
যে পথ সকল দেশ পারায়ে উদাস হয়ে যায় হারায়ে
১.
জ্ঞানদানন্দিনী দেবী গিয়েছিলেন যশোরের নরেন্দ্রপুরে । তাঁর বাপের বাড়ির দেশ । সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিদাদা, নতুন বৌঠান, সুরেন-বিবি এবং তাঁর ছোটো দেবর। দেবরটির বয়স তখন বাইশ । বিলেতফেরত এবং বেশ খ্যাতিমান লেখকের স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন ইতোমধ্যে। কিন্তু তাঁর পিতৃদেব বিশেষ শংকিত তার নানা বিষয়বুদ্ধিরহিত কার্যকলাপে । মেজবৌঠানকে তিনি আদেশ করেছিলেন যতো শীঘ্র সম্ভব দেবরটিকে বিবাহ দিয়ে বিষয়সংসারে লিপ্ত করার প্রয়াস করতে । পিতৃদেবের আর কী দোষ? অতো বিশালমাপের ভূসম্পত্তি দেখাশোনা করার লোক পাওয়া যাচ্ছেনা । বড়ো ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথ প্রতিভা ও পাগলামির সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকেন । এলেমদার মেজোছেলে সরকারি চাকরি নিয়ে সুদূরবাসী । সেজোছেলে হেমেন্দ্রনাথ ছিলেন পিতার দক্ষিণ হস্ত। কিন্তু তিনিও মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে গতায়ু হলেন। রবি তখন একুশ পূর্ণ করেছেন। । বীরেন্দ্রনাথ আর সোমেন্দ্রনাথ বদ্ধ উন্মাদ । আর জ্যোতিদাদা পিতামহের মতো ব্যবসায় বিশ্বাস করেন, জমিদারিতে নয় । গান-বাজনা-নাটক-কবিতা ইত্যাদির ফাঁকে যে সময়টুকু বাঁচে সেটুকু দিয়ে ব্যবসা চালানোর মতো বিষয়বুদ্ধি তাঁর নেই । শেষ পর্যন্ত ভরসা রবীন্দ্র । কিন্তু তিনিও নির্ঝরের স্বপ্নে মশগুল । এমতাবস্থায় তাঁকে বিয়ে দিয়ে সংসারী না করলে জমিদারি তো প্রায় গোল্লায় যায় । অতএব সব পাতি বাঙালি বাপ-মায়ের মতো মহর্ষিও রবি’র আশু বিবাহ দিতে অগ্রণী হলেন । কিন্তু সেই চিরকেলে বল্লালি বালাই। একে বেম্ম তায় পিরিলি । সারা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কুলগৌরবের শ্রেষ্ঠতমা কন্যাটি যাঁকে পেলে ধন্য হয়ে যাবে, তাঁর জন্য মেজোবৌঠান হন্নে হয়ে গন্ডগ্রামের আট বছরের একটি শিশুকন্যাকে খুঁজে যাচ্ছেন । কিচ্ছু চাইনা, শুধু মেয়ে হলেই হলো । দু’চারটি দেখেছেনও, কিন্তু এতো নীরেস । রবি তো দূরের কথা, তাঁর নিজের পক্ষেও একেবারে নৈরাশ্যজনক । এদিকে কলকাতায় ফেরার সময় এগিয়ে আসছে । এই সময় তাঁদের দর্শন করতে আসেন জোড়াসাঁকোর সেরেস্তার একজন কনিষ্ঠ কেরানি বেণীমাধব রায় । তিনি তাঁর বয়স্থা কন্যাটিকে (বয়স নয় বছর) পাত্রস্থ না করতে পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে লম্বা ছুটি নিয়েছেন । একটা হেস্তনেস্ত