শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আমি হেথায় থাকি শুধু – ৩

Shibanshu Dey

যারা বিহান-বেলায় গান এনেছিলো….

১.
তিনি সতত নির্জনতা খুঁজতেন । প্রিন্স দ্বারকানাথের পুত্র। ভোগসুখ বিষয়প্রবৃত্তির শীর্ষে থাকা আভিজাত্যে মোকাম কলকাতার এক নম্বর পরিবারের ঐতিহ্যধারক। খুঁজে যেতেন ঈশ্বর নামের এক প্রহেলিকাকে। নির্জনতা তাঁর কাছে ঈশ্বরের আরেক নাম । রামমোহন তাঁকে ডাকতেন বেরাদর । পুত্র রমাপ্রসাদের বন্ধু ছিলেন তিনি । তিনি তো কেশব সেন ছিলেন না, তাঁর ঈশ্বরচর্চা ছিলো অন্তর্মুখী । ঊনবিংশ শতকের বাঙালির হাজার ভালোমন্দ, শাদাকালোর পরিপ্রেক্ষিতে তিনিও তর্কাতীত ছিলেন না । যুগ বদলের পরিপ্রেক্ষিতে বহুমুখী দ্বান্দ্বিক শর্তের স্ববিরোধ তাঁকেও পীড়িত করেছে বারবার। বাড়িতে দুর্গোৎসব হতো, তিনি পৌত্তলিকতার বিরোধী ছিলেন। তাই প্রতিবাদে পাহাড়ে চলে যেতেন। এই মূর্তিপূজা নিবারণ করতে অনেকদিন লেগেছিলো তাঁর। একদিকে সংসারে নির্লিপ্ত, অন্যদিকে অতি সংলিপ্ত । সামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি সেকালের বঙ্গীয় নক্ষত্রসমাজে অদ্বিতীয় ছিলো। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র যেমন বলেছিলেন,”বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা”, দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন তাই। পুত্রবধূ জ্ঞানদানন্দিনী তাঁর স্মৃতিকথায় খুব সরলভাবে লিখেছিলেন, ” আমার শ্বশুরমশায় তো কলকাতায় থাকতেন না । তিনি হিমালয়ে ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়াতেন ।” কেন বেড়াতেন ? কী প্রয়োজন ছিলো তাঁর, কোন আকুলতা ? লোকজন রামায়ণের সংসারী ঋষি বিশ্বামিত্রের প্রতি প্রযুক্ত আখ্যাটি ধার করে তাঁকে বলতো ‘মহর্ষি’ । রাজা জনকের অনুকরণে ‘রাজর্ষি’ বলতো না। এটাও একটা তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। তাঁর সংসারী সত্ত্বাটিকে অনেক বেশি ছেয়ে থাকতো তাঁর অতিসংসারী সত্ত্বা, সেটাই কি কারণ ?

ভুবনডাঙ্গার মাঠে দেবেন্দ্রনাথের ছাতিমগাছ আবিষ্কার, বাংলার আবহমান সংস্কৃতি ইতিহাসে একটা অন্যযুগের বীজবপন বলা যায় । তিনি কীভাবে, কখন এই গাছটিকে ধ্যানের আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তা নিয়ে পণ্ডিতজনের নানা মত রয়েছে । অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়, অজিতকুমার চক্রবর্তী, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বা প্রমথনাথ বিশী, সবাই ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেছেন । তবে প্রশান্তকুমার পাল মশায় জ্ঞানেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একমত । দেবেন্দ্রনাথ গুসকরায় এক নির্জন প্রান্তরে তাঁবু খাটিয়ে ধ্যান করতেন । সেখান থেকে একদিন তাঁর সুহৃদ রায়পুরের জমিদার ভুবনমোহন সিংহ মশায়ের আমন্ত্রণে পাল্কিতে দিগন্তবিস্তৃত ভুবনডাঙ্গার মাঠ পেরিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁর বাড়ি । পথে তাঁর চোখে পড়ে ঐ ছাতিমগাছটি । তিনি পাল্কি থামিয়ে কিছুক্ষণ ঐ গাছের ছায়ায় বসে ঈশ্বরচিন্তা করলেন । তাঁর মনে হলো এই স্থানটিই নির্জনে ঈশ্বরকে স্মরণ করার উপযুক্ত ঠিকানা । ফিরে গিয়ে ১৮৬৩ সালের পয়লা মার্চ সেখানকার জমিদার প্রতাপনারায়ণ সিংহের থেকে বার্ষিক পাঁচ টাকা খাজনায় মৌরসি পট্টা নিলেন ভুবনডাঙ্গা গ্রামে বাঁধপারের বিশ বিঘে জমি । উদ্দেশ্য ছিলো সেখানে ব্রাহ্ম উপাসনা ও চর্চার জন্য একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করা ।


