শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

৯ মে, ১৯৩৮‌।

ফ্লোরেন্স শহরের Teatro Comunale এ এক মহা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এখানে মিলিত হবে ইতিহাসের দুই কুখ্যাত নায়ক। একটু আগেই ফ্লোরেন্সের Via del Corso দিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেছেন কবির ভাষায় “un messo infernale” নরকের এক দূত। উন্মত্ত আলালা আলালা ধ্বনির সঙ্গে স্বর সংগতি রেখে আর্ণো নদীর রাগী ঢেউগুলি তীরভূমিতে আছড়ে পড়ছে। উথালপাথাল জলে সময়ের তীব্র মধ্যমে সন্ধ্যা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। আর, একজন কবি রাস্তার ম্লান আলোয় হেঁটে যাচ্ছেন, পায়ের তলায় চটপটির মতো ফাটছিল মৃত মথের চামড়াগুলি। তিনি ধীরে ধীরে নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন আর তাঁর মনের তীরভূমিতে তখন বিবাদী পর্দায় আছড়ে পড়ছে অন্যরকম এক ঢেউ। তিনিও ধরতে চাইছেন সময়ের সেই স্বরকে তাঁর রক্তে, আবেগে এবং মননে। একটু একটু করে গড়ে উঠছে শব্দ দিয়ে তৈরী সেই সময়ের ভাস্কর্য যার সামনে আজ আমি নতজানু।

ইউজেনিও মোনতালে

কবির নাম : ইউজেনিও মোনতালে ( জন্ম : ১২/১০/১৮৯৬, মৃত্যু : ১২/০৯/১৯৮১)। নিজে যেমন অজস্র কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন ছোটো গল্প নতুন নতুন আঙ্গিকে, তেমনি বিশ্বসাহিত্যের অজস্র কবিতা অনুবাদ করে নিজের সাহিত্যকেও যথেষ্ট সমৃদ্ধ করেছেন। করেছেন ধ্রুপদী গানের সাধনা, বিশেষ করে বেল ক্যান্টোর। সাহিত্যের সাথে সঙ্গীত সমালোচক হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিদগ্ধ। ধার ধারতেন না কোনোরকম মতলববাজী রাজনীতির। নিজেই লিখেছেন, “রাজনীতি না করার জন্য এবং কোনো গোষ্ঠীভুক্ত না হওয়ার ফলস্বরূপ ১০ বছর বেকারিত্বের পর আমি ১৯৪৮ সালে মিলানের একটি প্রখ্যাত দৈনিকে (Corriere della Sera, Evening Courier) সম্পাদকীয় বিভাগের যোগ দিই।

এবার একটু পিছনে তাকানো যাক।

তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু হতে প্রায় এক বছর চার মাস বাকি। হিটলারের জার্মানিতে চলছে ধারাবাহিকভাবে ‘হলোকাস্ট’। তাঁর গেস্টাপো বাহিনীর হাতে ইতিমধ্যেই খুন হয়েছেন কয়েক লক্ষ কমিউনিস্ট, সোস্যাল ডেমোক্রেট, ইহুদী এবং অশ্বেতকায় অসহায় মানুষ। দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন অসংখ্য সাধারণ এবং অসাধারণ মানুষ যাঁদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববরেণ্য পদার্থবিদ যেমন : Albert Einstein , Max Born, James Franck, Leo Szilard,, Eugene Wigner, Edward Teller, Lise Meitner, Erwin Schrödinger। ছিলেন John Von Neumann এর মতো গণিতজ্ঞ, Oskar Kokoschka এর মতো এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রকর , এবং Thomas Mann এর মত নোবেলজয়ী সাহিত্যিক, Bertolt Brecht এর মতো নাট্যপ্রতিভা।

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা

৩০, জুন, ১৯৩৪ জার্মানিতে সংঘটিত হল কুখ্যাত রক্তস্নানের উৎসব। ইতিমধ্যে ইটালী আবিসিনিয়া আক্রমণ করল এবং আবিসিনিয়ায় যুদ্ধ চলাকালীনই স্পেনের গণতন্ত্রী সরকারের ওপর ১৯৩৬ সালেই জুলাই মাসে সম্মিলিত ফ্যাসিস্ট আক্রমণ নেমে এল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে। ১৯৩৬ এর আগষ্ট মাসে ফ্রাঙ্কোপন্থীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হলেন কবি ও নাট্যকার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। পাবলো নেরুদা হাহাকার করে উঠলেন , বললেন ” স্পেনের সেরা ফুল ঝরে গেল।” নিহত হলেন Ralph Fox ঐ ডিসেম্বরেই। পরে Stephen Spender তাঁর বিখ্যাত ‘Fall of a city’ তে লিখবেন :

“FOX and LORCA claimed as history on the walls,
Are now angrily deleted
Or to dust surrender their dust,
From golden praise excluded.”