করেই ফিরবেন এবার । করজোড়ে, বিগলিত বিনয়ে তিনি কর্তাদের আমন্ত্রণ করলেন তাঁর গৃহে একবার পদধূলি দিতে । জানেন না কর্তারা আদৌ রাজি হবেন কি না । জ্যোতিদাদা বললেন, বেশ যাবো একবার । পরদিন সবাই মিলে গেলেন বেণীমাধবের গৃহে । বেণীমাধব কীভাবে আপ্যায়ন করবেন ভেবে পাননা । কন্যা ভবীর উপর ভার দিয়েছেন অতিথিদের মিষ্টান্ন পরিবেশন করতে । সেই শ্যামলী নয় বছরের বালিকাটির অবস্থাও তথৈবচ । এতোজন রাজাগজাকে কীভাবে আদর করতে হবে সে কিছুই জানেনা । যাই হোক মেজোবৌঠান ভবীকে দেখে তাঁর স্কন্ধলগ্ন ভারটি থেকে মুক্ত হবার একটা উপায় খুঁজে পেলেন । জ্যোতিদাদা একটু আপত্তি করেছিলেন। কারণ তাঁর স্ত্রীও ঠাকুরবাড়ির মিষ্টান্নপরীক্ষকের (কিঞ্চিৎ সম্মানিত পরিচারকই বলা যায়) পৌত্রী।
আন্না তরখড়, স্কটবোনেদের সঙ্গ করে আসা রবি কিছুতেই রাজি নয় । শেষে মহর্ষি তাঁকে মুসৌরিতে ডেকে পাঠালেন । সোজা ভেটো, তোমাকে ঐ মেয়েকেই বিবাহ করে বিষয়কর্মে মনোসংযোগ করতে হবে । ওসব গানবাজনা, গদ্যপদ্য অনেক হয়েছে । কত্তাবাবার ইচ্ছাই আইন । সেই ভবী ওরফে ভবতারিণী একটি ‘কাপড়ের পুঁটলি’র রূপ নিয়ে বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী হয়ে জোড়াসাঁকোতে পদার্পণ করলেন । আসলে বেণীমাধবের ঘরভাড়া করে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সঙ্গতিও ছিলোনা । তাই বিবাহটিও ঠাকুরবাড়িতেই সম্পন্ন হয়েছিলো । সেখান থেকে ‘ভাই ছুটি’ একটি ইতিহাস ।

২.
‘নতুন বাড়ি’ বলে তিনটি খড়ছাওয়া কুঁড়েঘরের যে আশ্রয়টি রয়েছে, সেখানে আমরা দাঁড়িয়ে এই সব সাতপাঁচ ভাবছিলুম । ব্রহ্মচর্যাশ্রমের সব ছাত্র, শিক্ষক আর অন্য সব আশ্রমিকদের জন্য সারা দিনরাত কাঠের উনুনে তিনি রান্না করে যেতেন । পাচক রাখার সঙ্গতি ছিলোনা তখন । ছেলে রথী লিখেছেন, মায়ের সম্ভবত কালাজ্বর হয়েছিলো। সারাদিন গরমে, ধোঁয়ায় পাকশাল সামলাতে সামলাতে তাঁর অত্যন্ত স্বাস্থ্যহানি হয়েছিলো। রোগের ধকল আর সামলাতে পারেননি । এই নতুনবাড়িটি (বস্তুত নিতান্ত মাটির কুঁড়েঘর) তৈরি করা হয়েছিলো তাঁর জন্যই। রোগমুক্তির পর যখন তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে আসবেন, তখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে যাতে একটু শান্তিতে থাকতে পারেন । সেই ফিরে আসা আর হয়নি । ছোটো বৌয়ের ‘নতুন’বাড়ি তাঁর জন্য নতুনই থেকে গেছে । দুদিকে এক কামরার দু’টি ঘর আর মাঝখানের একচিলতে উঠোনের পিছনে আরেকটি মাটির ঘর । প্রিন্স দ্বারকানাথের পৌত্রবধূর না-দেখা আশ্রয় । ঠিক তার পাশেই বেশ বড়ো দেহলি বাড়ি । কবি সেখানে থেকেছেন বহুদিন । ঐ দেহলি বাড়ির সামনেই তো মুজতবা আলিসাহেবের মরাঠি বন্ধু ভান্ডারে, কবিকে দরবেশ ভেবে জোর করে পুরো অঠন্নি বকশিস দিয়ে এসেছিলো । দেহলি বাড়িতে এখন একেবারে ছোটোদের জন্য চলে আনন্দ পাঠশালা, সুন্দর বাগান দিয়ে ঘেরা।

