
“ওই যে এসেছে রে, ওই কিস্টুপার! “
জনার্দনপুর রেল কলোনির পাশে পথের ধারে বসে থাকা দু একজন সবজি বিক্রেতার সন্ত্রস্ত গলায় এরকম বিজ্ঞপ্তির পরই দেখা গেল অনেক ছোটখাটো দোকানীই তাদের জিনিসপত্র ঢাকাঢুকি দিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। জনার্দনপুর রেলওয়ে কলোনীর ছোট হাটে যাকে দেখে এমন সামাল সামাল রব, তাকে সবাই একডাকে চেনে, চেহারাও একবার দেখলে ভুলে যাবার নয়। এই ‘কিস্টুপার’ ওরফে ক্রিস্টোফার হচ্ছে এই রেলওয়ে কলোনীর বাসিন্দা — দঃ পূর্ব রেলওয়ের এক জংশন স্টেশনের এক ইঞ্জিন-চালক। যেমন দশাসই চেহারা, তেমন বেপরোয়া স্বভাব! একটা ষাঁড়ের মতোই যখন সে বাজারে ঢোকে, যেখান থেকে যা’ পছন্দ, দানবের মতো দুই হাতে তুলে নেয়। এই জনার্দনপুরের সকলেই জানে, যা সে তুলে নেবে,তার দাম দেবেনা কখনই। ফলে তার বাজারে প্রবেশ মাত্রই দোকানীরা স্বভাবতই সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে।
ক্রিস্টোফারের পরিবারের আরো চারজন সদস্য স্ত্রী অলিভিয়া আর তিন মেয়ে। এক মেয়ের অবশ্য বিয়ে হয়ে গেছে। জামাইকেও সে ঢুকিয়ে দিয়েছে রেলের চাকরিতে নিজের ইউনিটেই — তার কাজ চলন্ত ইঞ্জিনে কয়লা দেওয়া। বৌয়ের সঙ্গে ক্রিস্টোফারের অবশ্য খুব বনেনা, যদিও সে বাড়িতে থাকে কম। রোজগারের বড় হিস্সাই সে খরচ করে মদ্যপানে, সেই নিয়ে খিটিমিটি বাঁধা স্বাভাবিক। ক্রিস্টোফারের পানের মাত্রা যেদিন বেশি হয়ে যায়, সেদিন বাড়ি ফিরে বেধড়ক পেটায় বৌকে, দুই মেয়ে তখন ধারেকাছে ঘেঁষেনা বিশেষ। নেশা না চড়লে ক্রিস্টোফার অবশ্য দিলখোলা অমায়িক মানুষ। কথায় কথায় দরাজ গলায় হেসে উঠবে হো হো করে, আসা যাওয়ার পথে কারও সঙ্গে দেখা হলে তার
দরজায় দাঁড়িয়ে সুখ দুঃখের খবরও নেবে। এ ছাড়া আর একটা কারণেও পাড়ার অল্পবয়সীদের কাছে সে যাকে বলে খুব ‘পপুলার’। ছুটির সময় অবসর মতো সে বক্সিং শেখায় বাচ্চাদের।

অবশ্য রেলওয়ে কলোনীর যে দু’এক ঘর খ্রিস্টান অ্যাংলো ইন্ডিয়ান আছে, তাদের সঙ্গে ক্রিস্টোফারের যে খুব মাখামাখি আছে, এমন নয়। তার অপরিমিত মদ্যপান ও তার পরিণতিতে ঘরের অশান্তির কথা প্রতিবেশীরা সবাই জানে। হয়তো তার স্বজাতি-আত্মীয়রাও সেই সূত্রে শুনে থাকবে, তাই ক্রিস্টোফারই মনে হয় তাদের সংস্রব এড়িয়ে চলে। আত্মীয় বলতে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজনেরাই কাছাকাছির বাসিন্দা, ওপর ওপর তারা কিছুটা সমীহই করে ক্রিস্টোফারকে, সে তার জামাইকে চাকরীতে ঢুকিয়েছে বলেই হোক, বা তার তাগড়া চেহারা ও বেপরোয়া স্বভাবের জন্যই হোক। কিন্তু ক্রিস্টোফার নিজেই তাদের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করে চলে। একটু আধটু মদ্যপান অবশ্য তার আত্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো দোষ হিসেবেই ধর্তব্য নয়। তবু কেন সে এই দূরত্ব রক্ষা করে চলে, তা বলা মুশকিল।

