শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

অমল ধবল পালে লেগেছে


আজ শারদ প্রাতে সকলের সঙ্গে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নেবার জন্য বেছে নিলাম শরতের একটি অতি পরিচিত গান : অমল ধবল পালে লেগেছে। আমার অত্যন্ত প্রিয় এই গানটি নিয়ে অনেক কিছুই বলার আছে, কিন্তু স্থানাভাবে সব বলা গেল না। সংহত কোন বিশ্লেষণ নয়, শুধু ইতস্তত, বিক্ষিপ্ত “মনের কথার টুকরো আমার” তুলে দিলাম, সহৃদয় পাঠক নিজের মত করে “আমার মনের প্রলাপ জড়ানো” সেই কথা বুঝে নেবেন।


অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া—
দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী বাওয়া।।
কোন্ সাগরের পার হতে আনে কোন্ সুদূরের ধন—
ভেসে যেতে চায় মন,
ফেলে যেতে চায় এই কিনারায় সব চাওয়া সব পাওয়া।।
পিছনে ঝরিছে ঝরো ঝরো জল, গুরু গুরু দেয়া ডাকে,
মুখে এসে পড়ে অরুণকিরণ ছিন্ন মেঘের ফাঁকে।
ওগো কাণ্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসিকান্নার ধন
ভেবে মরে মোর মন—
কোন্ সুরে আজ বাঁধিবে যন্ত্র কী মন্ত্র হবে গাওয়া।।

প্রথমে আমরা এই গানটির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরব — যা শরতের গানে অনুপস্থিত বা নিতান্ত বিরল। শরতের গানের মধ্যে এই গানটির স্বাতন্ত্র্য নির্দেশ করাই এখানে উদ্দেশ্য।


তরণী

গানের কথাবস্তুর প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা যায় এর দৃশ্যপটের বৃহত্তম অংশ জুড়ে রয়েছে তরণীর অনুষঙ্গ। আস্থায়ীতে তরী বেয়ে চলার নয়নাভিরাম দৃশ্য, অন্তরায় চিত্রিত তার যাত্রাপথ, আভোগ অংশে চালকের স্বরূপ উন্মোচনের প্রয়াস। একমাত্র সঞ্চারীতেই তরণীর কোন অনুষঙ্গ নেই, গানের এই এক চতুর্থাংশ জুড়ে শুধুই আছে নৈসর্গিক পটভূমি।
প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুসারে এই গানে তরণীর রূপকল্পটি কোন বাস্তব দৃশ্যের চিত্রায়ণ নয়, এটি একটি রূপক। উপমেয় শরতের নীল আকাশে ভাসমান নবনীতশুভ্র মেঘমালা। শরৎমেঘের বর্ণনায় জলযানের উপমানের প্রয়োগের দৃষ্টান্ত আমরা পাই “আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়” গানটিতে (সাদা মেঘের ভেলা)। এখানে উপমেয় ও উপমানের সম্বন্ধ সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করা হয়েছে কিন্তু আমাদের আলোচ্য গানে শুধুই উপমান তরণীর উপস্থিতি এবং তার বিস্তার গানের বৃহত্তর অংশ জুড়ে — উপমেয় মেঘ সম্পূর্ণভাবে অন্তরালেই রয়ে গেছে। সঞ্চারী অংশে বর্ণিত ছিন্ন মেঘ শরতের জলহারা মেঘ নয়, এই মেঘ শরতের দিনে বর্ষার স্মৃতিবাহী জলভরা কাজল মেঘ। এই মেঘ তরণীর উপমান নয়।
এই তরণী যে শরৎমেঘের প্রতীক — তার কোন সুস্পষ্ট ইঙ্গিত কিন্তু গানের কথাবস্তুতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। গানে কোথাও “শরৎ” “শারদ” বা সমতুল কোন শব্দের প্রয়োগ নেই। শিউলি, কাশ, শিশিরসিক্ত তৃণদল প্রভৃতি শরতের পরিচিত রূপকল্পগুলিও এই গানে অনুপস্থিত। সঞ্চারী অংশে মেঘ ও রৌদ্রের খেলা রয়েছে— একমাত্র একেই শরতের রূপকল্প বলে গণ্য করা যেতে পারে। বস্তুতঃ শুধুমাত্র গানের সপ্তম কলির ভিত্তিতেই এই গানটিকে শরতের গান বলে অভিহিত করা যায়। অবশ্য এই যুক্তিও সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র নয়, কেননা বর্ষার গানেও আলো-আঁধারের সহাবস্থানের এমন চিত্রকল্প চোখে পড়ে : আজি বর্ষারাতের শেষে/ সজল মেঘের কোমল কালোয় অরুণ আলো মেশে।

