শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বিস্মৃতিচারণা (১৭)

নব্বই দশকের গোড়ার দিক। প্রভাসতীর্থে এলেন দুই কবি। একজন প্রবীণ, অপরজন নবীন। প্রবীণ পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নবীন কবি জয় গোস্বামী। অনুষ্ঠানটির শিরোনামও ছিল “দুই কবি”। গোটা আসরটি আবর্তিত হয়েছিল দুই কবির কবিতাকে উপজীব্য করে। অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে হাজির ছিলেন স্থানীয় তরুণ কবি শিবাশিস মুখোপাধ্যায়, বাচিক শিল্পী অরুময় বন্দ্যোপাধ্যায়, বিল্বদল চট্টোপাধ্যায়, তরুণ গায়ক সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। সন্ধ্যাটি হয়ে উঠেছিল এক প্রবীণ কবিকে ঘিরে নবীন সাহিত্য ও সঙ্গীতপ্রেমী তরুণদের সমাবেশ।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর চিরাচরিত এক মাথা এলোমেলো ঝাঁকড়া সাদা চুল, হালকা হলুদ রঙের রঙের পাঞ্জাবী, সাদা পায়জামা আর কাঁধে শান্তিনিকেতনী ঝুলিতে দীপ্যমান ও সপ্রতিভ, ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসিটি লেগে রয়েছে। তুলনায় অন্তর্মুখী জয় একটু যেন কুণ্ঠিত, সলাজ। তখন সবে তার কবি-প্রতিভা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, বিশেষত তরুণদের মধ্যে।

সেদিনের দুই অতিথির সঙ্গে আমরা

ছবিতে প্রভাসতীর্থে সেদিনের সন্ধ্যায় উপস্থিত বাম দিক থেকে শিবাশিস মুখোপাধ্যায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, এই প্রতিবেদক, জয় গোস্বামী, বিল্বদল চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও অরুময় বন্দ্যোপাধ্যায়

চিত্রগ্রাহকঃ সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়

এই দুই কবির আগরপাড়ার প্রভাসতীর্থের কাব্যসভায় সেই সন্ধ্যার আগমনের কান্ডারী ও আসরের আয়োজক ছিল আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভ্রাতৃপ্রতিম তরুণ সুরকার, গীতিকার ও গায়ক সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, যাদের দুজনের মধ্যে ছিল প্রগাঢ় প্রীতির সম্পর্ক।

এই আসরের ছোট্ট দুটি ঘটনার কথা আজও মনে ভেসে আছে। প্রথমটির কেন্দ্রে আমাদের তরুণ গায়ক সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্বিতীয়টির প্রবীণ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

কবিতা পাঠে ও কবিতার আলোচনায় জমে উঠেছে আসর। কখনো সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা, কখনো বা জয়ের কবিতা পাঠ করছেন তরুণ আবৃত্তিকারেরা। চলছে কবিতা নিয়ে আলোচনা। বলা প্রয়োজন, তখনও তরুণ প্রজন্ম আজকের মতো সাহিত্য-বিমুখ হয়ে ওঠেনি। ফলে জনসমাগম ভালই হয়েছিল, যার মধ্যে তরুণদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

একটু প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বলি, এই সময়টিতেই সুমন চট্টোপাধ্যায় নামের এক যুবক, মুখে চাপ দাড়ি, পরনে ডেনিম শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট, হাতে গীটার নিয়ে বিদেশ থেকে ফিরে নতুন ধারার বাংলা গানের পসরা সাজিয়ে কলকাতার মঞ্চে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, মানবেন্দ্র, সতীনাথ, ভূপেনের যুগের শেষে নতুন বাংলা গানে যখন খরা নেমে এসেছে, শ্রোতারা যখন কিছুটা দিশাহারা, ঠিক তখনই সুমন এলেন ইউরোপ থেকে সুরের আঙ্গিক আহরণ করে নিজস্ব কথায় ও সুরে, নতুন ধাঁচের কাব্যধর্মী লিরিকের বাংলা গানের উপহার নিয়ে।

