শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

১৮৩৯ সালে ফিলাডেলফিয়া নিবাসী এক যুবক রবার্ট কর্ণেলিয়াস, তাঁহাদের পারিবারিক গৃহের অঙ্গনে একটি ক্যামেরার সম্মুখে, কোন এক অপরাহ্ণে প্রায় পনেরো মিনিট স্থির হইয়া নিশ্চুপে দাঁড়াইয়া রহিলেন। পূর্ব হইতেই তাহার ক্যামেরাটিতে লেন্সের সূচিমুখ দিনের আলোর সহিত সামঞ্জস্য সাধন করিয়া রাখিয়াছিলেন এবং ক্যামেরার লেন্স আবরণীটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে খুলিয়া রাখিবারও একটি প্রক্রিয়া আবিষ্কার করিলেন। ফলতঃ প্রস্তুত হইল পৃথিবীর প্রথম উপলব্ধ চিত্রশিল্পীর আত্মপ্রতিকৃতি, যাহা তিনি স্বয়ং কাহারও সাহায্য ব্যতীত সৃষ্টি করিতে পারিলেন। মানব ইতিহাস নিঃসন্দেহে ইহা একটি সন্ধিক্ষণ।

ইহার উপান্তে সভ্যতা দীর্ঘ পথ পার হইয়া আসিয়াছে। ক্যামেরা নামক যন্ত্রটি পুনঃ পুনঃ প্রযুক্তির অভিযোজনের ফলে ‘সেল্ফ শাটার’ অতিব সাধারণ একটি ঘটনায় পর্যবসিত হইল। তাহার সঙ্গে আনুষঙ্গিক বহু প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য সংযোজিত হইয়াছে। 

এ হেন ক্যামেরার জয়যাত্রার গৌরব কিছুটা ক্ষুণ্ণ হইল, যখন ধরাধামে চলভাষের উদয় ঘটিল। চলভাষ অর্থাৎ মোবাইল ফোনের হাত ধরিয়া প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নূতন যুগ আসিল। এই যন্ত্রটির ন্যায় মনুষ্যজাতিকে এযাবৎকাল দ্বিতীয় কোন যন্ত্র প্রভাবিত করিতে পারে নাই। চলভাষ যন্ত্রটি কথা বলা ব্যতীত, ছবি তোলা, গান শোনা, ঘড়ি দেখা, রেডিও, টিভি হইতে জাগ্রত মানুষের সমস্ত ইচ্ছাপূরণের দোসর রূপে একাত্ম হইয়া গেল। 

চলভাষ যন্ত্রটি বৈজ্ঞানিকদের হস্তে নিত্য নূতন কারসাজির চমকপ্রদ অস্ত্ররূপে প্রতিভাত হইতে লাগিল। ১৯৯৯ সালে সর্বপ্রথম একটি জাপানি চলভাষ কোম্পানি তাহাদের যন্ত্রে সম্মুখ ক্যামেরা সংযোজন করিলেন। ইহাতে যন্ত্রী অপর কাহারও সাহায্য ব্যতীত স্বপ্রতিকৃতির ছবি তুলিতে সক্ষম হইবেন। ঠিক যেমন কর্ণেলিয়াস করিয়াছিলেন। এই অসামান্য উদ্ভাবনটি মনুষ্যজাতির একটি বিশেষ মনস্তত্বের দ্বার উন্মোচন করিয়া দিল। পৃথিবী জুড়িয়া চলভাষ ব্যবহারকারী মানুষেরা প্রমাণ করিয়া দিলেন, আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ছবি দেখিতে সর্বাধিক আগ্রহী। 

মানব মনের চরম আকাঙ্খা, আপনাকে সকলের নিকট প্রদর্শিত করা। বিশ্বজুড়িয়া রচিত হইতে লাগিল দীনতার উদযাপন। ‘আমি’ সর্বস্ব হইয়া সমগ্র মানবজাতি ‘হিস্টেরিয়া’ ব্যাধিগ্রস্তের ন্যায় অতিরিক্ত আবেগে ভাসিয়া রহিল। আত্মমুগ্ধতা নামক এই মানসিক রোগ বৈশ্বিক অতিমারিতে পর্যবসিত হইল। 

সমাজের নিম্ন মধ্য উচ্চ, সর্বস্তরে ইহার প্রকোপ পরিলক্ষিত হইতে থাকে। নিম্নরুচি ও নিম্ন মেধা সম্বলিত অতি সাধারণ গৃহের তরুণ তরুণী হইতে বিগত যৌবনা গৃহবধূ অতি কুৎসিত অঙ্গসঞ্চলনা সহযোগে নিজ চলভাষের সম্মুখ ক্যামেরা দ্বারা নির্লজ্জ আপন শরীরী পরিবেশন করিতে অনায়াসে উদ্যোগী হইয়া থাকেন। তদুপরি এহেন প্রতিটি কর্মকান্ড, ‘মনোযোগ বাণিজ্যে’ নিয়োজিত তথাকথিত সমাজ মাধ্যম কোম্পানিগুলি নিরন্তর উপজীব্য করিয়া তুলিল, যেন ইহার ন্যায় সত্য আর সুন্দর কোনরূপেই অবস্থিত নাই। সমাজ মাধ্যমে নিমগ্ন মনুষ্যজাতি অনুধাবন করিতেই পারে না, তাহার এই অবিচ্ছিন্ন মনোযোগ-ই অত্যন্ত সুকৌশলে পণ্যে পরিণত হইয়াছে। সৃষ্টি হইয়াছে এক অ-পূর্ব বিপণন ক্ষেত্র, ‘মনোযোগ-বাণিজ্য’।