অতএব তরণীকে শরৎমেঘের উপমানরূপে চিহ্নিতকরণের ভিত্তি শুধু মাত্র গীতবিতানে এই গানের শ্রেণিবিন্যাস এবং “শারদোৎসব” নাটকে এই গানের প্রয়োগ। এই গানের প্রচলিত ব্যাখ্যাটিই একমাত্র পাঠ নয়। সমস্ত তথ্য পরিহার করে যদি শুধুমাত্র গানটির কথাবস্তু অবলম্বন করে অগ্রসর হওয়া যায় তবে গানটি একটি তরণীযাত্রার গানরূপে প্রতীয়মান হবে। ভিন্ন ভিন্ন পাঠক এই তরণীর এবং তার যাত্রার ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য আবিষ্কার করতে পারেন।

সাগর

এই গানের একটি অভিনবত্ব সাগরের রূপকল্পের প্রয়োগে। শরৎ উপপর্যায়ের তিরিশটি গানের মধ্যে আমাদের আলোচ্য গানটি বাদ দিলে আর একটিমাত্র গানে “সাগর” শব্দটির প্রয়োগ ঘটেছে : তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে।
জানি গো আজ হাহারবে তোমার পূজা সারা হবে
নিখিল অশ্রু-সাগর-কূলে।
এই গানে সাগর থাকলেও সাগরযাত্রা নেই। এই সাগর পাড়ি দেওয়া যায় না, এই সাগর কোন যাত্রাপথ নয়, এই সাগর রূপক মাত্র। শরৎ উপপর্যায়ের গানের মধ্যে আমাদের আলোচ্য গানেই শুধুমাত্র “সাগরযাত্রা” আছে। শরতের লীলাস্থল সাধারণভাবে কুঞ্জকানন (শিউলিবন, কাশবন), ধানের ক্ষেত, নদীতীর। মেঘভারাক্রান্ত আকাশে শরৎরবিকিরণের প্রথম প্রকাশে আনন্দে আত্মহারা বালকের দল স্থির করতে পারে না তারা নাম না জানা কোন বনে যাবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় তাদের ক্রীড়াস্থল চাঁপাবন , তালদিঘির তীর। রৌদ্রছায়ার খেলায় মুগ্ধ বালকের দল ঘোষণা করে : “যাব না আজ ঘরে রে ভাই যাব না আজ ঘরে”। কিন্তু এই গানেও দেখা যায় তাদের অবকাশ যাপনের ক্ষেত্র নদীতীর যেখানে চখাচখির মেলা। রবীন্দ্রভাবনায় শরৎ ছুটির ঋতু, রবীন্দ্রসাহিত্যে সে প্রাত্যহিক বাস্তবতা থেকে মুক্তির বার্তা বহন করে আনে।কিন্তু এই ঘর-ছাড়ানো ডাক ঘরের চার দেওয়ালের বন্ধন থেকে মুক্তির ডাক, কখনই দেশান্তরে পাড়ি দেওয়ার আহ্বান নয়। শরতের গানে শরৎঋতু সাগরপারের বাণী বহন করে আনে না। আমাদের আলোচ্য গানটির স্বাতন্ত্র্য এইখানেই।


