
[২৫ জুলাই , ১৯৪১ সাল। দিনটি শুক্রবার। সাতসকালেই আশ্রমবাসীরা সমবেত কণ্ঠে এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার’ গাইতে গাইতে রবীন্দ্রনাথকে অর্ঘ্য অর্পণ করল। শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলেছেন কবি। আর কোনদিন ফিরবেন না , বোধ হয় বুঝতে পেরেছেন তিনি। যাওয়ার আগে মোটরগাড়িতে চেপে শান্তিনিকেতন আশ্রমের সবার সঙ্গে দেখা করলেন, গাড়িতে করেই গোটা আশ্রম ঘোরানো হলো তাঁকে। আশ্রমের চিকিৎসক শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে ডেকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শচী, আমার আশ্রম রইল, আশ্রমবাসীরাও রইলেন। তুমি দেখে রেখো।’ পুরো আশ্রমের মানুষ তাঁকে দাঁড়িয়ে অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানাল। বোলপুর স্টেশন থেকে ট্রেনের বিশেষ কোচে রবীন্দ্রনাথ এলেন কলকাতায়। ২৫ জুলাই দুপুর সোয়া ৩টার দিকে রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। ]

“কী খুঁজছ, কবি ?
জীর্ণ দেহে, অবসন্ন চেতনায় ?
জন্মভিটে থেকে দূরে এতদিন
দেশহীন মহাদেশের আকাশের নীচে বসে
মনের মধ্যে তোমার যে বিপুল সঞ্চয়,
সেই সব অমূল্য ছবি,
তাদের নিয়ে আজ আবার
উৎসমুখে এসে দাঁড়িয়েছ।
কী খুঁজছে তোমার চোখ, কান কোন্ কথা?”

“এখানেও তুমি জীবনদেবতা?
দ্যাখোদিকি, আমি যে খুঁজে চলেছি
আমাদের সেই বাগানের পুরোনো বট
মাথায় যার জটা,
খুঁজছি সেই শ্যামবর্ণ দোহারা বালক, যে আমাকে
গণ্ডি কেটে বসিয়ে রাখত,
আর সেই পাঞ্জাবী অল্পবয়স্ক লেনু,
আমার কাছে যে
রণজিৎ সিংহের চেয়ে কম ছিল না।
খুঁজছি সেই তেতলার ঘরখানা যেখানে
বউঠাকুরানীর সাহিত্যচর্চায় অংশি বালক,
জ্যোতিদাদার উৎসাহে তার গান,
খুঁজে চলেছি সেই প্রতিবেশীদের,
সেই ঘাট বাঁধানো পুকুর,
আর নির্জন প্রহরে রাজহাঁস আর পাতিহাঁসের
ডুব দিয়ে গুগলি তোলার স্বর্গীয় দৃশ্যকে,
সেই বিখ্যাত দক্ষিণের বারান্দায়
তিন শিশু দেবদূতের ছবি ছবি খেলা,
কোথায় গেল তারা?”

“এখন বিশ্রাম নাও, কবি,
এই তো তোমার সেই বাড়ি, স্মৃতিকীর্ণ,
শিগগিরই একে একে এসে পড়বে সবাই,
তোমাকে বরণ করে নেবে।”
” না, না, আমি খুঁজছি সেই
দশাসই পুরোনো বাড়িটা যার
অভিজাত স্তম্ভগুলিতে অনুরণিত হত
বিষ্ণুর ধ্রুপদ, ভট্টজী আর গোঁসাইজীর গান,
হেমদাদার তানালাপ, জ্যোতিদাদার পিয়ানোয় ঝড়,
গণদাদার উদাত্ত সংলাপ, সোমদাদার মিষ্টি সুর,
আর সবকিছু ছাপিয়ে শ্রীকণ্ঠবাবুর সেতারের সঙ্গে
আমার পরমাত্মীয় এক বালকের গান :
‘ময়্ ছোড়ো ব্রজকি বাসরী…’ –
সে এক স্বর্গীয় সুরসভা,
কোথায় গেল সেই কত্তাদাদামশায়ের বৈঠকখানা
যা এখন দ্বিখণ্ডিত – পাঁচ নম্বরে আর ছ’ নম্বরে,
হাহাকার করছে দক্ষিণের বারান্দা,
হাজার ডাকলেও গগন আর সাড়া দেবে না,
সমর শয্যাশায়ী, একমাত্র অবন –
জানো, দেশ তো ওকে কোনো মূল্যই দিল না,
অতবড় গুণী, এদেশ কেন, পৃথিবীতে কটা আছে,
আমি এবার ওর সপ্ততিতম জয়ন্তী ঘটা করে করব,
সামনের জন্মাষ্টমী ২২-এ শ্রাবণই সেই পুণ্যলগ্ন।

