শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আমার সুভাষচন্দ্র: কৈশোর ও যৌবনস্মৃতির অনুবর্তন (দ্বিতীয় পর্ব)

সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনা লিখিতভাবে প্রকাশের চেষ্টার সূচনাও আমার স্কুলপর্বের শেষের দিকেই হয়েছিল। আমার যে-নিবন্ধটি আমার স্কুল ও কলেজপর্বের স্মৃতিকে একই বন্ধনীতে ধরে রেখেছে এখানে সেটির উল্লেখ করা যায়। উচ্চমাধ্যমিক পাঠ সাঙ্গ হওয়ার অল্প কিছুদিন আগে জামশেদপুরে আমাদের স্কুলে যৌথভাবে আয়োজিত স্বামী বিবেকানন্দ ও নেতাজির জন্মদিন উপলক্ষে মাস্টারমশাইদের অনুরোধে আমাকে একটি প্রবন্ধ পড়তে হয়েছিল। সুভাষচন্দ্রের জীবনে ও চিন্তায় বিবেকানন্দের প্রভাব ও ভাবধারার প্রতিফলন বিষয়ে সেই প্রবন্ধটি যখন সেই কিশোর পাঠ করেছিল, তখন অবশ্য সে ভাবতেই পারেনি যে, এক বছরের মধ্যে সেটি ছাপার অক্ষরে পুনরাবির্ভূত হবে!

১৯৬৮ সালে নরেন্দ্রপুরে রামকৃষ্ণ মিশন কলেজে ভর্তি হওয়ার পরেই কলেজ পত্রিকার (‘অভী:’) জন্য লেখা আহবান করা হলে আমি নিজের সেই সাম্প্রতিকতম প্রবন্ধটি জমা দিয়েছিলাম। অচিরেই ‘নেতাজির আদর্শ : স্বামীজীর উত্তরাধিকার’ শিরোনামে লেখাটি ছাপাও হয়ে যায়। বালকবেলা থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার যে সমস্ত নেতাজি বিষয়ক রচনা আমি সংগ্রহ করে রাখতাম, সেগুলি থেকেই প্রবন্ধটির অধিকাংশ উপাদান সংগ্রহ করেছিলাম। সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে সেই সদ্য-তরুণ ছাত্রটির চিন্তাভাবনার কিঞ্চিৎ নমুনা এখানে পাঠকদের উপহার দেওয়া যেতে পারে। সুভাষচন্দ্র ও বিবেকানন্দের চিন্তাধারার সাদৃশ্য লক্ষ করে তার মনে হয়েছিল সুভাষ যেন বিবেকানন্দেরই উত্তরসাধক। তাই সে লিখেছিল, স্বামীজি দেশের কাজের জন্য একশোটি যুবক চেয়েছিলেন, “বলেছিলেন, ‘বীর্যবান, সম্পূর্ণ অকপট, তেজস্বী বিশ্বাসী

এরকম একশত যুবক হইলে সমস্ত জগতের ভাবস্রোত ফিরাইয়া দেওয়া যায়।’ কিন্তু একশো যুবক সেদিন তাঁর ডাকে সাড়া দিতে ছুটে আসেনি।… তেমন যুবক পাওয়া গেল একদিন, বিবেকানন্দের মহাপ্রয়াণের প্রায় কুড়ি বছর পরে। সংখ্যায় একশো নয়, একজনই, তবে সে যুবক একাই একশো। তার জীবনে বিবেকানন্দের আদর্শ এমন ভাবে রূপায়িত হয়ে উঠলো, যে তা শত সহস্র জনকে উদ্বুদ্ধ করলো। সে যুবককে আমরা সকলেই চিনি। তিনি সুভাষচন্দ্র। তাই সুভাষচন্দ্রকে বলা যায় বিবেকানন্দের মানসপুত্র। স্বামীজীর আদর্শের নিঃসংশয় উত্তরাধিকারী সুভাষচন্দ্র।”

এই তিন বছরের কলেজপর্ব ছিল সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে আমার প্রথম কবিতাটিরও রচনাকাল। আমাদের ছাত্রাবাসের একটি নিজস্ব দেয়ালপত্রিকা প্রকাশিত হত, সেটির নাম ছিল ‘রশ্মি’। ১৯৬৯ সালের নেতাজি জয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত এর বিশেষ সংখ্যায় আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম, যাতে ভারতীয় ও গ্রীক পুরাণের বিভিন্ন বীরচরিত্রের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রকে উপমিত করে দেখা হয়েছিল :- “মাতৃদাস্য মোচনে গরুড় পক্ষ ঝাপটে ওড়ে,/ হারক্যুলসের পেষণে দানব, পশু করে প্রাণত্যাগ, /আর্তত্রাতা পার্সিউসের হস্তে পীড়ক মরে –/ সকল শৌর্য তোমার মাঝারে মিশে হয়ে গেছে এক!” ‘যৌবনমূর্তি’ নামে এই চতুর্দশপদী কবিতার পরবর্তী অংশে ছিল :- “বাঙালির সব ক্ষুদ্রতা মাঝে তুমি মহামহীয়ান, /বাঙালি-প্রাণের পরম প্রকাশ, হে নায়ক, স্বাপ্নিক, তুমি রাজ-ঋষি, হে যুগমানব, মহাভারতপথিক — / পঙ্কিল যত পল্বল মাঝে নির্ঝর বেগবান!” সেসময় নেতাজি সম্পর্কে বয়স নির্বিশেষে সকল বাঙালির ভাবার্ঘ্যই শেষ হত ভারতবর্ষে তাঁর সশরীরে ফিরে আসার প্রার্থনা দিয়ে। সেই রীতি অনুযায়ী কবিতাটির শেষে আমিও লিখেছিলাম :- “উদয়াচলের পথে যেন ঐ শুনি তব জয়ভেরী,/ হিমাচল থেকে কুমারিকা কাঁপে তব জয়নির্ঘোষে -/ হে মহাসূর্য, তিমিরবিদারী উদয়ের কত দেরি !/ তব প্রাণপ্রিয় জন্মভূমিতে আবার দাঁড়াও এসে।/ বলো আজ তুমি সবাকার মহাপ্রতীক্ষা করে শেষ –/ ‘আমার জীবনে লভিয়া জীবন জাগো রে সকল দেশ’!”

