু সামরিক বাহিনী তুলে পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন করেছে। চীনের কাছে এটা একটা সুযোগও বটে। যুদ্ধের এই ডামাডোলে তারা ঘর গুছাতে পারে। করতে পারে হামলা তাইওয়ানকে বা জাপানের সেনকাকু দ্বীপে। তাছাড়া আমেরিকাকে মাঝেমধ্যে ইরানের হাতে নাস্তানাবুদ হতে দেখে তাদের বেশ ভালই লাগছে।
আবার কিছু দেশ আছে যারা এই অশান্তির ফায়দা লুটছে। যেমন রাশিয়া। তারা দেদার তেল বিক্রি করতে পারছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ন্যাটোর নজর আপাতত ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে দূরে সরে গিয়েছে বলে রাশিয়া একপ্রকার স্বস্তির মধ্যেও আছে । রাশিয়া ইরানকে সমর্থন করছে এবং যতটা সম্ভব সাহায্যও করছে। তাদের চিরাচরিত শত্রু দেশ আমেরিকার শক্তিক্ষয়, দেদার অর্থ ব্যয় আর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে দেখে তারা মহানন্দে আছে।
ইউক্রেন রাশিয়ার বন্ধু ইরানের বিরোধী পক্ষ নিয়েছে এবং ড্রোনের আঘাতকে প্রতিহত করবার মতন ‘অ্যান্টি ড্রোন’ সাপ্লাই দিচ্ছে আরব দেশগুলিকে। কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে যে এই ‘অ্যান্টি ড্রোন’ সাপ্লাই দেওয়ার জন্য একটি আমেরিকান কোম্পানিও মাঠে নেমেছে, যার হয়ে কাজ করছে ট্রাম্পের দুই সন্তান। এরিক আর জুনিয়র। ভাবা যায়!
পাকিস্তানের ত্রিশঙ্কু অবস্থা । মুসলিম দুনিয়ার একমাত্র নিউক্লিয়ার পাওয়ার তারা। তাদের থেকে ইরান সাহায্য আশা করছে। ওদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক সুরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে পাকিস্তান মাত্র কয়েক মাস আগেই। তারাও দাবি করেছে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সুরক্ষা। হালে সংযুক্ত আমীর শাহী (UAE) তিতিবিরক্ত হয়ে পাকিস্তানকে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার ধারের টাকা ফেরৎ দিতে বলেছে এবং পাকিস্তান তাদের সঙ্গে বাকযুদ্ধে ব্যস্ত। তাদের প্রভু আমেরিকা বা চীন, কাউকেই চটাতে চায় না তারা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানকে দিয়ে ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতা করাচ্ছেন। তারমধ্যে আফগানিস্তান আর বালোচিস্তানে ঝামেলা তো লেগেই আছেই। জাঁতাকলে পিষছে তারা এখন।
ভারত অতি কৌশলী এবং সাবধানী কূটনীতিক আর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে এই যুদ্ধে। আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত হয়নি এবং সরাসরি বিরোধিতাও করেনি। ওদিকে ভারত ইরানের সঙ্গে আর ইজরাইলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। শ্রীলঙ্কার কাছে , আন্তর্জাতিক সমুদ্রে ইরানের একটি যুদ্ধ জাহাজ আমেরিকার টর্পেডো আঘাতের শিকার হয়। তারপরই ভারত ইরানের অন্য একটি যুদ্ধ জাহাজকে আশ্রয় দিয়েছে এবং আমেরিকা সেই নিয়ে কোন উচ্চবাচ্যও করে নি। এই ডামাডোলে ইরান হাতে গোনা মাত্র পাঁচটি দেশকে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে দিয়েছে। তাতে তাদের চিরাচরিত বন্ধু পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, ইরাক ছাড়া ভারতও সামিল। সেটা একটা অতি আশার কথা।

