শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আমার দেশে ব্যস্ত রেলস্টেশনে কিংবা রাজপথে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থেকে অসুস্থ অথবা আহত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে — উৎসাহীরা রিল আর ভিডিও তৈরি করতে এগিয়ে আসেন। অসুস্থ মানুষটির প্রাথমিক পরিচর্যা বা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হতে দেখা যায় না কাউকে।

চোর সন্দেহে কোনও অপ্রকৃতিস্থ বা নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে গণপ্রহার এখন সকলের গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। নির্বাক দর্শক প্রচুর পাওয়া যায়, কিন্তু সম্ভাব্য অপরাধী বা সমাজবিরোধীটিকে উদ্ধার করে স্থানীয় থানায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে — সকলেই আইন হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করেন।

একটু বেশি রাত্রে গণপরিবহন ব্যবহার করতে ভয় পায় শহর-মফস্বলের চাকুরিরতা মেয়েরা, পাড়াগাঁয়ের মেয়েরা ভয় পায় ঘরের বাইরের শৌচাগারে যেতে। জীবজগতের হিংস্রতম প্রাণী যে ওত পেতে নেই আশেপাশে, তার নিশ্চয়তা কি?

রোগী হাসপাতালে যেতে ভয় পায় — সরকারি হলে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার ভয়, বেসরকারি হলে সর্বস্বান্ত হওয়ার ভয়।

পরবর্তী প্রজন্ম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নিরাসক্ত, কারণ শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি বা স্থির আয়ের নিশ্চয়তা নেই।

স্বাধীনতা দিবসের আগে নাগরিক ট্রাফিক সিগন্যালে দামী গাড়ির জানলায় কচি শিশুমুখ খুদে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে সেটি কেনার আকুল আর্জি জানায় আরোহীর কাছে — নিস্পৃহভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয় গজদন্তমিনারবাসী উদাসীন পুঁজিবাদ। আন্তর্জাতিক ক্ষুধা সূচকের নিরিখে বিশ্বের ১২৩টি দেশের মধ্যে ভারত নেমে গিয়েছে ১০২ নম্বরে — এই খবর তেমন বিচলিত করে না কাউকে।

বিভিন্ন বানভাসি রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গলাজলে দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা সংখ্যালঘু শিক্ষকের নাম ওঠে না জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে — কূট রাজনীতি শুধু জাতীয় সঙ্গীত আর জাতীয় স্তবস্তোত্রে দ্বন্দ্ব খুঁজে ফেরে।

আধুনিক প্রযুক্তি-অনভিজ্ঞ হতদরিদ্র মানুষ রাষ্ট্রের কাছে গচ্ছিত তার শেষ সম্বলটুকুর নাগাল পেতে কবর খুঁড়ে প্রিয়জনের কঙ্কাল নিয়ে এসে উপস্থিত হয় ব্যাঙ্কের দরজায়।
শবযানের অভাবে হাসপাতাল থেকে মৃত আপনজনের দেহ কাঁধে করে প্রত্যন্ত দুর্গম গ্রামের ভিটেয় বয়ে নিয়ে যায় কোনও নিরুপায় দেশবাসী।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে উপরের উদাহরণগুলি কী আমাকে নিরাশ করে? অবশ্যই করে।

তবে কী এই স্বাধীনতা কেবল লজ্জার স্বাধীনতা? কিছুটা তো নিশ্চয়ই।
কিন্তু সবটাই আত্মকেন্দ্রিক সমাজের চিন্তাহীন বল্গাহীন নির্বোধ উচ্ছ্বাসের ছবি নয়। একেবারেই নয়।

পনেরই আগস্ট পাড়ায় পাড়ায় মাংসভাতের লাঞ্চ আর আরামের ওটিটিযাপনের বাইরেও চলছে অসংখ্য রক্তদান শিবির। বহু মানুষ অপরিচিত রোগগ্রস্ত সহমানবদের কথা ভেবে রক্তদান করেছেন। পুরোটাই উপহারের লোভ অথবা মোচ্ছবের হুল্লোড় বলে উড়িয়ে দিলে তাঁদের এই পরহিতৈষাকে আন্তরিক অপমান করা হবে।

