শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

রেলপথের পাঁচালী 

বাঙালির কাছে দুর্গা পুজোর সঙ্গে রেলগাড়ির সম্পর্ক অনেকটা বিয়েবাড়ির সঙ্গে লুচি ভাজার গন্ধের সম্পর্কের মতো। পুজো মানেই বাড়ি ফেরা, আবার পুজো মানেই বাড়ি ছেড়ে দাও ছুট। পুজো কাছাকাছি এলেই, উত্তরে না দক্ষিণে, পাহাড়ে না সমুদ্রে, নাকি স্রেফ শিমুলতলা, মধুপুর, কারমাটার, যাওয়া হবে এবার তাই নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে পলিটবুরোর মিটিং । মোদ্দা কথা পুজো মানেই একদল মানুষ ট্রেনে চেপে শহর ছেড়ে দূর দূরান্তে পালানো আর একদল মানুষের দূর দূরান্ত থেকে বাড়ি ফেরা । যখন বৃটিশরা রেল কোম্পানিগুলো চালাতো তখনই তারা বুঝতে পেরেছিল বাঙালির পুজো আসা মানে রেল কোম্পানিগুলোর কাছে বাড়তি মুনাফা কামানোর সময়।

রেলের শারদীয়া বিজ্ঞাপন

এখনও হয়ত ছবিটা একেবারে পালটিয়ে যায় নি ।

তবে কিনা মনুষ্য-চরিত্র এবং ট্রেন-চরিত্র দুটোই এতটাই বদলে গেছে যে ট্রেনে চাপা নিয়ে বাঙালির কোনো রোমান্টিকতা আর অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না । দুরন্ত না নাকি বন্দেভারত কার খাওয়াটা বেশি ভালো, কার সিটটা বেশি আরামদায়ক এই সব বাছবিচার করতে করতে সে ভুলেই গেছে পুরোনো দিনের ট্রেনে চাপার মধ্যে ছিল এক আশ্চর্য রকমের যাত্রাপথের আনন্দগান ।

বুদ্ধদেব বসু একটি লেখায় লিখেছিলেন – রেলগাড়ি আমাদের শুধু একটা ইস্টিশন থেকে আর একটা ইস্টিশানেই নিয়ে যায় না, বাস্তব থেকে রূপকথাতেও নিয়ে যায় ।

আমার মতো সেকেলে লোকেরা আশা করি বুদ্ধদেববাবুর সঙ্গে একমত হবেন ।

পৃথিবীর নানা দেশে নানান রকমের ট্রেনে চড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে বটে, কিন্তু তবুও আমার কাছে এখনও রেলগাড়ি শব্দটা শুনলে মনে ভেসে আসে দুপাশে সবুজ ধানের ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে হাই পিচের সুরেলা বাঁশির সুর বাজাতে বাজাতে একটু হেলে দুলে চলে যাচ্ছে একটা ট্রেন । আর তার চাকার শব্দ যেন বলছে – যাচ্ছি আমি যাচ্ছি দূরে…… যাচ্ছি আমি যাচ্ছি দূরে…।

এই চাকার শব্দও বলতে মনে পড়ে গেল একটা গল্প। একবার রানী চন্দ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ট্রেনে চেপে কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি হঠাৎ দেখলেন রবীন্দ্রনাথ জানলার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলে চলেছেন । রানী চন্দ-র কৌতূহল হলো, কী বলছেন তিনি । জিজ্ঞেস করে বসলেন – কী সব বলছেন ? কবি বললেন “ শুনছিস না, ট্রেনের চাকায় শব্দ হচ্ছে … সেনগুপ্ত-দাশগুপ্ত…… সেনগুপ্ত-দাশগুপ্ত …… সেনগুপ্ত-দাশগুপ্ত “

কী আশ্চর্য দেখুন এই ভদ্রলোকই আবার ওই রেলের চাকার ছন্দ মিলিয়েই লিখেছিলেন –

“এ প্রাণ, রাতের রেল গাড়ি

দিল পাড়ি –

কামরায় গাড়ি-ভরা ঘুম

রজনী নিঝুম । …… “

আবার এই ভদ্রলোকই মুঙ্গেরে কলেরা রোগে তাঁর প্রিয় পুত্রের মৃত্যুর পরের দিন যখন ট্রেনে করে শান্তিনিকেতন ফিরছেন, সেদিন ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল- আকাশ জোৎনায় ভেসে যাচ্ছে । তখন তাঁর উপলব্ধি

“…… কোথাও কিছু কম পড়েচে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি – সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারই মধ্যে। সমস্তর জন্যে আমার কাজও বাকি রইল । যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে । সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনোখানে কোনো সূত্র যেন ছিন্ন হয়ে না যায় – যা ঘটেচে তাকে যেন সহজে স্বীকার করি, যা কিছু রয়ে গেল তাকেও যেন সম্পূর্ণ সহজ মনে স্বীকার করতে ত্রুটি না ঘটে।”

ওঁর কথায় পরে আবার আসা যাবে, আপাতত আমরা রেলগাড়ির কথায় ফিরে আসি ।

আসলে বাঙালির সামাজিক ইতিহাস যে কয়েকবার বাঁক নিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল গোটা দেশটার সঙ্গে এই বঙ্গদেশের রেলপথের মাধ্যমে জুড়ে যাওয়া।

