শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আমি হেথায় থাকি শুধু- ১

Shibanshu Dey

সামনে চেয়ে এই যা দেখি…

১ .

একটা নেশার মতো। সেই ছোটোবেলা থেকে। আলাদা করে ভাবিনি কখনও। কিন্তু জায়গাটা ছিলো যেন একটা মুক্তির প্রান্তর। তার ঝকঝকে আকাশ, লাল মাটির দিক ছাড়ানো উঁচুনিচু কার্পেট। তাল আর খেজুরগাছের সঙ্গে বাঁশবাগান, অকুলীন লতাগুল্ম সবুজ জাগিয়ে রাখে। কৃপণ হলেও উজ্জ্বল। ছোটো ছোটো বাড়িঘর, নম্র, সহৃদয় মানুষজন আর সহজ, উচ্ছল কিশোরীদের অনায়াস মুখরতা। অবারিত অক্সিজেন, ক্লোরোফিল আর ভিটামিন ডি। নিজেকে আচরাচর ছড়িয়ে বাঁচার মানে বই খোলা থাকে চারদিকে। আমাদের গ্রামের থেকে অন্যরকম। ছোটোবেলা থেকে দেখছি টাটাবাবা তার জমিদারি ঘিরে রাখে জবরদখল বাঁচাতে । অতো চেনা মাঠপ্রান্তর, পথঘাট, তাদের উদাত্ত উন্মুক্ততা হারিয়ে ফেললো রূঢ় লালফিতের বাঁধনে । তবে কি আমাদের চেনা শান্তিনিকেতনও একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছে সেই সব চরিত্র, যার টানে যেকোনও সময় নির্ভার ছুটে যাওয়া যেতো। চুপ করে কোপাই, খোয়াই, তিনপাহাড়ের কোণায় বসে নিঃশব্দের গান শুনে জমে যেতো নেশার মৌতাত। সরজমিন জানার ইচ্ছে হয় কেমন আছে সেই দূর রজনীর স্বপন? দূর ফাগুনের বেদন উদযাপন করতে না হয় আরো একবার ভুবনডাঙ্গাই হোক । প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ যদি পাই, ছাতিমতলায় । তার অফুরান আয়োজন কী আর কিছু বেঁচে আছে? ।

২.

তখন যেতুম টিরেনে। এখন তো হুশ করে চার চাকায় পাঁচ ঘন্টা। হাওড়া টিশনে লোকজন দেখে সময় কেটে যেতো । অগণন মানুষের এরকম একটি বর্ণময়, ছন্দোময় কোলাজ আমি তো কোথায় দেখিনি । শাশ্বত চলমান ইনস্টলেশন শিল্প । এক মূহুর্তের পুনরাবৃত্তি নেই তার । বোলপুরের লাইনে এখন অসংখ্য রেলগাড়ি । সেই দানাপুর প্যাসেন্জার বা রামপুরহাট ঠ্যালাগাড়ির আঠেরো শতকের বিলাস আর নেই । তাদের মধ্যে নবীনতম শাইনিং ইন্ডিয়ার বন্দেভারত। নিউ জলপাইগুড়ি শতাব্দীও একটা সরেস গাড়ি । এরা সব আরামপ্রদ এবং বিন্যস্ত । বোলপুর পর্যন্ত থামেনা কোথাও, এমনকি বর্ধমানেও না । সোয়া ঘন্টায় পৌঁছে যায় গন্তব্যে । মসৃণগতিতে গাড়ি এগিয়ে যায় । বর্ধমান পেরিয়ে যায়, গুসকরা পেরিয়ে যায় নিঃশব্দে, না থেমে, ভাবা যায় ? আশেপাশে নানা মডেলের শান্তিনিকেতনী কিছু খ্যাত-অখ্যাত সহযাত্রীদের দর্শন হয়ে যায়। বাঙালি, কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্যোতি আছে তাঁদের কারো কারো । অজয় ব্রিজের ঝমঝমের মধ্যে বাজনদারের ঝাঁঝ-ঢোলকের স্বাগত সিম্ফনি। গাড়ি থামতো, নিচু প্ল্যাটফর্ম । ঠিক যেমন ছিলো তিরিশ বছর আগে । এখন বদলে গেছে।

