
পাটালি গুড়ের কথা মনে আছে? সেই হারিয়ে যাওয়া গুড়ের কথা বলছি। অর্ধেক গোলকাকৃতির হালকা লালচে একটা পাটা থেকে এক টুকরো ভেঙে নিয়ে মুখে পুরে দাও। আহা! স্বর্গ যেন জিভের ছোঁয়ায়। সকালের টিফিনে দুধরুটি। সাথে কয়েক টুকরো পাটালি। কিংবা শুধু রুটি সাথে আর কিচ্ছুটি চাইনা। একটা বড় ফিটকিরি সাইজের পাটালির টুকরো। সন্ধেবেলায় মুড়ির আড্ডা। সাথে পাটালি। রুটি ভাত যাই থাকনা, রাতে ডিনারে শেষ পাতে আবার এক টুকরো, সাইজ যত ছোটই হোকনা কেন। স্কুলের টিফিন বক্সেও স্থায়ী জায়গা দু’তিন মাসের জন্য পাকাপাকিভাবে। পুরো মরশুমটাই যেন পাটালিময়। রান্নাঘরে একরকম নীল মাছি ছিল, সারাক্ষণ ভনভন করতো ঘরময়, ঠিক ওই দু তিন মাস।
পৌষ সংক্রান্তির দিনে রিয়েলিটি শো-এর ফাইনালের আগে যেন মাস জুড়ে অডিশন রাউন্ড। বাতাসে উত্তুরে হাওয়া লাগামাত্রই দু চারদিন পরপরই হেঁশেলে চলত মা ঠাকুমার পিঠে পুলি বানানোর কর্মব্যস্ততা। সেদ্ধ পিঠে, পুলি পিঠে, পাটিসাপটা, দুধপুলি পায়েস- এর সুগন্ধে সারাবাড়ি সুগন্ধে ‘ম ম’করত। বাড়ির চৌহদ্দি পেড়িয়ে সুঘ্রাণ পৌঁছে যেত আশেপাশে। ঠাকুমা তখন ছিলেন বেশ শক্তপোক্ত। একাই একশো। নাটাইচণ্ডী বলে এক আরাধ্য ছিলেন ঠাকুমার। তাঁর পূজা হত সংক্রান্তি বা আশেপাশের কোনও একটা দিন। এক্কেবারে ভোর থেকেই চলত তার প্রস্তুতি পর্ব। একদম রাত অবধি চলত পুজো। টানা দুটো মাস চলত পিঠে পার্বণ।
“পেটে খেলে পিঠে সয়। এতো কভু মিছে নয়।”—-ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সের দাপট ছিলনা তখন। তবে, তার মধ্যেও মাঝেমধ্যে একটি আধটু গুরুপাক হয়ে গেলেও চাপ ছিলনা। দু-এক পিস মেট্রোজিল কিংবা এক ছিপি কারমোজাইমেই মুশকিল আসান। আবার কোমর বেঁধে লেগে পড় পেটপুজোয়। তবে, সবেতেই যেন সবপুজোয় ওই কাঁঠালিকলার মত খেজুরে গুড়টা ছিল কমন। “মাস্ট মাস্ট অ্যান্ড মাস্ট”।

বসিরহাটে পিসির বাড়ি থাকার সুবাদে, খেজুরে গুড়ের আগাগোড়া রসাস্বাদন থেকে পুরোপুরি যে বঞ্চিত হয়নি তা অস্বীকার করলে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যায় বইকি! শীতে নয়-নয় করেও কম করে পাঁচ ছয়বার পিসির বাড়ি হানা দেওয়ার মধ্যে যে খেজুরগুড় একটা প্রধান আকর্ষণ ছিল এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। পিসতুতো ভাইকে সঙ্গে করে সেই কাকভোরে উঠে সাইকেলে চেপে খেজুর গুড়ের আড়তে হানা দিয়ে চাষি কাকাদের কাছ থেকে গাছ থেকে সদ্য পাড়া তাজা রস আকন্ঠ পান করা। আহা……….! স্মৃতি যেন জোনাকি! পিসির পাড়াতে আনাচে কানাচে খেজুর গাছে ভর্তি। সকালে বিকেলে তাজা গোটা খেজুর ফলও তাই দিব্যি জুটে যেত, না চাইতেই। “চেরি অন দ্য টপ” কি একই বলে? এদিকে, আমাদের মফঃস্বলে খেজুর রস কাঁধে করে বিক্রি হত বটে, তবে সে-গুড়ে বালি। ওতে ওই খেজুর সেন্ট মাখানো স্যাকারিন এর বেশি কিছু থাকত বলে মনে হয়না। শুধু বড়দের উপদেশ নয়; হাতেনাতে চেখে দেখাও বটে। তবে হ্যাঁ। এর মধ্যেও পাড়ার সেকেলে মুদি দোকানগুলোর পাটালি ধোঁকা দেয়নি কক্ষনো। কোয়ালিটির উনিশ বিশ অবশ্যই থাকত। যেমন গুড় তেমন দাম।