এমনিতে বাকি ভারতবর্ষের সঙ্গে বাংলার আত্মিক, সামাজিক, ধার্মিক, সাংস্কৃতিক সব দিক থেকেই খানিকটা বিচ্ছিন্নতা ছিল। এমন কি বাঙালি যখন ইয়োরোপের সভ্যতার সঙ্গে পরিচয় ঘটতে শুরু হয়েছে তখনও উত্তর ভারত বা দক্ষিণ ভারত নিয়ে বাঙালির তেমন আগ্রহ নেই । অবশ্য ভ্রমণ করার নেশাটা বাঙালির ছিল ।

দেবেন্দ্রনাথের যে ভ্রমণের নেশা ছিল আমরা সবাই জানি । তিনি প্রায়ই হিমালয়ে চলে যেতেন । কিন্তু যখন রেল আসেনি তখন তিনি হিমালয় অবধি পৌঁছাতেন কি করে এই প্রশ্ন অনেকের মনে জাগতেই পারে । তাঁর আত্মজীবনী থেকে সেই অংশটুকু পড়লে সেকালের বিনা রেলের ভ্রমণ কেমন হত তার কিছুটা ধারণা হতে পারে ।

যখন তিনি হিমালয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেন, তখন তিনি প্রথমে কলকাতা থেকে কাশী অবধি গেছলেন নৌকায় চেপে। ভাড়া লেগেছিল একশো টাকা । ১৭৭৮ শকের ১৯শে আশ্বিন ( ১৮৫৬ সালের ৩রা অক্টোবর ) তিনি রওনা হলেন। পথে নবদ্বীপ, মুঙ্গের, পাটনা এই সব জায়গা দেখলেন । তারপর কাশী পৌঁছালেন । কাশী পৌঁছতেই সময় লাগলো প্রায় দেড় মাস।

কাশীতে নেমে সিকরোলের দিকে হাঁটতে লাগলেন। সঙ্গের পরিচারকরা জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে চলল। যেতে যতে একটি ফাঁকা বাড়ি দেখে সেই বাড়িতেই থেকে গেলেন। তখনও জানেন না বাড়িটি কার । পরের দিন দেখলেন কাশীর বিখ্যাত বাঙালি রাজেন্দ্র মিত্রের ছেলে গোপীনাথ মিত্র এসে হাজির । ওটা তাদেরই বাড়ি । তিনি দেবেন্দ্রনাথকে প্রচুর খাতির করলেন এবং ফাঁকা বাড়িটিকে বাসযোগ্য করার জন্য যা যা করা দরকার সবই করে দিলেন । কাশীতে দিন দশেক থাকলেন দেবেন্দ্রনাথ। সঙ্গে যে সব চাকরবাকর এসেছিল, দু জন ছাড়া সবাইকেই নৌকায় ফেরত পাঠিয়ে দিলেন । তারপর ১৭ই অগ্রহায়ন একটা ডাকগাড়ি ভাড়া করে চললেন এলাহাবাদ । এলাহাবাদে দুই একদিন থেকে ওখান থেকে ২২ শে অগ্রহায়ন পৌঁছালেন আগ্রা। আগ্রায় তাজমহল দেখলেন । দুদিন বিশ্রাম করলেন । তারপর যমুনা দিয়ে জলপথে চললেন দিল্লীর দিকে। এগারো দিন জলপথে যাত্রা করে পৌঁছালেন মথুরায় । সেখান থেকে বৃন্দাবন হয়ে দিল্লী পৌঁছলেন ২৭ শে পৌষ । সেখানে একটা বাড়ি ভাড়া করলেন ।

সেখানে কুতুব মিনার দেখতে গেলেন। একেবারে উপরে উঠে দিল্লীর শোভা দেখে মুগ্ধ হলেন। তারপর আবার ডাকগাড়ি ভাড়া করে দিল্লি থেকে প্রথমে লাহোর তার পর অমৃতসরে পৌঁছালেন । গুরুদ্বারা দেখে এবং শবদ কীর্তন শুনে মুগ্ধ হলেন । সেখানে বেশ কিছুদিন থাকলেন । তারপর সেখান থেকে সিমলার উদ্দেশে রওনা হলেন ৯ই বৈশাখ । কালকাতে পৌঁছলেন ১২ই বৈশাখ ( ২০শে এপ্রিল ১৮৫৭) । সেখান থেকে ১৬ই বৈশাখ ঝাঁপানে চেপে রওনা হলে সিমলার দিকে। দু-এক দিনের পরে সেখানে পৌঁছলেন ।

অর্থাৎ ১৮৫৬ সালের ৩রা অক্টোবর কলকাতা থেকে রওনা হয়ে তিনি সিমলা পৌঁছলেন ১৮৫৭ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে । অবশ্য তিনি অন্তর্বর্তী অনেক জায়গাতে কিছুদিন করে থেকেছিলেন ।

এদেশে রেল এসেছিল লর্ড ডালহৌসির উদ্যোগে, এ কথা আমাদের জানা। এ দেশে তার আগমন বৃত্তান্ত জানার আগে আমরা একটু তার বিদেশে জন্মলগ্নের কথাটা জেনে নিই ।

স্কটিশ ইঞ্জিনিয়ার জেমস ওয়াটের সেই কেটলির ঢাকনা বাষ্পের জোরে কেঁপে ওঠা দেখে স্টিম ইঞ্জিনের তত্ত্ব মাথায় আসার কথা তো আমাদের ছোটো বেলায় বইয়ে পড়া।

