শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

ফুলকো লুচির উপাখ্যান

মনে আছে সেই দৃশ্যটা? একটা অ্যাম্বাসেডার গাড়িতে চেপে ফেলুদা, মুকুল, ডঃ হাজরা (নকল) রাজস্থানের রাস্তা দিয়ে চলেছেন সোনার কেল্লার সন্ধানে । কিন্তু ফেলুদার নজরে এলো পাশে জাতিস্মর মুকুল বসে আছে এবং যে কোনো সময় সোনার কেল্লা দেখা যেতে পারে, এই রকম একটা সময়ে ডঃ হাজরা গাড়িতে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়ছে। ডঃ হাজরার এই নিরুত্তাপ ভাব দেখে ফেলুদা বুঝে ফেলেছিলেন এই ডঃ হাজরা একজন আসল প্যারা-সাইকোলজিস্ট হতে পারে না।

ঠিক তেমনি যদি কোথাও দেখেন সকালবেলার জলখাবারে কোনো একজন বাঙালির সামনে একটি প্লেটে ধবধবে সাদা ফুলকো লুচির সঙ্গে সাদা আলুর তরকারি সাজিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তার মুখটি একটুও উজ্বলতর হয়ে উঠল না, তার চোখের তারাদুটির ভোল্টেজ একটুও বেড়ে উঠলো না, তাহলে বুঝবেন সেই লোকটি ‘হাইলি সাসপিসিয়াস’। ফেলুদার লজিক মেনে উনি আসল বাঙালি কিনা সেটা নিয়ে আপনি সন্দেহ প্রকাশ করতেই পারেন।

আসলে quintessential বাঙালির রসনাকে যে সব খাদ্যবস্তু অবধারিত ভাবে উদ্দীপ্ত করে তুলতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফুলকো লুচি ।
শুধু তাই নয়, একটু খুঁজলে দেখা যাবে আমাদের সংস্কৃতির আনাচে কানাচে কিন্তু কীর্তন, ভাটিয়ালি, ধান, মাছ, আলপনা, ব্রতকথা ইত্যাদির মতো লুচিরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে ।


আমরা কিছুদিন আগে দেখলাম একটি রাজনৈতিক দল আর একটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলকে এই বলে আক্রমণ করলো ওটা অবাঙালিদের দল, ওদের ক্ষমতায় আনলে ওরা বাঙালির মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেবে। সেই অভিযোগটিকে ভুল প্রমাণ করার জন্য ওই তথাকথিত অবাঙালিদের দলটিকে দেখা গেল মাছকেই তারা প্রচারের কাজে লাগালো। বাঙালি হয়তো তাতে কিছুটা আশ্বস্তও হলো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মাছ কি বাঙালির প্রকৃত অভিজ্ঞান ? দেশে বিদেশে অনেক জাতই আছে যারা বাঙালির চেয়ে অনেক বেশি মাছ খায় । বরং সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে বাঙালির মতো এমন লুচিশীল জাত খুঁজে পাওয়া যাবে না কোথাও । বরং লুচিকেই বাঙালির প্রকৃত অভিজ্ঞান বলা যেতে পারে।

আজকাল অবশ্য বাঙালিরও অন্য সবার মতোই ‘উঠল বাই তো অনলাইনে কিছু আনাই’ জাতীয় বদভ্যাস হয়ে গেছে। সে বেগুন পোড়া, আলুপোস্তোও অনলাইনে আনিয়ে খাচ্ছে। তবে অনলাইনে লুচি আনানো ব্যপারটা এখন অবধি ঠিক জমে না। ফুলকো অবস্থায় লুচি তো ঠিক প্যাক করা যায় না বলে বোধহয়। আর লুচি যদি ফুলকো না হয়, তাহলে তা ব্যাপারটা অনেকটা মুখে পাইপ ছাড়া কমল মিত্রকে দেখার মতো হয়ে যায়।

