শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বেদনা কী ভাষায় রে : ‘এলেজি’ – শোক থেকে শ্লোকে

এলেজি (Elegy) শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘Elegos’ এবং ‘Elegeia’ থেকে যার অর্থ বিলাপ বা শোকগাথা। প্রাচীন গ্ৰীসে কবিতার একটি বিশেষ আঙ্গিকে এলেজি লেখা হতো যাকে বলা হতো ‘এলেজিয়াক কাপলেট’ (Elegiac couplet) যা আসলে ড্যাকটিল ছন্দে পর্যায়ক্রম পঙক্তিতে প্রথমটি ষান্মাত্রিক এবং দ্বিতীয়টি পঞ্চমাত্রিক ছন্দের কাঠামোর উপর ভিত্তি করে রচিত হতো এবং এই কবিতাগুলি তখন যেমন শোক প্রকাশের প্রধান মাধ্যম ছিল তেমনি এর মাধ্যমে ঘোষণা করা হতো যুদ্ধেরও আহ্বান এমন কি এই কবিতাগুলি প্রেম, রাজনীতি বা ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনাকেও ব্যক্ত করতো। আবার বাঁশির সুরেও বেদনার্ত অনুভূতি প্রকাশ করা হতো যার বহমান ধারা আজও রয়ে গেছে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের একটি অন্যতম শৈলীতে যাকে বলা হয় ‘Élégie’ যার উদাহরণ বীঠোফেনের Élégiac Song Op. 118, ক্লদ দ্যবুসির Élégié ইত্যাদি। রোমান কবি ওভিড (Ovid) এবং প্রোপার্টিয়াস (Propertius) একে জনপ্রিয় করে তোলেন প্রধানত প্রেম (Erotic elegy) এবং পৌরাণিক কাহিনীকে ছন্দে রূপান্তরিত করে।

আমাদের প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যেও এই শোক প্রকাশের ছন্দোময় উল্লেখ পাওয়া যায় রামায়ণের স্রষ্টা বাল্মীকির কবিত্বলাভ প্রসঙ্গে যে কাহিনী চলে এসেছে তার সূত্রে :

তমসার তীরে বিচরণ করতে করতে এক ব্যাধের দ্বারা মৈথুনরত একজোড়া ক্রৌঞ্চপাখির পুরুষ সঙ্গীটির হত্যায় বাক্রুদ্ধ এবং শোকার্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে মহর্ষি বাল্মীকির মুখ থেকে যে ছন্দোময় বাণী নিঃসৃত হয়েছিল সেই ছিল আদি কবির প্রথম শ্লোক :

‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠানং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্।’

যেহেতু শোক থেকে উৎপত্তি তাই এই উচ্চারিত বাণীকে বলা হল শ্লোক এবং এই ছন্দের নাম অনুষ্টুপ সেখানেও পুরো শ্লোকে মোট চারটি পদে আটটি করে অক্ষর থাকে দুটি চরণে বিন্যস্ত (Cuplet) হয়ে। অর্থাৎ একেবারে হুবহু গ্ৰীক এলেজিয়াক কাপলেট না হলেও প্রায় সমগোত্রীয় ছন্দে শোক প্রকাশের ছন্দোবদ্ধ নিদর্শন আমাদের প্রাচীন সাহিত্যেও ছিল। রামায়ণ, মহাভারতের বহু শ্লোক এই অনুষ্টুপ ছন্দে গাঁথা।