যদিও ভারত এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে নি। তবে যুদ্ধের ফল কিন্তু আমাদেরকেও ভুগতে হবে। কারণ আমাদের জ্বালানির ক্ষিদে অন্যান্য দেশগুলি থেকে অনেক অনেক বেশি। আমাদের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি হয় বিদেশ থেকে। তার প্রায় অর্ধেক আসে গাল্ফ দেশগুলি থেকে। এই যুদ্ধের পর তাদের উৎপাদন হ্রাস হয়েছে। তাছাড়া শোনা যাচ্ছে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে হলে অতিরিক্ত শুল্কও লাগবে। তবে হয়ত সেটা ভারতের জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে। এছাড়া আমাদের গ্যাসের প্রয়োজনের সিংহভাগ আসে এই দেশগুলি – কাতার, আমীর শাহী, সৌদি আরব থেকে। সেই সাপ্লাই ও ব্যাহত হবে। কিছুটা হলেও ব্যাহত হবে ফার্টিলাইজার আমদানীও। তার সুদূর প্রসারী ফল প্রকাশ হবে হয়ত কয়েকমাস পর। তবে ভারত হাত গুটিয়ে বসে নেই সেটা বোঝা যাচ্ছে। নিজস্ব উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন নতুন বিক্রেতা দেশের সঙ্গে চুক্তি এবং বিকল্প জ্বালানিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। যদি এই যুদ্ধের শর্ত অনুযায়ী ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, তাহলে কিছুটা সমস্যা লাঘব হবে। ভারত যদি আমেরিকার সঙ্গে সমঝোতা করে বা তাদের রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে রাশিয়ার থেকে জ্বালানি নেয়, তাতেও একটা সুরাহা হবে।
জ্বালানির সমস্যা একমাত্র সমস্যা নয়। গাল্ফ দেশগুলির সঙ্গে আমাদের কোটি কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে আছে। লগ্নিও করা হয়েছে নানা খাতে। এই যুদ্ধের জেরে তারা কতটা পারবে তার মর্যাদা রাখতে সেটাও একটা উদ্বেগের বিষয়। একটা অর্থনৈতিক ঝড়ের কবলে পড়েছে তারাও। আমীর শাহী পাকিস্তানকে দেওয়া প্রায় তিন বিলিয়ন টাকা ফেরৎ চেয়েছে। এইসব দেশগুলিতে ভারতীয় থাকে প্রায় এক কোটির কাছাকাছি। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স আসে বছরে প্রায় চল্লিশ বিলিয়ন ডলার। সেটা ভারতের মোট রেমিটেন্সের প্রায় চল্লিশ শতাংশ। হতে পারে এই যুদ্ধের কারণে সেই টাকার জোগানও অনেকটা কমবে। বদলে যাবে রাজনৈতিক আর কূটনীতিক সমীকরণও। আমেরিকা আর পাকিস্তানের মিত্রতা আরও শক্তিশালী হচ্ছে। পাকিস্তান একাধারে চীন ও আমেরিকা, দুই দেশের সঙ্গেই অশুভ আঁতাত গড়ে তুলতে পেরেছে। ভারতের সুরক্ষার জন্য সেটা মোটেই কাম্য নয়। আমাদের সজাগ থাকতে হবে যাতে পাকিস্তানের এই যুদ্ধে মধ্যস্থতা করার সুবাদে, আমেরিকার নেক নজরে এসে তারা আবার আতঙ্কবাদীদের পালে হাওয়া না দেয়।

গত কয়েক বছরের নানা ঘটনার বিশ্লেষণ করলে, যেমন ভেনেজুয়েলার ওপর হামলা, গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, কিউবাকে হামলার হুমকি, আর সাম্প্রতিক কালে ইরানের ওপর আক্রমনকে দেখে একটা কোথাও যেন মনে হচ্ছে পৃথিবী একনায়কতন্ত্র বেছে নিচ্ছে। কূটনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতিকে সরিয়ে রেখে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এক রাষ্ট্রনায়কের অন্য আর এক রাষ্ট্রনায়কের প্রতি সৌজন্য এবং সম্ভ্রমের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে বিস্তর। মুখের ভাষা, শব্দচয়ন আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ অনেকেরই গেস্টাপো বাহিনির সর্দারদের মতন ঠেকছে। তারা শত্রুর জাহাজে টর্পেডো মেরে উল্লাস প্রকাশ করছে। শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মিসাইল