তাই এখনও গরম গরম লুচি ভেজে খাওয়া গার্হস্থ্য বাঙালির যাবতীয় খুশি উদযাপনের এক চটজলদি উপায়। ছেলে বা মেয়ে ভালো রেজাল্ট করেছে, বাড়ির কর্তার অনেক দিন ধরে ঝুলে থাকা প্রমোশনটি পাওয়া গেছে, বাড়ির গিন্নির অনেক দিন আগে হারিয়ে যাওয়া একটা সোনার দুল খুঁজে পাওয়া গেছে, এই রকম পরিস্থিতিতে অন্য কোনো বড় সড় সেলিব্রেশন হোক না হোক, বাড়িতে রুটি ক্যানসেল করে লুচি তো হতেই পারে।

মোটামুটি সত্তরের দশক অবধি, যখন বাঙালির ভোকাবুলারিতে ডেকোরেটর, কেটারার’, বিউটি পারলার, ইভেন্ট ম্যানেজার জাতীয় শব্দগুলির অনুপ্রবেশ ঘটেনি, তখন কোনো বিয়ে বাড়িতে ঢুকলেই কেমন যেন একটা বেলি ফুল আর ফুলকো লুচির ফিউশন গন্ধ মম করতো চারিদিকে। বিয়েবাড়ির নিমন্ত্রিতরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন খাওয়ার জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাবার সুযোগ পেত এবং অবশেষে দেখতে পেত, নড়বড়ে কাঠের টেবিলে পাতা কলাপাতার উপর হাতে গরম লুচি, বোঁটা শুদ্ধ লম্বা করে কাটা বেগুন ভাজা, এবং তার পিছু পিছু নারকেল কুচি দেওয়া ঘন ছোলার ডাল এসে উপস্থিত হয়েছে, তখন সেই দৃশ্যটি অনেকটা সেই হাল ভাঙা, দিশা হারানো নাবিকের দারুচিনি দ্বীপের ভিতর সবুজ ঘাসের দেশ দেখার সঙ্গে তুলনীয় হয়ে উঠত।

আমাদের প্রিয় নায়ক উত্তম কুমার যেমন যে কোনো নায়িকার সঙ্গে অতি উত্তমই হয়েই থাকতেন , তেমনি লুচির সঙ্গে অন্য যা কিছুই পরিবেশিত হোক লুচি তো নিজের মহিমাতেই বিরাজ করে।

এমনিতে বাঙালিদের মধ্যে লুচি অনেক কিছু দিয়েই খাওয়ার চল আছে । সাদা আলুর তরকারি, বেগুন ভাজা, ছোলার ডালের কথা আগেই বলা হয়েছে। এ ছাড়াও আরো বিকল্প আছে – মাখা মাখা আলুর দম , কুমড়োর ছক্কা,ঝাল ঝাল খাসির মাংস, সাদামাটা আলু ভাজা, পায়েস, বোঁদে ইত্যাদি। তবু যদি প্রশ্ন তোলা হয় লুচির সঙ্গে আদর্শ কম্বিনেশনটা কি, এর উত্তর দিতে গিয়ে বাঙালি যে তার জাতীয় স্বভাবকে মান্যতা দিয়ে কিছুতেই একমত হবে না, এটা ধরেই নেওয়া নেওয়া যেতে পারে। সেনবাবু যা বলবেন বোসবাবু তার উল্টো কিছু বলবেন, এবং মুখুজ্যেবাবু যে সেনবাবু এবং বোস বাবু দুজনেরই মতকেই উড়িয়ে দিয়ে কিছু একটা আঁতেলমার্কা মন্তব্য করবেন এটাই তো বাঙালির পক্ষে স্বাভাবিক । এখানে তো আবার আপরুচি খানার ব্যাপার। অতএব একমত হবার প্রশ্নই ওঠে না।
সাহিত্যিকরাও এ ব্যাপারে একমত হতে পারেন নি ।
এই যেমন সুকুমার রায় বলেছেন – ‘রোদে জলে টিকে রঙ, পাকা কই তাহারে / ফলারটি পাকা হয়, লুচি দই আহারে।’
অর্থাৎ লুচির সঙ্গে দইও একটা অপশন ।
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় শীতকালের প্রত্যেক শনিবারে তাঁর বাড়িতে বন্ধুবান্ধবদের নেমন্তন্ন করতেন । নিমন্ত্রণ পত্রে লেখা থাকত –
‘ফুলকো লুচি ভাজা কপি / মাংস থাবা থাবা / খাবে যদি, পদ্মপুকুর / দৌড়ে এস বাবা।’
এই দেখুন লুচির সঙ্গে ভাজা কপির কথা আমরা একেবারেই ভেবেই দেখিনি ।

