
সময়টা ১৭৮৯ সালের মে- জুন মাসের সন্ধিক্ষণ। লণ্ডনের প্রকৃতি রূপকথার মতো মোহময়। উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তরে ব্লুবেল, টিউলিপ, গোলাপ, ড্যাফোডিল, পিওনি, হলিহক, ভায়োলেট, রডোডেনড্রন এবং আরো কত রঙ-বেরঙের ফুল নীল দিগন্তে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের অশ্রুত গীতিময়তায় পূর্ণষড়জে আনন্দ বসন্ত সমাগমের সুর। তাদের নৃত্য ভঙ্গিমায় দিনে রাতে আলো ও ছায়ার এক অদ্ভুত কাব্যিক মেলবন্ধন।
সমস্ত শহর যেন জীবন্ত ফুলেদের রঙিন ক্যানভাস। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে নাগরিকগণ রাস্তায়, পার্কে, কেউ প্লেজার গার্ডেনগুলিতে, কেউ চেলসি ফিজিক গার্ডেনে আবার কেউ কিউ-এর রয়্যাল বোটানিক্যাল গার্ডেনসে।
ঠিক সেই সময়ে চ্যানেলের ওপারে তৈরী হচ্ছিল এক প্রবল আবর্ত যার আলোড়নে বদলে যাচ্ছিল একটা জাতির সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পটভূমি যাকে ইতিহাস মনে রাখবে ফরাসি বিপ্লব নামে। এ ছিল ঠিক সেই সময়, যাকে ৭০ বছর বাদে চার্লস ডিকেন্স তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস A Tale of Two Cities-এর সূচনাতে অননুকরণীয় ভাষাশৈলীতে চিরকালের জন্য অমর করে রাখবেন – “It was the best of times and it was the worst of times, it was the age of wisdom it was the age of foolishness, it was the epoch of belief, it was epoch of incredulity, it was the season of Light, it was season of Darkness, it was the spring of hope, it was the winter of despair…”
একইসময়ে চ্যানেলের এপারে তখন শুধু একজন অন্যরকম মানুষ তাঁর লন্ডনের সোহোর ২৮ নং পোল্যান্ড স্ট্রিট (Poland Street)-এর নিজস্ব অপরিসর বাসভবন ও কর্মশালায় দিনরাত এক করে এক অভিনব সৃজনকর্মকে ছাপার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি পরিচিত ছিলেন একজন উন্মার্গগামী খোদাই শিল্পী ( Engraver) হিসেবে, আপন খেয়ালে চলতেন। আর হবে নাই বা কেন যিনি মাত্র চার বছর বয়সে স্বয়ং ঈশ্বরকে দেখেছিলেন তাঁর জানালয় মুখ রেখে দাঁড়াতে। ন বছর বয়সে উত্তর লন্ডনের পেকহ্যাম রাই-এর মাঠে একটি গাছের প্রতিটি ডালে দেখলেন দেবদূতেরা আলো করে রয়েছেন। তো, এই ছেলেকে প্রতিবেশিরা উন্মার্গগামী যে বলবেন ,সে তো স্বাভাবিক, এমন কি বাবা, মাও বুঝলেন এ ঠিক সাধারণ নয়। পাঠশালার পাঠে মন না থাকায় বাবা তাঁকে ভর্তি করে দিলেন ছবি আঁকার স্কুলে। তিনি আপন প্রতিভায় শিখে নিয়েছিলেন খোদাই শিল্প যা হয়ে উঠবে তাঁর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। পরে এই শৈলী তিনি শিখিয়ে দিয়েছিলেন ছোটো ভাই রবার্ট এবং স্ত্রী ক্যাথরিনকে। ১৭৮৭ সালে ভাই রবার্ট ক্ষয় রোগে মারা যাবার সময় ব্লেক তার আত্মাকে দেখেছিলেন আনন্দে হাততালি দিতে দিতে উর্ধে উঠে যেতে। তিনি বিশ্বাস করতেন রবার্টের আত্মাই তাঁকে স্বপ্নে তাঁর এই সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতির ব্যবহার ‘ইলুমিনেটেড প্রিন্টিং’ শিখিয়েছিলেন। তিনি তামা বা কপার প্লেটে অ্যাসিড-প্রতিরোধী মাধ্যম দিয়ে কবিতা ও নকশাগুলো উল্টো করে আঁকছেন । এরপর অ্যাসিডের সাহায্যে বাকি অংশ ক্ষয় করে, লেখা ও ছবিগুলোকে উঁচুতে বা রিলিফ (relief) হিসেবে ফুটিয়ে তুলবেন। এই খোদাই করা প্লেটগুলোতেই কালি লাগিয়ে প্রেসের মাধ্যমে ছাপানো হবে। এ ব্যাপারে তিনি এবং তাঁর নিরক্ষর স্ত্রী জলরঙ দিয়ে হাতে করে প্রতিটি পাতা একটি একটি করে রাঙিয়ে তুলছেন।

Blake in the making
