
“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি বিচিত্র ছলনাজালে,
হে ছলনাময়ী..” . —–রবীন্দ্র -জীবনে শেষ বছর।
মর্ত্য থেকে বিদায় নেবার এক বৎসর আগে কবির গলায় ক্লান্তির সুর। সুদীর্ঘ জীবনের পথ-পরিক্রমায় তিনি হারিয়েছেন মাতা পিতা পত্নী পুত্রকন্যা সন্তানতুল্য নিকটাত্মীয় এবং বহু প্রিয় বন্ধুকে। বিদেশী বন্ধুদের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে অন্তরঙ্গ দীনবন্ধু এনড্রুজ, যিনি বলে ছিলেন… my whole heart was given to the poet Rabindranath Tagore… সেই এনড্রুজও চলে গেলেন ১৯৪০ এর ৫এপ্রিল।
এনড্রুজের যখন মৃত্যু হল তখন কবির ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরও মৃত্যু শয্যায়। পুত্রসম সুরেনের মৃত্যুর আশঙ্কায় বিচলিত কবি ভাইঝি ইন্দিরাকে লিখলেন, – “সুরেনের জন্য মন কী রকম উদ্বিগ্ন হয়ে আছে তা বলে উঠতে পারিনে… আমার নিজের শরীর একটুও ভালো নেই –প্রায়ই জ্বর হয়।…আমারও তো যাবার সময় হয়ে এসেছে–কোন কিছুর জন্য পরিতাপ করার সময় নেই জানি, তেমনি আর সময় নেই কর্তব্য থেকে নিষ্কৃতি নেবার… এই জন্যে দুর্বল স্বাস্থ্যের কুহেলিকাচ্ছন্ন দিনের অস্বচ্ছ আলোয় ঝুঁকে পড়ে কাজ করে চলেছি।”…
কবি তখন মংপুতে। সেখানে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন। পাহাড় যে তাঁর খুব প্রিয় – এমন নয়, তবুও তিনি সেখানে বার বারে যান কারণ সেখানে তাঁর ভক্ত এবং একান্ত অনুরাগী, তাঁরই স্নেহধন্যা মৈত্রেয়ী সংসার পেতেছে শান্ত, প্রকৃতির কোলে। কবি তাঁরই অতিথি। মৈত্রেয়ীর প্রীতিপূর্ণ আতিথ্য কবির মনকে তৃপ্ত করে।

পাহাড়ের মানুষদের নিয়ে মৈত্রেয়ীর ব্যবস্থাপনায় পালিত হল কবির জন্মদিনের উৎসব ২৫শে বৈশাখ। ঠিক তার পরের দিন কবির কাছে পৌছল ভাইপো সুরেনের মৃত্যু-সংবাদ। এই মর্মান্তিক শোক কাটতে না কাটতে, মংপু থেকে কালিম্পং পৌঁছানোর কয়েকদিন পরে এল কালীমোহন ঘোষের মৃত্যু-সংবাদ ১২-ই মে ১৯৪০। এই মানুষটি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের কর্মযজ্ঞের অন্তরঙ্গ সঙ্গী।
একটি একটি করে আত্মীয় বন্ধুদের মৃত্যুর আঘাত বুকে নিয়ে কালিম্পং থেকে কবি কলকাতায় ফিরলেন ১৯৪০-এর ২৯ জুন। দিন চারেক কলকাতায় থেকে বিশ্বভারতী খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে গেলেন শান্তিনিকেতনে। দেহের জরা এবং মনের অবসাদকে দুরে সরিয়ে বিদ্যাভবনের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার কাজে মন দিলেন। বয়স্ক ছাত্র-ছাত্রীদের বাংলা পড়াতে শুরু করলেন। সঙ্গে চলল নিজের লেখা কবিতা গান ও গল্প।
‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থ বেরুল তাঁর আশি বৎসর বয়সের শেষ বসন্তের ফসল নিয়ে। জীবনের শেষ বছরে আরও তিনখানি কাব্যগ্রন্থ বেরুল ‘রোগশয্যায়’, ‘আরোগ্য’, ‘জন্মদিনে ‘। তাছাড়া লিখলেন নিজের ছেলেবেলার স্মৃতিকথা -অবিস্মরনীয় ‘ছেলেবেলা’। আর লিখলেন ‘তিনসঙ্গী’, ‘গল্পসল্প’ ‘ সভ্যতার সংকট’ আর ‘ ল্যাবরেটরী’ গল্প। কী বিস্ময়কর প্রাণ শক্তি ছিল রবীন্দ্রনাথের তা এই শেষ বৎসরের বিচিত্র সৃষ্টি দেখেই খানিকটা অনুমান করা যায়।
তবু মর্ত্য থেকে বিদায় নেবার ঘন্টা বাজতে লাগল। শেষ বিদায়ের ঘন্টা। চিঠিতে লিখলেন “শরীরটা অত্যন্ত ক্লান্ত ও অবসন্ন। অক্টোবরের প্রারম্ভে পাহাড়ে পালাবার ইচ্ছা করছি।” যে কবি শান্তিনিকেতনের প্রচন্ডতম গ্রীষ্মেও তাঁর প্রিয় আশ্রমকে ছেড়ে যান নি, সেই কবি কোলাহল থেকে দুরে পাহাড়ের শীতল কোলে আশ্রয়ের জন্য ব্যাকুল হয়েছেন। বার বার ছুটে যাচ্ছেন পাহাড়ের ভয়ংকর নির্জনতায়, শান্তির খোঁজে।
শেষ বয়সে কবি পুত্র ও পুত্রবধুর স্নেহচ্ছায়ায় থাকতেই ভালবাসতেন। রথীন্দ্রনাথই ছিলেন তাঁর শেষ জীবনের সারথি। বৈষয়িক সংস্রব ছেড়েছিলেন আগেই। টাকা পয়সা হাতে রাখতেন না। যা প্রয়োজন সেটি পেলেই ছোট ছেলের মত খুশি হয়ে উঠতেন। পুত্র কিংবা পুত্রবধূ কাছে না থাকলে অস্থির হয়ে উঠতেন।

সে সময় রথীন্দ্রনাথ গেছেন জমিদারি পরিদর্শনে পাতিসরে। পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী আছেন কালিম্পঙে অসুস্থ অবস্থায়। কালিম্পঙে যাবার জন্য জেদ ধরলেন কবি। অক্টোবরের জন্য আর অপেক্ষা করতে পারলেন না। যদিও ডাক্তার বাইরে যেতে নিষেধ করেছেন, কিন্তু তিনি শুনলেন না। ১৯শে সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে কালিম্পং রওনা হলেন।
যাবার আগে লিখলেন -“কিছুদিন থেকে আমার শরীর ক্রমশই ভেঙে পড়ছে, দিনগুলো বহন করা যেন অসাধ্য বোধ হয়। তবু কাজ করতে হয়েছে, তাতে এত অরুচিবোধ -সে আর বলতে পারিনে। ভারতবর্ষে এমন জায়গা নেই যেখানে পালিয়ে থাকা যায়। ভিতরের যন্ত্রগুলো কোথাও কোথাও বিকল হয়ে গেছে -বিধান রায় আশঙ্কা করেন হঠাৎ একটা অপঘাত ঘটতে পারে। সেই জন্য কালিম্পঙে যেতে নিষেধ করেন। কিন্তু মন বিশ্রামের জন্য এত ব্যাকুল হয়েছে যে তাঁর নিষেধ মানা সম্ভব হোলো না । চল্লুম আজ কালিম্পঙ।”

নগাধিরাজের শীতল কোলে কবির শেষ যাত্রা শুরু হল। সঙ্গে সুধাকান্ত চৌধুরী এবং দুজন ভৃত্য বনমালী ও মহাদেব। কদিন কালিম্পঙের গৌরীপুর ভবনে ভালই কাটল। তারপরই এল মৃত্যুর পূর্বাভাষ, অপ্রত্যাশিত আগন্তুকের মত। ২৬ শে সেপ্টেম্বর ইউরিমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কবি জ্ঞান হারালেন। সঙ্গে পুরুষসঙ্গী কেউ নেই। ইতিমধ্যে সুধাকান্ত পুত্রের অসুস্থতার খবরে ফিরে গেছেন। আছেন শুধু পুত্রবধু প্রতিমা দেবী আর খবর পেয়ে মংপু থেকে এসেছেন মৈত্রেয়ী দেবী। আশি বছরের অসুস্থ কবিকে নিয়ে দুই নারী তখন অসহায়, দিশেহারা!