স্বামী বিবেকানন্দের কনিষ্ঠ ভ্রাতা মহেন্দ্র নাথ দত্তর ‘কলকাতার পুরাতন কাহিনি ও প্রথা’ বইতে সেকালের নিমন্ত্রণ বাড়িতে লুচি খাওয়া নিয়ে লিখেছেন – ‘আমরা যখন পাঁচ-ছ বৎসরের তখন এইরূপ প্রচলিত ছিল, যথা – বড় লুচি, বিলাতি কুমড়া, পটল, মটর ভিজা দিয়া ছক্কা হইত। তাহাতে নুন দেওয়া হইত না। নুন যার যার পাতে দেওয়া হইত। নুন দেওয়া হইলে উৎসৃষ্ট বলিত। লুচি আর ছক্কা এই ছিল তখন প্রধান আহার।’

কৃষ্ণা দত্তের লেখাএকটি অসাধারণ বই ‘থোড় বড়ি খাড়া’ -তে সেকালের একান্নবর্তী পরিবারের জলখাবার পর্ব নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি লিখেছেন –
‘সবচেয়ে সহজ অথচ সেরা আদরের জিনিস ছিল লুচি। ওটি ছাড়া সকালের জলখাবার, দুপুরের ভাত কি রাতের খাবার, কোনোটাই সম্পূর্ণ হত না। লুচি দিয়ে ভাজাভুজি তরকারি, মাছমাংস, চাটনি, দই, দুধ, রাবড়ি সবই খাওয়া হত। বিয়েবাড়িতে কাঁচা হলুদ রঙের পাতলা ক্ষীরের সঙ্গে তো বটেই, রোজকার পাতেও আধ-ঘন দুধে এমনকী সরু চালের দুধমাখা ভাতও লুচি দিয়ে খেতে আমরা দেখেচি । ‘

আসলে উত্তর কলকাতার লোকেদের লুচির (তাদের ভাষায় নুচি) প্রতি একটু বেশিই আসক্তি ছিল ।
শোনা যায় উত্তর কলকাতায় ‘জামাইভোগ’ নামের এক ধরণের লুচির প্রচলন ছিল । সেগুলি আকারে একটু ছোট হত। ছোটো এই জন্য যে, জামাই শাশুড়ির সামনে বসে কষ্ট করে লুচি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে এই ব্যাপারটাতে জামাইয়ের প্রতি খাতিরদারি একটু কম হচ্ছে বলে মনে হতে পারে । তাই লুচির আকার এমন হবে যে জামাই যেন সেই লুচি ছোলার ডাল বা বেগুন ভাজা দিয়ে একসঙ্গে গোটাটাই মুখে পুরে দিতে পারে । সেই সঙ্গে এই লুচির ময়ান এমন মাপের হতে হবে যে লুচির গায়ে যেন একটুও ঘি না লেগে থাকে । তবেই হত এটি পুরোপুরি ‘জামাইভোগ’ লুচি ।

