
ভানুকে আমি নিয়ে এসেছিলাম গোয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ৷ ভানু একটি গোয়ান বৃদ্ধের মাটির মূর্তি ৷ এক প্রান্তিক শিল্পীর পুতুল তৈরীর কারখানায় ভানুকে যখন প্রথম দেখি –তখন সে গ্রামে বিকেলের ছায়া পড়েছে ৷ গরম থাকলেও সূর্যের তেজ কমছে ৷ কারখানার ভেতরে বেশ অন্ধকার ছিল – শুধু চালাঘরের চারপাশের ফুটো দিয়ে বিকেল ঢুকে ভানুর মুখে আলো ফেলেছিল ৷ শিল্পী আলো জ্বালাতে গেলে বাধা দিলাম এবং ওই কম আলোতেই থাই অব্দি ধুতি পরা বৃদ্ধের মূর্তিকে ভারী ভালোবাসলাম ৷ নাম দিলাম -ভানু ৷ মনে মনে অবশ্য একটি পূর্ণ বাক্য বলেছিলাম —
ওরে ভানু তুই আমার বিকেল শেষের বন্ধু রে ৷
মাটির ভানুর মুখে একটি মাটির হুঁকো বসান ছিল ৷ তখন থেকেই মনে হচ্ছিল — ভানু বুড়ো সত্যিকার হুঁকো টানছে — ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বুড়ো কড়াচোখে অনাচারে লক্ষ্য রাখছে আর গরীবদের কষ্টগুলো তার মাটির চামড়ায় মেখে নিচ্ছে ৷ আমার কল্পনায় মাটির ভানুর দিনরাতে কর্ম যোগ হল ৷ ভানু আমার কোলে চেপে প্লেনে করে কলকাতায় এল ৷
বাবার নিউটাউনের বাড়িতে ভানুর প্রতিষ্ঠা হল ৷ চারপাশে ওহিদুর চাষীর শুকনো পালং ক্ষেত ৷ রোজ রাতে পালং এ জল দেয় ওহিদুর – যদি পালংয়ে সবুজ জাগে ৷ এ বাড়ি আমার বাবা, মাকে উপহার দিয়েছিলেন ৷ মায়ের জন্য এটি ছিল – বাবার প্রথম ও শেষ উপহার ৷ তখনকার দিনের বররা বউদের খুব ঘন ঘন উপহার দিত না ৷ তখন মানুষের দেওয়ার ক্ষেত্রটা সংসারের বাইরেই বেশী ছিল ৷ যাই হোক –আমি বাড়িটা সাজানোর পর মা অসুস্থ হলেন ৷ ফলে নিউটাউনের বাড়ি ফাঁকা ছিল — এবার আমি ও ভানু সেখানে আস্তানা গড়লাম ৷ মনে হল — মা যেন সূর্য হয়ে আমার কাছে এল ৷
ভানু আমার শ্রমপুজোর প্রতীক হয়ে গেল ৷ আরামে হুঁকো টানতে থাকা একটি মাটির বুড়োকে কেন যে আমি শ্রমিকের বন্ধু ভাবতে শুরু করলাম, নিজেও জানি না ৷ শুধু ভানুর তোবড়ানো গাল, নুয়ে পড়া কাঁধ আমায় বোঝাতে লাগল —
দেখো ভাই – এ হল ভানু ৷ পর্তুগীজরা আসার আগে এই ভানুরাই গোয়ার মাঠে ফসল ফলাত –মানুষের দুখের ফয়সালা করত — আবার খরার দিনে খাবার না খেয়ে রক্তবমি করে মরত৷ মরা রক্তে সূর্যের নতুন বান আসত ৷ ভানুকে তুমি মায়ের মতো যত্ন করে রাখ৷

ভানুকে নিয়ে আমার কল্পনা তখন এমন তুঙ্গে – দিনের বিভিন্ন সময় বাড়িটার বিভিন্ন জানলায় তাকে বসিয়ে রাখতাম ৷ ভানুর মুখে নানাভাবে আলো পড়ত ৷ আমি মনে করতাম –এক এক জানলা দিয়ে এক এক মানুষ দেখে ভানুর চোখ বদলাচ্ছে ৷ ন্যাকড়া দিয়ে ভানুর চোখের ধুলো মুছিয়ে দিতাম -যাতে সে আরো দেখতে পায় ৷
সে-রাতে পূর্ণ চাঁদ ৷ পাশের অবাঙালী বড়লোক বাড়িতে পুণ্য -উৎসব – লক্ষ্মীপুজো ৷ ভানু ও আমি দুজনেই দেখেছি – আগের রাতে মিস্ত্রীরা বিশাল প্যান্ডেল বানিয়েছে ৷ দিনকে ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছিল না মিস্ত্রীদের ৷ কারণ তখন কোভিডে জনসমাগম বন্ধ ছিল ৷ তাই রাতে নিদ্রাহীন মিস্ত্রীর দল ৷ পর্যাপ্ত কৃত্রিম আলোও তাদের দেওয়া হত না — লোকের নজর এড়াবার জন্য ৷ রাতের পুজো শেষ করে ঘি চুপচুপে লিটটি খেয়ে বড়মানুষ বউ জড়িয়ে ঘুমোতে গেল ৷
মিস্ত্রীরা এবার প্যান্ডেল খুলছে ৷ সেই আঁধার –আধাঁরের মাঝেই কটা কালো হাত কাজ করে চলেছে ৷ বাইরের মৃদু গুঞ্জন — এক মিস্ত্রীকে সাপে কেটেছে ৷ নিউটাউনে খুব কেউটের বাচ্চা ৷

জোছনা ভরা খাটে শুয়ে স্পষ্ট দেখলাম –ভানুর গায়ের জোছনা গায়েব ৷ একটি ঢিপসি কালো ঢেলা হয়ে গেছে সে ৷ ঢেলায় শুধু দুটো তীব্র চোখ! কী দেখছে ভানু ? কীসের জন্য কীসের ওপর এত ক্রোধ ভানুর, যে জোছনা দিয়ে নিজেকে সাজাতে ভুলে গেল সাগরপাড়ের প্রাচীন মানুষ! মানুষের দুঃখ দেখে একটা মাটির মূর্তি নিজেকেই এমন অন্ধকার করে ফেলল !
বড়মানুষের ঘরের আলো নিভল ৷ বিছানায় শীত ঢোকাবার যন্ত্র চালু হল ৷
বাড়ির গার্ডরা সাপে কাটা মিস্ত্রী নিয়ে ছুটল হাসপাতাল ৷
বড় বড় ঘাসে বাঁশ ফেলার আওয়াজ হচ্ছে — খটখটাখট ৷
সকালের মধ্যে কাজ শেষ করে পালাতে হবে মিস্ত্রীর দলকে ৷
অতিমারীতে লক্ষ্মী চালু থাক ৷
শুধু লোক যেন লোককে না দেখে ৷
দেখছে আমার মাটির ভানু ৷
জোছনা ফিরিয়ে আমার মা-টি দেখছে তার সন্তানদের ৷
মা কে দেওয়া বাবার প্রণয় -উপহার ব্যর্থ হয়নি ৷


বেশ ভালো লাগল গল্পটা। অন্যরকম আলো ছড়ালো।