শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আমার সুভাষচন্দ্র : কৈশোর ও যৌবনস্মৃতির অনুবর্তন

ষষ্ঠ (অন্তিম) পর্ব

ওটেন সাহেবের বিষয়ে আমার লেখাটি যখন ছাপা হয়েছিল, সে সময়েই আমার নেতাজী বিষয়ক প্রথম ইংরেজি প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত একদা বিখ্যাত মডার্ন রিভিউ পত্রিকাটিতে, শিরোনাম ছিল –‘Netaji and 25 years of Indian Independence (আগস্ট ১৯৭৩)।

যা-ই হোক, পরবর্তী এক দশকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমার প্রকাশিত রচনাগুলির শিরোনাম এখানে উল্লেখ করছি, যতটা মনে পড়ছে। এ থেকে সুভাষচর্চায় আমার আগ্রহের ক্ষেত্র বা বিষয়গুলি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যাবে।
কংগ্রেসী সরকারের নেতাজি-নীতি (সত্যযুগ, ১৯৭৪), খোসলা-রায়ে সরকারী নেতাজি নীতির প্রতিফলন (ঐ, ১৯৭৫), নেতাজীর সংগ্রাম ও তাঁর পূর্বসূরীরা (দৈনিক বসুমতী, ১৯৭৫), নেতাজি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুক্তিসংগ্রাম (দৈনিক বসুমতী, ১৯৭৬), সুভাষ-জীবনের কয়েকটি দিক (সত্যযুগ, ১৯৭৬), সমকালীন বিশ্বের চোখে সুভাষচন্দ্র (ঐ, ১৯৭৭), এশীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেতাজি (ঐ, ১৯৭৮), প্রাক সমরপর্বের নাৎসিবাদ ও সুভাষচন্দ্র (দৈনিক বসুমতী, ১৯৭৮), কলকাতায় সুভাষচন্দ্র : সমকালের দলিল থেকে ১৯১৩-২২, (কলকাতা পুরশ্রী ১৯৭৮), নেতাজির দৃষ্টিতে পরিবর্তিত ভারত (পরিবর্তন, ১-২-১৯৭৯), সুভাষচন্দ্র ও তাঁর পূর্বসূরীরা (সত্যযুগ, ১৯৭৯), সুভাষ-জীবনের উপাদান প্রসঙ্গে (ঐ, ১৯৮০), জাতীয় সংহতির সমস্যা ও সুভাষচন্দ্র (ঐ, ১৯৮১), সুভাষচন্দ্র ও অক্ষশক্তি : যুদ্ধকালের জার্মানিতে (ঐ, ১৯৮২), ভারতীয় গণমানসে সুভাষ-ভাবমূর্তির বিবর্তন (ঐ, ১৯৮৩), সুভাষচন্দ্র ও অক্ষশক্তি : জাপানে (ঐ, ১৯৮৪), জার্মানির নাৎসিবাদ ও সুভাষচন্দ্র (ঐ, ১৯৮৫)।

সে সময় গ্রানাডা নামে এক ব্রিটিশ টেলিভিশন কোম্পানি ‘দা ওয়ার অফ দা স্প্রিংগিং টাইগার’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছিল। সেখানে স্বনামধন্য লেখক নীরদ চৌধুরী ও নেতাজির ব্রিটিশ জীবনীকার হিউ টোয় প্রমুখ কয়েকজনের সুভাষ সম্পর্কিত নানা বিরূপ মন্তব্য সংবাদমাধ্যমে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল ও ভারতে এটির প্রচার নিষিদ্ধ করার দাবীও উঠেছিল। (১৯৮৪) সে সময় আমি একটি ইংরেজি পত্রিকায় প্রকাশিত এই টিভি-ফিল্মটির চিত্রনাট্যের ভিত্তিতে ওই ভাষ্যকারদের বিতর্কিত বক্তব্যগুলি ঐতিহাসিক তথ্যের নিরিখে যাচাই করার চেষ্টা করেছিলাম ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামে একটি ছোট পত্রিকায় প্রকাশিত এক আলোচনায়, যার শিরোনাম ছিল ‘আহত সিংহের চোখে উদ্যত শার্দুল’ (১৯৮৬)।

এরপরেও অবশ্য আমার সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে লেখালেখি মোটামুটি নিরবচ্ছিন্ন ধারায় চলেছে এবং আজও তা অব্যাহত রয়েছে। সংক্ষেপে শুধু একথা বলা যায় যে, পরবর্তী বছরগুলোতে প্রতিক্ষণ, পশ্চিমবঙ্গ, সংবাদ প্রতিদিন, কলকাতা পুরশ্রী, পরিচয়, কলেজ স্ট্রিট ইত্যাদি বহু পত্রপত্রিকায় আমার প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। জামশেদপুরের শ্রমিক ধর্মঘটে সুভাষচন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার সূত্রে টাটা স্টিল আর্কাইভসে গিয়ে সুভাষচন্দ্রের বহু চিঠিপত্র ও অন্যান্য মূল নথিপত্র ব্যবহার করার সুযোগও আমার হয়েছে, যার বিস্তারিত বিবরণ দেবার পরিসর এখানে নেই।