জেমস ওয়াট

সেটা ছিল ১৭৬৫ সালের ঘটনা। তবে এই তত্ত্বের পেটেন্ট পেতে কয়েক বছর লেগে যায়। ১৭৭৫ সালে তিনি স্টিম ইঞ্জিন বানিয়ে সেই তত্ত্বের বানিজ্যিকীকরণ করতে পেরেছিলেন । কিন্তু তাঁর আবিষ্কারের কথা জানাজানি হয়ে গিয়েছিল ইতিমধ্যেই। ফরাসী দেশে ১৭৭১ সালে যখন নিকোলাস যোসেফ নামের এক প্রযুক্তিবিদ একটা স্টিম ইঞ্জিন বানিয়ে সবাইকে তাঁর কেরামতি দেখাবার চেষ্টা করছিলেন, তখন সে ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল । তাতে একজন দর্শকের ভালরকম আঘাত লাগে। এর ফলে নিকোলাসের হাজত বাস হয়।

কিছুদিন পরে উইলিয়াম মারডক নামের এক স্কটল্যান্ডের বাসিন্দা স্টিম লোকোমোটিভ বানানোর চেষ্টায় হাত লাগান। তিনি একটি চার্চের সামনে তাঁর বানানো যন্ত্রটি চালানোর চেষ্টা করেন । কিন্তু এবারে সেই যন্ত্রটি প্রচুর ধোঁয়া বার করতে করতে এলোমেলো ছুটতে থাকে । তা দেখে চার্চে উপস্থিত লোকেরা তো প্রথমে প্রচুর ভয় পেয়ে যায় । তারপর একটু সামলে নিতেই তারা মারডকের উপর খাপ্পা হয়ে তাকে বেদম প্রহার করলেন ।

এই ঘটনাটি নিয়ে চারিদিকে প্রচুর আলোড়ন হল। বাষ্পীয় শকটের বিরুদ্ধে নানান বিরুদ্ধ মত গড়ে উঠতে লাগল । কেউ বললে এর থেকে যে কালো ধোঁয়া বেরোয় তাতে পাখিরা মারা যাবে । কেউ বললে এতে যা উত্তাপ সৃষ্টি হয় তাতে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে । কেউ বললে এই এই বাষ্প শকট চালু হলে গোরু দুধ দেবেনা, দিলেও তা টকে যাবে, গাছ পালারা বড় হবে না।

কোনো কোনো চিন্তাশীল ব্যাক্তি আবার সংবাদ পত্রে লিখলেন – এই শকট চালু হলে মানুষে মানুষে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে, স্থানীয় আইন কানুন বলে কিছু থাকবে না, এখনকার জীবনযাত্রার ছন্দটাই নষ্ট হয়ে যাবে ইত্যাদি ।

আসলে সে সময় মানুষের একটু দূরে যাতায়াতের জন্যে ছিল ঘোড়া বা ঘোড়ার গাড়ি। তাতে তো আর বেশি দূর যাওয়া যেতনা। ফলে মানুষ একটা চেনা জগতের মধ্যে থাকতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল । সেই চেনা জগত ছাড়িয়ে অচেনা জগতে যাতায়াতের রাস্তাটা খুলে ব্যপারটা কি রকম দাঁড়াবে, তা নিয়ে মানুষের মনে নানান সংশয় ছিল।

তাই নানা রকমের বিরূপ সমালোচনা হতে থাকল। কিন্তু প্রগতির গতি তো আটকে থাকে না, তাই রেলগাড়ি চালু করার চেষ্টা চলতেই থাকল। ইংল্যান্ডে জর্জ স্টিফেনসন নামের কয়লা খনির শ্রমিক নানারকমের উদ্ভাবনী চিন্তা করতেন । তাঁর মাথায় এসেছিল ট্রাম লাইনের উপর দিয়ে যদি বাষ্প চালিত ইঞ্জিন চালিয়ে কয়লা বয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে অনেক পরিশ্রম বাঁচবে । ১৮১৪ সালে তিনি একটি আস্ত স্টিম ইঞ্জিন বানিয়ে ফেললেন ।

জর্জ স্টিফেন্সনের তৈরি স্টিম লোকোমোটিভ

তাঁরই চেষ্টায় ইংল্যান্ডে ১৮২৫ সালে ডারলিংটন থেকে স্টকটন পর্যন্ত কয়লা বয়ে নিয়ে যাবার জন্যে প্রথম সফলভাবে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ব্যবহার করা হল । সেই শকট চলেছিল ঘন্টায় পনেরো মাইল গতিবেগে। মানে প্রায় মানুষের হাঁটার গতিতে, আর আজ নাকি বুলেট ট্রেন চলে ঘন্টায় ২০০ মাইল গতিতে। তবু সেদিন কিছু মানুষ কিছুতেই হাল ছাড়েনি বলেই আজ এখানে পৌঁছানো গেছে, এটা মেনে নিতে হবে।

এর পাঁচ বছর পর ১৮৩০ সালে ম্যাঞ্চেস্টার থেকে লিভারপুল প্রথম যাত্রী পরিবহন শুরু হল। তবে তখনো লোকের মন থেকে ভয় যায় নি ।ব্যাপারটা অনেকেই ভাল ভাবে নেয় নি।