সুমন চট্টোপাধ্যায়

এই পটভূমিতে আসি আমাদের ভ্রাতৃসম শখের গায়ক সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়। গানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রথাগত শিক্ষা তার ছিল না বলেই শুনেছিলাম। তবে গৃহে ছিল সাঙ্গীতিক পরিমন্ডল, সেখানেই তার বাল্য ও কৈশোরের সঙ্গীতচর্চা পরিজনদের কাছে। পারিবারিক ধারায় প্রভাব ছিল রাগাশ্রয়ী গানের এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বনামধন্য সঙ্গীতকার পুত্র সুরসাধক দিলীপ কুমার রায়ের সঙ্গীত ঘরানার। এই সুরসাধনার প্রভাবে সুদীপ গান বাঁধত, সুর করত নিজের মতো করে। সে সব গানে দিলীপকুমারের সুরের প্রচ্ছন্ন প্রভাব আমাদের নজর কাড়ত। এরই পাশাপাশি সে হয়ে উঠেছিল সুমনের আধুনিক কাব্যধর্মী গানেরও গুণগ্রাহী। ফলে তার নিজের করা সুরে পড়তে লাগল আধুনিকতার ছাপ, পাশাপাশি তার গলার ছোট ছোট কাজে রয়ে গেলেন দিলীপকুমারও। গান নিয়ে তার বড় কোনো লক্ষ্য ছিল বলে মনে হোত না। মনের আনন্দে গান বাঁধত সুদীপ, সুর করত, অনুরোধ করলে গেয়ে শোনাত সুরেলা কণ্ঠের খালি গলায়। সে সবই ছিল তার শখের ও আমাদের ভাললাগার ব্যাপার।

দিলীপ কুমার রায়

সেদিনের কাব্যসন্ধ্যার সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিল সন্ময়। কবিতা পাঠ ও আলোচনার ফাঁকে সে দর্শক-শ্রোতা ও দুই কবির সামনেই সুদীপকে প্রতিভাবান তরুণ সুরকার গায়ক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে বসল, ‘তোমাকে ১৫ মিনিট সময় দেওয়া হল। কবি জয় গোস্বামীর যে কোনও একটি কবিতায় সুর দিয়ে গান হিসেবে তোমাকে পরিবেশন করতে হবে।’

কঠিন প্রস্তাব। জনসমক্ষে, বিশেষত দুই অতিথির সামনে এমন একটি প্রস্তাবের আকস্মিকতায় যারপরনাই বিব্রত সুদীপ। কিন্তু বয়সে কিঞ্চিৎ এগিয়ে থাকা বন্ধুর অনুরোধ ফেলতে না পেরে কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হল সুদীপ। ফিরেও এল মিনিট পনেরো-কুড়ির মধ্যে। মাইক্রোফোনটি হাতে নিয়ে গুনগুন করে সামান্য তান বিস্তার করে সুরেলা কণ্ঠে সুদীপ গেয়ে উঠল জয়ের কবিতাটিঃ

“অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে
হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে
করো আনন্দ আয়োজন করে পড়ো
লিপি চিত্রিত লিপি আঁকাবাঁকা পাহাড়ের সানুতলে
যে একা ঘুরছে, তাকে খুঁজে বার করো
করেছো, অতল; করেছিলে; পড়ে হাত থেকে লিপিখানি
ভেসে যাচ্ছিল–ভেসে তো যেতই, মনে না করিয়ে দিলে;
–’পড়ে রইল যে!’ পড়েই থাকত–সে-লেখা তুলবে বলে
কবি ডুবে মরে, কবি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে।।”

মুগ্ধ উপস্থিত জনতা। অভিভূত স্বয়ং কবি জয় গোস্বামী। তার কবিতা যে সুরারোপ-যোগ্য এটা বোধহয় প্রথমবার উপলদ্ধি করল সে। মুগ্ধতা কবি সুভাষের চোখে-মুখে। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন সুদীপের সংগীত-প্রতিভার।

পরবর্তী কালে সুদীপ সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেছিল, পাশাপাশি অব্যাহত রেখেছিল সাঙ্গীতিক চর্চার ধারাটি। তার গড়া গানের দল ‘রঙীন’ নতুন আঙ্গিকের বাংলা গানে সাড়া ফেলেছিল। সুদীপের সেদিনের সুরারোপিত গানটি কবি জয় গোস্বামীর কবিতা-পাঠের সঙ্গে একটি সিডিতে প্রকাশিত হয়েছিল।

গানের সংযোগ

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন যে তাঁর মধ্যে একটি শিশু ও মেঠো মানুষ পাশাপাশি বসবাস করত। শিশুর সারল্য ফুটে উঠত তাঁর আচরণে, আর তাঁর অতি সরল জীবনযাপনের কেন্দ্রে বসে থাকত মেঠো মানুষটি।

সেদিনের সন্ধ্যায় যখন পূর্ণোদ্যমে চলছে সাহিত্যের আসর, দুই কবি সভাঘরের ছোট মঞ্চে পাশাপাশি দুটি চেয়ারে আসীন, সামনে উৎসুক শ্রোতৃমন্ডলী, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ইশারায় ডাকলেন আমাকে। কাছে যেতে চমকে দিয়ে কানে কানে বললেন, “আমি বুঝতে পারছি যে পরিবেশটি সুভদ্রজনের। কিন্তু আমার এই মুহূর্তে একটা বিড়ি খেতে খুব ইচ্ছে করছে। এখানে বসে যদি বিড়িটা ধরাই, খুব খারাপ দেখাবে কি? তুমি কি বল?”