খড়ে ছাওয়া আরেকটি বড়ো মাটির বাড়ি রয়েছে চৈতীর সামনে, পাঠভবনের দিকে যেতে । নাম বেণুকুঞ্জ । বিয়ের পর রথীন্দ্রনাথ সেখানে কিছুদিন প্রতিমাদেবীর সঙ্গে বাস করেছিলেন । পরবর্তীকালে পন্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী, দীনবন্ধু এন্ড্রুজও থেকেছেন সেই বাড়িতে। তার ঠিক পাশেই রয়েছে, যে মানুষটির দৌলতে আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ধরাছোঁয়ার মধ্যে পেয়েছি, সেই দিনেন্দ্রনাথের দোতলা বাড়ি ‘দিনান্তিকা’ । এই বাড়িটির স্থাপত্য ষড়ভুজ দেওয়ালের কাজ ।দিনের শেষে শান্তিনিকেতনের সব অধ্যাপকদের চা-চক্র বসতো এই বাড়িটির বারান্দায় । কে আসতেন না সেখানে ?

সেখান থেকে দক্ষিণে পাঠভবনের দিকে একটু এগোলেই ডানদিকে একটি খোলা জায়গা । বিখ্যাত গৌরপ্রাঙ্গন । আশ্রমের আদিযুগের শিক্ষক গৌরগোপাল ঘোষ মশায়ের নামে । এখানেই আশ্রমের ছেলেরা খেলাধুলো করতো প্রথম যুগে । মাঠের পাশেই জমকালো রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিংহসদন । কবির বন্ধু রায়পুরের জমিদার লর্ড শ্রীনাথ সিংহের অর্থানুকূল্যে তৈরি হওয়া একটি প্রাসাদ । সেখানের সভাগৃহটিতে মহাজনসম্মিলন হয়েছে অসংখ্যবার । ১৯৪০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন এই বাড়িটিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেই উপলক্ষে তাঁরা সর্বোচ্চ সম্মানসূচক ডি লিট উপাধি দিয়েছিলেন কবিকে। তাঁদের পক্ষ থেকে এসেছিলেন সার মরিস গয়্যার এবং সর্বেপল্লী রাধাকৃষ্ণন । এই ভবনটির দুদিকে আছে পূর্বতোরণ আর পশ্চিমতোরণ । তিনটি হর্ম্যের সামগ্রিক স্থাপত্য নতুন ধরণের ইন্দো-ইস্লামিক পদ্ধতির । শান্তিনিকেতনে ভারতীয় স্থাপত্যের নানা রূপ নিয়ে যেসব পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছিলো, সিংহসদন চত্বরেই তার সূচনা । সিংহসদনের ঘন্টাঘর থেকেই শান্তিনিকেতনের সময় বাঁধা হয় ।

