শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

শব্দরাজি ছুটিয়া বেড়ায়। হৃদয়ে, শোনিতে, মজ্জায়, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে। তাহার নিস্তার নাই। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় সম্মোহিত পাঠকের অনুরূপ অবস্থা। কিয়ৎকাল ভাবনায় প্রতিভাত হইতে পারে, স্বাভাবিক জীবনে আগ্রহ হউক। এক্ষণে জ্ঞানলাভ আবশ্যিক হইয়া পড়ে, স্বাভাবিক বলিতে কী প্রতীয়মান হয়? আর পাঁচজন যেমন করিয়া বাঁচিয়া রহিয়াছেন, প্রত্যহ বাজার করিয়া, রান্না চড়াইয়া, সন্তানের জন্ম দিয়া, অতঃপর সন্তান প্রতিপালনহেতু কর্ম করিয়া, দিনশেষে শয়ন করিয়া পরবর্তী দিনটির আগমনের অপেক্ষা করিতে করিতে সুষুপ্তির আবাহনে লিপ্ত হইলেন।

এমন ‘স্বাভাবিক’ যাত্রা তো তাঁহার জীবনের কাহিনিও হইতে পারিত? ইহার অধিক আর কীইবা সাধারণের বেঁচেবর্তে থাকিবার ইপ্সিত থাকিতে পারিত? জীবনে যে মহৎ কিছু করিবার আছে, তাহার সত্যানুসন্ধান করিবেন কে? জীবনের আনন্দ খুঁজিয়া পাইবার পরিবর্তে তিনি শব্দের কোমল অথচ বিষাদ খুঁজিয়া পাইলেন। শুধু তাহাই নহে তাঁহার শব্দজন্ম, প্রজন্ম অতিক্রম করিয়া বাঙালিকে বিস্রস্ত বিভ্রান্ত করিয়া রাখিল।

কী রহিয়াছিল তাঁহার শব্দের ভিতর? কী রহিয়াছে তাহার জন্মের ভিতর? কী রহিয়া যায় কবির হৃদয়ের ভিতর? এক বহমান বিপন্নতা, যাহা উত্তরাধিকার সূত্রে গ্রাস করিয়া লয় বাংলাভাষা অবলম্বী মনুষ্য জাতিকে। তাহারা কি ভুলিয়া থাকিতে পারিতেন না? এই শব্দরাজি তাহাদের ভুলিতে দিবে না। যে মানুষ ভুল করিয়াও এই শব্দ সংস্পর্শে আসিয়াছেন, তাহার পরিত্রাণ নাই। ইহা অবচেতনে দ্রব হইয়া আমাদিগের অন্তর প্রাচীরে লগ্ন হইয়া থাকে, কোন এক আদিম শৈবালের ন্যায়। কোষবদ্ধ আত্মা শরীর সত্তার উর্ধে উঠিয়া এক অতিন্দ্রিয় উপলব্ধিকে অর্জন করিয়া লয় অনায়াসে।

শব্দ হইতে শব্দের মোক্ষণ হইতে থাকে। কোমলে বিষাদে পাঠককে একাকী করিয়া তোলে, কোটি কোটি সহনাগরিকের সহিত থাকিয়া তাহার সংযোগ স্থাপিত হয়, “একং সদ বিপ্রা বহুধা বদন্তি।” প্রতিটি অক্ষর শল্করূপী আবরণের ন্যায়, সত্য এবং মায়ার অভিলাষী মননকে স্পর্শ করিয়া অস্থির হইয়া বিরাজ করে। এই অস্থিরতা পাঠককে জাগ্রতকালেই স্বপ্নের প্রতি আকর্ষণ করে, অপরপক্ষে স্বপ্নের ভিতর পরাবাস্তবের ভূমি প্রস্তুত করে। সেই ভূমি, স্বপ্ন ও জাগরণের মধ্যবর্তী কোন স্থান, যেখানে কেবলমাত্র কবি এবং কবিতাস্নাত পাঠকের প্রবেশাধিকার রক্ষিত হয়, অতি যত্নে।

পক্ষান্তরে জীবনানন্দ, গদ্য নির্মাণে অনেকাংশে বাস্তব নির্ভর, পদ্যের ন্যায় পরাবাস্তবতা লালন করেন নাই। তাহার গদ্যের চলন ধীর। মূল চরিত্রেরা নিঃসঙ্গ এবং হতাশাগ্রস্ত। যাপিত জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। সেখানে মধ্যবিত্ত সমাজের অস্বস্তিকর চিত্র উপস্থাপিত হয়। মূলতঃ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লষণে জারিত হয়, তাঁহার সৃষ্ট উপন্যাস। কেবলমাত্র গল্প উপন্যাস নয়, তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধও রচনা করিয়াছেন। নিজস্ব কাব্য ভাবনা বিধৃত করিয়াছেন। সমাজ ও সাহিত্য লইয়া তাঁহার ব্যক্তিগত উপলব্ধির কথাও লিখিয়া রাখিয়াছেন।