দেখা যাচ্ছে আমাদের সংসারের লুচি প্রকৃত অর্থে উদার স্বভাবের – ধর্ম, জাত পাত , আমিষ নিরামিষ, উচ্চ নিচ , কুলিন অকুলিন এই সব নিয়ে মাথা ঘামায় না।
বরং বলা যেতে পারে শুধু মুখে নয়, লুচিই ‘সব কা সাথ সাথ সবকা বিকাশ’ কার্য ক্ষেত্রে করে দেখাতে পারে ।
তবে ব্যাক্তি বিশেষের পছন্দ তো এক এক রকম হতেই পারে ।

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় একটি ব্যোমকেশের গল্পে লুচির সঙ্গে আলুভাজাকে তুলনা করা হয়েছে বিসমিল্লার সানাইয়ের সঙ্গে শান্তা প্রসাদের সঙ্গতের সঙ্গে ।

হয়তো একটু খুঁজে দেখলে হয়ত দেখা যাবে অন্য কোনো বিশিষ্ট রসিক বাঙালি লুচির সঙ্গে বেগুনভাজাকে বলেছেন – রবিশঙ্করের সঙ্গে আল্লারাখার সঙ্গত, অন্য কেউ বলেছেন লুচির সঙ্গে ছোলার ডাল কে বলেছেন শিবরাম চক্রবর্তীর গল্পের সঙ্গে শৈল চক্রবর্তীর অলঙ্করণ , ইত্যাদি ।

তাই লুচির সঙ্গে সেরা সঙ্গী কে, এই বিষয় কোনো সিদ্ধান্তে আসার চেয়ে এই ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণর প্রতি প্রণত হওয়াই সেরা উপায় – যত মত তত পথ ।

আগেই বলেছি ময়দার তৈরি ফুলকো লুচি বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো জাতিকে খেতে দেখা যায় না । ‘এস আই আর’ অথবা কাস্ট সেনসর করে আর যাই বাছা যাক প্রকৃত বাঙালি বাছা অসম্ভব ।

জিনোম সিকোয়েন্সিং করে দেখা গেছে বাঙালি অতি বিচিত্র জাতি । বাঙালির জিনে একই সঙ্গে প্রাচীন দক্ষিণ ভারতীয়, প্রাচীন উত্তর ভারতীয় এবং প্রাচীন মধ্য এশিয়া, মানে ইরানের মালভূমি অঞ্চল থেকে আগত প্রজাতির চিহ্ন আছে। মোটামুটি খৃষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের সময় ভারতীয় আর্য্যরা পূর্ব ভারতে আসতে শুরু করে। তখন থেকেই বাঙালির ডি এন এ -তে এই পরিবর্তন সম্ভবত হয়ে থাকবে ।
বাকি ভারতের লোকজন থেকে বাঙালিরা যে অনেক বিষয়েই একটু আলাদা রকমের সেটা সম্ভবত বাঙালির ডি এন এ-র কারণেই । ওই জন্যেই বাঙালির শরীরের গঠনে এবং তার ভাবনা চিন্তায় কোনো বিশেষ গোষ্টী বা জাতির প্রভাব নেই । মিলে মিশে সবটাই বিচিত্র ।

হয়তো সেই কারণেই ভূভারতে যখন আটা দিয়ে পুরি বানায় তখন বাঙালি কেনই বা ময়দা দিয়ে লুচি বানানোর কথা ভাবলো!

কিন্তু লুচি খাওয়াটা বাঙালি শুরু করলো কবে? বল্লাল সেন কি সকাল বেলার জলখাবারে লুচি খেতেন? কিম্বা চাঁদ সদাগর কি বিদেশ থেকে ব্যবসা পত্তর শেষ করে বাড়ি ফিরে লুচি খাবার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন? না, তেমন কোনো প্রমান পাওয়া যায় না।

নৈষধকাব্যে চাঁদ সদাগরের ছেলের বিয়ের বিশাল ভোজের বা বেহুলার শ্বশুরালয়ে আগমন উপলক্ষে যে ভোজসভার আয়োজন হয়েছে সেখানে মাছ ও মাংসের নানা রকমের বিচিত্র পদের উল্লেখ থাকলেও লুচির উল্লেখ নেই ।

