
বিস্মৃতিচারণা (১৯)
প্রায়শই শান্তিনিকেতনে আসি বা আসার ইচ্ছের কথা শুনে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি, “এখনও কিসের টানে আ্সেন শান্তিনিকেতনে? সেই শান্তিনিকেতনকে এখনও পান আপনি?”
বলেছিলাম – “কিন্তু তাঁকে যে পাই এখানকার আকাশে বাতাসে, গৌর প্রাঙ্গনে, ছাতিমতলায়। চোখ বুজলে দেখতে পাই, শালবিথীতে হেঁটে বেড়াচ্ছেন তিনি। বৈকালিক চায়ের আসরে যোগ দিচ্ছেন দিনু ঠাকুরের দিনান্তিকায়, গান বাঁধছেন, গান তুলে দিচ্ছেন দিনু ঠাকুরকে, মহড়া দেওয়াচ্ছেন ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে, আলাপচারিতায় বসছেন গান্ধীজী বা অ্যান্ড্রুজের সঙ্গে, আরো কত যে চিত্রকল্প! – তাঁকে এমন করে তো আর কোথাও পাইনা।“ – কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে গিয়েছিলাম আবেগী উচ্চারণে।
শুনতে শুনতে মৃদু হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর গৌরবর্ণ মুখমন্ডলে। সেই হাসির মধ্যে শ্লেষ নয়, মনে হল যেন কিঞ্চিৎ ব্যথা্র প্রকাশ। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে এবার সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তাঁর – “এখনও রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পান এই রবি-ভূমিতে? হরেক রকমের ভ্রমণার্থী, তীর্থক্ষেত্রের পূন্যার্থী আর যানবাহনের বিচিত্র ধ্বনি-কণ্টকিত হট্টগোলের মধ্যে?”

যাঁর সঙ্গে আলাপচারিতার একটা অংশ আপনাদের কাছে পরিবেশন করলাম, তিনি সুদূর জার্মানি থেকে বাংলা ভাষা শিক্ষা ও বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ পড়ার প্রবল বাসনা নিয়ে আটের দশকের গোড়ায় শান্তিনিকেতনে এসে ডেরা-বাঁধা ডক্টর মার্টিন কেম্পশ্যেন। তখনো পর্যন্ত তাঁর পরিচিতি ছিল এদেশে প্রায়-অপরিচিত এক জার্মান লেখক, অনুবাদক এবং সাংবাদিক হিসেবে।
তাঁর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের প্রেক্ষাপটটি বলা যাক। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে পৌঁছেছিলাম শান্তিনিকেতনে। কিছুদিন আগে দেশ পত্রিকায় মার্টিন কেম্পশ্যেনের লেখা একটি প্রবন্ধ পাঠের পর থেকেই তাঁর সম্পর্কে আমার কৌতুহল জেগেছিল। তিনি প্রায়শই শান্তিনিকেতনে বসবাস করেন, এই তথ্যটুকু জানতাম। কিন্তু দেখা করার পথটি জানা ছিল না। এবার শান্তিনিকেতনে পৌঁছে কিছুটা আকস্মিকভাবেই পরিচয় হয়ে গেল কেম্পশ্যেন সাহেবের আপ্তসহায়ক শ্রী রাজেন সরকারের সঙ্গে। রাজেন বাবুর সহায়তায় তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য আমাদের আবেদন পৌঁছল শ্রী কেম্পশ্যেনের কাছে। পরের দিন তাঁর স্বদেশ জার্মানিতে ফেরার ব্যস্ততা। তবু তিনি সময় মঞ্জুর করে দেখা করতে রাজি হলেন তাঁর বিপুল কর্মব্যস্ততার মধ্যেও।