রেনেসাঁসের যুগে ইউরোপে এসে এই এলেজি সুনির্দিষ্টভাবে শোকার্ত গাথায় রূপান্তরিত হয়। ইংরেজি ভাষায় ইতিমধ্যে ষোড়শ শতকের পর থেকেই আয়াম্বিক পেন্টামিটার অন্যতম প্রধান ছন্দ হিসেবে প্রচলিত হয়ে গেছে বিশেষ করে এডমান্ড স্পেন্সারের কবিতা, মার্লো এবং শেক্সপীয়ারের নাটকে এর প্রভূত ব্যবহারে সাধারণ মানুষ তাদের মুখের ভাষার ছন্দস্পন্দকেই যেন খুঁজে পেয়েছিল, ফলে অন্যান্য কবিতার মতোই এলেজিতেও তার প্রভাব এসে পড়ল এবং যথারীতি প্রচলিত ড্যাকটিল ছন্দের আদলটা আর রইল না। এলেজির ধ্রুপদী ছন্দ অনেকটা মুক্ত হয়ে গেল। শেক্সপীয়ার এলেজি লেখেন নি ঠিকই কিন্তু তাঁর বেশ কিছু সনেটে যেমন ৭১ (‘ No longer mourn for me when I am dead…’ , ৭৩ (‘ That time of year thou mayst in me behold…’) , ৮১ (‘Or I shall live your Epitaph to make… ‘) ১০৭ নং সনেট (‘Not mine own fears, not the prophetic soul…’) ইত্যাদিতে ফুটে উঠেছে কোথাও মৃত্যু, কোথাও বিষাদ, আবার কোথাও আত্মবিশ্বাসী কবির কালের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে উপেক্ষা করে গড়ে তোলা প্রেমের চিরন্তন স্মৃতিস্তম্ভ – এগুলি হয়ে উঠেছে এক একটা সার্থক এলেজিয়াক সনেট। এই প্রসঙ্গে জন মিল্টনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কেমব্রিজের বন্ধু এডোয়ার্ড কিং এর জলে ডুবে অকাল মৃত্যুর প্রেক্ষিতে লেখা ‘Lycidus’ কবিতাটিও একটি সার্থক Pastoral elegy। রোম্যান্টিক যুগে ইংরেজি সাহিত্যে এটি পরিপূর্ণভাবে প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশের রূপ ধারণ করে যদিও জন ডান ( John Donne) ও অন্যান্যরা প্রেমের কবিতা হিসেবেও এলেজিকে ব্যবহার করেছিলেন। এ ছাড়াও কালজয়ী বিখ্যাত এলেজির মধ্যে রয়েছে থমাস গ্রে-র ‘Elegy Written in a Country Churchyard’, ফরাসি ভাষায় আলফঁস দে লামার্তিনের লেখা Le Lac, জন কীটসের মৃত্যুতে লেখা পি. বি. শেলী-র Adonais, আলফ্রেড টেনিসন তার বন্ধু Arthur Henry Hallam এর মৃত্যু উপলক্ষে In Memorium A H H, ওয়াল্টার হুইটম্যান-এর আব্রাহাম লিঙ্কনের মৃত্যু উপলক্ষে O Captain ! My Captain! , রাইনের মারিয়া রিলকের বিখ্যাত ‘Duino Elegies’, এবং ‘Sonnets to Orpheus’ ডব্লিউ.এইচ. অডেন-এর ‘In Memory of W. B .Yeates’, বা ‘Funeral Blues’ ( হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে) , Dylan Thomas এর ‘Fern Hill’, এবং ‘Do Not Go Gentle Into That Good Night ‘ আন্না আখমাতোভার ‘Song of a Last Meeting’ বা ‘Requiem’ , পল সেলান-এর ‘Fugue of Death’ সিলভিয়া প্লাথের ‘Daddy’, অক্টাভিয়া পাজের’ Sunstone’, পাবলো নেরুদার ‘The Heights of Macchu Picchu, ই. ই. কামিংস- এর ‘ My father moved through dooms of Love’ কিংবা স্ত্রীর মৃত্যুতে Dauglas Dunn- এর এলিজিগুচ্ছ ইত্যাদি বিখ্যাত কবিতাগুলি।