এই প্রান্তরে ১৮৬৩ সালেই মহর্ষির নির্মিত প্রথম অট্টালিকাটির নাম ছিলো ‘শান্তিনিকেতন গৃহ’। তার নামেই সমগ্র ভূখন্ডটির নাম হলো ‘শান্তিনিকেতন’ । ১৮৯০ সালে উপাসনা গৃহ নির্মিত হবার আগে পর্যন্ত এখানেই ব্রহ্ম-উপাসনা হতো। ১৯০১ সালে কবি যখন পাঁচ জন ছাত্রকে নিয়ে ব্রহ্মচর্য আশ্রম প্রতিষ্ঠা করছিলেন, তখন তিনি সস্ত্রীক এই ভবনটিতেই থাকতেন। গীতাঞ্জলির অধিকাংশ কবিতা এখানেই রচিত। পাশেই ছাতিমতলায় ধ্যানের বেদী । তাঁর প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি । শান্তিনিকেতন গৃহ একটি দোতলা সুরম্য ভবন । আইওনিক স্তম্ভ, ত্রিকোন কর্নিশ আর সবুজ খড়খড়ি দেওয়া দীর্ঘ জানালারা । বাড়িটির পিছন দিকের বিস্তারটি ক্রমশ কমে গেছে । কপালে লেখা ” সত্যাত্ম প্রাণারামং মন আনন্দং”। এখানে এখন একটি জাদুঘর । শৈশব থেকে কবি এসে এখানেই থাকতেন । বাড়িটির ঠিক সামনেই প্রতিষ্ঠিত রামকিঙ্করের বিমূর্ত ভাস্কর্য ‘ অনির্বাণ শিখা’। একটু এগিয়েই ডানদিকে সেই বিখ্যাত বিপুল বটবৃক্ষটি দাঁড়িয়ে রয়েছে । যার নীচে কোনকালে একটি ছোটো জলাশয় ছিলো । আর ছিলো পাথর জমিয়ে তৈরি করা বালক রবীন্দ্রনাথের তিনটি ঢিবি, যেজন্য তার নাম তিন পাহাড় । রাস্তার ওপারেব উপাসনাগৃহ বা ব্রাহ্মমন্দির, যার ডাকনাম কাঁচঘর ।
২.
বহুদিন আগে একটা পদ্য লিখেছিলুম, তার প্রথম লাইনটা,” কোনোদিন নদী বয়েছিলো, আজও তার টায়ারের দাগ রয়ে গেছে ।” উপলক্ষ ছিলো প্রথম খোয়াই দেখার অভিজ্ঞতা । সুরুল থেকে সিউড়ির রাস্তায় একটু এগিয়েই বাঁদিকে মোচড় মেরে বিনুরিয়া খালের পাশে পাশে যে লালমাটির রাস্তাটি এগিয়ে যেতো সোজা পশ্চিমে, সোনাঝুরি নামের প্রান্তরটি তার ডানদিকে অবিন্যস্ত শুয়ে থাকতো । সে আর এখন নেই। মৃদু লাল, মধ্য লাল, মেদুর লাল, লালিম আভায় ঘোর ধুলোট সেই মৃত্তিকা, জ্বরতপ্ত প্রেমিকের মতো শুয়ে থাকা তার। এখন সে কৃষ্ণকান্ত, পিচঢাকা। পাশে পাশে প্রেয়সী জলধারা, শীর্ণ আকালষোড়শী, কোনও শুশ্রূষা এনে দেয়না আর। মেঘের কাছে অনিবার্য ফিরে গেছে । অন্তরীক্ষের কাছে । শুধু দুজনের নখর আশ্লেষের দাগ আঁকাবাঁকা খোয়াই জন্ম নিয়ে একপাশে অপেক্ষা করে আছে । হে মেঘমদির শবরী, এই সব ক্ষতচিণ্হে ভিজে আঙুল বুলিয়ে দিও একদিন, তার বেশি কোনও প্রত্যাশা নেই তার ।

