
আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় – যাঁকে একেবারেই এই অশিক্ষিত আমি, বাধ্য হয়েই এড়িয়ে চলি, যাঁর প্রসঙ্গ এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে The Origin and Development of the Bengali Language – বাংলা শব্দতত্ত্বের সেই বৃহদায়তন বাইবেলটির প্রচ্ছদ – ওরে বাবা ! আমি তো কোন ছাড়, যতই আন্তরিক এবং স্নেহের সম্পর্ক থাক, সুনীতি শান্তিনিকেতনে আসছেন শুনলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যেমন খুশি হতেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নাড়ির স্পন্দনও নাকি বেড়ে যেত – কী জানি আবার কোন নতুন দুরূহ তত্ত্ব সম্পর্কে অনেক কঠিন প্রশ্নের পরীক্ষায় তাঁকে বসতে হবে ! আজ আচার্যের জন্ম বা মৃত্যুদিন কোনোটাই নয়, তথাপি তাঁকে নিয়ে নাড়াচাড়া করার খেয়ালটা হঠাৎই মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন সেই রবীন্দ্রনাথই! বিগত দেড়-দুবছর ধরে অনেক অলস মুহূর্তের সঙ্গী হিসাবে অগত্যা নানা অপথ্যে যখন ক্লান্ত হয়ে যাই তখন রবীন্দ্রনাথ ছাড়া ‘আর তো গতি নাহি রে মোর নাহি রে’ । জীবনের উপান্তে বসে তাঁকে নিয়ে পরিকল্পনাহীন আর এলোপাতাড়ি নাড়াচাড়াটাই দেখছি অবিকল্প । এমন করেই সম্প্রতি চোখ হঠাৎ আটকে গেল ‘শেষের কবিতা’র সেই পাতাটায় যেখানে সুনীতিকুমারের পরিচয়টা অক্ষয় হয়ে আছে ।
উপন্যাসের ‘সংঘাত’ পরিচ্ছদে বর্ণনাটা এমন – “অমিত সবাইকে বলে গিয়েছিল, সে শিলঙে যাচ্ছে নির্জনতা ভোগের জন্যে – দুদিন না যেতেই বুঝলে, জনতা না থাকলে নির্জনতার স্বাদ মরে যায় । ক্যামেরা-হাতে দৃশ্য দেখে বেড়াবার শখ অমিতের নেই । সে বলে, আমি টুরিস্ট না, মন দিয়ে চেখে খাবার ধাত আমার, চোখ দিয়ে গিলে খাবার ধাত একেবারেই নয় ।
কিছুদিন ওর কাটল পাহাড়ের ঢালুতে দেওদার গাছের ছায়ায় বই পড়ে পড়ে । গল্পের বই ছুঁলে না, কেননা, ছুটিতে গল্পের বই পড়া সাধারণের দস্তুর । ও পড়তে লাগল সুনীতি চাটুজ্জের বাংলা ভাষার শব্দতত্ত্ব, লেখকের সঙ্গে মনান্তর ঘটবে এই একান্ত আশা মনে নিয়ে । এখানকার পাহাড় পর্বত অরণ্য ওর শব্দতত্ত্ব এবং আলস্য-জড়তার ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ সুন্দর ঠেকে… ” । এখন কবি-কল্পনায় তো অমিত রায় সাধারণের পর্যায়ে পড়ে না, তাই সুনীতি চাটুজ্জের সঙ্গে মনান্তরকে ঘিরেই তার যত উৎসাহ আর ভাবনার খোরাক । কিন্তু তেমন ভাবনা তো আমার মতো ‘সাধারণের দস্তুর’ নয়; তথাপি বিভিন্ন প্রাজ্ঞ মানুষের মাধ্যমে জানবার অবকাশ ঘটেছে যে, কোনো গভীর তত্ত্বকে এড়িয়ে আচার্য সুনীতিকুমারের মধ্যে সাধারণ মানুষেরও ভাবনার বিষয় রয়েছে । পাণ্ডিত্য তাঁকে জীবনবিমুখ করেনি; বরং তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নানা দিক দিয়ে আমাদের উজ্জীবিত করার রসদ রয়েছে । এখানে আচার্য সুনীতিকুমার সম্পর্কে বাংলার তিন বরেণ্য মানুষ – আচার্য সুকুমার সেন, সত্যজিৎ রায় এবং নারায়ণ সান্যালের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কিছু অংশকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত ।

