শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

ব্যতিক্রমী অভিধার এক “শিল্পী” রবীন্দ্রনাথ ব্যতিক্রমী তাঁর ধর্ম এবং ঈশ্বর ভাবনা

তাচ্ছিল্য করে ছোট করতে গিয়ে মৌলবাদী বাঙালি মুসলমানেরা রবীন্দ্রনাথকে একজন হিন্দু বিবেচনা করেন। এবং অনেক সময়ই অভ্যাসগতভাবে তাঁকে গালি দিয়ে হেয় করে থাকেন। আবার মৌলবাদী নন যাঁরা,পরিশীলিত কিংবা মুক্তমনা যাঁরা, তাঁরা মৌলবাদীদের ভুল ধরিয়ে দিয়ে বলেন, রবীন্দ্রনাথ মূর্তিপূজক হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন এক ঈশ্বরের উপাসক, ব্রাহ্ম। এখন প্রশ্ন হল, যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এত আগ্রহ আমাদের, বাঙালির শ্রেষ্ঠতম মনীষী যিনি, ধর্মবিশ্বাসের নিরিখে তিনি আসলে কোন মত বা পথের অনুসারী ছিলেন, তাঁকে অজস্রবার জানবার পরেও, এ প্রশ্নটি আমাদের থেকেই যায়।
আসলে হিন্দু কিংবা বাপ-ঠাকুরদার কাছ থেকে প্রাপ্ত ব্রাহ্ম, এ জাতীয় প্রচলিত, প্রথাবদ্ধ কোন ধর্মমত কিংবা প্রচলিত ঈশ্বরের ধারণা রবীন্দ্রনাথের সুন্দরতম প্রকাশ অর্থাৎ তাঁর অজস্র সুন্দর সৃষ্টির মধ্যে তেমনভাবে ছায়াপাত করেনি কখনও। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে তাঁর সৃষ্ট ব্রহ্মসঙ্গীতগুলি, যা তাঁর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত হিসেবেও বিবেচিত, তা কি তাঁর একেশ্বরবাদী চিন্তার প্রতিফলন নয়? আমি মনে করি রবীন্দ্রনাথসৃষ্ট ব্রহ্মসঙ্গীতগুলি তাঁর সুন্দরতম সৃষ্টিগুলির অন্যতম এবং কিছুটা তাঁর গৃহীত ঈশ্বর এবং আধ্যাত্মিক ধর্মবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে বিবেচিত হলেও তা পরিপূর্ণ সঙ্গীত পদবাচ্যই, কোন ধর্মমত বা সুনির্দিষ্টভাবে কোন একেশ্বরবাদী চিন্তার প্রতিফলন নয়।রবীন্দ্রনাথের কাছে সঙ্গীত ছিল আত্মার মুক্তি ও সৌন্দর্যের প্রকাশ, যা ধর্মীয় মতবাদকে ছাড়িয়ে যায়।