সেই ধুলোডাঙ্গাটির একপাশে ছিলো খোয়াইয়ের হারিয়ে যাওয়া জলধারার খাদ। এখনও আছে। তবে হ্রস্ব হয়ে গেছে। জলের মতোই এঁকেবেঁকে কোথাও কোনও দিকে। যাঁরা কলোরাডো দেখেছেন, এই আয়োজন তাঁদের জন্য নয় । আমার দেখা বাংলায় আর একটি জায়গায় এই দৃশ্যের জন্ম হয়। অনেক ব্যাপক, বিস্তৃত নির্মাণ তার। গড়বেতার কাছে গনগনির মাঠে দীর্ঘ ঘোর সবুজ কাজুবনের আঁচল সরিয়ে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায় লালপাড় নদীর সীমন্তরেখা । শিলাবতী নদীর শুকনো সোঁতা। বর্ষায় উত্তাল। লালমাটির শিরা-উপশিরা ছিন্নভিন্ন করে, শিহর জাগিয়ে নিশ্চল অপেক্ষায় রয়েছে সেখানে । নিচের দিকে উঁকি দিলে একটু শিরশির করে ওঠে অনুভূতিগুলি। গ্র্যান্ড নয়, আমাদের পাতি ক্যানিয়ন । বাঙালি মেয়েদের মতো, কৃশা, লঘূত্তমা, কিন্তু অমোঘ আর্তি জড়িয়ে থাকে তাদের সারা গা’য় । কচি সবুজ আঁচল জড়ানো শিশির-চিকন কলাগাছের মতো মসৃণ, সর্বতো নারীর মতো । সোনাঝুরির খোয়াই সেই বন্যতাকে ধরতে পারেনা । সে মেঘদেবতার হেলায় রিক্তা অম্বালিকার দোসর ।

৩.
শান্তিনিকেতনের ভূগোল বিষয়ে বেশি বলা নিষ্প্রয়োজন । উত্তরায়ণ প্রাঙ্গন, তার অভিনব স্থাপত্যের বাড়িগুলি, কলাভবন, সঙ্গীতভবন, চীনাভবন, হিন্দিভবন, নিপ্পনভবন, রতনকুঠি, মালঞ্চ,নাট্যঘর ইত্যাদি ইত্যাদি । শান্তিনিকেতন হয়তো এখন ভগ্ননীড়, হয়তো তা প্রতিষ্ঠাতার সাধিত রুচি ও সম্ভ্রমবোধ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে । বিংশশতকের গোড়া থেকে পঞ্চাশ দশক পর্যন্ত অভ্রভেদী মাপের সাধকরা গড়ে তুলেছিলেন একটা বিশ্বস্বীকৃত সারস্বততীর্থ। তাঁদের সমতুল্য আজ আর কেউ নেই। ধীরে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত পদক্ষেপে, পর্যটন বাণিজ্যের পল্লবগ্রাহী আখড়া হয়ে উঠছে সে। তবু, …একটা তবু থেকে যায় । নিছক লৌকিক অভ্যেসে কাল কাটানো সংখ্যাগুরু অধিবাসীদের মধ্যে কিছু মানুষ এখনও নিভৃত নীলপদ্মের খোঁজ করে যান । খুঁজে পা’ন কি না তা হয়তো সতত প্রমাণ করা যায়না । তবু তো মনে থাকে, “হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দিশে, দেশবিদেশে………. “

