শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

“কাহার অভিষেকের তরে
সোনার ঘটে আলোক ভরে।
উষা কাহার আশিস বহি
হল আঁধার পার।”

মাঝেমধ্যে কিছু লাইন আমার ভিতর রাজত্ব করে। দেবদারু পাতায় সাজানো ছোট্ট মঞ্চ – সেখানে একটা হারমোনিয়াম তবলা ও মাইক্রোফোন। সন্ধের একটু আগে কালবৈশাখী থামলে বেজে ওঠে কিশোর কুমারের কণ্ঠে এই গানের কলি – পাড়ার রবীন্দ্রজয়ন্তী। এখনও একটা ঘোর। এখানে আমি সেরকম কিছু একটা খুঁজছি। সেই জায়গাটা হল ঢাকা, বাংলাদেশ। বেশ কয়েকবার আসা-যাওয়ার সুযোগে জায়গাটির সঙ্গে কোথাও যেন এক আত্মিক টান অনুভব করি, যার কেন্দ্রবিন্দু রবীন্দ্রনাথ। এই ওপার বাংলার সঙ্গে সোনারতরী কবিতার মাধ্যমে তিনিই এঁকে দিয়েছিলেন যোগাযোগের অপার্থিব ছবিখানি।

এবারে আমার চারদিনের সফরে দু ‘ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে এ শহরের অচেনাকে চিনতে। এই অচেনার মধ্যে তিনিও আছেন। শুধু কি দেশটির জাতীয় সঙ্গীতে নাকি অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। অন্বেষণের তাগিদে আমার ভিতর একটা বজ্রবিদ্যুৎ সহ ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। ঝড় শেষে বৃষ্টি হল। পানসি থেকে বেরিয়ে পা চালালাম আমার টিমের উদ্দেশ্যে। পরের দিনটা রবীন্দ্রনাথের। মনে মনে খুঁজছিলাম, “কোথায় পাব তারে?” আরে, ওই তো! গান গাইতে গাইতে ওপারের ছেলের দল আমাদের দিকেই আসছে। ধানমন্ডি লেকের একটা পাড়ে বসে ওরা আলাপ করল নাহারের সঙ্গে। সূর্য তখন অস্ত গেছে। গাছের আড়ালে আড়ালে জ্বলে উঠেছে বাতি আর সমবেত কণ্ঠে,

“আমি তোমাকেই বলে দেবো
কী যে একা দীর্ঘ রাত,
আমি হেঁটে গেছি বিরাণ পথে।
আমি তোমাকেই বলে দেবো
সেই ভুলে ভরা গল্প,
কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়।”

কিছুক্ষণ সঞ্জীব চৌধুরীয় স্তব্ধতা। স্মৃতিতে ভুলে ভরা গল্পের রোমান্টিক হাতছানি। তারপর আবার ভুলের বোঝা কাঁধে আরেক ভুলের দিকে হেঁটে চলা। মেঘ কাটিয়ে চাঁদ উঠেছে আকাশে। আগের দিন আমি কার্জন হলের আকাশে সেই হাতছানি দেখে এসেছি। এখন কেবল অপেক্ষা করছি আমার স্বরচিত “স্পর্ধা”র , যে স্পর্ধাকে কিছুটা হারিয়েছি, কিছুটা ঝেড়ে ফেলেছি, বাকীটা হারাতে চাইনা বলেই কাঁটাতার উপেক্ষা করে এসেছি। স্পর্ধা ব্যাপারটা গোপন প্রেমের মতন, তাকে যথার্থভাবে লালনপালন করলে, তা এক আশ্চর্য সৃজনশীলতায় সম্মানিত করে।

এবার আমার গাইবার পালা। ছেলেমেয়েদের অনুরোধ। ভিতরে যে সুর ক্রমাগত অনুরণিত হয়ে চলেছে তাকে প্রকাশ করতে গেলে কথা সুর সবই হারিয়ে যায়। আমার গান যে সুরে মনের ভিতর ঘুরপাক খায় ঠিক সেভাবে মনের বাইরে আসতে পারে না। আমি সুরগুলোকে কেবল অন্তরেই লালনপালন করি। তাই ভাঙা ভাঙা সুর তালে গেয়ে উঠি –