সেই ১৭৮৯ সালের গ্ৰীষ্মকালীন অবকাশে মাত্র উনিশটি কবিতা কবি-শিল্পীর নিজস্ব শিল্পকলায় অলঙ্কৃত হয়ে মাত্র ১৭-১৮ টা কপি প্রকাশিত হল কালো, সবুজ এবং উজ্জ্বল হলুদ রঙের কালির আখরের ওপর জলরঙ দিয়ে। প্রত্যেকটি কপি আলাদা আলাদা জলরঙ দিতেন স্ত্রী ক্যাথরিন, ফলে প্রত্যেকটি কপি হয়েছিল স্বতন্ত্র। প্রথম প্রকাশিত বইতে মোট ৩১টা এমন প্লেট ছিল। সে ছিল অক্ষর এবং চিত্রের সমন্বয়ে এক অ-পূর্ব যৌথশিল্পের অশ্রুত সংগীত। এই বইতে তিনি দেখিয়েছিলেন শৈশব, সরলতা, পবিত্রতা, ক্ষমা এবং ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের একটি আদর্শ জগত। প্রকাশের সময় বইটি সীমিত দু-চারজনের কাছে পৌঁছে ছিল এবং পরে ১৭৯৪ সালে বইটি তাঁর নতুন প্রকাশিত বই ‘Songs of Experience ‘ এর সঙ্গে একত্রীভূত হয়ে প্রকাশ পায়। কবির জীবিতকালে এর প্রচার অত্যন্ত সীমিত ছিল কিন্তু বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে থেকে এর পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয় এবং প্রমাণিত হয়েছিল ইংরেজি তথা বিশ্বসাহিত্যের ছিল এটি একটি যুগান্তকারী কাব্যগ্রন্থ এবং আজও এর জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে বইটির চিরকালীনতা।
যদিও ব্লেক তখন কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন না, এমন কি আমৃত্যু তিনি কবি নয়, চিত্রকর এবং খোদাই শিল্পী ( engraver) হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। ১৯২৭ সালে মৃত্যুর পর তাঁর অবিচুয়ারিতেও তাঁকে চিত্রকর এবং খোদাই শিল্পী হিসেবেই দেখানো হয়েছিল যদিও তখনো ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং কোলরিজ জীবিত এবং দুজনেই তাঁর কবি প্রতিভা সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। দুঃখের বিষয় ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর গুণগ্ৰাহী হয়েও তাঁকে উন্মাদগ্ৰস্ত মনে করতেন এবং কোলরিজ তাঁকে Man of Genius বলেও প্রায় ব্যঙ্গের সুরে বলেছিলেন ‘…but verily I am in the very mire of common-place common-sense compared with Mr. Blake, apo- or rather anacalyptic Poet, and Painter!’

Songs of Innocence by W. Blake
সেই ১৭৮৯ সালের গ্ৰীষ্মকালীন অবকাশে মাত্র উনিশটি কবিতা কবি-শিল্পীর নিজস্ব শিল্পকলায় অলঙ্কৃত হয়ে মাত্র ১৭-১৮ টা কপি প্রকাশিত হল কালো , সবুজ এবং উজ্জ্বল হলুদ রঙের কালির আখরের ওপর জলরঙ দিয়ে। প্রত্যেকটি কপি আলাদা আলাদা জলরঙ দিতেন স্ত্রী ক্যাথরিন, ফলে প্রত্যেকটি কপি হয়েছিল স্বতন্ত্র। প্রথম প্রকাশিত বইতে মোট ৩১টা এমন প্লেট ছিল। সে ছিল অক্ষর এবং চিত্রের সমন্বয়ে এক অ-পূর্ব যৌথশিল্পের অশ্রুত সংগীত। এই বইতে তিনি দেখিয়েছিলেন শৈশব, সরলতা, পবিত্রতা, ক্ষমা এবং ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের একটি আদর্শ জগত। প্রকাশের সময় বইটি সীমিত দু-চারজনের কাছে পৌঁছে ছিল এবং পরে ১৭৯৪ সালে বইটি তাঁর নতুন প্রকাশিত বই ‘Songs of Experience ‘ এর সঙ্গে একত্রীভূত হয়ে প্রকাশ পায়। কবির জীবিতকালে এর প্রচার অত্যন্ত সীমিত ছিল কিন্তু বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে থেকে এর পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয় এবং প্রমাণিত হয়েছিল ইংরেজি তথা বিশ্বসাহিত্যের ছিল এটি একটি যুগান্তকারী কাব্যগ্রন্থ এবং আজও এর জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে বইটির চিরকালীনতা। এই তো গত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে পথে গীটার হাতে নেমে পড়েছিলেন পর রবসন, জোন বায়েজ, পিট সীগার, জন লেননরা, কণ্ঠে তুলে নিলেন Blake এর ‘Ah, Sunflower! The Sick Rose, A Little Girl Lost এর মতো কবিতাগুলি। Bob Dylan Allen Ginsberg এর সহযোগিতায় কবিতাগুলিতে সুর দিয়ে রেকর্ড করলেন। ১৯৭০ সালে গীনসবার্গ Nurse’s Song সহ ব্লেকের ২১টি কবিতাকে সুরে সুরে সর্বত্র ছড়িয়ে দিলেন। বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে যশোর রোডে লক্ষ লক্ষ অসহায়, অত্যাচারিত, সর্বস্বান্ত শরণার্থীদের দেখে ‘ September On Jessore Road’ এ লিখলেন:
‘ Millions of babies in pain
Millions of mothers in rain
Millions of brothers in woe
Millions of children nowhere to go ‘ –
সেই ১৫২ পঙক্তি র আগুনঝরানো শব্দগুলিতে কি নতুন করে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল না ব্লেকের বিখ্যাত ‘London’ কবিতাটি :
‘In every cry of every man,
In every Infant’s cry of fear,
In every voice, in every ban,
The mind-forg’d manacles I heard.’
