
প্রথমেই বলে রাখি রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কথা মনে আনলেই দুঃখ লাগে বটে, কিন্তু তাঁকে অস্বীকার করার স্পর্ধা বা ইচ্ছা কোনোটই আমার আসে না । দ্বিজেন্দ্রলালের প্রসঙ্গে আমার প্রথমেই মনে পড়ে তাঁর রচিত গানগুলো, সেখানে অসামান্য সুর-ভাবনার জন্য। রবীন্দ্রনাথের গানের রূপের প্লাবন সত্ত্বেও দ্বিজেন্দ্রলালের গরিমা একেবারে স্বতন্ত্র। কথা আমাদের তেমন করে নাড়া দেয় না বটে, কিন্তু দেশী-বিদেশী সুরের মিশ্রণে তাঁর ঘরানায় আমাকে আপ্লুত করে রাখে। তাঁর দেশাত্মবোধক গানে পাই মাটির গন্ধ। কথায় এবং সুরে ব্যঙ্গ-কৌতুক রচনায় তাঁর নৈপুণ্য ছিল অসাধারণ। আমাদের সাহিত্য-শিল্প-সংগীত-শিক্ষা জগতে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তিনি আমাদের প্রণম্য। আজকের লেখাটা অবশ্য আমার মনের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতিভার আলোড়নের প্রকাশ নয় – শিরোনামই বলে দিচ্ছে এ একেবারেই দুই কবির সম্পর্কের রসায়ন । রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলাল, দুজনের সম্পর্কের তিক্ততার ইতিহাসটা আমাকে অন্তত ক্লান্ত করে, কিন্তু অবাকও করে, তাই এড়াতে পারি না । দুঃখ লাগে, যখন দেখি ‘জ্যোতির্ময় রবি’-কে আবৃত করার নিরলস প্রয়াসে তাঁর মতো উজ্জ্বল এবং প্রাণিত করা মানুষটিও ‘কালো মেঘ’-এর দলে যুক্ত হয়েছেন।
প্রথমদিকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দ্বিজেন্দ্রলালের সম্পর্ক ছিল মসৃণ। বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ, আলোচনায় শ্রদ্ধার কোনও ঘাটতি ছিল না। রবীন্দ্রনাথ অথবা দ্বিজেন্দ্রলালের ব্যক্তিগত উদ্যোগের কোনো অনুষ্ঠানে একে অপরকে নিমন্ত্রণে ত্রুটি থাকত না । রবীন্দ্রনাথকে করা দ্বিজেন্দ্রলালের কবিতায় নিমন্ত্রণের এমনই একটি উদাহরণ –
কল্য রবিবার রাত্রে ; সাড়ে সাতটায়
১ ব্যাঙ্কশাল স্ট্রীটে, ভারতীয় ‘ক্লাব’ ;
‘ড্যিনার’ ; – ব্যাপার সবই পূর্ববৎ প্রায় ;
ইচ্ছা গলযোগ করা মাত্র মিলে সবে ।
কদিনেরই বা জীবন ; তাও অনিশ্চিত । –
ঠিক নেই চলে যায় কোথায় কে কবে !