শান্তিনিকেতন পূর্বপল্লীতে গাছগাছালিতে ঘেরা বাসভবনের রোদঝলমলে প্রাঙ্গনে তাঁর বেতের আরামকেদারা থেকে উঠে এগিয়ে এসে আমাদের স্বাগত জানালেন ছিপছিপে সত্তর ছুঁইছুঁই সৌম্যদর্শন স্মিতহাস্য ‘তরুণ’টি । নিজের কেদারা ছেড়ে আমাদের পাশে মোড়ায় এসে বসলেন, নবাগত অতিথিদের সঙ্গে একাত্ম হবার জন্যে। অনুমান করলাম, গোটা ছয়েক মোড়াবেষ্টিত ছোট্ট উন্মুক্ত অফিসটিতে তিনি তৎপূর্বে আলাপরত ছিলেন উপস্থিত তাঁর দুই সাঁওতাল ও বাংলাদেশী ছাত্রের সঙ্গে। সামান্য বিদেশি বাচনভঙ্গি হলেও ঝরঝরে বাংলায় কথা শুরু করলেন আমাদের সঙ্গে। পরিচয় পর্ব সমাধা হলে কথোপকথন শুরু হল। কফি আনালেন আমাদের আপত্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে। নিজে হাতে ট্রে-তে করে কফি নিয়ে এলেন। আমরা সঙ্কোচ প্রকাশ করায় আমাদের দ্বিধা কাটানোর জন্যে বললেন, “আপনারা আমার অতিথি। এটা আমার কর্তব্য।“

আপাদমস্তক এক ভিন্নগোত্রের ভিনদেশী বলে মনে হয়েছিল তাঁকে। আমাদের কৌতূহল নিরসনে শোনালেন তাঁর অভিনব যাত্রাপথের বিবরণ।
ডক্টর মার্টিন কেম্পশ্যেন প্রথম ভারতবর্ষে এসেছিলেন সেই ১৯৭৩ সালে। ভিয়েনা থেকে সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করে প্যারিস থেকে ফরাসী ভাষায় স্নাতকোত্তর লাভের পর কলকাতার গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন ইন্সটিটিউট অফ কালচারে তিন বছর জার্মান ভাষার শিক্ষকতা করার দায়িত্ব নিয়ে। এই সময়ে তাঁর বসবাস ছিল কলকাতার দক্ষিণে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের অতিথিশালায়। এখানেই শুরু তাঁর রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ চর্চার । গোলপার্ক মিশনে শিক্ষকতা শেষ করার পর বিদায়কালে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে উপহার পান একটি ইংরেজি ভাষার গীতাঞ্জলি।

মার্টিন বলে চলেন – “ইংরেজি গীতাঞ্জলি পড়ার পর যে মুগ্ধতায় আমি আচ্ছন্ন হলাম, তার থেকে অন্তরের তাগিদ অনুভব করলাম বাংলায় গীতাঞ্জলি পাঠ করে রবীন্দ্রনাথের মূল লেখার রস গ্রহণের । ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বদলে কিছুদিনের মধ্যে পৌঁছে গেলাম শান্তিনিকেতনে। একটা বাসা ভাড়া করে দীর্ঘমেয়াদী একটা পরিকল্পনা শুরু করে দিলাম।“
বিস্ময়ের ব্যাপার, শান্তিনিকেতনে পৌঁছে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হিসেবে নাম নথিভুক্ত করিয়ে চলতে থাকল তাঁর শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মভাবনাকেন্দ্রিক গবেষণা। তাঁর এই দ্বিতীয় পি, এইচ, ডি-র বিষয় ছিলঃ Comparative religious study of Sri Ramakrishna, the 19th century Indian mystic-saint and Saint Francis of Assisi, the 11-12th century Italian saint”.