আজ শ্রাবণের কত হল? কী বলো , এগারো !
এবার বুঝি সে অভ্যর্থনাহীন,
দেখছো না ‘ফিরে বায়ু হাহাস্বরে’ –
কে অমন করে কাছে ডেকে বসাবে বলো,
আমি ছাড়া?
বাগানের ফুলগুলি কেমন করুণ,
তাদের শিকড়ের কান্না
যেন আমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে,
ওদের যন্ত্রণাই বা কে সুরে সুরে
জগতের সামনে তুলে ধরবে?
আমি যে বেঁচে আছি, তা কেবল এই পৃথিবীকে
ভালোবেসেছি বলে।
যে আমি নিতল নীল নীরব মাঝে
তার নিহিত স্তব্ধতা বিছিয়ে দিয়েছে
শুধু শুনবে বলে তার মন্ত্রের মতো গভীর বাণী,
ছুটেছে নারকেল গাছে রোদ্দুর ঝিলমিল করছে – তা দেখতে – সে এই রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ নয় ।
এতো ভালোবেসেছি যে বলতে পারি নে।
ওরা যে শিশুর মতো আমার মুখেই চেয়ে থাকে।
কেন যে এরা যাবার আগে আমাকে
আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে চাইছে?
ফল যেমন বৃন্ত থেকে আপনি খসে পড়ে,
আমারও ঠিক তেমনি ইচ্ছে চিরকাল।
একটু শান্তি দাও, একটু সান্ত্বনা দাও।
দিন চলে যাচ্ছে, আর তো বেশি দিন নেই।”
“আহা, আজ সকালবেলার অরুণ আলোর মতো
মনে জেগে উঠল কয়েক পঙক্তি :
রানী, খাতা কলম নিয়ে আয়,
শিগগিরই লিখে রাখ দেখি, নয়তো হারিয়ে যাবে।
“প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে – কে তুমি।
মেলে নি উত্তর।”
না, কিছুই জানা হল না, কে আমি ?
কো বেদ, কে জানে? স্বয়ং স্রষ্টাই কি জানেন?

“কবি, ভেবে দ্যাখো, ডাক্তাররা তো বলেইছে
অপারেশনের পর মাথাটা আরো পরিষ্কার হবে,
দৃষ্টি তোমার কাঙ্খিত সুদূর ছোঁবে,
চোখের সামনে পর্দাগুলো যাবে সরে, আর,
বৃহত্তর ভুবন এসে দাঁড়াবে সামনে,
গান গাইবে তোমার চেতনায়,
তোমার সৃষ্টিতে সেই সৌন্দর্য
পরতে পরতে বুনে চলবে এক মহাশিল্পের
অন্তহীন নক্সিকাঁথা…”
“সব হারিয়ে যাচ্ছে একে একে,
সব ডুবে যাচ্ছে – দিনের সূর্য, রাতের তারা,
গলে যাচ্ছে ইস্পাতের মতো দিগন্ত,
ধুয়ে মুছে যাচ্ছে পুরোনো স্মৃতি, নবীন শোক,
জন্মদিন একাকার হয়ে যাচ্ছে মৃত্যুদিনে।
সকালের আলো আসছে, রানী, লিখে নে –
“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে
হে ছলনাময়ী…”
কোন দূর দিগন্তের ওপার থেকে যেন ভেসে আসছে
সেই মন্ত্রের মতো উচ্চারণ,
তিনি এখন বৃক্ষ ইব স্তব্ধ দিবি …
“বড় ক্লান্ত লাগছে, শেষটা লিখে নে –
“অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার।”
সকালবেলার কবিতাটির সঙ্গে জুড়ে দিস।
একবার পড়ে শোনা তো কি লিখেছি আজ।
উঁহু, কিছু গোলমাল আছে –
ভালো হয়ে পরে ঠিক করব’খন।”

“চোখের বাইরে নিবে আসছে আলো
মুছে যাচ্ছে সব রেখা রঙ, আকাশের জ্যামিতি,
আমার গান যেন যন্ত্রহীন ধ্বনি, অক্ষরহীন কথা,
হিমের পরম শূন্যতার নীচে জলের গুঞ্জিত স্তব্ধতা,
ঘুম… ওহে অন্তরতম… এসো তুমি শ্রান্তিহরা …
এসো শান্তি -সুপ্তিভরা…
যেভাবে গাছের সবুজ পাতায়
তোমার নিঃশ্বাস পড়ে,
আর, গভীর রাতে নক্ষত্রদের
বুকের ভিতর তোমার সুর ঝরে পড়ে,
যেভাবে অতল অন্ধকার ছুটে আসে
সকল অন্ধকার ডোবাতে ডোবাতে,
আর, গভীর শান্ত অনাড়ম্বর আসে
সকল দ্বন্দ্ববিরোধ একাকার করতে করতে
আমার সর্বস্বে এসো তুমি,
এসো তোমার সহস্রাশ্ব রথে চড়ে …”


অতুলনীয় পরিবেশন।
আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক অজানা তথ্য, এইরকম বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে পরিষ্কার হয়।
এখনকার পরিবেশে এইরকম প্রেক্ষাপট তুলে আনা সব সময়ে কাল্পনিক মনে হবে, যদি না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্বন্ধে শ্রোতার জ্ঞানের পরিধি পর্যাপ্ত থাকে। সেইসব শ্রোতাদের আরো ভালো লাগবে যারা রীতিমতন রবীন্দ্র, নজরুল, বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্য নিয়ে চর্চা করেন।
আমি আরো শোনার অপেক্ষায় থাকলাম।