নিহত হলেন Christopher Caudwell, John Cornford এর মতো বিখ্যাত লেখক, অগুনতি বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ। ইটালীতে অন্রীণ হয়ে কণ্ঠরুদ্ধ রইলেন বেনেদেত্তো ক্রোচের মতো বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক। ১৯৩৭ সালে জাপান চীন আক্রমণ করলে প্রতিবাদে গঠিত হল ‘League Against Fascism and War ‘ যার ভারতীয় শাখার সভাপতি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ২০, সেপ্টেম্বর অমিয় চক্রবর্তীকে লিখলেন – ‘দেখলুম ঐ স্পর্ধিত সাম্রাজ্যশক্তি নির্বিকার চিত্তে এবিসিনীয়কে ইটালির হাঁ করা মুখের গহ্বরে তলিয়ে যেতে দেখল, মৈত্রীর নামে সাহায্য করল জর্মনীর বুকের তলায় গুঁড়িয়ে ফেলতে চেকোস্লোভাকিয়াকে; দেখলুম নন্- ইন্টারভেনশনের কূটিল প্রণালীতে স্পেনের রিপাবলিককে দেউলিয়া করে দিতে…।” ক্ষুব্ধ রবীন্দ্রনাথ আবিসিনিয়া আক্রমণ উপলক্ষে তাঁর বিখ্যাত ‘ আফ্রিকা ‘ কবিতাটি লেখেন এবং ইংরেজী তর্জমা করে ছড়িয়ে দিলেন।( The Spectator, 7 May, 1937).

মুসলিনি-হিটলার সাক্ষাৎকার

ফিরে আসা যাক সেই দিনটিতে যেখান শুরু করেছিলাম যাত্রা।

৯ মে, ১৯৩৮। ফ্লোরেন্সের সান্তা মেরিয়া নোভেল স্টেশনের ১৬ নং প্ল্যাটফর্ম। সময় দুপুর ২ টো। হন্তদন্ত হয়ে উপস্থিত হলেন প্রধানমন্ত্রী মুসোলিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই নেপলস থেকে ট্রেন এসে পৌঁছুল। নামলেন জার্মান চ্যান্সেলর হের হিটলার। দুজনের পরণেই মিলিটারি পোষাক। হিটলারকে স্বাগত জানিয়ে মুসোলিনি পথে নামলেন। উন্মত্ত জয়ধ্বনি ( প্রাচীন গ্ৰীক জয়ধ্বনি ‘ Eja, Eja, alalà ‘ যা ফ্যাসিস্টরা তাদের জয়ধ্বনি হিসেবে গ্ৰহণ করেছিল), ফুল, আর স্বস্তিকাশোভিত পতাকার ভিতর দিয়ে তারা কয়েকটি দ্রষ্টব্যস্থল ঘুরে দেখলেন, গেলেন স্থানীয় আর্ট গ্যালারিতে। রাতে Teatro Comunale- এ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। আর্ণো নদীতে সারারাত ম্লান বাতিস্তম্ভের নীচে তুষারপাতের মতন সাদা মথ পোকারা ঝরে পড়ছিল যেন বিছিয়ে দেওয়া সাদা শবের চাদর। আলো ম্লান হলেও নৃত্যরত মথ পোকাদের তাদের ঘিরে মরণ আহুতিতে মেতে ওঠা এবং সমর্থকদের দিশী উন্মত্ত নাচ যেখানে মেয়ে এবং পুরুষদের বার বার স্থান পরিবর্তন যা তৎকালীন সামাজিক দিশাহীনতাকে সার্থকভাবে রূপায়িত করে তোলে ফ্যাসিজমের প্রতি তৎকালীন উৎসাহী সমর্থকদের সাময়িক উন্মত্ততার প্রবণতাকে। কবিতার শুরুতেই যে দান্তের উদ্ধৃতি সেখানে এবং মোনতালের বেশিরভাগ কবিতাতেই তাঁর জীবনের বিয়াত্রিচে বা লরা যিনি ছিলেন সেই ক্লিজিয়া বারবার ধ্রুবতারার মতো উপস্থিত আছেন। ক্লিজিয়া আসলে ছদ্মনাম, ক্লাইটি বা ক্লুটির ইটালিয় রূপ যে ওভিদের মেটামরফসিসে একজন পরী ছিল এবং অ্যাপোলোর প্রেমিকা যাকে সেই সূর্যদেবতা সূর্যমুখীতে রূপান্তরিত করেন যাতে সে সর্বক্ষণ তাঁর প্রতি নির্নিমেষ আসক্ত থাকে। মোনতালের কাছে ক্লিজিয়া সেই দীপ্তিময়ী নারীর প্রতীক যে দানবের প্রতিপক্ষ হিসেবে মর্তে আনে স্বর্গের মাধুরী। কবি ক্লিজিয়া ছিলেন একজন আমেরিকান, যাঁর ইহুদী নাম ইরমা ব্র্যানডেইস। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত দান্তে বিশেষজ্ঞ। কবিতাটি শেষ হয় যুদ্ধবিদ্ধস্ত ক্ষতবিক্ষত ঝলসানো দক্ষিণ ইউরোপের পটভূমিকায় নতুন ভোরের ( ক্লিজিয়ার / মিত্র শক্তির?) আগমনী ঘোষণায়, যে কোনো মহৎ কবিতার মতোই যা চির রহস্যাবৃত।