পাশাপাশি সুগভীর অভিনিবেশে তিনি শুরু করলেন বাংলা ভাষা শিক্ষা ও রবীন্দ্র-সাহিত্য পাঠ। মজে গেলেন বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি, রবি ঠাকুর আর শান্তিনিকেতনের প্রেমেও। বিশ্বভারতীতে মার্টিন শিক্ষক ও স্নেহশীল শুভানুধ্যায়ী হিসেবে পেলেন প্রশান্ত কুমার পাল, রবীন্দ্র কুমার দাশগুপ্ত প্রমুখ বিদ্বজ্জনকে। কিছুকালের মধ্যেই তিনি ব্যুৎপত্তি অর্জন করলেন বাংলা ভাষা ও রবীন্দ্রসাহিত্যে। শুরু করলেন প্রত্যক্ষভাবে বাংলা থেকে জার্মান ভাষায় শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত অনুবাদ এবং একের পর এক রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদের কাজ। শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন গ্রন্থ রচনা। ১৯৯২ সালে মার্টিন কেম্পশ্যেন ভূষিত হলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত রবীন্দ্র-পুরস্কারে। পরবর্তী কালে তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গবেষণা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথের তিনটি জার্মানী সফরকে কেন্দ্র করে – “Rabindranath Tagore in Germany – Four Responses to a Cultural Icon”।
কথায় কথায় মার্টিন বললেন – “এখন আমার দুই দিকে দুই ঠাকুর। একদিকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, অন্যদিকে ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ।“
এক ভিনদেশী পন্ডিত তাঁর প্রতি আমাদের মুগ্ধতা বাড়িয়ে চলেছেন।
দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা এগোতে থাকে অপরাহ্নের দিকে। আমরা ক’জন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছি রাইন নদীর উপত্যকার ছোট্ট একটি শহর থেকে ভারতবর্ষের পূর্ব প্রান্তে বাসা বাঁধা এ’দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে, বিশ্বখ্যাত এক মনীষার সাহিত্য-কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া এক জার্মান ভদ্রলোকের অচিন্ত্যনীয় জীবনকাহিনি।
“আমার একটা আক্ষেপ কী জানেন?” কয়েক মুহূর্ত সময়ের নীরবতা ভেঙে বলে চলেন কেম্পশ্যেন – “বাঙালি রবীন্দ্রনা্থের কালজয়ী প্রতিভাকে শুধু কবি হিসেবেই মনে রাখল, কর্মী হিসেবে নয়। আমি মনে করি, এটা তাঁর প্রতিভার একটা বিরাট অবমূল্যায়ন। পৃথিবীর ইতিহাসে একসঙ্গে প্রতিভাবান কবি ও নিরলস কর্মীর এমন সম্মিলিত রূপ আমরা কোনো দেশে দেখিনি। হয়তো ভবিষ্যতেও দেখব না। বাঙালির চোখে কবির সেই রূপটা ধরা পড়ল না।“

বলে চলেন কেম্পশ্যেন সাহেব –
“আমি কর্মী রবীন্দ্রনাথকে আমার সাধ্যমতো অনুসরণ করেছি। এই ছেলেদের দেখুন, এরা সাঁওতাল সম্প্রদায়ের। সাত-আট কিলোমিটার দূরে এদের গ্রামটির নাম ঘোষালডাঙা। আমি ওদের সঙ্গে আছি। নিয়মিত সাইকেল করে ওদের কাছে যাই। ওরা আসে আমার কাছে। ওদের প্রয়োজনে, আপদে বিপদে ওদের সঙ্গে থাকি। ওদের যথাসম্ভব পথ দেখাবার চেষ্টা করি। ওরা আমার সঙ্গে বিদেশেও গেছে।“- মনে হল যেন এক রূপকথার গল্প শুনছি আমরা।
কী ভাবে সম্ভব হল একটা বিদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণে নিজের পরিজন, সংসার, বিলাস, বৈভব ছেড়ে আসা এক স্বেচ্ছা-নির্বাসিত জার্মান পন্ডিতের পক্ষে? তাঁর মনে কী কোনো আক্ষেপ কাজ করেনি? তিনি কি যথোপযুক্ত মর্যাদা পেয়েছেন এই দেশে? এই রাজ্যে? এমনকি তাঁর প্রিয় শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীতে?

