শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বাংলার ঋতুচক্রে শরতের আগমন যেন এক নিভৃত পদচারণায়।

অগ্নিস্রাবী গ্রীষ্মের দাবদাহ ও রুদ্ররূপ, বর্ষার মেঘমল্লারের ঘনঘটা, আষাঢ়-শ্রাবণের বজ্র-মানিক দিয়ে গাঁথা ক্লান্তিহীন বারিধারা, তাদের ঋতুরূপ প্রকাশে যতটা উচ্চকিত, তার বিপ্রতীপে শরতের আলোছায়ার খেলা, প্রকৃতির প্রাণোচ্ছলতা, আকাশে-বাতাসে তার আবেশ অনেক বেশি শান্ত, মধুর ও স্নিগ্ধ। রূপবৈচিত্র্যে মনোরম।

ধূলি-ধূসরিত, বিজ্ঞাপন-কণ্টকিত, ব্যস্ত জীবনচর্যার কোলাহল মুখরিত নগর-জীবনের গন্ডিতে হয়তো শরতের আগমন-বার্তা সেভাবে ঘোষিত বা অনুভূত হয় না, যতটা হয় গ্রাম বাংলার পটভূমিতে। শরতের রূপ-লাবণ্য সেখানে আমাদের অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে, আবিষ্ট করে। তার স্পর্শ মাধুর্যময় হয়ে ধরা দেয়। উদার, উন্মুক্ত আকাশ, নবীন সবুজ ধানের গালচে, দিগন্তবিস্তৃত সর্ষে ফুলের আস্তরণ, আর ফাঁকে ফাঁকে গুচ্ছ গুচ্ছ কাশ ফুলের ঢেউ আজও আধুনিক নাগরিক মনের গহনে মুগ্ধতা আনে, মনকে আপ্লুত করে। বর্ষার মেঘমেদুর আকাশের দৃশ্যপটের পর শুভ্রতার প্রতীক হয়ে ওঠে শরৎ। ঊষাকালে শিউলি ফুলের আবেশ-ধরানো সুবাস, জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রির ঝলমলে আলোয় শ্বেতশুভ্র মেঘরাশি অপরূপ সৌন্দর্যের দ্যোতক হয়ে ধরা দেয় শরৎ।

বাংলা সাহিত্যে, গানে, কবিতায় একটি বড় জায়গা জুড়ে বিরাজমান শরৎকালের অপরূপ রূপ-লাবণ্য। আনুমানিক চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে গুপ্তযুগের মহাকবি কালিদাস, মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের বৈষ্ণব পদাবলী, ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর রবীন্দ্রনাথ শরতের রূপ-বর্ণনায় ছিলেন অকৃপণ। কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যিক শরৎ-বন্দনাও নজর কাড়ে সাহিত্যপ্রেমীদের।

কালিদাস তাঁর ঋতুসংহার কবিতায় বলেছেন, ‘কাশফুলের মতো যার পরিধান, প্রফুল্ল পদ্মের মতো যার মুখ, উন্মত্ত হাঁসের ডাকের মতো রমণীয় যার নূপুরের শব্দ, পাকা শালিধানের মতো সুন্দর যার ক্ষীণ দেহলতা, অপরূপ যার আকৃতি সেই নববধূর মতো শরৎকাল আসে।’

প্রেম ও বিচ্ছেদের পটভূমিতে শরৎকাল এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে বৈষ্ণব পদাবলীতে। রাধার বিরহ যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলতে এই ঋতু ও মাস বৈষ্ণব পদাবলীর আধার। শরতের মেঘপুঞ্জ সজ্জিত আকাশ, শিশিরবিন্দু সমন্বিত প্রকৃতির শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপকে রাধার মানসিক অবস্থার সঙ্গে একাত্ম করে দেখেছে বৈষ্ণব পদাবলী।

এবং অবিকল্প রবীন্দ্রনাথ। তাঁর কবিতায়-গানে অজর, অমর করে গেছেন শরৎকালকে। একের পর এক, শরতের কী অপরূপ ছবি তিনি এঁকেছেন শব্দ ও ছন্দের মোহময় তুলিতে!…

“শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি।
ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি॥
শরৎ, তোমার শিশির-ধোওয়া কুন্তলে
বনের-পথে-লুটিয়ে-পড়া অঞ্চলে
আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি॥…”

শারদ-প্রাতের রূপমুগ্ধ কবির লেখনীতে ফুটে উঠেছে দেশমাতৃকার প্রতিচ্ছবি। এক অননুকরণীয় চিত্ররূপ ধরা পড়েছে তাঁর ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের ‘শরৎ’ কবিতাটিতেঃ