আমার বাবা প্রথম শান্তিনিকেতনে যেতেন গত শতকে চল্লিশ দশকের শেষদিক থেকে । তখন তিনি কলকাতায় কলেজ ছাত্র । ততোদিনে সূর্য ডুবে গিয়েছে, কিন্তু গোধূলির কিছু লালিমা তখনও আকাশে বেঁচে ছিলো, যথেষ্ট উজ্জ্বল । শান্তিনিকেতনের পথেঘাটে খালি পায়ে, কখনও চটি পরে, টোকা বা ছাতা মাথায় বহু ডাকসাইটে মানুষেরা ঘোরাফেরা করতেন । দর্শনধারী কিস্যু ঠাহর হবে না, কিন্তু নামটাম শুনলেই চমকে যেতে হতো । বাবা বলতেন, ওখানে রিকশাচালকদেরও একটা অন্যস্তরের জানাবোঝার জগৎ ছিলো । বাইরের লোকজন তো চিরকালই সেখানে আসেন নিয়মিতভাবে । শান্তিনিকেতনে তাঁদের জন্য পান্ডার ডিউটি দিতেন ঐ রিকশাচালকেরা । আসলে শান্তিনিকেতনে পর্যটকের লিস্টিটি প্রথম তৈরি করেছিলেন রিকশাচালকরাই ।

নতুনবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলুম ছায়ায় । এক রিকশাসওয়ার দম্পতিকে চালক প্রশ্ন করছেন, বলুন তো রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর আসল নাম কী ? তাঁরা এদিকওদিক ভেবে বললেন, মৃণালিনী না ? এইতো, জানেন না তো । উনার নাম ছিলো ভবতারিণী । তাই…? হমম, তিনি হলেন যশোরের মেয়ে । এই বাড়িটায় থাকতেন, হুই যে ওদিকের ঘরটা, উনার রান্নাঘর ( এই কথাটা যদিও সত্যি নয়, কারণ ঐ বাড়িতে তাঁর থাকার সুযোগ হয়নি )। পর্যটকেরা চমৎকৃত হয়ে শুনতে থাকেন । খানিক পরে সেই রিকশাচালককেই দেখি কলাভবনের সামনে দেওয়ালের অলংকরণ দেখিয়ে সেই দম্পতিকেই বলছেন, ঐ যে দেওয়ালের আঁকা, ওটা মানিদা’র করা । মানি’দা কে ? সে কী, নাম শোনেননি ? খুব বড়ো আটিস । তাঁরা মাথা নাড়েন। কে জি সুব্রামনিয়ান বেশ ভারি নাম , রিকশাচালকের সব সময় মনে থাকেনা হয়তো ।
৪.
দক্ষিণ-পশ্চিমদিক দিয়ে সড়কপথে শান্তিনিকেতন যাওয়ার জন্য লোকে দুর্গাপুর থেকে জিটি রোড ধরে পানাগড় যাওয়ার পথে কাঁকসা মোড় থেকে বাঁদিকে ঘুরে যায় । এই চোদ্দো নম্বর সড়কটি সটান উত্তরপূর্বে রামনাবাগান জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অজয় নদের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে । পূর্ব বর্ধমানের এককালের বিখ্যাত দুর্গাপুরের জঙ্গল এখন এইটুকুই টিকে আছে । বাংলাদেশের যতো সাবেকি ডাকাতের কিংবদন্তি শাল বনের এই সুদীর্ঘ রেঞ্জটি আশ্রয় করেই একদিন গড়ে উঠেছিলো । চার-পাঁচ দশক আগে যখন বাইকযাত্রী হয়ে এ তল্লাটে ঘোরাফেরা ছিলো তখনও এই জঙ্গলটি গৌরবে যেন মিনি সারান্ডা। এখনকার ইলামবাজারের শালবন। এখনও রয়েছে, কিন্তু গাছগুলি মূলত: সামাজিক বনসৃজনের ফসল । প্রাচীন বনস্পতি সব চেরাইকলে রেস্ট ইন পীস । সিংভূমের লোক শালবনের ছায়ায় সেমত সুন্দর, যেমতি ‘সিপাইরা সুন্দর জেলে’ । কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে গেলে কখনও গুশকরা হয়ে যাইনা। একটু লম্বাপথ হয়তো, কিন্তু ইলামবাজার জিন্দাবাদ।

