শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আমার সুভাষচন্দ্র: কৈশোর ও যৌবনস্মৃতির অনুবর্তন

(চতুর্থ পর্ব)

আমার সুভাষ-অধ্যয়নের প্রধান উপকরণ হিসেবে যে বইগুলোর কথা এতক্ষণ বলেছি, সেগুলির বিভিন্ন অংশ আমি একটি ডায়েরিতে নোট করে রাখতাম, ভবিষ্যতে আমার সুভাষ-অনুধ্যানের উপাদান হিসেবে সেগুলিকে ব্যবহার করার জন্য। এই নোটবুকে আরো তিনটি বইয়ের নাম দেখতে পাচ্ছি, যেগুলির কথা এখনো বলিনি। এগুলি একদিকে সুভাষচর্চার উপাদান হিসেবে যেমন অতিশয় মূল্যবান, তেমনি বর্তমান পাঠকের কাছে কিছুটা দুষ্প্রাপ্য বলেও উল্লেখযোগ্য। প্রথম বইটি পূর্ব এশিয়ায় নেতাজির বিভিন্ন ভাষণের একটি নাতিবৃহৎ সংকলন – নাম ‘দিল্লি চলো’। বেঙ্গল পাবলিশার্স-এর আজাদ হিন্দ গ্রন্থমালার প্রথম বই হিসেবে এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। ভূমিকায় অমিয়নাথ বসু জানিয়েছেন, ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের প্রকাশিত ‘Blood bath’ নামে যে -রচনা সংকলনটি আগে প্রকাশিত হয়েছিল, তার অন্তর্ভুক্ত রচনাগুলির সঙ্গে আরো চারটি বক্তৃতা যোগ করে তা প্রাঞ্জল বাংলায় এই বইটিতে পরিবেশিত হয়েছে। তাঁর ভাষায় “আজাদ হিন্দ গভর্নমেন্টের উদ্দেশ্য, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও ভারতবর্ষের সমসাময়িক ঘটনাবলীর সুনিপুণ বিশ্লেষণ এবং নেতাজির অনন্য দেশপ্রেমের পরিচয় রচনাগুলির ছত্রেছত্রে প্রকাশ পেয়েছে।” আমাদের প্রতিবেশী এক কাকিমার সংগ্রহ থেকে এই দুর্লভ বইটি এনে আমি প্রথম পড়েছিলাম এবং অমিয়বাবু নেতাজির ভাষণগুলি সম্পর্কে যা বলেছিলেন, তার সত্যতা অনুভব করেছিলাম।

দ্বিতীয় বইটির নাম ‘কোন পথে?’ এটি ছিল ‘ক্রসরোডস’ নামে নানা চিঠিপত্র ও নথিপত্রের ইংরেজি সংকলনটির বঙ্গানুবাদ (প্রকাশক কথা ও কাহিনী)। দুটি খণ্ডে প্রকাশিত বইটির দ্বিতীয় খণ্ডটি আমি লাইব্রেরী থেকে সংগ্রহ করেছিলাম। এর অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি চিত্তাকর্ষক বিষয় ছিল ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্রের চীন সফরের পরিকল্পনা সংক্রান্ত সরকারি চিঠিপত্র, ১৯৪০-৪১ সালে গান্ধী ও সুভাষচন্দ্রের পত্রবিনিময় ও সুভাষচন্দ্রকে লেখা রাসবিহারী বসু, জয়প্রকাশ নারায়ণ প্রমুখ কয়েকজন বিশিষ্ট নেতার চিঠি। প্রথমোক্ত বিষয়ে সংকলিত দলিলগুলি থেকে দেখা যাচ্ছে, সুভাষচন্দ্র চীনে যাবার অনুমতি প্রার্থনা করে সরকারের কাছে যে আবেদন করেন, তাতে বাংলার প্রাদেশিক সরকারের কোন আপত্তি না থাকলেও ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর ডিরেক্টর এই অনুমতি না দেওয়ার সুপারিশ করে স্বরাষ্ট্র বিভাগে চিঠি পাঠাচ্ছেন। তাঁর মতে ‘সুভাষ বসুর মতো একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি’কে ভারতরক্ষা আইনের অধীনে যেভাবে যথোচিত নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে, তা শিথিল করার ঝুঁকি নেওয়া উচিত হবে না। এতে সম্মতি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রবিভাগের সেক্রেটারি লিখছেন, তাঁর মতো এক ‘ভ্রাম্যমান বিপ্লবীকে’ পররাষ্ট্র বিভাগ কিছুতেই মধ্য এশিয়ায় ছেড়ে রাখতে চাইবে না। কাজেই তাঁর ভারতে থাকাই শ্রেয়, যাতে তাঁর ওপর নজর রাখা যায় ও প্রয়োজনে তাঁকে ‘গেঁথে তোলা’ যায়।

আমাদের আলোচ্য পর্বে (১৯৬৪-৮৩) আমার পঠিত বইয়ের তালিকায় সর্বশেষ নামটি হল বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা হীরেন্দ্রনাথ মুখার্জির ‘The bow of Burning Gold’ (প্রকাশক পিপলস পাবলিশিং হাউস)। মনে আছে এই বইটি যাঁর বাড়িতে আমি পেয়েছিলাম, তিনি আমার মামা প্রবীর গুহ। তিনি ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সমর্থক এবং সে কারণে সুভাষচন্দ্রেরও কড়া সমালোচক। ছেলেবেলা থেকে নানা রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁর সঙ্গে তর্ক করতে করতে আমি বড় হয়েছি। বিশ্বযুদ্ধের সময় সুভাষচন্দ্রের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির তীব্র নিন্দা-ব্যঙ্গ ও বিরূপ সমালোচনার প্রেক্ষিতে এই বইটির লেখকের মূল্যায়ন ছিল এক বিরল ব্যতিক্রম ও একজন বিদগ্ধ কমিউনিস্টের সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে যথাসাধ্য নিরপেক্ষ ও সশ্রদ্ধ বিশ্লেষণের একটি বিরল দৃষ্টান্ত। নেতাজির মূল্যায়নে সিপিআই-এর অতীতের নীতি যে ভুল ছিল, সেকথা স্বাধীনতার পরে কমিউনিস্ট নেতাদের কেউ কেউ স্বীকার করেছিলেন বটে, কিন্তু জনমনে নেতাজির অনন্য স্থান, তাঁর অতুলনীয় নেতৃত্ব ও ব্যক্তিগত গুণাবলী আর স্বাধীনতা সংগ্রামে আজাদ হিন্দ ফৌজের অনস্বীকার্য অবদানের কথা ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে যেভাবে সৎসাহসের সঙ্গে ব্যক্ত হয়েছিল, এর আগে কোন কমিউনিস্ট নেতার কাছ থেকে সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে এর কাছাকাছি কোন মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি। উইলিয়াম ব্লেকের যে-কবিতাটি থেকে তিনি এই গ্রন্থটির শিরোনাম বেছে নিয়েছিলেন, সুভাষচন্দ্রকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তার চার লাইন তিনি এই বইয়ে উদ্ধৃত করেছেন :- “Bring me my bow of burning gold/ Bring me my arrows of desire/ Bring me my spear, oh Clouds unfold/ Bring me my Chariot of fire!”