পরের বছর এই দেয়ালপত্রিকার নেতাজি সংখ্যাটি সম্পাদনা করেছিলাম আমিই, সেটিতে একটি ছবিও এঁকেছিলাম। নেতাজি অদূরে লালকেল্লার দিকে তাকিয়ে দেখছেন ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন :- তাঁর সেনাদল কদম কদম এগিয়ে গিয়ে সেখানে উত্তোলন করেছে স্বাধীন ভারতের পতাকা — এরকম একটি দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম ছবিটিতে। ছবিটির নিচের অংশে লেখা ছিল নেতাজির বাণী :- “তারা বলে আমি স্বাপ্নিক, আমি স্বপ্ন দেখি। …আমি স্বীকার করি, আমি স্বাপ্নিক। আমি আজীবন শুধু স্বপ্নই দেখে এসেছি। কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় স্বপ্ন ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন।”

“চিহ্ন তব পড়ে আছে…”

নরেন্দ্রপুরের কাছাকাছিই ছিল সুভাষচন্দ্রের পৈতৃক গ্রাম কোদালিয়া। কলেজে পড়ার সময়েই সহপাঠী দীপ্তেনকে নিয়ে একদিন দুপুরবেলায় আমি দেখে আসি তাঁর বাসভবন। তার সঙ্গেই আবার এক ছুটির দিন সকালবেলায় হাজির হয়েছিলাম কলকাতার এলগিন রোডে নেতাজির পৈত্রিক বাসভবনে, যা নেতাজি ভবন নামে পরিচিত ছিল। সুভাষচন্দ্রের ভারতে বসবাসের সর্বশেষ স্মৃতিবিজড়িত এই ভবনে তারপর যে কতজনের সঙ্গে কতবার গেছি, তা সঠিক ভাবে বলা সম্ভব নয়! [শেষবার গেছি আমার কিশোর পুত্রকে নিয়ে, সেও বোধ হয় অন্তত কুড়ি বছর আগে]। সেই বাড়িটির আনাচেকানাচে ইতিহাস যেন কথা বলে উঠত! সেখানে ঢুকে সুভাষচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত নানা সামগ্রী ও ছবি দিয়ে সাজানো বিভিন্ন কক্ষ ও আসবাবপত্র কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ সেই দুই ছাত্র রীতিমতো রোমাঞ্চিত হয়েছিল।

তাদের মনে হয়েছিল, মানুষটি যেন ধারেকাছেই আছেন! ১৯৪১ সালে গোপনে ভারত থেকে নিষ্ক্রমণের আগে সুভাষচন্দ্র দোতলার যে ঘরটিতে থাকতেন, সেটিতে তাঁর ব্যবহৃত দুটি খাট ও মেঝেতে পাতা মৃগচর্মের আসন ও ধর্মগ্রন্থ ইত্যাদি একদম খোলা অবস্থায় রাখা ছিল, এখনকার মতো কাচের ঘেরাটোপে বন্দী হয়নি। ফলে সুভাষচন্দ্রের ব্যবহৃত এইসব আসবাব নিজ হাতে ছুঁয়ে দেখার কোনই বাধা ছিল না। তা ছাড়া ধারেকাছে আর কোনো দর্শক বা পাহারাদার না থাকায় আমাদের কৈশোর-যৌবনের মানসনায়কের নিজস্ব বিছানাটিতে হাত বুলিয়েই ক্ষান্ত না হয়ে সেটিতে বসবারও ইচ্ছা জেগেছিল আমার সেই সহপাঠীর। এক অসম্ভব কল্পনায় বিভোর হয়ে দীপ্তেন তখন আমাকে প্রশ্ন করেছিল, “আচ্ছা, যদি এমন হয় যে, কোন একটি ঘরের মধ্য থেকে বেরিয়ে এসে সুভাষচন্দ্র আমাদের সামনে হাজির হয়ে প্রশ্ন করেন, “কী হে, কেমন আছ?” বিমুগ্ধ চিত্তে সেদিন আমরা একদম কাছ থেকে দেখেছিলাম কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে সুভাষ-ব্যবহৃত সামরিক পোশাক, জাপান থেকে সদ্য আনা নেতাজিকে উপহার দেওয়া এক তরবারি ইত্যাদি। নেতাজি মিউজিয়াম নামে পরিচিত এই ঐতিহাসিক বাড়িটির পেছনের অংশের যে-সিঁড়ি দিয়ে নেমে সুভাষচন্দ্র তাঁর ভাইপো শিশিরকুমার-চালিত গাড়িতে গোপনে কলকাতা ত্যাগ করেছিলেন, সেই সিঁড়ি বেয়ে নাবার সময় আক্ষরিক অর্থেই শিহরণ জেগেছিল এই দুই সদ্য তরুণের। ওখান দিয়ে নেমে ডানদিকের জমির একপাশে চালাঘরে রাখা নেতাজির ব্যবহৃত সেই ওয়ান্ডারার গাড়িটিও আমরা দেখতে পেয়েছিলাম।