সুকুমার সেন (দিনের পরে দিন যে গেল – ১)
শান্তিনিকেতনে তিনচার মাস গতায়ত করে সেখানকার শিল্পী ও পণ্ডিতদের সঙ্গে সুপরিচিত হলুম । সুনীতিবাবুর সঙ্গেও অন্তরঙ্গতা বাড়ল । তাঁর সহৃদয়তারও পরিচয় পেলুম । সেবার ৭ই পৌষের সময় আমরা সেখানে ছিলুম । বেজায় শীত পড়েছিল । কলকাতা থেকে অনেক অতিথি গিয়েছিলেন তাই আমার শোবার ব্যবস্থা হয়েছিল দোতলার পশ্চিমের বড়ো ঘরটিতে মেঝেয় ঢালাও বিছানা । আমার গায়ে দেবার ছিল একখানি পাতলা রাগ যা ঘোড়ার গায়ে দেওয়া হয় । সেটটি জড়িয়ে কুঁকড়ি মুকড়ি হয়ে শুয়ে পড়লুম । ভাবলুম শীতের চোটে রাত্রিতে বোধহয় ঘুম হবে না । কিন্তু ঘুমিয়ে পড়লুম অঘোরে । সকালে ঘুম ভাঙতে দেখলুম আমার পাতলা কম্বলের উপরে একটা বড়ো মোটা কম্বল চাপানো হয়েছে । বুঝলুম শীতের কাণ্ড ও আমার কুকুর কুণ্ডলী দেখে সুনীতিবাবু রথীবাবুর ভাণ্ডার থেকে মোটা রাগ আনিয়েছিলেন ।
একবার শান্তিনিকেতন থেকে আসবার সময়ে আমি সুনীতিবাবুর কাছ থেকে একটা টাকা নিয়েছিলুম ভাঙানি ছিল না বলে । ফেরবার সময়ে আমি বর্ধমানে নামব । টাকাটা সুনীতিবাবুর প্রয়োজন । আমি সে কথা ভুলে গেছি । সঙ্গে আমার বন্ধুবান্ধব আছেন । তাঁদের সামনে টাকাটা চেয়ে নেওয়া অশোভন হবে । তাই বর্ধমানে ট্রেন থামবার আগে সুনীতিবাবু আমাকে বললেন আবেস্তার ভাষায় – যাতে কেউ না বুঝতে পারে -, ‘অএবম্ এরেজতম্ দজদী’ (অর্থাৎ, একটা টাকা দাও) । আমি লজ্জিত হয়ে তখনি টাকাটা দিলুম । আমার মনে হয় না বর্তমান শতাব্দীতে আর কোন ব্যক্তি প্রাচীন ইরাণের বেদ-স্থানীয় আবেস্তার ভাষায় উপস্থিত প্রয়োজনে কথা বলেছেন ।

সত্যজিৎ রায় (সমসাময়িক দৃষ্টিতে সুনীতিকুমার, এপ্রিল ১৯৮৫)
সুনীতিকুমার আমার পিতৃবন্ধু ছিলেন । দুঃখের বিষয় সুনীতিকুমারের সঙ্গে আমার সামনাসামনি সাক্ষাৎ হয়েছে মাত্র তিনবার । প্রথমবার প্রায় চল্লিশবছর আগে । … সেবার পাটনার বিচক্ষণ অধ্যাপক শ্রী রঙিন হালদারের সঙ্গে তাঁকে গুরুগম্ভীর বিষয়ে আলোচনা করতে দেখে আমার কিশোর মনে তাঁর পাণ্ডিত্য সম্পর্কে বিশেষ সম্ভ্রমের ভাব জেগেছিল ।
দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ বছর পনেরো আগে । রাজভবনে তাঁর সঙ্গে আমার নিমন্ত্রিত হবার সৌভাগ্য হয়েছিল কোনও এক বিশেষ উপলক্ষে। সেবার তাঁকে দেখেছিলাম গ্রিসের রানির সঙ্গে গ্রিক ভাষায় কথা বলতে, যদিও রানি তাঁর কথা বুঝতে পারেননি, কারণ সুনীতিকুমার যে ভাষা ব্যবহার করেছিলেন তাছিল আরিস্ততলের আমলের ভাষা। এ-ভাষা একজন বাঙালি অধ্যাপকের মুখে শুনে গ্রিস-সম্রাজ্ঞীর বিস্ময়বিমুগ্ধ দৃষ্টি আমার এখনও মনে আছে ।