আধুনিক বাংলা কবিতার ছন্দও ইংরেজি ছন্দের মতো ক্রমশ ধ্রুপদী সংস্কৃত অনুষ্টুপ ছন্দকে অতিক্রম করে নিজস্ব ছন্দস্পন্দ খুঁজে পেল অক্ষরবৃত্ত পয়ারে যার চূড়ান্ত বিকাশ হল মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে এমন কি তাকে অতিক্রম করে গেলেন অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবহমানতায় যখন তিনি পয়ারের ১৪ মাত্রাকে বহাল রেখেও ছন্দকে যতির (৮+৬) এবং অন্তমিলের নিগড় থেকে মুক্ত করে ছন্দের অন্তহীন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেন। কিন্তু শেষ বিচারে সেই ছন্দ যে প্রচণ্ড আবর্ত সৃষ্টি করল তা নদীর প্রবহমানতায় পরিণত হল না, কারণ তাতে ছিল বেগ, ছিল না সেই প্রাণের স্বাচ্ছন্দ্য যার জন্য আধুনিক বাংলা ছন্দকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হল রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব পর্যন্ত। বাংলা ছন্দের মাধুর্যমণ্ডিত অফুরন্ত বৈচিত্র্যের সহস্রধারার উৎসমুখ যে রবীন্দ্রনাথ, আজকের দিনে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, মনে হয় চারিদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মতো এরাও যেন তেমনি স্বাভাবিক, যেন চিরকালই এরা আমাদের সাহিত্যে ছিল। অথচ আক্ষরিক অর্থে রবীন্দ্রনাথই এই বৈচিত্র্যের উৎসস্থল। রবীন্দ্রনাথের অক্ষরবৃত্তের স্বাভাবিক সমিল প্রবহমানতার (কবিতার কথা বাদ দিলেও কাব্যনাট্য এবং গীতিনাট্যগুলি এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ) সঙ্গে মাত্রাবৃত্তের আবিষ্কার, মুক্তক এবং গদ্য ছন্দের সঙ্গে লৌকিক স্বরবৃত্তের নিপুণ ব্যবহার বাংলা ছন্দের বুকে জাগিয়ে তুলেছিল সহস্রধারার কলস্বন সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথই আধুনিক বাংলা ছন্দের ভগীরথ – এ কথা নিঃসংশয়েই বলা যায়। তবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যেতেই পারে আধুনিক বাংলা ভাষায় ‘আত্মবিলাপ’ কবিতাটিই প্রথম এলেজি লক্ষণাক্রান্ত। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে লেখা ২৭টি কবিতাগুচ্ছে ‘স্মরণ’ কবিতাগুলি যার অনেকগুলোই চতুর্দশপদী, বলাকার ‘ছবি’ বা কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যু উপলক্ষে লেখা ‘সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’ এবং অজস্র গান যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভ্রাতুষ্পুত্র নীতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুতে ‘অল্প লইয়া থাকি তাই মোর যাহা যায়, তাহা, যায়’ বা স্ত্রীর অকালমৃত্যুর অব্যবহিত পরে লেখা ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু’ কিংবা দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরর মৃত্যুর পর লেখা ‘কী বেদনা মোর জানো, সে কি জানো, ওগো মিতা’, কাজী নজরুল ইসলামের রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই লেখা কবিতা ‘রবিহারা’, কিংবা বিখ্যাত গান ‘ শূন্য এ বুকে পাখী মোর…’, জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ এগুলি এলেজির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ ছাড়াও আধুনিক বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশের ( বনলতা সেন, হায় চিল, সপ্তক) এবং মহপৃথিবী-র বেশ কিছু কবিতায়, বিনয় মজুমদারের বিশেষ করে ‘ফিরে এসো চাকা’য় এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘খৈরী আমার, খৈরী : একটি এলেজি’, ‘সমরেশ বসু : একটি এলেজি’, ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’, ‘অবনী, বাড়ি আছো’ ইত্যাদি কবিতায় এবং উত্তরপর্বের বহু কবিতাই মৃত্যু, বিষাদ এবং অন্তিম নিঃসঙ্গতা যা পরোক্ষভাবে এলেজির চরিত্র লক্ষণ নিয়ে প্রবলভাবে উপস্থিত যেমনভাবে শামসুর রাহমানের ‘একটি এলিজি’ (খন্দকার মাজহারুল করিম স্মরণে) কবিতাটি। এইসব কবিতা বহু আলোচিত এবং জনপ্রিয়ও বটে।এ ছাড়াও বহু কবিই এলেজি লিখেছেন এবং আজও লিখে চলেছেন, যদিও এলেজির, সনেটের মতোই এখন আর কোনো নির্দিষ্ট বাঁধাধরা আঙ্গিক নেই। ]

এলেজি

 (১)
বেহালার সুরে দ্রাবিত শিশিরকণা...
জলরঙে আঁকা গাছ থেকে ঝরে শোক,
পাতামর্মরে বেদনার মূর্চ্ছনা,
শূন্যে দৃষ্টি অনির্দিষ্ট চোখ।

ভায়োলিনে ঝরে গোলাপের শেষ কথা,
দিগন্তে ফেটে পড়ে সে রক্তিমতা,
রাতের তারারা এসে নিয়ে যায় তাকে;

কাকে মনে পড়ে আজ এ প্রহরে, কাকে?

সুরের ফোয়ারা তুলে বসন্তবাহার
নিজেকে উজার করে সময়ের কাছে
একদিন বেজেছিল, আজ ছেঁড়া তার
খাদের অতল ছুঁয়ে স্থির হয়ে আছে।

স্বরের ভিতরে আজো সেই সুরে বাজে
রণিত শিশিরকণা সকালে ও সাঁঝে,
বাজায় ছড়ের টানে গূঢ় বেদনাকে;

কাকে মনে পড়ে আজ এ প্রহরে, কাকে?