বোলপুর স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়েই ঘিঞ্জি বাজারের রাস্তা । মহর্ষির সময় থেকেই তার কোন স্ফীতিবৃদ্ধি হয়নি মনে হয় । শান্তিনিকেতনের মতো একটা আন্তর্জাতিক ঠিকানাকে ধারণ করার বিন্দুমাত্র পরিসর নেই এই রাস্তাটিতে । পুরোনো বারাণসির পথঘাটের থেকেও শীর্ণ, সঙ্কুচিত । দু’তিনটি মোড়ের গিঁট পেরিয়ে বোলপুর থেকে শ্রীনিকেতনমুখী বড়ো রাস্তায় কিঞ্চিৎ স্বস্তি। সেইপথে চোখে পড়বে কবিগুরু অপটিক্যালস, রবীন্দ্রবস্ত্র ভান্ডার বা বিশ্বকবি শু স্টোর্সের সারি । তবে একটু চমকে গেলুম পথের ডানদিকে একটি দোকানের নাম দেখে । ‘পর্ণা হার্ডওয়্যার’ নাম তার । পর্ণাকে শান্তিনিকেতন মনে রাখবে সেই বিশ্বাস নিশ্চয় ছিলো । কিন্তু তা বলে ঐ সারি সারি লোহার ছড়, সিমেন্টের বস্তা আর স্যানিটারি ফিটিংসের বেষ্টনীতে ঘেরা পর্ণার মুখটা আর মেলাতে পারলুম না । তবে ভরসা আছে, হারায়নি তা হারায়নি, বৈতরণী পারায়নি …….

যে পথে গাড়িটি এগিয়ে যাচ্ছিলো, সেই সব রাস্তা মনে করাবে কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ির অনুষঙ্গ । মোটরগাড়ি সেখানে এখনও বহিরাগত । টোটো, টোটো এবং টোটো। সিমেন্টবাঁধানো পথের ভুলভুলাইয়া, সোনাঝুরি থেকে সীমান্তপল্লী, মাঝিপাড়া, বাগানপাড়া। ভুবনডাঙা এখন যেন ‘রাজধানী’। পাঁচিলের এপারে ওপারে কবি’র দেশ। বিনয়ভবনের পিছুটানা অনন্ত মাঠ। আজ যেন বার্লিন দেওয়ালের অন্য পার । তাকে পেরিয়ে পায়ে পায়ে শ্রীনিকেতনের পুরোনো রাস্তায় পৌঁছোনো যাবেনা আর ।

শান্তিনিকেতনের খেলার মাঠটিকে একসময় মনে হতো অনন্তপ্রান্তর । মাঠের উত্তর প্রান্ত থেকে ঐ পারের মরূদ্যান, অর্থাৎ সারি সারি তিনটি ছাত্রী-আবাস, শ্রীসদন, বিড়লা আর গোয়েঙ্কা যেন ভবসাগরের অন্যপারের এক দৈবী স্বপ্ন । স্বপ্নই তো। বহুদিন আগে একদিন মাঠ পেরিয়ে একটা রোগা ফর্সা ধারালো মেয়ে নিজের হাতে বাঁধা বিছানা আর তোরঙ্গ নিয়ে থাকতে এসেছিলো শ্রীসদনের একটা ঘরে । দূরে কোথাও তার বাবা জেলশয্যায় আর মা রোগশয্যায় কাতর, বিচ্ছিন্ন। বহুদিন পরে মেয়েটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলো । একটা ঘর তার নামে এখনও রাখা আছে সেখানে । উর্দুতে বলতে গেলে ঐ চৌহদ্দির “গর্দিশ মেঁ হ্যাঁয়, চাঁদতারোঁ কা নিজাম” । তখন মাঠের বেড়াবাঁধা কোনও সীমা সংক্ষেপ ছিলোনা একেবারে । উত্তরপাশের রাস্তাটি টানা পশ্চিমদিকে চলে গেছে চীনাভবন হয়ে হিন্দিভবন । পাঠভবন যেতে গেলে গাড়ি রাখতে হবে ঐ মাঠের পাশে, বৃক্ষরাজির ছায়ায় ।