তবে একাদশ শতাব্দীর কিছু পুঁথিতে ‘শষ্কুলী’ নামের এক খাবারের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে । পালযুগের চিকিৎসক চক্রপাণি দত্ত-র দ্রব্যগুণ গ্রন্থে শষ্কুলীর উল্লেখ পাওয়া যায় । এখানে বলা আছে ঘৃতাক্ত গোধুম (গম) চুর্ণ করে বেলে গরম ঘিয়ে সিদ্ধ করে ও ভেজে নিলে ‘শষ্কুলী’ তৈরি হয় । অনেকে মনে করে এই ‘শষ্কুলী’ লুচির আদি রূপ।
কিন্তু আমরা কোনো মঙ্গল কাব্যেই লুচির উল্লেখ পাচ্ছি না । অবশ্য গোধুমের কথা পাওয়া যাচ্ছে অনেক জায়গাতেই । এমন কি চতুর্দশ খৃষ্টাব্দে চৈনিক পর্যটক মু হুয়ানের লেখায় বঙ্গ দেশে গোধুম চাষের কথা লেখা হয়েছে । চৈতন্যচরিতামৃতেও গোধুমের উল্লেখ আছে । ফার্সি ভাষায় গমকে বলা হয় গোন্ধুম বলা হয়। তাই অনেকেই মনে করেন মুসলমানরা এ দেশে আসার পরেই বাঙালি আটার ব্যবহার শিখেছে ।

সুকুমার সেন এবং সুভদ্র সেনের লেখা ‘বাঙালির ভাষা’ বইতে খুব নির্দিষ্ট করে বলছেন – ‘ গমজাত আদিমতম সুখাদ্য রুটি ও তার উন্নত সংস্করন স্নেহ-পক্ক পুরি-লুচি সাধারণ বাঙালির গোচরে এসেছিল তুর্কি আক্রমণের পর অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে।’
পন্ডিতেরা বললে তো তা মানতেই হবে । কিন্তু তুর্কিদের যে সব খাবার বাজারে এখন পাওয়া যায় , তার মধ্যে মোটেই লুচির ধারে পাশের কোনো খাবার নেই । সত্যি কথা বলতে কি এমন সর্বনেশে ডিপ ফ্রাই করা খাবারের কথা ওরা ভাবতেই পারে না । তাই আমার অন্তত মনে হয় লুচি কোনো বাঙালিরই আবিষ্কার।


রান্না করা ব্যাপারটাকে যে বাঙালি একটি উচ্চমার্গের বিদ্যা বলে মনে করতো তার প্রমাণ – উনিশ শতকে সংস্কৃত সাহিত্যে পন্ডিত বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কার মশাই নব্যন্যায়ের চর্চা ছেড়ে মন দিয়েছিলেন রন্ধন বিদ্যার চর্চায় । ১৮৭৩ সালে তিনি বাংলায় প্রথম রন্ধন শিল্প নিয়ে একটি বই লেখেন। বইটির নাম ‘পাক রাজেশ্বর’। ‘পাক রাজ্যেশ্বরঃ’ বইতে লুচি বানানোর পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হছে । ওখানে লেখা হয়েছিল – ‘দধি ঘৃত মর্দিতোষ্ণোদক সহিত দলিত মণ্ডাকার নির্ম্মিত ঘৃতভৃষ্ট সমিতা,’ এখানে উষ্ণজলে ময়দা মেখে তার সঙ্গে দই দেওয়ার কথা বলেছেন। এখন অবশ্য আর দই দিয়ে ময়দা মাখা হয় না।

১৮৯৩ সালে বিপ্রদাস মুখার্জি, যিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, কিন্তু সংস্কৃত ছাড়াও নানা বিষয় নিয়ে গবেষণাও করতেন, তিনি পাঁচ খন্ডে লিখলেন ‘পাক-প্রণালী’ এবং সঙ্গে লিখলেন দুই খন্ডে ‘মিষ্টান্ন পাক’ ।