আমাদের বাড়িতে অবিশ্যি সারা বছর মিষ্টি নিয়ে অত আদিখ্যেতা ছিলনা কোনও কালেই। কিন্তু শীতের স্পেশাল আইটেমগুলোর বরাবরই একটা আলাদা কদর ছিল বইকি।
নলেন গুড়ের সন্দেশ, নলেন গুড়ের রসগোল্লা, ছানার পায়েসের পাশাপাশি এসে যায় জয়নগরের মোয়ার স্মৃতিও। ‘জয়’নগর না কি ‘জাল’নগর- বিচার করার অবকাশই ছিলনা একবার মুখে পড়লে। একবার কোনও এক আত্মীয় এসেছিলেন বাড়িতে দু বাক্স মোয়া নিয়ে। ওবেলা গিয়েই দুই ভাইয়ে মিলে পুরো বাক্স সাবাড়।
বছর দুয়েক আগেকার কথা। পিসির বাড়ি গেছি এই শীতের সময়েই। মনে আশা, ছোটবেলার খেজুরে মজাটাকে আবার পুরনো ধাঁচে ফিরে পাওয়া। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরা। পুরোটা না হলেও অন্তত কিছুটা। কিন্তু হায়…! না আছে বাঁশ, না বাঁশুরি। কোথায় সেই পাটালি, কোথায় সেই তাজা খাঁটি রস! পাড়ার খেজুর বাগানগুলোও সব হাপিস। তার জায়গায় গা ঘেঁষাঘেঁষি ইমারতি সজ্জা। গ্রামের ভেতরেও নাকি খেজুর গাছ আজকাল সেরকম দেখা যায়না। আর থাকলেও খেজুর রস পাড়ার লোক নেই।
কোথায় যেন শুনেছিলাম, কিছু ঘটনার স্মৃতিটুকুই যত্নে আগলে রাখতে হয়। লালন করে রাখতে হয় সারাটা জীবন। মিথ্যে নয়। কিন্তু পারছি কই? আশায় মরে চাষা….!



হর্ষবর্ধনের ভাই গোবর্ধন একবার কর্মপলক্ষে এক জনের বাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে খাটের নিচে সারি সারি পাটালি। গোবর্ধন বিনাবাক্যব্যয়ে সেখানে সেঁধিয়ে অর্ধেক সাফ করে দিয়েছিল। সখেদে দাদা বলেছিলেন ‘পাটালিযার সব পাটালি তুই ফাটালি’। লেখক মাত্র এক বাক্স জয় নগরের মোয়া খেয়েছেন। আফসোস। কিছুটা পাটালির নিজস্ব স্বাদে গন্ধে আর কিছুটা লেখকের হাত যশে ভারী রম্য হয়েছে রচনাটি। পরিশেষে ‘এই খেদ মোর মনে’, সবার একজন পিসি / মাসী , বসিরহাটবাসী হন না কেন?
বিষয়টা খুব লোভনীয়।কিন্তু স্মৃতিতেই সুন্দর।বর্তমানে একেবারেই হতাশাব্যঞ্জক।কারণ,খেজুর গাছের বাগান উজাড় হয়ে গাছগুলি ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে চালান হয়ে গেছে।বাগানের মালিকের বর্তমান বংশধরেরা জমিগুলো প্রমোটিংযে দিতে পছন্দ করছে।খেজুর গাছ এখনো যে কটা আছে,তার রস পাতার লোক পাওয়া যায়না।এখনো যেটুকু রস সংগ্রহ করা হয়,তাতে নানাবিধ কৃত্রিমতার মিশ্রণ হয়ে পাটালি বা খেজুরগুড় হিসেবে বিক্রী হয়, যেটা খেলে মুখ বেজায় মিষ্টি আর মন তিক্ত হয়ে যায়।