আলো-আঁধার / বৃষ্টি-রৌদ্র

সঞ্চারীতে প্রতীয়মান হয় বিদায়ী বর্ষার রূপ — প্রথম কলিতে অবিরল ধারাবর্ষণ, মেঘগর্জন ; পরবর্তী কলিতে কালো মেঘের মাঝে বিকীর্ণ শরতরবিকিরণ। আলো-আঁধারের, বৃষ্টি-রৌদ্রের এমন সহাবস্থান শরতের গানে নিতান্ত বিরল। “কে রয় ভুলে তোমার মোহন রূপে” গানটিতে শরৎ-আলো আর ঝড়ের মেঘের আবহ রয়েছে : শরৎ-আলোর আঁচল টুটে কিসের ঝলক নেচে উঠে,/ ঝড় এনেছ এলোচুলে।এছাড়া “কোন খ্যাপা শ্রাবণ ছুটে এল আশ্বিনেরই আঙিনায়” গানটিতে দেখা যায় শরতের রঙ্গভূমিতে বর্ষার আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত প্রবেশ। এই গানে আছে মেঘের ঘনঘোর, ছায়াবিস্তার, বাদলবাতাসের আন্দোলন। অকালবর্ষণের সুস্পষ্ট চিত্র এই গানে নেই। “লুটিয়ে-পড়া কিসের কাঁদন উঠেছে আজ নবীন ধানে” — সঞ্চারীর দ্বিতীয় কলিতে লুটিয়ে পড়া কাঁদনকে রূপকের মাধ্যমে বৃষ্টিপাতের দৃশ্যের চিত্রায়ণরূপে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, কিন্তু এটি একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা মাত্র। শরতের দিনে অবিরাম বর্ষণের সুস্পষ্ট ইন্দ্রিয়গ্রাহী চিত্রকল্প, শুধুমাত্র আমাদের আলোচ্য এই গানটিতেই আছে।

ধ্বনিগত গঠন

শুধু মর্মবস্তু নয়, সঞ্চারীর ধ্বনিগত গঠনও এই গানটিকে শরতের গানের মধ্যে একটি অনন্য স্থান দিয়েছে। এই অংশের প্রথম কলিতে ধ্বন্যাত্মক শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। “ঝরো ঝরো” ও “গুরু গুরু” ধ্বন্যাত্মক শব্দযুগলের মধ্য দিয়ে বৃষ্টিপাত ও মেঘগর্জন ধ্বনিত হয়ে ওঠে । শরতের গানে এই গানটি বাদ দিলে শরতের আর একটিমাত্র গানেই ধ্বন্যাত্মক শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। ইতিপূর্বেই একাধিকবার উল্লিখিত সেই গানটি হল ঃ তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে।
জানি গো আজ হাহারবে তোমার পূজা সারা হবে
নিখিল অশ্রু-সাগর-কূলে।

তবে উল্লেখ্য ‘’হাহা” শব্দটি বাস্তব ধ্বনির অনুকারজাত নয়, এই ধ্বন্যাত্মক শব্দটি সম্পূর্ণভাবে অনুভূতিদ্যোতক। শ্রবণেন্দ্রিয়ে শ্রুত ধ্বনির অনুকরণে সৃষ্ট ধ্বন্যাত্মক শব্দের ব্যবহার শুধুমাত্র আমাদের আলোচ্য গানেই পাওয়া যায়।

শরতের ব্যতিক্রমী পুরুষ রূপ

ওগো কাণ্ডারী কে গো তুমি ? — একটি সম্ভাব্য উত্তর মেঘতরণীর চালক শরৎঋতুরই ব্যক্তিরূপ। এখানে অধ্যাপক ক্ষুদিরাম দাসের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য ঃ “সম্ভবতঃ নীল আকাশে শুভ্র মেঘের সঞ্চরণ কবিকে এই তরী-বাওয়ার কল্পনায় প্রবৃত্ত করেছে।কাণ্ডারী ঐ শরৎ-সৌন্দর্য, এখানে তার পুরুষ-রূপ।” শরতের এই পুরুষরূপ নিতান্তই ব্যতিক্রমী। শরতের গানে আমরা শারদশোভার নারীরূপই প্রত্যক্ষ করি। কখনও শারদপ্রকৃতিকে কবি সম্বোধন করেছেন শারদলক্ষ্মী নামে (আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ) কখনও শারদসুন্দরী নামে (পোহালো পোহালো বিভাবরী); কোন কোন গানে আমরা দেখি শারদসৌন্দর্যস্বরূপিণীর অবগুন্ঠিতা রমণীরূপ (এবার অবগুন্ঠন খোল, আমার নয়ন-ভুলানো এলে) । অনেক গানে সাজসজ্জার অনুষঙ্গের মধ্যে দিয়ে নারীমূর্তিই আভাসিত ঃ আঁচল (ওগো শেফালি বনের মনের কামনা, কে রয় ভুলে তোমার মোহনরূপে, ওলো শেফালি, তোমার নাম জানি নে) ; কঙ্কণ ( শরত-আলোর কমলবনে, শরৎ তোমার আলোর অঞ্জলি) ,ওড়না (শরৎ তোমার আলোর অঞ্জলি)।“নব কুন্দধবলদলসুশীতলা” গানটির প্রতিটি বিশেষণই স্ত্রীলিঙ্গ (কুন্দধবলদলসুশীতলা, সুনির্মলা, সুখসমুজ্জ্বলা, অচঞ্চলা …) । শরতের ত্রিশটি গানের মধ্যে এই একটি মাত্র গানেই এই ঋতুর সুস্পষ্ট পুরুষরূপ দেখা যায়।