এই বইতে তিনি খুব বিষদে লুচি নিয়ে লিখেছেন। তিনি আলাদা আলাদা করে তিনি সেই সময়ে প্রচলিত নানা রকমের লুচির রন্ধন প্রণালির কথা খুব যত্নের সঙ্গে লিখে গেছেন। তার মধ্যে ছিল খাস্তাই লুচি, ফুলকো লুচি, রাধাবল্লভী লুচি, মাধুপুরী, ক্ষীর ও ছানার লুচি, মানকচুর লুচি, কাঁটাল বিচির লুচি, নারিকেলের মিষ্ট লুচি, ব্রহ্মানন্দ পুরি, বিলাতী কুমড়ার লুচি, মিষ্ট পুরি, দুগ্ধের পুরি, দধির লুচি এবং মিষ্ট গোকুল পুরি। এর মধ্যে প্রথম তিন রকমের লুচি ছাড়া বাকি সব লুচিগুলির এখন আর চল নেই।

১৯২৪ সালে দীঘপতিয়ার রাজবধু কিরণলেখা রায় ‘জলখাবার’ নামের একটি রন্ধন প্রণালীর বই লেখেন।
তাতে তিনি ‘পাক রাজেশ্বরঃ’ বইতে লেখা লুচি বানানোর পদ্ধতি সম্মন্ধে উল্লেখ করে লেখেন –
আজিকালি সাধারণতঃ দধি না দিয়া শুধু ঘৃতের সাহায্যেই প্রথমে শুষ্ক ময়দা মর্দিত হইয়া থাকে । এই ঘৃত মিশ্রণকে ‘ময়ান’ দেওয়া কহে। “
কিরণলেখা দেবী সাধারণ লুচি ছাড়া আরও দুই রকমের লুচির কথা উল্লেখ করেছেন – ময়দার সঙ্গে সুজি মিশিয়ে ‘টবগা লুচি’ আর ‘কচমচিয়া লুচি। এই দুরকমের লুচিও এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে ।

বাঙালিদের মধ্যে আমরা যাদের মনীষী বলি,তা তিনি সন্ন্যাসী হোন, সাহিত্যিক হোন, বিপ্লবী হোন বা বিদ্যার সাগরই হোন, প্রায় সবাই কিন্তু অল্পবিস্তর ভোজনরসিক বটেন। তার প্রমাণ এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে।
বিদ্যাসাগর মশাই শুধু যে খেতেই ভালোবাসতেন তা নয়, তিনি খাওয়াতেও ভালোবাসতেন । এমন কি ক্ষেত্র বিশেষে নিজে রান্না করেও খাইয়েছেন ।
বিদ্যাসাগর মশাইয়ের লুচির প্রতি কিঞ্চিৎ দুর্বলতা ছিল, তাঁর জীবনের তিন পর্বের তিনটি ঘটনা থেকে এই রকম একটা সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে ।
প্রথমটি ঘটে যখন বিদ্যাসাগর মশাই তখন সংস্কৃত কলেজের ছাত্র। সেই সময়ে কাব্যশাস্ত্রর অধ্যাপক ছিলেন জয়গোপাল তর্কালংকার। সরস্বতী পুজো উপলক্ষে ছাত্রদের তিনি একটি শ্লোক লিখতে বললেন। ছাত্র ঈশ্বরচন্দ্র জয়গোপালের কথায় যে শ্লোকটি লিখেছিলেন সেটির শুরুই হচ্ছে লুচি দিয়ে :-
‘লুচী কচুরী মতিচুর শোভিতং
জিলিপি সন্দেশ গজা বিরাজিতম্।
যস্যাঃ প্রসাদেন ফলারমাপ্রুমঃ
সরস্বতী সা জয় তান্নিরস্তরম্।’