সেখান থেকে পায়ে পায়ে শ্রীসদনের রাস্তা পার করে ( শোনা গেলো ঐ রাস্তাটির এখন নাম হয়েছে ‘দুঃখহরণ রোড’ । যদিও দুঃখবরণ করার জন্যও ঐ রাস্তাটিকে আশ্রয় করা যেতে পারে । শ্রীসদন ও বিড়লা ছাত্রী আবাসের আঙ্গিনায় রামকিংকরের যে মহিষ-আনন মকরপুচ্ছ মূল ভাস্কর্যটি এবং নৃত্যপরা নারীমূর্তিটি রয়েছে, দু’টিই শান্তিনিকেতন ঘরানার প্রতিনিধিমূলক নিদর্শন । এড়িয়ে গেলে চলবে না । এই পথটিতে সাইকেল আরোহিণীদের অন্তহীন আসাযাওয়া থেকেই বোধ হয় লেখা হয়েছিলো, “…. শুধু দেখা পাওয়া, শুধু ছুঁয়ে যাওয়া,/ শুধু দূরে যেতে যেতে কেঁদে চাওয়া, / শুধু নব দুরাশায় আগে চলে যায়-/ পিছে ফেলে যায় মিছে আশা।।” রসিক কবি কিন্তু এই গানটিকে গ্রন্থিত করেছিলেন ‘বিচিত্র’ পর্যায়ে ।

কতো কিছু শেখার বাকি থেকে গেছে…..

৩.

গত বছর কুড়ি-পঁচিশ শান্তিনিকেতনে গেলে একটা অবশ্যগন্তব্য ছিলো ইন্দ্রনাথ মজুমদারের বইবিপণী ‘সুবর্ণরেখা’। ইন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছেন । তাঁর এই দোকানটি শুধু কেনাবেচার ঠেক ছিলোনা । সেখানে শান্তিনিকেতনের বনেদি আড্ডাধারিরা একত্র হতেন ছুটির দিনে বা অলস সন্ধেবেলা । চারদিকে অভিজাত স্বভাবময় বইয়ের সাজঘর । একপাশে আড্ডা চলতো পৃথিবীর সব বিষয় নিয়ে । বাঙালির সব পেয়েছির আসর । মনে পড়ছে বহুদিন আগে আমি তখন পাটনাতে থাকি । সাঁওতাল পরগণার সীমান্তে একটা ব্রাঞ্চ অডিট করতে গিয়ে রয়েছি সিউড়ির একটি সরাইখানায়। মাঝখানে একটা রোববার । সক্কালবেলায় বাস ধরে পৌঁছে গেলুম বোলপুর। ঘুরতে ঘুরতে নন্দন ভবনে, হঠাৎ দেখি মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী বেরিয়ে আসছেন সেখান থেকে । পিছনে অনেক বরকন্দাজ । আমার সামনে এসে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন, কখন এলে ? আমি নিতান্ত অপ্রস্তুত । বলি, এই এলুম । বেশ, বেশ, আমার একটু তাড়া আছে, আজ আসি, হ্যাঁ । বলতে বলতে তিনি নিষ্ক্রান্ত । তাঁর সঙ্গীর দল আমাকে এলেমদার কিছু ভাবলেন বোধ হয় । আমি নিতান্ত ভ্যাবাচ্যাকা । ভাবতে বসি, তাঁর কোন পরিচিতের সঙ্গে আমাকে তিনি গুলিয়ে ফেললেন কে জানে ? ভিতরে তখন শ্রদ্ধেয়া অমিতা সেন’কে আশ্রমিকরা সম্বর্ধনা দিচ্ছেন । তার পরে তাঁকে দেখার আর সুযোগ হয়নি ।