আঘাত করে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা প্রকাশ করছে না। তাদের আশেপাশে থাকা পরামর্শদাতারাও তাঁবেদারি করে যাচ্ছে। পুতিন বা শি জিনপিং, খামনেই বা নিতানিয়াহু, ট্রাম্প বা কিম জং, এরাই নেতা। ক্ষমতায় এরাই আসছেন, মিলিটারী ক্যু করে বা ভোটে নির্বাচিত হয়ে। সেখানে দেখা যাচ্ছে গণতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র একবারে একাকার হয়ে গেছে। যতটা পাগলামি উত্তর কোরিয়ার প্রধান করছেন, তার থেকে বেশি পাগলামি পৃথিবীর সবথেকে উন্নত গণতন্ত্র থেকে বের হচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক। একটা আশার কথা বলে শেষ করি। এই যুদ্ধের পর একটা নতুন World Order আসবার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। আমেরিকার একা সারা পৃথিবীতে দাঁপিয়ে বেড়ানো আর মার্কিন ডলারের আধিপত্য থেকে গোটা বিশ্বের মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা। আজকের Unipolar world থেকে Multipolar বিশ্বের। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি Power Centre গড়ে উঠছে। চীন, রাশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, ভারত। বিনিয়োগ শুরু হয়েছে চীনের ইউয়ান, রাশিয়ার রুবল আর ভারতের রুপিতে। সামরিক শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের দিন হয়ত শেষ হয়ে আসছে।



এই যুদ্ধটায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো এতটাই এলোমেলো এবং অস্পষ্ট হয়ে গেছে যে আমরা সাধারণ মানুষেরা দিশেহারা হয়ে আছি । এই সময় একসময় একজন সামরিক বিশেষজ্ঞর কাছ থেকে সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি সহজ বিশ্লেষণ আমাদের কাছে একটি পরম প্রাপ্তি । আমরা বৈদ্যুতিন মাধ্যমে লেখককে যে রকম নিরপেক্ষ এবং balanced মতামত দিতে দেখি , এই লেখার মধ্যেও তেমনটাই পাচ্ছি । আশা করি ভবিষ্যতে এখানে তাঁর কাছ থেকে আরো অনেক লেখা পাবো ।
যথার্থ বলেছেন।
যদি একজন পুর্বতন সেনাকর্মী এই লেখার শিরোনাম রাখেন ‘ তোরা যুদ্ধ করে করবি কি তা বল’ তাহলে স্বতঃই আশ্বাস বানী ধ্বনিত হয় মনে। লেখাটি বেশ দীর্ঘ এবং আমি সোমেন দের সঙ্গে সম্পুর্ন একমত যে বৈশ্বিক বিশ্বাস ও সম্পর্ক প্রবল ভাবে ঘেঁটে গেছে। কতকাল আগে পড়া ‘মধু বংশির গলি’ কাব্যে পড়া ‘ অর্থাৎ কে যে শত্রু ঠিক নেই, নিজেরাই মারামারি করছি, ঘরে বাইরে মরছি’, চিরকালীন সত্য হয়ে প্রতিভাত হচ্ছে। কিন্তু সেই দীর্ঘ কবিতার শেষেও কবি বলেছেন ‘ প্রাণ ,কল্লোলে ওই নব যুগ আসে’। লেখক প্রভুত পরিশ্রমে সাজিয়েছেন এই লেখাটি। বেগবান ও প্রানবন্ত ভাষায় এত বিরস বিষয় দিয়েও টেনে রাখতে পেরেছেন পাঠক কুলকে – তাকে স্যালুট।
একজন প্রাক্তন সেনানায়কের সুচিন্তিত ও মূল্যবান বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে এটা বোঝা যাচ্ছে যে পৃথিবীর ছোট বড় সব দেশই নিজের দেশের স্বার্থরক্ষার তাগিদে আগে বা পরে আমেরিকার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে।ফলতঃ কোণঠাসা হতে হতে আমেরিকার শক্তি কমবে এবং নতুন নতুন শক্তি উঠে আসবে।আমরাও সেই আশায় থাকব।পৃথিবী শান্ত হোক আবার।আর তা নাহলে সমস্ত মানুষজাতির ধ্বংসই কাম্য।তাতে অন্তত পৃথিবীতে সৃষ্ট অন্য প্রাণীরা অন্তত হাঁফ ছেড়ে বাঁচবার সুযোগ পাবে।
একজন যোদ্ধাই জানেন যুদ্ধের কী ভয়ঙ্কর পরিণাম! অত্যন্ত সময়োচিত রচনা।