যার অর্থ হল – ‘লুচি কচুরি মতিচুর, জিলেপি, সন্দেশ, গজা এই সব চমৎকার খাবার যার পুজোয় আমরা খেতে পাই, নিরন্তর জয় হোক সেই দেবী সরস্বতীর।

আর দ্বিতীয়টি, একটি শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে যারা পরিবেশন করে তাদের উদ্দেশ্যে লুচি কি ভাবে নিমন্ত্রিতদের কাছে যাচতে হয় সেটা বোঝাতে বলেছিলেন –
“হুঁ হুঁ দেয়ং হাঁ হাঁ দেয়ং দেয়ঞ্চ করকম্পনে
শিরসি চালনে দেয়ং ন দেয়ং ব্যাঘ্রঝম্পনে।”
যার মানে হুঁহুঁ করলেও দেবে, হাঁ হাঁ করলেও দেবে, মাথা নাড়লেও দেবে। শুধু দেবে না যখন কোনো ব্যাক্তি বাঘের মত ঝাঁপিয়ে লুচি পাতে দিতে না করবে।


তৃতীয়টি বিদ্যাসাগর মশাইয়ের শেষ বয়সের, যখন তিনি কার্মাটাঁড়ে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে গিয়েছিলেন। কার্মাটাঁড়ে থাকার সময়ে একবার হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। কথায় কথায় বিদ্যাসাগর জানতে পারলেন যে হরপ্রসাদ সঙ্গে এনেছেন দিস্তে কয়েক লুচি। হরপ্রসাদকে বললেন লুচি দিতে। হরপ্রসাদ একটু দ্বিধা করছিলেন, বাসী লুচি, কলাপাতায় মোড়া, কলাপাতার গন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বিদ্যাসাগর নাছোড়বান্দা। অতএব তাঁর কথামতো লুচিগুলো বার করে হাওয়ায় একটু রেখে দিলেন। খানিকক্ষণ পরে খোলা হাওয়ায় কলাপাতার গন্ধ উবে গেল। বিদ্যাসাগর পরমানন্দে কয়েকখানা লুচি খেলেন। বাকিগুলি সেখানে থাকা সাঁওতালদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন ।

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র যে কতটা লুচি খেতে ভালো বাসতেন সেটা তিনি কমলাকান্তের মুখ দিয়ে বলিয়ে দিয়েছেন । ‘আমার মন’ নামের রচনায় কমলাকান্ত বলছেন –

‘যেখানে, পাচকরূপী বিষ্ণুকর্তৃক, লুচিরূপ সুদর্শন চক্র পরিত্যক্ত হয়, আমার মন সেইখানেই গিয়া বিষ্ণুভক্ত হইয়া দাঁড়ায়। অথবা যে আকাশে লুচি-চন্দ্রের উদয় হয়, সেইখানেই আমার মন-রাহু গিয়া তাহাকে গ্ৰাস করিতে চায়। অন্যে যাহা বলে বলুক, আমি লুচিকেই অখণ্ড মণ্ডলাকার বলিয়া থাকি।’

আর রবীন্দ্রনাথ?
তাঁকে না ছুঁয়ে গেলে তো বাঙালির কোনো পুজো আর্চা,হোম, যজ্ঞ, মিটিং, মিছিল,খেলা, মেলা , অন্নপ্রাশন, আ্যনিভারসারি, শোকসভা, কিছুই ঠিক মতো সমাপন হয় না। এই লেখাটিই বা হয় কি করে !
কিন্তু লুচি নিয়ে তিনি তো কোনো গান লেখেন নি। গল্পে, উপন্যাসে লুচি কখনো সখনো উঁকি দিয়েছে হয়তো। তবে একটি কবিতায় লুচি প্রসঙ্গ বেশ অদ্ভূত ভাবে এসেছে। মানসী কাব্যগ্রন্থের সেই কবিতাটির নাম ‘ধর্মপ্রচার’। বেশ বড় কবিতা । এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথের শ্লেষ ঠিক কাদের দিকে ধাবিত, সেটা বুঝতে হলে পুরো কবিতাটি পড়তে হবে (পাঠকের প্রতি কবিতাটি পড়ে নেওয়ার অনুরোধ রইল) ।