ইরমা ব্র্যানডেইস (ক্লিজিয়া) ও ইউজেনিও মোনতালে

এই ভ্রমণ উপলক্ষে সারাদেশে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। পরের দিন সকালে গোয়েবলস, হিমলার, ফ্রাঙ্ক আর ভন রিবেনট্রপকে নিয়ে ওঁরা কম্যুনেল থিয়েটারে ভের্দির অপেরা দেখলেন। হিটলার ফিরে গেলেন। কিন্তু ঘটনাটি চিরকালের জন্য মূদ্রিত হয়ে রইল মহাকালের সংগ্ৰহশালায় Ettore Scola-র ফিল্ম ‘A Special Day ‘ এবং Eugenio Montale-র বিখ্যাত ‘La Primavera hitleriana’ কবিতায়। মোনতালে কিন্তু এই নরমেধযজ্ঞের জন্য শুধুমাত্র হিটলার বা মুসোলিনিকেই দায়ী করেন নি, সমানভাবে দায়ী করেছেন সকলকেই, বিশেষ করে সেইসব কবি শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীদের, নিজেকেও বাদ না রেখে, ইতিহাসের প্রতি সচেতন দায়বদ্ধতার পরিচয় না দিতে পারার জন্য ( ‘…e piü nessuno è incolpevole.)। এর ঠিক দু’দশক আগে প্রথম মহাযুদ্ধের ঘূর্ণাবর্তের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের অনুরূপ উচ্চারণ এখনও আমাদের কানে বাজে:

‘ওরে ভাই, কার নিন্দা কর তুমি? মাথা করো নত।
এ আমার, এ তোমার পাপ।’
(বলাকা, ৩৭)

রবীন্দ্রনাথ

মোনতালের ‘হিটলারীয় বসন্ত’ কবিতাটি স্বাভাবিক কারণেই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মুদ্রিত হতে পারে নি। এটি ছাপা হয় ‘SILVAE’ বইতে যুদ্ধোত্তর কালে। কবিতাটি জেগে উঠেছে পরস্পর বিপরীতধর্মী চিত্রকল্পের গতিময় সংঘাতের ভিতর থেকে (গ্রীষ্ম/ তুষার, আগুন/ ঝঞ্ঝা, বসন্ত/ শৈত্য, বীজ/ দগ্ধ-শুষ্ক, অন্ধ/সূর্য)।

