শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বর্তমানকালের একটি অমোঘ অস্ত্র হ্যাশট্যাগ, যাহা # (হ্যাশ) চিহ্নটি দ্বারা নির্মিত। তথ্যপ্রযুক্তির একটি বিশেষ সূচিপত্রর নাম হ্যাশট্যাগ। সামান্য বিশদে, নিম্নরূপে বলা যাইতে পারে। বহু মুদ্রিত পুস্তকের শেষভাগে বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তালিকার সঙ্গে পৃষ্ঠাসংখ্যার উল্লেখ পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। পুস্তকের অগ্রভাগে নির্মিত সূচিপত্রের সহিত ইহার বৈশিষ্ট্যর পার্থক্য লক্ষণীয়। হ্যাশট্যাগ কতকটা গ্রন্থের অন্তসূচি, যাহা বৈদ্যুতিন তথ্যভান্ডারে পৃথক তালিকাভুক্ত হইয়া সঞ্চিত থাকে। এটি এমন প্রক্রিয়ায় নির্মিত হয়, যাহাতে অত্যন্ত দ্রুততার সহিত কোন একটি শব্দকে আবিষ্কার করিয়া বাহিরে আনয়ন সম্ভব। গ্রন্থের অন্তসূচির ন্যায় প্রতিটি শব্দের সহিত সেই শব্দটির উল্লেখিত মূল অনুচ্ছেদ অথবা ছবিটির অবস্থানের ডিজিট্যাল ঠিকানা সংশ্লিষ্ট থাকে, যাহাতে পাঠক সহজে তাহার উদ্দিষ্ট শব্দের পোস্টসমূহ খুঁজিয়া পান। একই সঙ্গে যে সকল শব্দের উপস্থিতি এবং জনপ্রিয়তার আধিক্য অর্জিত হয়, সেই সকল শব্দের হ্যাশট্যাগ অ্যালগোরিদম পরবর্তী পাঠক অথবা দর্শকের সম্মুখে অনায়াসে আনয়ন করিয়া থাকে। ফলতঃ হ্যাশট্যাগকৃত শব্দের জনপ্রিয়তা বহুগুণিতকে বর্ধিত হইতে থাকে।

দীর্ঘ সময় সরণীতে, প্রতি বৎসর নূতনের আবির্ভাব হইয়া থাকে, এবং তজ্জনিত পুরাতন নাগরিক আপনার প্রাচীনত্ব অনুধাবন করিয়া অপার বিস্ময় বোধ করিয়া থাকেন। ইহাই প্রকৃতির নিয়ম, ইহাকে জয় করিবার ক্ষমতা বা স্পর্ধা কোন প্রজন্মের করায়াত্ত হয় নাই।

সম্প্রতি ভারতবর্ষ, নূতন প্রজন্মের যে আন্দোলন সংগঠিত হইতে প্রত্যক্ষ করিল, তাহার কতিপয় বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, যাহার পূর্বে সম্যক দর্শন হয় নাই।

এই আন্দোলন সংগঠিত হইয়াছে সমাজ মাধ্যমের ভার্চুয়াল দেওয়ালে। বিশেষ করিয়া ইনস্টাগ্রাম নামক মাধ্যমটিতে। এই মাধ্যমে কেবলমাত্র ছবি, ক্ষুদ্র ভিডিও নির্ভর প্রচার, দাবানলের ন্যায় নব্য প্রজন্মকে উদ্বেলিত করিয়াছে। ছবি অথবা ভিডিও ছিল মূলতঃ কার্টুন নির্ভর এবং তৎসংলগ্ন হ্যাশট্যাগ।

এমত অবস্থায় এই আন্দোলনে ব্যবহৃত হ্যাশট্যাগের একটি তালিকা প্রস্তুত করিলে বুঝিতে সুবিধা হইতে পারে। তালিকাটি সংখ্যাধিক্যর ক্রমানুসারে পরিবেশিত হইলঃ
#CockroachJantaParty
#CJP
#CJPProtest
#GenZ
#GenZRevolution
#StudentsProtest
#ExamLeaks
#EducationNotCorruption
#JobsNotJumlas
#YouthForChange
#SaveEducation
#ResignDharmendraPradhan
#KyaBoltiPublic
#Government
#CommunicationStrategy
#PoliticalCommunication ইত্যাদি।

উপরোক্ত শব্দবন্ধগুলি নিরীক্ষণ করিলে, অনায়াসে আন্দোলনের অভিমুখ সম্পর্কে সম্যক ধারণা সম্ভব। যেহেতু আন্দোলন সংগঠিত হইয়াছে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সমাজ মাধ্যমে, সেইহেতু ইহার পর্যালোচনা করিতে প্রযুক্তির সাহায্য লইতেই হইবে। আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও বিধেয় অনুমান নির্ভর নয় বস্তুনিষ্ঠ তথ্যনির্ভর হইয়া ওঠে। যে আন্দোলনের ভিত্তি আন্তর্জালিক মাধ্যম, তাহার প্রচার এবং প্রসার তাৎক্ষণিক অগ্নিবৎ গ্রাস করিবে, সংশয় নাই।