২৮ শে সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে প্রশান্তচন্দ্র মহালনবিশ তিনজন ডাক্তারকে নিয়ে কালিম্পঙ পৌঁছলেন। সঙ্গে গেলেন কবিকন্যা মীরাদেবী। পরে পৌছলেন শান্তিনিকেতনের পরিকরগোষ্ঠী-সুরেন্দ্রনাথ কর, অনিলকুমার চন্দ এবং সুধাকান্ত রায়চৌধুরী। সন্ধ্যার ট্রেনেই কলকাতা ফিরে যাওয়া সাব্যস্ত হল। রাস্তায় ধস নেমেছিল। শ খানেক কুলি লাগিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে রাত ন’টায় শিলিগুড়ি পৌঁছলেন।
২৯ শে সেপ্টম্বর ভোরবেলা কবি ট্রেনে করে পৌছলেন কলকাতা। শিয়ালদা থেকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হল জোড়াসাঁকোর বাসভবনে। দোতলার পাথরের ঘরে থাকলেন একমাস কুড়ি দিন। এরই মধ্যে এল ভ্রাতৃদ্বিতীয়া। রবীন্দ্রনাথের পঁচাশি বছরের দিদি বর্ণকুমারী দেবী ফোঁটা দিয়ে গেলেন আশি বছরের ছোট ভাই রবিকে। ও-বাড়ি থেকে অবনীন্দ্রনাথ আসতেন। কিন্তু তিনি আর ঘরে ঢুকতেন না। বলতেন, ‘রুগ্ন সিংহ বিছানায় পড়ে, ও আমি দেখতে পারব না।’

জোড়াসাঁকোর বাড়িতে মাসাধিককাল অসুস্থ থাকবার পর কবি কিছুটা সেরে উঠে, শেষবার শান্তিনিকেতনে গেলেন ১৮ নভেম্বর ১৯৪০। শান্তি নিকেতনে কবির স্বাস্থ্য আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল না কিছুতেই। এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক -সবরকম চিকিৎসাই করে দেখা গেল কোন ফল হল না। শরীর রীতিমত ভেঙে পড়েছে এবং দ্রুত ভাঙছে।
প্রতিমা দেবী লিখছেন -“…তিনি শীর্ণ হয়েছিলেন কিন্তু তাঁকে ব্যাধিগ্রস্ত দেখাত না, তাঁর চোখের উজ্জ্বলতা একটি করুণায় পূর্ণ হয়েছিল, তাঁকে ইদানীং মনে হত তপোক্লিষ্ট ঋষি, আধ্যাত্মিক জ্যোতির মধ্য দিয়ে চলেছেন মহাপ্রস্থানের পথে, মুখে ঠিকরে পড়ত প্রীতি ও শান্তির ছায়া।”
রোগশয্যায় দিন যায়, কখনো কেদারায়, কখনো বিছানায়। রাত কাটে কখনো অনিদ্রায়, কখনো ভাবনায়। এরই মধ্যে চলে বিচিত্র সাহিত্যসৃষ্টি – কোনটি গম্ভীর, কোনটি লঘু, কোনটি পদ্য, কোনটি গদ্য, আবার কোনটি বা বিচিত্র ছড়া।
ছোট বড় কাজের জন্য লোক আসে, লেখার জন্য তাগিদ আসে, আবার প্রার্থীর দলও আসে। শরীরের এই অবস্থায় লিখতে কষ্ট হয়; তবু লিখতে হয়। কখনো কবি বলে যান, অন্য কেউ লিখে দেন। শরীর ভালো থাকলে কবি সন্ধ্যায় কত লোকের সঙ্গে দেখা করেন; নানা রকমের আলোচনা করেন।
কারও কাছ থেকে তিনি সেবা নিতে চাইতেন না, বিশেষত মেয়েদের কাছ থেকে। শত প্রয়োজন হলেও ডাকাডাকি করতেন না। ইদানীং শরীর স্থবির হয়ে পড়েছিল। তাই বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন নাতনী নন্দিতার কাছে। ভোরের বেলা নন্দিতা এসে হাত মুখ ধুইয়ে, চুল আঁচড়ে, চশমা পরিয়ে বাইরের চৌকিতে না বসিয়ে দিলে কবির মনের তৃপ্তি হত না। নাতনী-দাদামশায়ের এই সম্পর্কটি ছিল বড় মধুর।

