শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বিস্মৃত এক আন্তর্জাতিক বিপ্লবী

হ্যাঁ। আন্তর্জাতিক বিপ্লবীই বটে। তিনি, প্রমোদরঞ্জন সেনগুপ্ত (মঘা), যাঁর বিপ্লবের হাতেখড়ি নদীয়ার কৃষ্ণনগরের গুপ্ত বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে শুরু হলেও শেষপর্যন্ত তা ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্স, ফ্রান্স থেকে জার্মানি, জার্মানি থেকে স্পেন — ছুটে বেরিয়েছেন ক্লান্তিহীন। ফ্রান্সে করেছেন ডক্টরেট। ইংল্যান্ডে করেছেন সাংবাদিকতা। প্রচন্ড গতিময়, অক্লান্ত, বর্ণময় এক জীবন কাটিয়ে অর্ধশতাব্দী আগে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু আমরা কতটুকু মনে রেখেছি তাঁকে? রূপকথার মতো তাঁর এ জীবন কাহিনী শুরু থেকেই শুরু করা যাক।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতে নরমপন্থী জাতীয়তাবাদের বিকল্প হিসেবে সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটে। সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন মূলত তিনটি ধারায় বিকশিত হয়েছিল। প্রথমত আত্মশক্তি বা স্বদেশী আন্দোলন। জাতীয় শিক্ষার প্রচলন,দেশীয় শিল্প ও কুটির শিল্পের গঠন প্রভৃতি ছিল এই ভাবনার অঙ্গীভূত। দ্বিতীয়ত ছিল নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ বা বয়কট আন্দোলন— যে নীতিতে সরকারি অফিস আদালত স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সমস্ত বিলাতি জিনিসপত্র বর্জনের কথা বলা হয়। আর এর পাশাপাশি তৃতীয় যে পথটি জাতীয়তাবাদীদের কাছে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, সেটি ছিল বিপ্লববাদী (ব্রিটিশ বয়ানে সন্ত্রাসবাদী) আন্দোলনের পথ। যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ও গুপ্ত বিপ্লবী সন্ত্রাস চালিয়ে সরকারি শাসনযন্ত্রকে পঙ্গু করে দেওয়ার কথা বলা হয়। এই তৃতীয় পথটিই যে ব্রিটিশ প্রশাসন যন্ত্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক শির:পীড়ার কারণ হয়ে উঠেছিল, সেকথা বলাই বাহুল্য। কৃষ্ণনগরের বিপ্লবী প্রমোদরঞ্জন সেনগুপ্ত ছিলেন এই তৃতীয় পথের পথিক।

প্রমোদরঞ্জনের জন্ম হয় ১৯০৭ খ্রী: বিহারের দুমকায়। বাবা হর্ষনাথ সেনগুপ্ত ছিলেন খ্যাতনামা ডাক্তার। প্রমোদরঞ্জনের জন্মের সময় দেশে চলছে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন। কার্জনের বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে গোটা বাংলা তখন রীতিমতো ফুঁসছে। এমনই এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বড় হচ্ছিলেন প্রমোদরঞ্জন। কৃষ্ণনগরের হেমন্ত সরকারের অভিভাবকত্বে তখন স্বদেশী ও গোপন বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন অনন্তহরি মিত্র, তারকদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, গোবিন্দপদ দত্ত’র মতো আলোকদীপ্ত তরুণরা। এঁদের সাহচর্যেই সশস্ত্র বিপ্লববাদে হাতেখড়ি হয় প্রমোদরঞ্জনের।


