শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

রবীন্দ্রনাথ : অন্তরে বাহিরে এক নিরন্তর পর্যটক

যে বালকটি জোড়াসাঁকোর বাড়ির জানলার খড়খড়ি তুলে অপার বিস্ময়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখত পুকুরের জল, তাতে চরে বেড়ানো হাঁস, স্নানরত প্রতিবেশীরা, তার ধারে ঝুরি নামা বটগাছ, বালকটির সেই অপার কৌতূহল, বিশ্ববিখ্যাত মানুষ হবার পরেও রবীন্দ্রনাথ বুকের মধ্যে কোথাও হয়ত লুকিয়ে রেখেছিলেন । নইলে আমাদের মনে এই প্রশ্নটা উঁকি দেয়, জীবনের শেষ প্রহর অবধি তিনি এমন অদম্য ভ্রামণিক রয়ে গেলেন কি করে !

বালক রবির কাছে ৬নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের লালবাড়ির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বাইরে যাওয়ার সুযোগ প্রথম আসে ডেঙ্গু রোগের কল্যাণে । কলকাতায় সেবার খুব ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিল। ডেঙ্গুর ভয়ে ঠাকুর পরিবারের কয়েকজন তখন চলে যান পেনেটিতে (পানিহাটি) ছাতু বাবুর গঙ্গার তীরের বাগান বাড়িতে । রবি জায়গা পেয়েছিল সেই দলে । ‘কড়ি বরগা দেওয়ালের জঠর’ থেকে বেরিয়ে সেই রবির প্রথম বাহির দর্শন ।

পেনেটির বাগানবাড়ি

সেখানকার জোয়ার ভাটায় নদীর রূপ পাল্টে যাওয়া, নানা রকমের পাল তোলা নৌকোদের গঙ্গায় অলস গতিতে ভেসে বেড়ানো, ওপারে কোন্নগরের বনে সূর্য ডোবার সময় আকাশে নানা রঙ্গের ম্যাজিক-বালকটির কাছে এসব ছিল বিস্ময়।
এই প্রথম ভ্রমণের কথা স্মৃতিতে ছাপ ফেলেছিল গভীরভাবে । নইলে সেই তখনকার অকিঞ্চিৎকর দৃশ্যগুলি- শেওড়ার বেড়া দেওয়া পানা পুকুরের ধারে বসে অবেলায় একটি লোকের দাঁতন করতে থাকা, বাগানের চাঁপা গাছে রাশি রাশি ফুল ফুটে থাকা, এখো গুড় আর বাসি লুচি দিয়ে প্রাতরাশ করা, এ সবের বর্ণনা অনেক বছর পার করে জীবনস্মৃতি লেখার সময় অত বিশদে মনে থাকে কি করে !

সত্যিকারের ভ্রমণের সুযোগ ঘটেছিল আরও একটু বড় হয়ে । একবার দেবেন্দ্রনাথ প্রবাস থেকে ফিরলেন বিশেষ করে রবি এবং তার দুই সঙ্গীর পৈতে দেওয়ার জন্যে। বৈদিক নিয়ম মাফিক পৈতে দেওয়া হয়ে গেল। নেড়া মাথার রবির তখন চিন্তা এর পর নেড়া মাথা নিয়ে কি করে সে ইংরেজী স্কুলে যাবে । এমনিতেই সেখানে দুষ্টু ছেলের অভাব নেই । নানা ছুতোয় বালক রবিকে র‍্যাগিং করে তারা । নেড়া মাথা হলে সে উৎপাত আরো বাড়বে এই চিন্তায় রবি যখন বিষণ্ণ, এমন একটা সময়ে তার বাবামশাই একদিন তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন তাঁর সঙ্গে হিমালয় যেতে চায় কিনা। এ তো মেঘ না চাইতেই জল। রবি তো একপায়ে খাড়া।

বোলপুর হয়ে যাওয়া হবে হিমালয়ের পথে, এমনটাই ঠিক হল। বোলপুর জায়াগাটাও তখন একেবারেই অপরিচিত রবির কাছে । ছোটোবেলায় রবীন্দ্রনাথের ‘তিনসঙ্গী’র এক সঙ্গী ছিল সমবয়সী ভাগনে সত্যপ্রকাশ, সে কয়েকদিন আগে বোলপুর ঘুরে এসে রেলভ্রমণ এবং বোলপুরের প্রকৃতি নিয়ে এমন বর্ণনা দিয়েছে যে রবি তা শুনে রীতিমত উত্তেজিত । সত্যপ্রসাদ বলেছিল রেলগাড়িতে চড়ার জন্যে নাকি এক বিশেষ দক্ষতার দরকার । একটু পা ফসকালেই আর রক্ষে নেই ।

যদিও বোলপুরের পথে রেলে চেপে এবং বোলপুরে স্টেশনে নেমে বোঝা গেল সত্যপ্রকাশের বর্নণায় প্রচুর অতিরঞ্জন ছিল। প্রথম রেল যাত্রা কেমন ছিল সেই স্মৃতি রোমন্থন করে জীবনস্মৃতিতে লিখেছিলেন- “গাড়ি ছুটিয়া চলিল; তরুশ্রেণীর সবুজ-নীল পাড়-দেওয়া বিস্তীর্ণ মাঠ এবং ছায়াচ্ছন্ন গ্রামগুলি রেলগাড়ির দুই ধারে দুই ছবির ঝরনার মতো বেগে ছুটিতে লাগিল যেন মরীচিকার বন্যা বহিয়া চলিয়াছে।”

বোলপুরে পৌঁছে তাঁর প্রথম প্রাপ্তি ভৃত্যরাজ থেকে মুক্তি পাওয়া। এমন কি পিতৃদেবও তেমন আপত্তি করছেন না তার একা একা হেঁটে বেড়ানোতে। যতদূর চোখ যায় দিগন্ত বিস্তৃত লালমাটির উন্মুক্ত প্রান্তর। এই প্রান্তরে হেঁটে হেঁটে ঘুরতে ঘুরতে একদিন আবিষ্কার হয়ে গেল খোয়াই । তার সঙ্গে তো তাঁর আমৃত্য প্রেম রয়ে গিয়েছিল।