আরো পরবর্তীকালে এই নেতাজি ভবনের নানা অনুষ্ঠানেই বক্তৃতা শুনেছি নেতাজি-নিষ্ঠ বিশিষ্ট মানুষজনদের, রবীন্দ্রসদনে নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর তথ্যচিত্রে প্রথম হাঁটাচলা করতে দেখেছি ‘জীবন্ত’ সুভাষচন্দ্রকে, সেই সত্তরের দশকে যা ছিল এক দুর্লভ ব্যাপার। সেই দিনগুলির কথা আজও মনে পড়ে, যখন সেই তথ্যচিত্রের টিকিটের জন্য নেতাজি ভবনে দীপ্তেনের সঙ্গে লাইন দিয়েছি। কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নেতাজি জয়ন্তীতে এখানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ থেকে আগত ডঃ নীলিমা ইব্রাহিম প্রমুখ অতিথিদের নেতাজি সম্পর্কে সশ্রদ্ধ উদ্দীপনার সাক্ষী থেকেছি। নেতাজির পন্থা অনুসরণ করেই যে আজকের বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে এ কথাটি দলমত নির্বিশেষে অনেককেই সে সময়ে উল্লেখ করতে শুনেছি।

কলেজের ছাত্রাবাসেই প্রথম দেখার সুযোগ হয়েছিল সুভাষ-অনুগামী জননেত্রী লীলা রায়ের প্রতিষ্ঠিত ও নেতাজির ভাবধারা প্রচারের সূত্রে বিখ্যাত ‘জয়শ্রী’ পত্রিকাটি। আমাদের ছাত্রাবাসের এক সিনিয়র ছাত্র ছিলেন লীলা রায়ের পরিবারেরই ছেলে, তিনিই আমাকে পত্রিকাটির একটি সংখ্যা দেখতে দেন ও শুধু নেতাজিকে নিয়েই একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয় দেখে আমি যুগপৎ বিস্মিত ও আকৃষ্ট বোধ করি। সে-সময় আমি ভাবতেও পারি নি যে, দশ বছরের মধ্যেই ঐ পত্রিকায় আমার লেখালেখি শুরু হবে।

স্কুল ও কলেজের ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে ওই পর্ব শেষ হবার পর মোটামুটি এক দশক পর্যন্ত আমার এই সুভাষ-অনুসরণের আদিপর্বে সবচেয়ে পাকাপোক্ত ভিত্তি রচনা করেছিল যে বিভিন্ন বইগুলি ও নানা বিদগ্ধ লেখকের রচনা, সেগুলোর কিছু কিছু পরিচয় এবার উপস্থিত করতে চাই, যে-অংশটি সেই মহীরুহ-প্রতিম মানুষটি কে নিয়ে আমার নিরন্তর অধ্যয়নেরই একটি পর্ব মাত্র।

সুভাষ-অধ্যয়নের আদিপর্ব – ছাত্রজীবনে পড়া কয়েকটি বই

স্কুলের পাঠের বাইরে প্রথম যে-সুভাষ-জীবনীটি পড়ি, সেটি আমি ১৯৬৬ সালে এক আত্মীয়ার কাছ থকে পেয়েছিলাম জন্মদিনের উপহার হিসেবে। বইটির নাম ‘দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র’, লেখক তখনকার সুপরিচিত জীবনীকার মণি বাগচি। বইটির মলাটে ছিল সুভাষ সম্পর্কে সরোজিনী নাইডুর উক্তি “ the flaming sword of freedom”-এর অনুসরণে আঁকা এক জ্বলন্ত তরবারির ছবি। নেতাজির জীবনকথা মোটামুটি বিশ্বস্তভাবে বর্ণনা করার পর তাঁর তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন ছিল এ-রকমঃ- “…সুভাষচন্দ্রই ভারতীয় জনগণের বিড়ম্বিত ও লাঞ্ছিত ভাগ্যকে পৃথিবীর শোষিত জনসাধারণের ভাগ্যের সঙ্গে যুক্ত করে ভারতের মুক্তিসংগ্রামকে সমগ্র এশিয়া ও আফ্রিকার মুক্তিকাম জনসমষ্টির সাধারণ সংগ্রামে পরিণত করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতবাসীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও আদর্শের বাণীবাহক সুভাষচন্দ্র। ‘প্রকৃত বিপ্লবী যে কখনো পরাজয় স্বীকার করেনা, কখনো হতাশ হয়না বা দমে যায়না’, সুভাষচন্দ্রের এই একটি মাত্র উক্তির মধ্যে আভাসিত হয়েছে তাঁর জীবনব্যাপী স্বপ্ন ও সাধনা।”