কলকাতায় ছিলো ‘বাবু’ কালচার , শান্তিনিকেতনে শুরু থেকেই ‘দাদা’ কালচার । সম্ভবতঃ কবি নিজে, অবনীন্দ্রনাথ আর দু’য়েকজন ‘কড়া’ শিক্ষক (যেমন জগদানন্দ প্রমুখ) ছাড়া সবাই ‘দাদা’গিরির অংশ ছিলেন । শান্তিনিকেতনের গৌরব ছিলো না ইঁটকাঠ, ধুলোমাটি, কুবেরযক্ষের মেহরবানি । সেখানে ছিলো শুধু এক দল মানুষ , যারা দায়িত্ব নিয়েছিলো সারা বিশ্বে বাংলাভাষায় বেঁচে থাকা মানুষদের জীবনে একটা নতুনধরনের সেরিব্রাল মাত্রা যোগ করার। এই মাত্রাটির দৌলতেই বাংলাভাষীরা দীর্ঘদিন ধরে বোধবুদ্ধির জগতে অন্যান্য দেশবাসিদের থেকে নিজেদের উৎকৃষ্ট ভাবার অহংকার করে এসেছে। প্রাথমিকভাবে উৎসটি ছিলো দ্বারকানাথের দুই পুত্রের দেহকোষে ওয়াটসন-ক্রিক সাহেবের নক্শায় আঁকা কিছু প্রোটিনের কারিকুরি । কালক্রমে সেই সব সংক্রামক প্রোটিনশৃঙ্খলের জাদু ছড়িয়ে পড়েছিলো যতোসব মরা গাছের ডালে ডালে, আকাশে হাততোলা আগুনের মতো । পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসে, কোনও জাতির সমগ্র সাংস্কৃতিক চেতনায়, একটি মাত্র পরিবার থেকে স্ফূরিত এই জাতীয় বন্ধহীন প্রভাবী দিগদর্শনের নমুনা আর দেখা যায়না । সেই পরিবারটির বাইরে আরো যে সমস্ত মহৎ মননশীল অস্তিত্ত্বগুলি সেই ধারাটিকে শুধু ধরে রেখেছিলো তাই নয়, তাকে ক্রমাগত পরিবর্ধন, পরিমার্জনও করেছিলো, তাঁদের সিংহভাগ একসময় এই ছোট্টো ভূখন্ডটিতেই নিজেদের উপনিবেশ গড়ে তুলে ছিলেন । তাঁরাই ছিলেন শান্তিনিকেতনের আসল সম্পদ, বুনো রামনাথের ব্রাহ্মণীর হাতে লালসুতোর মতো গর্বিত অলঙ্কার । সেই আর্ষরীতির অনুগামী হয়তো এখন অনেক কমে এসেছে, তবু রয়ে গেছেন বেশ কিছু মনস্বী মানুষজন।
৩.
সীমান্তপল্লীর পর মাঝিপাড়া । সেখানে থাকেন এ তল্লাটের আদি অধিবাসী সাঁওতালেরা । কৌম সমাজের কিছু নিয়ম আছে যার উপর ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থার প্রভাব বিশেষ পড়েনি । বিকেল থেকে সাঁঝগড়ানো আলোয় হাঁটছিলুম বাগানপাড়ার দিকে । মোড়ে একটি ছোট্টো ঠ্যালাগাড়ি ছাপ তেলেভাজার দোকান । আমাদের দেশের ভাষায় গুমটি। সামনে ভিড় মন্দ নয় । কড়াইতে টগবগ করছে বাঙালির পাপের ভরা । উঁকি দিয়ে দেখি সাঁওতাল একটি মেয়ে, বড়োজোর বিশ-বাইশ, সেই কর্ত্রী । দু’হাতে কাটাকুটি, ভাজাভুজি করে যাচ্ছে, সঙ্গে দোকানদারিও । যাঁরা বাঙালি খদ্দের, তাঁদের সঙ্গে পরিষ্কার বাংলায় কথাবাত্তাও চলছে । জায়গাটা তো আদত গ্রাম, সব্বাই সব্বাইকে চেনে, হয়তো একটু বেশিই চেনে । তাঁদেরকে বিদায় করে আমার দিকে সপ্রশ্নচোখে তাকায় । নতুন চেহারা, আগে দেখেনি তো । দেখি একদিকে বেগুন ফালি করে রাখা আছে । প্রশ্ন করি, বেগনি ভাজবে নাকি? কতোদিন বাইরে এসব কুখাদ্য খাইনি। সুনীলের ভাষায় প্রবাসে সকলই চলে । মেয়েটি বলে, দাঁড়াও, এদেরকে ভাগিয়ে তোমায় দিচ্ছি । দেখি তিন-চারটি