কিছুদিন বোলপুরে থেকে ১০ বছরের বালক রবি বাবার সঙ্গে ফাগুন মাসের শেষদিকে ট্রেনে চেপে চললেন অমৃতসর। অমৃতসরে প্রায় একমাস থাকতে হল রবিকে। তার মন টানছে অদেখা হিমালয়। তাই ভালো লাগছে না এই অমৃতসর শহর। অবশেষে চৈত্রের শেষ দিকে যাওয়া হল ডালহৌসি পাহাড়ের কোলে ছোট্টো জায়গা বক্রোটা। বক্রোটা, তেহরা আর পোতরেন এই তিনটে পাহাড় নিয়ে একটি উপত্যকায় একটি জনপদ। বক্রোটা পাহাড়ের উপরে ছিল দেবেন্দ্রনাথের থাকার জায়গা। বৈশাখ মাসেও সেখানে প্রবল ঠান্ডা। প্রথম যেদিন সমতল থেকে ঝাঁপানে চেপে পাহাড়ে উঠছেন তখনি বালক রবি হিমালয়ের সৌন্দর্যে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে পঁইষট্টি বছর পর সেদিনের কথা মনে করে লিখছেন – ‘পংক্তিতে পংক্তিতে সৌন্দর্যের আগুন লাগিয়া গিয়াছিল।’

শুধু হিমালয়ের দর্শনের আনন্দই নয়, সেই সঙ্গে পেলেন প্রথম অনাস্বাদিত এক স্বাধীনতার স্বাদ। নিজের শোবার ঘরের একলা বিছানায় শুয়ে শুয়ে শার্শির কাঁচ দিয়ে তারায় আলোয় অস্পষ্ট পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকিয়ে থাকা, ঝাপানওয়ালাদের বিশ্রামের সুযোগে ঝাপানে বসে বসেই দূরের শ্যাওলা মাখা কালো পাথরের গা বেয়ে নেমে আসা ঝিরিঝিরি ঝর্নার গান শোনা, এই সব প্রবল শিহরণ জাগালো রবির মনে।

এর সঙ্গে আর একটা পাওয়া সন্ধেবেলায় বাবামশাইয়ের কাছে পাহাড়ের স্বচ্ছ আকাশে গ্রহতারাদের চিনে নেওয়ার সুযোগ। বেশ কয়েক মাস পাহাড়ে থাকা হয়েছিল রবির। তারপরে কলকাতায় ফেরা। এর বছর পাঁচেক পর রবীন্দ্রনাথ আবার ট্রেনে চাপছেন মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে। গন্তব্য আমেদাবাদ । মেজদাদা সেখানে ডেপুটিগিরি করেন । রবিকে তিনি নিয়ে যাচ্ছেন ইংরেজি ভাষাটায় ভালো করে সড়গড় করে দিতে এবং বিলেতি এটিকেটে কিছুটা রপ্ত করে দিতে । কারণ এর পর রবিকে পাঠানো হবে বিলেতে। উচ্চতর শিক্ষা লাভ করার জন্য।

আমেদাবাদে শাহীবাগে যে বাড়িটিতে উঠলেন সে বাড়িটি ছিল বাদশাহী আমলের একটি প্রাসাদ। রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায় – “দিনের বেলায় মেজদাদা চলে যেতেন কাজে। বড়ো বড়ো ফাঁকা ফাঁকা ঘর হাঁ হাঁ করছে, সমস্ত দিন ভূতে পাওয়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি। সামনে প্রকান্ড চাতাল, সেখান থেকে দেখা যেত সাবরমতী নদী।”

কিছুদিন আমেদাবাদ এবং তারপরে বোম্বাই শহরে কাটিয়ে ১৮৭৮ সালের ২০ শে সেপ্টেম্বর, মেজোদাদা সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে উঠলেন ‘পুনা’ জাহাজে। তখনকার দিনে সমুদ্রযাত্রা ছিল বেশ কষ্টদায়ক। প্রথমে মাস্কাট, এডেন হয়ে সুয়েজ। প্রায় পাঁচদিনের যাত্রা। তারপর সুয়েজ থেকে রেলগাড়িতে চেপে আলেকজান্দ্রিয়া। সেখান থেকে স্টিমার চেপে ভূমধ্যসাগর পার হয়ে ইটালি। লাগলো পাঁচদিন সময়। সেখান থেকে ট্রেনে চেপে বিন্দ্রিসি। আবার সেখান থেকে ট্রেনে চেপে প্যারিস। প্যারিসে কয়েকদিন থেকে সেখান থেকে লন্ডন। সতেরো বছরের রবীন্দ্রনাথের এই ভ্রমণের বিশদ এবং সরস বর্ণনা তিনি লিখেছিলেন ইয়োরোপ প্রবাসীর পত্র নাম দিয়ে। তা প্রকাশিত হয়েছিল ভারতী পত্রিকায়। এই লেখাটি লেখার সময় তরুণ রবীন্দ্রনাথের কিছু মতামত তাঁর বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের পছন্দ হয় নি। তাই নিয়ে দুজনের মধ্যে কিছু কিছু পত্র-বিতর্কও হয়। রবীন্দ্রনাথের অভিভাবকদের কাছে ব্যাপারটা সম্ভবত ভালো ঠেকেনি। ১৮৮০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথও দেশে ফিরে এলেন। প্রায় বছর দেড়েক বিলেতে কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেশে ফিরে এলেন। এই দেড়বছরে বিলেতের খোলামেলা সমাজে কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্বভাবে অনেকটাই বদল ঘটল। প্রভাতকুমারের ভাষায় – “তিনি গিয়াছিলেন লাজুক বালক, ফিরিলেন প্রগলভ যুবক।”