জঙ্গলের শেষে পথটি পেরিয়ে যায় বর্ধমানের সীমানা, অজয় নদের সেতু । তার পরেই ইলামবাজারের তেমাথা । তেমাথার মোড় থেকে উত্তর-পশ্চিমদিকে রাস্তাটা চলে গেছে শ্রীপুর হয়ে হেতমপুর, দুবরাজপুর । আর পূবদিকের রাস্তাটা গেছে চৌপাহাড়ির জঙ্গল পেরিয়ে সটান সুরুল গ্রাম । উত্তরদিক থেকে আসা সিউড়ির রাস্তা এখানে এসে মিলেছে ভুবনডাঙ্গা জংশনে । রাঢ়বঙ্গের প্রামাণ্য ল্যান্ডস্কেপ যতো ছড়িয়ে আছে পথের দুধারে ।

সত্তর দশকের ঠিক পরে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির প্রাসঙ্গিকতা ও অবমূল্যায়ন নিয়ে আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে চর্চাটি হতো, সেখানে পূর্বধারণাগুলির অবস্থান ছিলো মেরুপ্রমাণ দূরত্বে । কলকাতার যে সব ছেলেরা আলিপুর, বহরমপুরের জেলহাজত থেকে বেঁচে ফিরে এসেছে বা আমাদের গ্রামের হাজারিবাগ জেলফেরত দাগি ছেলেপুলেদের রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ নিয়ে ভাবনাচিন্তায় ছিলো তীব্র দোলাচল । আমার স্বল্প পরিচিত একটি কলকাতা থেকে আগত তরুণ, যাকে কেউ কেউ মিনি-মাও বলতো । মানে সে ছিলো চেয়ারম্যান মাও-এর থেকেও বড়ো ‘মাওবাদী’। অন্যেরা বলতো যদুপুরের পাকা । নানারকম বৈপ্লবিক তত্ত্ব দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে ব্যাখ্যা করতো । আমাদের ছোটো শহরের পরিপাকের পক্ষে সে জাতীয় কথাবাত্তা ছিলো বেশ দুরূহ । সেসময় আমিও বড়োজোর বছর কুড়ি । একদিন একটা আড্ডায় শুনি সে তার তত্ত্বকথা বেশ উচ্চস্বরে প্রচার করে চলেছে । বহু বহুকাল পরে গত বছর এক “প্রথিতযশা” বাঙালি গায়কের একটি ঘোষণা শুনেছিলুম । নিজের গাওয়া একটি অতি নিম্নরুচির মিউজিক ভিডিওর শেষে তিনি ইংরিজিতে বলে উঠলেন definitely it is filthy, because it is political . ‘পলিটিক্যাল’ হতে গেলে যে ‘ফিলদি’ হতে হয় সে শিক্ষা মিনি-মাও আমাদের প্রথম দিয়ে ছিলো । পরবর্তীকালে বিভিন্ন জনবিনিময়ে যখন আপাদমস্তক পলিটিক্যাল আমি, কবিকে নিয়ে কিছু বলাবলি করতুম, মিনি-মাও নিশ্চিত সেখানে যেতো । সব কিছু শুনে বলতো, ‘ইয়োর অ্যাপ্লিকেশন অফ মার্ক্স অন টেগোর ওয়াজ পারফেক্ট, বাট অ্যাট দি এন্ড অফ দি ডে, হি ওয়াজ ডেফিনিটলি ডেকাডেন্ট ।‘

