শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বাঙালির বিবর্তনের ভোটরঙ্গ

সদ্য সমাপ্ত হল বাংলার ভোটরঙ্গ, যাকে ঘিরে বিগত কয়েকটি মাস আবর্তিত হয়েছে বাঙালিজীবন। এবং বলা যেতে পারে, এখনও তার রেশ কাটেনি। তবে রঙ্গ বললেও একে তামাশা বলে তাচ্ছিল্য করা ঠিক হবেনা, কারণ ব্যাপারটা ঠিক ততটা হালকা করে দেখার উপায় নেই। পর্বে পর্বান্তরে পাঁচটি বছর করে বাঙালিজীবনের ঠিকাদারীত্ব যাদের হাতে থাকে, লঙ্কায় পৌঁছনোর পর তারা রাবণ রাজার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে কতদিন সময় নেয় এবং সহনশীলতার পরম পরাকাষ্ঠা বাঙালি তার পরেও তাদের কতটা সময় দেয়, সেটা একটা ভেবে দেখবার বিষয় বৈকি।

এমনিতেই চোর, ডাকাত, সাম্যবাদী, অসাম্যবাদী, সততার স্বঘোষিত প্রতিমূর্তি, যেই হোক না কেন, তাকে নিজেকে আপাদমস্তক চিনিয়ে দিতে বাঙালি প্রভূত সময় দিতে পরম ধৈর্য্যশীল। তার হাতে সময় অপরিমিত। স্থিতধী জাত বলেই হয়তো, কোনো কিছু বুঝতে ও মানতে তার অপর্যাপ্ত সময়ের প্রয়োজন হয়। তদুপরি বাঙালি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে সে বড়ো চিন্তাশীল ও বিদ্রোহী মানসিকতাসম্পন্ন জাতি। তার অতীত ঐতিহ্যে সে সদা গরীয়ান। উত্তরাধিকারীর ন্যূনতম কাঙ্খিত যোগ্যতা নিয়ে সে নিস্পৃহ। কিন্তু এই বিষয়ে সে নিশ্চিত যে অন্যদের থেকে সে ভিন্ন। অপরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করায় তার পরম আত্মপ্রসাদ। তার মনে সদা সর্বদা ধূমায়িত বিপ্লবীয়ানার টগবগ করা বাষ্প। তবে চায়ের দোকানের বেঞ্চ বা ঘরোয়া বিতর্ক সভার বাইরে তার ফলিত অগ্নিবর্ষী রূপের বহিঃপ্রকাশ বিশেষ দেখা যায় না। তার চতুর্দিকে অগ্নুৎপাতের লেলিহান বহ্নিশিখা গ্রাস করলেও সে মহাভারতে, মহাবিশ্বে বা মহাকাশে বিচরণপুর্বক তুলনামূলক ব্যাখ্যার গবেষকের ভূমিকা গ্রহণ করতে স্বস্তি বোধ করে। এক অলীক স্বপ্নে বিভোর হয়ে অপরিমিত সময় ধরে তৃপ্তিবোধে আচ্ছন্ন হয়ে সে নিয়ত নিস্তরঙ্গ থাকার অভ্যাস করে থাকে। এর ফলস্বরূপ বাংলা নামের লঙ্কারাজ্যটিতে রাবণ রাজাদের শাসনকাল বর্ধিত হয় পর্ব থেকে পর্বান্তরে, মূলত বাঙালির অসীম সহনশীলতার গুণে। সুতরাং কদাচিত রূপ বদলালেও রাবণ রাজা ও তার উপভোক্তা প্রজাগণের গরিষ্ঠাংশ ‘মৎস মারিব খাইব সুখে’ দর্শনকে মূলমন্ত্র করে সুখে কালাতিপাত করে।

এ’ তো গেল সদ্যসমাপ্ত ভোটরঙ্গের চালচিত্রে বাঙালি জাতিচরিত্রের বিগত কিছু দশকের চলমান এবং ক্রমবর্ধমান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে রাম-রাবণের যুদ্ধের আবহ তৈরি হল কবে থেকে? কবে থেকেই বা বাংলার রাজনীতি হয়ে উঠল মহাভারতের কুরুক্ষেত্র, যেখানে ন্যায়-নীতি সব বিসর্জন দিয়ে একপক্ষ অপর পক্ষকে বলতে শুরু করল “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী”?