বিলেতযাত্রী তরুণ রবীন্দ্রনাথ – ১৮৭৮ সাল

এর পরে কিছুদিন মগ্ন হয়ে রইলেন সাহিত্য এবং সংগীত সৃষ্টিতে । কুড়ি বছর বয়সে লিখলেন বাল্মিকী প্রতিভা, যা অভিনীতও হল জোড়াসাঁকোর বাড়িতে বিদ্বজনদের সভায়, এবং প্রভূত প্রশংসিত হল। এর পরে জ্যোতিদা’রা সঙ্গে চলতে লাগল গান বাজনার পাঠ। আর লেখালেখি তো ছিল । এই সময় ভ্রমণ বলতে ছিল গঙ্গার ওপারে চন্দন নগর । সেখানে জ্যোতিদাদার বাগানবাড়ির নাম ছিল মোরানসাহেবের কুঠি । গঙ্গার ধারে কাটাতে কাটাতে রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কার করলেন – ‘বাংলা দেশের নদীই বাংলাদেশের ভিতরকার প্রাণ বহন করে।’ নদীর সঙ্গে তাঁর যে চিরকালের পাগলপারা প্রেম গড়ে উঠেছিল সে অবশ্য অন্য এক নদী। তার কথায় পরে আসছি।

এর পর ১৮৮৭ সালের শরৎকালে রবীন্দ্রনাথ যাচ্ছেন পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দার্জিলিং ভ্রমণে। ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয়েছে এবং তিনি এক কন্যা সন্তানের পিতা হয়েছেন। সেই ভ্রমণে তিনি ছিলেন সেই দলের একমাত্র পুরুষ অভিভাবক। সঙ্গে ছিল তাঁর স্ত্রী, শিশু কন্যা, দুই দিদি ও তাঁদের কন্যারা। তখন স্ত্রী মৃণালিনীর বয়স ১৪, কন্যা বেলার বয়স এক বছর। দুই দিদি সৌদামিনী আর স্বর্ণকুমারীর দুই কন্যা হিরণ্ময়ী (১৯), সরলা ( ১৫)। তখনকার দিনে দার্জিলিং যেতে হলে ট্রেন বদল করে যেতে হত। ছয় জন প্রমিলাবাহিনী এবং তাদের প্রচুর পরিমাণে বাক্সো প্যাঁটরা সামলাতে রবীন্দ্রনাথকে কি পরিমাণ ঝক্কি ঝামেলা সামলাতে হয়েছিল, তার সরস বর্ণনা আছে ভাইঝি ইন্দিরাকে লেখা একটি চিঠিতে। সেবার প্রায় এক মাস তিনি কাটিয়েছিলেন দার্জিলিং-এ ।

কলকাতায় ফিরে লেখালেখিতে মন দিলেন। সেই সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে নানা মতামত প্রকাশ করতে দেখা গেল। মাঝে মাঝে যাচ্ছেন বোলপুর, আশ্রম প্রতিষ্ঠার কাজে। যাচ্ছেন শিলাইদহতে জমিদারির কাজ দেখতে। ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথের আবার মনে হল কাছাকাছি নয়, দূরে কোথাও যাওয়া দরকার। প্রথমে তিনি চললেন সোলাপুরে মেজদার কর্মস্থলে। তারপর সেখানে থেকে মেজদা এবং বন্ধু লোকেন পালিতের সঙ্গে বোম্বাই থেকে সিয়াম জাহাজে আবার পাড়ি দিলেন বিলেত। সেই আগের মতো করেই। আগের বারের মতো আবার পড়লেন সি-সিকনেসে। আবার ইটালির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হলেন। আবার প্যারিস ভালো লাগলো। এবার প্যারিসে সদ্য নির্মিত আইফেল টাওয়ারের উপরে উঠে প্যারিস শহরকে অন্যরকম ভাবে দেখলেন। এবং অতঃপর লন্ডনে পৌঁছালেন।

ইংল্যন্ডে বন্ধু লোকেন্দ্রনাথ পালিতের সঙ্গে কবি – ১৮৯০ সাল

লন্ডন শুধু পরিচিত শহর তাই নয়। এবার এখানে আছে অনেক স্মৃতি । বারো বছর আগে, যে স্কট পরিবারের সঙ্গে, বিশেষ করে সেই পরিবারের দুই কন্যার সঙ্গে মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তাঁদের সন্ধানে গিয়ে দেখলেন তারা সেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও । তাদের নতুন ঠিকানার সন্ধান পেলেন না।
কয়েকমাসের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের এই প্রবাস আর ভালো লাগলো না । ১৮৯০ এর ৬ই অক্টোবরে ডায়রিতে তিনি লিখছেন – “আমি আর এখানে পেরে উঠছিনে, অতয়েব স্থির করেছি বাড়ি ফিরবো”। এই লেখার তিনদিন পরেই দেশে ফিরবার জাহাজে উঠে পড়লেন। তাঁর এই সুদূরের টানে অস্থির হওয়া আবার গৃহের টানের ফিরে আসার মধ্যে কি রহস্য ছিল তা আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে না।

ফিরে এসেই শুরু হয়েছে শিলাইদহ-কেন্দ্রিক ভ্রমণ। প্রবীন বয়স অবধি তা চলেছে। উদ্দেশ্য যদিও জমিদারীরর কাজ দেখাশোনা, তবুও সেখানে ভ্রমণের আনন্দ কর্মের প্রহারকে ছাপিয়ে গেছল। পদ্মা নদীর সংসর্গে এসে একদিকে রবীন্দ্রনাথ নতুন করে আবিষ্কার করছেন নিজেকে, অন্যদিকে তাঁর কাছে ধরা দিচ্ছে প্রকৃতির এক অন্যরূপ। তিনি আবিষ্কার করছেন স্তব্ধতার বাঙময়তা, নদীর প্রাণচাঞ্চল্য, আকাশের ঔদার্য। উপলব্ধি হচ্ছে – “পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দরী, তা কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়। এই যে ছোটো নদীর ধারে শান্তিময় গাছপালার মধ্যে সূর্য প্রতিদিন অস্ত যাচ্ছে এবং এই ধূসর নিস্তব্ধ চরের উপরে প্রতি রাতে শত সহস্র নক্ষত্রের অভ্যুদয় হচ্ছে, জগৎ সংসারে এ যে কী এক মহৎ ঘটনা তা এখানে থাকলে তবে বোঝা যায়।” ( ছিন্নপত্র)

