সমগ্র বিশ্বে তৃণের আসন জুড়িয়া রহিয়াছে। অথচ মনুষ্য জাতির মানবিক অস্তিত্বের প্রেক্ষাপটের তৃণের স্থান অতীব অকিঞ্চিতকর। নগরায়নের আগ্রাসনে তৃণভূমি বিলীয়মান। গ্রামীণ পরিবেশে অদ্য কৃষকের হস্তেও তৃণ ধ্বংসকারী রাসায়নিক। ইহার নির্বিচার ব্যবহারে প্রায়শঃই দগ্ধতৃণভূমি পরিলক্ষিত হয়। নিরীক্ষণ করিলে বুঝা যায়, অগ্নি সহযোগে তৃণ দগ্ধ হয় নাই, বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগে উহার এমত পরিণতি। ইহাতে পরিবেশ ও তৃণভোজী প্রাণীকুল, তথা খাদ্য শৃঙ্খলে অবস্থিত উক্ত প্রাণীকুলের পরবর্তী স্থানাভিষিক্ত প্রাণীদের কী পরিণাম, তাহা অপরিণামদর্শী মানবের বোধগম্য হইবার কারণে, নূতন কোন বৃহৎ বিপর্যয়ের অপেক্ষায় রহিতে হইবে।
তদুপরি তৃণ অবিনশ্বর। সামান্য পরিসর পাইলেই তাহার উপস্থিতি দৃশ্যমান হইয়া ওঠে। মানবের অলক্ষ্যে কোন এক জাগ্রত সত্য অপেক্ষায় থাকে, মুহূর্তের মায়াবিভ্রম কাটিয়া যাইতেই, তাহার শ্যামশোভা পরিদৃশ্যমান হইয়া ওঠে।
এমনই এক তৃণজাতীয় উদ্ভিদ, যাহাকে সম্বৎসর দেখিতে পাইনা, প্রকৃতির এক অমোঘ আহ্বানে সে আত্মপ্রকাশ করিয়া আমাদিগের সম্মুখে আসিয়া, তাহার শুভ্র হাস্যোজ্জ্বল অবয়ব উপস্থাপন করিয়া আমাদিগের অন্তঃকরণকে বাহিরে আহ্বান করিয়া থাকে। তাহাকে বাঙালি কাশফুল নামে অবিহিত করিয়াছে। যে উদ্ভিদের ব্যবহারিক কোন উদযাপন নাই, হোমে অথবা যজ্ঞে যাহার ভূমিকা পরিলক্ষিত হয় না, অকস্মাৎ শরৎকালীন আনন্দ উৎসবের প্রাককালে আসিয়া যেন শঙ্খ ও নিশানবাহী আনন্দময়ীর অগ্রদূত রূপে আবির্ভূত হইয়া থাকে।

আকাশেও যেন তদ্রুপ শুভ্রতার প্রতিবিম্ব পরিলক্ষিত হয়। সারিবাঁধা সোপানের ন্যায় সেই সকল কাশফুলরূপী মেঘের দল বাঙালি মানসকে আচ্ছাদিত করিয়া রাখে।
একাকী গৃহকোণে নিবিষ্ট চিত্তে বহু মানুষ তাহার ইষ্ট ভজনায় নিয়োজিত থাকেন। উক্ত ভজনা যখন সমষ্টির সম্মিলিত আকাঙ্খায় পর্যবসিত হয়, তখনই সৃষ্টি হয় উৎসব। ধর্মপালনের উপাচারের বাহিরে আসিয়া এক অনন্য শৈলীর বৃহৎ রূপ পরিগ্রহ করে। এই বৃহত্তর রূপের দোসর হইয়া আমাদিগের সম্মুখে আসে, নীল আকাশ, ভরন্ত নদীর স্বচ্ছ জলরাশি ও আরও অনেক অনুষঙ্গের সহিত কাশফুল। যাদুকরের মন্ত্রবলে সম্বৎসরের অপ্রাপ্তি, বিফলতা, বিরূপ প্রকৃতি তান্ডব, সব বাস্তবতার ভীড় ঠেলিয়া সামান্য ঘাসের উপস্থিতি বাঙালি