তাঁর সৃষ্টিতে ঈশ্বর বা ব্রহ্ম ধারণা এসেছে এক ধরনের নান্দনিক এবং দার্শনিক অভিজ্ঞতা হিসেবে। তিনি ঈশ্বরকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় কাঠামোয় বন্দী করেননি, বরং ঈশ্বর ধারণার মধ্যেই তিনি মানবজীবনের সৌন্দর্য, প্রকৃতির মহিমা এবং হৃদয়-অভ্যন্তরে লালিত “গভীর গোপন তথা এক মহা-আপন” চৈতন্যময় বিস্ময়কে প্রকাশ করেছেন। এভাবে রবীন্দ্রনাথের গানে ব্রহ্ম শব্দটি এক সর্বজনীন সত্তা বা মহাজাগতিক ঐক্যের প্রতীক। এটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং তাঁর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির অংশ বলা যায়। তাই তাঁর “ব্রহ্ম” যতটা না ধর্মীয় তার থেকে অনেক বেশি দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক চিন্তা বা চেতনার স্বরূপ। তাঁর সৃষ্টির মূল সুর নিহিত ছিল মানবতাবাদ, সৌন্দর্যবোধ, জাগতিক বিস্ময়বোধ এবং স্বাধীন চিন্তার প্রকাশ বা মুক্তিতে। তাঁর ব্রহ্মসঙ্গীতও কেবল ধর্মীয় এবং ঈশ্বরীয় চিন্তার বাইরে তাঁর এই সব কিছুকে ধারণ করেছে, তাই ব্রহ্মসঙ্গীতকে কেবল ঈশ্বর তথা ধর্মীয় চেতনা সমৃদ্ধ গান হিসেবে দেখতে গেলে তাঁর শিল্পীসত্তাকে সংকীর্ণ করে ফেলার প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ব্যতিক্রমী তাঁর বিস্ময়বোধ
প্রতিদিনের চেনা জগতকে চিরনতুন করে দেখবার মতো একটি অপার বিস্ময় ছিল রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে। আর এই বিস্ময় ছিল বলেই এ জগতের তাবৎ ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছের প্রতি ছিল তাঁর আসীম মমতা। তাঁর গানে প্রতিদিনের তুচ্ছতার বিষয় বা বস্তু যতটা মহৎ বা বৃহৎ হয়ে উঠেছে তা আর কারও গানে তা কখনও হয়েছে বলে মনে হয় না। “এ সুর আমি খুঁজেছিলেম রাজার ঘরে,/শেষে ধরা দিল ধরার ধূলির পরে।/এ যে ঘাসের কোলে আলোর ভাষা আকাশ হতে ভেসে আসা/এ যে মাটির কোলে মাণিক-খসা হাসি-রাশি।“ রবীন্দ্রনাথের “এ সুর”কে খুঁজে পেতে কোন রাজার ঘরে যেতে হয় না, এ সুর ধরার ধূলির পরেই নিজেকে ধরা দেবার অপেক্ষাতে লুকিয়ে থাকে। যার হৃদয়ে বিস্ময় আছে এ সুর শুধু তারই। বিস্ময়াবিভূত কবি “মাটির কোলে মাণিক-খসা” এ সুরকেই অভিষিক্ত করেছেন তাঁর অজস্র গানে।