আমাদের বাড়িতে রীতি ছিল, আমাকে বা আমার বোনকে অন্যান্য গুরুজনেরাও কিছু উপহার দিলে বাবা বইয়ের শুরু সাদা পৃষ্ঠাটিতে তাঁদের হয়ে কবিতায় কিছু লিখে দিতেন। আমার পড়া এই প্রথম সুভাষ-জীবনীটি আজও আমার সংগ্রহে আছে। তার প্রথম পাতাটিতে জ্বলজ্বল করছে আমার বাবার লেখা কয়েক ছত্র সুভাষ-প্রশস্তি – “উচ্ছল যৌবন উন্নত শির/ ‘সিংহের’ সন্ত্রাস বিশ্বের বীর;/ বুদ্ধির দীপ্তিতে দৃপ্ত চেতন/ বিদ্যার সৌরভে ভাস্বর মন;/ সন্ন্যাসে সংযত চিত্ত বিশাল/ উদ্ধত শত্রুর উদ্যত কাল;/ ভৈরব গৌরবে রুদ্র ভয়াল/ সম্মুখ সংগ্রামে উগ্র করাল;/ আত্মার আত্মীয় হিন্দের জান্‌/ কোন্‌খানে আছ আজ নন্দিত প্রাণ!”

যে সব বই আমার কৈশোর আর প্রাক্‌-যৌবনের সুভাষ-অনুধ্যানে উল্লেখযোগ্য উপাদান জুগিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে দিলীপকুমার রায়ের লেখা কয়েকটি বইয়ের নাম না করলেই নয়। ১৯৬৬-৬৭ সাল নাগাদ আমার জন্মদিনে আমার ঠাকুমা আমাকে উপহার দেন এই লেখকের ‘আমার বন্ধু সুভাষ’ বইটি। এটি ছিল তাঁর মূল ইংরেজি বই ‘দি সুভাষ আই নিউ’-এর বাংলা ভাষান্তর। লেখক তাঁর বাল্যবন্ধুকে যে ভালোবাসেন ও তাঁর নানা গুণের অনুরাগী, বইটা পড়লে প্রাথমিকভাবে এমনটাই মনে হয়। নিজের বন্ধু ও জাতির নেতা সুভাষচন্দ্রকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যই তিনি বইটি লিখেছেন, এমন কথা বইটিতে তিনি বারবার বলেছেন। সুভাষচন্দ্রের ব্যক্তিগত মহত্ত্ব, নেতৃত্বশক্তি, দেশের জন্য আত্মনিবেদন, চরিত্রের পবিত্রতা, মেধা ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের প্রভাব, বন্ধুপ্রীতি ইত্যাদির বহু ইতিবাচক উল্লেখ করতে দিলীপকুমার কুন্ঠিত হন নি। কিন্তু এত সব কথার মধ্যে মধ্যে তিনি নানা ব্যাপারে সুভাষচন্দ্রের সমালোচনাও করেছিলেন, যেগুলো ওই বয়সে আমার ঠিক হজম হয়নি। এর প্রধান কারণ হয়তো এই যে, তখন এমন একটা সময় ছিল যে, সুভাষচন্দ্রের বিন্দুমাত্র নিন্দাও আবালবৃদ্ধ সবার মনকেই পীড়া দিত।

সাবরমতি ও পন্ডিচেরি, এই দুই আশ্রমের ভাবধারা দেশের যুবকদের কর্মবাদ-বিমুখ করে তুলছে, ১৯২৮ সালে এক বক্তৃতায় এ কথা বলে সুভাষচন্দ্র গান্ধি ও অরবিন্দের ভক্তদের প্রবল সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। নিজে শ্রীঅরবিন্দের শিষ্য হওয়াতে এই সমালোচনা দিলীপকুমারকেও স্বভাবতই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে তোলে ও এই বইটিতে তিনি সেই কারণে বন্ধুর সমালোচনা করেছিলেন। তবে আহত গুরুভক্তির কারণ ছাড়াও সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক পন্থারও বিরোধিতা করেছিলেন দিলীপকুমার। তিনি লিখেছিলেন “তার অক্ষশক্তির পক্ষে যোগ দেওয়াটা অত্যন্ত মারাত্মক একটা ভুল হয়েছিল বলেই আমি মনে করি। তার এই সিদ্ধান্ত ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে সহায়ক হতে পারে একথা কোন চিন্তাশীল ব্যক্তিই মানতে পারেন না। আমি এখনো দুঃখের সঙ্গে চিন্তা করি সুভাষ কি করে বিশ্বাস করতে পারলো যে, জাপানের মতো একটা নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিনামূল্যে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার কাজে সহায়তা করবে!” এ সম্পর্কে জওহরলাল নেহরুর অভিমতকে সমর্থন করে তিনি লিখেছিলেন, “সুভাষ কী ক’রে এ-পথে পা বাড়ালো? সে তো এতটা অদূরদর্শী নয়।”