যদিও ব্লেক সেই কবিতা লেখার সূচনা পর্বে কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন না, এমন কি আমৃত্যু তিনি কবি নয়, চিত্রকর এবং খোদাই শিল্পীই ( engraver) হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। ১৯২৭ সালে মৃত্যুর পর তাঁর অবিচুয়ারিতেও তাঁকে চিত্রকর এবং খোদাই শিল্পী হিসেবেই দেখানো হয়েছিল যদিও তখনো ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং কোলরিজ জীবিত এবং দুজনেই তাঁর কবি প্রতিভা সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। দুঃখের বিষয় ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর গুণগ্ৰাহী হয়েও তাঁকে উন্মাদগ্ৰস্ত মনে করতেন এবং কোলরিজ তাঁকে Man of Genius বলেও প্রায় ব্যঙ্গের সুরে বলেছিলেন ‘…but verily I am in the very mire of common-place common-sense compared with Mr. Blake, apo- or rather anacalyptic Poet, and Painter!’
১৭৮৯ সালে ব্লেক তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং কালজয়ী বই ‘Songs of Innocence’ প্রকাশ করেন ফরাসি বিপ্লবের আশাব্যঞ্জক দিনগুলির প্রেক্ষাপটে। তাঁর ধারণা ছিল মানুষের আদিম অবস্থাই অকৃত্রিমভাবে সুন্দর যা শৈশবে অনেকটাই অবিকৃত থাকে, তাই তাঁর কাছে শৈশব দৈব অবস্থার প্রতিরূপ। নিজে নিঃসন্তান হয়েও শিশুচরিত্রে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ছিল বিস্ময়কর। কবিতাগুলিতে শিশুদের নিষ্পাপ জগৎ, আনন্দ এবং প্রকৃতির সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক তুলে ধরেছেন যদিও Innocence-এর সুর অনেক বেশি মৃদু ও আধ্যাত্মিক। কবিতাগুলি আনন্দ, সরলতা, পবিত্রতা এবং ঈশ্বর ও প্রকৃতির ওপর বিশ্বাসের প্রতীক। ‘The Lamb’ (মেষশাবক) হলো এই সংকলনের প্রধান প্রতীক, যা যিশু খ্রিস্টের কোমলতা ও নির্দোষতার প্রতিনিধিত্ব করে।
কবিতাগুলো ছড়ার (nursery rhymes) মতো সহজ, কিন্তু গভীর আধ্যাত্মিক অর্থবহ। ‘The Lamb’, ‘The Chimney Sweeper’ (Innocence), ‘The Little Black Boy’, ‘Holy Thursday’ ইত্যাদিতে জীবনের উজ্জ্বল, আনন্দময় ও নিষ্পাপ দিকটিই ফুটে ওঠে।
আজও তাঁর এইসব কবিতার মাধ্যমে আমরা আমাদের চিরন্তন শৈশবকে খুঁজে পাই, নক্ষত্রখচিত রাত্রির বুকে ঘুমপাড়ানিয়া গান শুনতে শুনতে রূপকথার জগতে হারিয়ে যাই :
‘ Sweet dreams, forms a shade
O’er my lovely infant’s head;
Sweet dreams of pleasant streams
By happy, silent, moony Beams’
Sleep, sleep, happy child,
All creation slept and smiled;
Sleep, sleep happy sleep,
While o’er thee thy mother weep’.
( A Cradle Song)
মিষ্টি স্বপ্ন কাজল ছায়া মেলে
ঘুম দিয়ে যা সোনার মাথায় ঢেলে;
উছল নদির স্বপ্ন মধুভরা
খুশি ঝলমল, চুপ জ্যোছনায় গড়া।
আয় রে ঘুম, খোকার খুশির চোখে,
ওই তো ভুবন হাসছে স্বপ্নলোকে;
ঘুমতা ঘুমায় খুশিতে তুই ঘুমো,
চোখে অশ্রু মা তোকে দেয় চুমো।
(ঘুমপাড়ানি গান)
অনু : চ.ভ.

The cradle song
আর, আমরা যারা বাংলা ভাষার কোলে জন্মেছি, তারা এর পিঠোপিঠি আওড়াতে থাকি রবীন্দ্রনাথের শিশু থেকে :
‘চোখে যে ঘুম আসে
সকল-তাপ-নাশা –
জান কি কেউ কোথা হতে যে
করে সে যাওয়া-আসা।
(খোকা)
কিংবা :
‘ ঘুমের বুড়ি আসিছে উড়ি
নয়ন-ঢুলানি,
গায়ের ‘পরে কোমল করে
পরশ বুলানি।
মায়ের প্রাণে তোমারি লাগি
জগৎ-মাতা রয়েছে জাগি,
ভুবন-মাঝে নিয়ত রাজে
ভুবন-ভুলানি।
ঘুমের বুড়ি আসিছে উড়ি
নয়ন-ঢুলানি।’
(খেলা)
আরো কয়েকটি কবিতা পাশাপাশি রেখে দেখা যাক :
‘Old John, with white hair,
Does laugh away care,
Sitting under the oak,
Among the old folk.
