
সংস্কৃতিমনস্ক, উদার, বিশ্বনাগরিক বাঙালির স্মৃতির দরজায় মোলায়েম কড়া নেড়ে কয়েকজন বিস্মৃতপ্রায় বঙ্গসন্তানের নাম মনে করার সনির্বন্ধ অনুরোধ নিয়ে এলাম এই লেখাটির মাধ্যমে। অধুনা অনালোচিত, কিছুটা উপেক্ষিতও হয়ত সেই নামগুলি।
যাঁরা জানেন, তাঁদের নতুন করে মনে পড়বে। আর যাঁরা জানেন না, তাঁদের আগ্রহকে উসকে দেবার অভিপ্রায়েই আমার এই লেখা।
১) রামব্রহ্ম সান্যাল

১৮৫৮ সালে বেঙ্গল প্রভিন্সের মুর্শিদাবাদে জন্ম এই পশুবিজ্ঞানীর। বহরমপুর কলেজে পড়াশোনা শেষ করে তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়তে আসেন। স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে পড়া শেষ করতে পারেননি।
হাওড়ার রয়াল বোটানিকাল গার্ডেনের সুপারিনটেনডেন্ট জর্জ কিং সাহেবের সুপারিশে তিনি আলিপুর চিড়িয়াখানার হেডবাবুর কাজে যোগ দেন। ১৮৭৭ সালে তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর চেয়ে উপযুক্ত কোনো ইউরোপীয় প্রার্থী না থাকার সুবাদে, রামব্রহ্ম আলিপুরের পশুশালার হেড কিপার পদে অভিষিক্ত হন। আমৃত্যু সেই পদেই তিনি কাজ করে গিয়েছেন। পশুশালার কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকাকালীনই তিনি Handbook of management of animals in captivity in lower Bengal নামে একটি বই লেখেন। লন্ডনের নেচার পত্রিকায় তাঁর লেখা আলোচিত এবং প্রশংসিত হয়।
পরবর্তীতে তিনি Breeding of animals in captivity বিষয়ে গবেষণা করেন। নেচার পত্রিকায় তাঁর আরো কিছু প্রকাশিত নোটসের হদিশ পাওয়া গেছে।
শেষ জীবনে তিনি ডাক্তার জন অ্যান্ডারসনের সঙ্গে যুগ্মভাবে সাপের বিষ এবং বিষক্ষয়ের ওষুধ আবিষ্কারের সম্ভাবনার ব্যাপারে কাজ আরম্ভ করেছিলেন।
১৮৯৮ সালে তিনি কেমব্রিজে অনুষ্ঠিত জীববিজ্ঞানের চতুর্থ ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেসে আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিরও সদস্য ছিলেন তিনি। কলকাতার ব্রাহ্ম সমাজের অগ্রণী রামব্রহ্ম, ব্রাহ্ম সম্মিলনী সমাজের গৃহনির্মাণের জন্য যথেষ্ট সঞ্চিত অর্থ দান করে গিয়েছিলেন।
১৯০৮ সালে কর্মরত অবস্থায়, ভগ্নস্বাস্থ্য এই মানুষটির প্রয়াত হ’ন।
আলিপুর চিড়িয়াখানার মূল ফটকের উল্টোদিকে সাপের ঘরের গায়ে রামব্রহ্ম সান্যালের নামটুকু কেবল জেগে রয়েছে আজ। আধুনিক বাঙালি তাঁকে চেনে না।
২) অসীমা চট্টোপাধ্যায়

