শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

প্রতিদিন শত তুচ্ছের মাঝে আড়ালে আড়ালে

প্রতিদিনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ অতি সামান্য ঘটনা থেকে কিভাবে উৎসারিত হয় অসামান্য নান্দনিক সৃষ্টি তার বহু দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের গানরচনার ইতিবৃত্তে। তেমনই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সুপরিচিত এই গানটি : আমার কণ্ঠ হতে গান কে নিল ভুলায়ে। এই গানটি রচনার উপলক্ষ হয়ত সকলেরই জানা। তবু যদি কারও অজানা থাকে তাই এর নেপথ্য কাহিনিটি তুলে ধরলাম। যাদের জানা আছে তাঁরা মার্জনা করবেন। শেষে গানটি সম্বন্ধে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেব।

আমার কণ্ঠ হতে গান কে নিল ভুলায়ে,

সে যে বাসা বাঁধে নীরব মনের কুলায়ে॥

মেঘের দিনে শ্রাবণ মাসে যূথীবনের দীর্ঘশ্বাসে

আমার-প্রাণে সে দেয় পাখার ছায়া বুলায়ে॥

যখন শরৎ কাঁপে শিউলিফুলের হরষে

নয়ন ভরে যে সেই গোপন গানের পরশে।

গভীর রাতে কী সুর লাগায় আধো-ঘুমে আধো-জাগায়,

আমার স্বপন-মাঝে দেয় যে কী দোল দুলায়ে॥

গানটি রচনার উৎস নির্দেশ করেছেন শ্রী শান্তিদেব ঘোষ মহাশয়।

“১৩২৯ সালে কলকাতায় বিশ্বভারতীর তরফ থেকে ‘বর্ষামঙ্গলে’র আয়োজন উপলক্ষে অনেক নতুন বর্ষার গান রচিত হয়েছিল। আমরা সব গানের দল কিছুদিন পূর্বেই জড়ো হয়েছি। খুব জোর মহড়া চলেছিল, জোড়াসাঁকোর বাড়ি সরগরম হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে একদিন হঠাৎ ঠাণ্ডায় গুরুদেবের গলা গেল বসে, বর্ষামঙ্গলে তাঁর আবৃত্তি ইত্যাদি ছিল প্রধান আকর্ষণ, ভাঙা গলা নিয়ে মহা ভাবনায় পড়লেন — নানাপ্রকার ওষুধ পাঁচন নিজে খাচ্ছেন, আমাদেরও খাওয়াচ্ছেন, গলা যাতে না ভাঙে। সেই ভাঙা গলায় একটি গান রচনা করে দিনেন্দ্রনাথ ও আমাদের সকলকে ডেকে শিখিয়ে দিলেন সন্ধ্যায় গাইবার জন্য। গানটি হল ‘আমার কণ্ঠ হতে গান কে নিল ভুলায়ে।’

(শান্তিদেব ঘোষ, রবীন্দ্রসঙ্গীত, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলিকাতা ২০০৯, পৃ ১৯৮ -১৯৯)

এবার ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা। প্রাথমিক পাঠেই দেখা যাচ্ছে গানের কথাবস্তুর সঙ্গে গানরচনার পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডলের যোগসূত্র নিতান্তই ক্ষীণ। গলা ভেঙে গেছে, গান গাওয়া যাচ্ছে না, ওষুধ খাওয়া হচ্ছে — এমন পরিস্থিতিতে কোন লঘুরসের বা ঈষৎ হাস্যরসাত্মক গানের সৃষ্টি হওয়াটাই কি স্বাভাবিক ছিল না? কিন্তু এমন একটি নিতান্ত সাধারণ শারীরবৃত্তীয় ঘটনায় কবি যোগ করলেন এক ইন্দ্রিয়চেতনাতীত মাত্রা। গান গাওয়ার সাময়িক সেই অক্ষমতার অন্তরালে কবি প্রত্যক্ষ করলেন এক অদৃশ্য গানহরণকারীকে। সেই গোপনচারীর বিচিত্র লীলা গানের আস্থায়ী ও অন্তরা অংশে বিধৃত হয়েছে। গানের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থাৎ সঞ্চারী ও আভোগে সংযোজিত হয়েছে আর একটি আখ্যান — হারিয়ে যাওয়া গান আবার ফিরে পাওয়ার আখ্যান।