অভ্যেসবশে পৌঁছে যাই ‘সুবর্ণরেখা’য় । ঢুকতে গিয়ে দেখি রোববারের আড্ডা বসে গিয়েছে ততোক্ষণে। একজন হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে । দেখি আমাদের সুজিতদা, জামশেদপুরের সুজিত চট্টোপাধ্যায় । আমাদের শহরের আদি শান্তিনিকেতনী আশ্রমিক ছিলেন তিনি ছাত্রজীবনে । তারপর ফিরে আসেন নিজের গাঁয়ে । উচ্চপদস্থ অধিকারী হয়ে কর্মরত ছিলেন একটি নামকরা সংস্থায় বহুদিন । আদ্যন্ত রুচিমান, বিদগ্ধ একটি শিল্পী মানুষ, অবসর নিয়ে শান্তিনিকেতনে স্থিতু হয়েছেন । আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন ইন্দ্রনাথবাবুর সঙ্গে, ‘আমাদের’ জামশেদপুরের ছেলে । এই ‘আমাদের’ শব্দটির উচ্চারণ জামশেদপুরের সঙ্গে যেভাবে মানিয়ে যায়, ‘আমাদের শান্তিনিকেতনে’র থেকে তার অভিঘাত অনেক সুদূরস্পর্শী । গাঁয়ের লোক হবার এই প্রিভিলেজটি আমরা বুঝি। বুঝেছিলেন বলেই মোহনদাসের আহ্বান, ব্যাক টু ভিলেজ । আমাদের এই লেজটি থাকেই, বেশ মোটাও বলা যায় তাকে । কখনও তো কাউকে বলতে শুনিনা, এইটি ‘আমাদের’ কোলকাতার ছোঁড়া । সুজিতদা আর নেই। আমারও ‘সুবর্ণরেখা’র আড্ডায় আর যাওয়া হয় না। জামশেদপুরের লোকের শরীরে তো গঙ্গা থাকেনা, থাকে শুধু সুবর্ণরেখা । জন্মের পর প্রথম গণ্ডূষ জল থেকে সব খেলা শেষ করে অস্থি বিসর্জন, সবই সুবর্ণরেখার বিগলিত করুণায় । সেদিনও সুবর্ণরেখায় অনেক আড্ডা, বই নেওয়া, যথারীতি কোঁচড়ে দু’চার মুদ্রার বাসভাড়া মাত্র বাঁচিয়ে ।

সম্প্রতি সে হেন ‘সুবর্ণরেখা’য় গিয়ে দেখি আমার জানা শ্রাবণদিনের সেই উদ্বেল নারীর মতো স্রোতস্বিনী, চৈত্রের মরা সোঁতা যেন । ইন্দ্রনাথ নেই। সরকার দোকান খালি করার লুটিস ধরিয়ে দিয়েছেন । বিজলি কেটে দিয়েছেন । ভিতরে দেখি ইন্দ্রনাথের এক পুত্র অর্ধঘুমন্ত অবস্থায় ধুনি জ্বালিয়ে বসে থাকেন। আলো নেই, হাওয়া নেই । বই সংগ্রহের অতি ক্ষীণদশা । সব চেয়ে আফশোস পুরোনো, মূল্যবান বাংলা আকর গ্রন্থের প্রাপ্তিস্থান ‘সুবর্ণরেখা’র সেই গৌরব অস্তমিত । ভিতরের গুদামে অনেক বই হয়তো আছে, কিন্তু আলো নেই, অন্ধকার, ধূলিধূসর। কোথায় পাবো তারে । চাইলেও নিজের বইটি খুঁজে নেওয়া যাবেনা ।