পদ্মা বোটে রবীন্দ্রনাথ

১৮৮৯ সাল থেকে ১৮৯৫ সাল, এই সময়টার মধ্যে বার বার এসেছেন শিলাইদহ । তাঁর প্রিয় জলিবোট আর পদ্মা বোটে চেপে ঘুরে বেড়িয়েছেন । এই ভ্রমণ তাঁকে কতটা মুগ্ধ করেছিল, তার বিবরণ অনেকটাই পাওয়া যাবে ছিন্নপত্র গ্রন্থে সংকলিত তার চিঠি গুলিতে । শিলাই দহের জমিদারির পাট একসময়ে চুকলো আইনগত সমস্যায়। কবি মন দিলেন শান্তিনিকেতন গড়ার কাজে।

এর মধ্যে ১৯০২ সালে কবি হারালেন তাঁর জীবনসঙ্গিনীকে। সেই সময় রথীন্দ্রনাথের বয়স চৌদ্দ, রেণুকার বয়স বারো মীরার বয়স দশ, শমীর বয়স আট। মাধুরীলতার বিয়ে হয়ে গিয়ে শ্বশুর বাড়িতে । তবুও রবীন্দ্রনাথ সামলে নিলেন নিজেকে। পুত্র কন্যাদের নিয়ে শান্তিনিকেতনে ফিরে কাজে লেগে পড়লেন । কিছুদিন পরে অসুস্থ কন্যা রেণুর স্বাস্থ্যোদ্ধারের উদ্দেশে চললেন হাজারিবাগ । সেখান থেকে ফিরে আবার চললেন আলমোড়ায় । মাসখানেক থেকে ফিরলেন কলকাতায় ।

প্রথমবার আঠারো বছর বয়সে দ্বিতীয়বার উনত্রিশ বছর বয়সে বিলেত গিয়েছিলেন । তৃতীয়বার বিলেত চললেন বাহান্ন বছর বয়সে, ১৯১২ সালে ২৭ই মে তারিখে । সঙ্গে পুত্র এবং পুত্রবধু। এবারের যাওয়াটা চিকিৎসার কারণে হলেও তিনি লিখলেন – “কেবলমাত্র বাহির হইয়া পড়াই আমার উদ্দেশ্য। ভাগ্যক্রমে পৃথিবীতে আসিয়াছি, পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় যথাসম্ভব সম্পূর্ণ করিয়া যাইব…… দুইটা চক্ষু পাইয়াছি যত দিক দিয়া যত বিচিত্র করিয়া দেখিবে ততই সার্থক হইবে।”
কিন্তু এই বারের ভ্রমণ শুধু দেশ দেখার জন্য ছিল না । এইবারেই কবি ও সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের পশ্চিম জগতের সঙ্গে সংযোগের সেতুটি তৈরি হয়ে। গীতাঞ্জলি অনুবাদ পাঠ করা হয় ইয়েটস, রদেনস্টাইন সহ সেই সময়ের প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের সামনে। এঁদের মধ্যে অনেকেই সেই কবিতাপাঠ শুনে মুগ্ধ হন। এইবারের ভ্রমণেই কবির আলাপ হয় চার্লস এন্ড্রিউজের সঙ্গে। সেই আলাপ পরে বন্ধুত্বে পরিবর্তিত হয়, যা রয়ে যায় জীবনব্যাপী। ১৯১২ সালের ২৭শে অক্টোবর মূলত চিকিৎসা করানোর উদ্দেশে কবি চললেন আমেরিকা। সেই প্রথম আমেরিকায় যাওয়া। আমেরিকায় বেশ কিছু জায়গায় আমন্ত্রিত হয়ে বক্তৃতা দেবার পরে ইংল্যান্ডে ফিরলেন ১৯১৩ সালের জুন মাসে । ভারতে ফিরে এলেন ৬ই অক্টোবর । ইয়োরোপ আর আমেরিকা মিলে প্রায় সতেরো মাস কাটিয়েছিলেন দেশের বাইরে।

শিল্পী রোদেনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডে – ১৯১২ সাল

১৯১৩ সালে ১৩ই নভেম্বর সুইস একাডেমি ঘোষণা করল সেই বছরে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ দেশে প্রচুর হৈ চৈ হল। সম্বর্ধনা জানানো হল নানান জায়গা থেকে। বিদেশের অনেক দেশ থেকেই আমন্ত্রণ আসতে লাগল । অবশেষে আমেরিকার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লেন কবি । ঠিক হল যাওয়া হবে জাপান হয়ে । এন্ড্রিউজ, পিয়ারসন আর মুকুলচন্দ্র দেকে সঙ্গে নিয়ে জাহাজে উঠলেন ১৯১৬ সালের ৩রা মে । প্রথমে রেঙ্গুন, পরে পৌঁছলেন জাপান । জাপানে বেশ কিছু সভায় বক্তৃতা করলেন। দেশ ভ্রমণও করলেন । তারপরে সেখান থেকে যাত্রা করে আমেরিকায় পৌঁছালেন ১৯১৬ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর।

প্রথমে সিয়াটেলে শুরু করে বোস্টন, পোর্টল্যান্ড, সানফ্রান্সিসকো, লস আঞ্জেলস, ডেনভার, চিকাগো, ইন্ডিয়ানা পোলিস, সিনসিনাটি, নাসভেল, ডেট্রয়েট, পিটসবার্গ, ফিলাডেওফিয়া, ব্রুকলিন, নিউইয়র্ক, ক্লিভ্ল্যান্ড শহরে ঘুরে প্রায় চল্লিশটি বক্তৃতা দেন । এই যাত্রায় আমেরিকার আর কিছু দেখার সময় পেয়েছেন বলে মনে হয় না ।