দাদামশায়কে কফি খাইয়ে নন্দিতা বাড়ি যেত, আসতেন রানী চন্দ। সকালে মুখে মুখে যা কিছু রচনা রানীকে বলতেন, রানী টুকে নিত। কবির সেবা শুশ্রূষার কর্তব্যের ভার নিয়েছেন অনেকেই। তাঁদের মধ্যে আছেন -অমিতা ঠাকুর, রানী মহানবিশ, শ্রীমতি ঠাকুর, মৈত্রেয়ী দেবী, রানী চন্দ, সুরেন্দ্রনাথ কর, বিশ্বরূপ বসু, অনিল চন্দ, তেজেশচন্দ্র সেন, সুধাকান্ত রায়চৌধুরী, সত্যরঞ্জন চৌধুরী, বিনায়ক মাসোজী প্রমুখ।
পৌষ-উৎসবের দিন এল। কবি মন্দিরে উপস্থিত হতে পারলেন না। তিনি দুঃখ করে বলেন -” আমি আশ্রমে উপস্থিত আছি অথচ ৭ই পৌষের উৎসবের আসন গ্রহণ করতে পারিনি, এরকম ঘটনা আজ এই প্রথম ঘটল।” কবির মর্তজীবনের শেষ মাঘোৎসব পেরিয়ে গেল, কবি উপাসনায় যোগ দিতে পারলেন না।
বসন্ত উৎসব এসে গেল। ‘নটীর পূজা’র অভিনয় দেখতে যেতে পারলেন না। কবির সম্মুখে একদিন অভিনয় হল। এতদিন ফাল্গুন এসেছে তাঁর জীবনে মিলনের বাণী নিয়ে, এবার নিয়ে এল বিচ্ছেদের সুর।
রোগক্লান্ত জীবনের শেষ নববর্ষ এল ১৩৪৮ সালের ১লা বৈশাখ। নববর্ষের দিনে আশ্রমবাসীদের উদ্দেশ্যে কবি তাঁর শেষ আশীর্বাদে মানুষের অপরিসীম প্রীতির উদ্দেশে তাঁর শেষ নমস্কার জানিয়ে বললেন – “সকলের এই স্নেহমমতা, সেবা আজ আমি অন্তরের মধ্যে গ্রহণ করি, প্রণাম করে যাই তাঁকে যিনি আমাকে এই আশ্চর্য গৌরবের অধিকারী করেছেন।”
কবির জন্মদিন এল ২৫ শে বৈশাখ। জন্মদিনের গান লিখলেন কবি ” হে নূতন দেখা দিক আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ”। নিজেই সুর দিলেন। জন্মদিন পালিত হল অনাড়ম্বর ভাবে। কয়েকদিন পরে ত্রিপুরা দরবার থেকে রাজ প্রতিনিধিরা এলেন কবিকে ‘ভারত ভাস্কর’ উপাধি দিতে। এই গ্রীষ্মের ছুটিতে সপরিবারে শান্তিনিকেতনে এলেন বুদ্ধদেব বসু। শান্তিনিকেতনে ১৩ দিন ছিলেন।
দেখলেন, ”কেশরের মত যে কেশগুচ্ছ,তার ঘাড় বেয়ে নামত তা ছেঁটে ফেলা হয়েছে,কিন্তু মাথার মাঝখান দিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত কুঞ্চিত শুভ্র কেশের সৌন্দর্য এখনো অম্লান, মুখ শীর্ণ, আগুনের মত গায়ের রঙ ফিকে হয়েছে। এই অপরূপ রূপবান পুরুষের দিকে এখন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়, যেমন করে আমরা শিল্পীর গড়া কোন মূর্তি দেখি। …এতটুকু শৈথিল্য নেই, আচরণে কি চিন্তায় কি ব্যবহারে।”

এবার শান্তিনিকেতনে অসহ্য গরম। একটুকুও মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই। বিদ্যালয় বন্ধ। কবি সারাদিন এয়ার কন্ডিশন ঘরে থাকেন। সন্ধ্যার পর কবিকে এনে বারান্দায় বসানো হয়। শরীর ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। যাই বলুন বা লিখুন শরীর আর বইছে না।