আইস-এজ, স্টোন-এজ, এগ্রিকালচার-এজ, ব্রোঞ্জ-এজ, আয়রন-এজ হইতে পার করিয়া বর্তমান প্রজন্মকে স্ক্রিন-এজ বলিলে অত্যুক্তি করা হইবে না। এঁরা হ্যাশট্যাগের ভাষাতেই ভাব প্রকাশ করিয়া থাকেন। #feelingHappy #lovingHaHa #breakup #lonely ইত্যাদি মণিমুক্তা সমাজ-মাধ্যমের স্ক্রিন জুড়িয়া ইতস্তত ছড়াইয়া আছে।

তথ্যপ্রযুক্তির ভাষায় আন্তর্জালের অন্তর্ভুক্ত একটি যন্ত্র হইতে অপর একটি যন্ত্রকে সংকেত আদানপ্রদান করিতে একটি বিশেষ নির্দেশ ব্যবহৃত হয়- PING (Packet Internet Groper)। কোন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী এই শব্দটি ব্যবহার করিয়া দুটি যন্ত্রের ভিতর সংযোগ পরীক্ষা করিয়া থাকেন। এই প্রজন্মের সন্তানেরা অনায়াসে শব্দটিকে অন্যান্য বহু হ্যাশট্যাগের ন্যায় নিজ ভান্ডারে স্থান দিয়াছেন। প্রায়শঃই তাহাদের বলিতে শোনা যায়, “বাড়ি ফিরে আমাকে পিং দিস।” “মাঝেমাঝে একটু পিং করলেও তো ভাল লাগে।” “হ্যাশট্যাগ ফিলিং হ্যাপি।” ইত্যাদি।

উনিশশো সাতচল্লিশ হইতে একটি করিয়া বৎসরের দূরত্ব বর্ধিত হয়, আর ভারতবাসী ভাবিতে আরম্ভ করেন, স্বাধীনতা কী? তাহা হইতে আমাদিগের কী উদ্দেশ্য সাধিত হইল?

না পাওয়ার তালিকা দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইতেই পারে, তথাপি একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিঃশ্বাস লইবার মৌলিক অধিকার, নাগরিক এরূপ আত্মস্থ করিয়াছেন যে তাহার কিঞ্চিৎ স্খলন, পুস্করিণী হইতে উত্থাপিত মীনের ন্যায় প্রতীয়মান হইতে থাকে। বর্তমান প্রজন্মকৃত এই আন্দোলন পূব-প্রজন্মকে মূলসমেত শিহরিত করিয়া তুলিয়াছেন, ইহাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই।

আন্দোলনের পরিণতি, তাহার সাফল্য অথবা ব্যর্থতা বিচার করিতে এই রচনার অবতারণা করা হয় নাই। ইহা নৈর্ব্যক্তিক অবস্থান হইতে সভ্যতার চলন পরিলক্ষিত করার এক সামান্য প্রচেষ্টা। স্বাধীনতা দিবস, ভারতীয় অস্তিত্বের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অতএব, উক্ত সময়বিন্দুতে অবস্থান করিয়া সমাজের চলন দেখিতে আগ্রহ জন্মে। ইহা ভাল না মন্দ সময় বলিবে, আপতত প্রার্থনা, নূতনের আবাহনে চতুর্দিকে জয়ধ্বনি ঘোষিত হউক।

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Ruchi Ghosh
Ruchi Ghosh
1 month ago

যথাযথ সম্পাদকীয়। প্রাসঙ্গিক।

শৌভিক দে
শৌভিক দে
1 month ago

সম্পাদক মহাশয়কে অশেষ ধন্যবাদ। ‘#’ ট্যাগের কাহিনী জ্ঞাতার্থে আনিয়া তিনি আমাদিগকে বাধিত করিলেন। এ কথা সত্য যে যুগের অভিমুখ বড়ই দ্রুততার সহিত বদলাইতেছে। এই গতির সহিত আমাদের সাযুজ্য থাকেনা এবং সতত দিক ভ্রমিত হইতে হয়। তাছাড়া কুন্ঠা বশত অবোধ্য বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করিতে পারি না। আপনি তাহা বুঝিয়াছেন। এমত আধুনিক শব্দাবলীর অর্থ যদি মাঝে মধ্যে আমাদের ন্যায় অপোগন্ডের দৃষ্টি স্বচ্ছ করে – আপনি অনন্ত সাধুবাদ পাইবেন। ঈশ্বর, আল্লা, ইশা মসিহ কিম্বা গুরু গোবিন্দ আপনার মঙ্গল করুন।

Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
1 month ago

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুই বদলে যেতে থাকে। পুরনোরা জায়গা ছেড়ে দেয় নতুনদের।যুগের সন্ধিক্ষণে থাকা আমরা সব সময় নতুন অনেক কিছু সম্যক বুঝতে না পেরে থতমত খেয়ে যাই।সম্পাদকীয় এই বিষয়টি আমাদের নতুন যুগের ভাষা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করল। অতএব, এটি একটি প্রয়োজনীয় কাজ বলেই মনে হল।

3
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x