একদিন আমাকে খুব সিরিয়সভাবে শুধালো, ” সি, শেকভ ওয়াজ ফার মোর পাওয়ারফুল স্টোরি রাইটার, সো ওয়াজ টলস্টয় অ্যাজ আ নভেলিস্ট। হি ক্যান নেভার বিট শেকস্পিয়র অ্যাজ আ ড্রামাটিস্ট অ্যান্ড হি অ্যাজ আ পোয়েট, উড লুজ হিজ ক্রাউন টু টূ মেনি পিপল । হোয়াট ইউ পিপল ফাইন্ড সো স্পেশাল ‘বাউট হিম ?’

এত্তো ইংরিজি বলেও সে ঢাকতে পারেনা তার ডাফ লেন, মোহনবাগান রো, বিজয়গড় থেকে গড়িয়ে আসা অন্ধগলির পাতি কলকাতা । সে পরে কোথায় গেলো? কী ভাবতো? তার কোনও হদিশ নেই। এই সব মানুষকে অনেক কথাই বলা যায়, আবার নিশ্চুপে উপভোগও করা যায় তার শিকড়হীন উদ্দীপনা । দ্বিতীয়টিকেই সঠিক ভেবেছিলুম তখন, এখনও তাই ভাবি । আরও ভাবি ‘শান্তিনিকেতন’ও তো এখনও অনেকের কাছে ‘ ডেকাডেন্সের’ একটি প্রকৃষ্ট নমুনা ।

৫.
দ্বারকানাথের সাহেব সেক্রেটারি মনিবের বারম্বার সিদ্ধান্ত বদলানোর অভ্যেসে বড়ো বিড়ম্বিত থাকতেন । সেই বিখ্যাত “বাবু চেঞ্জেস হিজ মাইন্ড” উক্তিটি তাঁরই করা এবং তা নিয়ে কবিরও বেশ শ্লাঘা ছিলো । ইওরোপযাত্রার জন্য জাঁকজমকের সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাওড়া স্টেশন থেকে ফিরে আসা ও যাত্রা সম্পূর্ণ নাকচ করে দেওয়ার ঘটনা আমরা জানি । আরও জানি এ জাতীয় ঘটনা একবার নয়, বারবার ঘটেছে । গতানুগতিক স্থিতির স্বাচ্ছন্দ্য কবির একেবারে নাপসন্দ ছিলো । আরও অনেক ব্যাপারের মতো তাঁর বাসস্থান পরিবর্তনের নেশাও ছিলো কিংবদন্তি সুলভ । সুধীর কর মশায় লিখেছেন, একসময় দেহলি বাড়ি ছিলো তাঁর প্রিয় আস্তানা । ঐ বাড়ির দোতলার বারান্দায় বসে গ্রীষ্মকালের প্রবল তপ্ত হাওয়ায় তাঁর সৃজনশক্তি স্ফূরিত হতো । পরবর্তীকালে খ্যাতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণের ‘উদয়ন’ অট্টালিকাটি নির্মিত হয় । সেখানে কবি বেশ কিছুদিন বসবাস করেন । তার পর আরেকটু কোনায় গিয়ে কোণার্ক বাড়ি । তাও পুরোনো হয়ে গেলো শ্যামলী বাড়ি তৈরি হবার পর। ‘শ্যামলী’ বাড়িটির প্রতি তাঁর বেশ পক্ষপাত ছিলো শুনেছি । কিন্তু সে মাটির বাড়ি বৃষ্টির ধাক্কায় বিপজ্জনক হয়ে পড়লে ‘পুনশ্চ’। নামেই পরিচয় এই বাড়িটি নির্মাণের উদ্দেশ্য । সে বাড়িও ‘পুরোনো’ হয়ে যায় অচিরাৎ। শেষ পর্যন্ত তার পাশে উদীচী বাড়ি । সেখান থেকেই তিনি কলকাতার পথে শেষযাত্রায় প্রয়াত হ’ন । এই বিরাট শিশুর ছেলেখেলার নমুনা হিসেবে এই নিত্য নতুন বাড়ির নেশা একটি উল্লেখ্য বিষয় হতেই পারে । শান্তিনিকেতনের পর্যটকেরা অবশ্য ছুটতে ছুটতে বাড়িগুলির দেওয়ালে প্রলম্বিত দীর্ঘ আলোকচিত্রগুলি দেখতেই ব্যস্ত থাকেন । এই সব বাড়িরই স্থাপত্য একটু মনোসংযোগ করে দেখতে হয় । সিমিট্রির মামুলি ফর্মুলাকে কীভাবে বিনির্মাণ করা যেতে পারে তার কিছু নিদর্শন পাওয়া যাবে এই আবাসভবনগুলিতে।ভাগ্যিস, বাবু চেঞ্জড হিজ মাইন্ড সো অফন।