বিপ্লবী হেমন্ত সরকার ও অনন্তহরি মিত্র

কৃষ্ণনগরে তখন বিপ্লবীদের অন্যতম ঘাঁটি ছিল ’দরিদ্র ভান্ডার’ নামে এক সমাজকল্যাণ সমিতি। এই সমিতির স্বেচ্ছাসেবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসত একটি করে মাটির হাঁড়ি। বাড়ির গৃহিণীরা রান্নার সময় এক মুঠ করে চাল জমা করতেন। সপ্তাহ শেষে সমস্ত বাড়ির হাঁড়ির চাল এক জায়গায় করে দোকানে বিক্রি করা হত। সেই বিক্রির টাকা থেকে গরিব ছাত্র কিংবা দুস্থ পরিবারকে অর্থ সাহায্য করা হত। প্রকাশ্য সমাজসেবার আড়ালে দরিদ্রভাণ্ডার হয়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের গোপন অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলার আস্তানা। এই বিপ্লবী দলের পাণ্ডা ছিলেন, নদীয়ার বাগআঁচড়ার বিপ্লবী অনন্তহরি মিত্র। রাতের বেলা সঙ্গী সাথিদের নিয়ে কৃষ্ণনগরের চৌধুরীপাড়ার জঙ্গলাকীর্ণ ভাঙা বাড়িতে পিস্তল চালানোর অনুশীলন করতেন তিনি। এই দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন প্রমোদরঞ্জন – যেমন সাহসী, তেমন ডানপিটে। বেপরোয়া গুলি চালানোর জন্য অনেকেই ভয় পেতেন তাঁকে।

ইতিমধ্যে ‘দক্ষিণেশ্বর বোমা মামলা’য় ধরা পড়েন অনন্তহরি, ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাসে। বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন তিনি। কিন্তু আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি থাকাকালীন সময়ে পুলিশ বিভাগের ডেপুটি সুপার ভুপেন চ্যাটার্জীকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার অপরাধে ফাঁসির হুকুম হয় অনন্তহরির। এই বোমা মামলায় পুলিশ কৃষ্ণনগরেও ব্যাপক ভাবে ধরপাকড় শুরু করে। এই সময় ফাঁসির আসামি অনন্তহরিকে বাঁচাতে তারকদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমোদরঞ্জন সেনগুপ্ত বিশেষ উদ্যোগী ভূমিকা নিলে তাদের দুজনকেও পুলিশ বেঙ্গল অর্ডিন্যান্সে গ্রেফতার করে। প্রমোদরঞ্জনকে বিনা বিচারে ফরিদপুরের শিবচর গ্রামে অন্তরিন রাখা হয়। জেলে বসে পরীক্ষা দিয়েই তিনি শেষ পর্যন্ত বি এ পাস করেন।

পুলিশের খাতায় একবার নাম উঠে গেলে পড়াশোনা বা জীবনযাপন কোনটাই যে সুস্থ ভাবে করা সম্ভব নয় সেকথা বুঝেছিলেন বাবা হর্ষনাথ। সম্পন্ন এবং প্রভাবশালী চিকিৎসক পিতা হর্ষনাথের ব্রিটিশ দরবারে আবেদন নিবেদনে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি পেলেন প্রমোদরঞ্জন। শর্ত ছিল প্রমোদ আর দেশে থাকতে পারবেন না। ফলে হর্ষনাথ ছেলেকে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ১৯২৭ সালে বিলেতে পাঠিয়ে দিলেন সিভিল সার্ভিস পড়তে। কিন্তু যার রক্তে বিপ্লবের নেশা, চোখে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির স্বপ্ন, তিনি বাঁধা ধরা খাঁচায় নিজেকে বন্দি রাখবেন কী করে! বিলেতে গিয়ে প্রমোদরঞ্জন তাই সিভিল সার্ভিসে ভর্তি হলেন বটে কিন্তু ব্রিটিশ বিরোধী দুর্নাম থাকায় পরীক্ষায় আর বসা হল না। কিছুদিন পড়লেন লন্ডনের স্কুল অফ ইকনমিক্সে। একই সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়লেন লন্ডনের ডক শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে। অচিরেই যোগ দিলেন ’ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগে’। এটি ছিল অনাবাসী ভারতীয়দের এক জাতীয়তাবাদী দল, যারা ভারতকে ইংরেজ শাসন মুক্ত করার লক্ষে ইংল্যান্ডের মাটিতে সংগঠিত হচ্ছিল। এই রাজনৈতিক সংগঠনটি মূলত ভারতের বাইরে, বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবাসী ভারতীয়দের একত্রিত করে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটাবার লক্ষে ১৯২০-১৯৪০ এর মধ্যে খুব সক্রিয় ভূমিকা নেয়।