১৯১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন অসীমা চট্টোপাধ্যায়(মুখার্জি)। বাবা ছিলেন চিকিৎসক এবং বিদ্যানুরাগী। তাই যে কালে মেয়েদের হাঁড়ি-হেঁশেল এবং সংসারের জাঁতাকলের বাইরের জগতে পদার্পণ বিরল ছিল, সেই রক্ষণশীল সময়ে অসীমা স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে রসায়ন নিয়ে স্নাতক হওয়ার পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জৈবরসায়নে স্নাতকোত্তর এবং ডিএসসি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনিই বিজ্ঞানের কোনও শাখায় ভারতের প্রথম মহিলা ডক্টরেট।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে কাজ করেছেন অসীমা। তাঁর কাজের বিচরণক্ষেত্র ছিল ওষধি-উদ্ভিদ এবং নানা রোগে সেই উদ্ভিদ থেকে নিষ্কাশিত বিভিন্ন উপক্ষারের উপযোগিতা। ম্যালেরিয়া, মৃগীরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এমন কি ক্যানসার কেমোথেরাপির গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর কাজের গুরুত্ব অপরিসীম।
তিনি দীর্ঘদিন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে অধ্যাপনা করেন। তাঁরই হাত ধরে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে রসায়ন বিভাগের উদঘাটন হয়। অসীমা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ স্কলার ছিলেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে খয়রা অধ্যাপকের চেয়ার অলংকৃত করেছিলেন প্রায় কুড়ি বছর ধরে।
শান্তিস্বরূপ ভাটনগর, সিভি রামন এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় পুরস্কারে ভূষিত অসীমা ১৯৭৫ সালে পদ্মভূষণ সম্মান লাভ করেন।
২০০৬ সালে তাঁর প্রয়াণ হয়।
বিজ্ঞানমনস্ক, গ্লোবাল বাঙালির স্মরণে, মননে কি আছেন অসীমা চট্টোপাধ্যায়? জানা নেই।
৩) রাজলক্ষ্মী ভট্টাচার্য

শিক্ষিত বাঙালি আশাপূর্ণা দেবী, মহাশ্বেতা দেবীর নামের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু কতজন রাজলক্ষ্মী দেবীর সম্পর্কে অবগত আছেন আমার জানা নেই।
১৯২৭ সালে জন্ম এই বাঙালি বিদূষীর। অধ্যাপনা করেছেন খড়গপুর আইআইটি-তে, পুনের ফার্গুসন কলেজ ও নওরোজজি ওয়াদিয়া কলেজে। বিষয়- দর্শন। লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। আশির দশকে দেশ-এ ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছে উপন্যাস লাজুকলতা। রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুপম অনুবাদ করেছেন, ১৯৯১তে ইণ্ডিয়ান পোয়েট্রি সোসাইটি এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত নিখিল ভারত কাব্য প্রতিযোগিতায় লাভ করেছেন প্রথম স্থান – তাঁর কবিতা ‘পুনর্নবা’-র জন্য।
এই নিজভূমে উপেক্ষিতা বিদগ্ধ নারীর জন্য আমার প্রণাম রইলো। আপনাদের তরফেও।
৪) ডঃ ভূমেন্দ্রনাথ গুহরায়

১৯৩৩ সালে মধ্যপ্রদেশের বিলাসপুরে জন্ম এই বিশিষ্ট হৃদশল্যচিকিৎসকের। ১৯৫৯এ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার পিজি হাসপাতালে প্রথম পরীক্ষামূলক ওপেন হার্ট সার্জারি করেন তিনি। মানুষ নয়, একটি কুকুরের উপরে। এরও তিনবছর পরে, ১৯৬২তে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম সফল হার্ট বাইপাস অপারেশন সম্পন্ন হয় তাঁর হাতে – পিজি হাসপাতালেই। খুলে যায় করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফটিং বা CABG-র ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত।
আরও পরে ডক্টর গুহরায়ের তত্ত্বাবধানে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ডেভিড হেয়ার ব্লকে তৈরি হয় কার্ডিওথোরাসিক অ্যাণ্ড ভাস্কুলার সার্জারি ইউনিট, CTVS — এখনও মাসে গড়ে কুড়ি বাইশটি বাইপাস সার্জারি হয়ে চলেছে সেই ইউনিটে।
নিরলস চিকিৎসক ব্যতিরেকেও ডক্টর গুহরায়ের আরো একটি পরিচয় ছিল। তিনি মরমী কবি ছিলেন। আশি-নব্বইয়ের দশকে তিনি নিয়মিত লিখেছেন ‘কৃত্তিবাসে’। সম্পাদনা করেছেন ‘ময়ূখ’ পত্রিকা। অনুবাদ করেছেন সাফো। অপ্রকাশের অন্ধকার থেকে তুলে এনেছেন জীবনানন্দের অজানা লেখা – কবিতা, ছোটোগল্প, উপন্যাস। তাঁরই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলি। ২০০৫এ পেয়েছেন রবীন্দ্র পুরস্কার। অবশেষে ২০১৫ সালে তাঁরই হাতে গড়া মেডিক্যাল কলেজের সিটিভিএসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ভূমেন্দ্র গুহ।
শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান বাঙালি কি মনে রেখেছে তাঁকে?
৫) রীতা সেন