অনুভূতিকে এক চিরন্তন সত্যের আধারে প্রতিস্থাপিত করে, অন্তরনিহিত আনন্দময় কোষই এক এবং একমাত্র উপলব্ধি। প্রতিদিনের পার্থিব চাওয়া পাওয়ার দ্বন্দ্ব ও দৈন্যতায় আমাদিগের বিস্মৃত করিয়া রাখে, যে এসকল ক্ষণস্থায়ী উচ্চকিত উচ্চারণ, জীবন নহে। পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে অনুষ্ঠিত হইয়া চলা চিরন্তন প্রবাহ।
‘কাশ’ শব্দটি বাঙালি মনে যেরূপ অনুরণিত হইয়া থাকে তেমনটি অন্যান্য অনেক ভাষায় প্রতিভাত হয় না। হিন্দিতে ‘কাশ’ কোন এক অতৃপ্ত আকাঙ্খার ‘যদি’ রূপে বিধৃত। সংস্কৃততে উজ্জ্বল কিছু ব্যাখ্যা করিতে এমত শব্দ ব্যবহৃত। ইহা ব্যতীত সমোচ্চারিত ‘ক্যাশ’ শব্দটিতে অর্থকড়ি-র দ্যোতনা ধ্বনিত করিয়া থাকে। ইংরাজি, ফরাসী, স্প্যানিশ হইতে দক্ষিণ ভারতের তামিল, তেলেগু সকল ভাষাতেই ‘ক্যাশ’-এর আধিপত্য বর্তমান। কেবলমাত্র এই বঙ্গদেশ এই শব্দটির এক ব্যতিক্রমী ভাষ্য খুঁজিয়া পাইল।
অনাবশ্যক প্রধান্য পাইবা হেতু বাঙালি কাশ আতিশয্যে শয্যা পাতিয়াছে। বিভিন্ন শরৎকালীন মেলায় কাশ দিয়া নানারূপ অঙ্গসজ্জার ব্যবস্থা করা হইয়া থাকে। অল্প বয়সী তরুণ তরুণী নৃত্যের আভরণ রূপেও ইহাকে শনাক্ত করিয়া থাকেন। বস্তুত কাশফুলের সূক্ষ্ম আঁশ, প্রশ্বাসের সহিত শরীরে অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলে, যে কী মারাত্মক ক্ষতি হইতে পারে, তাহা লইয়া গবেষণা চলিতে পারে।
যাহা হউক, উৎসবের অছিলায় তৃণকে তাহার ভূমি আসন হইতে সামান্য কয়েক দিবস উপলক্ষে রাজাসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়া বাঙালির স্বর্গসুখ লাভ হইয়া থাকে। সামান্য হইলেও বাঙালি তাহার প্রকৃতির সহিত নাড়ির বন্ধন অজান্তে হইলেও স্পর্শ করিয়া থাকেন। ইহাতে উপাচারের দাক্ষিণ্য থাকিলেও মানস মালিন্য মোচন উপায়ও লগ্ন হইয়া যায়। কোন প্রজন্মের হস্ত বিধৌত আশিস রেণু হইতে পুনরায় জাগ্রত হইবার আশ্বাস লইয়া প্রতিবারের ন্যায় শরৎ আসেন, তাঁহার চরাচর ব্যাপী প্রশান্তি লইয়া।
রবিচক্রের সকল পাঠক, দর্শক, লেখক, শ্রোতা বন্ধুদিগের প্রাণে সেই প্রশান্তি স্পর্শ করুক। কাশফুলের ন্যায় নিষ্কলঙ্ক হউক পরবর্তী পদচারণা। জীবনদেবতার নিকট এইমাত্র প্রার্থনা।
রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com
Bengali identity and consciousness