এমনই আরেকটি সংগঠন ছিল ’বার্লিন কমিটি’,যার লক্ষ্য ছিল জার্মানির বুকে বসে ব্রিটিশ ভারত বিরোধী কার্যকলাপকে সংগঠিত করা। ১৯২৮ সালে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে প্রমোদরঞ্জন জার্মানি যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় মানবেন্দ্রনাথ রায়, বীরেন চট্টোপাধ্যায়, নলিনী গুপ্তের মতো বিপ্লবীদের সঙ্গে। ছোট মফস্বল শহরের চেনা গণ্ডির বাইরে গিয়ে এই সময় থেকে প্রমোদরঞ্জন হয়ে উঠলেন আন্তর্জাতিক এক মানুষ। সর্বহারা শ্রেণীর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছুটে বেড়াতে লাগলেন এক দেশ থেকে আরেক দেশে।

জার্মানি থেকে প্রমোদরঞ্জন ফিরে আসেন ইংল্যান্ডে। সঙ্গে রিভলভার থাকার অপরাধে মাঝপথে ফরাসি পুলিশের হাতে বন্দি হন। ফ্রান্স থেকে ছাড়া পেয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে প্রমোদরঞ্জন ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন রজনীপাম দত্ত, সাপুরজি সাকলাৎওয়ালা, হ্যারি পলিট প্রমুখ আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট নেতার সঙ্গে। ১৯৩৩ খৃস্টাব্দ, সাংবাদিকতা শুরু করলেন লন্ডনের হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায়। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন বেশ উত্তেজক। ইউরোপ জুড়ে চলছে তীব্র আন্তর্জাতিক মন্দা। ইটালীতে চলছে মুসোলিনীর শাসন। জার্মানিতে উত্থান ঘটছে হিটলার এবং তাঁর নাৎসি বাহিনীর। জাতশত্রু কমিউনিস্টদের ওপর চলছে অকথ্য পীড়ন। স্বাধীনতাকামী মানুষেরা দলে দলে জার্মানি ছেড়ে পালিয়ে আসছেন ইংল্যান্ডে, ফ্রান্সে, ইউরোপের নানা দেশে। সে সব দেশেও তখন ধীরে ধীরে বাজপাখির ডানা মেলছে ফ্যাসিবাদ। আবার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ এবং শ্রমিক শ্রেণির জাগরণও এই সময়েই চলছে।


লন্ডনের কিছু ভারতীয় সাহিত্যানুরাগী যুবক সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এইসময়ে ’কমিউনিস্ট স্টাডি সার্কেল’ তৈরি করেন।এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মূলকরাজ আনন্দ, জ্যোতিষ চন্দ্র ঘোষ, মোহাম্মদ দীন তাসির প্রমূখ। এঁদের সঙ্গে যোগ দেন প্রমোদরঞ্জন। লন্ডনের ডেনমার্ক স্ট্রিটের একটি চীনা রেস্তোরাঁর পিছনে দিকের ঘরে বসতো তাঁদের আসর। ইতিমধ্যে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসে বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক আঁরি বারবুসের নেতৃত্বে ম্যাক্সিম গোর্কি রোঁমা রোলাঁ, আন্দ্রে মালরো, টমাস মান প্রমুখ সাহিত্যিকদের উদ্যোগে বিশ্ব ফ্যাসিবাদ বিরোধী সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে এর প্রভাবে ডেনমার্ক স্ট্রিটের আস্তানাতে গড়ে ওঠে ‘প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’ এর প্রাথমিক সংগঠন। যার ম্যানিফেস্টো রচয়িতাদের অন্যতম ছিলেন প্রমোদরঞ্জন। এই ইস্তাহারকে ভিত্তি করেই ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ্ণৌতে গঠিত হয়েছিল সারা ভারত প্রগতিশীল লেখক সংঘ।