নেতাজির সহযোগী ও অনুগামীদের সন্নিধানে

সত্তরের দশকের প্রথম দিকে কলকাতায় প্রধানত নেতাজি ভবনের নানা অনুষ্ঠানে নেতাজির অনেক সহকর্মী সহযোগী ও ঘনিষ্ঠজনকে ও তাঁর জীবন-ইতিহাসের গবেষক ও লেখককে চাক্ষুষ দেখার যে-সুযোগ আমি পেয়েছিলাম, তা আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে অক্ষয় সঞ্চয় হয়ে আছে। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ও ১৯৭৬ সালে সেখানে নেতাজির জন্মদিনের অনুষ্ঠানগুলিতে ও নেতাজি বিষয়ক দুটি আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে (১৯৭৩ ও ১৯৭৬) দর্শক হিসেবে উপস্থিত থেকেছি। এই ক’বছরে কাছ থেকে দেখেছি নেতাজির সহপাঠী চারুচন্দ্র গাঙ্গুলি, আজাদ হিন্দ ফৌজের ধিলন, পি কে সেগল, দেবনাথ দাস, ডঃ লক্ষ্মী সেগল, জানকী থেবার্স প্রমুখ মানুষকে, দুর্গম যাত্রাপথে নেতাজির সঙ্গী আবিদ হাসান ও ভগতরাম তলোয়ার, জার্মানিতে নেতাজির সহযোগী ডঃ আলেকজান্ডার ওয়ার্থ ও ডঃ লোথার ফ্রাঙ্ক, নেতাজির বিদেশিনী বন্ধু কিট্টি কুর্তি, আজাদ হিন্দ সরকারে প্রেরিত জাপানি রাষ্ট্রদূত হাচাইয়া, নেতাজির দুই সহযোগী ভ্রাতুষ্পুত্র অমিয়নাথ ও ডঃ শিশির বসু, বি-ভি-র বিপ্লবকর্মী শান্তিময় গাঙ্গুলি, অতীতের ডঃ শিবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সমকালের সমর গুহ ও নির্মলকুমার বসু পর্যন্ত রাজনীতির অঙ্গনের বিভিন্ন নেতা ও কর্মী, পরবর্তীকালের বিখ্যাত সুভাষ-জীবনীকার লেনার্ড গর্ডন সহ এশিয়া-ইয়োরোপ-আমেরিকার নানা গবেষক-লেখক ও নেতাজীর অনুগামী-অনুরাগী অন্যান্য কত না বিশিষ্ট গুণীজনকে!

১৯৭৩ সালের আলোচনাচক্রে প্রবন্ধ পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের সেই বিখ্যাত অথবা কুখ্যাত অধ্যাপক ওটেন, ছাত্রদের সঙ্গে বিরোধ ও সে-সূত্রে সুভাষচন্দ্রের বহিষ্কারের সুবাদে যাঁর নাম প্রতিটি সুভাষ-জীবনীর পাতায় অক্ষয় হয়ে আছে। এই লেখাটিতে ওটেন সাহেব দাবি করেছিলেন, ১৯১৬ সালে তাঁর ঐ নিগ্রহের ঘটনায় যে সুভাষচন্দ্র জড়িত ছিলেন, সেটা নাকি তিনি ঐ ঘটনার অব্যবহিত পরেও জানতেন না! তাঁর আরেকটি চমকপ্রদ দাবি ছিল, ঐ কলেজে অধ্যাপনার সময়েই তাঁর নাকি জানা ছিল যে, তিনি যাদের পড়াচ্ছেন, তারাই ভারতের ভবিষ্যৎ শাসক!
১৯৭৬ সালে নেতাজি ভবনে আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে যেসব সুভাষ-ঘনিষ্ঠ মানুষজনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য তাঁর যৌবনের বন্ধু স্বনামধন্য দিলীপকুমার রায়। কলেজজীবনে একদা এই দিলীপ রায়কে দেখতে গিয়ে আশাভঙ্গ (বর্তমান রচনার প্রথম পর্বে উল্লিখিত) ও পরে নেতাজি ভবনে সেই আশাপূরণের কাহিনী আরও পরবর্তী কালে দিলীপকুমারের (এবং সুভাষচন্দ্রেরও) জন্মশতবার্ষিকীর সময় আমি লিখেছিলাম। ‘কথাসাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত সেই রচনাটির নাম ছিল “দিলীপকুমার রায়কে দেখেছিলাম”। নেতাজি ভবনেরওই অনুষ্ঠানে দিলীপকুমারের বক্তৃতা ও গান শোনার বিস্তারিত বর্ণনা ছিল লেখাটিতে। সেই লেখাটি থেকে কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি। “দিলীপকুমার রায় উঠলেন বক্তৃতা দিতে এবং চকিত বিস্ময়ে লক্ষ করলাম, এখনো জরা তাঁকে স্পর্শ করেনি। সতেজ তাঁর স্মৃতি, স্পষ্ট তাঁর বক্তব্য। …সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের ও নানা আলাপ-আলোচনা-বিতর্কের কথা, প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কেম্ব্রিজে ছাত্রজীবনের নানা কথা তিনি স্বচ্ছন্দে বলে গেলেন,… যা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ রসিকতার ছোঁয়ায় আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। যেমন, কথাপ্রসঙ্গে একবার বললেন, ‘এখন আমার চেহারা যেমনই হোক, বিশ্বাস করুন, সে সময় আমি দেখতে ভালোই ছিলাম।‘ সুভাষচন্দ্র যে সে-বয়সেই আর পাঁচজন ছেলের থেকে আলাদা ও দেশের মুক্তিসন্ধানে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, এ-কথা বোঝাতে গিয়ে বললেন, তাঁরা ইংল্যান্ডে ছাত্রাবস্থায় ছুটি পেলেই প্যারিসে ছুটতেন অপেরা দেখতে আর সুভাষচন্দ্র যেতেন আইরিশ বিপ্লবকাণ্ড অনুধাবন করতে আয়ারল্যান্ডে! এই সব কথাই তিনি বললেন স্বচ্ছন্দ ইংরেজিতে।“