এ ধরনের অভিমত অবশ্য পরবর্তী জীবনেও নানা মহল থেকে বহুবার শুনেছি, এখনও শুনে থাকি। এমন অভিমত যে পুরোপুরি অসঙ্গত ছিল না, সেটা এখন বুঝতে পারলেও সেই কিশোর বয়সে দিলীপ রায়ের কলমে এই সব মন্তব্য আমাকে ব্যথিত করেছিল এজন্য যে, তিনি ছিলেন তাঁর একজন মরমী বন্ধু, সে যুগের কিছু রাজনীতিকের মতো অন্ধ সুভাষবিদ্বেষী বা আজকের প্রচারলোভী কিছু লোকজনের মতো ধান্দাবাজ বা আহাম্মক ছিলেন না, যারা সুভাষচন্দ্রের দেশপ্রেম সম্পর্কে পর্যন্ত সন্দেহ প্রকাশে দ্বিধা করেন নি।

দিলীপ রায়ের এই প্রথম বইটি পড়ার পরেও অবশ্য আমার সুভাষ-অধ্যয়নের পরিসরে তিনি বারবার ঢুকে পড়েছেন। স্কুলের পাঠ সাঙ্গ করে যখন আমি নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন কলেজে ভর্তি হই, সেখানকার আশ্রমের লাইব্রেরিতে পেয়ে যাই একই লেখকের স্মৃতিচারণ’ বইটি। এই বৃহদায়তন বইটির যে-অংশের উপজীব্য সুভাষ-প্রসঙ্গ, সেটি পড়তে গিয়ে বিস্মিত হয়ে যাই এই ব্যাপারটি লক্ষ করে যে, আগাগোড়া এ-যেন এক অন্য দিলীপকুমার, যিনি ‘আমার বন্ধু সুভাষ’ বইটিতে তাঁর খ্যাতকীর্তি বন্ধুর রাজনৈতিক মত ও পথের কিছু বিরূপ সমালোচনা করেই তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন সেরে ফেলেছিলেন। এই বইটিতে কিন্তু পুরোপুরি ভিন্ন তাঁর ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গী, তাঁর অভিপ্রায়ও মনে হয় অন্যরকম! প্রথম বইটিতে বর্ণিত অনেক ঘটনা এই গ্রন্থেও তিনি উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তাঁর সুর যেন অনেকটাই বদলে গেছে!

তাঁর যৌবনের বন্ধুকে নির্দ্বিধায় মহাজন বলে স্বীকার করে নিয়ে দিলীপকুমার এখানে লিখেছিলেন, “সুভাষের কাছ থেকে আমি আমার জীবনে সবচেয়ে বড় যে দানটি পেয়েছি, তার কী নাম দেওয়া যায়?… আমি ওর কাছ থকে পেয়েছি অনেক সম্পদ, প্রাণশক্তি, স্বপ্নবৈভব …। কিন্তু আমার কাছে ওর সবচেয়ে বড় দান – ওর পবিত্র চরিত্রের একান্ত সন্ন্যাসী প্রভা, যাকে আমি দিব্য প্রভাই নাম দিতে চাই।…“

তবু শেষ পর্যন্ত “ভারতের রাজনৈতিক মুক্তিসাধকদের অন্যতম“ বলে সুভাষকে “অন্তরের শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েও” দিলীপকুমার তাঁকে বরেণ্য মনে করেছেন এই কারণে যে, “রাজনীতির আখড়ায় এ যুগের যত মহাজন অবতীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র শ্রী অরবিন্দ ছাড়া সুভাষের অধ্যাত্মসত্ত্বাই ভারতের আত্মার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ…।“ ইত্যাদি।

এই পরিবর্তিত দিলীপকুমার তাঁর এই স্মৃতিচারণে উপহার দিয়েছিলেন তাঁর রচিত সুন্দর একটি সুভাষ-প্রশস্তি, যার শেষাংশটি এ-রকম :- “দেখেছি আমরা কান্তি যাহার — বিকচ ইন্দীবর,/ শুনেছি যাহার যৌবনবাণী –বৈরাগ সুন্দর,/ অমিতাভ তেজে বরি’ যে পাবক/ লভিল উপাধি ‘দেশের নায়ক’/ মন্থি মরণসিন্ধু ছানিল অমরণ-শতদল/ সে তোমারে করি প্রণাম হে অপরাজেয়, হে অমিতবল!”

