শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

“তবু অশুভ বাক্য নয়…”

“আমি খুবই দারিদ্র্য! কিছু সাহায্য করুন।”
সাহায্যপ্রার্থী মানুষটি লোকমুখে শুনিয়াছিল, বিদ্যাসাগর মহাশয় মহাপন্ডিত এবং অতি দানশীল, ওঁনাকে প্রভাবিত করিতে কিঞ্চিত প্রমিত ভাষার অবলম্বন করিয়াছে। কিন্তু পেটে বিদ্যা না থাকিলে যাহা হয়, বিশেষ্য বিশেষণে গোল বাধিয়া গেল। ইহাতে ফল যাহা অবশ্যম্ভাবী, তাহাই ঘটিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় ভর্ৎসনা করিয়া কহিলেন “তা আপনার আ-কার দেখেই বোঝা যাচ্ছে।”
এই গল্পটি মহাজনের জীবনের সত্য ঘটনা নাকি কল্পিত উপাখ্যান, জানা নাই, তথাপি উল্লেখ করিতেই হইল।

সত্য বলিতে, দীনতার বিজ্ঞাপন আজ ভাষার সর্বত্র প্রতীয়মান হয়। আমরা অর্থাৎ অধিকাংশ সহনাগরিক, বাংলা ভাষা হইতে অতি দূরে চলিয়া আসিয়াছি। সেখানে নাই চর্চা, নাই শ্রদ্ধা, যাহোক করিয়া হিন্দি ইংরাজি মিশাইয়া কিছু বলিলেই হইল।

শিশুকাল হইতে পরিবেশ, পড়াশোনা সব কিছু হইতেই আহরণ করিতে করিতে আমাদিগের শব্দ ভান্ডার বর্ধিত হয়। সেই শব্দ সমাহার ঠিক কোন সময় কোনটি জিহ্বাগ্রে আসিবে, তাহাও সৃষ্টি হয়, সচেতন এবং অচেতন, নিরলস চর্চার মাধ্যমে। দৈনন্দিন কথা প্রসঙ্গে আমরা তাৎক্ষণিক যাহা পাই তাহাই বলিয়া দিই। মস্তিষ্কের একটি প্রকোষ্ঠ শব্দভান্ডারের জন্য নির্দিষ্ট থাকে, সেই ভান্ডার এই শব্দ জোগানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। আমাদিগের যেইরূপ শব্দ সেই স্থলে সংগ্রহীত হইবে, মস্তিষ্ক সেই সকল শব্দ সম্ভার আমাদিগের নিকট উন্মুক্ত করিবে।

একটি স্বর্ণকলসে যদি আমরা পুরীষ সংগ্রহ করি, তাহা উল্টাইলে পুরীষই নির্গত হইবে, মিষ্টান্ন কদাপি নহে।
অতএব মনুষ্যরূপে আমাদিগকে সচেতন সিদ্ধান্ত লইতে হইবে, আমাদের শরীরের সর্বাধিক উৎকৃষ্ট অঙ্গ, মস্তিষ্ক নামক স্বর্ণকলসে কী রাখিব?
এমন নয় যে, অপভাষা কেবল সমকালীন সংস্কৃতি! যুগযুগ ধরিয়া বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ, নিজ নিজ বাচনিক ক্রিয়ায় অপভাষা প্রয়োগ করিয়া আসিতেছে। ইহার অন্যতম একটি কারণ, সে নিজেকে বাকিদের তুলনায় স্বতন্ত্র করিতে ইচ্ছুক। ইহাতে দোষের কিছু নাই। প্রাণী মাত্রই স্বাতন্ত্র্য দাবী করতে প্রাণপাত করিয়া থাকে। সিংহ কেশর ফুলাইয়া হুঙ্কার দেয়, ময়ূর পুচ্ছ মেলিয়া নয়নাভিরাম ছাতার মতো করিয়া থাকে। এমন করিয়া মানুষও নিজের দৈনন্দিন কথায় অপভাষা প্রয়োগ করিয়া অন্যের মনযোগ আকর্ষণ করিবার চেষ্টা করিয়া থাকে। গোল বাধে, যখন এই আকর্ষণ পদ্ধতির আবর্তে নিজেই জড়াইয়া যায়। তখন সামান্য কথাতেও অপভাষার প্রয়োগ অতি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়।

অভ্যাস অতি বিষম বস্তু। পুনঃপুনঃ অপভাষার আত্তীকরণে মানুষ নিজের অজান্তেই অপভাষাকে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রূপে প্রতিষ্ঠা করে। ইহার সহিত অচিরেই চরিত্রের অপকর্ষ তাহার অন্যান্য আচরণেও প্রতিফলিত হইতে থাকে।

রুচিবোধ সন্তর্পনে সংরক্ষিত করিতে হয়।

জীবনধারণের জন্য জল একটি অপরিহার্য পদার্থ। তৃষ্ণা দূরীকরণ ব্যতীত অসংখ্য দৈনিক প্রয়োজনে আমাদিগকে জল ব্যবহার করিতেই হয়। এক্ষণে লক্ষ্যণীয়, পানীয় জলের জন্য আমরা যে পাত্র ব্যবহার করি, অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত জল কদাপি সেই পাত্রে সংগ্রহ করিনা।

অপরপক্ষে সুচিন্তা আর কুচিন্তা রাখিবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রকোষ্ঠ নাই, কারণ আমাদিগের মস্তিষ্ক নামক স্বর্ণকলস একটিই। তাই তাহাতে কী রাখিব আর কী রাখিব না নিতান্তই নিজস্ব অভিরুচি।

অতএব, গল্পে বর্ণিত কপিত্রয়ের ন্যায় কু দেখিব না, কু বলিব না, কু শুনিব না অভ্যাস করিতে পারিলেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হইতে পারে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমগ্র জীবন এই শুভবোধের সাধনায়, আমাদিগের সম্মুখে উদাহরণস্বরূপ জ্যোতিরূপে ভাস্বর, “যদি দন্ড সহিতে হয়, তবু অশুভ বাক্য নয়।”

ভারতীয় দর্শন অনুযায়ী মাত্রা, শব্দ এবং বাক্যে দেবতার অধিষ্ঠান, তাই অপশব্দের ব্যবহার উক্ত বক্তা এবং দেবতার বেদী, উভয়কে কলুষিত করে। অতএব, সাধু সাবধান।

[ছবি ও তথ্যঋণ – আন্তর্জাল]

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.