ওই আলোচনাচক্রে এবং নেতাজি-জন্মদিনের অন্যান্য বছরের অনুষ্ঠানে খ্যাত অখ্যাত নানা মানুষের সান্নিধ্যের নানা দৃশ্য আজও ছায়াছবির মত যেন চোখে ভেসে ওঠে। উত্তরপশ্চিম সীমান্ত ও আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি পথে সুভাষচন্দ্রকে পথ দেখিয়ে যিনি নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ভগতরাম তলোয়ারকে দেখেছি ঘুরে বেড়াচ্ছেন ও ওই সেমিনারে আগত নানাজনের সঙ্গে আলাপ করছেন। তিনি একদিন অন্য একজন বক্তার ভাষণের সূত্রে আলোচনাপ্রসঙ্গে এমন একটি তথ্য জানিয়েছিলেন, যা এর আগে কেউ জানতেন না, এখনো অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হবে। তিনি জানিয়েছিলেন, গোপনে ভারত থেকে নিষ্ক্রমণের পথে সুভাষচন্দ্র নাকি তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর ওই নিষ্ক্রমণের কথা পরিবারের বাইরে যে-একজন মাত্র ব্যক্তি জানতেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ। খুব সপ্ৰতিভ ছোটখাট চেহারার মানুষটি যে ওরকম একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন ভেবে রোমাঞ্চিত হয়েছি। একই রকম রোমাঞ্চকর অনুভূতি হয়েছিল নেতাজির দুটি গোপন অভিযানের দুই সঙ্গী শিশির বসু ও মেজর আবিদ হাসানকে দেখে। আলোচনাসভার মণ্ডপের মধ্যে এক সকালে দর্শকাসনে আমার থেকে মাত্র তিন চারটি আসনের ব্যবধানে দেখেছি বসে আছেন নেতাজির সামমেরিন যাত্রার সঙ্গী আবিদ হাসান, তাঁর কোলের ওপর রাখা কাপড়ের কিছু একটি পোশাক তিনি সুতো দিয়ে সেলাই করছিলেন আর তাঁর পাশে উপবিষ্ট দেখেছিলাম এক তরুণীকে।

আরেকদিন দুপুরবেলায় আলোচনা চলছিল শরৎ-বিভা প্যাভেলিয়ন নামে একতলার একটি ছোট বন্ধ হলে। সেখানে নেতাজির নির্দেশে তাঁরই পথ ধরে আফগানিস্তান যাত্রায় নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন বি ভি (বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স) নামক বিপ্লবী দলের সদস্য শান্তিময় গাঙ্গুলী। আলোচনাকক্ষটির সামনের আসনগুলি ভর্তি হযগিয়েছিল, ফলে আমরা কয়েকজন রবাহুত (অর্থাৎ যারা সেমিনারের নিয়মমাফিক তালিকাভুক্ত ডেলিগেট ছিলাম না) তরুণ ঢুকতে না পেরে কক্ষটির সামনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনছিলাম। দেখতে পেয়ে শিশির বসু আমাদের সামনে এসে প্রশ্ন করলেন, “ভেতরে আসতে চান?” আমি “হ্যাঁ” বলতেই তিনি তৎক্ষণাৎ ভেতরে গিয়ে ঘরটির পেছনের অংশের আরেকটি দরজা খুলে দিলেন। সেটা দিয়ে আমরা ঢুকে কিছুটা মাঝামাঝি সারির আসনে বসার সুযোগ পেলাম ও দেখলাম ঠিক আমার সামনের সারিতেই বসে আছেন আই এন এ-র ঝাঁসি-রানী বাহিনীর অধিনায়িকা ড. লক্ষ্মী সেগল, কৃষ্ণা বসু (লেখিকা ও শিশির বসুর পত্নী) প্রমুখ গণ্যজনেরা। মনে আছে সেদিন ইতিহাসের এই বীরাঙ্গনার দৃপ্তভঙ্গীতে চলন দেখে ও ভাষণ শুনে চমকিত ও বিমোহিত হয়েছিলাম।

এতগুলি বিখ্যাত মানুষের কথা বলার পর ওই সেমিনারের একজন সাধারণ দর্শকের কথা না বলে পারছি না, যিনি কোন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন না — একজন নিতান্তই ছা’পোষা বাঙালি। একদিন আলোচনা-চক্রের দুটি বৈঠকের মধ্যেকার বিরতির সময় বইয়ের স্টলে সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছি, দেখি এক টাকমাথা শামলাবরণ ছোটখাটো চেহারার মাঝবয়সী ভদ্রলোক, হাতে এক জার্মান লেখকের একটি গুরুগম্ভীর বই। স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি শরৎচন্দ্র বসুর ‘আই ওয়ার্নড মাই কান্ট্রিমেন’ বইটা নাড়াচাড়া করছেন এবং এর অতিরিক্ত দামের সমালোচনা করছেন। আমি তাঁর কথায় সায় দিতেই আলাপ হয়ে গেল। জানা গেল তাঁর নাম কানাই ভট্টাচার্য, বৈদ্যবাটীর বাসিন্দা। তারপর চট করে পকেট থেকে ১৫ টাকা বের করে শরৎ বসুর বইটা কিনে নিলেন।

এভাবে ক্রমে এই অসমবয়সী মানুষটির সঙ্গে আলাপ জমে গেল। নিজের কেনা প্রথম বইটা দেখিয়ে বললেন, ”শুধু শুধু কিনলাম বইটা, কিচ্ছু নেই এতে!” তারপর তিনি রিসার্চ ব্যুরোর কর্তৃপক্ষের নানারকম সমালোচনা করতে লাগলেন। ভদ্রলোকের বিচিত্র সব মতবাদও ক্রমশ জানা গেল। তাঁর ধারণা বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম থেকে আফ্রিকা — বিশ্বের সর্বত্র যা কিছু বড় বড় কাণ্ড ঘটছে, সবকিছুর পেছনে নাকি নেতাজিই রয়েছেন! কাগজে কোন দেশের কোন প্রতিনিধির নাকি ছবি বেরিয়েছিল, যিনি নেতাজির মতো দেখতে — এইসব বলতে লাগলেন। আজকের পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য নেতাজির এই অরণ্যদেব ভূমিকার রংবেরঙের গল্পকথা শুনলে কেউ আর অবাক হন না। কিন্তু আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে যখন গুমনামীবাবা ইত্যাদি গল্প কেউ শোনেনি, তখনও আজকের নেতাজি-ভক্তদের পূর্বসূরী এই ভদ্রলোক দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছেন, নেতাজি সে-বছরই ফিরে আসবেন এবং নেতাজির বিবাহের কথাও তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে চান না!