অনেক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এই বিশেষ দিনে শহর-গ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের, সংশোধনাগার এবং বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের, পথশিশু এবং যৌনকর্মীদের সন্তানদের মধ্যে আহার্য সামগ্রী বা বস্ত্র বিতরণ করেছেন। সবটাই নিখাদ প্রচারের লোভে করা হয়েছে বললে তাঁদের প্রচেষ্টাকে ছোট করা হবে।

স্বাধীন ভারতবাসী মানেই একশ্রেণীর সুবিধাভোগী গা বাঁচানো মানুষ বোঝায় না। সমাজমাধ্যমে আমার নিবিড় পরিচয় হয়েছে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে, যাঁরা স্বদেশে তো বটেই, এমন কি বিদেশে থেকেও কাঁধে তুলে নিয়েছেন অন্তত একটি দুঃস্থ কিশোর কিংবা কিশোরীর উচ্চশিক্ষার সমস্ত ব্যয়ভার।

আমার এমন চিকিৎসক বন্ধু রয়েছেন যিনি মাসে অন্ততপক্ষে চার দিন নিখরচায় দরিদ্র রোগীদের দেখেন ও বিনামূল্যে ওষুধপত্র দেন।

এমন কিছু শিক্ষক বন্ধুর সঙ্গেও আলাপিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি, যাঁরা প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের কাছে কেবলমাত্র শিক্ষক বা অভিভাবকস্থানীয় নন, ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শকও বটে – যাঁদের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত সেইসব ছাত্রছাত্রীদের জীবনে চূড়ান্ত।

এখনও দরিদ্র ট্যাক্সিচালক তাঁর গাড়িতে যাত্রীর ফেলে যাওয়া টাকার ব্যাগ বা গয়নাগাঁটি দায়িত্ব সহকারে পুলিশের জিম্মায় ফেরাতে যান। লোভ তাঁর পায়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল পরাতে পারে না।
এখনও পাড়ার মুখচোরা ছেলেটা সহপাঠিনীর প্রতি ইভটিজারদের কটূক্তির প্রতিবাদ করে – ভয়ের পরাধীনতাকে জয় করেই।

এখনও পাশের বাড়ির বৌদির উপর স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন অত্যাচার করলে, কলেজে পড়া সাধারণ মেয়েটি দৌড়ে গিয়ে কলিংবেল বাজায় — নিরাসক্তির শিকল ভেঙেই।
এখনও পথেঘাটে দুষ্ট বিকৃতকাম ব্যক্তির কোনও অচেনা অসহায় মেয়েকে শ্লীলতাহানির অপচেষ্টার ভিডিও তুলে তা গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার সাহস রাখে কোনও তরুণী সাংবাদিক — লোকলজ্জার চোখরাঙানিকে অগ্রাহ্য করেই।
এখনও কোনও দূর মফস্বলে শারদীয়া দুর্গাপুজোয় অনামা সংখ্যালঘু শিল্পীর তুলির টানে চক্ষুদান হয় মৃন্ময়ী প্রতিমার, ইফতারে সমবেত হ’ন অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ, বড়দিনে গির্জাঘরের উপচে পড়া ভিড় কোনও বিশেষ ধর্মের তোয়াক্কা করে না।

এই দুঃসময়েও রাজনৈতিক শিষ্টাচার একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব, নির্বাচনের ময়দানে আমরা কোনও কোনও যুযুধান দলের প্রার্থীদের করমর্দন বা সৌজন্য বিনিময়ের ছবি দেখতে পাই কোনও সংবেদী, দায়িত্বশীল চিত্রসাংবাদিকের বদান্যতায়। সস্তা রাজনীতির মোহ সেই রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছার কন্ঠরোধ করতে পারে না।

প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর আত্মদান, আভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী পুলিশের কর্মদক্ষতা, সকলের মুখে ফসল তুলে দেওয়ার জন্য কৃষকের প্রাণপণ কৃচ্ছ্রসাধন, দেশকল্যাণের লক্ষ্যে ও নানা প্রশাসনিক কর্মসূচীর সফল রূপায়ণে অগণিত সরকারী কর্মচারীদের অবিশ্রান্ত পরিশ্রম, প্রশাসনের হাতে হাত মিলিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির এগিয়ে আসা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি — কোনওটাই তো মিথ্যে বা মিথ নয়।

অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি আমরা। আরও অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে।