তুলি ও কলমে আঁকা আমার সুভাষচন্দ্র

লেখা ছাড়াও ছবি আঁকার ভূত যেহেতু আমার ঘাড়ে ছেলেবেলা থেকেই সওয়ার হয়েছিল, তাই আমার লেখালেখির মতো আঁকাআঁকিতেও আমার মানসনায়ক স্থান পাবেন না, এমনটা যে সম্ভব ছিল না, তা বলাই বাহুল্য। মনে আছে সম্ভবত স্কুলে থাকতেই চাইনিজ ইংকে এঁকেছিলাম আমার নেতাজির প্রথম প্রতিকৃতিটি। যখন স্কুল ও কলেজের ছাত্র ছিলাম কোথাও নেতাজির ছবি দেখতে পেলে অনেক সময় খেয়ালের বশে খাতার পাতায় সেটি দেখে দেখে স্কেচ করে ফেলতাম। মনে আছে একবার এক সহপাঠীর কোন একটি খাতার মলাটে ছাপা কোমরে তলোয়ার ঝোলানো সুভাষচন্দ্রের এক কাল্পনিক বীরমূর্তির ছবি দেখে স্কুলেরই একটি খাতার পাতায় ডট পেনে সেটি নকল করেছিলাম। পরে রং পেন্সিল দিয়ে রাঙিয়ে এটির সৌন্দর্যবৃদ্ধির প্রয়াসও করেছিলাম। কলেজের ছাত্রাবাসের দেয়াল পত্রিকায় জলরঙে আঁকা একটি অপটু প্রয়াসের নমুনা এর আগেই উপস্থিত করেছি। তার পরবর্তীকালে ড্রইং পেপারের ওপর স্কেচ পেনে আমি একাধিক স্কেচ এঁকেছিলাম, এর মধ্যে একটি স্কেচ সত্যযুগ পত্রিকায় আমার একটি লেখার সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলি সবই ছিল বই বা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সুভাষচন্দ্রের কোনও ছবি দেখে দেখে আঁকা অর্থাৎ প্রতিলিপি বা নকল।


‘চলো দিল্লি পুকার কে’ — জলরঙে আঁকা


আর একটি একরঙা ছবিতে পতাকা হাতে আজাদ হিন্দ সেনানীদের লালকেল্লার দিকে এগিয়ে এগিয়ে যাবার পথনির্দেশ দিচ্ছেন নেতাজি এমন একটি দৃশ্য রূপায়িত হয়েছিল। এটি মৌলিক কোন সৃষ্টি নয় অবশ্যই, নেতাজির একটি বক্তৃতা সংকলনের প্রচ্ছদ থেকে সোজাসুজি নকল মাত্র। আমি তার সঙ্গে যোগ করেছিলাম অদূরে লালকেল্লার আকৃতি আর ছেলেবেলা থেকে কোমরে তলোয়ার ঝোলানো নেতাজির যে কাল্পনিক ছবি পানের দোকানে কিংবা বাসের ড্রাইভারের আসনের পেছনে শ্রদ্ধাভরে টাঙানো দেখেছি, তারই প্রভাবে নীল রঙে আঁকা এই ছবিতেও নেতাজির কোমরে একটি তরবারি দেখানো হয়েছিল। এটুকুই ছিল আমার সংযোজন।

এছাড়াও আরেক ধরনের ছবি আমি এঁকেছি যেগুলোকে নিছক প্রতিকৃতি বলা যায় না এবং কোনো প্রকাশিত বা ছাপা ছবির হুবহু নকলও নয়। এ ধরনের তিনটি ছবির কথা এখানে মনে পড়ছে, তিনটিই ছিল জলরঙে আঁকা। নেতাজি সম্পর্কে আমার মৌলিক সৃষ্টি হিসেবে একটি একরঙা ও দুটি বহুবর্ণ ছবির উল্লেখ করা যায়। আন্দামানের ব্রিটিশ দখলমুক্ত ভূখণ্ডে নেতাজির ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের দৃশ্য আমি কল্পনার ভিত্তিতে রূপায়িত করেছিলাম যেহেতু তখনো ওই ঘটনাটির ঐতিহাসিক ভিডিওটি দেখার আমার সুযোগ হয়নি। অপর ছবিটিও পোস্টারের ধাঁচে জলরঙে আঁকা। বক্তৃতারত সুভাষের পশ্চাদপটে ছিল অগ্নিশিখা আর লেখা ছিল তাঁর বাণী :- “ভুলে যেও না ক্রীতদাস হয়ে বাঁচার চেয়ে লজ্জাকর আর কিছুই নেই।”