“বনে বনে ফুল ফুটেছে,
দোলে নবীন পাতা–
কার হৃদয়ের মাঝে হল
তাদের মালা গাঁথা।”

আর একটা দিন পেরোলেই এখানে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। খুব ইচ্ছে ছিল তাঁকে এদেশে দেখবার। কিন্তু হইচই কই? রাস্তাঘাটে, মোড়ের মাথায় কিংবা সিগন্যালে কোথায় তিনি ? হোটেলের ক্যাশিয়ারবাবুকে পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেছি তাঁর কথা। তিনি খুব স্বাভাবিক সুরেই জবাব দিয়েছেন, “উনি তো আমাদের দ্যাশের জলে হওয়ায় আমের বনে, ধানের ক্ষেতে।”

ওইটুকুই আমার যোগসূত্র। আমি তো এ’দেশের কেউ নই। আমাদের হোটেলে ফিরতে এগারোটা পেরিয়ে গেল। তারপর মেসেঞ্জার চেক করে দেখি নাহারের পাঠানো ছায়ানটের রবীন্দ্র-উদযাপনের সূচি। বাকি রাতটুকু তখন আমার এবং কিশোর কণ্ঠের…..
” এ দিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার।”

শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ

এবারে বীরভূমের বাড়ি গিয়ে হাতের কাছে পেয়েছিলাম “শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ।” বইটা বাবার কেনা, সাল তারিখ লেখা, আমার জন্মের প্রায় বছর দুয়েক আগে। পড়তে পড়তে চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই বিপ্লবী পদ্মা নদী এবং তার দিগন্তবিস্তৃত চরাচর। এক জায়গায় প্র.না.বি লিখছেন যে পদ্মা যে দেখেনি, সে বাংলাদেশ দেখেনি। আমার এবারের সফরে ইচ্ছে ছিল ,সেই কল্পনাকে বাস্তবায়িত করার। রাত্রে ফোন করলেন রংপুরের প্রকাশক শাকিল মাসুদ ভাই – “দিদি, কাল আমরা কুষ্টিয়া যাব, আপনাদের ভারত থেকে কয়েকজন এসেছেন তাঁদের নিয়ে। ওখানে লালন সাইয়ের মাজারে যাব, তারপর কুঠিবাড়ি। আপনিও চলে আসুন।” বাংলাদেশ এসে কুষ্টিয়া কক্সবাজার মাওয়া ঘাট বান্দরবন এসবই তো মানুষ যায়। আমার চার চার বারের যাত্রাপথে এসবের একটারও দর্শন হয়নি। এবারেও পদ্মা দর্শন হল না। রবীন্দ্রনাথ এইজন্যই আমার উপর বেশ চটে আছেন।

আজ ওপার বাংলায় ২৪ শে বৈশাখ। আমার বন্ধুদের খুব ইচ্ছে ছিল আমাকে চাঁদপুরে নিয়ে যাবার। সন্ধ্যায় লঞ্চে চেপে সারারাত পূর্ণিমা উপভোগ করব এদেশের নদীবক্ষে। হোটেলের ম্যানেজারবাবুও খুব উৎসাহ দিয়ে বললেন, “দ্যাখবেন, চাঁদনি রাইতে নদীর রূপ, কবিতা লিখার ইচ্ছে হইবে। সকাল সকাল পৌঁছে ঘুইরা ফিইরা ইলিশ খাইয়া আসবেন।” প্রত্যেক স্নেহশীল মানুষের হৃদয়ে একজন কবি বাস করে। উপযুক্ত পরিবেশে শব্দে অথবা নিঃশব্দে সে রচনা করে তাঁর অনুভূতির বিচিত্র প্রকাশ। এখানে এসে আগেও আমি খুঁজে পেয়েছি এমন মানুষজন। ঢাকার রাস্তায় এক রিক্সা চালকের তাঁর স্বভূমি সিলেটের প্রকৃতির বর্ণনা শুনে মনে হচ্ছিল, তিনি স্বভাব কবি, তাঁর ভাষই সাহিত্য, এর আলাদা প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা নেই।