প্রকৃতিপ্রেমিক কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গ্ল্যাডস্টোনকে চিঠি লিখে জানালেন – The project, if carried out will destroy the staple of the country, which is its beauty. It will prove subversive of its quiet and highly injurious to its morals ।

আপত্তি এলো আরো অনেকের কাছ থেকে । কিন্তু রেলযন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা তাতে থেমে থামেনি । জোর গতিতে চারিদিকে রেল লাইন পাতা হতে লাগল । ১৮৭০ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডে সাড়ে তেরো হাজার কিলোমিটার লাইন পাতা হয়ে গেল । এবং রেলগাড়ি হয়ে উঠল সে দেশে সবচেয়ে বড় গনণপরিবহন ব্যবস্থা ।

তবে শুধু ইংল্যান্ডেই নয়। ফ্রান্সে রেলপথ শুরু হল ১৮২৯ সালে, জার্মানিতে ১৮৩৫ সালে, আমেরিকায় ১৮৩০ সালে, হল্যান্ড আর ইটালিতে ১৮৩৯ সালে, আর রাশিয়ায় ১৮৩৭ সালে ।

এবারে ভারতের কথায় আসি । পলাশির যুদ্ধের একশো বছর পেরিয়ে যাবার পরেও ইংরেজ কিন্তু এই বিরাট দেশে ছড়িয়ে থাকা বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এদেশের অর্থনীতিকে ঊর্ধ্বগতি দেওয়ার কোনো চেষ্টা দেখায় নি। যদিও ইংল্যান্ডের বণিককুল এ ব্যপারে আগ্রহ দেখিয়েছে বার বার । ইয়োরোপে রেল ব্যবস্থা সার্থকভাবে চালু হয়ে যাবার পর ইংল্যান্ডের বণিকরা আবার দাবী জানাল ভারতে তিনটে বন্দর বোম্বাই, মাদ্রাজ, কলকাতাকে যদি ভারতের বিশাল পশ্চাৎ-ভূমির সঙ্গে যুক্ত করা যায় তাহলে একটা ব্যবসার বিশাল সুযোগ উন্মুক্ত হতে পারে । যুক্তিটা অনেকেই মানলেন । খোদ লর্ড ডালহৌসি এ ব্যাপারে উৎসাহ দেখালেন ।

লর্ড ডালহৌসি

আমেরিকার তুলো চাষে প্রবল মন্দার কারণে ম্যানচেস্টার এবং গ্লাসগো শহরের ব্রিটিশ সুতো ব্যবসায়ীদের ভারতে উৎপন্ন উৎকৃষ্ট তুলোর ওপরে নজর পড়ে।

ডালহৌসি প্রস্তাব দিলেন – “England is calling aloud for cotton which India does already produce in some degree and will produce sufficient in quality and plentiful in quantity , if only they were fitting means of conveyance for it for distant plains to the several ports adopted for its shipment “

এই fitting means of conveyance দিয়ে জুড়ে দেওয়ার কাজটা যে একমাত্র রেলপথ এতে কারো সন্দেহ থাকলো না ।

কিন্তু সমস্যা হল পুঁজি । সরকার এত বড় পুঁজিনিবেশে আগ্রহী নয় । ওদিকে বৃটিশ পুঁজিপতিরা মনে করল এত বড় দেশে রেলপথের জন্য পুঁজি নিবেশ করাতে ঝুঁকি আছে প্রচুর । শেষ পর্যন্ত সরকার একটি গ্যারান্টি প্রথা চালু করল, যাতে পুঁজি নিবেশ করে যদি নিবেশকারীরা লাভ পাঁচ শতাংশের কম হয় তাহলে সরকার পাঁচ শতাংশ থেকে যত কম লাভ হবে ততটা ভর্তুকি দেবে । এ ব্যাপারে লর্ড ডালহৌসির উৎসাহ ছিল প্রবল।

শেষ পর্যন্ত পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম যাত্রীবাহী রেল শুরু হল ১৮৫৩ সালের ১৬ই এপ্রিল । বোম্বে থেকে থানে পর্যন্ত একুশ মাইল পথ রেল চলতে শুরু করল , গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসিউলার রেলওয়ে কোম্পানির তত্বাবধানে। এই কোম্পানির একজন ডাইরেক্টর ছিলেন জর্জ স্টিফেনসন, সেই যিনি ইংল্যান্ডে রেল ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছিলেন।

ভারতের প্রথম রেলযাত্রা বম্বে থেকে থানে

এখন প্রশ্ন হল প্রথম রেল চলার গৌরবটা তো রাজধানী কলকাতারই পাওয়ার কথা । তার জায়গায় সেটা বোম্বাই পেল কেন?

আসলে কলকাতা থেকে রানীগঞ্জ অবধি রেল লাইন পাতার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ১৮৫০ সালে ।এবং সেটা হয়েছিল দ্বারকানাথ ঠাকুরের আগ্রহে । তিনি তখন বেশ কয়েকটা কয়লা খনি কিনেছেন । এ দেশের প্রথম মাল্টি-ন্যাশানাল কোম্পানি কার- টেগোর কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন । তিনি শুধু এই রেললাইন পাতার আগ্রহই দেখান নি, এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের এক-তৃতীয়াংশ তিনি সংগ্রহ করে দিতে রাজী হয়েছিলেন । কিন্তু পরে যে কোনো কারণেই হোক দ্বারকানাথ এই প্রকল্প থেকে পিছিয়ে আসেন । আর এর কিছুদিন পরেই তিনি বিলেতে যান এবং সেখানে তাঁর অকালপ্রয়াণ ঘটে ।