উত্তরায়ন প্রাঙ্গণের ৫টি গৃহ

৬.
শান্তিনিকেতনের বাগানে নানা রকম ফুল ফুটিয়েছিলেন কবি। সেরকম একজনের নাম ‘অণিমা’। মানে বাবা-মা সেরকমই রেখেছিলেন। শান্তিনিকেতনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অস্তিত্বটিই ছিলো বালিকাটির জীবনের চালিকাশক্তি। বাকি সব গৌণ প্রসঙ্গ। দাদামশাই রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০২ সাল থেকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁকে কেন্দ্র করে একটা গোটা পরিবারই শান্তিনিকেতনের অধিবাসী হয়ে যান। তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর সঙ্গে জীবিকাসূত্রে যুক্ত হয়ে যান। তাঁর মায়ের ডাকনাম সোনা, দিদির নাম গিনি, তাই তিনি মোহর। আদি গুরুপল্লীর পাশাপাশি খোড়োচালের মাটির কুঁড়েঘরে তখন থাকতেন নানা দিকপাল। নন্দলাল বসু, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, প্রমদারঞ্জন ঘোষ, জগদানন্দ রায়, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ক্ষিতিমোহন সেন, নেপালচন্দ্র রায়, নিত্যানন্দ গোস্বামী। মোহরের পিতৃদেব সত্যচরণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন তাঁদের প্রতিবেশী। রবীন্দ্রপ্রভাবে আচ্ছন্ন মানুষগুলি আমাদের সংস্কৃতির প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন পরবর্তীকালে । প্রাচীনকালে আশ্রমিক জীবনের যে বর্ণনা দেখতে পাওয়া যায়, কবি’র ‘শান্তিনিকেতন’ ছিলো তারই প্রতিরূপ। তাঁর স্বপ্নের ‘স্বর্গরাজ্য’। যেখানে কাঞ্চনমূল্যে মানুষ বিকোতো না। প্রতিভা, মনন ও সৃজনশীলতা ছিল মানুষকে মাপার মানদণ্ড। সেখানেই বেড়ে উঠেছিলেন মোহর।