প্রমোদরঞ্জনের পরবর্তী ঠিকানা ছিল প্যারিস। সেখানে সারবন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভারতের কৃষি বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং ১৯৩৮ সালে ‘দি ডেভেলপমেন্ট অফ ইন্ডিয়াস এগ্রারিয়ান কন্ডিশন’ এর ওপর ডক্টরের ডিগ্রি লাভ করেন। ইতিমধ্যে স্পেনে শুরু হয়ে গিয়েছিল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রিপাবলিকান সরকার ও তাদের বিরোধী জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহী বাহিনীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ (১৯৩৬)।স্পেনের পপুলার ফ্রন্ট এর বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী জেনারেল ফ্রাঙ্কোর অভিযানকে প্রতিহত করতে জোটবদ্ধ হয়েছিল কমিউনিস্ট পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল ব্রিগেড। প্রমোদরঞ্জন স্পেনে গিয়ে সেই ব্রিগেডে যোগ দেন।পড়ার টেবিলের সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে প্রমোদরঞ্জন যে-কোনো ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানবতার মুক্তকন্ঠের পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক বিপ্লবীর মতোই।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ফ্রান্সের মার্শাল পেঁতা সরকারের সহযোগিতায় জার্মানি ফ্রান্স আক্রমণ করে। ইতিমধ্যে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছিল প্রমোদরঞ্জনের। তিনি কমিউনিস্ট মুক্তিফৌজে যুদ্ধ করতে গিয়ে নাৎসিদের হাতে ধরা পড়েন এবং কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী হন। ১৯৪২ সালে সুভাষচন্দ্র যখন জার্মানিতে বসে ব্রিটিশ ভারতের বিরুদ্ধে বিরাট ভাবে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন তাঁর সঙ্গে দেখা হয় প্রমোদরঞ্জনের। নেতাজি তাঁকে নাৎসিদের হাত থেকে মুক্ত করে বার্লিনে নিয়ে গিয়ে তাঁর ফৌজের প্রচার অধিকর্তার দায়িত্ব দেন। একইসঙ্গে তিনি ‘আজাদ হিন্দ’ পত্রিকার সম্পাদনাও করতে থাকেন। সুভাষচন্দ্র তখন জার্মানিতে ‘ফ্রি ইন্ডিয়ান লিজিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপে বন্দী ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে এটি গঠিত ছিল যার মূল উদ্দেশ্য ছিল অক্ষশক্তির সাহায্যে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতকে মুক্ত করা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পতনের পর, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে, ব্রিটিশ বাহিনীর ভারতীয় সৈন্যদের হাতে প্রমোদরঞ্জন গ্রেফতার হলেন। যুদ্ধবন্দী হিসেবে দশ মাস কারাগারে অকথ্য অত্যাচার সহ্য করার পর বাবা হর্ষনাথের আবেদনে এবং জওহরলাল নেহেরুর উদ্যোগে শেষপর্যন্ত জার্মান কারাগার থেকে মুক্তি পান প্রমোদরঞ্জন। ইতিমধ্যে বার্লিনে থাকার সময়েই তিনি একজন জার্মান মহিলা, লোটিকে বিবাহ করেন। লোটি সেনগুপ্ত ছিলেন কার্ল মার্কস এর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ফ্রেডারিখ এঙ্গেলসের পরিবারের মেয়ে।

দীর্ঘ কুড়ি বছরের আন্দোলন লড়াই আত্মগোপন কারাবাসের পর দেশে ফিরে এলে কৃষ্ণনগর স্টেশন থেকে শহরের যুবকরা শোভাযাত্রা করে তাঁকে হাই স্ট্রিটে তাঁর বাড়িতে (বর্তমানে পাহাড়পুর ঔষধালয়ের বাড়ি) নিয়ে আসেন। কিন্তু দেশে ফিরেও তাঁর লড়াইয়ের জীবন শেষ হয়নি। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন বিক্ষোভ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ফলস্বরূপ তাঁর জায়গা হয় স্বাধীন দেশের কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেলে।