পূর্বকালে ছবিটা যে ভিন্ন ছিল, সেটা বলাই বাহুল্য।


অতীতচারণে ধরা পড়ে, বাঙালির ভোট-ব্যবস্থার শুরুটা হয়েছিল উনিশ শতকের শেষদিকে। ১৮৮২ সালে ‘ভারতবন্ধু’ হিসেবে খ্যাত ভাইসরয় লর্ড রিপনের সম্মতিতে শুরু হয়েছিল এক সীমিত পরিসরের প্রাতিষ্ঠানিক নির্বাচন ব্যবস্থা, যা মান্যতা দিয়েছিল রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভারত সভা’ সংগঠনের স্বায়ত্বশাসনের দাবিকে। তবে তাতে সাধারণ মানুষের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু সেই সময়কাল থেকেই বাঙালি পরিচিত হতে লাগল নেতা, কমিশনার, ভোট ইত্যাদি শব্দের সঙ্গে। মফস্বলে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড, মিউনিসিপ্যালিটি ইত্যাদি কিছু স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পদাধিকারীদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হল প্রবল উৎসাহ, যদিও ভারতীয় জনসাধারণ সার্বিকভাবে প্রথম ভোটাধিকার পেয়েছিল ১৯৫২ সালের নির্বাচনে, যার ভিত্তি ছিল ১৯৫০ সালে গৃহীত ভারতীয় সংবিধান।

ভোট-ব্যবস্থা নিয়ে কৌতুহল ও প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বাঙালি রঙ্গ-ব্যঙ্গে মজেছিল শুরুর দিনগুলো থেকেই। ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত শ্রী নরেন্দ্রনাথ দত্ত (পরবর্তীকালের স্বামী বিবেকানন্দ) ও শ্রী বৈষ্ণবচরণ বসাক সম্পাদিত ‘সঙ্গীতকল্পতরু’ গ্রন্থে সংকলিত এক অনামী লোকগীতি-রচয়িতার একটি গানের বাণী তার সাক্ষ্য বহন করছে। সেই গানের কয়েকটি পংক্তি ফিরে দেখা যেতে পারে।…
“ও চাঁদ, ফাঁকি দিয়ে ভোট নেবে ভেবেছ আবার ?
চিনেছে তোমায় সব রেটপেয়ার –
যেমন করেছি বোকামী, দেছ, আক্কেল সেলামি,
বেলতলাতে ন্যাড়ে যায় হে কবার? …”

পরবর্তী সময়ে এলেন মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুর-খ্যাত রঙ্গব্যঙ্গবিশারদ দাদাঠাকুর ওরফে শরৎচন্দ্র পন্ডিত। সমাজের অভিজাত শ্রেণীর কর্তাব্যক্তিদের অন্যায়ের প্রতিবাদে এক প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ, সমাজের ভ্রুকুটিকে হেলায় অস্বীকার করে সামান্য চানাচুর-তেলেভাজা বিক্রেতা কার্তিককে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে পৌর কমিশনার করার অসাধ্য সাধন করে ফেললেন অন্ত্যজ শ্রেণীর অঘোষিত প্রতিনিধি তাদের দা’ঠাকুর। এই নির্বাচন তুমুল ঝড় তুলেছিল জঙ্গীপুরের সমাজে ও রাজনীতিতে। ভোট-রঙ্গ নিয়ে দাদাঠাকুরের গানগুলো আজও জনপ্রিয় ও প্রাসঙ্গিক।

“ভোট দিয়ে যা – / আয় ভোটার আয়। / মাছ কুটলে মুড়ো দিব, / গাই বিয়োলে দুধ দিব,/ দুধ খেতে বাটি দিব, / সুদ দিলে টাকা দিব… “
কিমবা, “আমি ভোটেরও লাগিয়া ভিখারি সাজিনু…ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে” ইত্যাদি।

ভোটারকে ভোট দানে প্রলুব্ধ করার বা ভোট-প্রার্থীর এমন স্বীকারোক্তি সম্বলিত বাণী রসসিক্ত গানগুলোর ছত্রে ছত্রে। বাংলার ভোট-চিত্রে দাদাঠাকুরদের এই রঙ্গরসের আয়ু বিভিন্ন আঙ্গিকে মোটামুটি ছ’য়ের দশকের শেষ পর্যন্ত। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে শালীনতা বজায় রাখা বাংলার রাজনীতি, নির্বাচন উপলক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলির রুচিশীল দেওয়াল-লিখনেও এই রঙ্গরসের স্পর্শ পেয়েছিল বেশ কিছুকাল।