ছোকরা, বাইকে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছে । মেয়েটি তার বারকোশ থেকে বেশ কয়েকটা ঠোঙা বের করে ছেলেগুলোকে ডাকলো । ওরা সাঁওতালিতে কথা বলছিলো, আমি বুঝতে পারছিলুম । ছেলেগুলো সন্ধের ঝোঁকে নেশা করবে বলে তেলেভাজা কিনতে এসেছে । মেয়েটি ওদের ঠোঙা সরবরাহ করতে করতে দেখলুম বকাবকি করছে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর মতো । বিষয়, মদ্যপানের কুফল । ছেলেগুলো হেসে গড়িয়ে পড়ছে, যেন এর থেকে বেশি মজার কথা আর কখনও শোনেনি । তার পর মেয়েটি আমার জন্য বেগনি ভাজতে ভাজতে বললো, বলো , মদ কতো সব্বোনাশ করে । আমি বলি , ঠিক । সে আবার বলে, মানুষ নেশা করলে জন্তু হয়ে যায় । আমি আবার বলি, ঠিক। তার পর সে বলে যায়, আমি শুনে যাই । মনে পড়ে যায় আমার সিংভূমে দীর্ঘদিন ধরে দেখা আদিবাসী পুরুষদের হাঁড়িয়া থেকে মৌয়া , মৌয়া থেকে চোলাই, তার পর পঞ্চাশ ফুরোবার আগেই ফুড়ুৎ হয়ে যাওয়া । সেই সব অরণ্যপ্রান্তরের কেতা শান্তিনিকেতনেও ? পরে শুনলুম এখানেও বহু আদিবাসী পুরুষ ইশ্কুলে লেখাপড়া শেষ করেন । বোঝা যায় তারা ধলভূম, কোলহানের ভাইবন্ধুদের থেকে অনেক বেশি আলোকপ্রাপ্ত । কিন্তু রক্তের বীজকে উপড়াতে পারেননি। তাঁদের গ্রামকে ঘিরে ফেলেছে বাঙালি মধ্যবিত্তদের রুচিশীল, স্বচ্ছল গোষ্ঠীর একটা বড়ো অংশ । তাঁদের সঙ্গে নিত্য বিনিময়, তবু অন্ধকারের শক্তি কী ব্যাপক।
পরে শুনলুম ঐ মেয়েটিকে নিত্য তার নেশাড়ু স্বামী মারধোর করে । আবার ইভনিং শো’তে বাইকে করে সিনিমা দেখাতেও নিয়ে যায় ।

শিল্পের ইতিবাচক মূল্য নিয়ে আবহমানকাল ধরে সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি কথা লেখা হয়েছে। বলা হয়েছে আরও বেশি । যাঁরা জানেন, তাঁরাই জানেন। বাঙালির ‘সিলপোসাধনা’ এক অন্যমেরুর উপলব্ধি । অন্যান্য অনেক দেশবাসির মতো বাঙালি, শুধু ধর্ম অথবা শুধু জিরাফ নিয়ে তৃপ্ত থাকতে পারেনা । এমনকি পেশাদার রাজনীতিকদেরও ‘সৈল্পিক’ ইসে থাকতে হয় । ভোটে জিতে মন্ত্রী হতে গেলেও তাকে রেনোয়ার মতো ছবি আঁকতে হবে। রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘জানতে’ হবে। । শত শত ‘পদ্যে’র বই ছাপতে হবে। ‘ধনধান্যপুষ্পে ভরা’ রবীন্দ্রসঙ্গীতটি মুখস্থ করতে হবে। ভোটের চীৎকৃত আসরে গুর্বরকে নিয়ে গেন্ডুয়া খেলতে হবে। শরীরে একফোঁটা শিল্পীসুলভ মেধা, রুচি বা সম্ভ্রমবোধের রেশ না থাকলেও হবে। মাথায় কার্বন ডাই অক্সাইড বা পবিত্র গোময় ভরা থাকলেও চলবে। কিন্তু বাঙালির ‘প্রবাদপ্রতিম’ সিলপোরুচি বোধের তকমাটি ছাড়া চলবে না। বাবা ড়বিন্দোনাতের উত্তরসূরি না.হলে পাবলিক মানবে না। কীই বা আসে যায়, যখন ‘বোম বোম তাড়কবোম’ই শেষ পর্যন্ত সব সিল্পের উৎস। এলিট, সুশীল, যে গালই দিন না কেন, ইহাই বাঙালির ভিত্তি, ইহাই বাঙালির ভবিষ্যৎ।