They laugh at our play,
‘Such, such were the joys
‘When we all girls and boys,
‘In our youth time were seen
‘On the Ecchoing Green.’
( The Ecchoing Green/ Songs of Innocence)জন দাদু তাঁর পাকা চুল ভুলে গিয়ে,
মাতিয়ে রাখেন হাসি মস্করা দিয়ে,
ওকের তলায় খুশির মেজাজে বসে,
পুরনো সাথীরা মজে শৈশব রসে।
ঠাট্টা করেন আমাদের খেলা দেখে,
সবাই বলেন অতীতকে মনে রেখে;
‘ঠিক এভাবেই খেলার নেশায় মেতে
কাটিয়েছি দিন তরুণ যৌবনেতে,
সেদিনও শিশুরা খুশিতে তুলেছে ঝড়
যেখানে সবুজ প্রতিধ্বনিমুখর।’
( অনু : চ.ভ.)
‘আমি তোমার চশমা-পরা
বুড়ো ঠাকুরদাদা,
বিষয়-কাজের মাকড়সাটার
বিষম জালে বাঁধা –
আমার ছুটি সেজে বেড়ায়
তোমার ছুটির সাজে,
তোমার কণ্ঠে আমার ছুটির
মধুর বাঁশি বাজে।
আমার ছুটি তোমারই ঐ
চপল চোখের নাচে,
তোমার ছুটির মাজখানেতেই
আমার ছুটি আছে।
(ঠাকুরদাদার ছুটি/ পলাতকা)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘When the voices of children are heard on the green
And laughing is heard on the hill,
My heart is at rest within my breast
And everything else is still.’
( Nurse's Song/ Songs of Innocence)যখন শুনি শিশুর দল ঘাস সবুজে কাকলি
পাহাড় জুড়ে উছলে পড়ে হাসির তোড়া হা হা,
শান্তি বড়ো হৃদয় মাঝে স্বস্তি প্রাণে আরাম
আর সকলি নিঃশব্দ কী প্রশান্তি আহা।’
( অনু : চ.ভ.)‘ শ্যামল ঘাসের ‘পরে সাঁঝে
আলো-আঁধারের মাঝে মাঝে,
ছেলেতে মেয়েতে করে খেলা।
ওরা যে কেন হেসে সারা,
কেন যে করে অমনধারা,
কেন যে লুটোপুটি,
কেন যে ছুটোছুটি,
কেন যে আহ্লাদে কুটিকুটি!
কেহ বা ঘাসে গড়ায়,
কেহ বা নেচে বেড়ায়,
সাঁঝের সোনা-আকাশে
হাসির সোনা ছড়ায়।
(খেলা / শিশু)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৯০৩ সালে রবীন্দ্রনাথ কবিতাগুলি লিখছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক এক দুঃসহ ট্র্যাজেডির পটভূমিকায় । ১৯০২ সালে স্ত্রীর অকালমৃত্যুর পর মেজো মেয়ে রানী মরণান্তক রোগে আক্রান্ত হন এবং সেই সেপ্টেম্বরেই মাত্র ১২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। বইটি ‘শিশু’ নামে সে বছরই প্রকাশিত হয় তার মাস কয়েক আগে। কবিতাগুলির ইতিহাস রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিম্নলিখিত স্মৃতিচারণে অক্ষয় করে রেখে গেছেন :
‘আমার মেজো মেয়ে রানীর কথা অনেকবার তোমাকে বলেছি। তাঁর মৃত্যুর সময় তার মা বেঁচে ছিলেন না। সমস্ত অসুখের মধ্যে আমিই তার সেবা করছছিলুম শেষ পর্যন্ত। … সর্বদা তার বাবাকে কাছে চাই। যদিও তার বিয়ে হয়েছিল, তবু তার সমস্ত মন জুড়ে বসে ছিল তার বাবা। আলমোড়াতে যখন তাকে চেঞ্জে নিয়ে যাই, তখন তার অসুখ খুব বেশী। তাকে খুশি রাখবার জন্যে রোজ রোজ কবিতা লিখে বিছানার পাশে বসে শোনাতুম, যাতে কিছুক্ষণও অন্তত রোগের যন্ত্রণা ভুলে থাকে। এমনি করে আমার “শিশু” বইখানা লেখা হয়েছে – ও কবিতাগুলো রানীর অসুখের সময় লিখেছিলুম।’ ( নির্মলকুমারী মহালনবিশ, বাইশে শ্রাবণ ‘ পৃ ১১-১২)।

অসুস্থ রাণীর শয্যাপার্শ্বে কবিতা পাঠরত রবীন্দ্রনাথ