আমোদটা যে এ ঘোর অর্থশূন্য ভবে
যত করে নিতে পারে তত তার জিত ।
কেহ নৃত্যগীতবাদ্যে ; কেহ বন্ধু সহ
নম্র ‘ড্যিনারের’ মৃদুতর কলরবে ।
আমরা শেষোক্ত । – তবে করে অনুগ্রহ
আমাদের এই অতি সাধু মতলবে
রবিবাবু – আপনার যোগ দিতে হবে ।
‘গোরা’ উপন্যাসটি পড়ে উচ্ছ্বসিত দ্বিজেন্দ্রলাল ‘বাণী’ পত্রিকায় (১৩১৭, আশ্বিন-কার্তিক) ‘গোরা’ প্রবন্ধে লিখছেন, “উপন্যাসখানি Vicar of Wakefield ধরনের লিখিত । ইহা শুধু উপন্যাস নহে। ইহা ধর্মগ্রন্থ । একদিকে যেমন ৬০০ পৃষ্ঠা পড়িতে পড়িতে কেবল কৌতূহল বাড়িতে থাকে এবং পাঠ অসমাপ্ত করিয়া উঠিতে অনিচ্ছা হয়, অন্যদিকে ইহা হইতে অনেক শিক্ষালাভ করা যায় । এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের গৌরব।”
তা হলে সম্পর্কের অবনতির সূত্রপাতটা কোথায়? রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রলালের কাব্যের কিছু কিছু ত্রুটির উল্লেখ করলেও তাঁর ‘মন্দ্র’ কাব্য সম্পর্কে প্রশংসা করে লিখেছেন, “দ্বিজেন্দ্রলালবাবু বাংলা কাব্যভাষার একটি বিশেষ শক্তি দেখাইয়া দিলেন । তাহা ইহার গতিশক্তি । ইহা যে কেমন দ্রুতবেগে, কেমন অনায়াসে তরল হইতে গভীর ভাষায়, ভাব হইতে ভাবান্তরে চলিতে পারে, ইহার গতি যে কেবলমাত্র মৃদুমন্থর আবেশভারাক্রান্ত নহে, তাহা কবি দেখাইয়াছেন ।” কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলাল তো প্রধানত নাট্যকার, অথচ তাঁর নাটক সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ কিছু বলেননি। এটাই কি দ্বিজেন্দ্রলালের উষ্মার কারণ ? দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনীকার দেবকুমার রায়চৌধুরী অবশ্য এই মনোমালিন্যের জন্য ‘বঙ্গভাষার লেখক’ (১৩১১) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত রবীন্দ্রনাথের ‘আত্মকথা’কে দায়ী করেছেন । প্রশান্তকুমার পালের মতে, ‘বঙ্গভাষার লেখক’ গ্রন্থটি দ্বিজেন্দ্রলালেরই অহমিকাকে আহত করেছিল তাঁর জীবনী উক্ত গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় । তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথকে লেখা একটি অপ্রকাশিত চিঠির (১৭।৩।১৯০০) উল্লেখ করে প্রশান্তবাবু এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন – “দ্বিজেন্দ্রলালের উত্তেজনার মূল কারণ নিহিত ছিল এখানেই। তাছাড়া তাঁর মানসিকতা জটিলতা মুক্ত ছিল না।”

শুনুন কী লিখছেন দ্বিজেন্দ্রলাল – “কাল সন্ধ্যায় বালিগঞ্জ অভিমুখে গিয়ে বড় অপ্রতিভ হলাম । কেউ কোথাও নেই । শেষে সস্ত্রীক শকটারোহণে একেবারে পালিতদের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত । আমার সঙ্গে কেউ আর কথা কচ্ছে না বড় । কেবল অপমান কর্ব্বার যোগাড়ে আছে । আপিসের কার্য্যের নিষ্পেষণে বসে’ গিইছি । আর ত পেরে উঠিনে ।… আপনি তো বেশ সুখে আছেন । আমার ঐ রকম একটা সুবিধা কোরে দিতে পারেন ? শারীরিক অবস্থা আমার নেহাইৎ মন্দ নয় । কিন্তু মানসিক তা আর বলে কাজ নেই । যেরকম অবস্থা দাঁড়িয়েছে কার উপর রাগটা ঝাড়ি বুঝে উঠতে পাচ্ছিনে।” এই সূত্রে প্রশান্তবাবুর মন্তব্য – “জীবিকার ভাবনা-শূন্য জমিদার-পুত্র রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কে অনেকেই ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন, যেন এই ভাবনা না থাকলেই তাঁর মতো সাহিত্যিক গণ্ডায় গণ্ডায় গজিয়ে উঠত ।”
দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে দুর্নীতিমূলক এবং লালসাপূর্ণ হিসাবে অভিহিত করেছিলেন তো বটেই, অন্যান্য অনেক অভিযোগ জানিয়েও একটি চিঠি লিখেছিলেন । চিঠিটির সন্ধান না পেলেও রবীন্দ্রনাথের উত্তর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলি পরিষ্কার । অভিযোগগুলি –
১) দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের স্তাবকবৃন্দের মধ্যে ভর্তি হতে পারবেন না ।
২) অপ্রিয় সত্য বলাটা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অহঙ্কার ।
৩) সাধারণের ধারণা এই যে, রবীন্দ্রনাথের পরিবারের সদস্যরা অহঙ্কৃত ।
৪) রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে নিজেদের নাটকেরই অভিনয় হয় । সেটা self advertising ।
৫) সঙ্গীত সমাজে রবীন্দ্রনাথের লেশমাত্র কর্তৃত্ব নেই ।
৬) রবীন্দ্রনাথ আত্মজীবনী লিখে অহমিকা প্রকাশ করেছেন ।
৭) সত্যেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করে তাঁকে advertise করে বেড়ান ।
৮) আদিব্রাহ্মসমাজে রবীন্দ্রনাথের পরিবারের রচিত গানই একমাত্র গাওয়া হয় ।
সংযম এবং ভদ্রতার নিদর্শন রেখে রবীন্দ্রনাথ ছয় পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ পত্রে দ্বিজেন্দ্রলালকে উত্তর দিয়েছিলেন । চিঠিটা শুরু করেছিলেন এইভাবে –“আপনি আমার স্তাবকবৃন্দের মধ্যে ভর্ত্তি হইতে পারিবেন না এ কথাটা এতটা জোরের সঙ্গে কেন যে বল্লেন আমি ভাল বুঝতে পারলেম না । ‘আপনার নিন্দুকের দলে আমি যোগ দিতে পারব না’ একথাও তো আপনি বলতে পারতেন ।’ আর শেষে লিখেছেন – “আপনি আমার এবং আমাদের সম্বন্ধে আপনার মনের ভাব অকুণ্ঠচিত্তে আমার এবং সর্ব্বসাধারণের সমক্ষে ঘোষণা করতে পারেন আমাকে এই কথা বলে সতর্ক করে দিয়েছেন – ভালই করেছেন – আমার এ বয়সে আমি যদি কোনো শিক্ষা পেয়ে থাকি তবে আশা করি আপনার অপ্রিয় আচরণ আমার পক্ষে দুঃসহ হবে না । ইতি ২৩শে বৈশাখ ১৩১২ ।
আর একটি প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে । দ্বিজেন্দ্রলাল ইংলন্ড থেকে কৃষিবিদ্যায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশে ফেরা মানুষ। কিন্তু তাঁর এই শিক্ষা বা কোনও অভিজ্ঞতা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করার তেমন সুযোগ ঘটেনি। এমন কি শিলাইদহে আলুচাষের বিষয়ে তাঁর দেওয়া পরামর্শ ফলপ্রসু না হওয়ায় রথীন্দ্রনাথ লিখছেন – “Father was careful never again to seek agricultural advice from his friend.” এটাও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অসন্তোষের কারণ হতে পারে । এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে । সেখানে বর্ষাকালে ধান কাটার উল্লেখকে দ্বিজেন্দ্রলাল ব্যঙ্গ করেছিলেন, যদিও পরক্ষণেই বলেছেন, “এরূপ হইতে পারে যে কোন স্থানে কোন বৎসরে কেহ শ্রাবণ-মাসে আশু ধান কাটিয়াছে। কিন্তু এরূপ exceptional instance উপমায় দেয় না।” এই প্রসঙ্গে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে রবীন্দ্রনাথ পরে লিখছেন (১৫।