নামটা একটুও চেনা লাগল না, ঠিক কিনা? পদবী সেন হলেও ইনি ফিল্মি দুনিয়ার কেউ নন। ১৯৫৪ সালে কলকাতার চেতলায় এক নেহাতই মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম রীতা সেনের।
একটি রক্ষণশীল বাড়ির উঠোন থেকে এশিয়ান অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়নশিপের আঙিনা পর্যন্ত দৌড়টা মোটেও সহজ ছিল না।
১৯৭৯এ টোকিয়োয় আয়োজিত এশিয়ান অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়নশিপে ৪০০ মিটার দৌড়ে রুপো পেলেন রীতা। ১৯৮২র দিল্লী এশিয়াডেও পেলেন রৌপ্যপদক জিতলেন — ৪×১০০ মিটার রিলে রেসে।
মনে রাখতে হবে, রীতা সেনের সাফল্য এমন এক সময়ে, যখন স্পনসর বা আন্তর্জাতিক স্তরের প্রশিক্ষণের বিবিধ সুযোগ সুবিধা ছিল না, ছিল না সক্রিয় সরকারি সাহায্যও।
আমরা জ্যোতির্ময়ী শিকদার, সোমা বিশ্বাস, পিঙ্কি প্রামাণিক, স্বপ্না বর্মণকে পেয়েছি, পেয়েছি দীপা কর্মকারকেও। কিন্তু এই মেয়েদের পূর্বসূরী, যিনি কিছুটা হলেও বাঙালি মেয়েদের অ্যাথলেটিক্সে কেরিয়ার তৈরির রাস্তা দেখিয়েছিলেন, পি টি ঊষার স্মরণীয় আন্তর্জাতিক সাফল্যেরও আগে, সেই রীতা সেনকে মনে রাখেনি বাংলা।
এমনি করেই আমরা, সংস্কৃতি সচেতন বাঙালিরা বিস্মৃত হয়েছি থিয়েটারের আলোকসজ্জাশিল্পী তাপস সেনকে, মঞ্চসজ্জাশিল্পী খালেদ চৌধুরীকে, ভুলে গিয়েছি প্রথম বাঙালি মহিলা আই এ এস লীনা চক্রবর্তীকে, মনে রাখিনি বিষাদসিন্ধু রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেনকে, কিংবা সার্কাসজনক প্রিয়নাথ বসুকে।
কালচারড বাঙালির বৈঠকী আলোচনায় উচ্চারিত হয় না বিমলকৃষ্ণ মতিলাল, পার্বতী বড়ুয়া অথবা বরুণ সেনগুপ্তের নাম।
তর্পণ কি কেবল মহালয়াতেই হয়? শ্রদ্ধাঞ্জলির জন্য কোনও তিথির প্রয়োজন হয় না।
বাঙালির সংস্কৃতির উপরে বহুজাতিক আগ্রাসন এবং আঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই প্রণম্য বাঙালিদের স্মরণ করুন সকলে। এই গর্বের ঐতিহ্যই যে আমাদের উত্তরাধিকার।
আসুন, সকলে তাকে সযত্নে লালন করি।