কলেজজীবনে আমার পড়া দিলীপকুমারের আরেকটি ইংরেজি বইয়ের কথা না বললে এ-প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ হবে না। এই বইটির নাম ‘নেতাজি – দি ম্যান : রেমিনিসেন্সেস’। এই বইয়ে তথ্য বা বক্তব্যের দিক থেকে নতুন কিছু ছিল না, যা এর আগে উল্লিখিত তাঁর অন্য বইগুলোতে নেই। তদতিরিক্ত এতে ছিল নেতাজির জন্মদিনে (১৯৬৪) নিবেদিত তাঁর একটি ইংরেজি কবিতা, যার প্রথম অংশে ছিল- “No demon nights could tame your/ Flame-Hunger for freedom’s bliss;/ The lesser loves you spurned for/ Your Mother-land’s welcome kiss…” ইত্যাদি। ছাত্রাবাসে বসে এই কবিতাটিকে আমি বাংলায় যেভাবে অনুবাদ করেছিলাম, আমার খাতা থেকে সেটি এখানে উপস্থিত করলাম।

“তোমার অগ্নি-অভীপ্সা ছিল – পাবে স্বাধীনতা-সুধা –/ কোনও রাক্ষসী রাত্রি পারেনি নেভাতে তোমার ক্ষুধা;/ হেলাভরে ছিঁড়ে ফেলে লঘুতর যতেক আকর্ষণ/ ছুটে গেলে পেতে দেশজননীর সাগ্রহ চুম্বন/ সে-সাহস নিয়ে, ভীরু-দল যাকে করেছিল উপহাস,/ আর পেলে তুমি তাদের প্রাণের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস –/ তোমার বহ্নি-প্রাণের পরশে জীবন পেয়েছে যারা,/ দেশ-জননীর ডাকে সাড়া দিতে ছুটেছে পাগলপারা!/

”তন্দ্রা কাটাতে তুলেছ যে ঝড় মোদের অন্ধ ঘরে,/ তূর্যে তোমার বাজালে প্রভাত-রাগিনী গভীর সুরে,/ জাগাতে মোদের জন্মসিদ্ধ অধিকার-দিবালোকে/ তুমিই গাইলে :- ‘আমরা এগোব পূর্বাচলের দিকে, / যেখানে উঠেছে অখণ্ড স্বাধীনতার সূর্য লাল –/ ম’রে ভারতের যশের জন্য বেঁচে রব চিরকাল!’’

যেসব বই পড়ে আমার কিশোর মনে সুভাষচন্দ্রের কল্পমূর্তিটি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল তার মধ্যে এই বইগুলির পরেই উল্লেখ করতে হয় অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘উদ্যতখড়্গ’ বইটির দুটি খণ্ড। বিশিষ্ট গদ্যভঙ্গিমা ও বিশ্লেষণে সবিশেষ তাঁর স্বকীয় শব্দসম্ভার সুভাষচন্দ্রের বাল্যজীবন ও প্রথম যৌবনকালের ঘটনাবলীকে সমকালের পরিপার্শ্ব ও ছোটবড়ো নানা চরিত্রসমেত জীবন্ত করে তুলেছিল। ইতিহাসের চরিত্রগুলোর মুখে কাল্পনিক সংলাপ জুড়ে দিয়ে অচিন্ত্যকুমার এই জীবনকাহিনীটিকে উপস্থাপিত করেছিলেন একেবারে চিত্রনাট্যের আকারে। ফলে প্রথম খণ্ডটি বের হবার সঙ্গে সঙ্গে সেটা কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণবয়স্ক পাঠকদের কাছে এক চিত্তাকর্ষক ও সুখপাঠ্য বই হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল। স্কুলপরীক্ষায় ভালো ফল করায় মা সেটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। অধীর অপেক্ষার পর দ্বিতীয় খণ্ডটি আমি কলকাতায় গিয়ে ভবানীপুরের এক দোকান থেকে কিনেছিলাম মনে আছে। এটি বোধহয় কোন বইয়ের দোকানে একা গিয়ে আমার প্রথম বই কেনা। আক্ষরিকভাবে একে প্রামাণ্য জীবনকথা না বলা গেলেও সম্ভবত সুভাষচন্দ্রের জীবন নিয়ে কাহিনী বা নাটকরচনার প্রথম উপাদান হয়তো এই বইটিতেই পাওয়া গিয়েছিল। প্রথম খণ্ডটি প্রকাশ হবার কয়েক বছর পরে সত্যিই অচিন্ত্যকুমারের চিত্রনাট্য অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল বাংলায় সুভাষচন্দ্রের প্রথম জীবনীমূলক ছায়াছবি ‘সুভাষচন্দ্র’।

স্কুলজীবনে আমার নেতাজি অধ্যয়নের প্রযত্নে আমার পড়া সর্বশেষ বইটির কথা এবার বলতে হয়। সুভাষচন্দ্রের সহকর্মী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী ছিলেন ১৯৪০ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সী জেলে বন্দী থাকাকালে সুভাষচন্দ্রের একমাত্র সঙ্গী। তাঁর নেতার সঙ্গে কারাজীবন যাপনের অন্তরঙ্গ এই কাহিনী পড়েছিলাম তিন খণ্ডে সম্পূর্ণ তাঁর আকর্ষণীয় গ্রন্থ ‘নেতাজি সঙ্গ ও প্রসঙ্গ’ বইটির দ্বিতীয় খণ্ডে। অবশ্য স্কুল জীবনে শুধু প্রথম দুটি খণ্ড পড়ার সুযোগ হয়েছিল স্কুলের লাইব্রেরীর কল্যাণে। কলেজ জীবনে প্রবেশের পর দুটি বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার পুরস্কার হিসেবে আমি দ্বিতীয় ও তৃতীয় খন্ডটি পেয়েছিলাম