১০।১৯৩২) “… যেমন ‘সোনার তরী’ কবিতাটি। ছিলাম তখন পদ্মার বোটে। জলভারনত কালো মেঘ আকাশে, ওপারে ছায়াঘন তরুশ্রেণীর মধ্যে গ্রামগুলি, বর্ষার পরিপূর্ণ পদ্মা খরবেগে বয়ে চলেচে, মাঝে মাঝে পাক খেয়ে ছুটেচে ফেনা। নদী অকালে কূল ছাপিয়ে চরের ধান দিনে দিনে ডুবিয়ে দিচ্চে। কাঁচা ধানে বোঝাই চাষীদের ডিঙি নৌকা হূহু করে স্রোতের উপর দিয়ে ভেসে চলেচে। ঐ অঞ্চলে এই চরের ধানকে বলে জলি ধান। আর কিছুদিন হলেই পাকত। মনে আছে এগ্রিকালচারাল বিভাগের দ্বিজু রায় বিদ্রূপ করেছিলেন শ্রাবণ মাসের ধানের অসাময়িকতার উল্লেখ করে।
“ভরা পদ্মার উপরকার ঐ বাদল-দিনের ছবি ‘সোনার তরী’ কবিতার অন্তরে প্রচ্ছন্ন এবং তার ছন্দে প্রকাশিত।”
আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্রমশ ভাঙতে ভাঙতে নিজেকে গড়তে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে উত্তরণ, শিল্প-সাহিত্য-সংগীত, এমনকী সামগ্রিকভাবে জীবনবোধের মধ্যে তাঁর যে আধুনিকতার আবিষ্কার – সেই মনস্কতার তল পেতে দ্বিজেন্দ্রলালের আরও দীর্ঘ জীবনের প্রয়োজন ছিল। দূরত্বের সূত্রপাত ঠিক এখান থেকেই। রবীন্দ্রনাথের ‘কেন যামিনী না যেত জাগালে না’ বা ‘সে আসে ধীরে’-র মতো গানকে দ্বিজেন্দ্রলাল অভিহিত করে বললেন – ‘লম্পট বা অভিসারিকার গান’! তাঁর কথায়, “রবিবাবুর কবিতায় বৈষ্ণব কবিদিগের ভক্তিটুকু নাই, লালসাটুকু বেশ আছে।” তাঁর আরও বক্তব্য, “নারী জাতিকে দেখিয়া এই কবির মাতৃত্বের কথা মনে পড়ে না। নারী জাতিকে দেখিয়া কেবল তাঁহার ‘মরমে গুমরি মরিছে কামনা কত।’” ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্যটির অসামান্য কাব্যগুণের প্রশংসা করলেও তাঁর মতে “এ পুস্তকখানি দগ্ধ করা উচিত।” কারণ, “রবীন্দ্রবাবুর চিত্রাঙ্গদার সম্ভোগ অভিসারিকার সম্ভোগ। ‘অশ্লীলতা’ ঘৃণার্হ বটে। কিন্তু ‘অধর্ম’ ভয়ানক।”

লিখতে আর ইচ্ছা করে না সেই সব অসংযমী ভাষা, যা দিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেমে এসে রবীন্দ্রনাথকে ক্ষত-বিক্ষত করেছিলেন। দুঃখ নিশ্চয় পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু কোনও অবস্থাতেই তাঁর কাছ থেকে কোনও ক্রুদ্ধ, অসংযমী প্রতিক্রিয়া আমরা পাই নি। আমরা তো দেখেছি, এমন নানা মানুষের ক্ষেত্রে, নানা আঘাতে রবীন্দ্রনাথ শান্ত, সমাহিত এবং অবিচল। যত বিরুদ্ধতাই আসুক, যথার্থ মানুষকে যথার্থ শ্রদ্ধা জানাতে রবীন্দ্রনাথ কোনও কার্পণ্য করেন নি। শান্তিনিকেতনের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নতুন বই লিখলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর লেখা বই পড়ানো হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। অথচ ১৩১৬ সালের ১লা ভাদ্র ক্ষিতিমোহন সেনকে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন – “দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রণীত ইংরাজি শিক্ষার ৩ খানি বই আপনার কাছে পাঠাই – যদি উপযুক্ত বোধ করেন তবে বিদ্যালয়ে ধরাইবেন। অজিত যেন এ বইয়ের প্রতি অবজ্ঞা না করেন বা মনে কোনো বিরুদ্ধতা না রাখেন। সুবিচার করিয়া যেটি ভাল বোধ করেন তাহাই করিবেন – সত্যেশ্বরকেও [নাগ] দেখাইবেন। হয়ত ইংরাজি সোপানের চেয়ে ইহা কাজের হইতে পারে।” এই উদ্ধৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রশান্তকুমার পাল মন্তব্য করেছেন – “দ্বিজেন্দ্রলালের Lessons in English গ্রন্থটির তিনটি খন্ড 20 Dec 1907, 2 may 1908 ও 20 Jan 1909 তারিখে প্রকাশিত হয়। দ্বিজেন্দ্রলাল নিজে ও তাঁর বন্ধুবর্গ এই সময়ে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে যা-সব লিখেছিলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত চিঠিতে প্রকাশিত মনোভাব অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।”
আমরা বুঝতে পারি বিদেশে রবীন্দ্রনাথের খ্যাতির বিস্তারে অনেকেই ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ও চুপ করে থাকেন নি। রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর ভক্তদের ব্যঙ্গ করে লিখলেন ‘আনন্দ বিদায়’ নামে একটি নাটিকা। বইটির ভূমিকায় দ্বিজেন্দ্রলাল লিখলেন – “…যদি কোন কবি কোনরূপ কাব্যকে সাহিত্যের পক্ষে অমঙ্গল বিবেচনা করেন, তাহা হইলে সেইরূপ কাব্যকে সাহিত্যক্ষেত্র হইতে চাবকাইয়া দেওয়া তাঁহার কর্তব্য।” এটির অভিনয়ের কথা শুনে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যাকে রবীন্দ্রনাথ লেখেন – “দ্বিজেন্দ্রবাবুর জন্য আমি সত্যই দুঃখ বোধ করি। আমি এদেশে খ্যাতিলাভ করব কল্পনাও করিনি, সুতরাং সেজন্যে অগ্রসর হয়ে আসিনি – দৈবক্রমে জুটে গিয়েছে।… দ্বিজেন্দ্রবাবু যখন এ দেশে যশ উপার্জ্জন করবেন তখন আমি তাতে অন্তরের সঙ্গে সুখী হবো, এ আমি নিশ্চয় বলতে পারি। আমাদের দেশে যে-কেউ যেটুকু সফলতা লাভ করতে পেরেছেন সে যে আমাদের প্রত্যেকেরই। দ্বিজেন্দ্রবাবুর প্রতিভা কি তাঁর একলার সামগ্রী? তিনি যেখানে মহৎ সেখানে সে-মহত্ত্ব আমাদের সকলেরই, কিন্তু যেখানে তিনি ক্ষুদ্র, সেখানেই তিনি স্বতন্ত্র।”

১৯২৭ সালের জানুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ দিলীপকুমার রায়কে একটি চিঠিতে লিখছেন – “…আমি তোমাকে এই কথাটা জানিয়ে দিতে চাই যে, কোনো দিনই তোমার পিতার বিরুদ্ধে কারো সঙ্গে আলোচনা করিনি। তার কারণ যার কাছ থেকে আমি কোনো ক্ষোভ পাই তার সম্বন্ধে আমি সর্বপ্রযত্নে আত্মসংবরণ করে থাকি। তোমাদের মতো যাদের আমি ভালোবাসি তাদের কখনো কখনো নিন্দা করা আমার পক্ষে অসম্ভব নয়, কিন্তু যাদের সঙ্গে আমার কোনো প্রতিকূলতা আছে তাদের নিন্দায় আমি পারতপক্ষে যোগ দিই নে। তোমার পিতাকে আমি শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধা করেছি। সেকথা জানিয়ে তাঁকে ইংলন্ড থেকে আমি পত্র লিখেছিলাম, শুনেছি তিনি সে-পত্র মৃত্যুশয্যায় পেয়েছিলেন এবং তার উত্তর লিখেছিলেন। সে-উত্তর আমার হাতে পৌঁছয় নি।”