শুধু এই কবিতাতেই নয়, মোনতালের কবিতার বৈশিষ্ট্যই হল চিত্রকল্প এবং প্রতীকের সার্থক প্রয়োগ। সুইডিস অ্যাকাডেমি অব লেটার্স তাঁকে ১৯৭৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান উপলক্ষে যেমন বলেছিলেন,” জীবনের প্রতি কোনো মোহাচ্ছন্ন আবেশ না রেখে তাঁর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কবিতাগুলি অত্যন্ত শিল্পিতভাবে মানবিক মূল্যবোধকে ব্যাখ্যা করেছে…” যা শুনে কবির সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, “আমি অভিভূত। আমি খুশি।” সাংবাদিকদের বলেছেন, “কবিতাকে বাণী হিসেবে গ্ৰহণ করলে চলবে না, কবিতা হচ্ছে আশার আমন্ত্রণ।” ৮৫ বছর বয়সে মোনতালে মারা যান ১৯৮১ সালে মিলানে। জন কীটস্ চেয়েছিলেন তাঁর ভাষায় সবচেয়ে বড় কবি শেক্সপিয়ারের পাশে তাঁর স্থান এবং ম্যাথিউ আর্নল্ডের ভাষায় “He is … he is with Shakespeare.” মোনতালের তেমন কোনো অভিলাষ আমাদের জানা নেই। তবে তাঁর ভাষায় সর্বশ্রেষ্ঠ কবি দান্তের পাশে গিয়াকোমো লিওপার্দির মতো তিনিও যে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত এ বিষয়ে সম্ভবত আজ আর কোনো দ্বিমত নেই।

অনুদিত কবিতাটি নেওয়া হয়েছে EUGNIO MONTALE – collected poems (1920 – 1954) BILINGUAL EDITION TRANSLATED AND ANNOTED By Jonathan Galassy এবং Selected Poems of Eugenio Montale Translated and with an introduction by George Kay-র বইগুলি হতে। চেষ্টা করেছি এই ভাষান্তরের ভাষান্তরে মূলের ছন্দস্পন্দ এবং ব্যঞ্জনাময় আভাসগুলিকে আমাদের চেনা শব্দ মালায় যতটা সম্ভব আত্তীকরণ করে নিতে।

হিটলারীয় বসন্ত

“Né quella ch’a veder lo sol si gira…

——- Dante (?) a Giovanni Quirini

“সেও নয় যে সূর্যের দিকে ফিরে অনিমেষ…”

—– দান্তে? জোভান্নি কুইরিনি কে

ঘন সাদা মেঘের মতন উন্মত্ত মথগুলির ঘূর্ণী
রাস্তার ম্লান বাতিগুলি ঘিরে, ছাদের আলসেতে, আর
নদীতীরে তাদের মরা চামড়ার চাদর, পায়ের চাপে যেখানে
চটপটির শব্দ, যেন ভেঙে যাচ্ছে শর্করার দানারা; আগত গ্ৰীষ্ম
মৃত ঋতুর গোপন গুহায় বন্দী এতদিনের রাত্রির তুষারকে
মুক্তি দিচ্ছে, আর সেইসঙ্গে মেইয়ানোর উচ্চভূমি থেকে
নীচের বালুতীর পর্যন্ত বিস্তৃত মালঞ্চগুলিকে।

সবে মাত্র এই পথে এক নরকের দূত ‘আলালা আলালা’
ধ্বনির মধ্য দিয়ে ফিরে গেছে: নারকীয় ঐকতান,
মশাল, আর বর্ণময় স্বস্তিকারা
তাকে গ্ৰাস করেছিল আর গিলে ফেলেছিল, জীর্ণ ও নিরীহ
জানালাগুলি যদিও কামান আর খেলনা অস্ত্র দিয়ে সাজানো,
তারা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কসাইরা যে বেরিফল দিয়ে
কচি পাঁঠার মুণ্ডগুলি সাজাচ্ছিল, সেগুলোও বন্ধ,
ছোটোখাটো ঘাতকেরা যারা তখনও রক্তপাতে অনভিজ্ঞ,
পরিণত হয়েছিল ছিন্নভিন্ন ভগ্ন ডানার স্তূপীকৃত জটে,
সৈকতে মৃত শুক্রকীটেরা, আর জল দ্রুত ধেয়ে আসছে
তীরভূমিকে গিলবে বলে, আর এ সময়ে আমরা কেউই দোষমুক্ত নই।