কষ্ট হয়, বেশ কষ্ট ।

মনে পড়ে, একবার ‘সুবর্ণরেখা’য় দেখি একজন প্রবীণ মানুষ। প্রশ্ন করছেন, চন্দ্রনাথ বসু’র কোনও বই আছে ? নিজের বই খুঁজতে খুঁজতে আড়চোখে তাঁকে দেখি । নাতিদীর্ঘ, এই নিদাঘে শীতবস্ত্রে ভারাক্রান্ত নিরীহ গৌড়জন । উল্লেখ্য শুধু ঐ ‘চন্দ্রনাথের বই’ । দোকান মালিকের উত্তর ছিলো নেতিবাচক । তিনি আবার প্রশ্ন করেন, কোথায় পাওয়া যাবে একটু বলতে পারেন? সে প্রশ্নেরও কোনও উত্তর নেই । আমি আমার বইয়ের সওদা নিয়ে বেরিয়ে আসি । তিনিও আসেন । মুখটি বিষণ্ণ। আমি তাঁকে বলি, চন্দ্রনাথের একক বই তো পাবেন না, তবে অন্য লেখকের সঙ্গে সংকলিত ‘দুষ্প্রাপ্য সাহিত্য সংগ্রহ’ নামের একটি গ্রন্থ রিফ্লেক্টের আছে । সেখানে তাঁর একটি লেখা ‘পশুপতিসম্বাদ’ পাওয়া যায়। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তকাগারের সাইটে তাঁর ‘হিন্দুত্ব’ নামের বিতর্কিত লেখাটি পাবেন। আপনি যদি কলকাতায় থাকেন তবে কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে খোঁজ করবেন, পেয়েও যেতে পারেন । তিনি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন । তাঁর প্রবীণা সহধর্মিণীকে বলতে থাকেন, তোমায় বলেছিলাম না, শান্তিনিকেতনে অনেক পণ্ডিতেরা থাকেন, একটা খোঁজ পেয়েই যাবো (‘পণ্ডিত’ ??)। দ্যাখো, পেয়েই গেলাম । আমি কিঞ্চিৎ প্রমাদ গণি, এতো উৎসাহের কারণ কী হতে পারে ? আমি আবার বলি, কিছু মনে করবেন না, আপনি চন্দ্রনাথ বসু সম্বন্ধে এতো আগ্রহী কেন, জানতে পারি কি? তিনি একটু থামেন । তারপর বলেন, ছোটোবেলা থেকে শুনছি তাঁর লেখার কথা, কিন্তু এতো বয়স হলো, কখনও পড়িনি । তা বেশ, কিন্তু এতো লেখক থাকতে তাঁর লেখা খোঁজার ইচ্ছে কেন হলো ? ইয়ে মানে, চন্দ্রনাথ বসু হলেন আমার ঠাকুরদার বাবা । আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, বহুদিন ধরে খুঁজছি, আপনি একটা খোঁজ দিলেন ।

শিকড়ের সন্ধানে একটি চরিত্র….. এভাবেই

৪.

চৈতী

রাস্তাটি গিয়ে থামছে ‘চৈতি’ নামের মণ্ডপটিতে । ছোট্টো কাঁচঢাকা বাংলা ধাঁচের একটি প্রদর্শশালা । নন্দলাল ভেবেছিলেন ছাত্রছাত্রীদের উত্তম শিল্পকাজগুলিকে এখানে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। ডানদিকে ফিরলেই পাঠভবনের প্রশস্ত অঙ্গন । ‘শান্তিনিকেতন’ নামক ধারণাটির প্রয়োগ শুরু হয়েছিলো এই নির্মাণটির মধ্যে দিয়ে ।

একবার বসন্তকালে সকালবেলা সেখানে ঘুরতে ঘুরতে কানে ভেসে এসেছিলো কচিকাঁচাদের গলায় উদাত্ত স্বর সিম্ফনি। “..তোমার বাস কোথা হে পথিক?” স্রোতের অভিমুখে এগিয়ে দেখি পাঠভবনের পাশে বিস্তীর্ণ আমবাগানের খোলা মঞ্চে আসর বসেছে বসন্ত -আবাহনের । গেরুয়া বসনের ছাত্র সম্পুট আর বাসন্তীবেশিনী ছোটো মেয়েগুলি হলুদ পলাশবন হয়ে ঘিরে বসে আছে। অনুষ্ঠানমঞ্চ আর তার সঙ্গে কিছু দর্শকশ্রোতা আর অভিভাবকেরা । তাঁদের সবার হাতেই ক্যামেরা, হয় সচল ছবির, নয় অচল প্রতিবিম্ব । তখন পর্যন্ত সঙ্গিনী এ ধরণের অনুষ্ঠানের কথা শুনেছেন অনেক। কিন্তু দেখেননি কখনও । আমাদের মফস্সল প্রয়াসে গড়ে তোলা অসংখ্য অনুষ্ঠানের প্রযোজনা তিনি দেখেছেন ইতোপূর্বে। কিন্তু নবীনদের এই স্ফূর্ত আত্মপ্রকাশের সাক্ষী কখনও থাকেননি । সেবার তিনি এক প্রথম শ্রোতা। আমি পুরোনো হলেও তাঁর মুগ্ধতার ভাগী হলুম।