এই গানের পর্যায় প্রেম। কিন্তু বলাই বাহুল্য এই প্রেম নরনারীর চিরন্তন আকর্ষণ নয়। এই গান প্রেমাস্পদ পুরুষ বা প্রেমাস্পদা নারীর উদ্দেশে নয়।এই প্রেমের প্রাণকেন্দ্রে বিরাজমান এক রহস্যময় গোপনচারী, এক ইন্দ্রিয়চেতনার প্রান্তসীমায় তার আনাগোনা। সে নিসর্গসৌন্দর্যলীন এক অরূপ সত্তা —- বর্ষার ছায়াঘন মেঘমেদুর দিনে সে গান হরণ করে আবার শারদশোভার পটভূমিতে সেই গান সে প্রত্যর্পণ করে।

সেই অলক্ষ্যচারীর স্বরূপসন্ধানেই আমাদের আলোচ্য গানের সূচনা। গানের প্রথম কলিতে প্রশ্নবোধক সর্বনাম “কে”। কিন্তু কে সেই গোপনচারী এই গানের কোথাও তার উত্তর মেলে না। আমরা কেবল তার ক্রিয়াকলাপ প্রত্যক্ষ করি। গানের প্রথমার্ধে বিবৃত ক্রিয়াকলাপের মধ্যে গভীর তাৎপর্যবাহী এক অন্তর্লীন ঐক্য ধরা পড়ে। “বাসা বাঁধা” “ কুলায়” “পাখার ছায়া বুলানো” — তার মধ্য দিয়ে আভাসিত হয় একটি পক্ষীরূপ। সেই গোপনচারী কবির মগ্নচেতনায় ধরা দিয়ে যায় বিহঙ্গরূপে। এই পক্ষীরূপকের এমন ব্যবহার রবীন্দ্রনাথের একাধিক প্রেমের গানে দেখা যায় : অধরা মাধুরী ( ও যে সুদূর রাতের পাখি / গাহে সুদূর রাতের গান) ; “বনে যদি ফুটল কুসুম” ( নেই কেন সেই পাখি) ; “কে উঠে ডাকি” (করুণ মধুর অধীর তানে বিরহবিধুর পাখি )।

তবে পূর্বোক্ত গানগুলির মত আমাদের আলোচ্য গানে কোথাও “পাখি” শব্দটি অথবা অন্য কোন সমার্থক শব্দ ব্যবহৃত হয় নি। এই গানে সুস্পষ্ট ভাষায় নয়, আভাসে নির্মিত হয়েছে তার বাণীপ্রতিমা।

এই পাখির রূপকল্প নির্মাণের মূলে হয়তো বা বাউল গানের প্রভাব নিহিত রয়েছে। মনে আসে “গোরা” উপন্যাসের সূচনায় ব্যবহৃত সেই বাউল গানটি — যে গান বিনয়ের মনপ্রাণ আচ্ছন্ন করেছিল।

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।

আমাদের আলোচ্য গানের অচিন পাখির আনাগোনা শুধুই খাঁচায় বা প্রাণপিঞ্জরে নয়, পাখির স্বাভাবিক পরিমণ্ডলে — বনেও তার অবাধ বিহার। “বনমাঝে কি মনোমাঝে” সেই সংশয়ের অবকাশ থাকে না, মনে, বনে সর্বত্রই তার বিচরণ। প্রথমে তাকে দেখা যায় মনের গহনে নীড়রচনারত, পরক্ষণেই তার উপস্থিতি কুসুমবনে। যূথীগন্ধবিধুর বাদল বাতাস বহন করে আনে তারই পাখার ছায়ার স্পর্শ। গানহারা শূন্যতার মুহূর্তে সেই পরশটুকুই পরম প্রাপ্তি।

গীতহীন শূন্যতার পর্ব আর হারানো গানের প্রত্যাবর্তনপর্বের বাণীরূপায়ণ অন্তরা ও সঞ্চারী অংশে। তুলনামূলক আলোচনায় গানের এই দুই অংশের মধ্যে এক আশ্চর্যসুন্দর প্রতিসাম্য পরিলক্ষিত হয়। দুই অংশেরই প্রথম কলির প্রথমার্ধে আছে কালগত পটভূমি : অন্তরায় বর্ষা, সঞ্চারীতে শরৎ। উভয়ক্ষেত্রেই কলির দ্বিতীয়ার্ধে আছে একটি ফুলের রূপকল্প (অন্তরায় যূথী, সঞ্চারীতে শিউলি) এবং তারপর হৃদয়ানুভূতি (অন্তরায় বেদনা (দীর্ঘশ্বাস) , সঞ্চারীতে হর্ষ)। একইভাবে অন্তরা ও সঞ্চারীর দ্বিতীয় কলির প্রথমার্ধে আছে কোন আধার (অন্তরায় প্রাণ সঞ্চারীতে নয়ন), উভয়ক্ষেত্রে কলির দ্বিতীয়ার্ধে আছে পরশ। সঞ্চারীতে স্পষ্টতই আছে “গানের পরশ”; অন্তরাতে “পরশ” শব্দটি না থাকলেও “বুলিয়ে দেওয়া” ক্রিয়াটি স্পর্শদ্যোতক। গানের পরশের সমান্তরাল অবস্থানে আছে গানহারীর পাখার ছায়ার পরশ। গানের পরশ আসে নয়নে, আর গানহারীর পরশ আসে প্রাণে। বিষয়টি এইভাবে উপস্থাপন করা যায় :