এদিকে আর একটি প্রকল্পে ১৮৫১ সালে কলকাতা থেকে পান্ডুয়া অবধি রেল লাইন পাতা হয়ে যায় । কথা ছিল এই লাইন দিয়ে ভারতের প্রথম রেল চালু হবে সেই মতো সব ব্যবস্থা হয়েছিল । কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি কারণ, প্রথমত রেলের কামরাগুলি যে জাহাজে আসছিল সেটি গঙ্গাসাগরে কাছে ডুবে যায়। দ্বিতীয়ত এই লাইনে চলার জন্যে ইংল্যান্ড থেকে যে ইঞ্জিনটি জাহাজে করে পাঠানো হয়েছিল তা ভুল করে অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। পরে অবশ্য সেটিকে আবার অস্ট্রেলিয়া থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয় । কিন্তু ততদিনে অনেকটা সময় চলে গেছে। তৃতীয়ত, ইতিমধ্যে আরো একটি সমস্যা দেখা দিল। পান্ডুয়া যেতে হলে চন্দননগর পেরিয়ে যেতে হবে । আর চন্দননগর তখন ফরাসীদের দখলে । ফরাসীদের সঙ্গে তখন ইংরেজদের সম্পর্ক বেশ খারাপ। ফরাসীরা তাদের জমি দিয়ে ট্রেন চালাতে দেবে না জানিয়ে দিল। এই সমস্যা অবশ্য আলোচনা করে একটা মীমাংসায় আসা গেল । কিন্তু অনেকটা সময় নষ্ট হল। এই সময়ে বোম্বাইয়ে রেল চালু হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ১১ই আগস্ট ১৮৫৪ সালে কয়েকজন বৃটিশ সাংবাদিকদের নিয়ে পরীক্ষামূলক ভাবে ট্রেন চলল হাওড়া থেকে হুগলি অবধি। সাংবাদিকরা কাগজে লিখলেন যে এই রেলযাত্রাটি তারা উপভোগ করেছেন । ১৪ই আগস্ট কলকাতার বেঙ্গল হরকরা এবং ইন্ডিয়া গেজেট নামের দুটি খবরের কাগজে একটি বিজ্ঞাপন বেরোলো ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের তরফ থেকে । জানানো হল – এ মাসের ১৫ তারিখে হাওড়া থেকে সকাল ১০-৩০ এবং বিকেল ৫-৩০ মিনিটে হাওড়া থেকে হুগলির উদ্দেশে ট্রেন ছাড়বে । আর ফিরতি পথে হুগলি থেকে ট্রেন ছাড়বে সকাল ৮-৩০ মিনিটে এবং ৩-৩৮ মিনিটে । ট্রেন থামবে বালী, শ্রীরামপুর আর চন্দননগর স্টেশনে।

আরো জানানো হল, যারা কম টাকায় মাসিক টিকিট কাটতে চান তারা স্টেশনে ফর্ম পাবার জন্যে লিখুন ।

দেখা গেল প্রায় তিন হাজার লোক দরখাস্ত করেছে, যদিও সিট ছিল কয়েক শো লোকের ।

১৫ই আগস্ট ১৮৫৪ সালের সকালে দেখা গেল হাওড়া থেকে হুগলি গোটা রাস্তা জুড়েই দু পাশে হাজার হাজার লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে দেখল, ট্রেন নামের এক বিচিত্র যন্ত্র মাথার উপর ভক্‌ভক্‌ করে কালো ধোঁয়া ওগরাতে ওগরাতে, আর সঙ্গে আবার আগুনের ফুলকিও ছড়াতে ছড়াতে এক দৈত্যের মতো এগিয়ে চলেছে প্রবল বেগে ।

হাওড়া স্টেশন ১৮৫৪

হাওড়া থেকে হুগলি প্রথম শ্রেণির ভাড়া ছিল তিন টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণির ১ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণির ভাড়া ছিল সাত আনা।

যদিও হাওড়াতে রেলের অন্তিম স্টেশন হল, কিন্তু হাওড়ার বাকি অংশ তখন গন্ডগ্রাম। রেলের টিকিট কাটার অফিস ছিল গঙ্গার এই পারে আরমেনিয়াম ঘাটে। সেখানে টিকিট কেটে লঞ্চে করে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছাতে হত । লঞ্চের ভাড়া অবশ্য টিকিটের মধ্যেই ধরা থাকত। আলাদা করে দিতে হত না ।

হুতোমের নক্সাতে এই লঞ্চে উঠে যাওয়ার এবং টিকিট কাটার একটি সরস বর্ণনা আছে , সেটি এই রকম –