সেবারে আমার দৌড় ছিল সদরঘাট অব্দি। সুবর্ণা, আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী, লঞ্চে চড়িয়ে নদী ভ্রমণ করাতে চেয়েছিল কিন্তু নোংরা জল দেখে আমি পিছিয়ে এসেছিলাম। চাঁদপুর নাম শুনেই আন্দাজ করতে পারছেন যে এখানে পূর্ণিমাস্নাত নদী দর্শনের আকর্ষণ সাংঘাতিক, সঙ্গে যদি থাকে ইলিশ !

কিন্তু গোল বাঁধাল বস, দি সুপ্রিমো। এক ঘড়া গঙ্গা জলে একফোঁটা গোমূত্র ফেলতে এঁদের জুড়ি মেলা ভার। খালি কাজ কাজ কাজ। ছেলেটির চাকরির বয়স কম, ফলে ফাঁকফোকরের সন্ধান পেতে সময় লাগবে। তাঁর বসের ডাক এসে গেছে, অতএব আজ রাত্রে ফিরতে হবে। পদ্মা দেখা তো হলই না, চাঁদপুরও রসাতলে। চাঁদ উড়ে গেল কিন্তু তার বদলে ফুটল রাশি রাশি কৃষ্ণচূড়া। সক্কাল সক্কাল রেডি হয়ে এসে বলল, “দিদি, চল, তোকে চন্দ্রিমা উদ্যান নিয়ে যাব।” মধু নেই তো কী হয়েছে, চন্দ্রমা তাঁর জোৎস্নাসহ কলঙ্কটুকু উজাড় করে দিয়েছে যাত্রাপথে কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় মায়ায়। চকচকে রাজপথের একদিকে প্রশাসনিক ভবন, ক্লাব অন্যদিকে সবুজ ঘাসের গালিচা ঢাকা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের সমাধি। এককথায় অপূর্ব, শুধু দেখার চোখে এ দেশের প্রতি একটু শ্রদ্ধা সম্মান নামক আবেগ মেশাতে হবে।
আমার এক বস সেদিন দেশভাগ নিয়ে কথা প্রসঙ্গে বলে ফেললেন, “উন্নত দেশের ভিকিরি হয়ে জন্মানো ভালো, কিন্তু বাংলাদেশে নৈব নৈব চ। “ভাগ্যিস, এমন অভিজ্ঞতা নেই, তাহলে ঘৃণার নেশায় ভালোটুকুও এড়িয়ে যেতাম! ১৯৮১ সালের আগে জায়গাটি খামার ছিল যা পরবর্তীতে জিয়া উদ্যান বলেও অভিহিত। নাম বদলের খেলা এখানকার রাজনীতিরও অঙ্গ, আসলে দেশ যতই আলাদা হোক চরিত্রে তো একই। আমরা চাঁদ দেখতে পারিনি, বৈশাখী নবারুণ দেখেছি, ক্রিসেন্ট মুন লেকের ধার থেকে ঘ্রাণ নিয়েছি বাংলাদেশী সবুজের, লালের, ক্ষমতার , অক্ষমতার সর্বোপরি সংগ্রামের।

আমার পরবর্তী গন্তব্য সংগ্রামেরই পথে । পদ্মা নাই দেখাতে পরলাম, পদ্মাপাড়ের নগর সভ্যতার জীবন সংগ্রাম দেখবেন না বললে চলবে না। এ পথ যেখানে মিশবে সেখানে বহুবিধ মত – রাম ও কৃষ্ণ, লালনে মিশে একাকার…..।

ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশন


বৈশাখের সকালে সারি সারি কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরী পেরিয়ে এবার রামকৃষ্ণ মিশনের পথে। ঝকঝকে পুষ্পশোভিত প্রশাসনিক সরণি পেরিয়েই পড়লাম উদভ্রান্ত ট্র্যাফিক স্রোতে, যেখানে আদিমতা আধুনিকতাকে বাধা দেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। অগত্যা বাস থেকে নেমে, হাঁটতে শুরু করলাম। গুগল বাবাজির নির্দেশিত পথে গিয়েও থমকে গিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করছি, “মামা, বলেনতো রামকৃষ্ণ মিশনটা কোথায় ?” আমরা যেমন “দাদা, বলুন তো” নামক গাইড নিয়ে ঘুরি, তেমনি এদের কাছে “মামা”।

কিরকম বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে মামারা নেতিবাচক ইঙ্গিতে মাথা নাড়াচ্ছেন। অবশেষে একজন মুচি যিনি রাস্তার ধারে ছেঁড়া হাওয়াই চপ্পলে ফিতে জুড়ছিলেন, তিনিই পথ দেখালেন। শিষ্য হো তো আইসা। ভাগ্যিস, বিবেকানন্দ মুচি ম্যাথর চণ্ডালকে ভাই বলে আপন করেছিলেন ! যেমন পাগল তাঁর গুরু, তেমনি শিষ্য। আমিও এখন সেই পাগলামির পথে।

এ গলি সে গলি ঘেঁটে আমরা অবশেষে স্বয়ং রামকৃষ্ণদেবের কাছে। দুপুরের খর তাপে দগ্ধ হয়ে কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় বসেছি একটু জিরিয়ে নিতে। সামনেই মিশনের বিদ্যালয়। দোতলার কোনো এক শ্রেণি থেকে শিক্ষক মহাশয়ের কণ্ঠে ভেসে আসছে, “চিত্ত যেথা মুক্ত উচ্চ যেথা শির…. গৃহের প্রাচীর।”
কয়েকজন শাখা সিঁদুর পরা মহিলারাও জড়ো হলেন, তাঁদের ছেলেদের নিতে এসেছেন। আমি ভাবছিলাম, রামকৃষ্ণ মিশনে কি এখানে শুধুই হিন্দুরাই পড়ে ? না, খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর দেখা গেল অনেক মুসলিম মহিলারাও এলেন
এই তীর্থক্ষেত্রে। আমার নজরে এই বিদ্যাপ্রাঙ্গণ তীর্থক্ষেত্রই যেখানে দুনিয়ার ক্রমবর্ধমান ভোগবাদ পেরিয়ে সাময়িক স্বস্তির সাক্ষাৎ হয়। মনে পড়ে , ঊনবিংশ শতকের বাংলা। ভোগবাদ ঘিরে ধরছে। অর্থ, নারী সেই লোলুপতার কেন্দ্রে।
সেই সময় দক্ষিণেশ্বরের এক পাগল পুরোহিত কীভাবে মানুষের শান্তির আশ্রয় হয়ে উঠছেন।

রাত্রে ফিরে এসে ভাবছিলাম, কাল কি আদৌ রবীন্দ্রনাথের দেখা পাব ? রঙপুরের প্রকাশক শাকিল মাসুদ ভাই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন লালন সাঁইয়ের দরবারে। সময়াভাবে সেটি হয়ে ওঠেনি, হয়নি পদ্মা দেখাও, তাহলে ?
ভাবতে ভাবতে ঢুকল নাহারের মেসেজ।

  • দিদি, কাল বিকেলে ছায়ানটে প্রোগ্রাম আছে, তোমার হোটেল থেকে কাছেই। আমি তো হাতে স্বর্গ পেলাম।
    আবার কিছুক্ষণ পর আরেকটি মেসেজ, “দিদি, কাল আমার মেয়ের ছায়ানটে নাচ আছে” খবর পাঠালেন কমল দা।