এরপর গেলাম নেতাজী সংগ্রহশালা দেখতে, ভদ্রলোকই দুজনের টিকিট কাটলেন। সেখানে জাপান থেকে আনা নেতাজির তরবারি দেখে তিনি বললেন, এটা যে নেতাজির তলোয়ার, তার প্রমাণ কী! এমিলিয়ে শেঙ্কেলের ছবি দেখে বললেন, ”ইনি যে নেতাজির স্ত্রী, তার প্রমাণ কী!” আমি তাঁকে কিছু পাল্টা যুক্তি বোঝাবার চেষ্টা করাতে শেষে বললেন, “আচ্ছা, আচ্ছা, নেতাজি তো আসছেনই, তখনই সব জানা যাবে।” আলোচনাচক্র শুরু হওয়ার পরও আমার পাশে বসে আমাকে জোরগলায় তিনি যখন এসব বোঝাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তখন অন্য সকলে কটমট করে আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন।
এরপর তিনি পকেট থেকে একটি কার্ড বের করে আমার হাতে দিলেন ও বললেন, “এটা দেখলে মনে পড়বে, একটা বেতালের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।” এরপর আলোচনায় আবার বিরতি। ভদ্রলোক তখন একজন রাশভারি চেহারার ডেলিগেটকে ব্যঙ্গের সুরে প্রশ্ন করলেন, “এতক্ষণ কী হল সব? ইংরেজিতে কীসব বলল বুঝতে পারলাম না!” সেই ভদ্রলোক অবাক হয়ে তাকাতেই পকেট থেকে আরেকটি কার্ড বের করলেন ও ওই ভদ্রলোককে দিয়ে বললেন, “মনে করবেন একটা বেতাল এটা দিয়েছিল!” তারপর হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে উঠে পড়ে তিনি বললেন, “যাই, বাড়িতে বউ আবার ভাববে রাস্তায় কী হল! নেতাজি ফিরে আসার আগে মরতে চাই না।” বলে হন হন করে বেরিয়ে গেলেন আমার এই অসমবয়স্ক ক্ষণেকের সঙ্গী।

এবার তাঁর কার্ডটির কথা বলি। এটি আসলে কাগজের ওপর হাতে লিখে তৈরি করা একটি টেমপ্লেট, ভিজিটিং কার্ডের আকারে প্রিন্ট করা। মাঝখানে নেতাজির একটি ছবি এবং তার চারপাশে নানা রকম বাণী ও কবিতা। একটি কবিতার নমুনা:- “প্রাণ-পূজারীরা আনো গো অভয়/ সময়ের সাজা আর নাহি সয়/কর সত্বর কালদুলালের সমস্যা সমাধান!” এর নিচে লেখা:- ‘জয় বাংলা জয় হিন্দ’।এই অদ্ভুত মানুষটির স্মৃতি আজও আমার মনে বেঁচে আছে নেতাজির মৃত্যুতে অবিশ্বাসী ও তাঁর ফিরে আসার প্রতীক্ষায় অধীর বাংলার অগণিত নামহীন প্রশ্নহীন নেতাজি-ভক্তদের একজন প্রতিনিধি হিসেবে। তার দেওয়া কার্ডটিও সযত্নে রাখা আছে আমার পুরানো ডায়েরির মধ্যে।

নেতাজি ভবন বা নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর সঙ্গে জড়িত আমার আর একটি স্মৃতিও উল্লেখ করা যায়, যা ‘সততই সুখের’ নয়। পারিবারিক সূত্রে সুভাষচন্দ্রের একটি ছবি আমার হাতে এসেছিল, যা তখন পর্যন্ত কোথাও প্রকাশিত হয়নি। চল্লিশের দশকে সুভাষচন্দ্র যখন রাঁচিতে যান, তখন এই গ্রুপ-ছবিটি তোলা হয়। আমার মনে হয়েছিল এই ছবিটি নেতাজি ভবনের সংগ্রহশালায় যদি দেওয়া যায়, তাহলে অনেকে দেখার সুযোগ পাবেন ও সেই ইচ্ছে প্রকাশ করে আমি জামশেদপুর থেকে ড. শিশির বসুকে ১৯৭২ সালে একটি চিঠি লিখেছিলাম। তিনি চিঠিটির প্রত্যুত্তর দেন ও সেই সঙ্গে নেতাজি ভবনে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রের একটি বিজ্ঞপ্তিও আমাকে পাঠিয়ে দেন। তিনি লিখেছিলেন যে, নেতাজি সংগ্রহশালায় ছবিটি সংরক্ষণের ব্যাপারে তাঁরা আগ্রহী। তখন আমি ছবিটাকে বড় আকারে প্রিন্ট করিয়ে কলকাতায় নিয়ে যাই ও নেতাজি জয়ন্তীর অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে ড. বসুর সঙ্গে দেখা করে এই ছবিটি তাঁদের সংগ্রহশালায় কী ভাবে হস্তান্তর করব জিজ্ঞাসা করি। তিনি অত্যন্ত হালকাভাবে বলেন, “পোস্টে পাঠিয়ে দিন, কত লোকই তো এরকম পাঠাচ্ছে!” তাঁর কথার মধ্যে এমন একটা তাচ্ছিল্যের ভাব ছিল, যা আমার উৎসাহী তরুণ মনকে আহত করেছিল। আমি দেখেছিলাম নেতাজি ভবনের অনুষ্ঠানে কোন কোন ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে নেতাজি-সংশ্লিষ্ট এই জাতীয় জিনিসপত্র সংগ্রহশালার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে শিশির বাবুর হাতে তুলে দিতে। ওই বয়সের অনভিজ্ঞতাবশত আমার মনের কোণে হয়তো এরকম একটা আশা জন্ম নিয়েছিল যে, আমিও হয়তো ছবিটা অনুষ্ঠান-মঞ্চে তাঁর হাতে তুলে দেবার সুযোগ পাব। কিন্তু তাঁর এই কথা শুনে আমার উপলব্ধি হয়েছিল যে, খ্যাতিপ্রতিপত্তিসম্পন্ন লোকজন আর নেতাজি-অনুরাগী সাধারণ মানুষজন সম্পর্কে তাঁদের নীতি সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে ছবিটি নেতাজি সংগ্রহশালায় দান করার ব্যাপারে আমার উৎসাহ নির্বাপিত হয়ে যায় ও সেটি আমার কাছেই থেকে যায়। (বেশ কয়েক বছর পরে অবশ্য সত্যযুগ দৈনিকপত্রে নেতাজির জন্মদিনে আমার একটি লেখার সঙ্গে ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল।)

