শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

পৃথিবী কী কারণে ঘুরিতেছে, প্রশ্ন উঠিতে পারে। ইহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই, দিনরাত্রি কিম্বা ঋতু পরিবর্তন হেতু উহাকে ঘুরিতেই হয়। নিজ অক্ষ এবং নিজ কক্ষ ব্যতীত তাহার নিস্তার নাই। তাহার এই ঘূর্ণন প্রক্রিয়ায় মনুষ্য সহ সকল জীবজগত, প্রতিনিয়ত আবর্তিত। কেহ তাহার খোঁজ লইয়া বিব্রত হয় না। যেন মনুষ্যজাতি আদার ব্যাপারী, পৃথিবী নামক জাহাজের খোঁজ না রাখিলেও চলিবে। কিন্তু হঠাৎ যদি পৃথিবী থামিয়া যায়? কিম্বা পৃথিবী এই বিরামহীন গতিপথের একপ্রান্তে ক্ষণিক অবসর যাপনের স্থান খুঁজিয়া পায়? তৎক্ষণাৎ সৃষ্টির বিনাশ অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়িবে।

বিশ্বব্রহ্মান্ডের এই অপরূপ গ্রহটিতে কেনইবা মনুষ্য জন্ম লয় আবার বিদায় লয়, আবার জন্ম লয় এ রহস্য অনুদ্ঘাটিত রহিয়া গিয়াছে। যুগ যুগ ধরিয়া জ্ঞানপিপাসুগণ নিজ নিজ সাধনমার্গে এই রহস্যকে জয় করিবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা করিয়া চলিয়াছেন। অদ্যাবধি তাহার কোনরূপ ঘ্রাণ লাভ করিতে পারেন নাই। এই ক্রমানুসন্ধানে গবেষণাপত্রের আকৃতি নিঃসন্দেহে ভারী হইয়াছে। অজস্র গ্রহ তারা নীহারিকা আকাশগঙ্গার তথ্য সংযোজিত হইতেছে, অথচ ইহার কোন আদি অন্ত নাই। বহির্বিশ্বের সহিত কি আমাদিগের কোন সম্পর্কই নাই? অথচ আমরা তো ওই চন্দ্র সূর্য তারকা সম্বলিত বৃহৎ পরিবারেরই অংশ! অথচ আমাদিগের প্রতিদিনের কর্মকান্ডের সমস্ত অংশে বৃহতের উপস্থিতি অনুক্ত থাকিয়া যায়।

বৈশাখ হইতে চৈত্র-র এই বাৎসরিক দৌড়ে সূর্য কখনও একস্থানে থাকেন না। তিনি তাঁহার সৌরজগতের প্রতিটি পারিবারিক সদস্যকে লইয়া অপর একটি স্বতন্ত্র কক্ষপথে ছুটিয়া চলিয়াছেন। এহেন সত্যাবিষ্কারে পৃথিবীবাসী চমকিত হওয়া ভিন্ন অতিরিক্ত কিছু করিতে পারেন না। তাহাকে কেবলমাত্র একটি উপলব্ধি অন্তরে ধারণ করিতে হয়, যে মনুষ্যজাতি একটি চলমান সভ্যতার ধারক ও বাহক। অঞ্চচল অস্তিত্ব বলিয়া যেমন কিছু হয়না, তেমনি পূর্ণ অস্তিত্বমাত্রই আমাদিগের একমাত্র পরিচয়, যাহা পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বেও ছিল, ধ্বংসের পরেও বিরাজ করিবে।

অতএব যাহা গতিময় তাহাই জগত! সৃষ্টির অভিধানে স্থিতির কোন স্থান নাই। এমতাবস্থায় মনুষ্য কী করিবে? তাহাকেও ছুটিয়া যাইতে হইবে। সময়ের পরিমাপে তাহার আয়ু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অগ্নিকণা সাদৃশ্য হইলেও, আত্মার অভ্যন্তরে উহা স্বয়ং অগ্নি। উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিস্থিতি পাইলে, তাহা হইতে দাবানল অথবা অগ্নুৎপাত সংঘঠিত হইবার পূর্ণ যোগ্যতা বর্তমান। মনুষ্য তাহার অধীত যোগ্যতা পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি হস্তান্তর করিয়া সময়ের পাল্লা বাঁধিয়া রাখে।

উক্ত সময়ের পাল্লায় তাহারা কাল্পনিক যতিচিহ্ন অঙ্কিত করে, ঘন্টা মিনিট সেকেন্ড অথবা প্রহর দন্ড পল অনুপলে বিভক্ত করে। পক্ষান্তরে বিভাজিত সময় যুক্ত হইয়া দিন সপ্তাহ পক্ষ মাস বৎসর শতাব্দ ইত্যাদি রচিত হয়। অনন্ত মহাকালে, মনুষ্য অভিজ্ঞতার প্রান্তরেখা সীমিত। অঙ্কের আয়ু ফুরাইয়া গেলে তাহা তল হারাইয়া প্রাগৈতিহাসিক অথবা তাহারও হইতে সুদূরবর্তী শব্দবোধোপলব্ধির বাহিরে কোন এক নিরঙ্কুশ ব্যাপ্তিতে বিলীন হইয়া যায়।