রবীন্দ্রনাথ ও কণিকা

‘ …শৈশবে এক কালবৈশাখীর সন্ধেবেলা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে দুটি মেয়ে ‘শ্যামলী’র বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে তারা দেখতে পায় জানালার পাশে একজন ‘সাদা চুল, সাদা গোঁফ-দাড়ি, বড় বড় চোখ। যেন তুলি দিয়ে আঁকা’ মানুষ বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। কিন্তু কিছুই যেন দেখছেন না। একটু পরে শিশুদুটি তাঁর নজরে পড়ে। তিনি তাদের ডেকে পাঠান। প্রশ্ন করেন, ‘গান জানিস?’ তাঁদের মধ্যে একজন শিশু পরবর্তীকালে লিখেছেন, ‘তিনি গান শোনাতে বললেন। আমিও সঙ্গে সঙ্গে শুনিয়ে দিলুম। কোনও দ্বিধা বা জড়তা কাজ করেনি। তিনি যে আমার কাছে গান শুনতে চেয়েছেন, তাতেই আমি ডগোমগো। আর, শান্তিনিকেতনের মাটিতে আমার কোনও লজ্জা ছিল না গান গাওয়ার। এটা তো আমাদেরই জায়গা। ঘুরতে, ফিরতে গান করি। গুরুদেবকেও শুনিয়ে দিলাম সদ্য শেখা একখানা গান। মনে হল, তিনি খুশি হয়েছেন। … কালবৈশাখীর বিকেলের এই একটুকরো ঘটনায় যেন অনেকখানি পাল্টে গেলাম আমি।’ (মেলোডি জংশন)
আদি গুরুপল্লীর ‘মোহর’ নামের বালিকাটির ‘কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়’ হয়ে ওঠার যে যাত্রা দুনিয়া দেখেছে, তার মধ্যেই ধরা আছে ‘শান্তিনিকেতন’ ব্র্যান্ডের অন্তঃসলিল আনন্দের উৎসগুলি । প্রশ্ন উঠতে পারে ‘কণিকা’ই কেন? অনেকেই তো আছেন। অবশ্যই আছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন অবিমিশ্র আশ্রমবালিকা। ‘অণিমা’, ‘কণিকা’ হয়েছিলেন কবি’রই দৌলতে। বদলটি শুধু নামে নয়, সমগ্র সত্তায়। যার ফলশ্রুতি পরবর্তী কালে তাঁর সারা জীবনজোড়া যাত্রাপথের আনন্দগান। সত্ত্বগুণে যা একেবারে ‘শান্তিনিকেতনী’। কবি’র ভাবনায় মানুষের বেঁচে থাকার পরিপ্রেক্ষিতগুলি কীরকম ভাবে বিকশিত হবে, তার একটি সেরা নিদর্শন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃজন ও জীবন ধারার মধ্যে ফুটে উঠেছিলো। ‘শান্তিনিকেতন’ নামের ধারণাটির একটি প্রামাণ্য মূর্তি আমি খুঁজে পাই এই আশ্রমবালিকার মধ্যে।

বদলে যাওয়াই সময়ের ধর্ম। অর্ধ শতক আগে আমার প্রথম দর্শনের স্মৃতি আর আজকের বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকবে এটা দাবি করা একান্ত মূঢ়তা। কবিই তার উত্তর দিয়ে গেছেন অনন্য দৈব ভাষার বন্ধনে,
‘..যে মহাকাল দিন ফুরালে আমার কুসুম ঝরালো
সেই তোমারি তরুণ ভালে ফুলের মালা পরালো।
শুনিয়ে শেষের কথা সে কাঁদিয়ে ছিল হতাশে,
তোমার মাঝে নতুন সাজে শূন্য আবার ভরালো।

আমরা খেলা খেলেছিলেম, আমরাও গান গেয়েছি।
আমরাও পাল মেলেছিলেম, আমরা তরী বেয়েছি।
হারায় নি তা হারায় নি, বৈতরণী পারায় নি—

নবীন চোখের চপল আলোয় সে কাল ফিরে পেয়েছি॥

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x