কলোনীর অদূরে অ্যাংলিকান চার্চের ফাদার তার এই পানদোষ দূর করবার চেষ্টা করেছিলেন — অবশ্যই সদুপদেশের মাধ্যমে। প্রতি রবিবার না পারলেও যখন সে বাড়িতে থাকত, সাপ্তাহিক প্রাথর্নার জন্য নিজের বৌ মেয়েদের নিয়ে মোটামুটি নিষ্ঠার সঙ্গে চার্চে হাজির হত একসময়। খ্রিস্টীয় সমাজের যেসব লোকজন আশেপাশের নানা মহল্লা থেকে সেখানে সমবেত হত, তাদের সঙ্গে ব্যবহারিক সৌজন্যে এতটুকু ব্যত্যয় ঘটতে দিতনা ক্রিস্টোফার। একবার সাপ্তাহিক প্রার্থনাতেই চার্চের প্রধান পাদরি আলাদা ভাবে ডেকে অনিয়ন্ত্রিত মদিরাসেবনের কুফল সম্পর্কে সদুপদেশ দিয়েছিলেন তাকে। ক্রিস্টোফার শান্তভাবে সেদিন সব শুনেছিল, কোনো প্রতিবাদ করেনি। তার অবশ্য মনে হয়েছিল যে ফাদার তার প্রতিবেশীদের থেকেই এ ব্যাপারে অবহিত হয়েছেন ও তার নৈতিক অভিভাবকের দায়িত্ববোধ থেকেই তাকে এসব কথা হয়তো বলেছেন। কিন্তু তা বলে তার সুরাসক্তির ওপর ফাদারের এই শাসনের কোনো প্রভাব পড়েনি।
এরপর রাস্তায় একবার খ্রিস্টের সুসমাচার প্রচারের সময় এই পাদরি বাবার সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল ক্রিস্টোফারের। সেদিনও মদ্যপানের প্রসঙ্গ তোলায় এবং বিশেষভাবে তাকেই এ নিয়ে কিছু উপদেশ দেওয়ায় সে তার পূর্ববৎ বিনয় বজায় রাখতে পারেনি, কারণ সেখানে উপস্থিত দু একজন মুখ-চেনা লোকের চোখে যেন কৌতুকের ঝিলিক লক্ষ করেছিল সে। ফলে সে ফাদারের কিছুকিছু সুসমাচার তাকেই ফিরে শুনিয়েছিল। সে বলেছিল যে সুরাপান তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও সেটা তার কাছে জীবনরক্ষক ওষুধ বা প্রাণদায়ী পানীয়ের সমান। তাছাড়া ও জিনিস পান করা উচিত নয় — স্বয়ং খ্রিস্টপ্রভুও এমন কথা কস্মিনকালে বলেননি। বরং বিবাহ উৎসবে নিমন্ত্রিতদের আপ্যায়নের জন্য দ্রাক্ষাসব ফুরিয়ে গেলে খৃস্ট প্রভু গালীল প্রদেশের কানা নগরের এক বিয়ে বাড়িতে দু’দুটি জালাভর্তি জলকে অবলীলায় আঙুরের সুস্বাদু মদ্যে পরিণত করেছিলেন।
পাদরি মশাই তখন অবশ্য বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন যে, তাঁর অভিযোগ সুরা সম্পর্কে নয়, সুরাপান ঘটিত অসংযম নিয়ে। কিন্তু ক্রিস্টোফারের সপ্রতিভ প্রত্যুত্তরের পর সে প্রসঙ্গ তেমন জমেনি। তিনিও বুঝেছিলেন যে, ক্রিস্টোফারের চেহারা যতোই হৃষ্টপুষ্ট হোক, বুদ্ধিটা অন্তত মোটা নয়। তাঁর সমস্ত ভাষণই সে যে মন দিয়ে শোনে, এতে যে আর সন্দেহ করা চলে না, এ ব্যাপারটা সেদিন জনার্দনপুরের ফাদার বুঝে গিয়েছিলেন। ক্রিস্টোফারের মনে সেদিন একটা সন্দেহের উদয় হয়েছিল — তার ওপর ফাদারের এই উপদেশ বর্ষণ অলিভিয়ার নালিশের ফল নয়তো! সেদিন সে প্রাণ ভরে মদ গিলেছিল এবং পরিণতিতে অলিভিয়া বেচারীরও উত্তম মধ্যম জুটেছিল ক্রিস্টোফার বাড়ী ফেরার পর।
নেশার ঘোরে স্ত্রীকে মারধোর করলেও ক্রিস্টোফারের মধ্যে যে কোনো দয়ামায়া বা সুকুমার বৃত্তি ছিলনা, এমন কিন্তু নয়। উদাহরণ হিসেবে তার দুটি আশ্রিতের কথা বলা যায়। একটি হচ্ছে এক বেওয়ারিশ কুকুর আর অন্যটি এক গৃহতাড়িত পাগল। ক্রিস্টোফার বাড়িতে থাকলে তার বাড়িতে এদের যে আহার জুটবেই – এটা একরকম সুনিশ্চিত। তার বৌ অবশ্য এদের দেখতে পারে না। ক্রিস্টোফার রেলের কাজে যে ক’দিন লাইনে বের হয়, সে ক’দিন জনার্দনপুরের হাটের ব্যাপারীরা নিশ্চিন্তে থাকলেও পাগল আর কুকুর বেচারী তখন পড়ে বিপদে। অলিভিয়া তখনই তাদের খেদিয়ে দেয় বাড়ি থেকে। আবার ডিউটি সেরে বেলচা কাঁধে ফেলে যখন ঘরে ফেরে ক্রিস্টোফার, তখন দেখা যায়, তার পেছন পেছন এসে ঢুকছে পাগল আর কুকুরটা।

