শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

ছবি ও কাঠের আড়বাঁশি

(১) ছবি

— কি খুঁজছো সারা বিছানায় এতো ছবি ছড়িয়ে রেখে?

— ছবি খুঁজছি।

— কি ছবি? তোমার সেই রক্তকরবী’র সাদাকালো ছবি?

— হোক না সাদাকালো। আমি তো রঙ দেখতে পাই ওতে। ফুল পড়লে যে বেতের ঝুড়িতে কুড়িয়ে আনতাম সেটাও দেখতে পাই। দেখি হালকা গোলাপী রঙের দোতলা বাড়িটা। সামনে সারাবাড়ি ঘিরে কতরকম রঙের পপি লাগিয়েছিল বাবা। গেটে মাধবীলতা জারবেরা জড়িয়ে দিয়েছিলো। দেখেছো তো, লোহার ঘোরানো সিঁড়ি আছে ছাদ পর্যন্ত। মাঝে মাঝে সেখানে বসে দেখতাম, চোখ জুড়িয়ে যেতো। ছাদে ঘুড়ি কেটে এসে পড়লে, সুতো গুটিয়ে ঘুড়ি শুদ্ধ রেখে দিতাম চিলেকোঠার ঘরে, টুকুন, আমার পিসতুতো ভাই এলে দিতাম ওকে, দুজনে মিলে ঘুড়ি ওড়াতাম… এসব গল্প তো শুনেছো আমার কাছে।

কিন্তু, আজকে যে গল্পটা বলবো সেটা অন্য। আজকে যে ছবিটা খুঁজছি সেটাও অন্য। আছে কি না তাই মনে করতে পারছি না, কিন্তু খালি মনে হচ্ছে আছে…

ছবিতে আমি আর পাশের বাড়ির অনন্ত, রক্তকরবীর সামনে দাঁড়িয়ে, আমি জড়িয়ে ধরেছি ওর হাত, ও কেমন জড়োসড়ো হ’য়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ছবিটা কে তুলে দিয়েছিলো মনে করতে পারছি না, বাবা বোধহয়। সে ছবিটায় রঙ ধরাতে পারি নি। ইচ্ছে করতো খুব, কিন্তু অনন্ত’র ইচ্ছে করেনি।

— বিকেল পড়ে এলো, আমি যাই একটু হেঁটে আসি, তুমি তোমার অনন্তর সাথে কথা বলো।

— আজ যেও না। একটু থাকো আমার কাছে।

অপরাজিতা জড়িয়ে ধরেছেন তাঁর হাত। কমলেশ সামান্য জড়োসড়ো হয়ে পড়লেন। তবে অনন্তর মতন নয়।

(২) কাঠের আড়বাঁশি

কালো পাথুরে ইঁটের দশফুটের রাস্তা। দু’পাশে সার সার পোড়ামাটির গোলটালি ছাওয়া একতলা দোতলা বাড়ি। সূর্য পশ্চিমে হেলতে হেলতে দু’দণ্ড যখন হাঁফ ছাড়ে, সে রাস্তার দুই পাশ জুড়ে সব বাড়িদের ঢেউ ঢেউ ছায়া প’ড়ে থাকে, আর ঠিক মাঝরাস্তা জুড়ে লম্বা একফালি রোদ ঝিমুনি দেয় তখন। ওই তখনই, সে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়, তার কাঠের আড়বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে এখান থেকে লম্বা সেই নদীর প্রান্ত পর্য্যন্ত হেঁটে যায় না ভেসে যায় কে জানে! জানা যায় নদীর পাশে দাঁড়িয়ে তার রাগ-অনুরাগের শেষটুকু শেষ ক’রে সেদিনের সেই বাঁশি ভাসিয়ে দেয় নদীর জলে। নদীকে অনুরোধ ক’রে বলে, সুর বেঁধে যে বাঁশি তোমায় দিলাম, পৌঁছে দিও ওকে ওর অরণ্যের কাছে। যদি নতুন প্রাণ পায়, যদি আরো ঝাঁকিয়ে ঝাঁপিয়ে ওঠে গাছপালা। দেখি না দু’জনে চেষ্টা ক’রে।

রোজ রোজ নতুন সুর বুকে ক’রে নদী যায়, ভেসে যায় তাহাদের কাছে।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


2 1 vote
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
3 months ago

এবারকার গল্প দুটো খুব সুন্দর হয়েছে।অনেকটা কবিতার মত লাগছে। আবেশটা থেকে যায় বেশ কিছুক্ষণ।শুভেচ্ছা রইল আগামীর জন্য।

Anindya Sanyal
Anindya Sanyal
Reply to  Chandan Sen Gupta
3 months ago

আন্তরিক ধন্যবাদ।🙏🏼🌿