এই বইটির দ্বিতীয় খণ্ড থেকে জানতে পেরেছিলাম, ভারত থেকে ১৯৪১ সালে গোপনে তাঁর সেই ঐতিহাসিক নিষ্ক্রমণের খুঁটিনাটি পরিকল্পনা সুভাষচন্দ্র ছকে ফেলেছিলেন জেলে থাকতেই। তিনি খবর পেয়েছিলেন, তাঁর সহবন্দী নরেন্দ্রনারায়ণকে সরকার তাঁর আগেই ছেড়ে দেবে। তাই তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁর আগেই দূত হিসেবে তাঁর এই সহকর্মী ভারত থেকে গোপনে বেরিয়ে গিয়ে রাশিয়া ও জার্মানির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর কাজ কিছুটা এগিয়ে রাখবেন। নরেন্দ্রবাবুর এই স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, পরবর্তীকালে নাৎসী জার্মানির সাহায্য নেবার জন্য ঘরে-বাইরে বহুনিন্দিত সুভাষচন্দ্র সর্বপ্রথম সোভিয়েত রাশিয়ার সাহায্যপ্রার্থী হবার কথা ভেবেছিলেন ও তা সম্ভব না হলে শুধু তখনই জার্মানির দ্বারস্থ হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এছাড়াও বইটিতে প্রেসিডেন্সি কলেজের সেই সুপরিচিত ‘ওটেন-ঘটনা’ সম্পর্কে লেখকের লিপিবদ্ধ সুভাষচন্দ্রের নিজের বক্তব্যও ছিল অত্যন্ত মূল্যবান ও তাৎপর্যপূর্ণ। জেলখানায় বসে সহবন্দী নরেন্দ্রনারায়ণের কাছে সুভাষ যে-স্মৃতিচারণ করেছিলেন, তা থেকে আরেকটি অজানা সংবাদ প্রথম জানতে পেরেছিলাম। ওটেন সাহেবের বিরুদ্ধে ছাত্রবিক্ষোভের পরিণতিতে তাঁর লাঞ্ছণা ও সেই সূত্রে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সুভাষচন্দ্রের বহিষ্কারের পরবর্তীকালেও একবার সাহেবের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক শিক্ষার্থী বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, শিক্ষা অধিকর্তার পদে আসীন ওটেন ট্রেনিং ক্যাম্পে পরিদর্শনে এসে শিক্ষার্থী হিসেবে সুভাষের পারদর্শিতায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে ক্যাডেট থেকে নন-কমিশনড অফিসারের পদে উন্নীত করে গিয়েছিলেন। এছাড়া পূর্বোক্ত ‘দি সুভাষ আই নিউ’ বইটিতে দিলীপ রায় সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে যেসব বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন, তার জন্য এই লেখক তাঁর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন যা আমার নিজের খুব মনোমতো হয়েছিল।

কৈশোরের সুভাষ-অনুসরণপর্বে আমার পড়া আরও দুটি বইয়ের নামও এখানে উল্লেখ করতে হয়। এর প্রথমটি ছিল হেমেন্দ্রবিজয় সেন রচিত ‘নেতাজী সুভাষচন্দ্র’। এটি সম্ভবত সুভাষ-উত্তর সময়ে বাংলায় তাঁর প্রথম প্রামাণ্য জীবনী, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। এই নাতিবৃহৎ বইটিতে তথ্যনিষ্ঠভাবে সুভাষচন্দ্রের প্রধান কর্মকৃতিগুলিকে উপস্থিত করা হয়েছিল, যতটা তখন পর্যন্ত সংগ্রহ করা গিয়েছিল। বইটিতে বিভিন্ন তথ্যের যথাযথ সূত্র নির্দেশও করা হয়েছিল পাদটীকার মাধ্যমে। বিভিন্ন প্রামাণ্য বই, স্মৃতিকথা, ক্যালকাটা মিউনিসিপাল গেজেটের পুরনো সংখ্যা ও আনন্দবাজার পত্রিকার সমসাময়িক সংবাদ ইত্যাদি ছিল এই বইটির মূল্যবান উপকরণ। দেব সাহিত্য কুটির প্রকাশিত এই সচিত্র বইটির সম্পাদনা করেছিলেন যোগেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রায় দেড়শ পৃষ্ঠার এই বইটির দাম সেকালে ছিল এক টাকা। এতে সুভাষচন্দ্র ও আজাদ হিন্দ ফৌজের কিছু আলোকচিত্র এবং একটি হাতে আঁকা কাল্পনিক ছবির কথা মনে পড়ে, যাতে আফগানিস্তানে পাঠানের পোশাক পরা সুভাষচন্দ্রের জলভরা মশকের ওপর চড়ে পাহাড়ি নদী পার হবার দৃশ্য ছিল। যেহেতু এই বইটি আমি পড়েছিলাম স্কুলের লাইব্রেরী থেকে নিয়ে এসে, তাই এটি থেকে বহু অংশ আমি কাগজে লিখে রেখেছিলাম। এর মাধ্যমে আমারও ভবিষ্যতের জ্ঞানচর্চার উপকরণ সংগ্রহে আকরসূত্রগুলি লিপিবদ্ধ করে রাখার কাজে হাতে খড়ি হয়েছিল।