ছোটবেলায় ঘুম ভাঙত ধোঁয়ার গন্ধে। মা সকালে উঠেই কয়লার উনুনে আঁচ দিতেন। তার ঠিক পরেই আকাশবাণীতে বেজে উঠত বন্দেমাতরম্। ভক্তিগীতির কয়েকটা গান বাজার পরই রেডিওর মুখটা ঘুরে যেত পূর্বে। ওপারে তখন রবীন্দ্রগান। বাংলাদেশ বেতার থেকে কাঁটাতার ডিঙিয়ে তাঁদের শিল্পীদের কণ্ঠে কবি হাজির হতেন মায়ের রান্নাঘরে। ততক্ষণে ধোঁয়া উধাও। আগুনের শিখায় শিখায় সুরের অনুরণন। শিল্পীদের তখন চিনে রাখিনি কিন্তু তাঁদের গানে যেন এক অন্যরকম মায়ার খেলা। উচ্চারণে মিশে থাকত এক অস্ফুট গোপন মালিকানা। সেই রবীন্দ্র-অধিকারে ছিল সরস নবীন পল্লী মায়ের গায়ের গন্ধ। গন্ধের ভিতর নীরবে অশ্রুপাত করত ভাষা আন্দোলনের বেদনা রক্তপাত, মুক্তিযুদ্ধে ঝরা পাতার স্বপ্ন।

ছায়ানট ভবন

বিকেল হতেই পৌঁছে গেলাম ছায়ানট। ষাটের দশকে ফৌজি পাক-সরকার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া, বেতার বা টেলিভিশনে সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে। এতে বাংলাদেশের প্রবাদপ্রতিম রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী কলিম শরাফী দমে না গিয়ে অন্যান্যদের সহায়তায় রবীন্দ্র সংগীত, নাটক ও নৃত্যনাট্যের সংস্থা ছায়ানট গড়ে তোলেন। আমরা অবহিত যে বর্ষীয়ান শিল্পী সানজিদা খাতুনের সুযোগ্য নেতৃত্বে এই প্রতিষ্ঠান এ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পীঠস্থানও বটে। চটি খুলে মূল অনুষ্ঠান কক্ষের প্রবেশ করলাম। ফুলের আলপনার মাঝে প্রদীপ। অপূর্ব স্নিগ্ধতা , যেন এক রবীন্দ্র মিলনমন্দির। গ্যালারির মেঝেতে বসে একটার পর একটা গান নাচ আবৃত্তি শুনতে শুনতে ভেসে যাচ্ছিলাম সীমানাবিহীন দিগন্তে। সঙ্গে আমার ছায়া সঙ্গী – সাজ্জাদ, শিহাব, মনিকা। দেখা পেলাম কমলদার মিসেস স্নিগ্ধা বৌদি ও মেয়ে বৃষ্টির। ওদের আদর যত্ন ভুলবার নয়।
জানিনা, যারা ভারত-বাংলাদেশ নিয়ে ঘৃণা ও বিদ্বেষের কারবার করেন, তারা সেই ব্যবসা থেকে কি কি ফায়দা উসুল করতে পেরেছেন। হয়তো তারা কোনোদিন শোনেননি –

“কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো—
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে—
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি॥”

হয়তো যত্রতত্র উদযাপনের ঘটা নেই, কিন্ত যা আছে তা শ্রদ্ধায় ,ভালোবাসায়, নিমগ্ন নিবেদনে কবির বঙ্গভঙ্গের যন্ত্রণাকে ক্ষণিকের জন্য হলেও উপশম দিতে প্রস্তুত। এই বাংলাদেশই তো আমার আপনার আমাদের, বিভক্ত হয়েও অবিভক্ত সাংস্কৃতিক চেতনায়, যেখানে ধ্রুবতারার মত উজ্জ্বল পথনির্দেশক এমনই এক পঁচিশে বৈশাখ।

ছায়ানটের অনুষ্ঠান

সেদিনের সেই ছায়ানটের নিবেদন আজও কানে বাজে। আমাদের শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতীতে যতখানি বেঁচে আছে, তার চেয়েও বেশি বেশি বেঁচে আছে এ দেশের নিবেদিত শিল্পীদের রবীন্দ্র-নিবেদনে। আমি গান অথবা সঙ্গীত না বলে, অন্তরাত্মার এই শৈল্পিক আকুতিকে নিবেদন বলাই শ্রেয় মনে করেছি।

“আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে॥
ভরে রইল বুকের তলা, কারো কাছে হয় নি বলা….”