আরেকটি একরঙা ছবি এঁকেছিলাম যাতে জীর্ণ বিধ্বস্ত হৃতগৌরব বাংলাদেশের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে তরুণ নায়ক সুভাষ পূর্ব দিগন্তে উদীয়মান সূর্যের দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছেন। ওপরে এক কোণে লেখা রয়েছে তাঁর ‘তরুণের স্বপ্ন’ গ্রন্থটির কয়েকটি ছত্র :- “আমরাই দেশে দেশে মুক্তির ইতিহাস রচনা করিয়া থাকি। ওগো আমার তরুণ জীবনের দল! তোমরা ওঠো, জাগো, ঊষার কিরণ যে দেখা দিয়াছে!”

আমার হাতের কাজ হিসেবে আরো দুটি নেতাজি প্রতিকৃতির কথা মনে পড়ছে যা পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করা হয়েছিল দেয়ালে টাঙাবার জন্য। টাটা স্টিল কোম্পানির কারখানায় একটি মিলের অভ্যন্তরে যে ঘরটিতে আমি বসে সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতাম, তার দেয়ালে টাঙানো ছিল কার্ডবোর্ডের ওপর ছাপানো ছবি সেঁটে তৈরি নেতাজির সেই বহু পরিচিত কাল্পনিক বীরমূর্তির এক কাট আউট। প্রবীণ পাঠকদের স্মরণে থাকতে পারে, আমাদের ছেলেবেলায় বিভিন্ন দেবদেবী ও মনীষীদের এ ধরনের কাটআউট কিনতে পাওয়া যেত গৃহসজ্জা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। নেতাজির এই মূর্তিতে তাঁর সামরিক কোটের বুকে কোনাকুনি ভাবে শোভা পাচ্ছে একটি তেরঙা ব্যান্ড ও একসারি মেডেল এবং কোমরে ঝুলছে একটি তরবারি, যার ওপর নেতাজি বাঁ হাতটি রেখেছেন। আগেই বলেছি, কোন বাস্তব ফটোর ভিত্তিতে নয়, কোনও অজ্ঞাত-অখ্যাত শিল্পীর আঁকা নেতাজির এই সুন্দর কল্পমূর্তিটি সম্ভবত ভারতের অগণিত গ্রামে-শহরে, বাড়িতে বা স্কুলে, অফিসঘরে বা দোকানে ব্যবহৃত সুভাষচন্দ্রের সর্বাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয় প্রতিকৃতি! আমাদের অফিসঘরে আমার সহকর্মীদের মধ্যে কে কবে এটিকে টাঙিয়েছিল আমার জানা নেই, তবে লক্ষ করেছিলাম বছরের পর বছর দেয়ালের কোণে ঝোলানো থাকায় এর ওপর ধুলো-ময়লার আস্তরণ পড়ে এটি বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। যে নেতাজি-অনুরাগীটি এটি এখানে একদা স্থাপন করেছিল, সে হয়তো বদলি হয়ে অন্য কোন অফিসে চলে গেছে, কিন্তু পরবর্তী সহকর্মীরা কেউ এই বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ছবিটি এখান থেকে অপসারিত করেনি। আমার অন্যতম সহকর্মী প্রবীর বসু পরম মমতায় এটিকে মাঝে মাঝে পরিষ্কার করত। সে আমাকে অনুরোধ করে এই রং চটে যাওয়া ছবিটির সংস্কার সাধনের জন্য। আমি তখন ছবিটাকে বাড়িতে নিয়ে আসি ও বুঝতে পারি যে এটি আর সংস্কারযোগ্য অবস্থায় নেই। তখন নতুন একটি কাগজে আমি একই ভঙ্গিতে ছবিটি এঁকে, যথাযথ রং করে ও একই মাপে পুরানো কার্ডবোর্ডের ওপর সেটিকে সেঁটে দিয়ে আবার আমাদের অফিসে নিয়ে গিয়ে যথাস্থানে স্থাপিত করেছিলাম।