“যে কবি বলেছিলেন ‘ইন্দ্রিয়ের দ্বার রুদ্ধ করি’ যোগাসন সে নহে আমার’, তাঁর ইন্দ্রিয়ের দরজাগুলো একে একে রুদ্ধ হয়ে আসছে। দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, চোখের সঙ্গে বই লাগিয়ে অতিকষ্টে পড়তে হয়, তবু পড়েন। শ্রবণশক্তি নিস্তেজ, আঙুল দুর্বল, তুলি ধরবার জোর নেই, কলমও কেঁপে যায়। তাঁর মানসলোকে ছবিরা ভিড় করে আসে, ওদের রঙে রেখায় ফোটানো হয় না। মন জ্বলন্ত, হাত চলে না। ক্ষণে ক্ষণে প্রাণে লাগে সুর, কণ্ঠ জাগে না। নানা শিল্পকর্মের তাঁর সবচেয়ে প্রিয় যে গান তার পালা বুঝি ফুরুলো।”
এখন তাঁর জগতে দিন রাত্রির বৈচিত্র্য আর নেই, ঋতুর লীলা ফুরিয়েছে। আশ্রমের পাখিরা ভোরবেলা ডাকাডাকি করে তিনি শোনেন না; বৃষ্টি পড়ে তাঁর জগতের নীরবতা ভাঙে না। তবু কোনো প্রশ্নেই তিনি নিরুত্তর নন, কোনো প্রসঙ্গেই অনিচ্ছুক নন। তাঁর মনের ঘরে ছুটি বলে কিছু ছিল না, এখনো নেই।

জীবনের ভার যখন গুরু, দেহ যখন জরাগ্রস্ত, মন যখন প্রকাশ-অনুকূলতার অভাবে ক্ষণে ক্ষণে স্তব্ধ হয়, রোগ দুঃখের চাইতে ঢের বেশি নিষ্ঠুর এই যন্ত্রণা। শরীর মনের এই দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে, কবিচিত্ত আপনার অন্তর্বেদনাকে শমিত করার চেষ্টা করে হাস্য- পরিহাসে। এমনকি যন্ত্রণা যখন দুঃসহ, চারিদিকে আশঙ্কার ছড়াছড়ি তখনও কৌতুক করার সুযোগ পেলে ছাড়তেন না। শরীরের এত কষ্টেও ওঁর হাসির উৎস শুকিয়ে যায়নি।
আষাঢ় মাস পড়তেই খোলা আকাশে বর্ষার রূপ দেখার জন্য কবি উতলা হন। তাঁকে উত্তরায়নের দোতলায় নিয়ে আসা হয়। কলকাতা থেকে রাণী মহালনবিশ আসেন। কবির কাছে থেকে যান মাসাবধি। রাণীকে পেয়ে রোগশয্যার দিনগুলো প্রীতি ও আনন্দে পূর্ণ হয়ে ওঠে কবির।
কিন্তু কোন চিকিৎসায় কোন উপকার দেখা যাচ্ছ না। কলকাতা থেকে ডাক্তার ইন্দুভূষণ বসু, ললিতকুমার বন্দোপাধ্যায় ও বিধানচন্দ্র রায় এলেন। তাঁরা কবিকে পরীক্ষা করলেন। জরুরী সিদ্ধান্ত হল, শ্রাবণ মাসেই অপারেশন করতে হবে।
অতঃপর কবিকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া স্থির হল। তৎকালীন ই.আই. রেলওয়ের অধিকর্তা এন. সি. ঘোষ কবির জন্য বিশেষ একখানি সেলুনগাড়ির ব্যবস্থা করলেন।
১৯৪১ সনের ২৫ শে জুলাই কবি শান্তিনিকেতন ছেড়ে শেষবারের জন্য জোড়াসাঁকের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। আশ্রমে সকলের মন খারাপ। ভোরের বৈতালিকের দল গানের অর্ঘ্য দিয়েছে কবিকে- “এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার, আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হল কার”। রওনা হবার সময় ছেলে মেয়েরা গানের মধ্য দিয়ে বিদায় -প্রণতি জানাল – “আমাদের শান্তি নিকেতন, সে যে সব হতে আপন”। তখনো তারা ভাবেনি এই তাদের শেষ গান শোনানো গুরুদেবকে।