আজ এসব কথা লিখতে গিয়ে যাঁর কথা মনে পড়ছে তিনি হলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাদি মহম্মদ। এপারে রবীন্দ্রনাথ খুঁজতে গেলে এমন অনেক খ্যাত থেকে অখ্যাত মানুষের ভিতর অবগাহন করে কবিকে আবিষ্কার করতে হয়। সাদী’দার অকস্মাৎ প্রয়াণে ক্ষণে ক্ষণে এই গানটিই শুনে যাচ্ছি। তিনি শুধু সুরকেই ধারণ করেননি, সুরের ভিতর দিয়েই নির্মাণ করেছেন তাঁর মননকে। কেবলই মনে হচ্ছে, সেখানে গিয়েও তাঁর সুরমন্দিরখানিতে প্রণাম জানিয়ে আসতে পারিনি, যেমন করে এত ভিড় এত কোলাহলের মাঝেও তাঁর একাকিত্বকে কেউ আপন করতে পারেনি। কোনো কোনো মানুষ আসলে কষ্ট পেলেও তাঁর নিভৃতিকে নিভিয়ে যেতে দেন না, চানও না কেউ আলো জ্বালুক সেই বিজন অন্ধকারে। তাঁরা দুঃখ যাতনাকে যত্ন করে ভালোবাসতে বাসতে একদিন নিজেরাই হারিয়ে যান অতলে।

সাদি মহম্মদ

আমরা শুধু জেগে উঠি ধোঁয়ার গন্ধে। সাময়িক ঝাপসা হওয়া দৃষ্টিতে তাঁদের খুঁজে বেড়াই। অথচ, ভিতরে ভিতরে কে কতখানি পুড়ে চলেছেন, সেসব কথা লিপিবদ্ধ হয় না। লিপিকারকেও পরাজিত হতে হয় সম্বন্ধের বিড়ম্বনার কাছে। ধোঁয়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, চোখ কচলে সময় হয় নির্ভার। আড়াল হবার আগে যেন তিনিই বলে যান…..

“এমনি গেল সারা রাতি, পাই নি আমার জায়গা সাথি–
বাঁশিটিরে জাগিয়ে গেলেম গানে গানে॥”

সাদী মোহাম্মদ, সাদী’দা প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির জল্পনা কল্পনার সিলেবাসের বাইরে আপনার গোপন কথাগুলি সুরে সুরেই বাজতে থাক আমাদের মতো শ্রোতাদের কানে, ধন্য হোক “আমাদের সব হতে আপন” প্রতিটি ধূলিকণা এমন পবিত্র প্রাণে।

কাঁটাতারের বিভেদে রবীন্দ্র-নজরুল যতখানি বিভক্ত তার চেয়েও তাঁরা ক্ষত বিক্ষত। মাঝেমাঝে ধর্ম সঙ্কট হাজির হয় তাঁদের অবস্থানে। সেসব সরিয়ে রেখেই আমি ঢাকার অলিগলিতে খুঁজে বেড়াই তাঁদের ছোঁয়া। সেই ছোঁয়া পাই শুধুমাত্র তাঁদের লেখা গদ্যে পদ্যে নয়, অজস্র অচেনা পথচলতি মানবের দরদী আলাপনে। সেখানকার বৈশাখ যাপনে তাই মানস চক্ষে দেখেছি, কবি শ্রমণের বেশে বলছেন,

“জল দাও, জল দাও
আমি তাপিত পিপাসিত,
আমায় জল দাও।”

সেই তৃষ্ণা মেটাবার দায় আমাদেরও। দায় আঁধার পেরোনোরও।

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.