২৫ শেষ শ্রাবণ, ১৩১০ এ মোহিত চন্দ্র সেন কে লিখেছিলেন : ‘ আমার এই কবিতাগুলি সবই খোকার নামে – তার একটি প্রধান কারণ এই – যে ব্যক্তি লিখেছে সে আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে খোকাই ছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে খুকী ছিল না। তার সেই খোকাজন্মের অতি প্রাচীন ইতিহাস থেকে যা কিছু উদ্ধার করতে পেরেছে তাই তার লেখনীর সম্বল – খুকীর চিত্ত তার কাছে এত সুস্পষ্ট নয়। তা ছাড়া আর একটি কথা আছে – খোকা এবং খোকার মার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ মধুর সম্বন্ধ, সেইটে আমার গৃহস্মৃতির শেষ মাধুরী – তখন খুকী ছিল না – মাতৃশয্যার সিংহাসনে খোকাই তখন ‘চক্রবর্তী’ সম্রাট ছিল – সেই জন্য লিখতে গেলেই খোকা এবং খোকার মার ভাবটুকুই সূর্যাস্তের পরবর্তী মেঘের মত নানা রঙে রঙিয়ে ওঠে – সেই অস্তমিত মাধুরীর সমস্ত কিরণ এবং বর্ণ আকর্ষণ করে আমার অশ্রুবাষ্প এই রকম খেলা খেলছে – তাকে আমি নিবারণ করতে পারিনে।’
এদিক থেকে উইলিয়াম ব্লেক ছিলেন নিঃসন্তান কিন্তু তাঁর সংবেদনশীল মনে শিশুদের সরল, স্বর্গীয় পবিত্রতা এবং সমাজের নিপীড়িত, ক্ষুধার্ত, শিশু শ্রমিকদের দুঃখ যন্ত্রণা খুলে দিয়েছিল তাঁর এক অফুরন্ত অপত্যস্নেহের
উৎসমুখ। তাঁর কবিতাগুলি আনন্দ-বেদনাকে দুইপাশে নিয়ে দ্বিধারায় উৎসারিত হয়ে ওঠে : ‘Songs of Innocence’ এবং ‘Songs of Experience’ এই দুটি বইতে। আমরা দু জনের কিছু কবিতা আলোচনার জন্য বেছে নিচ্ছি, যা পড়লে মনে হবে বুঝি রবীন্দ্রনাথের লেখায় ধ্বনিত হচ্ছে শতাব্দীর ওপার থেকে ভেসে আসা ব্লেকের কবিতার প্রতিধ্বনি। কিন্তু তথ্য বলছে রবীন্দ্রনাথের বিপুল রচনাতে বিশ্বের অসংখ্য কবি সাহিত্যিকদের, বিশেষ করে ইংরেজি রোম্যান্টিক কবিদের অজস্র উল্লেখ থাকলেও ব্লেকের কোথাও কোনো উল্লেখ নেই একবার মাত্র ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতাকালে বিশুদ্ধ কবিতার উদাহরণ হিসেবে কবির নাম উল্লেখ না করে ব্লেকের একটি কবিতার ( ‘Never seek to tell thy love …’) আলোচনা করেছিলেন। এর কারণ আগেই উল্লেখ করেছি কবি হিসেবে ব্লেকের স্বীকৃতি বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের আগে প্রায় অবহেলিতই ছিল।
আমরা আরো কয়েকটি কবিতা পাশাপাশি রেখে একবার দেখে নি :
The little boy lost in the lonely fen,
Led by the wand’ring light,
Begam to cry; but God, ever nigh,
Appear’d like his father in white.
He kissed the child & by hand led
And to his mother brought,
Who in sorrow pale, thro’ the lonely dale,
Her little boy weeping sought.
( The Little Boy Found/ Songs of Innocence) - Blake ।। সন্ধান মিলল বালকের ।।
হারালো ছেলে নির্জন সে জলায়,
আলেয়া ডাকে পথ ভুলেছে সে;
কান্না শুনে নিত্য পাশে যিনি,
ভগবানই বাবার মতো এসে
শুভ্রবেশে চুমোয় মাথা এবং নিজে তাকে
দিলেন তুলে দুখিনী মার হাতে,
নির্জন পাহাড়ে তখন ছেলের খোঁজে মা
ভাসছিলেন অশ্রু ধারাপাতে।
অনু : চ.ভ

The Little Boy Found
গহন বনের মাঝে চলিয়াছে শিশু
মার হাত ধরে,
মুহূর্তে ছেড়েছে হাত, পড়েছে পিছায়ে
খেলাবার তরে –
অমনি হারায়ে পথ কেঁদে ওঠে শিশু,
ডাকে “মা মা ” বলে-
আয় মা, আয় মা, আয় কোথা গেলি,
মোরে নে মা কোলে।”
মা অমনি চমকিয়া” বাছা,বাছা” বলে ছোটে,
দেখিতে না পায় –
শুধু সেই অন্ধকারে “মা, মা” ধ্বনি পশে কানে,
চারি দিকে চায়।
(নিশীথ জগৎ / ছবি ও গান) -
রবীন্দ্রনাথ‘ Sweet sleep, come to me
‘ Underneath this tree,
‘ Do father, mother weep
‘Where can Lyca sleep?
‘Lost in the desert wild
‘Is your little child,
‘How can Lyca sleep,
‘If her mother weep.’
( The Little Girl Lost)
Blake ‘ মিষ্টি ঘুম রে কাছে আয়
এই ছায়া গাছের তলায়।
বাবা-মা যে ভাসে কান্নায়,
কোথায় লাইকা ঘুম যায়?