নেতাজি ভবনের [এলগিন রোড] অদূরেই ছিল – ১ নং উডবার্ন পার্কে সুভাষচন্দ্রের মেজদাদা শরৎ বসুর বাড়ি, যা নেতাজি ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজ-এরও দপ্তর। সেখানেও ওই সংস্থার উদ্যোগের নানা আলোচনা-প্রদর্শনী ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হতে দেখেছি। মনে আছে, সেখানে এক ছবির প্রদর্শনীর কথা, যাতে একটি কার্টুনে শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবি’র শেষের সেই বিখ্যাত বাক্যগুলোর [“তুমি তো আমাদের মতো সোজা মানুষ নও!…” ইত্যাদি] সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল নেতাজির জীবনের নানা রোমাঞ্চকর অধ্যায়গুলোকে। এই চিত্রমালার শিল্পী ছিলেন কাফী খান। এই সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে, এইসব সুধীজন ও ঐতিহাসিক চরিত্রদের স্মৃতিচারণা, আলোচনা ও বিশ্লেষণ শুনে আর পড়ে এবং নেতাজির স্মৃতিবিজড়িত ঐ সব স্থান স্বচক্ষে দেখেই শুরু হয়েছিল আমার উত্তর-কৈশোরের সুভাষ-অনুসরণ।

সুভাষ- সহযোগী ও লেখকদের সঙ্গে পত্রালাপ

আগেই বলেছি, ষাটের দশকের মাঝামাঝি প্রকাশিত নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীর বই ‘নেতাজি সঙ্গ ও প্রসঙ্গ’ বইটির প্রথম দুটি খণ্ড পড়ার সুযোগ যখন পাই, তখন আমি নিতান্তই এক স্কুলবালক। শুধু নেতাজির জীবনকাহিনীই নয়, তাঁর ছবির ওপরও আমার ছিল প্রবল আকর্ষণ! পত্রপত্রিকায় তাঁর বিষয়ে যা কিছু পেতাম সংগ্রহ করে রাখতাম। বিশেষ করে খবর কাগজ থেকে কেটে রাখা নেতাজির ছবিগুলো দিয়ে একটি অ্যালবাম তৈরির পরিকল্পনা ছিল আমার। ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত নরেন্দ্রনারায়ণের বইটির বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল বইটিতে নেতাজির ছবি থাকবে। কিন্তু কী কারণে জানিনা, স্কুলের লাইব্রেরীতে আনা বইটির প্রথম খণ্ডে কোনো ছবি ছিলনা। সেই বয়সে বিশালায়তন বইটি পড়ে শেষ করার আগেই তাতে কোনো ছবি না থাকাটা আমার কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি মনে হয়েছিল। ফলে আমি লেখককে ওই অভিযোগ জানিয়ে একটি চিঠি লিখে বসলাম। বইটির বিষয়বস্তু বা কোনো বক্তব্য নয়, কেবলমাত্র কোনো ছবি না থাকাটা যে কোনো পাঠকের ক্ষোভের কারণ হতে পারে, সেটা সম্ভবত লেখক কল্পনা করতে পারেন নি, তিনি তো আর জানতেন না যে, পত্রলেখক হাফপ্যান্ট পরিহিত এক অর্বাচীন স্কুল পড়ুয়া কিশোর! তিনি ধৈর্য ধরে যথাযথ সৌজন্য সহকারে আমার পোস্টকার্ডটির জবাব দিয়েছিলেন ও লিখেছিলেন:- “আপনার চিঠি আমি প্রকাশকের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। …আপনার মনের অবস্থা বুঝে সমবেদনা প্রকাশ করা ছাড়া আমার আর সম্ভবত করবার কিছু নেই।…” (চিঠির তারিখ ১৫.৯.৬৬) এটিই ছিল কোনো গ্রন্থকারকে লেখা আমার প্রথম চিঠি।

পরবর্তীকালে (১৯৭০-৭৩) নেতাজী বিষয়ক অন্য যে-গ্রন্থকারকে আমি চিঠি লিখেছিলাম তিনি স্বনামধন্য নারায়ণ সান্যাল। তাঁর ‘আমি নেতাজিকে দেখেছি’‘নেতাজি রহস্য সন্ধানে’ এই দুটি বই পড়ে আমি লেখককে যে ক’টি চিঠি লিখেছিলাম তাতে তাঁর লেখা সম্পর্কে মুগ্ধ প্রশস্তির সঙ্গে কিছু প্রশ্নও ছিল, যার বিস্তারিত আলোচনার পরিসর এখানে নেই। প্রথম বইটি সম্পর্কে আমার প্রথম চিঠিটির শুরুতে আমি লিখেছিলাম, ”আপনি যে গ্রন্থ রচনা করেছেন, তা যে অনেক অজ্ঞাত অখ্যাত তথ্যাবলী ও ঘটনার উপস্থাপনায় ইতিহাসের মূল্যবান দলিল, শুধু তাই নয়, ভাষা ও ভাবের প্রসাদগুণে এবং চিন্তা-বিশ্লেষণের বৈদগ্ধ্যে বাংলা সাহিত্যেরও একটি ভাস্বর সামগ্রীরূপে গণ্য হবে।” সহৃদয়ভাবে আমার সবগুলি চিঠিরই জবাব দিয়েছিলেন তিনি। প্রথমোক্ত বইটির আখ্যান-অংশের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাবলীর কতটুকু ইতিহাস-সমর্থিত এবং কতটা লেখকের নিজস্ব কল্পনা, সে সম্পর্কে যত্নসহকারে আমার কৌতূহল নিরসন করেছিলেন তিনি। এই বইটিতে গান্ধীজীর একটি টেলিগ্রামের বাংলায় ভাষান্তর করতে তাঁর কিছু ভুল হয়েছিল, আমি সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করায় তিনি তা মেনে নিয়েছিলেন ও পরের সংস্করণে সংশোধন করবেন বলেছিলেন। আরেকটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “আপনি যেসব বিষয়ের অবতারণা করেছেন তার জবাব দিতে গেলে কিছু বইপত্র ঘাঁটতে হবে। অথচ আপনার চিঠির জবাব দু’মাসে না পেয়েও আপনি অন্য কিছু মনে করতে পারেন, তাই এই পত্র। একটা কথা বলি। আপনার মত সিরিয়াস পাঠকের চিঠি আমি খুব কমই পেয়েছি। এত গভীরভাবে কেউ আমার বই পড়েছে জেনে উৎসাহ বোধ করছি। আমার পরবর্তী পত্রে আপনার যাবতীয় প্রশ্ন সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করব।” (১৬-২-১৯৭৪)