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই জুন নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের প্রথম দিকে কৃষক সংগ্রাম সহায়ক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন প্রমোদরঞ্জন। এটিই ১৯৬৯ সালে সি পি আই এম এল পার্টিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। মানবতার মুক্তকণ্ঠের রক্ষক হিসাবে আজীবনের সংগ্রামী প্রমোদরঞ্জন ১৯৭২ এ কলকাতায় গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি (এ পিডিআর) তৈরি হলে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন তার প্রথম সাধারণ সম্পাদক।

শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনই নয়, বাংলার প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও সক্রিয় সহযোগী ছিলেন প্রমোদ রঞ্জন। প্রগতিশীল লেখক সংঘ ছাড়াও ভারতীয় গণনাট্য সংঘ প্রভৃতি সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যুক্ত থেকেছেন, এমনকি ঋত্বিক ঘটকের ‘নাগরিক’ ছবিটির প্রযোজনাও করেছেন তিনি। নীল বিদ্রোহের শতবর্ষে লিখেছেন ‘নীল বিদ্রোহ ও তৎকালীন বাঙালি সমাজ’ লিখেছেন প্রামাণ্য গবেষণা গ্রন্থ ‘ভারতীয় মহাবিদ্রোহ: ১৮৫৭’ । ফরাসি চিন্তক রোমাঁরোলাঁর জন্ম শতবর্ষে লেখেন ’কালান্তরের পথিক রোমাঁরোলাঁ’।

১৯৫২ সালে দেশের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে অবিভক্ত সিপিআই-এর পক্ষে প্রার্থী হয়েছিলেন প্রমোদরঞ্জন। কিন্তু কংগ্রেস প্রার্থী বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের কাছে তিনি পরাজিত হন।এই সময়ে তাঁর নির্বাচনে প্রচার সহায়ক ছিলেন নদীয়ার বিশিষ্ট লেখক অজিত দাস। তিনি লিখেছেন এই নির্বাচনে পরাজয়ের পিছনে অন্যতম কারণ ছিল তাঁর ‘মেম বউ’। পাড়ায় পাড়ায় প্রচারের কাজে ঘুরতে গিয়ে অজিত বাবু এই প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেন – “মেম বিয়ে করেছেন, উনি আবার স্বদেশী কোথায়?”। নিজেদের ঘরের মানুষের কাছ থেকে এই ব্যবহারে ভীষণ মর্মাহত হয়েছিলেন প্রমোদরঞ্জন। নির্বাচনী ফলাফল জানার পর কৃষ্ণনগর জজ কোর্টের মাঠে বসে হতাশ আর অভিমানী প্রমোদরঞ্জন বলেন, ”কতকাল পর দেশে ফিরলাম। কৃষ্ণনগরকে আজীবন ভালোবেসেছি। ভেবেছিলাম বাকি জীবনটা এখানেই থাকবো। শহরবাসী আমাকে গ্রহণ করল না”। এর পরই প্রমোদরঞ্জন পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে যান। ১৯৭৪ সালের ১৮ই নভেম্বর চির বিপ্লবী প্রমোদরঞ্জন সেনগুপ্তের সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। স্বচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও মানুষের অধিকার রক্ষায় গোটা জীবনটা উৎসর্গ করে দেওয়া এই বর্ণময় চরিত্রের মানুষটিকে কি আমরা আর একটু সম্মানের সঙ্গে মনে রাখতে পারতাম না?


তথ্য ঋণ:

১.স্বাধীনতা সংগ্রামে নদীয়া।[নদীয়া জেলা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস রচনা সমিতি।১৯৭৩.]
২.কৃষ্ণনগরে কাজী নজরুল ইসলাম। অজিত দাস।
৩.সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান।(প্রথম খন্ড)
৪. প্রতিবেদন। সুব্রত পাল।

চিত্র-নির্মাণ মাধ্যম: আন্তর্জাল সংগ্রহ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x