তা হলে, এ সবই বৃথাই শুধু? – আর, সেন্ট জন দিবসের
রোমান মোমবাতিগুলি,
ধীরে ধীরে শুভ্রাচ্ছন্ন করে তুলছে দিগন্ত,
আর সমবেত অসহায় মানুষের সামনে প্রভুর নামে শপথ,
দীক্ষাদান উৎসবান্তের দৃঢ় সংকল্প,
দীর্ঘ বিদায় সম্ভাষণগুলি (কিন্তু বাতাসে
একটা রত্নের মহাদ্যুতি,
তোমার হিমানিদংশিত উপকূলে টোবি সপ্তর্ষিগণের সঙ্গে
উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বীজ বপন করে দিল) আর
তোমারই হাতে জন্ম সূর্যমুখীরা – সব দগ্ধ, পরাগের শুষ্কতাশোষণ
যার জিহ্বা থেকে লেলিহান আগুন আর কামড়ে ঝঞ্ঝাঘাত…
হায়, ক্ষত-বিক্ষত বসন্ত
এখনও উৎসবময় যদি সে এই মৃত্যুকে মৃত্যুর ভিতরেই
তুষারাবৃত রাখে !
এই তোমার নিয়তি, ক্লিজিয়া: আবার ওপরে তাকাও,
পাল্টে গিয়েও এখনও সেই চিরন্তন প্রেমে আশ্রয় খুঁজে চলেছ,
যতক্ষণ না তোমার ভিতরের অন্ধ সূর্যটা
এক পরমের ভিতর ঝলসিত হয়ে তাঁরই মধ্যে লীন হয়ে যায়,
সর্বমঙ্গলের জন্য। হয়তো সেই মরণ বাঁশির ডাক আর
অশুভ ঘণ্টার ধ্বনি যা আবাহন করেছিল দানবদের
গত সান্ধ্য-তান্ডবে, ইতিমধ্যেই তারা স্বর্গ থেকে নামা
জয়ধ্বনির মধ্যে মিশে গেছে – ভোরের নিঃশ্বাসের সঙ্গে
যা প্রকাশ করবে আগামীকালকে, সকলের জন্য,
শুভ্র, কিন্তু ডানায় বিভীষিকার চিহ্ন ছাড়া,
দক্ষিণের ঝলসে যাওয়া বিস্তীর্ণ পাথুরে জমির ওপর…

টীকা :

(১) কবিতার শুরুতে উদ্ধৃত “Né quella ch’a veder lo sol si gira” অনুমান অনুসারে দান্তের একটি hexameter-এ রচিত সনেটের অংশ যা কবির মিত্র এবং শুভানুধ্যায়ী একজন ভেনিসের অধিবাসী Giovanni Quirini-কে উৎসর্গিত।
(২) নদী – Arno নদী যার তীরে Florence শহর।
(৩) Maiano – Florence শহরের নিকটে অবস্থিত।
(৪) নরকের দূত : জার্মান চ্যান্সেলর নাৎসি নায়ক Adolf Hitler।
(৫) টোবি সপ্তর্ষিগণ : স্বর্গের ৭জন দেবদূত যাঁরা শুভত্বের প্রতীক।
(৬) দানবদের : Adolf Hitler এবং Benito Musolini ।*

বর্তমান জটিল ভূরাজনৈতিক অবস্থা যা প্রায় বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এই কবিতাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
অতনু ভট্টাচার্য
অতনু ভট্টাচার্য
4 months ago

শ্রদ্ধেয় শ্রীচন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সাহিত‍্যের গভীরে গিয়ে নেড়েচেড়ে দেখেন।ঠিক এরকম প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব‍্যক্তি ক্রমশ বিরল হয়ে যাচ্ছেন।তাই,অনুরোধ,ওঁর মহামূল‍্যবান কাজগুলি প্রকাশিত হোক।ওঁর রচনা সম্পর্কে বিশেষভাবে বলার স্পর্দ্ধা আমার নেই।প্রণত হই বারবার।

Usri Dey
Usri Dey
4 months ago

অনেক অজানা তথ্য জেনে সমৃদ্ধ হলাম। কবির কবিতার প্রেক্ষিত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন চন্দ্রনাথ দা। স্বভাবতই কবিতাটি উপলব্ধি করতে অসুবিধে হয় নি। সম্পূর্ণ বিদেশী লেখকের কবিতার আত্তীকরণ , e বড় সহজ কথা নয় ! বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই অনুবাদক কে ! 🙏

Ruchi Ghosh
Ruchi Ghosh
4 months ago

অনেক অজানা কথা জানা হল। সমৃদ্ধ হলাম। লেখককে অশেষ ধন্যবাদ এমন একটি মূল্যবান লেখা উপহার দেয়ার জন্য।