সেই অনুষ্ঠান শেষ হবার পর যে দৃশ্যটির জন্ম হলো তা দেখে এই বয়সে বুঝতে পারি, কবি কাকে খেলা ভাঙার খেলা বলেছিলেন । আমাদের লোহার শহরে গড়ে ওঠা বয়সকালে এমন ঋদ্ধ রসের আয়োজন আমাদের নসিব হয়নি। পিছনের খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলো একটি একা রাধাচূড়া । তার গায়ের পত্রসবুজ ঝরে গেছে, শুধু মুকুটের মতো ছেয়ে আছে হলুদবসন্তের লা মার্সাই । সঙ্গিনীকে বললুম, একবার ঐ গাছটির সামনে দাঁড়াও তো । এই অন্য আলোটি একবার ক্যামেরায় ধরতে চাই ।

সিংহসদনের পুরোনো ঘন্টা বেজে উঠলো, একেবারে ঠিকসময় ।

ঘন্টাতলা ও সিংহসদন


সিংহসদন পথের উল্টোদিকেই সাঁচীতোরণের আদলে তৈরি অন্য ঘন্টাতলা । তার দু’দিকে ছায়া-সুনিবিড় ঝুরিবাঁধা বটগাছে সর্বতো শান্তিকল্যাণ ছেয়ে থাকে । সেই লাল বেদীটিতে নিশ্চুপ খানিক বসে সময়ের বয়ে যাওয়া দেখার ইচ্ছে আমার এখনও রয়ে গেছে। কিন্তু ঘন্টাতলা আর নেই। বাঁদিকে যেই তাকাই, টানা চলে গেছে শান্তিনিকেতনের হৃদয়, আম্রকুঞ্জ, বকুলবীথি, শালবীথি । বিস্তৃত প্রান্তরে নিচু নিচু আমগাছের সারি । শ্যামল ছায়ায় ভরে আছে ঝরাপাতার জাজিম পাতা পাঠশালা । ছোটবেলা থেকে বইয়ে পড়া গাছের নিচে পাঠশালার মুক্তাঙ্গন । এখনও বরকরার, স্ফূর্ত। আশ্বাস জাগে । আমরা কখনও গিয়ে বসি গুরুর বেদীতে। কখনও চেলাদের ভূমিলগ্ন আসনে । এখন ছুটি। এজন্মে তো আর এই ইশকুলে বসে অক্ষরপরিচয়ের সাধ মিটলোনা…… গানটা মনে মনে মকশো করি,

‘ভালো করে পড়গা ইশকুলে, নয়তো কষ্ট পাবি শেষকালে…..’

৫.