আমেরিকায় ও জাপানে রবীন্দ্রনাথ – ১৯১৭ সাল

১৯১৭ সালের ২১ জানুয়ারী আমেরিকা ছেড়ে জাপানের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। পথে একবার নামলেন হনুলুলুতে । সেখানেও কিছু বক্তৃতা, সম্বর্ধনা। তারপরে জাপান হয়ে ভারতে ফেরেন ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে । ফিরে কিছুদিন ব্যস্ত থাকলেন শান্তিনিকেতনের কাজে। দেশের এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের চিন্তা ব্যক্ত করলেন নানা লেখায় এবং বক্তৃতায়।

১৯১৮ সালে কন্যা বেলাকে হারালেন । কাজের মধ্যে ডুবে ভুলে থাকতে চাইলেন শোক। অনেকদিন বাইরে কোথাও যাওয়া হয় নি বলে কবি যখন কিছুটা ব্যাকুল হয়ে ছিলেন , সেই সময় মহীশূরের দেওয়ানের কাছ থেকে নিমত্রণ এলো , দক্ষিণ ভারত ভ্রমণের জন্য। ১৯১৯ সালের জানুয়ারী মাসে সুরেন্দ্র নাথ করকে সঙ্গে নিয়ে চললেন দক্ষিণ ভারত ভ্রমণে । গেলেন বাঙ্গালোর , মহীশূর, উটি , কোইম্বাটর, পালঘাট, নেলোর, তাঞ্জোর, মাদ্রাজ । এর মধ্যে কিছুদিন অ্যানি বেসেন্টের অতিথি হয়ে কাটালেন অ্যাডিয়ারে। কলকাতায় ফিরলেন ১৯১৯ সালের ১৪ই মার্চ ।

ওই বছর অক্টোবর মাসেই আবার চললেন আসাম ভ্রমণে । সঙ্গে ছিলেন রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী, দ্বিজেন্দ্রনাথ ও কমলা দেবী। ১১ থেকে ৩১ শে অক্টোবর কাটালেন শিলং-এর ব্রুকশিল্ড বাংলোতে । তারপর গেলেন গৌহাটিতে । সেখানে দিন তিনেক থেকে লামডিং হয়ে গেলেন সিলেট । সেখানে কয়েক দিন থেকে কলকাতা হয়ে শান্তিনিকেতনে ফিরলেন ১০ই নভেম্বর।

১৯২০ সালে গান্ধিজী কবিকে গুজরাটি সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার জন্যও আহ্বান জানালেন আহমেদাবাদে । কবি এবার আন্ড্রিউজ সাহেব, ক্ষিতিমোহন সেন, সন্তোষ চন্দ্র মজুমদার এবং কিশোর ছাত্র প্রমথ নাথ বিশীকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে চেপে চললেন প্রথমে বোম্বাই । পরে সেখান থেকে আহমেদাবাদ । ২ রা এপ্রিলে গুজরাটি সাহিত্য সম্মেলনে ভাষন দিলেন। দিন চারেক আহমেদাবাদে কাটিয়ে কাঠিয়াবাদের রাজাদের আহবানে গেলেন ভাবনগর । সেখান থেকে লিমডি , নাদিয়াদ হয়ে ফিরলেন আহমেদাবাদ এবং সেখান থেকে বোম্বাই ফিরলেন । সেখান থেকে রাজার অতিথি হয়ে গেলেন বরোদা । সেখান থেকে গেলেন সুরাট । সেখান থেকে বোম্বাই হয়ে কলকাতা ফিরলেন ৩ রা মে ।

কলকাতায় তাঁর ৫৯ তম জন্মদিন পালন করা হল । তার চার পাঁচ দিনের মধ্যেই কবি আবার বেরিয়ে পড়লেন । এবার গন্তব্য ইয়োরোপ হয়ে আমেরিকা । সঙ্গে গেলেন রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী আর সুরেন্দ্রনাথের কন্যা মঞ্জু । বোম্বাই থেকে জাহাজে উঠলেন ১৯২০ সালের ১৫ই মে । ইংল্যান্ডে পৌঁছালেন ৫ই জুন । ৬ই আগস্ট পৌঁছালেন ফ্রান্সে । ১৯ শে সেপ্টেম্বরে পৌঁছালেন হল্যান্ডে । হল্যান্ডের দি হেগ, রটারড্যাম, আমস্টারডম, লেডেন, ইউ ট্রেক্ট, ইত্যাদি জায়গা ১৫ দিন ধরে ঘুরে পৌঁছালেন বেলজিয়াম । সেখানে নানা জায়গায় বক্তৃতা করে পৌঁছালেন প্যারিস । সেখান থেকে জাহাজে করে গেলেন আমেরিকা। নিউইয়র্কে পৌঁছালেন ২৮শে অক্টোবর। সেখানে নানা জায়গা ঘুরে সভা, সাক্ষাৎকার, বক্তৃতা শেষ করে মার্চ মাসে আবার ফিরে গেলেন লন্ডনে। তিন সপ্তাহ মতো সেখানে কাটিয়ে বিমান যোগে পৌঁছলেন প্যারিসে । সেখান থেকে ৩০ শে এপ্রিল গেলেন সুইজারল্যান্ডে । মে মাসে এসে পৌঁছলেন জার্মানিতে । জার্মানি থেকে ডেনমার্কে, ডেনমার্ক থেকে সুইডেনে । জুন মাসে আবার ফিরে এলেন জার্মানিতে । সেখান থেকে আস্ট্রিয়া। সেখান থেকে প্রাগ । ১ লা জুলাই প্রাগ থেকে ফিরলেন প্যারিসে। এবং প্যারিস থেকে জাহাজে করে দেশে ফিরলেন ১৯২১ সালের ১৬ই জুলাই । প্রায় পনেরো মাস লম্বা একটি সফর ছিল ।