সবশেষে আমার বাড়ির দেয়ালে কাঁচে ঢাকা ফ্রেমে বাঁধানো একটি সুভাষ-প্রতিকৃতির কথা বলি। এটি নিয়েও আমি এক ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছিলাম। বাড়িতে একটি রঙিন ক্যালেন্ডার এসেছিল, যাতে এক হাতে একটি বই ধরে থাকা অবস্থায় সুভাষচন্দ্রের একটি
মাল্যভূষিত ছবি ছিল। কিন্তু ছবির ভঙ্গিমাটি আমার পছন্দ হয়নি বলে আমি ক্যালেন্ডারের ছবিটির মানানসই আকারে এক ড্রইংশীটের ওপরে সুভাষচন্দ্রের একটি প্রতিকৃতি এঁকেছিলাম জলরঙে আর ক্যালেন্ডারের ছবিটি থেকে সুভাষচন্দ্রের মুখাবয়বের অংশটুকু কেটে নিয়ে আমার আঁকা ছবির ওপর যথাস্থানে বসিয়ে দিয়েছিলাম। আমার তৈরি ছবিটিতে গলার পরিবর্তে মালাটি স্থান পেয়েছিল সুভাচন্দ্রের হাতে। পটভূমিতে এঁকেছিলাম একটি কাল্পনিক জনসভার দৃশ্য, যেখানে সুভাষের পেছনে দেখা যাচ্ছে অগণিত শ্রোতাদের একাংশকে আর ওপরে ঝুলছে দড়িতে বাঁধা ছোট ছোট তেরঙা পতাকার মালা। কোলাজধর্মী এই ছবিটিও এখন পর্যন্ত আমার ভদ্রাসনে শোবার ঘরের দেয়ালটিকে অলংকৃত করছে।

নেতাজি স্মারক সামগ্রী সংগ্রহ
সুভাষচন্দ্র যে-সময়টাতে ভারতের রাজনীতিক্ষেত্রে বিচরণ করছেন, তখন সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর নানা ছবি, বাণী ও সংবাদ ইত্যাদির কিছু কিছু আমার বাবা সংগ্রহ করে রেখেছিলেন, যা আমি ছেলেবেলাতেই দেখেছিলাম বলে প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছি। বাবার সংগৃহীত একটি ঐতিহাসিক সামগ্রীর অবশ্য উল্লেখ করা হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেতাজি যখন জাপানের সাহায্য নিয়ে সসৈন্যে ভারত অভিযান করছেন, তখন তাঁকে জাপানি আক্রমণকারীদের সহযোগী বলে ভারতের একটি মহল থেকে ক্রমাগত প্রচার করা হচ্ছিল। এরকম একটি প্রচারপত্র আমার বাবার সংগ্রহে দেখতে পেয়েছিলাম। পাটনার একটি প্রেস থেকে ছাপা এই প্রচারপত্রটির শিরোনাম ছিল ‘Follow your National Leaders’! এতে ভারত আক্রমণে জাপানের দুরভিসন্ধি ও সুভাষচন্দ্রের তাদের পক্ষাবলম্বনের সমালোচনা করা হয়েছিল এবং গান্ধী, নেহরু, জিন্না ও মৌলানা আজাদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছিল। গান্ধীর বক্তব্য হিসেবে যা উদ্ধৃত হয়েছিল, তার কিছুটা দেখা যেতে পারে :- “আমাদের সম্পর্কে অক্ষশক্তির বন্ধুত্বপূর্ণ ভাব দেখানোকে আমি কখনোই লেশমাত্র গুরুত্ব দিইনি। তারা যদি কখনো ভারতে আসে, তাহলে মুক্তিদাতা হিসেবে আসবে না, ধ্বংসের অংশীদার হিসেবেই আসবে। কাজেই সুভাষ বসুর নীতিকে আমার অনুমোদন করার কোন প্রশ্নই ওঠে না।”

জওহরলাল নেহরুর উদ্ধৃত বক্তব্যেও ছিল একই সুর, যার শুরুতেই বলা হয়েছিল, “বহু বছর আগেই আমরা সুভাষ বসুর সঙ্গত্যাগ করেছি। তারপর আমরা আরো দূরে সরে গেছি এবং বর্তমানে আমরা পরস্পরের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছি” ইত্যাদি। কাগজের দু’ পিঠে হিন্দি ও ইংরেজিতে ছাপা এই প্রচারপত্রটিতে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ ঐক্যের পক্ষে প্রচার করা হয়েছিল। পরিষ্কার উল্লেখ না থাকলেও মনে হয় এটি ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারপত্র।