আবার সেই মৃদু হাসিটির রেখা ফুটে উঠল গোলাপী আভার মুখমন্ডলে। হাসতে হাসতে বললেন, “আমি তো ভালবেসেছি এই মানুষগুলোকে, এই সংস্কৃতিকে, কবির ভাষাকে, যার টানে কাটিয়ে দিলাম জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময়। শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথকে অবলম্বন করে নিজের পথ করে নিয়েছি।“ সাঁওতাল যুবকদুটিকে দেখিয়ে বললেন, “ওরা আমাকে ভালোবাসে। আর আমিও ওদের খুব ভালোবাসি। ছোট্ট গ্রামটাকে নিজের করে নিয়েছি। ওদের পড়াশোনা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেখাশোনা করি। মাঝেমাঝে দেশে ফিরে যাই, আবার ফিরে আসি ওদের টানে। – এই তো বেশ। কেউ যদি ভাবে, একটা ভ্যাগাবন্ড অবিবাহিত জার্মান, চাল নেই, চুলো নেই বলে পড়ে আছে বিদেশ বিভুঁইয়ে, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।“ – আবার সেই হাসি ফুটে উঠল সাহেবের মুখাবয়বে।
পরিশেষে তুলে দেওয়া যাক তাঁর স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন সম্পর্কে কিছু নিস্পৃহ আত্মকথন তাঁর নিজেরই একটি রচনা থেকে। –
“For me as a foreigner from the West who spends his life in India it is natural to relate to the disadvantaged sections of the population around me in the attitude of a participatory friend, a mentor or benefactor. I felt, for myself, the urge to improve the life of the students who I befriended. Nowhere in German social life can I learn what I am able to learn in Indian villages. This interaction with village life continues and has taken on many layers.
To strike a just balance, I need to speak of the hardships that I endured for these 45 years. To bear the heat, and especially the humidity, has never been easy and my exhaustion is getting worse. The powercuts, the crowded streets, the crowded transport in trains and buses, the aggressiveness in public spaces, the invasion of privacy I had to accept without really getting used to it. I realized that in India I would forever be a private person, unable as a foreigner to accept official positions and responsibilities. I had to endure that I was misunderstood, and even looked down upon, as my chosen way of life – rejecting employment and position and its status symbols, staying alone without a family – appears to be so unusual, so odd to most people.
Yet, this has been my chosen path. I do not regret to have walked it. After 45 years, I still crave to understand India better and better, I still crave to ‘belong’.”
সম্প্রতি জেনেছি, রাইন নদীর উপকূলে তাঁর ছবির মতো সুন্দর পিতৃভূমিতে ফিরে গেছেন অসুস্থ মার্টিন কেম্পশ্যেন। ভাল থাকুন তিনি – এটুকুই কামনা।


এই সাক্ষাতকারটি লেখকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় আমি শুনেছিলাম। এ রকম বহু বিদগ্ধ এবং পছন্দসই মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটেছে, কিন্তু ব্যাক্তিগত প্রসঙ্গ পাছে এসে যায় – এই অহেতুক আশঙ্কায় তিনি লিপি বদ্ধ খুব একটা করেন না। এই সময়ে যখন ঢক্কা নিনাদটিই স্বাভাবিক সেখানে মৃদু মন্দিরার কুজনে কি ক্ষতি হবে? তিনি তার স্মৃতি মঞ্জুষা আরো উন্মিলন করুন – গরীবের এই বাসনা।
এমন মানুষের জীবনবৃত্তান্ত পড়ে অভিভূত।লেখাটি শেয়ার করলাম।
খুব ভালো লাগল এই মূল্যবান সাক্ষাৎকারটি পড়ে। এই লেখার মাধ্যমে তিনি যে ব্যতিক্রমী মানুষটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। জানাই লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ।
লেখাটি পড়ার ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
খুব ভালো লাগলো।একজন বিদেশী য়ে চোখে রবিঠাকুরকে দেখেছেন আমরা কেন সেই দৃষ্টিতে দেখতে পাইনি সেটা আমাদের দুর্ভাগ্য। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশভাবনার মধ্যে অন্যতম ছিল পল্লির উন্নয়ন এবং গ্রাম বাংলাকে আবিষ্কার।যতদিন বেঁচে ছিলেন সেই কাজটুকু তিনি করে গিয়েছিলেন।শ্রীনিকেতন স্থাপন বা হাতের কাজের শিক্ষা এ সবটকুই ছিল কবির ভাবনায় বিশেষ অঙগ।
আমরা বাঙালীরা তাঁর বিশেষ কিছু গান আর কবিতায় নিজেদের আবদ্ধ রাখলাম কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন বোঝার চেষ্টাটুকুও করলাম না।
সঠিক অনুধাবন। ধন্যবাদ।