তথাপি এই পৃথিবীবাসী মনুষ্যকুল, নিজ অস্তিত্বের প্রয়োজনে অনন্তকে বাঁধিবার চেষ্টায় নিয়োজিত হয়। সৃষ্টি হয় পঞ্জিকা। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের এক ক্ষুদ্রাংশ বঙ্গভূমে, বসন্ত প্রান্তে, নব পত্রালিকার আবাহনে, আসিয়া উপস্থিত হয়, রুদ্র বৈশাখ। বৎসর উদ্বোধনের রঙ্গমঞ্চে এহেন তেজোদীপ্ত প্রবেশ আমাদিগকে উদ্বুদ্ধ করে। মহাকালের অনন্ত প্রেক্ষাপটের অন্দরে আমাদিগের যৎপরোনাস্তি অকিঞ্চিৎকর অস্তিত্ব, অসামান্য চিরন্তনের সহিত মিলাইতে সক্ষম হয়। বর্ষব্যপ্ত স্তূপীকৃত সাংসারিক আবর্জনার অগ্নিসংযোগে, বাঙ্গালির অন্তঃস্থলের আপাত নির্বাপিত অগ্নির পুনঃপ্রজ্বলনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সম্ভাবনার অঙ্কুর পরিলক্ষিত হইতে থাকে।

এক্ষণে আশঙ্কা থাকিয়া যায়, এই অঙ্কুর সত্যই কি প্রকাশিত হইবে? এযাবৎকালে বাঙ্গালির চরিত্রগত যে স্থবিরতা অর্জিত হইয়াছে, তাহাতে এই আশা পরম দুর্দৈব ডাকিয়া আনিবার শক্তি রূপে প্রতীয়মান হইতেও পারে। দগ্ধগৃহ গাভীর ন্যায়, নিঃস্পন্দ বঙ্গভূমবাসী রক্তিম মেঘ দেখিয়া কম্পিত হইয়া যায়।

তথাপি কালের নিয়মে পঞ্জিকার পৃষ্ঠা উল্টাইয়া যাইবে। আজি হইতে শতবর্ষ পরে, কোন উৎসাহী পাঠকের নিকট আজিকার এই মহাসমারোহ বৈশাখী অভ্যুথ্থানকে নিতান্ত নিরীহ নির্জীব অস্পষ্ট সময়ের দাগ রূপে প্রতিভাত করিবে? নাকি যুগপরিবর্তনের এক কালখন্ডরূপে চিহ্নিত হইবে, তাহা জানিতে, আমাদিগকে কিঞ্চিতাধিক এক পক্ষকাল অপেক্ষা করিতে হইবে।

  

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Ruchismita Ghosh
Ruchismita Ghosh
3 months ago

একটি যথাযথ সম্পাদকীয়। কালের নিয়মে ঋতু পরিবর্তন এবং বৈশাখের আগমন, নববর্ষের সূচনা আমরা বাঙালিরা ঠিক কতদিন বহন করব, এ এক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে উঠেছে।

শৌভিক দে
শৌভিক দে
3 months ago

সম্পাদক মশাই যদি নিশ্চিত যে গতিময়তাই জগত তবে এই গতি জাঢ্যের শিকার জীবন লইয়া তাহার সংশয় কিসের। তিনি তো ‘রবি’র আলোয় দীক্ষিত। আমাদের ঠাকুর তো কবেই বলিয়া গিয়াছেন ‘ ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে’। সে কথা আলাদা যে বহুল প্রচারে সত্যের মুখ বিজ্ঞাপনে ঢাকিয়া যায়। যাহার যতটুকু সাধ্য সে তাহাই করুক, বাকি গীতা ভাষ্য। এই আন্তর্জালিক পত্রিকাটিতে অন্তত সম্পাদকীয় স্তম্ভে সাধু ভাষার প্রয়োগ করা হইয়া থাকে। এই সাধু প্রচেষ্টা বড়ই চিত্ত হ্লাদিনী। কাহার যেন নিভৃত শঙ্খ- নাদ শুনিতে পাই ‘ নিভন্ত এই চুল্লিতে মা একটু আগুন দে’। সম্পাদক মন্ডলী কালি কিঙ্কর সিঙ্গি’র আশীষ প্রাপ্ত হউন।

Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
3 months ago

কালচক্রের আবর্তনে যেমনভাবে সব ঋতুগুলি ক্রমানুসারে ফিরে ফিরে আসে নতুন হয়ে,ঠিক তেমনভাবে যা কিছু ঘটে, সেগুলিরও পুনরাবৃত্তি হয়না।মানুষ আশা করে,নতুন কিছু আসুক ব্যক্তি বা সমষ্টিজীবনে।তাই নতুন বৎসরকে বরণ করা হয় প্রতি বছরেই।