এই জাতীয় অতীত স্মৃতি-বিজড়িত সামগ্রী নাড়াচাড়া করতে গেলে মনে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অনুভূতির সৃষ্টি হত। মনে হত, সুভাষচন্দ্র যে-যুগে সশরীরে বর্তমান ছিলেন, এইসব কাগজপত্রে যেন সে যুগের স্পর্শ লেগে আছে! বাড়ির কোন পুরানো বইয়ের খবরকাগজের হলদে হয়ে যাওয়া পাতায় মোড়া মলাটে কিংবা পরিবারের তিন পুরুষের ব্যবহৃত কোন তোরঙ্গের ভেতরে বেছানো জীর্ণ ও বিবর্ণ খবরকাগজের মধ্যে হঠাৎ যখন দেখতে পেতাম সুভাষচন্দ্র সংক্রান্ত কোনো সংবাদ বা তাঁর ছবি, সেগুলো স্পর্শ করে যেন ফিরে যেতাম তাঁর যুগে! এলগিন রোডের নেতাজি ভবনে সুভাষচন্দ্রের শয়নকক্ষে ঢুকে বা তাঁর শয্যাকে স্পর্শ করে একদা যেমন রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম, এরকমই অনুভূতি হয়েছিল নেতাজি জন্মশতবর্ষের সময় জামশেদপুরের টাটা আর্কাইভসে একটি ফাইলের মধ্যে টিসকো কর্তৃপক্ষকে লেখা সুভাষচন্দ্রের একটি চিঠির মূল কপি দেখতে পেয়ে, যা তিনি ইউরোপ সফরের সময় এয়ারমেল পেপারে টাইপ করে ও স্থানে স্থানে নিজের হাতে কলম দিয়ে সংশোধন করে পাঠিয়েছিলেন। চিঠিটি আমি নিজের হাতে ফাইল থেকে বের করে জেরক্স মেশিনের কাছে নিয়ে গিয়ে প্রতিলিপি করিয়েছিলাম।

এরপর আমার নিজের সংগৃহীত কিছু সামগ্রীর উল্লেখ করা যায়, যার মধ্যে নেতাজির সম্মানে প্রকাশিত ভারতের কয়েকটি ডাকটিকিটের কথা প্রথমে বলতে হবে। ১৯৬৪ সালে নেতাজির জন্মদিন উপলক্ষে একসঙ্গে দু’টি ডাকটিকিট ভারত সরকার প্রকাশ করেছিল, যা ছিল নানাদিক থেকে নজিরবিহীন। তখন পর্যন্ত সুভাষচন্দ্রের সমপ্রজন্মের কোনও ভারতীয় নেতার সম্মানে ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়নি। এই দুটি ডাকটিকিটের সঙ্গে প্রকাশিত বিশেষ সিলমোহর সহ খাম (ফার্স্ট ডে কভার) ও ডাকটিকিটের বিবরণ সম্বলিত সচিত্র পুস্তিকা (যা ফোল্ডার নামে পরিচিত) কিনে আমাকে পাঠিয়েছিলেন দিল্লিবাসী আমার পিসতুতো দাদা সুবীর ঘোষ।

এর চার বছর পরে আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠার রজত জয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল আরেকটি ডাকটিকিট। কভার সহ সেই ডাকটিকিটটি আমি সংগ্রহ করেছিলাম কলকাতায় একটি দোকান থেকে। কিশোর বয়সে কালীঘাট অঞ্চলে উজ্জ্বলা সিনেমার উল্টোদিকের ফুটপাথে একটি ছোট দোকানে বসে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক দেশ-বিদেশের পুরানো ডাকটিকিট বিক্রি করতেন। সেখানে আমি প্রায়ই ডাকটিকিট কিনতাম। সেখানেই একদিন দেখতে পাই, আজাদ হিন্দ সরকারের রজত জয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত ফার্স্ট ডে কভারের ওপর ওই সরকারের ঘোষণাপত্র পাঠরত নেতাজির ছবি সম্বলিত ভারত সরকারের ডাকটিকিটটির পাশে সাঁটা রয়েছে জার্মানিতে ছাপা আজাদ হিন্দ সরকারের নিজস্ব একটি ডাকটিকিট! সেই কিশোর বয়সেও এটির ঐতিহাসিক মূল্য বুঝতে আমার দেরি হয়নি, আমি অবিলম্বে সেটি কিনে নিয়েছিলাম।

