যে ত সর্বাণি কর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরাঃ
অনন্যেনৈব যোগেন মাং ধ্যায়ন্ত উপাসতে।।
তেষামহং সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ
ভবামি ন চিরাৎ পার্থ ময্যাবেশিতচেতসাম।।
যে সকল মানুষ সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করিয়া থাকেন, আমাকে আশ্রয় করিয়া অনন্য যোগ সহকারে আমার ধ্যানে নিরত হইয়া উপাসনা করিয়া থাকেন, হে পার্থ, আমি আমার উপর স্থির-চিত্ত সেই সকল মানুষকে, এই মৃত্যুসঙ্কুল সংসার সাগর হইতে অচিরেই উদ্ধার করিয়া থাকি।
কে বলিলেন? স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। কোথায় বলিলেন? যুদ্ধক্ষেত্রে।
যেখানে কিয়ৎকাল উপান্তে ঘটিবে রক্তক্ষয়ী ভ্রাতৃঘাতী সংগ্রাম, সেই প্রান্তরে দাঁড়াইয়া তিনি শোনাইলেন ভক্তির কথা। তিনি জানাইলেন আশ্বাসবাণী। তাঁহাকে অবলম্বন করিলেই সর্বক্লেশ দূরীভূত হইবে।
ভারতীয় দর্শন অনুসারে, এমন করিয়া ভক্তকে পার করিবার কথা, একমাত্র তিনি-ই বলিতে পারেন। তৎক্ষণাৎ ভক্ত আপ্লুত হইয়া লুটাইয়া পড়ে, সংসার সাগরে তরণী ভাসাইবার সাহস খুঁজিয়া পায়।
ভক্ত আর ভগবানের যুগ্ম সম্পর্কে ভক্তির মাধ্যমে এক যোগসূত্র রচিত হয়। আবহমানের সেই ভক্তি সময়ের সহিত তাহার স্বরূপ পরিবর্তন করিয়া চলে। নব্য বাস্তবতার নিরিখে ভক্ত খুঁজিয়া লইতে চায় তাহার চিরন্তন অভিধা কে। বর্তমান কালে যখন প্রত্যক্ষ ভগবত দর্শনের উপায় নাই, তখন মানুষের ভক্তির ঢল বাধা পাইয়া নিত্য নতুন কালের লোক লৌকিকতায় নির্মিত হইতে থাকে। ভগবান ক্রমে লোকাচারে আসিয়া অলৌকিক হইতে নিতান্ত আপনজনের রূপ পরিগ্রহ করেন। যেমন বাল গোপাল হইয়া বাৎসল্যরসে ভক্তকে অধিকার করেন। বঙ্গদেশে তেমনই দেবী দুর্গা আসিয়া কন্যা উমা-র রূপ ধারণ করিয়াছেন।
দেবত্বর দূরত্ব, ঘুচাইয়া উমা হইয়া ওঠেন একান্ত আটপৌরে ঘরোয়া সম্পর্কের মানুষ, পূজা অর্চনার সহিত যাহার নিকট আব্দার ভালবাসা উভয়ই সহজ।

অতঃপর দুর্গার পিতৃগৃহে আগমন উপলক্ষ করিয়া এই পূজা, ক্রমে উৎসবের রূপ ধারণ করিল। পৃথিবীব্যাপী বাঙালীর অন্তঃস্থলে জাগরিত হইল এক অনির্ববচনীয় ফল্গু স্রোত, যাহাতে বার্ষিক অবগাহনে সে সঞ্জীবনীসুধা লাভ করিয়া তৃপ্ত হয়।
পারিবারিক ব্যক্তিগত পরিসর হইতে বাহির হইয়া দুর্গোৎসব অদ্য সর্বজনীন আকার ধারণ করিয়াছে। একই সঙ্গে যুক্ত হইয়াছে পূজার সহিত জড়িত সৃষ্টিশীল মানুষের প্রভূত কর্মকান্ড। প্রতিটি মন্ডপ নিজনিজ মহিমায় সজ্জিত হইয়া অপরূপ উত্তরণে উদ্ভাসিত। এমন একটি উৎসব কেন্দ্র করিয়া শিল্পকলার বিচ্ছুরণ, ধর্মীয় আচরণ অতিক্রম করিয়া বাঙালীর বৌদ্ধিক সত্তার প্রকাশ ঘটায়। হৃতগরিমা রোমন্থন ব্যতীত আমরা যৌথভাবে আজও যে সৃষ্টিশীল কাজে ব্যপৃত হইতে পারি, দুর্গাপূজা যেন কতকটা তাহারই নজির বহন করিয়া থাকে।
ভক্তিমার্গের যে ঘোষণা দিয়া রচনা সূচনা হয়, এই পর্বে আসিয়া তাহার কি নিবৃত্তি ঘটিল? ভক্তিমার্গের সহিত বিশ্বাসের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। অর্জুন সহ সমগ্র ভক্তকুল শ্রীকৃষ্ণের আশ্বাসকে ধ্রুবক মানিয়া, শ্রীকৃষ্ণ তথা সমগ্র দেববর্গকে সংসারসমুদ্রের যাবতীয় দুর্দশার উদ্ধারকারীর পদে বরণ করিয়া নিশ্চিন্তে থাকিতে ইচ্ছুক। কিন্তু হায়! তাহাতে কি মনুষ্যজতির সুরাহা হইয়া থাকে? সকলেই অনুধাবন করিতে পারি যে, সময়ের ধারার সহিত উত্তরোত্তর সমস্যা বৃদ্ধি হইয়াই চলিয়াছে। এই সমস্যা যেন দেবতাদিগেরও সাধ্যাতীত প্রতীয়মান হইতেছে। অতএব সমাজের চালিকা শক্তি রূপে ভক্তের প্রাধান্য অদ্য ক্রমহ্রাসমান। একই সঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষা ও নানাবিধ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলস্বরূপ মানুষের যুক্তিবোধ জাগ্রত হইতেছে, যাহা বিশ্বাস ও অন্ধবিশ্বাসের ফারাক করিতে সাহায্য করিয়া থাকে। পক্ষান্তরে, বর্তমান ভারতবর্ষে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করিতে ধর্মীয় উপকরণ সহ ভক্তিমার্গ ব্যবহার করিবার অভিসন্ধি পরিলক্ষিত হয়। দুর্গোৎসব উপলক্ষে আয়োজক সংস্থাকে ভাতাজীবির পরিধিতে আনিয়া, তাহাকে নির্বাচনমুখী মুনাফা লাভের প্রক্রিয়াজাত পদার্থে পরিণত হইতে হয়।
সাধারণ মানুষ এই প্রস্তাবনার উপাদানমাত্র। না আছে তাহার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর না আছে স্বীয়সত্তাকে পৃথক রাখিবার আত্মবিশ্বাস। অগত্যা ধর্ম ও জিরাফের সমন্বয় সাধন করিতে করিতেই দিনাতিপাত করিয়া থাকে।
শারদোৎসবের প্রাককালে রবিচক্রের সুধী পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীকে জানাই প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
(এখন থেকে প্রতি মাসের ১৫ তারিখে পত্রিকা প্রকাশিত হবে)
[crime against woman]


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com


শেষ হয়েও হল না তো শেষ। বেশ মসৃণভাবে চলতে চলতে হঠাৎ যেন গতি স্তব্ধ হয়ে গেল । আকাঙ্ক্ষা বেড়ে গেল।
ভালো থাকবেন।🙏
আপনি পড়ছেন জেনেই সুখ।
সত্যিই, এই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে। সম্পাদকীয় স্তম্ভের স্বল্প পরিসরে একটু ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।