অনুরূপ, ক্ষমতার অলিন্দে বাস করিয়া কোন রাজনৈতিক নেতা অথবা নেত্রী নিজ অক্ষম এবং অপটু ক্রিয়াকর্ম দর্পভরে লোকসমাজে প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। ক্ষমতার চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান তোষামোদী বিদূষকের দল, তাহাকেই আহা আহা রবে প্রশংসায় গগন আচ্ছাদিত করিয়া রাখিল। অপগন্ড মানুষটি জানিতেই পারিল না, তাহাকে বুদবুদের উচ্চমার্গে যাঁহারা স্থাপন করিয়াছেন, সময়ের নিয়মে একদিন অন্তঃসার শূন্য মহীরূহ, নিতান্ত অনুপল ব্যবধানে বাষ্পীভূত হইবে।

গ্রীক পুরানগাথার নায়ক শ্রীমান নার্সিসাস নিজ অপরূপ অঙ্গসৌষ্ঠবের প্রেমে মোহিত হইয়া ছিলেন। তৎকালে ‘সেল্ফি’ লইবার উপায় না থাকিবার কারণে তাহাকে পুষ্করিণীর জলতলে আপন অবয়ব দেখিবার প্রচেষ্টায় রত হইতে হইয়াছিল। ‘সেল্ফি’ই হউক অথবা জলতল, প্রতিফলিত রূপ যে কদাপি স্বরূপ হইতে পারেনা, তাহা মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষকে কে বুঝাইবে? অতএব এই বিকারই শ্রীমান নার্সিসাসের বিনাশের কারণ হইয়া ওঠে।

বর্তমান সমাজের দ্রুত ধাববান রথ, স্বরূপ হইতে প্রতিফলিত বাস্তবকেই ধ্রুবপথ জ্ঞান করিয়াছে। অলীক মায়ামুখে ধাবিত চরিত্রকে বাস্তব হইতে বহুদূর নির্বাসিত করিয়া রাখিয়াছে। ক্ষমতা ভোগ করিতে করিতে এমন দূরবস্থা হইয়া পড়ে, যে নির্বাচনে শোচনীয় হারিয়া গিয়াও সে বলিতে পারে ‘আমি হারি নাই’। বিকার হইতে বিনাশ আরও একবার প্রমাণিত হয়। বৃহত্তর সমাজ এবং নব্য নির্বাচিত ক্ষমতাধারী মানুষ কি সদ্য ইতিহাস হইয়া ওঠা কালখন্ড হইতে শিক্ষা লাভ করিবে? সময় তাহার উত্তর দিবে। বাংলার জনজীবন আজ সেই সদুত্তর প্রত্যাশী।

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
2 months ago

সম্পাদকীয় মন্তব্যটি যথাযথ ও প্রাসঙ্গিক। প্রতিফলিত সত্য মানুষকে আত্মতুষ্টিতে মশগুল রাখে।ফলে আত্মসমীক্ষার অবকাশ কমে যায় ভীষণভাবে।তাই আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে শিক্ষা নেবার সম্ভাবনা কম।সেই সুযোগে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে।

শৌভিক দে
শৌভিক দে
2 months ago

অহো কি দুঃসহ কৌতুক। এ বারতা আমার নহে – স্বয়ং যিনি বাঙ্গালী তথা বিশ্ববাসীর ঘেঁটি ধরিয়া নিজেকে চিনিতে শিখাইয়াছেন সেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরের। ঘরে ঘরে, হাটে – মাঠে – ঘাটে হইতে দেব দেউল এমন কি চিকিৎসালয়েও – নার্সিসাসের দৌরাত্ম চলিয়াছে। বোধহয় উপনিষদ বলে – আত্মানাং বিদ্ধি। নিজেকে চিনিতে হইবে। সেই চেনাটিই ঈষৎ ভোল বদল করিয়া নিজেকে দেখিবার নবীন মন্ত্র হইয়াছে। সে কথা শুনিবেনা কেহ আর তথাপি জোর করিয়া শুনাইতে হইবে, দেখাইতে হইবে – সভ্যতার এ বড়ই বিড়ম্বনা। সম্পাদক মহাশয় এক অতি প্রয়োজনীয় বিষয় উত্থাপন করিয়া আমাদের ধন্যবাদার্হ হইলেন।

Ruchi Ghosh
Ruchi Ghosh
2 months ago

এক সত্য উচ্চারণ।