এরপর এই গানটির কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে আলোচনা করব।

মন/ ধন

অন্তরা ও আভোগে একেবারে প্রতিসম অবস্থানে “মন” — ভেসে যেতে চায় মন / ভেবে মরে মোর মন। আর দুটি তুকেই ঠিক পূর্ববর্তী কলিতে প্রতিসম অবস্থানে ‘ধন” : কোন্ সাগরের পার হতে আনে কোন্ সুদূরের ধন/ ওগো কাণ্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসিকান্নার ধন । এই “মন” ও “ধন”এর সম্বন্ধটি পর্যালোচনাযোগ্য।

মনের ভূমিকা

অন্তরা ও আভোগ উভয়ক্ষেত্রই “মন”এর অবস্থান কেন্দ্রস্থলে — তিন কলিবিশিষ্ট তুকের দ্বিতীয় কলিতে। বস্তুত সমগ্র গানেই “মন’এর “কেন্দ্রীয়” ভূমিকা পালন করছে। অন্তরা, আভোগের মত “মন” শব্দের সুস্পষ্ট উপস্থিতি না থাকলেও, আস্থায়ীতেও মনের ভূমিকাই প্রধান। “দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী বাওয়া”— এই দেখা শুধুমাত্র চোখের দেখা নয়। বস্তুতঃ ইন্দ্রিয়দৃষ্টিতে যা প্রতিভাত হয়েছে — দূর নীলিমায় সঞ্চরমাণ সেই শুভ্র মেঘমালা এই গানে অদেখাই থেকে যায়; সেই ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে যায় এক নূতনতর, গভীরতর দেখা — মনের দেখা।এখানে মনই প্রকৃত দ্রষ্টা; সেই এই তরণীযাত্রার অনুপম আলেখ্যের রচয়িতা। শুধুমাত্র সঞ্চারী অংশে “মনে”র কোনই ভূমিকা নেই। তরণীর মত মনও এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। শেষ কলিতে দেখি অরুণকিরণ এসে পড়ে “মুখে”। শরৎরবির প্রথম কিরণের স্পর্শটুকুও সম্পূর্ণভাবেই শরীরী হয়ে ওঠে। এখানে “মন”দ্রষ্টা নয় ; এখানে ইন্দ্রিয়চেতনায় বিধৃত আলো-আঁধারিতে ঘেরা শরতের নৈসর্গিক পটভূমি নির্মাণ করা হয়েছে। এই অংশটুকু বাদে গানের বাকি অংশে অর্থাৎ গানের তিন-চতুর্থাংশ জুড়ে মনেরই প্রাধান্য।