সুভাষগীতি – শ্রবণ থেকে সৃজনে

সুভাষচন্দ্রের প্রশস্তি করে সম্পূর্ণ একটি গান আজাদ হিন্দ ফৌজের
কোন এক অজ্ঞাত কবি নেতাজির বর্তমানেই রচনা করেছিলেন। আমরা কে না শুনেছি পূর্ব এশিয়ায় তাঁর আগমনকে উপজীব্য করে লেখা সেই বিখ্যাত গান :-”সুভাষজী! সুভাষজী! উও জান-এ-হিন্দ আ গয়ে/ হ্যায় নাজ জিস পে হিন্দ কা, উও শান-এ-হিন্দ আ গয়ে!” আমার স্মৃতিতে সেটিই প্রথম সুভাষ-গীতি। আমার শোনা এর পরের সুভাষগীতিটিও ছিল হিন্দি গীতিকবি প্রদীপ রচিত। ষাটের দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস’ নামক ছায়াছবিটিতে সলিল চৌধুরীর সুরে গানটি গেয়েছিলেন মান্না দে :- “সুনো রে সুনো দেশ কে হিন্দু-মুসলমান/ সুনো বহন ভাই সুনো, সুনো নওজোয়ান!/ ইয়ে সুভাষ কী কথা,/ ইসমে হ্যায় বড়ী ব্যথা,/ ইসমে কহীঁ আগ হ্যায়, কহীঁ হ্যায় তুফান!” মনে আছে এই গানটি তখন খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।

নেতাজি সুভাষচন্দ্রের কীর্তিকে উপজীব্য করে বাংলায় যাঁরা নানাসময়ে গান রচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য তাঁর কলেজ জীবনের সহপাঠী দিলীপকুমার রায়। যদিও আমাদের ছেলেবেলায় বা তরুণ বয়সে এই গানগুলো শোনার সুযোগ হয়নি, তবে এরকম একটি গানের বাণীগুলি পড়ার সুযোগ হয়েছিল নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো প্রকাশিত বীরবন্দনা নামে কাব্য সংকলনটিতে। (১৯৬৩ সালে কলকাতায় নেতাজি ভবনে নেতাজির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তিনি গেয়েছিলেন তাঁর বন্ধুকে স্মরণ করে স্বরচিত এই গান।) এর কিছু অংশ ছিল এরকম :- “জানি না বন্ধু তোমায় কী নামে করব বরণ!/আমরা কীর্তি তোমার শুধু আজ করি স্মরণ!/বেজে যেই ওঠে তোমার আহ্বান গহন মনে,/ অমনি শঙ্কা মিলায় অভয়ের শঙ্খ-স্বনে।।/ উদাসী অসীম উধাও! অচিনের অভিসারে/ জপিলে চিরজীবন নবারুণ অন্ধকারে।/ ধাবমান পায়ে ঠেলে অকুলের আরাধনে/ উদ্দাম দুঃসাহসে জপিলে চিরন্তনে।।…”

ছেলেবেলায় দিলীপ রায়ের এই গানগুলো শোনার সুযোগ না পেলেও আমরা সেসময় বাংলায় রচিত আরো যে সব সুভাষগীতি শুনতাম তার কয়েকটির উল্লেখ প্রথম পর্বে করেছি। আকাশবাণী কলকাতার নেতাজি জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে প্রতিবছর শুনতাম একটি চমৎকার গান, যার সুর ও
বাণী এখনো আমার স্মৃতিতে জাগরূক রয়েছে ;- “সকল ধ্বনির ঊর্ধ্বে বাজে তূর্য তব, সে যে তোমারি জয়গান,/ জয় জয়তু, জয় জয়তু, জয়তু হে বীর মহান!/ কণ্ঠে কন্ঠে লয়ে দুর্জয় ছন্দ/ লক্ষ লক্ষ কোটি প্রাণের আনন্দ,/ তোমারই পথে তব মন্ত্র লয়ে মোরা নির্ভয়ে হব আগুয়ান।” ইত্যাদি। সুভাষপ্রশস্তিমূলক আরেকটি গান ছেলেবেলায় শুনতাম আমার কাকুর (বলরাম গুহ) মুখে, তার কয়েকটি ছত্র ছিল এরকম :- “নেতাজি, নেতাজি! লহ নমস্কার!/ মুক্তিপথের যাত্রীদলের হে বিজয়ী সর্দার!/ অমৃত-উৎসে জন্ম যাহার, সে যে মৃত্যুঞ্জয়-/ বিশ্বজনের কন্ঠ ভরিয়া ওঠে আজি তারই জয়।/ জয় নেতাজির, জয় নেতাজির, জয় নেতাজির জয়!/ মর নাই ওহে পরমাত্মীয়/ আত্মার তুমি চির বরণীয়,/ আমাদের মাঝে দেখা দিবে পুনঃ, বার্তা পেয়েছি তার।”