এই সূত্রে মনে পড়ছে, এই পত্রালাপের প্রায় ১৫-২০ বছর পরে ওই বইটি অবলম্বনে রচিত নেতাজি বিষয়ক একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল কলকাতার রবীন্দ্র সদনে, যা আমি দেখতে গিয়েছিলাম। ওই অনুষ্ঠানে নারায়ণ সান্যাল স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন ও অনুষ্ঠান শেষে রবীন্দ্রভবনের সিঁড়িতে তাঁর সঙ্গে আমি আলাপ করেছিলাম। তখন অবশ্য অতীতের সেই পত্রালাপের কথা তিনি মনে করতে পারেননি।

সত্তরের দশকের শুরুতেই বিশিষ্ট গবেষক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর সঙ্গে আমার পত্রবিনিময়ের সূচনা হয়েছিল তাঁর ‘বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ’ গ্রন্থটির বিভিন্ন খণ্ডে প্রকাশিত নানা তথ্য নিয়ে আলোচনার সূত্রে। সাপ্তাহিক বসুমতী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র’ রচনাটির কিছু মন্তব্যের সূত্রে ১৯৭৬ সালে আমি তাঁকে একটি চিঠি লিখেছিলাম। সে সময় দেশ পত্রিকার সাহিত্য সংখ্যায় প্রকাশিত দিলীপকুমার রায়কে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠিতে সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে পাওয়া কিছু নতুন তথ্যের বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম ওই চিঠিতে। সেই সঙ্গে ওই ধারাবাহিক রচনাটি কবে বই হবে একথাও জানতে চেয়েছিলাম। এর জবাবে তিনি লিখেছিলেন যে, আমার উল্লিখিত রচনাটির গ্রন্থায়নের ব্যাপারটি “আপনাদের মত আমাকেও যন্ত্রণা দিচ্ছে” এবং জানিয়েছিলেন, তাঁর বিবেকানন্দ ও নিবেদিতা বিষয়ক গ্রন্থমালার সবগুলি খণ্ড প্রকাশ হয়ে যাবার পরেই তিনি এই কাজটিতে হাত দেবেন। (বস্তুত ১৯৯৭ সালে নেতাজি শতবর্ষে এই রচনাটির মুখ্য অংশ ‘সমকালীন ভারতে সুভাষচন্দ্র’ নামে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়।) এই প্রসঙ্গে একটি চিত্তাকর্ষক সংবাদের উল্লেখ করা যায়। শঙ্করীবাবুকে লেখা বিভিন্ন ব্যক্তির চিঠিপত্রের একটি বৃহৎ সংকলন ২০০০ সালে প্রকাশিত হয়, যাতে আমার উল্লিখিত চিঠিটি ছাড়া আরো কয়েকটি চিঠিও স্থান পেয়েছিল। এ থেকে বোঝা যায়, আমার মতো সামান্য ব্যক্তির চিঠিও শ্রী বসু কতটা যত্ন সহকারে রক্ষা করেছিলেন।

বর্তমান স্মৃতি বিবরণের তৃতীয় পর্বে উল্লিখিত ‘সুভাষ ম্মৃতি’ সংকলনগ্রন্থটিতে ছাপা কবি অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তীকে লেখা সুভাষচন্দ্রের একটি চিঠির একটি পৃষ্ঠার ছবি থেকে জেনেছিলাম যে, জার্মানিতে হিটলারের ভারত সম্পর্কে কুৎসার কোন একটি ঘটনার প্রতিবাদের কথা লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্র, যার পুরো কাহিনীটি জানতে চেয়ে আমি অমিয়বাবুকে ১৯৭৮ সালে একটি চিঠি দিয়েছিলাম এবং যথেষ্ট সহানুভূতি ও গুরুত্বের সঙ্গে তিনি তার জবাব দিয়েছিলেন। আমার তথ্য সংক্রান্ত প্রশ্নগুলির সুনির্দিষ্ট ও যথাযথ জবাব দিতে না পারায় তিনি আমাকে যা লিখেছিলেন তার একটি অংশে ছিল, “সেই সময়ে হিটলরের জর্মনিতে ভারত সম্পর্কীয় মিথ্যাবাদকে বারেবারে আমরা খণ্ডন করেছি ও সুভাষচন্দ্রের সহযোগিতা পেয়েছি।’ তিনি আরো লিখেছিলেন, “আপনার চিঠির যথোপযুক্ত জবাব দিতে না পেরে লজ্জিত আছি। কিন্তু উপায় নেই। নিশ্চয়ই কয়েক জায়গায় (বিশেষ করে নেতাজী ভবনে) অনুসন্ধান করে আপনি তথ্যোদ্ধার করতে পারবেন। নেতাজী সম্বন্ধে যাঁরা শ্রদ্ধাবান ও সুপণ্ডিত তাঁদের কাছেই যাবেন।”

এ প্রসঙ্গে আরো দু একটি কথা মনে পড়ছে, যা এখানে উল্লেখ করছি শুধু বাঙালির বৌদ্ধিক জগতের প্রচলিত সংস্কৃতিটি সম্পর্কে কীভাবে আমার ধারণা হয়েছিল, তা বোঝাবার জন্য। আমার সবগুলি জ্ঞাতব্য প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব দিতে না পেরে অমিয়চন্দ্র সহৃদয়তাবশত আমাকে বামপন্থী রবীন্দ্র-গবেষক নেপাল মজুমদারের ঠিকানা দিয়ে তাঁকে এ ব্যাপারে লিখতে বলেন এবং আমার চিঠিটিও তাঁকে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু আমি এ ব্যাপারে নেপালবাবুকে একাধিকবার চিঠি লিখলেও তিনি সেগুলির উত্তর দেওয়ার কোন প্রয়োজন বোধ করেননি। আমার একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল পূর্বে উল্লিখিত ‘সুভাষচন্দ্র’ জীবনীগ্রন্থের লেখক পবিত্রকুমার ঘোষকে চিঠি লিখেও। এসব অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে শিখেছিলাম যে, সাহিত্যসংস্কৃতি-অভিমানী বাঙালির সারস্বত জগতের সকলেই অমিয়চন্দ্র, নারায়ণবাবু, বা শঙ্করীপ্রসাদ বসুর মতো সুভদ্র পাঠক-বন্ধু ছিলেন না।