“টুনুনাং ন্টাং টুনুনাং ন্টাং করে রেলওয়ে ইশটিম ফেরী ময়ুরপঙ্খীর ছাড়বার সঙ্কেত ঘন্টা বাজছে, থার্ড ক্লাস বুকিং অফিসে লোকের ঠ্যাল মেরেচে, রেলওয়ের চাপরাশীরা সাপসপ বেত মাচ্চে, ধাক্কা লাগাচ্চে, তথাপি নিবৃত্তি নাই । “ মশাই শ্রীরামপুর! “বালি বালি !” “বর্ধমান মশাই ! আমার বর্ধমানটা দিন না“ শব্দও উঠছে , চারিদিকে কাঠের ব্যাড়াঘেরা বুকিং ক্লার্ক সন্ধ্যাপূজার অবসরমত ঝোপ বুঝে কোপ ফেলচেন। কারও টাকা নিয়ে চার আনার টিকিট ও দোয়ানি দেওয়া হচ্চে, বাকি চাবা মাত্র চোপ রও ও নিকালো , কারো শ্রীরামপুরের দাম নিয়ে বালির টিকিট বেরুচ্চে , কেউ টিকিটের দাম দিয়ে দশ মিনিট চীৎকার কচ্চে , কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই । কমফরটর মাথায় জড়িয়ে ঝড়াক ঝড়াক করে কেবল টিকিট নম্বর দেবার কল নাড়চেন,সিস দিচ্চেন ও উপরি পয়সা পকেটে ফেলচেন। পাইখানার কাটা দরজার মতো ক্ষুদে জানলাটুকুতেও অনেকে হুজুরের মুখ দেখতে পাচ্ছে না যে কথা কয়ে আপনার কাজ লয় । যদি কেহ চীৎকার করে ক্লার্কবাবুর চিত্তাকর্ষণ কত্তে চেষ্টা করে , তখনি রেলওয়ে পুলিশের পাহারাওয়ালা ও জমাদারেরা গলা টিপে তাড়িয়ে দেবে । এদিকে সেকেন্ডক্লাস গুডস লাগেজ ডিপার্টমেন্টেও এই প্রকার গোল, সেখানেও ক্লার্ক বাবুরাও কতকএই প্রকার, কিন্তু এতো নয়। ফাস্টক্লাস সাহেবের বিবির স্থল, সেখানে টুঁ শব্দটী নাই, ক্লার্ক রিক্ত হস্তে টিকিট বেচতে আসেন ও সেই মুখেই ফিরে যান , পান তামাকের পয়সারও বিলক্ষণ অপ্রতুল থাকে।”

প্রথম দিকে রেলে যাত্রা করা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা রকমের ভয় ছিল। সংস্কার-আচ্ছন্ন দেশে সেটা খুব অস্বাভাবিক নয় । সেই সময় বাঙালিদের মধ্যে যে কজন বিজ্ঞানমনষ্ক এবং যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্ততম ছিলেন অক্ষয় কুমার দত্ত ।

অক্ষয় কুমার দত্ত-র বইয়ের প্রচ্ছদ

১৮৫৪ সালের আগস্ট মাসে যখন এই বাংলায় রেল-যাতায়াতের সূচনা হল, তখন মানুষের মন থেকে অযথা আশঙ্কা দূর করার জন্য এবং সেই সঙ্গে রেলে যাতায়াত করতে গেলে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে তা সাধারণ মানুষকে অবহিত করার জন্য তিনি একটি ১৮ পৃষ্ঠার পুস্তিকা রচনা করেন, যেটি ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ ছাপাখানা থেকে মুদ্রিত হয়েছিল। সেই পুস্তিকাটির নাম ছিল – “যাঁহারা কলের গাড়ী আরোহন করিয়া গমন করেন, তাঁহাদের তৎ-সংক্রান্ত বিঘ্ন নিবারণের উপায় প্রদর্শন।”

এটি সেই সময়টাকে বোঝার জন্যে একটি অতি মূল্যবান দলিল হয়ে রয়ে গেছে ।

এই পুস্তিকাটিতে অক্ষয় দত্ত মশাই যেমন পাশ্চাত্য প্রযুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন আবার সেই সঙ্গে স্বদেশবাসীকে এই বলে সতর্ক করেছেন যে “ কিন্তু নরলোকে নিরবিচ্ছিন্ন কল্যাণকর পদার্থ অতীব দুর্লভ । শুভাশুভ একত্রে এতাদৃশ মিলিত হইয়া রহিয়াছে , যে তাহাদিগকে পরস্পর পৃথক করা অসাধ্য বলিয়া বোধ হয়। … অশেষ শুভ-সাধক বাষ্পীয় রথেও মধ্যে মধ্যে বিঘ্ন ঘটিয়া অনেক ব্যাক্তি হত ও আহত হইয়া থাকে…।”

এর পরে তিনি বুঝিয়ে বলেছেন কী কী সাবধানতা অবলম্বন করলে এই হত বা আহত হবার আশঙ্কা কমানো যেতে পারে ।

বাংলার প্রথম আধুনিক কবি এবং সম্পাদক ‘সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকায় লিখলেন –

“টাকা ছেড়ে থাবড়ায়

পার হয়ে হাবড়ায়

চালিয়েছে রেলওয়ে পথে

হুগলির যাত্রী যত

যাত্রা করি জ্ঞান হত

কলে চলে স্থলে জলে সুখ। বাড়ি নহে বেশী বড়ো দূর

অবিলম্বে পায় পুর

হয় দূর সমুদয় দুখ”

কিছুদিন পরে বাঙালির সঙ্গে আর এক রেলের খুব নিকট আত্মীয়তা গড়ে ওঠে । স্ট্যান্ডার্ড গেজ বা ব্রড গেজ রেললাইনের পাশাপাশি উপশিরার মতো কিছু ছোট আকারের মিটার গেজ ও ন্যারো গেজ রেললাইন ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার গ্রামে গঞ্জে। এদের মধ্যে সবচেয়ে নাম করেছিল ‘ম্যাকলিয়ড রাসেল অ্যান্ড কোম্পানি’ এবং ‘মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি’। খুব কম পুঁজিনিবেশ করে ও গ্যারান্টি মানির সাহায্যে এই প্রশাখা লাইনগুলো বসানো সম্ভব ছিল।