এরপর প্রায় এক বছর ধরে ব্যস্ত রইলেন শান্তিনিকেতনে ও সাহিত্য সাধনায় । ১৯২২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর আবার বেরিয়ে পড়লেন দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারত সেই সঙ্গে সিংহল ভ্রমণে । এবার সঙ্গে গেলেন এলমহার্স্ট এবং শান্তিনিকেতনের শিক্ষক গৌরগোপাল ঘোষ । পুনে, বঙ্গালোর, মাদ্রাজ, কোয়েম্বাটোর, ম্যাঙ্গালোর হয়ে সেখান থেকে সিংহল । সিংহল থেকে ফিরে পৌঁছলেনে ত্রিভাঙ্কোরে ৯ই নভেম্বর তারিখে । সেখান থেকে এরনাকুলাম, আলেপ্পি, কোচিন হয়ে ফিরলেন মাদ্রাজে । এরপর বোম্বাই হয়ে আহমেদাবাদ। পৌষ উৎসবের আগে ফিরে এলেন শান্তিনিকেতনে ।

আবার পরের বছরের (১৯২৩) ফেব্রুয়ারি মাসে ক্ষিতিমোহন সেনকে সঙ্গে নিয়ে চললেন বারানসী। সেখান থেকে লখনৌতে অতুলপ্রসাদ প্রসাদ সেনের বাড়িতে, দিন চারেক থাকলেন । সেখান থেকে গেলেন বোম্বাই । সেখান থেকে করাচি । সেখান থেকে ১০ই এপ্রিল ফিরলেন শান্তিনিকেতনে । কিন্তু বেশিদিন থাকলেন না । ২৬ শে এপ্রিল আবার বেরিয়ে পড়লেন শিলং-এর উদ্দেশ্যে । শিলং-এ কাটালেন মাস দুয়েক। ফিরে এলেন শান্তিনিকেতনে।

১৯২৪ সালে ডাক পেলেন চীন দেশে গিয়ে বক্তৃতা দেবার জন্যে। ঠিক হল চীন যাত্রায় তাঁর সঙ্গী হবেন ক্ষিতিমোহন সেন আর নন্দলাল বসু । আর এই যাত্রায় তাঁর সেক্রেটারি হবেন এলমহার্স্ট সাহেব । ২১ শে মার্চ ১৯২৪ সালে কলকাতা বন্দর থেকে জাহাজে চাপলেন তাঁরা । রেঙ্গুন , পেনাং , কুয়ালালামপুর , সিঙ্গাপুরে নামলেন । সেখান থেকে জাহাজ বদলে পৌঁছালেন হংকং । সেখান থেকে পৌঁছালেন সাংহাই । সাংহাইতে সাতদিন থেকে নানা জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে সাংহাই থেকে নদী পথে গেলেন পিকিং । মে মাসের শেষের দিকে কবি চীন থেকে পৌঁছালেন জাপানে । প্রায় একমাস জাপানে থেকে কলকাতায় ফিরলেন ২১ শে জুলাই ।

চীনে রবীন্দ্রনাথ – ১৯২৪ সাল

মাস দুএক মাস দেশে কাটাবার পরই তিনি দক্ষিণ আমেরিকার পেরু থেকে সেই দেশের স্বাধীনতার শতবার্ষিকী উৎসবে যোগদানের জন্যও একটি আমন্ত্রণ পান এবং সেটি গ্রহণ করেন । সুরেন্দ্রনাথকে সঙ্গী করে কবি কলোম্বো থেকে জাপানি জাহাজে উঠলেন ২৯ শে সেপ্টেম্বর ১৯২৪ । ১১ই অক্টোবরে পৌঁছালনে ফ্রান্সের মার্সাই বন্দরে । সেখান থেকে গেলেন প্যারিস । সাতদিন প্যারিসে থেকে সেখান থেকে আবার জাহাজে উঠলেন । প্রায় তিন সপ্তাহ জাহাজে যাত্রা করে পৌঁছালেন আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স এয়ারিস । এখানে দু মাসের বেশি রইলেন । এখানেই পরিচয় হয় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে । শরীর অসুস্থ হওয়ায় তিনি শেষ অবধি পেরুতে যেতে পারেননি । বুয়েন্স আরিয়েস থেকে ইয়োরোপের উদ্দেশে যাত্রা করেন । এলেন ইটালিতে । দিন পনেরো ইটালিতে কাটিয়েছিলেন । তারপর বিন্দ্রিসি , পোর্ট সৈয়দ হয়ে ফেব্রুয়ারি মাসে ফিরে আসেন দেশে । এই যাত্রায় প্রায় পাঁচ মাস ছিলেন বিদেশে ।

১৯২৬ সালে আবার ইতালি সরকার কবিকে আমন্ত্রণ জানালো । কবি সাড়া দিলেন । এবারে তাঁর যাত্রা সঙ্গী হলেন রথীন্দ্রনাথ , প্রতিমা দেবী , তাঁদের পালিতা কন্যা, প্রশান্ত মহালনাবীশ এবং তাঁর স্ত্রী । এ ছাড়া শান্তিনিকেতনের দুই শিক্ষক ।
ইতালি থেকে আমন্ত্রণ এসেছিল মূলত মুসোলিনির কাছ থেকে । রবীন্দ্রনাথ প্রথমে মুসোলিনির আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলেও, পরে লোকমুখে তার স্বৈরাচারের কথা জানতে পেরে, মুসোলিনির কাজকর্মের সমালোচনা করেন কবি। এর ফলে উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ছেদ পড়ে। এরপর রবীন্দ্রনাথ সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, গ্রিস, তুরস্ক ও মিশর ভ্রমণ করে ভারতে ফিরে আসেন প্রায় সাত মাস সফর করে ।

জার্মানিতে বিদ্বজ্জনদের সঙ্গে – ১৯২৬ সাল

১৯২৭ সালে রাজস্থানের ভরতপুরের মহারাজার কাছ থেকে আমন্ত্রণ এলো সেখানের হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবার জন্য । সেই আমন্ত্রণ তিনি গ্রহন করলেন । প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এবং পরিচারক নীলমণিকে সঙ্গে নিয়ে মার্চ মাসের ২৮ তারিখে চললেন ভরতপুর । দুই তিন দিন সেখানে থেকে গেলেন আগ্রা । সেখান থেকে গেলেন জয়পুর । সেখান থেকে আহমেদাবাদ । আহমেদাবাদে কয়েকদিন থেকে বোলপুরে ফিরলেন ১১ এপ্রিল ।
আহমেদাবাদের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সারাভাইদের আমন্ত্রনে আবার চললেন শিলং । কিছুদিন নিরিবিলিতে কাটিয়ে ফিরে এলেন শান্তিনিকেতনে ।