মন ও ধনের সম্বন্ধ

আস্থায়ীতে যে তরণীর দেখা মিলেছিল অন্তরায় দেখা যায় সেই সাগরপারের ধন বহন করে আনে। কিন্তু দৃশ্যপটে সেই তরণী অনুপস্থিত।“কোন্ সাগরের পার হতে আনে কোন্ সুদূরের ধন” —এখানে“আনা” ক্রিয়ার কর্তা “তরণী” , কিন্তু সে এই বাক্যে উহ্য রয়ে যায়। সুদূরের বিপুল ধনরাশি যেন সমস্ত দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে রাখে, তাই ধনবাহী তরণী সম্পূর্ণভাবে অন্তরালে চলে যায়। বলা বাহুল্য দীর্ঘ অজানা পথ পাড়ি দিয়ে এই স্বপনতরী যে ঐশর্য বহন করে আনে, তা কোন পার্থিব সম্পদ নয়, এই ধন দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে মুক্তির প্রতীক। সেই ঐশ্বর্যের কাছে প্রাত্যহিক বাস্তবের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা, সমস্ত বৈষয়িক প্রাপ্তি মিথ্যা হয়ে যায়। সেই ধনের অন্বেষনে মন এইপারের সর্বস্ব পরিত্যাগ করে সুদূর অজানা লোকের অভিসারে ধাবিত হয়। মনের ব্যাকুল প্রশ্ন ধনের উৎস নিয়ে — কোন সাগর , কোন সুদূর। তরণীকে নিয়ে কোন প্রশ্ন জাগে না, তরণীর চালক সেই ধন আহরণকারীকে নিয়ে লেশমাত্র ভাবনার উদয় হয় না। তার উপস্থিতির সামান্যতম আভাসটুকুও এখনও মেলে না।
অন্যদিকে আভোগের শুরু হয় সেই চালকের স্বরূপবিশ্লেষণে —-“ওগো কাণ্ডারী, কে গো তুমি”। আমরা এই কাণ্ডারীকে শারদসৌন্দর্যের প্রতীক বলে ব্যাখ্যা করেছি। কিন্তু যেহেতু গানের কথাবস্তুতে শারদমেঘ ও তরীর মধ্যে কোন সুস্পষ্ট সম্বন্ধ নির্দেশ করা হয় নি তাই ভিন্নতর ব্যাখ্যাও সম্ভব। । এই তরণীকে জীবনতরণী বলে ভাবা অযৌক্তিক হবে না। সেক্ষেত্রে অন্বিষ্ট কাণ্ডারী জীবনদেবতা হতে পারেন। এবার “ধন” এক ভিন্নতর তাৎপর্য লাভ করে। এই ধন অর্জন করতে হলে সাগর পাড়ি দিতে হয় না। এবার দেখা যাচ্ছে এই ধন আহরণকারী আর ধন একাত্ম হয়ে গেছে, এই তরীর কাণ্ডারী নিজেই সেই ধন; তার পরম দান সে নিজেই। এবার ধনের উৎস নিয়ে আর কোন প্রশ্ন নেই, স্থানবাচক কোন শব্দ নেই। এবার প্রশ্ন ধনের অধিকারীকে নিয়ে এই কলির দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই একটি ব্যক্তিবাচক প্রশ্নবোধক শব্দ : কার। সেই কাণ্ডারীর স্বরূপ যে উপলব্ধি করতে পারে সেই প্রকৃত ধনী।

এই ধনের প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য এর সঙ্গে যুক্ত সম্বন্ধপদটির বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন : হাসিকান্না। কাণ্ডারী যদি শরৎঋতু হয় তবে এই হাসিকান্নাকে রৌদ্র ও বৃষ্টির প্রতীক বলে ব্যাখ্যা করা যায়। এমন ভাবনা শরৎ বিষয়ে রবীন্দ্রভাবনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই ব্যাখ্যা অনুসারে শারদশ্রীর পূর্ণ প্রকাশ শুধুই শরৎরবির কিরণে নয়, রৌদ্র ও বর্ষণের সহাবস্থানে। যদি কাণ্ডারী জীবনদেবতা হন তবে হাসিকান্নাকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করতে হবে। একইভাবে বলা যেতে পারে জীবনদেবতার স্বরূপ উপলব্ধি করা যায় শুধু অবিমিশ্র সুখের মধ্যে নয়, সুখ ও দুঃখের পরিপূর্ণ আস্বাদনের মধ্য দিয়ে। প্রকৃত ধনী সেই যে হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, মিলন-বিরহ — সমস্ত বিপরীতের মধ্য দিয়ে জীবনের সারাৎসারটুকু গ্রহণ করতে পারে।