একবার এমনই ডিউটিতে বের হয়েছে ক্রিস্টোফার, তাকে মেল ট্রেনের ইঞ্জিন চালাতে হবে। যথারীতি পাগল ও কুকুর উৎখাত হয়েছে তার বাড়ি থেকে। ক্রিস্টোফারের সঙ্গে চালকের কেবিনে রয়েছে আরও দু’জন রেলস্টাফ — যাদের অন্যতম তার জামাই জন। গাড়ী তখন বেগ নিয়েছে। স্টেশন ছাড়ার পর হঠাৎ সামনের দিকে তাকিয়ে ক্রিস্টোফার আঁৎকে উঠল- এমন ভয়ংকর কাণ্ড সে জীবনে দেখেনি। সে দেখতে পেল, যে-লাইন ধরে সে ট্রেন চালাচ্ছে, সেই একই লাইনে কিছুটা দূরে উল্টো দিক থেকে একটা ইঞ্জিন আসছে! সে মেল ট্রেন চালাচ্ছে – এতগুলো লোকের প্রাণ তার হাতে, এই খেয়ালটা তার ছিল, সে বুদ্ধি হারাল না। চেঁচিয়ে হর্ন বাজিয়ে সে থামাতে চেষ্টা করল উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা ইঞ্জিনটাকে। কিন্তু না — ঐ ইঞ্জিনের ড্রাইভার থামার কোনো লক্ষণই দেখাল না!

শেষ পর্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিজের কর্তব্য স্থির করে তার দুই সঙ্গীকে কেবিন থেকে ঝাঁপ দিতে বলে ক্রিস্টোফার। একজন ঝাঁপ দেয়, অন্যজন, তার জামাই। সে শ্বশুরকে ছেড়ে ঝাঁপ দিতে চায়না বলে তাকে লাথি মেরে সে ফেলে দেয় ইঞ্জিনের দরজা দিয়ে বাইরে। তারপর প্রচণ্ড শক্তিতে নিজের ইঞ্জিনের কাপলিং খুলে মেল ট্রেন থেকে আলাদা করে দেয় ইঞ্জিনকে, ফলে তার ইঞ্জিন সামনে ছুটে গিয়ে ধাক্কা মারে উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা দূরের ইঞ্জিনটাকে। সেই ইঞ্জিনটার ড্রাইভার কিছুটা জখম হয়, কিন্তু মারাত্মক চোট পায় ক্রিস্টোফার। তার মেল ট্রেন কিছুটা গড়িয়ে গিয়ে নিজের থেকেই থেমে যায় আস্তে আস্তে।
দু’দিন হাসপাতালে বেহুঁশ অবস্থায় থেকে যোঝে ক্রিস্টোফার, তারপর তার তাগড়া শরীরটা ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। তার কফিন যখন রেলওয়ে কলোনিতে আনা হয়, সমস্ত পাড়া ভেঙে পড়ে তার বাড়ির সামনে। কোথা থেকে পাগল আর কুকুরটাও এসে হাজির হয়। কিন্তু তারা বোধহয় কাঁদতে জানে না। পাদরি সাহেবও এসেছিলেন অন্ত্যেষ্টির সময় শেষ প্রাথর্না করতে। তাঁর মনে পড়ে গিয়েছিল, একবার ক্রিস্টোফারকে অপরিমিত মদ খেলে লিভার পচে মরতে হবে, তিনি একথা বলে সাবধান করতে গেলে সে বলেছিল, “আপনি লিখে রাখুন ফাদার, ক্রিস্টোফার মরদের মতো মরবে, বাড়ির বিছানায় শুয়ে রোগে পচে মরবে না।” সে আরও বলেছিল, খ্রীস্টপ্রভুর নামের সঙ্গে মিল থাকলেও তাঁর মতো যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু তার জন্য নয়। সংসারত্যাগী পাদ্রিটি ঠিক বুঝতে পারেননি, লোকটি কি অবিশ্বাসী ছিল, না – অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী!

এর কয়েকমাস পরে জনার্দনপুর জংশন স্টেশনের পাশে ক্রিস্টোফারের স্মৃতিতে এক সুদৃশ্য বেদী তৈরী হয়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সৌজন্যে তার ওপর বসানো হয় ক্যানাডিয়ান ইঞ্জিনের মডেল, জীবনের শেষ দিনটিতে যেরকম ইঞ্জিন সে চালাচ্ছিল। নীচে লেখা হয় — “ক্রিস্টোফার ছিল এক কর্তব্যপরায়ন রেলকর্মী। নিজের জীবন দিয়ে সে দু’শো যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছিল।”