প্রথম কলি—(পটভূমি)——(ফুল)—-(অনুভূতি)

অন্তরা———বর্ষা———–যূথী—– বেদনা(দীর্ঘশ্বাস)

সঞ্চারী ——-শরৎ———-শিউলি—-হর্ষ

দ্বিতীয় কলি —(আধার)—–(পরশ)

অন্তরা———প্রাণ———পাখার ছায়ার

সঞ্চারী ——-নয়ন———গানের

এবার বিভিন্ন অংশের নির্মাণকৌশলের স্বাতন্ত্র্য পর্যালোচনা করা যাক। সমান্তরাল অবস্থানে স্থিত বর্ষা আর শরতের উপস্থাপনায় পার্থক্য ধরা পড়ে। বর্ষার পরিসরটি বিস্তৃততর । প্রথমে “মেঘের দিন” তারপর আবার সুনির্দিষ্ট ভাবে মাসের উল্লেখ, “শ্রাবণ মাস”।কালগত পটভূমি তাই প্রত্যাশিতভাবেই আমরা দেখি শব্দবন্ধদুটির অধিকরণ কারকের রূপটি পাই : …দিনে, … মাসে। কিন্তু সঞ্চারীতে শুধুমাত্র “শরৎ” নামটি ব্যবহৃত হয়েছে। বর্ষার মেঘমেদুর অন্ধকারের বিপরীতে শরতের অরুণ আলোর উদ্ভাস আসে নি, শরতের নৈসর্গিক পরিমণ্ডলের লেশমাত্র প্রতিফলন এই অংশে ঘটে নি। কিন্তু আর্থস্তরে বর্ষার মত কালগত পটভূমি হলেও, ব্যাকরণগত পর্যায়ে “শরৎ” এখানে ক্রিয়ার কর্তা (ক্রিয়াপদ “কাঁপে”)। এই পার্থক্যের কারণ কলিদুটির শেষে পাওয়া যাবে। আমরা দেখেছি দুই কলির শেষে সমান্তরালভাবে অভিব্যক্ত দুই বিপরীত অনুভূতি — বেদনা (দীর্ঘশ্বাস) এবং হর্ষ। গভীরতর পাঠে দেখা যায় গান হারানোর বেদনার চেয়ে বহুগুণ তীব্র গান ফিরে পাওয়ার আনন্দ। বর্ষার ছায়াঘন দিনে গানহারা হৃদয়ের বেদনাতুর অনুভূতি যূথীসুবাস ভারাক্রান্ত বাতাসে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই গান ফিরে আসার মুহূর্তে কবিহৃদয়ে উৎসারিত হর্ষের অভিব্যক্তি শুধুই শেফালিবনে বাতাসের আন্দোলনে নয়। সেই আনন্দহিল্লোল সঞ্চারিত হয় সমগ্র নিসর্গলোকে। আমরা দেখি ফুলবনের নয়, শরৎঋতুর শিহরণ । শরৎ তখন আর বর্ষার মত কোন কালগত পটভূমি নয়, শরৎ হয়ে ওঠে গানের প্রত্যাবর্তনের এই অধ্যায়ের একটি চরিত্র —যে হারানো গানের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় রত, সেই ভাবনায় রোমাঞ্চিত।

এই তুলনামূলক আলোচনায় বিশেষ প্রাসঙ্গিক সম্বন্ধপদের (আমার) উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি। গীতহীন শূন্যতার মুহূর্তে অন্তরাল থেকে সেই গোপনচারীর স্বান্তনাপরশ আসে “আমার” প্রাণে। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় সম্বন্ধপদ ও সম্পৃক্ত বিশেষণের মধ্যে হাইফেনের অপ্রত্যাশিত প্রয়োগ : আমার-প্রাণ। এই অনুভূতি একান্তভাবেই কবিপ্রাণের — যতিচিহ্নের এই সম্পূর্ণ অপরিচিত প্রয়োগ তারই ইঙ্গিত বহন করছে। অন্যদিকে “আমার” প্রাণে সেই সূক্ষ্ম পরশের পর “আমার কন্ঠ” থেকে হারিয়ে যাওয়া গান ফিরে আসে “আমার নয়নে” নয়— “নয়নে”। হারানো গান ব্যক্তিজীবনের ক্ষুদ্র পরিসর অতিক্রম করে বিশ্বজনীনতায় উত্তীর্ণ হয়।