“আজি কি তোমার মধুর মূরতি
হেরিনু শারদ প্রভাতে!
হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ
ঝলিছে অমল শোভাতে।

পারে না বহিতে নদী জলধার,
মাঠে মাঠে ধান ধরে নাকো আর–
ডাকিছে দোয়েল গাহিছে কোয়েল
তোমার কাননসভাতে!
মাঝখানে তুমি দাঁড়ায়ে জননী,
শরৎকালের প্রভাতে।…”

শরতের অপরূপ ছবি কাজী নজরুলের কবিতাতেও। কাজী সাহেব লিখছেন – ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক/এসো শিউলি-বিছানো পথে।/এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে/এসো অরুণ-কিরণ-রথে।/দলি শাপলা শালুক শতদল/এসো রাঙায়ে তোমার পদতল,/নীল লাবণি ঝরায়ে ঢলঢল/এসো অরণ্য-পর্বতে।’

রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের আধুনিক কবি বিনয় মজুমদারের কলমেও পাওয়া যায় শরতের একটি স্বপ্নময় চিত্র – ‘শরতের দ্বিপ্রহরে, সুধীর সমীর-পরে/জল-ঝরা শাদা শাদা মেঘ উড়ে যায়;/ভাবি, একদৃষ্টে চেয়ে- যদি ঊর্ধ্ব পথ বেয়ে/শুভ্র অনাসক্ত প্রাণ অভ্রভেদি’ ধায়!’

আদিকাল থেকে বাঙালিজীবন ও সংস্কৃতি শরৎকালকে বেছে নিয়েছে তার ঐতিহ্যর প্রকাশের মুখ্য ধারক ও বাহক হিসেবে, শারোদৎসব দিয়ে যার সূচনা। এই সময়টিতে বাঙালির পূজা ও সংস্কৃতি যেন একাসনে লীন। উৎসব শব্দটির মধ্যে আছে উৎস। সেই উৎসের সন্ধান যেন বাঙালিজীবনের সার্থকতা। শরৎ মিলনের কাল। আর একবার রবীন্দ্রনাথের আশ্রয় নিয়ে বলা যেতে পারে “উৎসব একলার নহে, মিলনের মধ্যেই সত্যের প্রকাশ। আর সেই মিলনের মধ্যেই সত্যকে অনুভব করা উৎসবের সম্পূর্ণতা।” – (ধর্ম ও উৎসব, রবীন্দ্রনাথ)

কিন্তু প্রশ্ন জাগে, আজকের বাঙালি কি উৎসাহী তার ঐতিহ্যের উৎস-সন্ধানে? সে কি কোনোভাবেই তাকে অন্তরে গ্রহণ করতে চায়? আদৌ কি একাত্মতা বোধ করতে চায় এই কাঙ্খিত জীবনপ্রবাহ ও দর্শনের সঙ্গে? জীবনকে মেলাতে চায় প্রকৃতির এই বিপুল ঐশ্বর্য্যের সঙ্গে? কি করেই বা তা সম্ভব? পথভ্রমে তার জাতিসত্তা আজ ভিন্ন পথের পথিক। রাজনীতি ও অর্থনীতির স্বার্থান্ধ কারবারিরা আজ তার নিয়ন্ত্রক। এই অন্ধকার আবর্ত থেকে তাকে উদ্ধার করার, আলোকপথযাত্রী করে তোলার মতো বিদ্বজ্জন ও দেশনায়ক আজ বাঙালিসমাজ থেকে অন্তর্হিত। বাঙালিজীবনে ও জাতিসত্তায় এই শরৎকালেও তাই যেন গ্রীষ্মের এক অসহনীয় দহন।

তবু আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে স্মরণ করে আমরা স্বাগত জানাবো, আবাহন করবো এক উৎসব মুখরিত শরৎ কালের। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনে সার্থক হয়ে উঠুক এই ঋতুকাল। জীবনে ও যাপনে বোধ, চেতনা, শৃঙ্খলা হোক তার উজ্জীবনের মন্ত্র। প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা তো সেই শিক্ষাই নিতে পারি।

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ashish Sen
Ashish Sen
5 months ago

কথিত আছে আগেকার দিনে গায়করা মল্লার গেয়ে বৃষ্টি নামাতেন। আপনার লেখা দিয়ে আপনিও যেন শরৎকে আবাহন করলেন। চমৎকার।

Tanmay Banerjee
Tanmay Banerjee
Reply to  Ashish Sen
5 months ago

ধন্যবাদ। আপনার পাঠ প্রতিক্রিয়া আমার মনে শরতের ছোঁয়া এনে দিল।

Sulata
Sulata
5 months ago

শরতের অমল মহিমার আলোকে এ আমির আবরণ মোচন করার জাগর মন্ত্র আপনার নিবন্ধে। ভাল লাগ লো।