পৃথিবীর সব রকমের রূপ-রস- বর্ণ-গন্ধ-র প্রতি যাঁর যার আগ্রহ সর্বদা সজাগ থাকতো, লুচির প্রতি যে তিনি উদাসীন থাকবেন না, এটা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ-র মতো ধরে নেওয়া যেতে পারে । সে কথা তিনি রচনায় উল্লেখ না করলেও তাঁকে নিয়ে একটি প্রচলিত গল্প থেকে তাঁর লুচি-অনুরাগ ধরা পড়ে । গল্পটি এই রকম –


আমরা জানি গান্ধিজী খুব সাত্ত্বিক এবং স্বল্পাহারী ছিলেন । কিন্তু যেখানেই যেতেন তাঁর জন্য কিছু নির্দিষ্ট খাবারের আয়োজন করতে হত । যেমন প্রাতরাশে তিনি খেতেন ছাগলের দুধ, কিছু বিশেষ ফল , সিদ্ধ শাকসব্জি ইত্যাদি । তিনি শান্তিনিকেতনে এলে সেই রকম আয়োজনই করতে হত তাঁর জন্য। প্রাতঃরাশের সময় রবীন্দ্রনাথও থাকতেন এবং সেই সময় তাঁরা দুজনে নানা গভীর বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। একবার এই রকম প্রাতরাশের টেবিলে দু জন মিলিত হয়েছেন। গান্ধিজীর জন্য তাঁর মতো খাবার আনা হয়েছে। এবং রবীন্দ্রনাথের জন্য, তাঁর পছন্দের খাবার। সেদিন রবীন্দ্রনাথের প্রাতঃরাশের জন্য আনা হয়েছে ধবধবে সাদা ফুলকো লুচি। গান্ধিজী প্রাতঃরাশ করতে করতে সেই খাবারের দিকে তাকিয়ে বললেন, গুরুদেব, আপনি কি জানেন, আপনি বিষ খাছেন? গুরুদেব একটুও উত্তেজিত না হয়ে বললেন – হ্যাঁ, জানি, তবে এই বিষের অ্যাকশন খুব স্লো । আমি তো গত ষাট বছর ধরে খেয়ে আসছি।’

শেষ করার আগে একটি সাবধানবাণী – যদি দুর্ভাগ্যবশত ট্রাইগ্লিসারাইড নামক অসুর আপনাকে মাঝে সাঝে চোখ রাঙায় তাহলে জেনে রাখবেন এখনকার পুষ্টিবিদরা বলেন একটি লুচিতে ক্যালরির পরিমান নাকি ১৫০ থেকে ১৭০, যার উৎস স্যাচুরেটেড ফ্যাট । এই নিবন্ধের লেখক লুচির যতই গুণকীর্তন করে থাকুন না কেন আপনারা তার দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে বরং লুচির ক্ষেত্রে সেই রবি ঠাকুরকেই স্মরণ করুন , যিনি বলেছেন – ‘দূর হতে আমি তারে সাধিব/ গোপনে বিরহ ডোরে বাঁধিব …।’

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
1 month ago

ব্যক্তিগতভাবে বর্তমানে আমাদের অবস্থা আপনার উপস্থাপনার শেষ কথাটি।কারণ,ফুলকো লুচি বানাবার কারিগরেরা আজকাল ক্রমশঃ অবলুপ্ত হতে বসেছেন।ওগুলো বানাবার জন্য যে ধৈর্য্য, নৈপুণ্য আর ভালোবাসা দরকার,সেটা বর্তমান প্রজন্মে নেই।বাজারে পাওয়া যাবেনা কোথাও।

1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x