একইভাবে হাট, মাঠ, পথের ধুলা, ঊষার সোনার বিন্দু (শিশিরকণা), মাঘের আমের মুকুল, পাতায় পাতায় আলোর নাচন এই সব ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ বিষয় যে মহৎ এবং বৃহৎ হিসাবে অভিষিক্ত হতে পরে, এক অদৃশ্য সুতো দিয়ে এদের সঙ্গে যে হৃদয়ের বন্ধন সৃষ্টি হতে পারে, রবীন্দ্রনাথের গান না শুনলে এ ধারণা আমাদের মনে স্পষ্ট রূপ লাভ করে না।
তুচ্ছ এবং ক্ষুদ্রের মধ্য হতে অনন্যকে খুঁজে পাবার মত বিস্ময়ের ধারণাটি স্পষ্ট করা যাক একটি উদাহরণ দিয়ে অত্যন্ত তুচ্ছ একটি বিষয়, গ্রামের পথের ধারে এক অবহেলিত বেণুবন (বাঁশঝাড়)। পথে যেতে কেউ দেখে, কেউ দেখে না। যারা দেখে তাদেরও দৃষ্টিনন্দন হবার মতো বিশিষ্টতা নেই কিছুই তার। এরপর বসন্ত এল। বসন্ত বাতাসে বেণুবন নব কিশলয়ে আচ্ছাদিত হয়ে নবরূপে বিকশিত হল। কিন্তু তাতেই বা এমন কী? নতুন পাতায় সবুজের সমারোহটা একটু বেশি,এই তো? এর চেয়ে বিমুগ্ধ হবার মত আর কী-ই বা থাকতে পারে পথের ধারের এক অবহেলিত বেণুবনের? কিন্তু না, পারে। অখ্যাত অবহেলিত তাতে কী? তার কি প্রেমাস্পদের দেখা পাবার জন্য কোন ব্যাকুলতা থাকতে নেই? নেই কী প্রেমিকের স্পর্শসুখে “একটুকুতেই কাঁপন ধরার” কিংবা শিহরিত হবার আকাঙ্ক্ষা? আছে, অবশ্যই আছে। আর আছে যে তা যখন মূর্ত হয় রবীন্দ্রনাথের এই গানে-
“ওগো দখিন হাওয়া, ও পথিক হাওয়া, দোদুল দোলায় দাও দুলিয়ে।
নূতন-পাতার-পুলক-ছাওয়া পরশখানি দাও বুলিয়ে॥
আমি পথের ধারের ব্যাকুল বেণু হঠাৎ তোমার সাড়া পেনু গো–
আহা, এস আমার শাখায় শাখায় প্রাণের গানের ঢেউ তুলিয়ে॥
ওগো দখিন হাওয়া, ও পথিক হাওয়া, পথের ধারে আমার বাসা।
জানি তোমার আসা-যাওয়া, শুনি তোমার পায়ের ভাষা।
আমায় তোমার ছোঁওয়া লাগলে পরে একটুকুতেই কাঁপন ধরে গো–
আহা, কানে-কানে একটি কথায় সকল কথা নেয় ভুলিয়ে॥“
তখন আমাদেরও পথের ধারের তুচ্ছ অবহেলিত বেণু বনের শাখায় শাখায় প্রাণের গানের ঢেউ ওঠার আনন্দে রবীন্দ্রনাথের হাট, মাঠ আর পথের ধূলার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা আনন্দলোকের সন্ধান পেয়ে বিমুগ্ধ হতে হয়।
রবীন্দ্র সৃষ্টিতে এই আঙ্গিকের বিস্ময়বোধের ধারণার উদাহরণ আরও অনেক আছে। তাঁর জন্মান্তর কবিতাটির কিছু কথা এমন একটি উদাহরণ হতে পারে –
“আমি ছেড়েই দিতে রাজি আছি
সুসভ্যতার আলোক,
আমি চাই না হতে নববঙ্গে
নব যুগের চালক।
আমি নাই বা গেলেম বিলাত,
নাই বা পেলেম রাজার খিলাত,
যদি পরজন্মে পাই রে হতে
ব্রজের রাখাল বালক
তবে নিবিয়ে দেব নিজের ঘরে
সুসভ্যতার আলোক।
যারা নিত্য কেবল ধেনু চরায়
বংশীবটের তলে,
যারা গুঞ্জা ফুলের মালা গেঁথে
পরে পরায় গলে,
যারা বৃন্দাবনের বনে
সদাই শ্যামের বাঁশি শোনে,
যারা যমুনাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে
শীতল কালো জলে–
যারা নিত্য কেবল ধেনু চরায়
বংশীবটের তলে।“
জন্মান্তর (ক্ষণিকা )- রবীন্দ্রনাথ
অতি সাধারণ বস্তু-নিচয় হতে উদ্ভূত বিস্ময়বোধের জগতে আমি নিজেও আবিষ্কার করেছি এক “বিস্মিত” রবীন্দ্রনাথকে, আমার লেখা এই কবিতাটিতে–
—কোথায় আছেন রবীন্দ্রনাথ?—