(২)

আকাশ জুড়ে মেঘের গাঢ় স্বর
প্রতিধ্বনি ধূ ধূ পাহাড় বনে,
বাতাসে তার সবুজ মর্মর
থমকে আছি স্মৃতির নির্জনে।
বৃষ্টি পড়ে সে কোন শ্রাবণের
কাজরি ঘ্রাণে ব্যাকুল করে প্রাণ,
একটি সুর কেবল জাগে মনে
বৃষ্টি মোছে কালের ব্যবধান।

আকাশ জুড়ে মেঘমন্দ্র স্বর
নিষাদ ছুঁয়ে ভিতর প্রাণে ঝরে,
ভিজে আলোয় করুণ মর্মর
উদাস একা যেন কালান্তরে
সেতার থেকে সেতারে মীড় বোনে
হৃদয়খোঁড়া বিপুল আয়োজনে।

                  
 (৩)

বুকের ভিতর ডাক দিয়েছো আকুল সনির্বন্ধ
যেই এসেছি অমনি তোমার চঞ্চলতার ছন্দ

দুই পায়ে স্থির ছবির মতন নিস্পৃহতার কেন্দ্রে
বাগানময় তখনও আলো, হয়নি সময় সন্ধের

ফুলের ঘ্রাণে স্নিগ্ধ বীথি ভাসছিল কল্লোলে
বুকের ভিতর তখনও সুর সঞ্চারীতে দোলে

বুকের গভীর নির্জনে ডাক তোমার সনির্বন্ধ
দুয়ার খোলা ঘরে তোমার প্রিয় ফুলের গন্ধ

ভাসতে ছিল ছন্নছাড়া এইকোণে ওইকোণে
যখন তুমি ছবির মধ্যে ছিলে অন্যমনে

হাসতে ছিলে চোখের কোণে প্রসন্ন কৌতুকে
তোমার কাছে আসতে তখন শূন্যতা সম্মুখে

(৪)

আঁখি পল্লবে স্তব্ধ আঁধির ঝড়
দৃশ্যেরা আছে, রঙেরা শূন্যে হারায়,
আঁধারে অন্ধ বিষণ্ণ প্রান্তর
হিমেল আগুনে একা একা পুড়ে যায়।

সংস্রবী নদী, গাছপালা, ফুলফল
কুয়াশায় স্থির, স্পন্দন গেছে থেমে,
সরোদের থেকে কান্নার যত জল
হৃদয়ের গূঢ় শিকড় ভিজিয়ে নেমে
রাত্রির দিকে বারিমুখে ফেটে পড়ে
যেখানে মৃত্যু বৃষ্টিতে খেলা করে।

আঁখি পল্লবে থমকে ভীষণ ঝড়
ফাল্গুনী রঙ কোথায় শূন্যে হারায়,
আঁধারে অন্ধ কবন্ধ প্রান্তর
ঝলসানো দেহে অভিশাপ রেখে যায়।

                   
 (‌৫)

সরোদের তারে মেঘেদের আসা-যাওয়া
শ্রুতি অন্তরে মন্দ্র নিষাদে তান,
অশ্রুগোমুখ হতে ছুটে আসে হাওয়া
বিপর্যস্ত অন্ধ পাখির গান।
তখন আকাশে তড়িৎ ঝঞ্ঝনায়
নীচে অসংখ্য হৃদয়ে ভাঙছে ঝড়,
পাহাড়ে পাহাড়ে গূঢ় তার আনাগোনা
প্রতিধ্বনিতে ছুঁয়ে যায় সেই স্বর।

প্রখর বাতাস বেদনা দুহাতে ওড়ায়
যেন মল্লারে ব্যথা ঝরে মেঘ হতে,
দেবদারু বীথি তার নীচে ভিজে যায়
যোজনান্তর জলছবি শূন্যতে।

বাইরে বৃষ্টি, চোখের ভিতর দিয়ে
সে ধারা আমাকে চলেছে ভাসিয়ে নিয়ে।

(৬)

এ কোন আঁধার বিষাদ নিষাদে সুর
ক্রন্দসী মেঘ হাহাকার করে বনে,
ভিজে পাখনায় ঘুরে ঘুরে নির্জনে
পাখিরা হারায় পরমোজ্জ্বল দুপুর;
অশ্রুর মতো বৃষ্টিও গাঢ় নীল
শূন্যব্যাপ্ত আকাশের অনিকেতে
আসক্তিহীন বাউলের সাবলীল
বেদনাকে নিয়ে আনন্দে ওঠে মেতে।

কান্তার জুড়ে উদাসীর এই ছবি,
আভূমিআকাশ দাঁড়িয়ে রয়েছে স্থির,
আত্মভাবুক যেন সে দুঃখী কবি
একা হৃদয়ের বিশুদ্ধ সুনিবিড়
একাকী গাইছে একান্ত তার গান
যন্ত্রণাময় অথচ সসম্মান।

(৭)

