শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

[অনুবাদে ফিলিস্তিনি কবি রাফিফ জিয়াদাহ’র কবিতা ]

[প্রাক-কথনঃ রাফিফ জিয়াদাহ একজন ফিলিস্তিনি কবি, লন্ডনের স্বনামধন্য কিংস কলেজের অধ্যাপিকা। ‘We Teach Life, Sir’ এবং ‘Shades of Anger’-এর মতো তাঁর কবিতাগুলো প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সারা বিশ্বে ভাইরাল হয়ে ওঠে। তাঁর সরাসরি পাঠে কবিতা ও সঙ্গীতের এক আবেগময় মিশ্রণ শোনা যায়, যা শ্রোতাকে আন্দোলিত করে। প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের পর থেকে রাফিফ যুদ্ধ, নির্বাসন, লিঙ্গ ও বর্ণবৈষম্য নিয়ে তীব্র ও প্রভাবশালী আবৃত্তি নিয়ে বিশ্বের নানা দেশে মঞ্চে প্রধান শিল্পী হিসেবে পারফর্ম করেছেন।

রাফিফ জিয়াদাহ

নিজের কবিতা সম্পর্কে রাফিফ বলছেন “আমার কবিতা জন্ম নেয় সেই জীবিত অভিজ্ঞতা থেকে যেগুলো প্রায়শই আড়ালে থাকে, বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়, কিংবা নীরব করে দেওয়া হয়। নির্বাসন, অভিবাসন, আর এক স্বাধীন ফিলিস্তিনের জন্য অনন্ত সংগ্রামের প্রতিধ্বনি আমার কবিতাতে লুকিয়ে আছে। আমার আন্দোলনই আমার শিল্পকে বাস্তবতার মাটিতে গেঁথে রাখে—সেই বাস্তবতায়, যাকে আমরা প্রতিনিয়ত বদলাতে চাই। যখন লিখি, তখন আমি কেবল শিল্পের জন্য শিল্প তৈরি করি না। আমি নিয়ত বলে চলি টিকে থাকার গল্প, যন্ত্রণার, আকাঙ্ক্ষার আর আশার গল্প — যে গল্পগুলো, আমি বিশ্বাস করি, পাতার সীমা ছাড়িয়ে প্রতিধ্বনিত হয় বহু দূর পর্যন্ত। আমার আন্দোলন কবিতাকে উজ্জীবিত করে তোলে আবার কবিতাই আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়—লড়াই চালিয়ে যেতে, স্বপ্নকে জিইয়ে রাখতে।“

নিচে সংযুক্ত রইলো তাঁর কবিতা – SHADES OF ANGER – যার বাংলা তর্জমা করে নাম দিয়েছি রক্ত রাগের রাঙা রব |]

রক্ত রাগের রাঙা রব (SHADES OF ANGER)

আমাকে আমার ভাষায় কথা বলতে দাও —
তার জবরদস্তি দখল নিও না ।
আমাকে আমার মাতৃভাষায় কথা বলতে দাও —
তার স্মৃতিক্ষেত্রকে জহ্লাদের উপনিবেশ বানিও না ।
আমি রঙে রঙে গড়া এক আরব রমণী —
অগ্নিরঙ্গে আমার প্রতিবাদে ঝলসে ওঠে
তপ্ত বারুদ মরুপ্রান্তর।
আমার পক্ককেশ দাদামশাই চেয়েছিলেন
শুভ্র ভোরে জেগে উঠতে — দেখতে
কেমন করে দিদিমা নিবিড় প্রার্থনায় হাঁটু মুড়ে বসেছেন
ইয়াফা আর হাইফার মাঝের সেই গহন গুপ্ত গ্রামে।
আমার মা জন্মেছিলেন এক জলপাই গাছের তলায়,
সেই মাটিতে, যাকে আজ ওরা বলে— “এটা আর তোমার নয়।”
কিন্তু আমি মানব না , আমি ফিরব—
পেরিয়ে যাব ওদের বেড়া, ওদের চেকপোস্ট।
ওদের অভিশপ্ত বর্ণবৈষম্যের দেওয়াল ভেদ করে,
আমি ফিরে যাবই আমার মাতৃভূমিতে।
আমি রঙে রঙে গড়া এক আরব রমণী —
অগ্নিরঙ্গে আমার প্রতিবাদে ঝলসে ওঠে
তপ্ত বারুদ মরুপ্রান্তর।

শুনেছিলে কি আমার বোনের আর্তচিৎকার গতকাল—
যখন সে প্রসব করছিল এক চেকপোস্টে,?
দেখেছিলে , কি কেমন লুব্ধ দৃষ্টিতে
ইসরায়েলি সৈন্যরা তার যন্ত্রণাকাতর দু’পায়ের মাঝখানে
তাকিয়ে ছিল, খুঁজছিল আগামী প্রতিরোধের সন্তানকে—
যে একদিন তাদের বন্দুকের চোখে চোখ রেখে বলবে –
এই মাটিই আমার,
আমার মায়ের রক্তে আঁকা উত্তরাধিকার ?
শুনেছিলে কি আমনা মুনার সেই আর্তনাদ—
কারাগারের শিকের ওপার থেকে,
যখন পিশাচ ওরা টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে দিচ্ছিল তার সেলে?
শোনো , আমরা ফিরছি —
ফিরছি ফিলিস্তিনে।
আমরা রঙে রঙে গড়া আরব রমণী —
অগ্নিরঙ্গে আমাদের প্রতিবাদে ঝলসে ওঠে
তপ্ত বারুদ মরুপ্রান্তর।
তোমরা গলার শিরা ফুলিয়ে প্রচার কর
আমাদের গর্ভের গরিমারা
বন্দুক উঁচিয়ে , মাথায় কাপড় বেঁধে সজ্জিত ,
বিতর্কিত পরিচয়ের “সোচ্চার সন্ত্রাসবাদী” ছাড়া
আর কিছুই হতে পারেনি , পারবেও না।
তোমরা প্রচার কর –
আমরা স্বেচ্ছায় প্রিয় সন্তানদের কবরে পাঠাই !
কিন্তু একবার ভেবে সত্যি বলো তো –
উপদ্রুত আকাশে মৃত্যুর লেলিহান শব্দ সম্ভার , কার ?
কেন , তোমাদের শত শত হেলিকপ্টার , এফ – ১৬
আমাদের শান্তির ঘরে বারুদ ছড়ায় ?
আর সন্ত্রাসবাদ !
বলো, কে ছুঁড়েছিল প্রথম আগুন?
CIA-র ছায়া তো আজও জ্বলছে
প্রতিটি ফিলিস্তিনি শিশুর চোখে।
ভান করছো নাকি সুযোগ বুঝে ভুলে গেছো –
ওসামাকে প্রথম প্রশিক্ষণ কারা দিয়েছিলো ?
আমাদের পূর্বপুরুষেরা কি সাদা হুড পরে
অসহায় কালো মানুষদের রক্তে মুড়ে হত্যা করেছিল ?
ওরা কেউ ক্লাউন নয় , ওরা অপরাধী নয়—
ওরা প্রতিরোধের কণ্ঠ, নিপীড়িতদের অহংকার,
ওরা জন্মভূমির শপথ শকট-এ বাঁধা, প্রতিটি স্মৃতির দাবিদার।
তোমরা ক্ষমতার জাহির করো আগুনে, বারুদে , লোহার শিকলে
আমরা ফুৎকারে তা উড়িয়ে দিই, প্রতিবাদে, প্রতিরোধে।
আর এতেই তোমাদের সন্দেহ , ভয়
সন্ত্রস্ত – আমাদের চোখে খুঁজতে থাকো হুমকির উৎস।

শোনো , আমরা ফিরছি —
ফিরছি ফিলিস্তিনে।
আমরা রঙে রঙে গড়া আরব রমণী —
অগ্নিরঙ্গে আমাদের প্রতিবাদে ঝলসে ওঠে
তপ্ত বারুদ মরুপ্রান্তর।
কি বললে? ওই প্রতিবাদে মুখরা নারী –
যিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করছেন
তার প্রতিরোধে শামিল হওয়া নিষিদ্ধ ?
আবার বলছি , সাবধান হও !
প্রাচ্যের রূপকথার কল্পিত বন্দিনীরা
তোমাদের সেই সব কোমর দোলানো উপপত্নীরা –
যারা বেলী ডান্সের মোহজালে
রাতের পর রাত মেহেফিল জমিয়েছিল
সেই সব আরব রমণী , যারা নরম গলায়
‘জী হুজুর, না হুজুর, ধন্যবাদ হুজুর’ বলে
নজরানা তুলতো মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে
তাদের গর্ভে জন্ম নিতে প্রস্তুত আজ
বিদ্রোহের শত শত ফিলিস্তিনি কণিকারা।
ওদের প্রতিটি পদধ্বনিতে শোনা যাবে তরবারির রব,
ওদের দৃপ্ত কণ্ঠে বাজবে আত্মশপথের বাজনা;
ওদের হাতের প্রতিটি পাথরে লেখা থাকবে—
“এই মাটিই আমাদের। এই আমাদেরই মাটি । “

শোনো , আমরা ফিরছি —
ফিরছি ফিলিস্তিনে।
আমরা রঙে রঙে গড়া এক আরব রমণী —
অগ্নিরঙ্গে আমাদের প্রতিবাদে ঝলসে ওঠে
তপ্ত বারুদ মরুপ্রান্তর।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.