বাঙালি বার্মুডা ত্রিভুজটির তিনটি বাহু। পাতি লোকে তার নাম দিয়েছে বকু, তারু আর সন্তু । আপামর বাঙালির সর্বরোগহর বটিকার জোগান দেয় এই ত্রিভুজ । বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম, গঞ্জ, মফস্সল থেকে যেকোন ফাটামস্তান, কাটাগুন্ডা একটা ‘কোচ’বাস ভাড়া করে পুণ্যার্থীদের পাল্কিশুদ্ধু গঙ্গাস্নানের স্টাইলে এই ত্রিভুজদর্শনের ব্যবস্থা করে দেন । সবাই জানেন, তবু একটু ব্যাখ্যা থাক। বকু মানে বক্কেশ্বর, তারু মানে তারাপীঠ এবং সন্তু হলো শান্তিনিকেতন । প্রথম দুটি উদ্দিষ্টের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার মতো পুণ্যস্থানের অভাব নেই ধারে কাছে । কিন্তু বেচারা শান্তিনিকেতনের কপালে এই ত্রিভুজের তৃতীয় বাহু হবার গৌরব লাভ বেশ বিড়ম্বনাজনক । প্রায় প্রতিদিন বকু-তারুতে পুণ্য করে ফেরার পথে সিঁদুরতিলক সহিত বা রহিত অসংখ্য মানুষজন বাসের গর্ভ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে রবিকবির আঁতুড়ঘর, বাসরঘর খুঁজে বেড়ায়, রতনকুঠি থেকে নকল নোবেলের কাচবাক্স পর্যন্ত । বাঙালি হতে গেলে জিরাফ যে কতো প্রয়োজনীয়, কতো অমোঘ ব্যাগেজ, তাঁরা প্রমাণ করতে অতি তৎপর।
একবার এক বসন্ত সকালে ‘শান্তিনিকেতন গৃহ’ থেকে ধীরে ধীরে কলাভবনের দিকে হাঁটছিলুম । দেখি অন্যদিক থেকে ষাট-সত্তর জনের একটি দঙ্গল প্রায় ছুটতে ছুটতে এদিক লক্ষ করে ধেয়ে আসছে । তাদের হাবভাব ভঙ্গির মধ্যে বেশ একটু জঙ্গি মার্কণ্ডেয় পুরাণের ঢং । এই সব জনতাই ব্রিগেডের বাঙালি। ঝান্ডার রং পাল্টে যায়। লোক একই থাকে। সিল্পের পূজারী। বিপ্লবের স্বপ্নে কোনও ব্যতিক্রম নেই। তাঁদের নেতা হঠাৎ থেমে যান। দূরে কিছু একটা দেখিয়ে ভাষণ দিতে থাকেন। কাছে গেলে শোনা যায়, জনতাকে রামকিংকরের ‘কলের ডাকে’র মাহাত্ম্য শোনাচ্ছেন তিনি । বাঁকুড়া জেলায় যে গামছার থেকেও মহীয়ান কিছু, মানে রামকিংকরের মতো ‘কিছু’, উল্লেখ করার মতো রয়েছে, সে কথাই তিনি ব্যাখ্যান করছিলেন । এক মহিলাকে দেশের ভাষায় তাঁর সঙ্গীর প্রতি বলতে শুনলুম, অ্যাতঅ রদ কইর্ছ্যেঁ, চাঁদি ফাটাই দিবেক ইবার, কিন্তুক ইয়ার বকর বকর থাইমতে লারছে । সঙ্গী বিজ্ঞের মতো বললেন, ইটা রবিঠাকুরের ঘর বঠে, বুইঝত্যে লারছিস, কঠিন কান্ডঅ সব….