রাত্রি তুমুল স্তব্ধ হলে
অন্ধকারের পর্দা বেয়ে
সুরের উদাস বিষাদ মীড়ে
ঘুমহারা কোন উঠল গেয়ে।

রাত্রি গভীর বিজন হলে
বাঁশির ভিতর গলতে থাকে
অশ্রুধারায় মৌন তারা
ব্যথায় ফোটায় যন্ত্রণাকে।

অন্ধ আঁধার জুড়ে তখন
আলোর পারের বিমূঢ় রাত,
নীরব তারায় প্রতিচ্ছবি
বিষাদ দগ্ধ সিলভিয়া প্লাথ।

              
(৮)

ধ্যানী গাছগুলি কাঁপছিল অন্তরে
থৈ থৈ কাশ ছুটে চলে কুয়াশায়,
নীচে প্রহরেরা বৃষ্টির মতো ঝরে
হৃদিতলদেশে অশ্রু যেভাবে গড়ায়।

সহসা পাহাড় ছাইরঙা ঢেউ মেখে
মেঘের গভীর দর্পণে মুখ দেখে,
তখনি প্রপাতে বেদনাবাহারে সুর
স্মৃতি ছুঁয়ে দ্রুত ঝাঁপতালে সন্তুর।

হামাগুড়ি দিয়ে মেঘ নামে টিলা থেকে
গাছের সবুজ সূড়ঙ্গে ঢুকে যায়,
আঁধারের ঢেউ ছায়াবীথি দেয় ঢেকে
পাতামর্মরে দূরস্মৃতি গান গায়।

গুম গুম মেঘ পাহাড়ে পাহাড়ে চলে
নেমে এসে নদী নির্জনে কথা বলে।

(৯)

হৃদয়ে পদচ্ছাপ পড়েছিল তার।
এত ধ্বনি ছিল, কী দেব উপমা বলো?
অতিদূর সমুদ্রবালুকাবেলার
শ্রুতির প্রতিমা তারা? বহুদিন হলো.
নীল ঢেউ এসে মুছে দিয়ে গেছে তাকে;

আজো সেই স্মৃতি তবু ছুঁয়ে বেদনাকে।

হৃদয়ে পদচ্ছাপ পড়েছিল তার।
আজ সেইখানে অন্য অন্ধকার
অনন্ত স্তব্ধের নিতল ছুঁয়েছে
যেন ভাঙা তানপুরা, ধ্বনি মুছে গেছে।

তবুও প্রতিধ্বনি হৃদয় ভাসিয়ে
কোথা হতে নেমে আসে মৌন খসিয়ে।

                 
(১০)
অপলক চোখে লোকোত্তর মহিমা
স্থির বুকে বাজে অবেলার মূলতান,
বাক্য ছুঁয়েছে নৈঃশব্দ্যের সীমা
শূন্যে ভাসছে ভাঙা পালকের গান।
সকাতর চোখ সীমাহীন ছুঁয়ে দূরে
মানুষ কাঁদছে একা অন্তঃপুরে,
সে সুর চলেছে গাঢ় নীল বেদনায়
অন্তর্গত বিপুল শূন্যতায়।

আগুন শরীরে কৃষ্ণচূড়ার গান
মৃত্যুশিখার পরমোজ্জ্বলতায়,
যেন কল্যাণে শালিকের কলতান
আঁধারে দীপ্ত অমর্ত্য মহিমায়
ছড়িয়ে পড়ছে ছবির ভিতর জুড়ে,
ঝঙ্কার তার বুকে বাজে ঘুরে ঘুরে।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
KRISHANU BHATTACHARYYA
KRISHANU BHATTACHARYYA
3 hours ago

চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় এর কণ্ঠে কি বেদনা গানটি শুনতে খুব সুন্দর লাগে।
এলিজি র যে ঐতিহ্য ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন তার জন্য অজশ্র ধন্যবাদ।

Dwaipayan Goswami
Dwaipayan Goswami
13 minutes ago

এটি পড়তে আমার প্রায় আটত্রিশ মিনিট লাগলো, কারণ অনেক গুলো জায়গা দু তিনবার করে পড়লাম, খুব ভালো লাগলো। “Waiting for Godot” এর সঙ্গে তুলনা করে লেখা একদম মৌলিক বাকি অংশের লেখার সঙ্গে আমি পরিচিত। তাই আরও বেশি উপভোগ্য এবং প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। সবচেয়ে বড় কথা হলো আজকের পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ডাকঘরের প্রাসঙ্গিকতা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। তাই তোমার লেখাটিও সমান প্রাসঙ্গিক হয়ে থেকে যাবে।

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x