কবি স্ট্রেচারের হাতলের উপর ভর করে গালের নীচে হাত দিয়ে চশমা চোখে আধশোয়া হয়ে আশ্রমের চারদিক দেখতে দেখতে চলেছেন। চালক ইচ্ছে করেই আশ্রমের ভিতর দিয়ে গাড়িখানা নিয়ে এল যাতে গুরুদেব যাবার সময় সব কিছু দেখে যেতে পারেন।

রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে আশ্রমের উদ্বিগ্ন মানুষজন। কবির চোখে মুখে অসুস্থতার চিহ্ন। তা দেখে তাদের সকলের চোখ ছলছল। মনে তাদের আশঙ্কা কবি আবার তাদের কাছে ফিরে আসবেন তো! অসুস্থতার জন্য এতদিন গুরুদেবের খুব কাছটিতে যেতে পারে নি! আজ দুর থেকেই জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে কবিকে তারা বিদায় জানায়।
এই শান্তিনিকেতনের সঙ্গে কবির প্রায় সত্তর বছরের সম্পর্ক। বাল্য, যৌবন, প্রৌঢ় ও বার্ধক্যের সকল অবস্থার কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। আজ সেই স্থান ত্যাগের মুহূর্তে হয়তো সে সব স্মৃতি তাঁর মনের ক্যানভাসে বার বার ভেসে ওঠে। এবার যেন বুঝতে পারছিলেন তাঁর আয়ু ক্ষীণ হয়ে আসছে। কেউ কেউ দেখলেন তাঁর চোখের কোণে জল।
১৯৪১ সনের ২৫ শে জুলাই শুক্রবার বেলা তিনটে পনেরো মিনিটে রবীন্দ্রনাথ শেষবারের মত প্রবেশ করলেন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। পুরানো বাড়ির দোতলার সেই পাথরের ঘরেই তাঁর শেষশয্যা রচিত হল।
শান্তিনিকেতনে অসুস্থ পুত্রবধু, তাঁর আদরের মামণিকে শেষ চিঠি দিলেন, -অতি কষ্টে কাঁপা হাতে “বাবামশায়” শব্দটি লিখতে পেরেছিলেন। অপারেশনের কিছু আগে তাঁর জীবন দেবতার উদ্দেশ্য শেষ অর্ঘ্য নিবেদন করে গেলেন –
“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে,
হে ছলনাময়ী।
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুন হাতে
সরল জীবনে……….”
অপারেশন হল ৩০ শে জুলাই। কিন্তু ফল ভাল হল না। অপারেশনের পর কয়কদিনেই জীবনের গতি বদলে গেল। অবশেষে রাখীপূর্ণিমার অবসানে ১৯৪১সালের ৭ই আগষ্ট ১২টা ১০ মিনিটে তার হৃৎস্পন্দন থেমে গেল। চিরঘুমে ঘুমিয়ে পড়লেন কবি। সেই ঘুমের দেশে শান্তির পারাবারে নিমজ্জিত হলেন। তাঁর স্বপ্নের শান্তিনিকেতনে আর ফেরা হল না।
ঋণ:-
- রবীন্দ্রজীবনী -প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়
- বাইশে শ্রাবণ -নির্লকুমারী মহালনবিশ
- নির্বাণ -প্রতিমা দেবী।
- রবীন্দ্রনাথ ও সজনীকান্ত -জগদীশ ভট্টাচার্য।
- সব পেয়েছির দেশ -বুদ্ধদেব বসু।
(বিঃ দ্রঃ পাঠকদের অবগতির জন্য জানাই যে সুপ্রাবন্ধিক সুজয় কর্মকারের কিছু মনোজ্ঞ প্রবন্ধ কয়েক বছর আগে রবিচক্রের ফেসবুকের পাতায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল, যেগুলি আমরা রবিচক্রের আন্তর্জালিক পত্রিকায় মাঝেমাঝে পুনঃপ্রকাশ করে চলেছি। রবিচক্রের এই স্বজন কিছুকাল আগে প্রয়াত হন। তাঁর স্মৃতির প্রতি এটি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। – সম্পাদকদ্বয়)