তৃতীয় এবং শেষবার সুনীতিবাবুকে দেখি মাত্র এক বছর আগে । এবারে একটি বক্তৃতায় পাণ্ডিত্য ছাড়াও তাঁর চরিত্রের অনেকগুলি দিকের – বিশেষত তাঁর তীক্ষ্ন রসবোধের – পরিচয় পেয়েছিলাম ।
যে মনীষী পুরাতত্ত্বের চর্চায় তাঁর সমস্ত জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি নিজেকে শেষ বয়স পর্যন্ত কীভাবে এত সতেজ ও নবীন রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন সেটা আমার কাছে একটা পরমাশ্চর্যের বিষয়।

নারায়ণ সান্যাল (পঞ্চাশোর্ধে)
পঁচাত্তর সালের ফেব্রুয়ারী মাসের কথা । বড় মেয়ের বিয়েতে আচার্য সুনীতিকুমার এসেছিলেন আমার বাড়িতে পদধূলি দিতে । সেই গল্পই বলব এখন । বর আসার কথা গোধূলি-লগ্নে, মানে সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ । প্রথম ব্যাচ খেতে বসবে আন্দাজ সাতটায় । সেই মর্মেই আমরা তৈরী হচ্ছি । হঠাৎ কে এসে বলল, নিচে একটি গাড়ি এসেছে । তাতে আচার্য সুনীতিকুমার এসেছেন । তখন বেলা পাঁচটা । … আমাকে দেখতে পেয়েই বললেন, সন্ধ্যা সাতটায় একটা ‘বক্তিমে’ আছে; অথচ একবার ‘ঢুঁ’ মেরে না গেলেও চলে না । কই মেয়ে কোথায়? ওঁর হাতে খানদুই বই, ফিঁতে দিয়ে বাঁধা । ওঁরই লেখা গ্রন্থ । আশীর্বাদ করবেন বই দিয়ে । আমি ওঁকে বসিয়ে ভিতরে খবর দিতে গেলাম ।… এসে দেখি আমার দাদা, ভায়েরাভাই ইত্যাদি সবাই সুনীতিকুমারকে ঘিরে জমিয়ে বসেছেন । উনিও বেশ জাঁকিয়ে গল্প ফেঁদেছেন । দাদা ওঁকে বললেন, রান্না এখনও সব হয়নি, যা হয়েছে সামান্য কিছু নিয়ে আসি ?
- আনুন । অল্প অল্প করে । চেখে দেখি ।
সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেলাম । বিজলী গ্রিলের ম্যানেজার ভদ্রলোক অতি অমায়িক । … আমাকে উঠে আসতে দেখে ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন, বলুন স্যার ? - দেখুন, আমার একজন অতি বিশিষ্ট নিমন্ত্রিত ভদ্রলোক এসে পড়েছেন । আপনার কি কি রান্না হয়েছে বলুন তো? একটা প্লেটে সাজিয়ে দিন, আমি নিয়ে যাই । …
- তবে স্যার খানকয়েক রাধাবল্লভী, মাংস আর ফিস ওলী নিয়ে যাই ?
- ফিস্-এর কি ?
- আজ্ঞে ‘ফিস্ ওলী’ !
সেটা কি বস্তু জানা ছিল না । মেনুটা স্থির হয়েছে আমার অজান্তে । ‘ফিস্ ওলী’ নিশ্চয় কোন আধুনিক সুখাদ্য হবে । অজ্ঞতা প্রকাশ হয়ে যাবার ভয়ে আমি হেসে বলি, ও ফিস্ ওলী । তাই বলুন ।
একটু পরে একটি থালায় আহার্য সাজিয়ে ভদ্রলোক নিচে নেমে এলেন । মেজদি নিরামিষ হেঁসেল থেকে পৃথক পাত্রে দই মিস্টি নিয়ে এলেন । সুনীতিকুমার বললেন, এত কে খাবে ? …
হঠাৎ সুনীতিকুমার একটি ভোজ্যদ্রব্যের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে বললেন, ওটা কি ?
দাদা, মেজদা দুজনেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করেন । আমি সদ্যলব্ধ জ্ঞানটা বিতরণের এমন সুযোগটা হেলায় হারাতে রাজী নই । বললুম ওটা ইয়ে স্যার, ফিস্ ওলী ।
- ফিস্-এর কি ?