তোমাদের ছোট্ট সে মেয়ে
ঊষর মরুতে যে হারিয়ে।
লাইকার ঘুম সে কি আসে
যদি মা চোখের জলে ভাসে?
(নিরুদ্দিষ্ট বালিকা)
অনু : চ.ভ.এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের শিশু কাব্য গ্ৰন্থের আকুল আহ্বানকে একবার মিলিয়ে দেখা যাক :
‘রাত্রি হল, আঁধার করে আসে,
ঘরে ঘরে প্রদীপ নিবে যায়।
আমার ঘরে ঘুম নেইকো শুধু –
শূন্য শেজ শূন্য-পানে চায়।
কোথায় দুটি নয়ন ঘুমে-ভরা,
নেতিয়ে-পড়া ঘুমিয়ে-পড়া মেয়ে,
শ্রান্ত দেহ ঢুলে পড়ে, তবু
মায়ের তরে আছে বুঝি চেয়ে।…
(আকুল আহ্বান)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্লেক তাঁর ‘ SONGS OF INNOCENCE’ বই এর ‘প্রারম্ভিকা’ কবিতাটিতে বাঁশিওয়ালার মিষ্টি সুর শুনেও শিশুর আকাঙ্খাকে স্পষ্ট ভাবে লিখেছিলেন :
‘Drop thy pipe, thy happy pipe,
‘Sing thy songs of happy chear :’
So I sung the same again,
While he wept with joy to hear.’
‘ বাশি ফেলো ছুঁড়ে, তোমার খুশির বাঁশি,
ঢেলে দাও গানে আপন খুশির সুর, :
সেই গান আমি আবার শোনাই গেয়ে,
শুনে চোখে তার আনন্দ অশ্রুর।’
( অনু : চ.ভ.)
মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের ‘সমালোচক’ কবিতার শিশু আকাঙ্খার কাতরতা :
‘ বাবা নাকি বই লেখে সব নিজে।
কিছুই বোঝা যায় না লেখেন কী যে।
তারপরেই লিখছেন:
‘তোর মুখে মা, যেমন কথা শুনি,
তেমন কেন লেখেন নাকো উনি।’
এই শিশু হৃদয়ের আর্তি কি শুধু আমাদেরই ব্লেককে মনে করায় ? তার হলে ইয়েটস কেন ইংরেজি গীতাঞ্জলির ভূমিকায় এই কথাগুলি লিখতে প্ররোচিত হবেন : ‘ We go for a like voice to St. Francis and to William Blake who have seemed so alien in our violent history.’ কিংবা শিশু কাব্যের ইংরেজি অনুবাদ ‘The Crescent Moon’ প্রকাশিত হলে The Nation ‘ পত্রিকায় ১৩/১২/১৯১৩ সংখ্যায় কেন লিখবেন – ‘ In the Crescent Moon is revealed a vision of childhood which is only paralleled in our literature by the work of William Blake.’
যে সুর একদিন বেহালার তারে B-Flat এর semitone-এ ধ্বনিত হয়ে আকাশ বাতাস মথিত করেছিল সেই বেদনার কোমল নিষাদই যেন শতাব্দীর শেষে আরেক কবির স্বরে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবার আকাশে বাতাসে চিরন্তন বিষাদ প্রতিমায় শাশ্বত হয়ে রইল।এ এক আশ্চর্য সমাপতন।
এর ৫ বছর বাদে ১৭৯৪ সালে যখন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স পরস্পর যুদ্ধে রত এবং ফরাসি বিপ্লবের স্বপ্নও রোবসপীয়রের ত্রাসের রাজত্বে আস্তে আস্তে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, তিনি প্রকাশ করলেন তাঁর বিখ্যাত ‘Songs of Experience ‘ এবং প্রকাশ করলেন Songs of Innocence’ এর সঙ্গে একত্রীভূত করে ‘Songs of Innocence’ and Songs of Experience – Shewing Two Contrary States of Human Soul’ নামে যেখানে তিনি দেখালেন মানব আত্মার দ্বান্দ্বিক রূপ – একদিকে সারল্য, কোমলতা, পবিত্রতা ইত্যাদি ক্রিশ্চান গুণাবলী, অন্যদিকে চার্চের অমানবিকতা, ভয়ঙ্করতা, কঠোরতা। একদিকে মেষশাবক, আনন্দময় মানবশিশু, ওনা বা লাইকার মতো সরল বালিকা যা পবিত্র যীশুর রূপকে মিলিয়ে যায়, অন্যদিকে ভয়ঙ্কর বাঘ, কেশর ফোলানো হিংস্র সিংহ যা পিতা, রাজা, রাজতন্ত্র এবং শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে চার্চের সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের রূপক এবং তাদের চিরন্তন দ্বন্দ্ব। অসহায় শিশু লাইকা এবং তার ওপর কেশর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া হিংস্র সিংহ , কারখানার মুনাফাবাজ অত্যাচারী মালিক এবং কথা ফোটেনি এমন শিশু শ্রমিকের কান্নার স্বর – এই দুই বিপরীতমুখী সুর যেন মহাজীবনের বহুস্তরীয় Point- counterpoint এর মধ্যে দিয়ে এখানে সৃষ্টি করে চলেছে এক বিশ্ব আত্মার মহাসঙ্গীত যা ব্যক্তি নিরপেক্ষ, যা একই সঙ্গে সৃষ্টি এবং ধ্বংসের অপ্রতিরোধি সুর। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ The Tyger’ -এ তিনি বাঘের স্রষ্টার এই দ্বান্দ্বিকতার বিরোধাভাসে বিস্ময় প্রকাশ করে লিখলেন :
‘Did he smile his work to see?