কোপাইয়ের ধারে সাঁঝের আলোতে
রাঙা লাল গোধূলি।
এখানে নিস্তব্ধ জনপদে
শাল বনের বাঁকে বাঁকে বৃষ্টির গান,
মেঘমল্লার আছে তাই,
আছে ছায়ানট,
আছে ইমন কেদারা বেহাগ বাহার!
আর আছে রবীন্দ্রনাথের
হারিয়ে যাওয়া ছায়া,
তবে নেই কেবল রবীন্দ্রনাথ।
কোথাও নেই!
কেউ কি বলবেন,
কোথায় আছেন রবীন্দ্রনাথ?
আছেন কি তাঁর
শান্তিনিকেতন সৃষ্টির মহোৎসবে?
না, সেখানে নেই!
আছেন কি নোবেল প্রাপ্তির গৌরবে?
না সেখানেও নেই!
আছেন কি তাঁর
অজস্র মহৎ সৃষ্টির মহিমাতে?
না, তিনি সেখানেও নেই!
তবে কোথায় আছেন রবীন্দ্রনাথ?
রবীন্দ্রনাথ এখন
চৈতনের নতুন জগতে
তাই আছেন,
শরত প্রভাতের প্রথম আলো
আর ক্ষুদ্র শিশির কণার
যুগল-রূপ দর্শনে।
আছেন,
তুচ্ছ ঘাস ফুলের
রঙের মাধুরীতে মুগ্ধ হয়ে।
আর আছেন,
পথের ধূলায় রঙিন হয়ে ওঠা
তাঁর সঙ্গীতের গভীরে।
যে সঙ্গীতই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে, এবং রাখবেও আজীবন
এক আনমনা ঈশ্বরের ভাবাবেশে।
ব্যতিক্রমি তাঁর দ্রোহ–
অনেকে মনে করতে পারেন রবীন্দ্রনাথ তো ছিলেন প্রেম এবং সৌন্দর্যের কবি, দ্রোহের কবি তো তিনি ছিলেন না। না, এই ধারণাটি একদমই ভুল। রবীন্দ্রনাথও দ্রোহী ছিলেন। তবে তাঁর সৃষ্ট কাব্য সাহিত্যে তাঁর দ্রোহের প্রকাশ খুব প্রবল (ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেবার) ভঙ্গিতে ঘটেনি, বরং ঘটেছে অত্যন্ত সুস্মিত এবং শৈল্পিক ভাবে। এছাড়া ঘটেছে খুব সূক্ষ্ম অথচ গভীর ব্যঞ্জনাময় ভঙ্গিতে। তাঁর দ্রোহের কথা মনে হলে প্রথমেই মনে হয় তাঁর তাসের দেশ সঙ্গীতনাট্যটির কথা। রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশকে আমার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে “নিয়ম” এবং “ইচ্ছে”র দ্বন্দ্ব কিংবা “কারণের নিগড়” এবং “অকারণের শৈথিল্যে”-এর দ্বন্দ্ব সংবলিত একটি স্যাটায়ার ধর্মী সঙ্গীতনাট্য। তাসের দেশের চরিত্ররা অর্থাৎ তাস বংশীয়রা ছিল নিয়মের নিগড়ে বন্দি, তারা যান্ত্রিকভাবে নিয়ম মেনে চৌকো চৌকো চালে চলাফেরা করত। এই নিয়ম মেনে চলাটাই ছিল সে দেশের রাজা এবং পণ্ডিত প্রবর্তিত রীতি বা প্রথা। আর এই “নিয়ম সর্বস্ব” হবার ফলে শুরু থেকেই তাদের ইচ্ছারা হয়েছিল অবদমিত এবং মূল্যহীন। রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখিয়েছেন, শুধু নিয়মে আবদ্ধ জীবন মানুষকে প্রাণহীন করে তোলে। তাঁর দ্রোহ ছিল এই নিয়মের নিগড়ের বিরুদ্ধে। নিয়মের নিগড়ের বিরুদ্ধে তিনি স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা ও ইচ্ছার মুক্তির পক্ষে মত দিয়েছেন তাঁর এই সঙ্গীত নাটকটিতে।

