শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

অনুগল্পঃ ফেরিওয়ালা ও পাওয়ার ব্যাঙ্ক

ফেরিওয়ালা

সকাল দশটা সাড়ে দশটা হবে। বেশ তাপ লাগছে শরীরে। কেউ বলছিলো এখন নাকি আটত্রিশ, আর ফিল লাইক সাতচল্লিশ। ঘরের ভেতরটা বেশ ঘেমো ঘেমো। জানলা দিয়ে গাছের পাতার যা বহর দেখছি, মাটির দিকে মুখ ক’রে বেশ মনখারাপ মনে হলো তাদের। আর জলীয় বাষ্পের তো ছড়াছড়ি। কষ্টকর বহির্জগৎ। একটা ডাক শুনতে পেলাম। কেমন যেন! আবার। চোখ বন্ধ ক’রে কানটা খুলে দিলাম আরেকটু। কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না। শুরুটা চিৎকার ক’রে কান্নার মতো লাগছে, আবার পরের শব্দগুলো এমনভাবে বলছে যেন কিছু বিককিরি করতে চাইছে। লাও ঠ্যালা। ভিখিরি, নাকি ফেরি? এসব কি মিলিয়ে মিশিয়ে এক হয়ে গেলো! খিদে বেচা আর মাল বেচা কি এক হতে পারে কখনও? হয়তো একই। হয়তো নয়।

টুঙঙ। একটা মেসেজ ঢুকলো। পাত্তা দিই নি। আবার টুঙঙ। কি হলো? আবার। দেখতেই হয় এবার। কিসের এত তাড়না? এসএমএস ঢুকছে। তিনটে পরপর। চোখ বুলিয়ে বোঝা গেলো কন্টেন্ট একই। খুললাম একটা। অনুভবী মার্কেটিং, এইচ. আর. ডিভিশন, গুরগাঁও। আমরা আপনার সংবেদনশীলতাকে আদর জানাই। এটি পড়ুন,– একটি লিংক। লিংক খুলে অবাক হয়ে বসে আছি। কি ক’রে বুঝলো? তা’হলে কি ওইসব বস্তুবাদী দ্বন্দ্ব মাথায় এসেছে ব’লে কোনো এক ওয়েভলেংথ ডিটেকটর পাকড়ে ফেললো আমার ভাবনা তরঙ্গ! ওরা রবিঠাকুর পাঠিয়েছে:
দশটা বাজে, সাড়ে দশটা বাজে,
নাইকো তাড়া হয় বা পাছে দেরী।
ইচ্ছে করে সেলেট ফেলে দিয়ে
অমনি করে বেড়াই নিয়ে ফেরি।
দশটা, সাড়ে দশটা আর ফেরি এই তিনটের হিসেব কষেই পাঠিয়ে দিলো? শিশু মনে করেছে আমায়? তাপ, পাতার মনখারাপ, খিদে, ভিক্ষা… এসবের চাহিদা মিটবে কোথা থেকে? বসে ভাবছি। আবার টুঙ। খুললাম মেসেজ: আরো পড়ার জন্যে ১০০ আইএনআর জমা করুন। নীচের লিংকে আশৈশব লালিত কয়েকটি উত্তেজক শব্দ– গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে…

বাইরে আবার সেই ডাক। ফিরতি পথে এ’পাড়ায় আরেকবার হেঁকে যাচ্ছে ফেরিওয়ালা।

পাওয়ার ব্যাঙ্ক

পাওয়ার কাট। পাওয়ার ব্যাঙ্ক খালি খেয়াল নেই। ল্যাপটপে স্টার্ট নেওয়ার শক্তি শেষ। মেইল-এ মিটিং-এর ইনভিটেশন চেক করার সময় দেখলো ফোনে চার পার্সেন্ট বেঁচে আছে। ডেসপারেট সোল, মেমোরাবিলিয়া ডেস্কটপের ইউপিএস প্লাগ’ইন ক’রে দেখলো, স্তব্ধ পাথরের মতো সে যন্ত্র, লাথি মেরে দিলো একখানা, ফিউটাইল সোল। দু’তিনবার হাতের মুঠোভর্তি নিজের চুল ঝাঁকিয়ে হাত উল্টে ওহ্ শিট স্বগতোক্তি হলো, কি এতো রাতভর খেলা! কি এতো ঘুম তোমার!? বড় ক্লায়েন্ট, নতুন ক্লায়েন্ট, প্রথম মিট, মাত্র পাঁচ মিনিট হাতে। তারপর মাথা ঠাণ্ডা ক’রে যে উপায়টা ভাবনা হলো, সেটায় নিজেই একটা শিট লাগিয়ে ফেলেছে। পাশের ফ্ল্যাটের বয়স্ক আঙ্কল গতকাল বিকেলে কিনতে ভুলেছেন ব’লে একটু চিনি চাইতে এসেছিলেন। বেশ অভদ্রভাবে প্রায় মুখের ওপর দরজা বন্ধ ক’রে ইন-আ-মিটিং বলেছিলো। সত্যিই ছিলো মিটিং, তবে অত রিয়াক্টিভ না হলেও চলতো, দেওয়া যেতো চিনিটুকু। এখন খুব ইতস্তত বোধ করছে ওনার অ্যান্ড্রয়েড থেকে লগ’ইন ক’রে মিটিং-এর রিকোয়েস্ট বলতে। হঠাৎই প্রতিবার মুখোমুখি মিটে ওনার সেই স্নেহশীল হ্যালো-সান হাসিমুখ মনে পড়লো, মনে পড়লো ও নিজেও সুন্দর রেসপন্ড করে। দ্বিধা কাটিয়ে কাঁচুমাঁচু মুখে রিকোয়েস্ট’টা করেই ফেললো। আঙ্কল ওয়েলকাম ক’রে নির্দ্বিধায় ফোনটা দিয়ে জানালেন, ওখানে ব’সে মিটিং-টা সেরে নিতে। মাঝে কফি আর চয়েজ অফ বিস্কিটস সার্ভ ক’রে আবার বসলেন ওখানে। মিটিং সেরে, লগ আউট ক’রে, একাউন্ট আর হিস্টরি ডিলিট ক’রে ফোন ফেরৎ দিয়ে খুব আন্তরিক অপরাধী মুখে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে জানালো, স্যরি ফর এভরিথিং স্যর। স্যর!! একটু চুপ ক’রে হিস্টরি ভেবে খুব জোরে একবার হেসে উঠলেন আঙ্কল, আ লাফটার ফুল অফ পাওয়ার। মুখে বললেন, লেট’স হ্যাভ ডিনার টুগেদার সামহোয়ার আউটসাইড মায় সান। মায় ট্রিট। তখন আমরা অনেক গল্প করবো।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x