Did he who made the lamb make thee?’
‘নিজেরই সৃষ্টিতে তিনি কি ছিলেন হেসে?
তিনিই স্রষ্টা তোর, যাঁর সৃষ্টি শিষ্ট মেষে?’
অনু : চ.ভ.
তখন শিল্প বিপ্লব এবং ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবে সমাজ দ্রুত পরিবর্তনশীল। ইংল্যান্ডের সবুজ খেত ক্রমশ ভরে উঠছে চিমনির কালো ধোঁয়ায়। গড়ে উঠছে শিল্প বিপ্লবের ফলস্বরূপ কল কারখানা যাকে ব্লেক বলবেন ‘ Dark Satanic Mills’। এই সময়ে কলে- কারখানায় কাজ করার জন্য প্রচূর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল বিশেষ করে চিমনির ভিতরে ঢুকে ধোওয়া মোছা করার জন্য প্রয়োজন ছিল শিশু শ্রমিকের যাদের বেশিরভাগটাই আফ্রিকা এবং অন্যান্য উপনিবেশ থেকে দাস হিসেবে আনা হত। সেকালে কথা ফোটে নি এমন সব গরিব কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের চিমনি সাফাই বা পানশালার কাজে ব্যবহার করা হয় যারা ‘sweep’ – এর ব্যঞ্জনধ্বনি পর্যন্ত উচ্চারণ করতে পারত না , বলত ‘weep’। তাদের রাত থাকতে থাকতেই কাঁচা ঘুম থেকে উঠে চিমনির ভিতরে নেমে ধোওয়া মোছা করতে হত। তারা ধোওয়া উচ্চারণও করতে পারত না , স্বরবর্ণ উচ্চারণে বলত ‘ওয়া! ওয়া’! এরা সেই শিশু রবীন্দ্রনাথের লেখায় যারা আজো নব কিশলয়ের মতো স্পন্দমান :
‘ ছোটো খোকা বলে অ আ
শেখে নি সে কথা কওয়া।’
‘When my mother died I was very young,
And my father sold me while yet my tongue
Could scarcely cry ‘weep’!’weep’! ‘weep’! weep’!
So your chimneys I sweep’,& in soot I sleep.
( The Chimney Sweeper)
Blake
বড়োই ছোট, বড়োই ছোট্ট, মা মারা যান যখন
এবং আমায় দিলেন বেচে বাবা, আমার তখন
সবেমাত্র ফুটছে কথা ‘ওয়া! ওয়া! ওয়া!’
তাই তো তোমার চিমনি ঝাড়া – ঝুলকালিতে শোওয়া।
( চিমনি ঝাড়ুদার)
অনু : চ.ভ

Is that trembling cry a song
এদের অনেকেই মারা যেত শৈশব অবস্থাতেই অপুষ্টিজনিত রোগে। এইসব অবহেলিত ও অত্যাচারিত শিশুদের চাপা কান্নাই হল এইসব কবিতাগুলির বাদি স্বর। ব্লেকের কৈশোরে লন্ডন ছিল তাঁর কালজয়ী কবিতা লন্ডন- এর নিখুঁত প্রতিরূপ : রাজপথগুলি এমন কি টেমসও ছিল সংরক্ষিত কেবলমাত্র অভিজাতদের জন্য, পথজুড়ে যন্ত্রণাকাতর মানুষ, অভুক্ত শিশুদের ক্রন্দনে বিষণ্ণ বাতাস, রাজা এবং গীর্জার ত্রাসের রাজত্ব, সাধারণ সেনানীদের রক্তের ধারায় পিশাচের মতো জেগে থাকা রাজপ্রাসাদের প্রাচীরগুলি, পবিত্র কুমারীদের বারাঙ্গণে ঠেলে দেওয়া আর অন্ধকার সর্পিল পথে পথে তাদের চিৎকারে বীভৎস হয়ে থাকা রাত্রি গুলি, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে। কিংবা ‘Holy Thursday ‘ তে যেমন লিখেছিলেন :
‘Is that trembling cry a song?
Can it be a song of joy?
And so many children poor?
It is a land of poverty!’
( Holy Thursday)
Blake
ওই কাঁপা ক্রন্দন গান?
আনন্দ বাজে ওই স্বরে?
আর, এত দরিদ্র শিশু?
দারিদ্র, এ যে ঘরে ঘরে!
(পবিত্র বৃহস্পতিবার)
অনু : চ.ভ.