- আজ্ঞে ফিস্ ওলী ! মানে ও’লী ! মানে ফিস্-এর ‘ওলী’ আর কি !
সুনীতিকুমারের চর্বনকার্য বন্ধ হল । সোজা হয়ে বসলেন । বললেন, ফিস্-এর ওলী মানে কি ? কোন দেশী খাবার ?
আমার বিদ্যে ফুরিয়েছে । বিজলী গ্রিলের ম্যানেজারের দিকে করুণনেত্রে আমাকে তাকাতে হল । সে ভদ্রলোক বললেন, ভেটকি মাছের ফিস্ ওলী স্যার । ইয়ে… মানে, ফিস্ ওলি !
- বানান কি ?
ম্যানেজার ভদ্রলোক গলার টাইটা একটু আলগা করে দিয়ে বললেন, ‘ও’ আর ‘লয়ে দীর্ঘঈ’ ।
সুনীতিকুমার গম্ভীর হয়ে বললেন, সেটা তো সাত্রাগাছীর ওল ‘স্ত্রীয়াম ঈপ্’ । আমি রোমান হরফে বানানটা জানতে চাইছি ।
ম্যানেজার এবার নিজেই অজ্ঞতা স্বীকার করে বললেন, ঠিক জানি না । বোধহয়, OLEE । শুনেছি জার্মান,… না জার্মান নয়; ফ্রেঞ্চ ডিস্ ।
সুনীতিকুমার হাত গুটিয়েছেন । বললেন, উঁহু । জার্মান ভাষায় ভাজাকে বলে gebacken অথবা gebraten; ফরাসী ভাষায় ভাজা মাছ হচ্ছে frit poisons । ‘ওলী’ তো জার্মান-ফরাসী খাদ্য তালিকায় নেই । ‘ওলী’ শব্দটা কোথা থেকে এল ? মাথায় উঠল খাওয়া । উনি আরও ভেবে বললেন, স্প্যানিশ ভাষায় যতদূর মনে পড়ছে মাছ ভাজা হচ্ছে frito pescado – ইতালিয়ান ভাষায় fritte pesce । Olee কোথা থেকে এল ?
আমার মেজদা নিরুপায় হয়ে বললেন, আজ্ঞে আপাতত এল রান্নাঘর থেকে । স্রেফ ‘মাছ-ভাজা’ বলেই ধরে নিন না । ব্যুৎপত্তিগত না হক, উৎপত্তিগত হদিশটা তো পেলেন ।
সুনীতিকুমার ওঁর সরল রসিকতায় খুশি হলেন । জবাবে বললেন, তাই বলুন ! মাছ ভাজা ! ওলী নয় ! তাহলে ওপিঠটা খাওয়া যেতে পারে । ওলীর এ-পিঠ ও-পিঠ কিছুই চিনি না, কিন্তু মাছভাজা উল্টে খেতে জানি।
একটু পরেই বুলবুলি এসে প্রণাম করল ওঁকে । আশীর্বাদ করলেন উনি । মনে মনে । জোরে জোরে বললেও বুঝতুম না অবশ্য । হিব্রু-গ্রীক-লাতিন কী ভাষায় বলতেন কে জানে ?
উনি রওনা হওয়ার পর ‘বিজলী গ্রিল’-এর ম্যানেজার আমাকে প্রশ্ন করেন, উনি কে স্যার ?
বললুম আমাদের জাতীয় অধ্যাপক আচার্য সুনীতিকুমার । ভাষাবিদ ।
ম্যানেজার বললেন, আর ক’জন এমন ভাষাবিদ আপনার নিমন্ত্রিত আছেন স্যার ?
বললুম, না, আর কেউ নেই । আপনি এরপর নির্ভয়ে ‘ফিস্ ওলী’ চালাতে পারেন ।
ভদ্রলোক রসিক । বললেন আজ্ঞে না, আর ভয়ের কি আছে ? এখন জানাই হয়ে গেছে – উৎপত্তিগত হদিসঃ রান্নাঘর ! আর বুৎপত্তিগতঃ সাত্রাগাছীর ওল স্ত্রীয়াম্ ঈপ !


বড় মানুষের এমন রসস্নিগ্ধ গল্প, শুনতেও ভাল লাগে।