নেতাজির কীর্তিকে বিষয়বস্তু করে রচিত এসব গান আমার ছেলেবেলায় শুধু শ্রবণের বিষয় ছিল, কিন্তু ঘটনাচক্রে কীভাবে সুভাষ-গীতি সৃজনের ঝোঁক আমার ওপর ভর করেছিল সেই কাহিনী এবার বলি । আগে উল্লেখ করেছি যে ছেলেবেলায় মণি বাগচীর লেখা ‘দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র’ বইটি আমার এক আত্মীয়া আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। তার প্রথম পাতাটিতে আমার বাবা (নিরঞ্জন বসুচৌধুরী) লিখে দিয়েছিলেন কয়েক ছত্রের এক চিত্তাকর্ষক সুভাষ-প্রশস্তি : – “উচ্ছ্বল যৌবন উন্নত শির/ ‘সিংহের’ সন্ত্রাস বিশ্বের বীর;/ বুদ্ধির দীপ্তিতে দৃপ্ত চেতন/ বিদ্যার সৌরভে ভাস্বর মন;/ সন্ন্যাসে সংযত চিত্ত বিশাল/ উদ্ধত শত্রুর উদ্যত কাল;/ ভৈরব গৌরবে রুদ্র ভয়াল/ সম্মুখ সংগ্রামে উগ্র করাল;/ আত্মার আত্মীয় হিন্দের জান্/ কোন্খানে আছ আজ নন্দিত প্রাণ!”

সেটি ছিল ১৯৬৭ সালের কথা। এই কয়েক ছত্রের সুভাষ-প্রশস্তিটিকে আর একটু সম্প্রসারিত করে পুরোদস্তুর একটি কবিতায় রূপ দেওয়া যায় কিনা, এমন একটি ইচ্ছে পরে আমার মনে জাগলেও সঠিক ছন্দ মিলিয়ে সেটি করে ফেলা তখনই সম্ভব হয়নি। কিন্তু সেটি “ইচ্ছে হয়ে ….মনের মাঝারে” রয়েই গিয়েছিল। তখন বাবার লেখা স্তবকটির আদলে আরো কয়েকটি স্তবক রচনার চেষ্টা করেছিলাম আমার কবিতার খাতায়, যা অনেকদিন কোন সুনির্দিষ্ট রূপ লাভ করেনি। শেষ পর্যন্ত বাবার কবিতাটি রচনার প্রায় পাঁচ দশক পরে (২০২১) রচনা করা গেল ওই একই ছন্দে পুরো তিন স্তবকের একটি কবিতা। বাবার রচিত অংশের দু একটি ছত্র একটু এদিক-ওদিক করে সেটিকে প্রথম স্তবক হিসেবে ব্যবহার করে আমি যোগ করেছিলাম আরো দুটি মানানসই স্তবক :- “সংসার সম্পদ ছাড়ল হেলায়,/ নির্ভয়ে যোগ দিল মৃত্যু-খেলায় –/ দুর্গম পর্বত ক্ষুব্ধ সাগর/অক্লেশে পার হল বীর সে অজর!/ শত্রুর শত্রুকে মিত্র করে/ ঝাঁপ দিল যুদ্ধে সে স্পর্ধাভরে!/ বজ্রের নির্ঘোষ কন্ঠে যে তার,/ সুপ্তির সংহারে তীক্ষ্ণ কুঠার!/ ‘জয় হিন্দ’ মন্ত্রে সে তুলল নিশান–/ দেশ জুড়ে মন্দ্রিত তার জয়গান!…” ইত্যাদি।

এভাবেই একটি কবিতার জন্মান্তর হল প্রায় পঞ্চান্ন বছর পর — দশ ছত্রের কবিতা রূপ নিল ত্রিশ ছত্রের এক গানের! নেতাজির ১২৫ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বন্ধু অরিন্দম গুপ্তের সহযোগিতায় উপযুক্ত সুরকার ও গীতিকারদের সাহায্য নিয়ে গানটি ইউটিউবে প্রকাশ করতে পেরেছিলাম। আমার রচিত সেই প্রথম সুভাষ-গীতির লিংকটি রবিচক্রের দরবারে পেশ করছি।


এই সূত্রে আরও পরবর্তীকালে লেখা আমার আরেকটি সুভাষ-গীতির প্রসঙ্গও উত্থাপন না করে পারছি না। এই গানটি আমি লিখেছিলাম অতীতের কীর্তিমান গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দে‘র গাওয়া সুপরিচিত দেশাত্মবোধক গান ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’ গানটির ছন্দ অবলম্বন করে। এর প্রথম স্তবকটি ছিল :-
“মুক্তির সংগ্রামে অকুতোভয়ে/ তুমি ঝাঁপ দিলে বীর হে মহান–/ লেখা আছে স্বর্ণাখরে!/ কত বিদ্রোহী মানুষের চিত্ত-আকাশ/ সূর্যের মতো তুমি রাঙালে সুভাষ!/ তুমি যে ফের নি আর এই স্বাধীন দেশে,/ তবু জননী প্রতীক্ষায় দুয়ার ধরে!” ইত্যাদি। আমার বোনের (ভাস্বতী মিত্র) কন্ঠে এই গানটিও ইউটিউবে তোলা হয়েছিল। সেই লিংকটিও এখানে পাঠকদের জন্য দেওয়া হল।