ভারতের বাইরেও যে ভারত আছে সেই ভারত, অর্থাৎ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দ্বীপাবলি, দেখার ইচ্ছে অনেক দিন ধরেই কবি বহন করে আসছেন । সেই সুযোগ ঘটে গেল ।

১৯২৭ সালের ১২ই জুলাই সুরেন্দ্রনাথ কর, শিল্পী ধীরেন্দ্র দেববর্মণ এবং সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন । প্রথমে রেলপথে মাদ্রাজ । মাদ্রাজ থেকে জাহাজে সিঙ্গাপুর ,। সিঙ্গাপুরের দিন সাতেক কাটিয়ে সেখান থেকে মালাক্কা, সেখান থেকে কুয়ালালামপুর, সেখান থেকে তাইপিং । তাইপিং থেকে পেনাং , । সেখান থেকে ইন্দোনেশিয়া, বালিদ্বীপ, জাভা, সিয়াম, ব্যাংকক ইত্যাদি জায়গা ঘুরে দেশে ফিরলেন অক্টোবর মাসে ( ১৯২৭) ।

১৯২৮ সালের ১২ই মে জন্মদিনের চার দিন পরেই আবার বেরিয়ে পড়লেন দক্ষিণ ভারত ভ্রমণে । আসলে অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটি থেকে হিবার্ট লেকচার দেবার জন্য একটি নিমন্ত্রণ এসেছিল । ঠিক হল মাদ্রাজ থেকে জাহাজ ধরে যাবেন ইয়োরোপ । কিন্তু মাদ্রাজে গিয়ে কবি অসুস্থ হয়ে পড়ায় সে যাত্রা বাতিল হল । এদিকে পিঠাপুরম এর রাজার কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পেয়ে রেলপথে গেলেন মাদ্রাজ , সেখান থেকে গেলেন কুন্নুর ।তারপর এডিয়ার , পন্ডিচেরি ঘুরে গেলেন সিংহলে। দিন দশেক সিংহলে কাটিয়ে ফিরলেন মাদ্রাজে । সেখান থেকে বঙ্গালোর । মাস দুয়েকের সফর শেষ করে ফিরলেন শান্তিনিকেতনে ।

১৯২৯ সালের গোড়ায় কানাডা থেকে আমন্ত্রণ এলো একটি সম্মেলনে যোগদান করার জন্যে । কানাডায় এর আগে যাওয়া হয়নি ।তাই একটু দ্বিধা ছিল । তবু শেষ পর্যন্ত যাওয়াই ঠিক হল । সঙ্গে চললেন অপূর্ব কুমার চন্দ , কবি সুধীন্দ্র নাথ দত্ত, অধ্যাপক টাকার , ২৬ শে ফেব্রুয়ারি ( ১৯২৯ ) তাঁরা কলকাতা থেকে বোম্বাই যাত্রা শুরু করলেন । কলম্বো , সাংহাই , হয়ে জাপান পৌঁছলেন ২৪ শে মার্চ । ২৮শে মার্চ যাত্রা করলেন কানাডার উদ্দেশ্যে । ভিকটোরিয়া বন্দরে পৌঁছালেন ৬ই এপ্রিল । কানাডায় দশদিন কাটলো সম্বর্ধনা , সভায় অংশগ্রহন করে এবং বক্তৃতা দিয়ে । তারপর কানাডার ভ্যাঙ্কুভার থেকে ট্রেন ধরে গেলেন লস এঞ্জেলস । কলোম্বিয়া , ডেট্রোয়েট, হার্ভার্ড , ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিলেন । ২০ শে এপ্রিল তিনি জাপানের উদ্দেশে জাহাজে চাপলেন । ১০ই মে পৌঁছালেন ইয়োকোহামা বন্দরে । জাপানেও অনেক জায়গায় বক্তৃতা দিতে হল । তারপর সেখান থেকে জাহাজে চেপে সিঙ্গাপুর হয়ে মাদ্রাজে পৌঁছালেন ৩ রা জুলাই , সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতা পৌঁছালেন ৫ই জুলাই । এবারের সফর ছিল চারমাস আটদিনের ।

ক্যানাডার ভ্যাংকুবাররে কবি – ১৯২৯ সাল

১৯৩০-এর ২ রা মার্চে সপ্তমবার য়ুরোপ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন। সঙ্গে রথীন্দ্রনাথ , প্রতিমা দেবী ও তাঁদের পালিতা কন্যা । মার্সেলস বন্দরে পৌঁছালেন ২৬ শে মার্চ ।
এবারের ভ্রমণে শুধু বক্তৃতা নয় সঙ্গে আছে নিজের আঁকা চিত্রপ্রদর্শনী। ২ মে প্যারিসে তাঁর প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী নিজে ঘুরে দেখলেন। ১৯, ২০ এবং ২৬ মে হিবার্ট বক্তৃতামালা দিলেন অক্সফোর্ডে। বার্মিংহাম, বার্লিনেও চলল তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী। বার্লিনে আইনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাতে সামিল হন কবি।
দু’বার ব্যর্থ হওয়ার পর এবার কবি রাশিয়ায় গেলেন। মস্কোতেও তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী হয় (১৯৩০-এর ১৭ সেপ্টেম্বর)। অন্যদিকে রাশিয়ার ভ্রমণে রবীন্দ্রনাথ এতটাই মুগ্ধ হন যে পরে রাশিয়ার চিঠিতে লেখেন – ‘না এলে এ জন্মের তীর্থদর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত।’