নেতাজি সংক্রান্ত অধ্যয়ন প্রসঙ্গে আমার পত্রালাপের কাহিনীতে সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য নাম আনন্দমোহন সহায়, যার সঙ্গে ১৯৭৮-৭৯ সালে আমার কয়েকটি পত্রবিনিময় হয়েছিল। আজাদ হিন্দ সরকারের সচিব ও নেতাজির সহকর্মী হিসেবে সুপরিচিত এই বৃদ্ধ স্বাধীনতাসংগ্রামীকে যেসব বিষয়ে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, তার একটি ছিল আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘জনগণমন’ গানটির হিন্দি অনুবাদে সহায়জির কোন ভূমিকা ছিল কিনা। অত্যন্ত সহৃদয়ভাবে এই প্রবীণ মানুষটি তার উত্তর দিয়েছিলেন এবং তাঁর ভিয়েতনামে ভারতের রাষ্ট্রদূত থাকার সময়কার পুরানো সরকারী লেটারহেডে নিজের হাতে টাইপ করে কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ পাঠিয়েছিলেন। তাতে আমার জ্ঞাতব্য বিষয়ের অতিরিক্ত নেতাজির জীবন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের বেশ কিছু অজানা ও মূল্যবান সংবাদও আমাকে তিনি স্বত:প্রবৃত্তভাবে জানিয়েছিলেন, যা তখন অনেকের কাছেই অজানা ছিল এবং আজও রয়েছে বলা যায়। এরকম দুটি বিষয় হচ্ছে, চল্লিশের দশকে ভারতত্যাগ করার আগেই সুভাষচন্দ্রের আনন্দমোহনের মাধ্যমে জাপান সরকার সম্পর্কিত নানারকম সংবাদ সংগ্রহ এবং বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর বিকল্প আশ্রয়স্থল খুঁজে বের করার ব্যাপারে অনুসন্ধানের জন্য যুদ্ধ শেষ হবার আগে থেকেই নেতাজির প্ৰচেষ্টার কাহিনী।

জীবিত না মৃত? : রহস্য-গল্পের কল্পকাহিনী

১৯৪৫ সালে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির নেতাজির মৃত্যুর প্রচারিত সংবাদ যে অধিকাংশ মানুষই বিশ্বাস করেনি এবং ১৯৫৬ সালে শাহনওয়াজ কমিটি ওই দুর্ঘটনার সপক্ষে রায় দেবার পরেও উত্তরবঙ্গে সাধুর ছদ্মবেশে নেতাজীর বেঁচে থাকার কাহিনী বা তাঁর ফিরে আসার নানা জল্পনাকল্পনার মধ্য দিয়ে যে আমাদের সম্পূর্ণ শৈশবকালটা অতিবাহিত হয়েছিল সেসব কথা আগেই বলেছি। এইসব লাগামহীন কল্পগল্প আরো গতিলাভ করেছিল ১৯৬৫ সালে আনন্দবাজার পত্রিকা ও হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড-এ প্রকাশিত ভারতের বিদেশ দপ্তরের প্রাক্তন অফিসার ড. সত্যনারায়ণ সিংহের এক ধারাবাহিক রচনার মাধ্যমে। ‘রহস্যের অন্তরালে’ শিরোনামে আনন্দবাজারে প্রকাশিত ওই কাহিনীর মূল দাবি ছিল ১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট তাইহোকুতে কোন বিমান দুর্ঘটনাই ঘটেনি এবং নেতাজি তখন সোভিয়েত রাশিয়ার আশ্রয় নেবার অভিপ্রায়ে সায়গন থেকে রুশ অধিকৃত মাঞ্চুরিয়াতে চলে যান। তাঁর দাবি অনুযায়ী দাইরেনে কয়েক বছর আত্মগোপন করে থাকার পর যেখান থেকে স্তালিনের পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি সাইবেরিয়ার ইয়াকুটস্ক জেলে বন্দি ছিলেন। তিনি অবশ্য এসব দাবির কোন দলিলি প্রমাণ দাখিল করেন নি। বিভিন্ন বাস্তব ও কাল্পনিক নামধারী চরিত্রের সঙ্গে তাঁর নিজের কথোপকথনের মাধ্যমে আপাত বিশ্বাসযোগ্য আকর্ষণীয় শৈলীতে ও সপ্রতিভ ভাষায় এই গল্প উপস্থাপিত হয়েছিল। ফলে তা পাঠকসমাজে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে। এরপর থেকে নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে আবার নতুন তদন্তের যে দাবি সোচ্চার হয়ে ওঠে ,তার পেছনে এই রচনাটির অনেকটাই অবদান ছিল।

সে-সময় কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের কাছে বারবার যেসব জনপ্রতিনিধি এই দাবি সে সময়ে ক্লান্তিহীনভাবে তুলে যাচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন পশ্চিমবাংলার প্রজাসমাজতন্ত্রী দলের (পরে জনতা দল) সাংসদ অধ্যাপক সমর গুহ। এই কারণে তিনি নেতাজি অনুরাগী মানুষের কাছে একটি বিশেষ শ্রদ্ধার আসনে আসীন ছিলেন। তিনি যে শুধু নেতাজির মৃত্যুরহস্য নিয়েই সোচ্চার ছিলেন, এমন নয়। নেতাজির জীবনাদর্শ ও কর্ম সম্পর্কেও তাঁর নানা প্রবন্ধ প্রতিবছর ২৩শে জানুয়ারি বাংলা পত্র-পত্রিকাতে ছাপা হত। বর্তমানে যেসব রাজনীতিক নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী নেতাজির মৃত্যুরহস্য ইত্যাদি নিয়ে কালেভদ্রে আওয়াজ তোলেন, তাদের সঙ্গে এব্যাপারে সমর গুহর ছিল এক বিরাট তফাৎ।

এই পর্বে আমার হাতে পড়েছিল আরেকটি বই, যা বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর সংবাদে আমার অবিশ্বাসকে আরো বাড়িয়ে তোলে। ১৯৫৬ সালে শাহনওয়াজ কমিটির সদস্য ছিলেন সুভাষচন্দ্রের সেজদাদা সুরেশচন্দ্র বসু। ওই দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু হয়েছে, কমিটির বাকি দুই সদস্য এই সংবাদ মেনে নিলেও সুরেশ বসু একমত না হয়ে তাঁর আলাদা রিপোর্ট জমা দিয়েছিলেন এবং Dissentient Report নামে সেটি নিজের খরচে প্রকাশ করেন। সত্তরের দশকে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে এই বইটি আমি দেখতে পাই যার প্রথম পাতায় ছিল সুরেশবাবুর নিজের স্বাক্ষর। বইটি আমি বাড়িতে নিয়ে এসে পড়বার সময় অভ্যাস অনুযায়ী তার বিভিন্ন অংশের অনুলিপি করে, এমন কি নেতাজির বিমানের নকশা ইত্যাদিও নিজের হাতে এঁকে রেখেছিলাম।