“পান করে শুধু হলাহল..”
আমার সুভাষ-অনুসরণ ও অধ্যয়নের মোটামুটি প্রথম দুই দশকের কাহিনীর ঝাঁপি এখানেই বন্ধ করছি। এর পরেও অকথিত থেকে গেল পরবর্তী আরো চার দশকের নানা কাহিনী। আমার সুভাষ-অনুধ্যান ও অনুসরণের এই যৎসামান্য প্রয়াস বস্তুত একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া, কারণ কোনোদিনই তাঁকে “এই জানা আমার ফুরোবে না”! তবুও সুভাষচর্চার এই ছ’টি দশক পেরিয়ে এসে আমার একটি বিষণ্ন উপলব্ধির কথা সবশেষে না জানালে আমার কর্তব্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সাধারণভাবে ভারত ও বিশেষভাবে বাংলার তরুণ প্রজন্ম নেতাজির অনুরাগী বলেই পরিচিত। এই সূত্রে পশ্চিমবাংলার বুদ্ধিবৃত্তের বর্তমান হাল-হকিকত দেখে সুভাষ-চর্চার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুব একটা আশার সঞ্চার হয় না, একথা দুঃখের সঙ্গেই স্বীকার করতে হবে। তথাকথিত নেতাজি-অনুরাগীদের গরিষ্ঠ অংশের আগ্রহ ও অনুশীলন নেতাজির জীবনবাদ ও কর্মকৃতির অধ্যয়নের চেয়ে বেশি করে তাঁর মৃত্যুর বা বেঁচে থাকার নানা কাহিনীর অথবা তাঁর বিবাহ ও সন্তান সম্পর্কিত নানারকম তত্ত্বের আলোচনাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে দেখতে পাই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নানা রকম অপ্রতিষ্ঠিত ও উত্তেজক কল্পকাহিনীকে ‘সুভাষ-সত্য’ বলে হাজির করা হচ্ছে। পশ্চিমবাংলার ও অন্য রাজ্যের বেশ কয়েকজন লেখক এইসব পণ্যের পরিবেষক এবং বাঙালি তরুণ সমাজের একটা বড় অংশ যে এইসব মাদকের গ্রাহক, তা এইসব লেখকদের জনপ্রিয়তা থেকে বুঝতে পারা যায়! নীতিহীন কিছু প্রকাশক ও খবর কাগজের কলমচির মদত নিয়ে ‘গবেষক’ তকমাধারী কত লেখক আজ চিত্তাকর্ষক গালগল্পের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন, মেধাহীন মননহীন জনতা সেগুলো গলাধ:করণ করছে! অবশ্য আমি ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন তরুণতরুণীকে জানি, যারা এই প্রবণতার শিকার নয় এবং নেতাজি সম্পর্কে প্রকৃত অধ্যয়নে আগ্রহী। তবে এদের আমার নেহাৎ সংখ্যালঘু বলেই মনে হয়। আমার বলতে দ্বিধা নেই, তরুণপ্রজন্ম সম্পর্কে আমার এই ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হলে আমি নিজেই সবচেয়ে খুশি হব। কলকাতার বিগত বইমেলায় একটি বইয়ের স্টলে এ ধরনের একটি মাদকপণ্য নিয়ে নির্বোধ উন্মত্ততার যে ন্যক্কারজনক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল, তা দেখে আমার মনে হয়েছিল, ‘তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না, করে শুধু মিছে কোলাহল,/ সুধাসাগরের তীরেতে বসিয়া পান করে শুধু হলাহল!’ জানি না, হলাহলপানের এই মারণ নেশা থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেকে আজ কে রক্ষা করবে! যার জীবন ও কর্মপ্রেরণাকে স্মরণ করে বাঙালি কবি একদিন লিখেছিলেন “…যে প্রেরণা যুগে যুগে উত্তরিবে সুদুর্গম পথ,/ বীর্যবলে পার হবে অরণ্যানী সমুদ্র-পর্বত–/ তুমি সে প্রেরণা…” আজ জীবনসন্ধ্যায় এই নিরালোক পরিবেশে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াই সেই অবিনাশী প্রেরণাকে, সেই কবির মতোই আমারও মনে হয় :- “যে বাণীর তূর্যনাদে ধিক্কৃত হইবে পাপী, সমনস্ক হবে অন্যমনা/ তুমিই সে বাণী/ তারই মাঝে, হে অমর, আছো তুমি, আছো তুমি আছো তুমি জানি।”

[লেখকের পূর্ববর্তী রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x