তাসের দেশ

তাসের দেশ নাটকটিতে দেখা যায় সাগরপারের মানুষের দেশ থেকে তাসের দেশে যাওয়া এক রাজপুত্র এবং তার সওদাগর বন্ধুর চলা বলা উঠা বসা, যা ছিল মানুষের মত, তা সেখানে নিয়মের বাড়বাড়ন্তকে দূরে সরিয়ে ইচ্ছার জয় ঘোষণা করতে বা ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে ব্রতী হয়েছিল। আর বিপত্তিটা বেধেছিল সেই ঘটনাতে। তাসবংশীয়দের যে আঁটসাঁট নিয়মের চলা ফেরা উঠা বসা সেখানে শৈথিল্যের হাওয়া হয়ে ধাক্কা দিল মানুষের চলাফেরা বা চালচলন বা ইচ্ছার শক্তি। আর তাসবংশীয়রা, বিশেষ করে তাদের মেয়েরা, মানুষকে মানে রাজপুত্রদের নকল করে চলতে চায়ল বা বলা যায়, তারা তাদের তাস জন্মের লেবাস থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ হতে চায়ল। তাসের দেশের প্রচলিত কোন শাস্তির ভয় তাদের বিরত রাখতে পারল না। সবশেষে ইচ্ছার মাতাল করা “ইচ্ছা-হাওয়া”র কাছে তাসবংশীয় রাজা, রাণী, প্রজা, মন্ত্রী, নারী, পুরুষ সকলেই তাদের আজন্ম আচরিত নিয়মকে বিসর্জন দিয়ে ইচ্ছার জয়গান গায়ে মানুষ হয়ে উঠতে প্রয়াসী হল।
রবীন্দ্র নাটকে এটি দ্রোহের একটি উদাহরণ। এমন আরও সুস্মিত দ্রোহের উদাহরণ আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী, অচলায়তন, বিসর্জন সহ অনেক নাটকে। “রক্তকরবী”-তে আমরা দেখি লোভ ও ক্ষমতা এবং শোষণের বিরুদ্ধে দ্রোহ, “অচলায়তন”-এ দেখি জড়তা, অচল প্রথা ও আচার-অনুশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, জীবনের প্রবাহকে অচল করে রাখা মানেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। আর “বিসর্জন”-এ দেখি ধর্মীয় আচার-অনুশাসনের অন্ধত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এখানে মানবিকতা ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই আসল বিষয়। বিসর্জনে জয়সিংহের উচ্চারণ, “সত্য আর মিথ্যায় প্রভেদ শুধু এই/মিথ্যারে রাখিয়া দিই মন্দিরের মাঝে/বহুযত্নে, তবু সে থেকেও থাকে না।/সত্যরে তাড়ায়ে দিই মন্দিরবাহিরে/অনাদরে, তবু সে ফিরে ফিরে আসে।” জয়সিংহ উচ্চারিত “সত্য” এখানে একজন মানবী, জয়সিংহের প্রেমিকা “অপর্ণা”, যাকে মন্দিরের পুরোহিত রঘুপতি একদমই চায় না যে সে মন্দিরে আসুক। কিন্তু অপর্ণা বারবার ফিরে আসে, কারণ তার ভেতরে প্রাণ আছে, প্রেম আছে, মানবিকতা আছে। অন্য দিকে জয়সিংহ উচ্চারিত “মিথ্যা” হল মন্দিরে অধিষ্ঠিত দেবী প্রতিমা, যাকে বহুযত্নে, বহুপ্রেমে, বহু ভক্তিতে মন্দির মাঝে অধিষ্ঠান রাখতে চায়লেও সে রঘুপতি কথিত রাজরক্তের অভাবে থাকতে চায়না মন্দিরে, মন্দির ত্যাগ করে চলে যেতে চায়।