মহিলাদের নিরাপত্তা – যার দৃষ্টিকটু অভাব বিশ্বের দরবারে স্বাধীন ভারতবর্ষের মুখে কালিমালেপনের কাজটি ভালভাবেই করে চলেছে, সে বিষয়ে সুনিশ্চিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। দায় কেবল সরকার বা প্রশাসনের নয় — সমস্ত নাগরিকের। অন্যায় দেখলে মুখ ফিরিয়ে চলে গেলে চলবে না, প্রতিবাদ করতে হবে। অন্ধ হলে তো প্রলয় বন্ধ থাকে না। যূথবদ্ধ প্রতিবাদ কাঙ্ক্ষিত — যদি সম্ভব না হয়, রুখে দাঁড়াতে হবে একাই। অন্যায়, দুর্নীতি, অপরাধ সহ্য করতে করতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে দেশবাসীর — এবারে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।
জাতপাত, বর্ণবিদ্বেষ, ধর্মভেদ, পণপ্রথা, কন্যাভ্রূণহত্যা প্রভৃতি নানা পাপে পঙ্কিল হয়ে রয়েছে ভারতীয় সমাজজীবন।

সব পাপস্খালন আইন আদালত এসে করে দিয়ে যাবে না, নাগরিকের দায়িত্বই সর্বাধিক ও সর্বোত্তম। ঘরে বাইরে ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতনের যে স্ট্যাটিসটিক্স সুস্থ যাপনকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে, তাকে নির্মূল করতে গেলে আইন-প্রশাসন-নাগরিক-সংবাদমাধ্যম সকলের সহযোগিতা দরকার।

রাষ্ট্রের প্রান্তিকতম নাগরিকের সশক্তিকরণ যেমন প্রয়োজন, তেমনই দেশের সম্মান এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রত্যেক ভারতবাসীর সচেতনতাও প্রয়োজন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার সঙ্গে আসে দায়িত্ব — স্বাধীনতার অর্থ স্ব-অধীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা নয়।

নিন্দামন্দ অনেক হলো। এবার সকলে মিলে একটু গ্লানিমুক্তির কথা ভাবি বরং।
কোনও দেশবরেণ্য মানুষ সামনে থেকে পথ দেখাবার জন্য না থাকলেও ক্ষতি নেই – আমরা বরং নিজেরাই নিজেদের পথপ্রদর্শক হই।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
KRISHANU BHATTACHARYYA
KRISHANU BHATTACHARYYA
1 month ago

খুব সুন্দর দৃষ্টিতে সময়কে দেখলেন। এই আশাবাদ সঞ্চারিত হোক সবখানে।

Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
1 month ago

খাদ্য খাদকের সম্পর্ক দিয়ে যে জীবনচক্র শুরু হয়েছিল প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য,তাতে হিংসা একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।কিন্তু তার বিপরীতে বয়ে চলে অন্য আর এক প্রবৃত্তি, যার নাম ভালোবাসা।পৃথিবীকে বাসের উপযোগী রাখার জন্য যেটা জরুরি।যা কিছু ভাল হয়,সেটা হয় ভালোবাসার টানে।প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য দায়িত্ববোধ থাকাও জরুরী।তার উৎসও তো সেই ভালোবাসায়।একথা মনে করিয়ে দিয়ে লেখিকা এক সময়োপযোগী কাজ করলেন।

শৌভিক দে
শৌভিক দে
26 days ago

স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় – যা আজকে ভারতীয়রা অর্থাৎ আমরা – করিনি। তাই হয়ত তার প্রকৃত সংজ্ঞা আমাদের জানা নেই। দুটি দিবস মানে দুটি ছুটির দিন এছাড়া আর কিই বা ভাবা যেতে পারে। তবে প্রবন্ধটিতে শুধু অন্ধকারের গল্প নেই আশাবাদও রয়েছে সেটিই ভরসা। আমরা কি তিমির বিলাসী, আমরা তো তিমির বিনাশী হতে চাই। গদ্যভঙ্গী ঈষৎ তির্যক হলেও সহজ এবং মর্মঘাতী। এনার পরবর্তি গদ্যের আশায় আগ্রহী রইলাম।

Ruchi Ghosh
Ruchi Ghosh
25 days ago

সমাজের ইতিবাচক দিকটা তুলে ধরেছেন। সব নাগরিককে সচেতন হতে হবে, কিছু ভালোমানুষ আছে বলেই তো এখনও পৃথিবী বাসযোগ্য। সুন্দর প্রতিবেদন।

4
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x