তিনি আমাদের কী দিয়া গেলেন? কোন অসম্পূর্ণ কাব্য নির্যাস, যাহা সমসময়ের ‘বিশ্বকবি’-কেও নিরাশ করিয়াছিল? জন-মানুষের অগোচরে তোরঙ্গ আবদ্ধ করিয়া রাখিয়া গেলেন ঘুমন্ত অক্ষরের বীজ! ক্রমে সে সকল শব্দেরা অঙ্কুর বাহির করিল, কবি জানিতেও পারিলেন না। হয়তো তিনি জানিতে চাহিলেনও না। সততঃ প্রবহমান বাতাসের ন্যায় অনিশ্চিতের হাত ধরিয়া প্রস্থান করিলেন। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের ঐকান্তিকতায় পাঠক রহিল আজীবন অশান্তির আবডালে।

তথাপি তাঁহাকে যাপন করিতেই হয়। বঙ্গদেশের অন্যান্য মহীরুহদিগের ন্যায় তাঁহার দেবত্বপ্রাপ্তি হয় নাই। বরিশালের নদীতীরের বিষণ্ণ রৌদ্রস্নাত রোগা শালিকের বেশে জীবনানন্দ ঘুরিয়া বেড়াইবেন। ইহাই তাঁহার পার্থিব বিচরণের ক্ষেত্র। কবি-র তাহার অধিক চাহিদা নাই। তথাপি বাঙালি ছিদ্রান্বেষী। রবিঠাকুরের নূতন বৌঠানের ন্যায়, কবিপত্নী লাবণ্য এবং শোভনার সমীকরণ খুঁজিতে যতটা উদগ্রীব, কবির সৃষ্টির প্রতি সমধিক উৎসাহ খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না।

কর্মকুশল মানবকূলে তিনি একজন কবি, যেন চিরবিহ্বল, সদাকুন্ঠিত উপস্থিতি লইয়া এক বিড়ম্বিত অধ্যায়ের প্রতিভূ হইয়া তাঁহার সমকালে একলা হাঁটিলেন। অধ্যাপক পরিচিতি লইয়াও ছাত্রদিগের সম্ভ্রম আদায় করিতে অসমর্থ রহিলেন। সকল প্রকার বাঁচিবার অনুষঙ্গে জড়াইয়া রহিল এক ‘বিপন্ন বিস্ময়!’ যা একমাত্র তিনি প্রতিষ্ঠা করিতে পারিয়াছিলেন নিজস্ব জীবন আর শব্দের কাঠামোয়।

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
9 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Ruchismita Ghosh
Ruchismita Ghosh
5 months ago

খুবই যথাযথ বিশ্লেষণ কবি জীবনানন্দকে নিয়ে। ভালো লাগল।

Ruchismita Ghosh
Ruchismita Ghosh
5 months ago

কবি জীবনানন্দকে নিয়ে সঠিক বিশ্লেষণ। খুব ভালো লাগল সম্পাদকীয়।

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Ruchismita Ghosh
5 months ago

অনেক ধন্যবাদ

শৌভিক দে
শৌভিক দে
5 months ago

অহো কি অপরূপ লিখন। জীবনানন্দ প্রসঙ্গে কলম খুলিয়া সম্পাদক যেন আরেকটি জীবনানন্দীয় নির্মান করিয়াছেন। গদ্য হইলেও ইহাতে পদ্যের নির্যাস, অতিন্দ্রীয়বাদের সুলুক সন্ধান। ‘ রচনা ‘ সুন্দর, অথচ কোনো বালখিল্য প্রভ উক্তি নাই, সমাহিত বোধির প্রকাশ পরিলক্ষিত হইতেছে। এতদ্দেশে এ এক বিরল সংযোজন। সম্পাদকের জয় হউক।

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  শৌভিক দে
5 months ago

আপনি পড়ছেন জেনেই সুখ

Dwaipayan Goswami
Dwaipayan Goswami
5 months ago

ভালো লাগলো

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Dwaipayan Goswami
5 months ago

অনেক ধন্যবাদ বন্ধু

Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
5 months ago

নিজের উপস্থিতি নিয়ে কুণ্ঠিত থেকে গিয়েছিলেন পরিবারে,সমাজে,সমসাময়িক কবিকুলে।তাঁর কাব্যভাষা অতুলনীয়, সমসময়ে নিতান্তই বেমানান।কিন্তু অন্তরের গভীরে কতটা আত্মপ্রত্যয় ছিল বলেই না অমন সুটকেসের কালাধারে যক্ষের ধনের মত সঞ্চিত রেখে গিয়েছিলেন ওঁর রচিত সম্ভার,আগামীর কোন সাহিত্যপ্রেমীর আবিষ্কারের আশায়।সম্পাদকীয় খুব সুন্দর হয়েছে।

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Chandan Sen Gupta
5 months ago

অনেক ধন্যবাদ, ভাল থাকবেন