Photo collage

এছাড়া রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকে দ্রোহ প্রকাশ পেয়েছে অপূর্ব এক শৈল্পিক বৈচিত্র্যে। শিশু অমলের কণ্ঠে মুক্তির আহ্বানই ডাকঘর নাটকে মূল বিদ্রোহ। রবীন্দ্রনাথ এখানে সরাসরি রাজনৈতিক বা সামাজিক বিদ্রোহ দেখাননি, বরং অস্তিত্ববাদী ও মানবিক দ্রোহ প্রকাশ করেছেন। অমল জানে সে অসুস্থ, তবু সে মৃত্যুকে ভয় না করে মুক্তির দিকে তাকায়। ঘরের চার দেয়াল তাকে আটকে রাখলেও তার কল্পনা ও ইচ্ছা তাকে মুক্ত করে। ডাকঘরের প্রতীকী উপস্থিতি হয়ে ওঠে যোগাযোগ, স্বাধীনতা ও জীবনের প্রবাহের প্রতীক।
অমল অসুস্থ ছিল ঠিকই, কিন্তু তার হৃদয় ছিল এক দুর্লভ এবং ব্যতিক্রমী আনন্দে ভরপুর। যে আনন্দ “কারণের আনন্দ” নয়, যে আনন্দ “অকারণের আনন্দ”। কারণের আনন্দ আমাদের প্রতিদিনের প্রতিক্ষণের প্রচলিত আনন্দবোধেরই অংশ, আর “অকারণের আনন্দ” অনেক বড় আনন্দ, যার নির্দিষ্ট কোন সীমা নেই, অতীন্দ্রিয় এক জগত এবং অসীম আকাশই কেবল হতে পারে এর সীমা।
তাই অমলের যে জগত, তা ছিল আমাদের এই প্রচলিত জগতের মধ্যেই এক অপার বিস্ময়ের জগত। এক অনুভব এবং অনুধাবনের জগত, যে জগতে ছোট ছোট সাধারণ অনুষঙ্গের মধ্যে অসাধারণত্ব লুকিয়ে থাকে। কেবলমাত্র একটি জানালার দূরত্ব, তার একপাশে বদ্ধ ঘরে অমল নিজে এক অপার বিস্ময়বোধ নিয়ে, আর অন্যপাশে তারই অনুভব অনুধাবনের সেই আরাধ্য জগতে শারীরিক ভাবে সে যেতে না পারলেও , সেখানে থাকে তার স্বপ্নের পশরা নিয়ে চলাচলকারী মানুষগুলি। সেখানে দেখেছি আমরা চলাচল করছে, দইওয়ালা থেকে শুরু করে ফুল কুড়োতে চলা শোভা। খেলতে চলা বালকের দল, জবরদস্ত পাহারাদার, কুটিল মোড়ল এদেরকে। আরও দেখেছি নির্মাণাধীন ডাকঘর, দুরের পাহাড়, ঝর্ণা আর পাহাড়ের কাছের গ্রামে পৌঁছনোর মেঠো পথ, ফুল, পাখি, পাখির গান, আকাশ, বাতাস আরও কত কিছু।
ডাকঘর নাটকে রবীন্দ্রনাথের দ্রোহ সূক্ষ্ম অথচ গভীর। তাঁর দ্রোহ এখানে জীবনকে প্রাণবন্ত করে দেখানোর প্রয়াস, যেখানে মৃত্যু-ভয়কে অতিক্রম করে মানুষ মুক্তির দিকে এগোয়। নাটকটি তাই হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক বিদ্রোহের দলিল, যেখানে শিশুর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় মুক্তির গান। এখানে মৃত্যু আসলে এক পরম মুক্তি। এভাবেই আমরা দেখতে পাই, রবীন্দ্রনাথের দ্রোহ কখনোই হিংস্র বা প্রবল নয়, বরং শৈল্পিক মানবিক ও আধ্যাত্মিক, যা মানুষের অন্তর্গত মুক্তির জয়গান গায়। ডাকঘরে তাই অমলের চরিত্র হয়ে উঠেছে অস্তিত্ববাদী ও আধ্যাত্মিক বিদ্রোহের প্রতীক। মৃত্যুকে ভয় না করে মুক্তির দিকে তাকানোই এখানে দ্রোহের শৈল্পিক প্রকাশ।
এভাবে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ কখনো ধর্ম, কূপমণ্ডূকতা, স্থবিরতা, শোষণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘর্ষে যাননি, বরং ব্যাঙ্গ বিদ্রুপের শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় মানুষের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। শুধু নাটক কেন, রবীন্দ্রনাথের গল্প, কবিতা,উপন্যাস এমনকি তার সঙ্গীত সবকিছুতেই আছে সূক্ষ্ম, সুস্মিত অথচ গভীর দ্রোহের শিল্পিত প্রকাশ।