উনিশ শতকের শেষের দিকে বাংলার রেল নেটওয়ার্ক

এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘মার্টিন রেল’। হাওড়া, হুগলির গ্রামাঞ্চলের বিরাট সংখ্যক মানুষের কাছে তো বটেই, পরবর্তী কালে বারাসত-বসিরহাট লাইট রেলওয়ে চালু করে তিনটি জেলার মানুষের কাছে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল এই লাইট রেলওয়ে।

কার-টেগোর কোম্পানির পর ব্রিটিশ-বাঙালি যৌথ মালিকানায় গড়ে উঠেছিল মার্টিন লাইট রেলওয়ে। ইংরেজ ব্যবসায়ী টমাস অ্যাকুইনাস মার্টিনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই রেল-পরিষেবা গড়ে তুলেছিলেন বাঙালি উদ্যোগপতি স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ১৮৯০ সালে তাঁরা গড়ে তোলেন তাঁদের কোম্পানি ‘মার্টিন অ্যান্ড কোং’। ইনিই বার্নপুরে ইস্পাত কারখানা গড়ে তোলেন ।

এর মধ্যে একটি রুট ছিল হাওড়া থেকে আমতা । আর একটি ছিল শ্যামবাজার থেকে হাসনাবাদ ।

নিত্যযাত্রী ছাড়াও কাঠ, পাট, মাছ, দুধ, মাদুর ও কৃষিজ পণ্যও নিয়ে যেত এই লাইনের গাড়িগুলি। হকারদের জন্যেও এই ট্রেন খুব সুবিধেজনক ছিল। ট্রেনের মধ্যে তো বটেই এমনকি ছাতে বসা যাত্রীদের কাছেও তারা গরম তেলেভাজা , গরম চা নিয়ে সহজেই পৌঁছে যেতে পারত। হাওড়া আমতা লাইনে মাজুর ‘খৈচুর’, জগৎবল্লভপুরের পান, মাকড়দহের চা, ডোমজুড়ের তেলেভাজা, আমতার পান্তুয়া ছিল নিত্যযাত্রীদের কাছে খুব প্রিয়। ছোটো ছোটো স্টিম ইঞ্জিন এবং পাঁচ কামরার এই ট্রেন বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে একেবারে মিলে মিশে গিয়েছিল। কিন্তু এই ট্রেনের দুর্বল জায়গা ছিল এর গতি । শ্যামবাজার থেকে বসিরহাট যেতে সময় লাগত চার ঘন্টা। যখন বাস এবং ইএম ইউ কোচের লোক্যাল ট্রেন চালু হল তখন এই ট্রেনের যাত্রী কমে যেতে লাগলো এবং একসময় তা অলাভজনক হয়ে গেল। এখন কেবল পুরোনো গল্প উপন্যাসে এবং কিছু পুরোনো সিনেমায় এই ট্রেনের স্মৃতি ধরা আছে । ১৯৬৯ সালে তৈরি দীনেন গুপ্ত ‘নতুন পাতা’ সিনেমায় অনেকখানি জুড়ে আছে এই মার্টিন রেল। ১৯৭১ সালের ধন্যি মেয়ে সিনেমার সেই গান – ‘সব খেলার সেরা বাঙালির ফুটবল’, এখনও মনে করিয়ে দেয় এই রেলের কথা।

বাঁকুড়া- দামোদর ন্যারোগেজ লাইনের ট্রেন

সব কিছুরই প্রথম অবস্থায় কিছু দন্তোদ্‌গম সমস্যা থাকে। বয়স বাড়লে তা কমতে থাকে। প্রথম দিকের রেল কোম্পানিগুলির জন্যেও তাই হয়ে ছিল। একটি সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে ১৮৫৫ সালে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রথম শ্রেণিতে ৪৬৭, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১১৮৪ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ৫৮৬৪ যাত্রী যাতায়াত করেছেন। এর পরের বছর সাতেকের মধ্যেই, তৃতীয় শ্রেণির যাত্রীসংখ্যা ছিল মাত্র ৬১,৮১৭ ও দ্বিতীয় ২৯,৯৮২। এই ভাবেই রেলের লাইন পাতা বাড়তে লাগল, নতুন নতুন ট্রেন বাড়তে লাগল, নতুন নতুন জায়গা রেলের নেটওয়ার্কের মধ্যে জুড়ে যেতে লাগলো । আজ প্রায় এ দেশে ১৩০০০ যাত্রীবাহী ট্রেন চলে।

১৮৫৩ সালে যখন বৃটিশরা মুলত তাদের তুলো এবং কাপড়ের ব্যবসা বাড়াবার জন্য এদেশকে রেললাইন দিয়ে জুড়ে দেবার কথা ভাবছিল, তখন কার্ল মার্ক্স নিউ ইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন কাগজে একটি লেখায় লিখেছিলেন –

“রেলওয়ে ব্যবস্থা থেকে প্রসূত আধুনিক শিল্পায়ন, বংশগত শ্রমবিভাগ যার ভিত্তিতে ভারতের জাতিভেদ প্রথা দাঁড়িয়ে আছে, এবং যা ভারতবাসীর প্রগতি ও ক্ষমতার পথে চুড়ান্ত বাধাস্বরূপ তাকে ভেঙে ফেলবে । “