কোন সুরে

গানের সমাপ্তি ঘটে সুরের অন্বেষণে— কী সুর বাঁধা হবে, কী গাওয়া হবে তারই প্রস্তুতির সূচনাতে। তরীর সঙ্গে গানের অনুষঙ্গ রবীন্দ্রনাথের একাধিক গানে দেখা যায়। যেমন : “কূল থেকে মোর গানের তরী দিলেম খুলে /সাগর-মাঝে ভাসিয়ে দিলেম পালটি তুলে” অথবা “খেলার ছলে ভাসিয়ে আমার গানের বাণী / দিনে দিনে ভাসাই দিনের তরীখানি।” গান আবার পারানির কড়ি হতে পারে, কাণ্ডারীকে গান গেয়ে ভোলানোর ভরসা রাখেন কবি : আমার সুরের রসিক নেয়ে তারে ভোলাব গান গেয়ে, পারের খেয়ায় সেই ভরসায় চড়ি। গানের সঙ্গে তরণীর অনুষঙ্গের উদাহরণ আর বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। আমদের এই আলোচনায় যা সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক তা হল এই যে এই তরণীতে গান গাওয়া হয় না, গাওয়া হয় “মন্ত্র”। এই তরণীটি সাধারণ কোন তরণী নয়।গানের শুরুতেই আমরা দেখেছি তার “অমল ধবল” পালটি। পালের সঙ্গে প্রযুক্ত বিশেষণ বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।“ধবল” বিশেষণটি বর্ণনামূলক হলেও কিন্তু “অমল” বিশেষণটির যোগে এই পাল এক অসামান্য নান্দনিকতায় মণ্ডিত হয়ে ; নৌকার পালের বর্ণনায় এমন বিশেষণের ব্যবহার অপ্রত্যাশিত। এই শুভ্রতা শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, সে এক শুচিস্নিগ্ধ আবেশে হৃদয় পূর্ণ করে দেয়। এমন বিশেষণের প্রয়োগে তরী এক মহিমান্বিত রূপ পরিগ্রহ করে। তারপর দেখা সেই মায়াতরণীর যাত্রাদৃশ্য অতীতে দৃষ্ট অতীতে দৃষ্ট সমতুল সব দৃশ্যকেই ছাপিয়ে গেছে। অদৃষ্টপূর্ব, অনন্যসাধারণ এমন তরীতে গান গাওয়া যায় না, গাইতে হয় মন্ত্র।

কাণ্ডারী কে গো তুমি

কাণ্ডারী কে — এই প্রশ্ন আমাদের আলোচ্য গানটি ছাড়া আরও দুটি গানে উচ্চারিত হয়েছে ঃ “তুমি এ-পার ও-পার কর কে গো ওগো খেয়ার নেয়ে ?” এবং “ মোর স্বপন-তরীর কে তুই নেয়ে।”
কাণ্ডারী বা নেয়ে কে এই প্রশ্ন নিয়েই আমাদের আলোচ্য গানের সমাপ্তি ঘটেছে কিন্তু ওই প্রশ্ন দিয়ে পূর্বোক্ত অন্য গান দুটি শুরু হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রশ্ন রাখা হয়েছে শুধুমাত্র গানের প্রথম কলিতে ; কোথাও আর প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করা হয় নি। ওই দুটি গানের মধ্যে প্রথমটিতে দ্বিতীয় কলি থেকে কবি যা দেখেন তারই বিবরণ দেন। দুইবার তিনি তার মনের বাসনা ব্যক্ত করেন : “আমি তখন মনে ভাবি আমিও যাই ধেয়ে (চতুর্থ ও চতুর্দশ কলি)।দ্বিতীয় গানটিতে দ্বিতীয় কলির পর থেকে একটি ক্রিয়াবিহীন বাক্য বাদ দিলে প্রতিটি বাক্যই অনুজ্ঞাবাক্য ; এই সাতটি কলিতে পাঁচটি অনুজ্ঞাবাক্য । নেয়ের উদ্দেশে তিনি তার প্রার্থনা ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ দুটি গানেই কাণ্ডারী বা নেয়ের স্বরূপ বিশ্লেষণের প্রচেষ্টা পরিত্যক্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের আলোচ্য গানে প্রশ্নের পরে শুধুই প্রশ্নই আসে ঃ “কাণ্ডারী “কে”, “কার” হাসিকান্নার ধন, “কোন” সুরে… , “কী” মন্ত্র……।
“কে তুমি” রবীন্দ্রভাবনাজগতে এই প্রশ্নের উত্তর বোধহয় মেলে না। কবির জীবনের অন্তিম লগ্নে রচিত এই কবিতাটি এইক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে—
কে তুমি ।
মেলে নি উত্তর।
বৎসর বৎসর চলে গেলে,
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিমসাগরতীরে
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়—
কে তুমি।
পেল না উত্তর।।
“কে তুমি” এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের আলোচ্য গানেও মেলে নি। প্রশ্নের পর প্রশ্ন — উত্তরে থাকে শুধুই নীরবতা। যে গানের শুরু হয়েছিল গভীর মুগ্ধতায়, অধীর প্রশ্নব্যাকুলতায় তার সমাপ্তি ঘটে।

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Sulata
Sulata
4 months ago

বর্ণে গন্ধে রূপে ছন্দে এমন করে একটি গানের আস্বাদন করা ঐকান্তিক
রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রেমিক ছাড়া কার পক্ষেই
বা সম্ভব? এই ভাবে গানের তরী সকলের কাছে ভাসিয়ে দিন। আমরা সুধারসপিয়াসী ।