বসন্তে ভুবনডাঙ্গায় পলাশ না থাকলে আর কীই বা আছে? টুকটুকে লাল, আগুন রঙ বা পীতবাস, খুঁজে না পাওয়া গেলে মনে হয়, যাঃ, কিছুই তো হলনা। কৃষ্ণচূড়ার আগে আসে রাধাচূড়া। সেও অমিল হয়ে গেলে বসন্তে শুধু শুকনো পাতা, ঝরা ফুলের মেলা । আম্রকুঞ্জ ঝরাপাতার নরম কার্পেটে এপার ওপার । সন্ধের পর মালতী আর হাস্নুহানা এদিকওদিক থেকে উঁকি দিয়ে গন্ধ ছড়িয়ে যায় আমার পূর্বাশ্রমের আশ্রমবালিকাদের মতো। হাপিত্যেশ করে পলাশ পাওয়া গেলো সুরুলকুঠির দিকে শ্যামবাটিতে। তাও কটা মাত্র গাছ । আর রাধাচূড়া শুধু একজায়গায় । হ্যাঁ, একা দাঁড়িয়ে ছিলো পাঠভবনের মাঠে তার চোখজুড়োনো কাঁচাহলুদ মুকুট পরে । ক্যামেরার সাবজেক্ট হিসেবে রুক্মিণীর সঙ্গে রাধা বেশ লাগসই । কিন্তু আমার রুক্মিণীদেবীটি একাই রাধা, বৃন্দা, ললিতা, বিশাখা। সব ভূমিকায় একাই। একজন বাঙালিনী। বাড়িতে অনন্ত তাঁর তেজ! সবাই জানেন। আমিও।

রাধাচূড়া

জোয়ান বয়সে শান্তিনিকেতনে গতায়াত ছিলো দুটি কারণে । প্রথমত পারিবারিক ভাবে রবিরসে নিমজ্জিত হলেও জামশেদপুরের মতো একটি ছোটো বহুজাতিক শহরে বাড়ির বাইরের আবহে ‘রবি’র উদয় বিশেষ দেখা যেতো না। পঁচিশে বৈশাখে ঘামতে ঘামতে রবীন্দ্র-উপাসনার বাইরে নিমগ্ন রবীন্দ্রচর্চার পরিসরটুকু ছিলো খুব ছোটো। কয়েকটি পরিবারকেন্দ্রিক মাত্র । শান্তিনিকেতনে গেলে, লোহার গুঁড়ো, স্মেল্টারের আগুন আর ম্যাক্সিপ্রেসের ভয়ানক শব্দদূষণ মাখা রবীন্দ্রবিভবের বাইরে একজন অন্য রবীন্দ্রনাথ প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ টের পাওয়া যেতো। পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রির রোদে আনখ পুড়ে যাবার পর বাইশ ডিগ্রির বাতানুকূল ঘরে শান্তিকল্যাণের মতো স্বস্তিময়, স্বাচ্ছন্দ্য-সরস । অপর কারণটিও ছিলো বেশ আকর্ষণীয় । সেই পাড়ায় তখন ময়নাপাড়ার মেয়েদের সঙ্গে অবিরল দেখা হয়ে যেতো। সহজ, অকৃত্রিম, একটু বর্তুল উচ্চারণে বাংলা। ন্যূনতম প্রসাধিত, ধুলোট পায়ের কন্যা সব । ঈষৎ প্রগলভ হয়তো বা, কিন্তু ন্যাকা বলা যাবে না। মহানগরের সবজান্তা মেয়েদের মতো নয় একেবারে । তাদের সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপের জন্য মাঠেঘাটে ঘাসবিহারী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিলোনা সেকালে। সারা তল্লাটেই একটু বসে গপ্পো করার মতো কোনও সরাইখানা ছিলো নিতান্ত অমিল। সে বালাই এখন একেবারেই নেই । প্রচুর খাবারদাবার ঠেক হয়েছে চারদিকে । তাদের মধ্যে কিছু বোলপুরের মাপে বেশ বিলাসবহুলও বলা যায় । এখন আর খেপ মারতে অসুবিধে নেই। তবে জীবন গিয়েছে চলে আমাদের শত শত বছরের পার। এই সব কবিতা কি মেয়েরা আর পড়ে?

‘…একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে-একবার বেদনার পানে
অনেক কবিতা লিখে চলে গেল যুবকের দল;
পৃথিবীর পথে পথে সুন্দরীরা মূর্খ সসম্মানে
শুনিল আধেক কথা- এই সব বধির নিশ্চল
সোনার পিত্তল মূর্তি; তবু, আহা, ইহাদেরও কানে
অনেক ঐশ্বর্য ঢেলে চলে গেল যুবকের দল:
একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে- একবার বেদনার পানে ।‘
( মহাপৃথিবী: জীবনানন্দ)

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x