কন্ঠ থেকে ছলনায় হরণ করা “সেই গান” ফিরে আসে গোপনে — কিন্তু কন্ঠে নয়। এমনকি শ্রবণেও নয়। প্রত্যাবর্তনের অভিমুখ গভীর বিস্ময় জাগায়। গানের প্রত্যাবর্তন ঘটে “নয়নে”। গান —- শ্রুতিরিন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপকল্প — রূপান্তরিত হয় দৃশ্যকল্পে। যে কবি গানের ভিতর দিয়ে ভুবনকে “দেখেন” তাঁর নান্দনিক চেতনায় দৃষ্টি আর শ্রুতির মধ্যবর্তী সব ব্যবধান ঘুচে যায়।

ইন্দ্রিয়চেতনার এমন রূপান্তর আমরা রবীন্দ্রনাথের একাধিক গানে দেখা যায়। “এসো শ্যামল সুন্দর” গানটিতে দেখি নববর্ষা সমাগমে সকরুণ রাগিণী বেজে ওঠে প্রতীক্ষমাণা বিরহিণীর হৃদয়ে নয়, নয়নে।

নয়নে জাগিছে করুণ রাগিণী॥

রবীন্দ্রনাথের গানে দুটি বাদ্যযন্ত্রের সর্বাধিক উপস্থিতি : বাঁশি ও বীণা। দুটিরই ঝঙ্কার ধ্বনিত হয়েছে “নয়নে”। নয়নে বংশীধ্বনির দৃষ্টান্ত রয়েছে “আমার লতার প্রথম মুকুল” গানটির শেষ কলি :

বাজাতে বাঁশরি প্রেমাতুর দুনয়ানে ॥

“এই তো ভালো লেগেছিল” গানটিতে দেখি মুগ্ধনয়নে পারিপার্শ্বিক দৃশ্যাবলী বীণাধ্বনিতে রূপান্তরিত হয় :

সামনে চেয়ে এই যা দেখি চোখে আমার বীণা বাজায়॥

নিসর্গলোকের ভাষাহারা, অশ্রুত সঙ্গীত ধ্বনিত হয় দূরপথের পথিকের নয়নে :

তার আঁখির তারায় যেন গান গায় অরণ্যপর্বত ॥

বর্ষাসমাগমে উদ্গত নবতৃণদলের নীরব আহ্বান এসে পৌঁছয় স্বপ্নাবেশবিভোর কবিপ্রাণে। কিন্তু ইন্দ্রিয়চেতনাতীত সেই বাণীকে কবি ইন্দ্রিয়গ্রাহী রূপ দেন। সেই আহ্বানের মাধ্যম হয় “গভীর স্বর” আর তার লক্ষ্যস্থল কবির “আঁখি” :

তাই এমন গভীর স্বরে

আমার আঁখি নিল ডাকি ওদের খেলাঘরে—

ধ্বনির দৃশ্যে রূপান্তরের একাধিক দৃষ্টান্ত আমরা দেখলাম। এমন আরও বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় আমাদের আলোচ্য গানে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে ধ্বনি নয়, ধ্বনির স্পর্শ। নয়নে প্রত্যাবর্তন ঘটছে “গানের” নয়, “গানের পরশের”। আস্থায়ীতে হারিয়ে যাওয়া গান আর অন্তরাতে গানহারা মুহূর্তে গানহারীর পরশ পরবর্তী সঞ্চারীতে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় — তখন অনুভব করা যায় “গানের পরশ”।

ধ্বনির বা আরও নির্দিষ্টভাবে গানের সঙ্গে স্পর্শের একাত্মতার এমন দৃষ্টান্ত আমরা পাই “দিনের বেলায় বাঁশি তোমার বাজিয়েছিলে” গানটিতে। “গানের পরশ” শব্দবন্ধটি এই গানেও ব্যবহৃত হয়েছে।