৪.
সোনাঝুরির খোয়াই পর্যটকদের অবশ্য দর্শনীয় । আদি সোনাঝুরি গাছগুলি সংখ্যালঘু এখন । সামাজিক বনায়নের দৌলতে গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউক্যালিপ্টাস বৃক্ষ । মাঝখানের সমতল ধুলোর আঙিনায় প্রতি শনিবার বসে খোয়াইয়ের হাট । ‘শান্তিনিকেতনী’ ব্র্যান্ড হাতের কাজের সুপার মার্কেট এখন। ঠাকুর মাথায় থাকুন। আমার কলকাত্তাই বন্ধুরা অনেকেই শুধু বাজারহাট করতে আসেন এখানে । গাড়ি করে। দুপুরে বনলক্ষ্মীতে খাওয়াদাওয়া, গাওয়া ঘি’র স্টক বাড়িয়ে, সোজা ‘শনিবারের হাট’। ড্যাঞ্চিবাবুদের মতো কেনাকাটা করেন। প্রাণ ভরিয়ে। অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। পলিটিসিয়ানরা তোলাবাজি করে। ঠাকুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘সত্য যে কঠিন…’ । বাউলব্র্যান্ড রঙচঙে সাজানো মোটিফ-সেলাই জোব্বাও পাওয়া যায় এখানে । একতারা, দোতারা হাতে দাড়ির আড়ালে উৎসুক ওষ্ঠের গানও শোনা যায় । কেউ কেউ ভালোই গা’ন, কিন্তু আসল বাউল-ফকিরদের দেখিনি এখানে । যে পথটি বেয়ে এইখানে পৌঁছোতে হয়, সেই পথটিই আমার মনে হতো কবির কাছে নিয়ে যাবে আমায় । লালমাটির সূর্যাস্ত অ্যাভেনিউ। চোখজুড়োনো দৃশ্যছবি আমাদের রাঢ় বাংলার আনাচেকানাচে দেখতে পাওয়া যায় । তখন এই পথটিকে এক অন্য জন্মের ঝর্ণাতলার নির্জন মনে হতো । এক মরমী বন্ধু বলেছিলেন , এ এক অসম্ভব পথ । সত্যিই, ঐ পথে হেঁটে , ধুলো মেখে, স্বেদসিক্ত হয়ে ফিরে আসার পরেও মনে হয় পথটি নিখুঁত জাদুবাস্তবের পরিভাষা । প্রবলভাবে আছে এখন। নেই হয়ে, আমাদের স্মৃতিতে। সুরুল থেকে প্রান্তিক যাবার সেই পথটি আর নেই।
‘….শালের বনে খ্যাপা হাওয়া, এই তো আমার মনকে মাতায়।
রাঙা মাটির রাস্তা বেয়ে হাটের পথিক চলে ধেয়ে,
ছোটো মেয়ে ধুলায় বসে খেলার ডালি একলা সাজায়–
সামনে চেয়ে এই যা দেখি চোখে আমার বীণা বাজায়॥‘