[লেখকের পূর্ববর্তী রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
শৌভিক দে
শৌভিক দে
3 months ago

বাঃ। রবীন্দ্রনাথ আজও আবিষ্কৃত হতে পারেন নবীন আলোকে। তার ধর্ম ভাবনা যে সমকালীন ভারতবর্ষ বোঝেনি এবং অদ্যাবধিও সাধারণ্যে সমুচিত বোধগম্য নয় – সে কথা আমরা মেনে থাকি। মুস্কিল এই যে তাঁর রচনা বারংবার পাঠে – একই অভিব্যক্তির ভিন্নতর দ্যোতনা পাঠককে কিছুটা হলেও দিশাহারা করে রাখে। লেখক লক্ষ্য করেছেন তার ব্রহ্ম সংগীত গুলিও ঠিক একেশ্বরবাদের প্রচার করে না, বরংআত্মার মুক্তি ও সৌন্দর্যের প্রকাশ, যা ধর্মীয় মতবাদকে ছাড়িয়ে যায়। প্রকৃত ধর্মের উদ্দেশ্য তো তাই হওয়া উচিৎ। তাছাড়া একটি বিরল প্রচলিত বিষয় – যা লেখক বলছেন রবীন্দ্রনাথের দ্রোহ চেতনা – আলোকিত হয়েছে। অবশ্যই সোচ্চার প্রতিবাদে তিনি পুরোধা হতে পারেন নি কিন্তু নিরুচ্চার ও থাকেন নি। তিনিই তো লিখেছেন ‘ঘরে বাইরে ও চার অধ্যায়’। অবশ্য সেখানেও উচ্চকিত হয়নি তাঁর দ্রোহ।


বর্তমান লেখকের নামের অর্ধেক মেলে এক দিকপাল রবীন্দ্র বীক্ষকের সঙ্গে। সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই তার কলমে নিবিষ্ট রবীন্দ্র চর্যা ভবিষতেও পাওয়া যাবে একথা বলা অসমীচীন হবে না।

আর হ্যাঁ আমাদের সম্পাদক-দ্বয় ছেলে ধরার মত উমদা কিসিমের প্রাবন্ধিক ধরে আনতে পারেন। তাঁদের নিরবিচ্ছিন্ন প্রয়াসের জয় হোক।

আবু সায়ীদ ফিরোজ
আবু সায়ীদ ফিরোজ
Reply to  শৌভিক দে
3 months ago

আপনার মুজতবীয় হিউমার সমৃদ্ধ আলঙ্কারিক মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। এমন উমদা কিসিমের রসিকতা কেবল একজন রসিক পাঠকের পক্ষেই সম্ভব।

Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
3 months ago

এত স্নিগ্ধ ও সরল স্বচ্ছন্দ ভাষায় সমগ্র রবীন্দ্র দর্শন ছুঁয়ে যাওয়ার মধ্যে লেখকের মুন্সিয়ানার পরিচয় আগেও পেয়ে মুগ্ধ হয়েছি।এবারও হলাম।প্রত্যাশা বাড়লো আরো।