রাশিয়ায় রবীন্দ্রনাথ – ১৯৩০ সাল

রাশিয়া থেকে বার্লিন , বার্লিন থেকে আমেরিকা । সেখানে অনেক কটি বক্তৃতা দিলেন । মাঝে শরীর খারাপ হল । অবশেষে দেশে ফিরে এলেন ৩১শে জানুয়ারী ( ১৯৩০) । এই সফর ছিল প্রায় এগারো মাসের । ১৯৩১ সালের জুন মাসে মাসখানেকের জন্য কাটিয়ে এলেন দার্জিলিং-এ ।

১৯৩২ সালে নিমন্ত্রণ এলো পারস্যরাজের । তখন সত্তর পেরিয়েছে রবীন্দ্রনাথের । শরীর বিশেষ ভালো যাচ্ছে না । কিন্তু তাও কবির কথায় – “ মনে হল এ নিমন্ত্রণ অস্বীকার করা অকর্তব্য হইবে “ । তাই আয়োজন চলল । এবার যাওয়া হবে আকাশপথে । এর আগে একবার আকাশপথে লন্ডন থেকে প্যারিস গেছলেন । কিন্তু সে ছিল অন্য দেশের মাটি । এবার খোদ কলকাতা থেকে উড়ান । এই সফরে তাঁর সঙ্গী প্রতিমা দেবী , অমিয় চক্রবর্তী আর কেদার নাথ চট্টোপাধ্যায় । যাত্রা শুরু হল ১১ এপ্রিল । ১৩ই এপ্রিলে পৌঁছালেন বুশায়ার বিমান বন্দরে । গেলেন তেহরান ,গেলেন সিরাজ । সেখানে হাফিজের সমাধি দেখলেন । গেলেন ইস্পাহান । গেলেন বোগদাদ । এক মাস বাইশ দিনের সফর শেষ করে ফিরে এলেন ৩রা জুন ( ১৯৩২) ।

ইরানের তেহেরানে – ১৯৩২ সাল

১৯৩২ সালে বিদেশ ভ্রমণের পর আর বিদেশ-ভ্রমণে যাননি। আসলে শেষ সফরগুলিতে অনেক সময় শরীর তাঁর মনকে সহযোগিতা করছিল না । তবু নিমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করতে পারছিলেন না । তার একটা কারণ বিশ্বভারতীর জন্য টাকা সংগ্রহ করা । সেই সঙ্গে তাঁর নীড়-বিবাগী হৃদয় তো ছিলই ।

জাভা-যাত্রীর পত্র-র শেষ পত্রে অমিয় চক্রবর্তীকে তিনি লিখেছিলেন: ‘পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে অন্তত এই বুদ্ধি আমার এসেছে যে, ঘুরে বেড়িয়ে বেশি লাভ নেই; এ যেন চালুনিতে জল আনবার চেষ্টা, পথে-পথেই প্রায় সমস্তটা নিকেশ হয়ে যায়।’
তবুও তারপরেও তিনি থেমে যান নি । ঐ বয়সে পারস্য ভ্রমণ মোটেই আয়াসসাধ্য ছিল না । না গেলেও খুব কিছু ক্ষতি হত না । তবুও তিনি শারীরিক অবস্থা অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে পড়েছিলেন ।

এর পর বিদেশ না গেলেও দেশের মধ্যে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়া থেকে বিরত হন নি ।

১৯৩৫ সালে খারাপ শারীরিক অবস্থা নিয়ে গেলেন কাশী, এলাহাবাদ , লাহোর । ১৯৩৬ সালে নাটকের দল নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন দিল্লি, এলাহাবাদ , মিরাট । চারবার গেছেন কালিংপং-মম্পু । চতুর্থবার মংপু থেকে ফিরেছেন ১৯৪০ সালের আষাঢ় মাসে । ফিরে এসে থেকেই শরীর ভালো যাচ্ছে না । কিন্তু কয়েক মাস শান্তিনিকেতনে থেকেই তিনি আবার মংপুতে যেতে চাইলেন । ডাক্তার বিধান চন্দ্র এবং নীলরতন সরকার দুজনেই তাঁকে বারণ করলেন তবু তিনি শুনলেন না । কালিংপং-এ তখন প্রতিমা দেবী আছেন । সেখানে দিন সাতেক থাকার পরই শরীর খারাপ হতে লাগলো । ২৯ শে সেপ্টেম্বর তাঁকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা হল । এই ছিল তাঁর পার্থিব জীবনের শেষ ভ্রমণ ।

পাঁচটি মহাদেশের তিরিশটির বেশি দেশ শুধু নয় আমাদের এই দেশটারও খ্যাত অখ্যাত বহু শহর, মফস্বল গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছেন সারাটা জীবন ধরে যা কিছু ভালো, যা কিছু নতুন চোখে পড়েছে তা নিয়ে লিখেছেন । আকাশপথে ভ্রমণ করার সুযোগ পেলে, সেই সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নততর হলে হয়তো এই ভ্রমণ করা স্থানের তালিকাটি আরও অনেকটাই দীর্ঘতর হত ।

সত্তর বছরের জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথকে প্রদান করার জন্য একটি মানপত্রে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম লাইনটিতে লিখেছিলেন “তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই” ।

এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আমার উপলব্ধি – রবীন্দ্রনাথ যদি শুধুই পর্যটক হতেন তাহলেও তাঁর জন্য এই বাক্যটিই আমরা অনায়াসেই বলতে পারতাম ।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Ruchismita Ghosh
Ruchismita Ghosh
20 days ago

লেখাটি পড়ে ঋদ্ধ হলাম। পর্যটক রবীন্দ্রনাথের যে পরিচয় এই লেখাটির মাধ্যমে পেলাম, তা প্রশংসনীয়।

Dwaipayan Goswami
Dwaipayan Goswami
9 days ago

“ভূপর্যটক রবীন্দ্রনাথ” এই শিরোনামে প্রকাশিত হতেই পারতো এই অসামান্য প্রবন্ধটি। খুব ভালো লাগলো লেখাটি পড়ে।

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x