কার্ল মার্কসের প্রথম ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হয়েছে বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়টিও সত্যি হবার কথা ছিল। কিন্তু পুরোপুরি হয়নি, কিছু রাজনৈতিক দল কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠীর পশ্চাৎমুখী চিন্তা ও দর্শনের ফলে । সেই প্রসঙ্গ এখানে তোলা বেমানান হবে।

পথের পাঁচালি ছবির ট্রেনের দৃশ্য

তার চেয়ে এই নিবন্ধের প্রথম দিকে যে বলেছিলাম রবীন্দ্রনাথের কথায় পরে আসব, সেই তাঁর কথা দিয়েই শেষ করি এই নিবন্ধ।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম ট্রেন যাত্রার প্রসঙ্গে আসা যাক। সেটা ছিল ১৮৭৩ সাল। রবীন্দ্রনাথের বয়স এগারো। এর আগে কলকাতার বাইরে যাওয়ার সুযোগ ঘটেছে, একবারই। সেটা পেনেটিতে এক বাগান বাড়িতে। এবার সুযোগ ঘটলো একেবারে পিতার সঙ্গে হিমালয় যাওয়ার । সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের সবে পৈতে হয়েছে। নেড়া মাথায় স্কুল যেতে বেশ সংকোচ লাগছিল। এই রকম একটা সময়ে পিতার সঙ্গে হিমালয় যাওয়ার সুযোগটা তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো।

কিছুদিন আগে সমবয়সী ভাগ্নে সত্যপ্রকাশ ট্রেনে চেপে বোলপুর ঘুরে এসেছে। সে ট্রেন যাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছে। তাই বালক রবির ট্রেন চড়া নিয়ে একটু ভয় ছিল মনে মনে। অবশ্য ট্রেনে উঠে বুঝলেন সত্যপ্রকাশ অনেকটাই বাড়িয়ে বলেছিল। ট্রেনে চাপা ব্যাপারটা মোটেই ভয়ংকর কিছু নয়।

তবে সেই ট্রেন যাত্রায় এমন একটি ঘটনা ঘটে ছিল যা রবীন্দ্রনাথ কোনোদিন ভুলতে পারেন নি। সেই গল্পটা রবীন্দ্রনাথের কাছেই জেনে নিয়ে এই নিবন্ধ শেষ করবো।

“বোলপুর হইতে বাহির হইয়া সাহেবগঞ্জ, দানাপুর, এলাহাবাদ, কানপুর প্রভৃতি স্থানে মাঝে মাঝে বিশ্রাম করতে করিতে অবশেষে অমৃতসর গিয়া পৌঁছিলাম।

পথের মধ্যে একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল যেটা এখনো আমার মনে স্পষ্ট আঁকা রহিয়াছে। কোনো একটা বড় স্টেশনে গাড়ি থামিয়াছে। টিকিট পরীক্ষক আসিয়া আমাদের টিকিট দেখিল। একবার আমার মুখের দিকে চাহিল। কী একটা সন্দেহ করিল, কিন্তু বলিতে সাহস করিল না। কিছুক্ষণ পরে আর একজন আসিল; উভয়ে আমাদের গাড়ির দরজার কাছে উসখুস করিয়া আবার চলিয়া গেল। তৃতীয়বারে বোধহয় স্বয়ং স্টেশন মাস্টার আসিয়া উপস্থিত। আমার হাফ-টিকিট পরীক্ষা করিয়া পিতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এই ছেলেটির বয়স কি বারোর অধিক নহে?” পিতা কহিলেন “না “। তখন আমার বয়স এগারো। বয়সের চেয়ে নিশ্চয়ই আমার বৃদ্ধি কিছু বেশি হইয়াছিল। স্টেশন মাস্টার কহিল “ইহার জন্যও পুরা ভাড়া দিতে হইবে” । আমার পিতার দুই চক্ষু জ্বলিয়া উঠিল। তিনি বাক্সো হইতে তখনই নোট বাহির করিয়া দিলেন। ভাড়ার টাকা বাদ দিয়া অবশিষ্ট টাকা যখন তাহারা ফিরাইয়া দিতে আসিল সে-টাকা লইয়া ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিলেন, তাহা প্লাটফর্মের পাথরের মেজের উপর ছড়াইয়া পড়িয়া ঝন ঝন করিয়া বাজিয়া উঠিল। স্টেশনমাস্টার অত্যন্ত সঙ্কুচিত হইয়া চলিয়া গেল । টাকা বাঁচাইবার জন্যও পিতা যে মিথ্যা কথা বলিবেন, এ সন্দেহের ক্ষুদ্রতা তাহার মাথা হেঁট করিয়া দিল।”

 

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Ruchi Ghosh
Ruchi Ghosh
10 months ago

রেলকাহিনি বড় ভালো লাগল। অনেক তথ্য, অনেক গল্প এবং কিছু স্মৃতি উসকে দিল রেলভ্রমণ নিয়ে। লেখককে ধন্যবাদ।

Ruchi Ghosh
Ruchi Ghosh
10 months ago

রেলকাহিনি বড় ভালো লাগল। অনেক অজানা তথ্য, গল্প এবং রেলভ্রমণ নিয়ে কিছু স্মৃতি ফিরে এলো। লেখককে ধন্যবাদ।