ঠিক ১০০ বছর পরে ক্ষুধার্ত, অসহায়, নিপীড়িত মানুষের একই কান্নার সুর প্রাচ্যের আরেক মহাকবির কলমে বেজে উঠবে, প্রতিটি শব্দের গায়ে একই রকম রক্তক্ষরণ :
‘বড়ো দুঃখ, বড়ো ব্যথা – সম্মুখেতে কষ্টের সংসার
বড়োই দরিদ্র, শূন্য, বড়ো ক্ষুদ্র, বদ্ধ অন্ধকার।’
আজও এইসব কবিতার শব্দগুলি কি সমান প্রাসঙ্গিক মনে হয় না আজকের বিশ্বের রক্তাক্ত মানচিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে? আজও কি আমাদের হাহাকারে ধ্বনিত হচ্ছে না তীব্র মধ্যম যেভাবে বেজে উঠেছিল সেদিন কবির রুদ্রবীণায় :
‘ অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু,
চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ- উজ্জ্বল পরমায়ু,
সাহস বিস্তৃত বক্ষপট। এ দৈন্য-মাঝারে, কবি,
একবার নিয়ে এসো স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি।’

অন্ন চাই আলো চাই
রবীন্দ্রনাথের মতো সর্বেশ্বরবাদী ব্লেকও আমাদের মাঝে এই বিশ্বাসের ছবিটি প্রোথিত করতে চেয়েছিলেন যেমন তাঁর ‘The Divine Image’ কবিতাটিতে :
‘ Then every man, of every clime,
That prays in his distress,
Prays to the human form divine,
Love, Mercy, Pity, Peace.
And all must love the human form,
In heathen, turk, or jew ;
Where Mercy, Love,& Pity dwell
There God is dwelling too.’
(The Divine Image – Blake)
প্রতিটি মানুষ, প্রতি জাতি বর্ণের,
বিপদে পড়লে প্রার্থনাই তো আশা,
নরদেব কাছে তার প্রার্থনা ঢের
কৃপা ও করুণা, শান্তি ও ভালোবাসা।
মানবরূপকে বাসতেই হবে ভালো,
ম্লেচ্ছ, তুর্কী, ইহুদি, যা হয় হোক।
যেখানে করুণা, দয়া, প্রেম বাস করে
সেখানেই ভগবানের স্বর্গলোক।
(দৈবী প্রতিমা)
অনু : চ.ভ.
উভয়েই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মরমী কবিদের মধ্যে অন্যতম, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেও একে অপরের পরিপূরক। দুজনেই সর্বেশ্বরবাদে আস্থাশীল, দুজনেরই ঈশ্বর সাধনার সূচী মুখ ন্যস্ত ছিল মানুষেরই কেন্দ্রে এবং বিশেষ করে অবহেলিত, নিপীড়িত, অপমানিত, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘ সবার অধম, দীনের হতে দীন’ সেইসব সবহারাদের মাঝে। ব্লেকের কাছে মানবশিশু এক একটা ফুল, একটা মেষশাবক শেষ পর্যন্ত করুণাময় যীশুর রূপকে একাকার হয়ে যায়। তবে ব্লেকের সরলতার এবং অভিজ্ঞতার গানে আমরা যে শিশুদের পাই সেইসব আনন্দময়, নিষ্পাপ শিশুদের গায়ে যেখানে লেগে রয়েছে এ জগতের ধুলো-বালি-ক্লেদ-মালিন্য-যন্ত্রণার কালিমা, যেখানে নানা বৈষম্যের ঘাত-প্রতিঘাতে তাদের আনন্দের মুহূর্তগুলি ঝরে পড়ছে আর চোখে জাগিয়ে রেখেছে স্বপ্ন এক পরম পিতার, যিনি সর্বদাই তাদের পাশে রয়েছেন জীবনে এবং মৃত্যুতেও, যিনি একদিন এই শিশুর জগত থেকে নির্বাসিত শিশুদের আবার ফিরিয়ে দেবেন তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বর্গকে, সেখানে রবীন্দ্রনাথের শিশুরা প্রথম থেকেই জগত পারাবারের তীরে চিরন্তন শিশুস্বর্গে মুক্ত। বড়োদের সংঘাতময় জটিল জীবনের স্রোতের ভিন্ন স্তরে যেন তাদের অবস্থান, ঠিক যেন ব্লেকের কবিতায় যেমন দেবদূতের চাবি হাতে কফিন বাক্স থেকে মুক্ত করে দেওয়া সূর্যালোকে নৃত্যময় জো-ডিক-নেড-জ্যাক ও টম ডেকারদের মতো শিশুরা।

ব্লেক ও রবীন্দ্রনাথ
হে মহাকাল আমরা পরম বিস্ময়ে শুধু দেখছি, তোমার বামে যে সন্ধ্যা তোমার দক্ষিণের প্রভাতকে কেমন মিলিয়ে দিচ্ছে। এর ছায়া ওর আলোটিকে কোলে তুলে নিয়ে চুম্বনে ভরিয়ে তুলছে। এক প্রতীচী কবির পূরবী, যুগান্তরের আর এক প্রাচ্য কবির বিভাসকে কেমন আশীর্বাদ করে চলে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র :
১) William Blake
Introduced and edited by J.Bronowski.
২) A Tale of Two Cities – Charles Dickens
৩) ছবি ও গান, শিশু, চিত্রা – কাব্যগ্ৰন্থ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৪) বাইশে শ্রাবণ – নির্মলকুমারী মহালনবিশ
৫) THE RELIGION OF AN ARTIST – RABINDRANATH TAGORE ON ART AND AESTHETICS.
৬) অন্তর্জাল তথ্যভান্ডার