১৯১৩ সালে মাত্র উনপঞ্চাশ বছর বয়সে দ্বিজেন্দ্রলালের মৃত্যুতে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘স্মৃতি-পূজা’ প্রবন্ধে লেখেন – “তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্ব্বে তিনি দু একখানি পত্র লিখতে ব্যস্ত ছিলেন – তার মধ্যে আমার ভ্রাতা রবীন্দ্রনাথের নামে একটি পত্র। সেই লেখা সমাপ্ত হবার পরক্ষণেই যেন হঠাৎ তাঁর উপর বজ্রপাত হল…তারপর যারা কাছে ছিল, তারা এসে তাঁর উপর ঘড়া ঘড়া জল ঢালতে লাগল – তিনি যে লেখাগুলি লিখে গিয়েছিলেন, সব নষ্ট হয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথকে যে পত্র লিখেছিলেন, তার নামটি কেবল পড়বার মত ছিল – ভিতরকার কথাগুলো আর পাওয়া গেল না। এই দুই কবির মধ্যে কিছুকাল মতান্তর মনান্তর ঘটেছিল – এই পত্রই বুঝি বিচ্ছেদের পর পুনর্মিলনের চেষ্টা – বিগ্রহের পরে এই সন্ধিপত্র। কিন্তু তাঁর বাল্যবন্ধুর প্রতি উদ্দিষ্ট এই শেষ কথাগুলি চিরদিনের জন্য কালসাগরে বিলীন হয়ে গেল, কি আপশোষ! ” কিন্তু কী লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ? আশ্চর্য, ওই সময় ইংলন্ড থেকে বিশ্ববিখ্যাত কবির লেখা চিঠির কোনও প্রতিলিপি নেই? নাকি রবীন্দ্রনাথই ইচ্ছে করে তা রাখেন নি! এই প্রসঙ্গে স্মর্তব্য, দ্বিজেন্দ্রলালের মৃত্যুর (৩ জ্যৈষ্ঠ ১৩২০ । ১৭ মে ১৯১৩) পর দেবকুমার রায়চৌধুরী তাঁর যে জীবনীটি (দ্বিজেন্দ্রলাল, ১৩২৪) লেখেন রবীন্দ্রনাথ তার ভূমিকা লিখে শেষে বলেছিলেন – “দ্বিজেন্দ্রলাল সম্বন্ধে আমার যে পরিচয় স্মরণ করিয়া রাখিবার যোগ্য তাহা এই যে আমি অন্তরের সহিত তাঁহার প্রতিভাকে শ্রদ্ধা করিয়াছি এবং আমার লেখায় বা আচরণে কখনও তাঁহার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করি নাই । – আর যাহা কিছু অঘটন ঘটিয়াছে তাহা মায়া মাত্র, তাহার সম্পূর্ণ কারণ নির্ণয় আমি তো পারিই না, আর কেহ পারিবেন বলিয়া আমি বিশ্বাস করি না ।”

মনে আছে, ১৯৮০ সালে তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে কবি-পুত্র দিলীপকুমার রায় গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশনে একটি অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ-দ্বিজেন্দ্রলাল সম্পর্কের যাবতীয় তিক্ততার ইতি টেনে প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছিলেন। স্বীকার করেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর পিতার আচরণ সঙ্গত ছিল না। পিতার হয়ে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
ঋণ –
১) রবীন্দ্রজীবনী – ২ / প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
২) রবিজীবনী – ৪,৫,৬ / প্রশান্তকুমার পাল
৩) চিঠিপত্র – ১৪
৪) পত্রাবলী – রবীন্দ্রনাথ ও দিলীপকুমার রায় / সাহিত্য সংখ্যা ‘দেশ’ ১৩৮৩
৫) ঐ / ঐ ১৩৮৪
৬) রবীন্দ্র-রচনাবলী -১৬ / পঃবঃ সরকার