গানের পরশ প্রাণে এল, আপনি তুমি রইলে দূরে।।

পূর্বোক্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইন্দ্রিয়চেতনার এই রূপান্তর একমাত্রিক — ধ্বনির রূপান্তর ঘটছে দৃশ্যে অথবা পরশে। কিন্তু আমাদের আলোচ্য গানে এই রূপান্তর দ্বিমাত্রিক। ধ্বনি স্পর্শের সঙ্গে একাত্ম হয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে — হারানো গান স্পর্শে রূপান্তরিত হয়ে দর্শনন্দ্রিয়ে ধরা দিচ্ছে।

ইন্দ্রিয়চেতনাজগৎ থেকে হারিয়ে যাওয়া গানের পুনরাগমন ঘটে ইন্দ্রিয়চেতনাজগতের আভ্যন্তরীন সমস্ত স্তরবিন্যাস বিপর্যস্ত করে। দৃশ্য, ধ্বনি ও স্পর্শের মধ্যবর্তী সব সীমারেখা কোন মায়ামন্ত্রবলে অবলুপ্ত হয়ে যায়।

সেই গানহরণকারীই গান ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু সঞ্চারীতে তার উপস্থিতি ভাষায় ব্যক্ত হয় নি। আস্থায়ী ও অন্তরার “সে” আভোগে অনুপস্থিত থাকলেও ক্রিয়ারূপের মাধ্যমে তার প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি অনুভব করা যায়। যে গানহরণকারী মনের গহনে বাসা বাধে, প্রাণে তার পাখার ছায়ার পরশ দেয়, শারদশোভার অন্তরালে থেকে গান ফিরিয়ে দেয়, সেই গভীর রাতে আধো ঘুমে আধো জাগরণে অজানা সুর বাজায়, আবার সেই স্বপ্নের মধ্যে দোলা দেয়। প্রথম কলিতে “লাগায়” ক্রিয়ার অনুক্ত কর্তা “সে” — সুর যে সেই বাজায় এই বিষয়ে সংশয়ের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু দ্বিতীয় কলি বা বাক্যের ভিন্নতর পাঠও সম্ভব। এই বাক্যের ক্রিয়ার অনুক্ত কর্তা যেমন “সে” হতে পারে তেমনি “সুর”ও হতে পারে। অর্থাৎ গানহরণকারী সুর বাজায়, কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে দোলা দেয় “সে” নয়, তার বাজানো “সুর”। এই ব্যাখ্যাও সমান গ্রহণযোগ্য। স্বপ্নের মধ্যে এই দোলা কে দেয়— গানহরণকারী না তার দেওয়া সুর —এই অস্পষ্টতা যেন দুইয়ের অভিন্নতার সঙ্কেত দেয়। যে গান হরণ করে সে সেই গানকে আবার ফিরিয়ে দিয়ে সেই গানের সঙ্গেই যেন একাত্ম হয়ে যায়।

রবীন্দ্রচেতনাবিশ্বে কোন কিছুই হারায় না। সাময়িক ভাবে যা অন্তরালে চলে যায় আবার তারই প্রত্যাবর্তন ঘটে সুন্দরতর, উজ্জ্বলতর রূপে।

“ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে

অন্ধকারের পেরিয়ে দুয়ার যায় চলে আলোকে।”

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
শৌভিক দে
শৌভিক দে
3 months ago

রবি গীতি প্রসঙ্গে আলোচনা হলে প্রথমেই একটি ভয়ে আপ্লূত হতে হয়। অতি রূপবান মানুষের ও অন্দর মহল সুদৃশ হয় না। তেমনি হৃদয় কাড়া গান – বহু ব্যবচ্ছেদে মাড়াই করা আখ হবে না তো? এখানেই গৌতম বাবুর জীৎ। তার অনুধ্যানে সুন্দর – তার কক্ষ থেকে কখনো বিচ্যুত হয় না। তথ্যের ভার থাকে কিন্তু তাতে রস গ্রহন সুন্দরতর হয়। মাত্র একটি গান এই রচনার অবলম্বন। কিন্তু সেই প্রসঙ্গ থেকে ঈষৎ স্বেচ্ছা বিচ্যুতি দিয়ে তিনি এনেছেন অন্য গানে একই রকম অলঙ্করনের ব্যবহার। ‘কে ‘ শব্দের অতীন্দ্রিয় চেতনা, উপমার আবছা প্রয়োগ, সহজ প্রেমের অনন্ত অসীম সম্ভাবনা সবই ছুঁয়ে গেছেন তিনি। যে জন অধিক জানে – তাদের অসংযত হবার আশঙ্কা থেকে যায়। গৌতম বাবু এ সবের উর্ধে বরং এই রচনার সঠিক মুল্যায়ন স্বয়ং একটি নিবন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই – সংযত হতে হল।