আমি হেসে ফেললাম। মুহূর্তের ভাবনায় এলো, যে কবি অতি সাধারণ জীবনের মেঠো পথকেই যাপনের অঙ্গ ও প্রতিরূপ করে নিয়েছেন, যিনি মানুষকে নিদান দিয়েছেন, “রাস্তাই একমাত্র রাস্তা”, শালীনতা শোভনতার দোহাই পেড়ে তাঁকে বিড়ির সুখটান থেকে বঞ্চিত করার অধিকার আমার নেই। তাই হেসে বললাম,”মানুষটি যখন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, তখন এ প্রশ্ন নিরর্থক। আপনার ক্ষেত্রে এখানে বসে মৌজ করে বিড়ির টান মোটেই বেমানান হবে না।”

শিশুর সারল্য মাখা একগাল হাসি নিয়ে কবিতার আসরে মঞ্চে বসেই বিড়ি ধরালেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। দেখলাম, বেশ মানিয়ে গেলেন তিনি ওই পরিবেশেই।

সভাশেষে তাঁকে তাঁর দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে পৌঁছে দেবার দীর্ঘ পথে গাড়িতে সহযাত্রী হয়ে সেদিন প্রবীণ কবির জীবনের বর্ণিল পথপরিক্রমার, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর সখ্যের ইতিবৃত্ত শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল, যার অনেকটা আজ বিস্মৃতির অতলে ঝাপসা হয়েও কিছু কিছু দ্বীপের মতো জেগে আছে। সে সুখস্মৃতি আজও মনের গহনে আনন্দের রসদ জোগায়।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ruchismita Ghosh
Ruchismita Ghosh
6 months ago

দুই কবিকে নিয়ে আপনার স্মৃতিচারণ খুব ভালো লাগল।

Tanmay Banerjee
Tanmay Banerjee
Reply to  Ruchismita Ghosh
6 months ago

ধন্যবাদ।

Alak Basuchoudhury
Alak Basuchoudhury
6 months ago

কবি সুভাষের সেই সুকান্ত-স্মৃতি ছিঁটেফোঁটা হলেও কিছুটা যদি এখানে পাওয়া যেত, তাহলে চমৎকার হত! চেষ্টাচরিত্র করে স্মৃতিতে শান দিয়ে কিছুটা কি পুনরুদ্ধার করা যায় না? আমি যেমন মাঝে মাঝে পুরনো ক্যাসেট বের করে সেগুলি কষ্টেসৃষ্টে আবার বাজিয়ে সেই সব লুপ্তরত্ন আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের চেষ্টা করি, তন্ময়বাবুও যদি সেরকমভাবে এখানে কিছুটা পরিবেশন করতেন, তাহলে সেই স্মৃতিসম্পদ সবার জন্য থেকে যেত।

কবিতার সুরারোপটি অসামান্য মনে হল। এই কবিতার এমন গীতিরূপ কল্পনা করা কঠিন! পুরো গানটিতে রাগাশ্রয়ী ঘরানায় গায়কের দখলের পরিষ্কার ছাপ ফুটে উঠেছে।

Tanmay Banerjee
Tanmay Banerjee
Reply to  Alak Basuchoudhury
6 months ago

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অবশ্যম্ভাবী অনুষঙ্গে সুকান্ত ভট্টাচার্য আসেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে যতদূর মনে পড়ে, সেই সন্ধ্যায় তাঁর ও নবীন কবি জয় গোস্বামীর কবিতা ও আধুনিক কবিতার আঙ্গিক নিয়েই মূলত আলোচনা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল তরুণ কবি ও আবৃত্তিকারদের আবৃত্তি ও কবিতার গান। তারই মধ্যে ফাঁকে ফাঁকে সুকান্তকে নিয়ে দু’চারটি কথা বলেছিলেন সুভাষ, যেগুলি আমাদের মোটামুটি পরিচিত তথ্য। আমার বিস্মৃতিচারণা স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে মনের কোনে থেকে যাওয়া ছোট ছোট দু’ চারটি উপভোগ্য ঘটনাকে আপনাদের সামনে রাখা। এইমাত্র। আপনি পড়েছেন, এটাই আমার একটা প্রাপ্তি।