তারপর বিগত কিঞ্চিদধিক পাঁচ দশক জুড়ে বাংলা ও বাঙালির ভোট-রাজনীতিতে ক্রমান্বয়ে শাক্ত ভাবের প্রাবল্য। বৈষ্ণব পদাবলীর কীর্তন ঘরানা ছেড়ে বাঙালি ব্রতী হল গুলি, বোমা, ছাপ্পাভোট, ভোটলুঠ সহযোগে নরসংহার সাধনা দ্বারা অর্জিত ক্ষমতারোহনে, ক্ষমতা-রক্ষণে। সেই পর্ব এখনও অন্তর্হিত – টেবিল ঠুকে এমনটা বলা একেবারেই সমীচীন হবে না। নেহাৎ সাম্প্রতিকতম কালে যথেচ্ছাচারী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করা নির্বাচন কমিশন নামক রীতিমতো কড়া ধাঁচের জ্যাঠামশাইয়ের প্রবল দাপট আমাদের বিপুল অনীহা সত্ত্বেও বঙ্গে এখনও বহমান। অদূর ভবিষ্যতে তাঁদের অনুপস্থিতিতে বা পরবর্তী সময়ের দুর্বল উপস্থিতিতে হয়তো প্রমাণ হয়ে যাবে যে সাময়িক বিচ্যূতি সত্ত্বেও বাঙালি নিজের চরিত্রটি না খোয়াতে বদ্ধপরিকর। অর্থাৎ, বাঙালি আছে বাঙালিতেই !

ভোট-বাংলার রুচিহীন সংস্কৃতি যদি সব বাধা-বিঘ্ন উপেক্ষা করে সত্যিই যদি চলমান থাকে, বাঙালি তার উত্তরাধিকার বোধকে হেলায় তুচ্ছ জ্ঞান করে ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ায়, তাহলে সভয়ে বলব, ঈশ্বর বাঙালিকে রক্ষা করুন।

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
11 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
2 months ago

একমাত্র সময়ই বলতে পারবে এসব প্রশ্নের কি উত্তর হবে।কারণ,অবনমনের থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া মানে স্রোতের বিপরীতে চলা।সমষ্টির অংশগ্রহণ ছাড়া যেটাতে সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়।

TANMAY BANERJEE
TANMAY BANERJEE
Reply to  Chandan Sen Gupta
1 month ago

খুব সত্যি কথা। বিপরীতমুখী স্রোত যত কঠিনই হোক না কেন, বাঙালিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সে পথে যেতেই হবে।

Somen Dey
Somen Dey
2 months ago

বিবর্তন না বলে বোধহয় অবনমন বলাই যথাযথ হবে। বাঙালিকে কারা যেন রাজনৈতিক সচেতন জাত বলে থাকে। এই যদি সচেতনতা হয়, তাহলে অসচেতন থাকাই বোধহয় ভালো ছিল। খুব সংক্ষেপে একটি প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গকে সুবিন্যস্ত ভাবে তুলে ধরার জন্য সম্পাদক মশাইকে ধন্যবাদ জানাই।

TANMAY BANERJEE
TANMAY BANERJEE
Reply to  Somen Dey
1 month ago

ঠিকই বলেছেন। বিবর্তন শব্দটির মধ্যে যে সদর্থক ভাবনার ইঙ্গিত, সেটি তো আজ অন্তর্হিত। তবে আশায় রয়েছি, সভ্য সমাজের ভোট ব্যবস্থায় একদিন না একদিন বাঙালিকে ফিরতেই হবে।

Jhuma Banerjee
Jhuma Banerjee
2 months ago

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। আশাবাদী।

TANMAY BANERJEE
TANMAY BANERJEE
Reply to  Jhuma Banerjee
1 month ago

ঠিক। বাঙালি তার সুস্থ রুচিতে ও কর্মোদ্যমে ফিরুক, এই আশাই জাতির সঞ্জীবনী।

Ruchismita Ghosh
Ruchismita Ghosh
2 months ago

একটি যথাযথ সম্পাদকীয়। তথ্যপূর্ণ এবং ভোট সম্পর্কিত ছড়াগুলো উপভোগ করলাম।

TANMAY BANERJEE
TANMAY BANERJEE
Reply to  Ruchismita Ghosh
1 month ago

অনেক ধন্যবাদ।

Himadri Kumar Das Gupta
Himadri Kumar Das Gupta
2 months ago

ভীষণ ভাল লেগেছে। লেখাটা নিয়ে কিছু বলতেও ইচ্ছা করছিল।কিন্তু কী আর করি। আজ দু-কলম লিখতেও তো প্রাণ পাই না!

TANMAY BANERJEE
TANMAY BANERJEE
Reply to  Himadri Kumar Das Gupta
1 month ago

বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনি যেটুকু লিখেছেন, সেটার মূল্যও কম নয়।

Dwaipayan Goswami
Dwaipayan Goswami
1 month ago

খুব ভালো লাগলো

11
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x