যা-ই হোক, এসবের ফলে অবশেষে সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধী পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খোসলার নেতৃত্বে নেতাজির অন্তর্ধান সম্পর্কে দ্বিতীয়বার তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। সেই তদন্ত সম্পর্কে সমকালের জনমনে, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার মানুষের মধ্যে প্রচুর উত্তেজনা সৃষ্টির কথা আজও মনে আছে, আমার তরুণ মনও যার অংশীদার ছিল। কলকাতাতেও এই কমিশনের কয়েকটি বৈঠক বসেছিল। সেখানে হাজির হয়ে সত্যনারায়ণ সিংহ স্বয়ং তাঁর কাহিনী শুনিয়েছিলেন। নেতাজি-কাহিনী পরিবেশনে তাঁকে পাল্লা দিয়েছিলেন সৌরীন্দ্রমোহন গোস্বামী নামে আরেকজন সাক্ষী। তিনিও ১৯৪৫ সালের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নেতাজির উপস্থিতি এবং ড. রাধাকৃষ্ণান প্রমুখ নানা বিশিষ্ট ব্যক্তির মুখে নেতাজির বেঁচে থাকার কথা শোনার দাবি করেছিলেন, যদিও কোন দলিলি প্রমাণ তিনিও দিতে পারেননি। জনতার উৎসাহের আতিশয্যে শুনানির কাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ায় কলকাতার অধিবেশন শেষ পর্যন্ত বন্ধ রেখে খোসলাকে ফিরে যেতে হয়েছিল।

সব বাংলা সংবাদপত্রেই ফলাও করে তদন্ত কমিশনের শুনানির খবর প্রকাশিত হত। যুগান্তর ও আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে সব কর্তিকাই আমি খাতায় সেঁটে রাখতাম। বিমান দুর্ঘটনার অসত্যতা সম্পর্কে তখন আমি সিংহভাগ বাঙালির মতোই নিঃসন্দেহ ছিলাম এবং বয়সোচিত উৎসাহের বশে খোসলা কমিশনের সামনে কী কী জরুরী বিষয় উত্থাপন করা যেতে পারে, সে সম্পর্কে কিছু প্রস্তাব দিয়ে সাংসদ সমর গুহকে একটি চিঠিও লিখে বসেছিলাম। চিঠির শুরুর অংশের কিছুটা ছিল এরকম :- “ভারতীয় সংসদে কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে নেতাজির মর্যাদা আদায়ের জন্য আপনার সংগ্রাম আমরা বহুবার শ্রদ্ধার সঙ্গে লক্ষ করেছি। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সুভাষ-জীবনবাদ সম্পর্কে আপনার ভাষ্যও নেতাজি সম্পর্কে আপনার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও জ্ঞানের পরিচয় দেয়। … এই সিদ্ধান্ত ঘোষণায় সরকারকে বাধ্য করতে আপনার অবদান যে কতখানি, তা আমরা সহজেই বুঝতে পারি।” ইত্যাদি।

সেদিন আমি সমরবাবুকে কী কী তথ্য পাঠিয়েছিলাম, তার কোন প্রতিলিপি আমার কাছে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে, কমিশন যেন বিমান দুর্ঘটনার অকুস্থল তাইপে পরিদর্শন করে এবং কমিশনে ড. সত্যনারায়ণ সিংহ, আজাদ হিন্দ সরকারের প্রচারমন্ত্রী এস এ আইয়ার, নেতাজির ভ্রাতুষ্পুত্র ও রাজনীতিক অমিয় বসু প্রমুখ কয়েকজন ব্যক্তিকে যাতে সাক্ষ্য দেবার জন্য কমিশনে আহ্বান করা হয়, এই ব্যাপারগুলি দেখার জন্য আমি সমরবাবুকে অনুরোধ করেছিলাম। যদিও সেই চিঠি তিনি পেয়েছিলেন কিনা, নেতাজির বেঁচে থাকার মতো তারও কোন প্রমাণ আমি পাইনি, তবে পরবর্তীকালে সমরবাবু কমিশনের সঙ্গে তাইপে পরিদর্শন করেছিলেন ও আমার উল্লিখিত ড. সিংহ প্রমুখ কয়েকজন সাক্ষী হিসেবে কমিশনে উপস্থিতও হয়েছিলেন।

যা-ই হোক, প্রায় চার বছর তদন্ত চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বিচারপতি খোসলাও পূর্ববর্তী শাহনওয়াজ কমিটির সঙ্গে একমত হয়ে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুসংবাদকেই মান্যতা দিয়েছিলেন (১৯৭৪)। খোসলার রিপোর্টের নানা বক্তব্যকে খণ্ডন করে আনন্দবাজার পত্রিকায় বরুণ সেনগুপ্তের ধারাবাহিক প্রবন্ধমালা সে সময় খুব জনপ্রিয় হয়। স্বভাবতই এই রায় অধিকাংশ বাঙালির মতো আমাকেও খুশি করেনি। পরের বছর নেতাজি জয়ন্তীতে ‘সত্যযুগ’ দৈনিক কাগজটিতে আমি যে প্রবন্ধটি লিখি, তার বক্তব্য ছিল নেতাজি সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জনগণকে জানতে না দেওয়াই কংগ্রেসি সরকারের পুরানো নীতি এবং খোসলার রায়ে সেই নীতিরই প্রতিফলন হয়েছে। নেতাজির অন্তর্ধান বিষয়ে এটিই আমার লেখা প্রথম ও শেষ প্রবন্ধ।

[লেখকের পূর্ববর্তী রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Sukanya Bandyopadhyay
Sukanya Bandyopadhyay
1 month ago

পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। অত্যন্ত সুলিখিত প্রবন্ধ। অনবদ্য স্মৃতি-অর্ঘ্য শুধু নয়, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সম্বলিতও বটে। লেখাটির সবচাইতে ভাল বিষয় হলো, প্রাবন্ধিক কোথাও নিজের মত পাঠকের উপর চাপিয়ে দেননি। নিজের অনুসন্ধান ও অধ্যবসায়ের একটি বিশ্বাসযোগ্য দলিল পাঠকের সামনে রেখেছেন এবং তথ্যনিষ্ঠ উপস্থাপনায় পাঠকের মনে কিছু সঙ্গত প্রশ্ন জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
ওঁর উল্লিখিত বইগুলির মধ্যে একমাত্র হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখা গ্রন্থটির সঙ্গে আমার পরিচয় রয়েছে। শ্রদ্ধেয় কমিউনিস্ট নেতা নেতাজি সম্পর্কে তাঁর দলের মূল্যায়নের বিপ্রতীপে যে সাক্ষ্য লিখেছিলেন (এবং তার জন্য দলের একাংশের বিরাগভাজনও হয়েছিলেন), সেটি মনে রয়ে গিয়েছে।

1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x