স্কুল-লাইব্রেরী থেকে আমার পড়া অপর বইটি ছিল বিজয়রত্ন মজুমদার রচিত ‘আজাদ হিন্দের অঙ্কুর’। ১৩৫২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত স্মৃতিচারণমূলক এই বইটিতে বিভিন্ন ঘটনার টুকরো টুকরো বিবরণ এবং সে সম্পর্কে লেখকের অভিমত সংকলিত হয়েছে। বিশ ও ত্রিশের দশকে সুভাষ-জীবনের যেসব ঘটনার মধ্যে তিনি ভবিষ্যতের আজাদ হিন্দ ফৌজের অংকুর দেখতে পেয়েছিলেন তার মধ্যে প্রধানতম অবশ্যই ১৯২৮ সালে কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন। এই সূত্রে সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন ও ভাষার একটু নমুনা তুলে দিচ্ছি:- “মহাত্মা গান্ধীর প্রতি কিঞ্চিন্মাত্র বক্র কটাক্ষ না করিয়াও বলিতে পারি….. সুভাষের সেদিনের সেই সমরনায়কের বেশ বঙ্গীয় তরুণের চিত্তপটে যে চিত্রখানি বিচিত্র বর্ণে, আপন গর্ব্ব গৌরবে, আপনার মহিমায় অঙ্কিত-মুদ্রিত হইয়া গিয়াছিল, আজও, দুই যুগান্তেও তাহার ঔজ্জল্য ও মাহাত্ম্য অমলিন ও অপরিম্লান৷”

তরুণ গরুড়ের মতো মহৎ ক্ষুধায় সেই কিশোর বয়সে তখন সুভাষ-সাগরে ডুব দিয়ে যা কিছু পাচ্ছি, সেগুলিকে লিখে রাখছি নিজের খাতায়। এই বইটি থেকেও যেসব নোট রেখেছিলাম তার মধ্যে ছিল লালকেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের তিন বন্দী সেনাপতির বিচারপর্ব শেষে মুক্তিলাভের পর ১৯৪৬ সালে এদের অন্যতম শাহনওয়াজ খানের কলকাতায় নেতাজি ভবন পরিদর্শনের ভাবোচ্ছাসফেনিল বর্ণনা কিংবা ১৯২৮ সালে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর জন্য সামরিক ধাঁচের ইউনিফর্মের প্রবর্তন করায় সমকালে সমালোচনার ঝড় ইত্যাদি। শেষোক্ত প্রসঙ্গে সুভাষচন্দ্র লেখককে যা বলেছিলেন সেই উদ্ধৃতির কিছুটা আমার খাতা থেকে তুলে দেওয়া গেল :- “দাদা, সামরিক বেশভৃষা ও আদব কায়দার ওপর আমাদের মত দুর্বল, নিরস্ত্র ও পরাধীন দেশের লোকদেরও যে কতখানি সম্ভ্রম ও সমীহ তা বোধ হয় আপনারা কল্পনা করতে পারেন না। মহাত্মা গান্ধী যখন সামনে দিয়ে যান, তখন লোকের মনে শুধু ভক্তিই জেগে ওঠে, পায়ের ধুলো নেবার জন্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়-…. এই মাত্র ! কিন্ত আমাদের স্বেচ্ছাসেবকবাহিনী যখন নিয়মবদ্ধ, সারিবদ্ধ হয়ে কদমে কদমে চলে যায় তখন জনতা দু’ধারে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে, শ্রদ্ধান্বিত অন্তরে কী ভাবে, জানেন? ভাবে, আমিও কেন স্বেচ্ছাসেবক হই নি? হলে আমিও তো অমনি বীরদর্পে কদমে কদমে হাটতে পারতুম । দাদা, এর মুল্য, আমার কাছে অনেক — অনেক, অমূল্য, মহামূল্য।”

[লেখকের পূর্ববর্তী রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
শৌভিক দে
শৌভিক দে
5 months ago

অলোকরঞ্জন কতটা তৈরি হয়ে কোনো বিষয়ে আলোকপাত করে থাকেন সেটা বুঝতে এই লেখাটি ( পুর্বের রচনাটি ধরে) আলোকবর্তিকার কাজ করবে। নেতাজি সমন্ধে বাঙ্গালী তথা ভারতীয় মুগ্ধতা একটি ধ্রুবক। সময় বয়ে যায় কিন্তু তার ক্ষয় নেই – লয় তো দূরস্থান। লেখক যথার্থ লিখেছেন যে বিন্দু মাত্র নেতাজি বিরোধী কথা এখনও আমাদের জন্যে সুপাচ্য নয়। বহুবিধ প্রবন্ধে অলকদা আমাদের ঋব্ধ করে থাকেন। আমরা নিবিস্ট পাঠের লাভ নি। তাঁর কি বোর্ড সচল থাকুক।